2 of 4

৭০. গোদানবৈগুণ্যে নৃগনৃপতির কাকলাসজন্ম

৭০তম অধ্যায়

গোদানবৈগুণ্যে নৃগনৃপতির কাকলাসজন্ম

ভীষ্ম কহিলেন, “হে ধৰ্ম্মরাজ! পূর্ব্বে মহারাজ নৃগ ব্রাহ্মণের ধন অপহরণ করিয়া যেরূপ যন্ত্রণা ভোগ করিয়াছিলেন, আমি সেই পুরাতন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। কিয়দ্দিন পূর্ব্বে দ্বারবতীনগরীতে যদুকুলের বালকগণ জল অম্বেষণার্থ ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে করিতে হঠাৎ এক মহাকুপ অবলোকন করিল। ঐ কূপ তৃণ ও লতাদিদ্বারা সমাচ্ছন্ন ছিল। বালকগণ কূপদর্শনে আহ্লাদিত হইয়া জললাভের নিমিত্ত বিস্তর চেষ্টা করিল, কিন্তু কিছুতেই কৃতকার্য্য হইতে পারিল না। অনন্তর তাহারা মহাপ্রযত্নে সেই কূপের মুখ হইতে তৃণলতাদি অপসারিত করিয়া দেখিল, উহার মধ্যে এক মহাকায় কৃকলাস [কাকলাস] অবস্থান করিতেছে। সেই পর্ব্বতাকার কৃকলাসকে দেখিবামাত্র বালকগণ রঞ্জু ও চর্ম্মপট[চামড়ার দড়ি]দ্বারা তাহাকে বদ্ধ করিয়া তাহার উদ্ধারের নিমিত্ত যারপরনাই যত্ন করিল; কিন্তু কোনরূপেই তাহাকে তথা হইতে বিচলিত করিতে সমর্থ হইল না। তখন তাহারা নিতান্ত ক্ষুব্ধ হইয়া মহাত্মা কৃষ্ণের নিকট সমুপস্থিত হইয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিল, বাসুদেব। এক মহাকূপমধ্যে একটি ভীষণ কৃকলাস শূন্যপথ আবরণপূৰ্ব্বক অবস্থান করিতেছে, আমরা কোনরূপে তাহাকে উদ্ধার করিতে না পারিয়া তোমার নিকট উপস্থিত হইয়াছি।’

“বালকগণ এই কথা কহিলে বাসুদেব তাহাদিগের বাক্য শ্রবণ মাত্র সেই মহাকূপের নিকট গমনপূৰ্ব্বক তাহা হইতে সেই পৰ্ব্বতাকার কৃকলাসকে উদ্ধার করিয়া তাহাকে তাহার পূর্ব্বজন্মবৃত্তান্ত জিজ্ঞাসা করিলেন। তখন কৃকলাস তাঁহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিল, ‘ভগবন্! আমি পূৰ্ব্বজন্মে নৃগনামে এক রাজা ছিলাম। ঐ সময় আমি সহস্র যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়াছি।’ কৃকলাস এই কথা কহিলে, ভগবান্ বাসুদেব তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘মহারাজ! আপনি কখন পাপকাৰ্য্যের অনুষ্ঠান না করিয়া কেবল পুণ্যকার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন; আপনি ব্রাহ্মণগণকে প্রতিনিয়ত অসংখ্য গোদান করিতেন, তবে আপনার এরূপ দুর্গতি হইল কেন ‘

“তখন সেই কৃকলাসরূপী মহারাজ নৃগ বাসুদেবকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘ভগবন্! পূর্ব্বে এক অগ্নিহোত্ৰশীল কোন কার্য্যবশতঃ প্রবাসে গমন করিলে তাঁহার একটি ধেনু যূথভ্রষ্ট হইয়া আমার গোধনমধ্যে প্রবিষ্ট হওয়াতