৫৭ম অধ্যায়
কৰ্ম্মানুরূপ পারলৌকিক গতি
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! এই পৃথিবী যে অসংখ্য মহাবলপরাক্রান্ত নরপতির নিধনে নিতান্ত দীনভাব ধারণ করিয়াছে, আমি বারংবার সেই বিষয় স্মরণ করিয়া নিতান্ত বিমোহিত হইতেছি। অসংখ্য ব্যক্তির প্রাণসংহারপূর্ব্বক পৃথিবীজয় ও রাজ্যলাভ করিয়া আমাকে কেবল অনুতাপ করিতে হইতেছে। হায়! যেসমুদয় সুশীলা নারীর পতি, পুত্র, মাতুল ও ভ্রাতৃগণ সংগ্রামে কলেবর পরিত্যাগ করিয়াছেন, আজ তাঁহাদের কি গতি হইবে? যখন আমরা রাজ্যলোভে জ্ঞাতি ও বন্ধুবান্ধবগণকে সমরে নিপাতিত করিয়াছি, তখন নিশ্চয়ই আমাদিগকে অধঃশিরা হইয়া নরকে নিপতিত হইতে হইবে। আমি এই বিবেচনা করিয়া তপস্যা করিতে বাসনা করিতেছি। অতএব আপনি বিশেষরূপে আমাকে এই সময়ের উপযুক্ত উপদেশ প্রদান করুন।”
সূক্ষ্মবুদ্ধি ধৰ্ম্মরাজ এই কথা কহিলে মহামতি ভীষ্ম তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, “বৎস! মানবগণ যেরূপ কার্য্যদ্বারা পরলোকে যেরূপ গতি লাভ করে, আমি এক্ষণে তাহা তোমার নিকট কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। মনুষ্য তপস্যাদ্বারা যশঃ, দীর্ঘায়ু, বিবিধ ভোগ, জ্ঞানবিজ্ঞান, আরোগ্য, রূপ, ধনসম্পত্তি, সৌভাগ্য ও পরলোকে স্বর্গলাভ করিতে পারে। যে ব্যক্তি মৌনব্রত অবলম্বন করেন, তিনি সমুদয় লোককেই বশীভূত করিতে পারেন। দান, উপভোগ, ব্রহ্মচর্য্যদ্বারা দীর্ঘায়ু, অহিংসাদ্বারা সৌন্দর্য্য ও দীক্ষাদ্বারা সদ্বংশে জন্মলাভ হয়। যাঁহারা ইহলোকে ফলমূলমাত্র ভোজন করেন, তাঁহারা পরলোকে রাজ্য, আর যাঁহারা ইহলোকে পর্ণাহার ও সলিলমাত্র পান করিয়া থাকেন, তাঁহারা পরলোকে স্বর্গলাভ করিতে সমর্থ হয়েন। দানদ্বারা প্রভূত ধন, গুরুশুশ্রূষাদ্বারা বিদ্যা ও নিত্যশ্রাদ্ধদ্বারা সন্তানসন্ততি লাভ হয়।
“যাঁহারা শাকমাত্র ভোজন করেন, তাঁহারা পরজন্মে প্রভূত গোধন ও যাঁহারা তৃণমাত্র আহার করিয়া থাকেন, তাঁহারা পরলোকে স্বর্গলাভে সমর্থ হয়েন। ইহলোকে যেসমুদয় স্ত্রী ত্রিকালীন স্নান ও বায়ু ভক্ষণ করেন, পরলোকে তাঁহাদিগের যজ্ঞানুষ্ঠানের ফললাভ হয়। যাঁহারা নিত্যস্নান এবং প্রাতঃকাল ও সন্ধ্যাকালে ইষ্টমন্ত্র জপ করেন, তাঁহারা পরলোকে দক্ষপ্রজাপতির স্বরূপত্ব; যাঁহারা মরুভূমিতে দেবগণের অর্চ্চনা করেন, তাঁহারা রাজ্য; যাঁহারা অনশনব্রত অবলম্বন করেন, তাঁহারা স্বর্গ; যাঁহারা স্থণ্ডিলে [পবিত্রস্থানে কুশ-কাশাদি আস্তরণে] শয়ন করেন, তাঁহারা গৃহ ও শয্যা; যাঁহারা চীর ও বল্কল পরিধান করেন, তাঁহারা বস্তু ও আভরণ; যাঁহারা যোগ ও তপানুষ্ঠান করেন, তাঁহারা বিবিধ শয্যা, আসন ও যান এবং যাঁহারা অগ্নিতে প্রবেশপূৰ্ব্বক প্রাণত্যাগ করেন, তাঁহারা ব্রহ্মালোক লাভ করিয়া থাকেন।
“রসসমুদয় পরিত্যাগ করিলে পরলোকে সৌভাগ্য, আমিষ পরিত্যাগ করিলে পুত্রগণের দীর্ঘ আয়ু ও জলমধ্যে বাস করিয়া তপস্যা করিলে পরলোকে স্বর্গের আধিপত্য এবং সতত সত্যবাক্য প্রয়োগ করিলে দেহান্তে দেবগণের সহবাস লাভ হইয়া থাকে। ধনদানদ্বারা যশ, অহিংসাদ্বারা আরোগ্য, দ্বিজশুশ্রূষাদ্বারা রাজ্য ও ব্রাহ্মণত্ব লাভ হয়। পানীয় প্রদানদ্বারা অচলা কীৰ্ত্তি এবং অন্ন ও পানীয় এই উভয় দানদ্বারা বিবিধ ভোগজনিত তৃপ্তিলাভ হইয়া থাকে। সৰ্ব্বভূতের শান্তিপ্রদ মহাত্মাদিগকে কখনই শোকসন্তাপে লিপ্ত হইতে হয় না। দেবগণের আরাধনা করিলে পরলোকে রাজ্য ও দিব্যরূপ, দীপদান করিলে চক্ষুষ্মত্তা, রমণীয় বস্তু প্রদান করিলে স্মৃতি ও মেধা এবং গন্ধমাল্য প্রদান করিলে পরলোকে কীৰ্ত্তিলাভ হইয়া থাকে।
‘ইহজন্মে যাঁহারা কেশ ও শ্মশ্রু ধারণ করেন, পরজন্মে তাঁহাদিগের উৎকৃষ্ট পুত্রলাভ হয়। যাঁহারা দ্বাদশবর্ষ সর্ব্বভোগ পরিত্যাগ, জপাদি নিয়মানুষ্ঠান ও ত্রিকালীন স্নান করেন, তাঁহারা পরলোকে বীরস্থান অপেক্ষাও উৎকৃষ্ট স্থান লাভ করিতে সমর্থ ইয়েন। ব্রাহ্মবিধানানুসারে কন্যাদান করিলে পরজন্মে উৎকৃষ্ট দাস-দাসী, অলঙ্কার, ক্ষেত্র ও গৃহসমুদয় লাভ হইয়া থাকে। যজ্ঞানুষ্ঠান ও উপবাসদ্বারা স্বর্গলাভে সমর্থ হওয়া যায়। যাঁহারা ফল ও পুষ্পদ্বারা ঈশ্বরের আরাধনা করেন, তাঁহাদিগের মঙ্গলময় পবিত্র জ্ঞানলাভ হয়। দেবগণ কহিয়াছেন, সুবর্ণনির্ম্মিত শৃঙ্গসম্পন্ন সহস্ৰ ধেনু প্রদান করিলে মানবগণ নিঃসন্দেহ দেবলোক লাভ করিতে পারে। যে ব্যক্তি ইহলোকে সুবর্ণশৃঙ্গ ও কাংস্যক্রোড়সম্পন্ন সবৎসা ধেনু প্রদান করেন, তিনি পরলোকে ঐ ধেনুর শরীরে যত রোম বিদ্যমান থাকে, তত বৎসর অভিলষিত সুখসম্ভোগ ও স্বীয় পুত্রপৌত্রাদি সপ্তপুরুষের উদ্ধারসাধন করিতে পারেন। ইহলোকে ব্রাহ্মণগণকে সুবর্ণময় শৃঙ্গসম্পন্ন, কাংস্যক্রোড়বিভূষিত, কনকোত্তরীয়যুক্ত তিলময় ধেনু প্রদান করিলে পরলোকে বসুদিগের লোক লাভ করা যায়। যেমন পবনসঞ্চালিতপোতদ্বারা মহার্ণব হইতে উত্তীর্ণ হওয়া যায়, তদ্রূপ গোদানদ্বারা অন্ধকারময় নরক হইতে অনায়াসে মুক্তিলাভ করা যাইতে পারে। যাঁহারা ইহলোকে ব্রাহ্মবিধানানুসারে কন্যাদান এবং ব্রাহ্মণগণকে ভূমি ও অন্ন দান করেন, পরলোকে তাঁহাদিগের ইন্দ্রলোকলাভ হয়। যাঁহারা স্বাধ্যায়নিরত গুণবান্ ব্রাহ্মণদিগকে উৎকৃষ্ট গৃহসামগ্ৰীসমুদয় প্রদান করেন, তাঁহারা পরলোকে উত্তরকুরুতে সুখসম্ভোগ করিতে পারেন। ভারবাহক গোদান করিলে বসুলোক, হিরণ্য দান করিলে স্বর্গ অপেক্ষাও উৎকৃষ্ট স্থান, ছত্ৰদান করিলে রমণীয় গৃহ, চর্ম্মপাদুকা প্রদান করিলে যান, বস্ত্র দান করিলে দিব্যশরীর এবং গন্ধ দান করিলে সুগন্ধযুক্ত দেহলাভ হইয়া থাকে।
“যাঁহারা ব্রাহ্মণগণকে ফল প্রদান, পুষ্প ও বৃক্ষ প্রদান করেন, তাঁহারা পরজন্মে উত্তম স্ত্রী ও নানাবিধ রত্নভূষিত গৃহ লাভ করিয়া থাকেন। যাঁহারা ইহলোকে বিবিধ ভক্ষ্য, পানীয়, বস্ত্র ও আশ্রয় দান করেন, তাঁহারা পরজন্মেও ঐ সমুদয় প্রচুর পরিমাণে প্রাপ্ত হয়েন। যে ব্যক্তি ইহলোকে ব্রাহ্মণগণকে স্নানীয়, ধূপ, গন্ধ ও মাল্য প্রদান করেন, তিনি পরজন্মে সুন্দর ও রোগবিহীন হইয়া থাকেন। যে ব্যক্তি ইহলোকে ব্রাহ্মণকে ধনধান্যপরিপূর্ণ শয্যাসমন্বিত গৃহ প্রদান করেন, পরলোকে তাহার ধ্রুবলোকলাভ হয়। আর যে ব্যক্তি ইহলোকে সুগন্ধযুক্ত বিচিত্র আস্তরণ ও উপাধানসম্বলিত শয্যা প্রদান করেন, তিনি পরজন্মে সকুলোদ্ভবা রূপবতী ভাৰ্য্যা লাভ করিয়া থাকেন। মুহর্ষিগণ কহিয়া থাকেন, বীরশয্যায় শয়ন করিলে সৰ্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মার স্বরূপত্ব লাভ করা যায়; অতএব কেহই বীরশয্যাশায়ী মহাত্মাদিগের তুল্য উৎকৃষ্ট গতিলাভ করিতে সমর্থ হয়েন না।”
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির মহাত্মা ভীষ্মের এই সমুদয় বাক্যশ্রবণে প্রীত হইয়া স্বৰ্গকামনানিবন্ধন বনবাসবাসনাপরিহারপূর্ব্বক ভ্রাতৃগণকে কহিলেন, “হে ভ্রাতৃগণ! তোমরা পিতামহের বাক্যে শ্রদ্ধান্বিত হও।” তখন অৰ্জ্জুন, ভীমসেন, নকুল, সহদেব ও যশস্বিনী দ্রৌপদী তাঁহার সেই বাক্য স্বীকার করিলেন।
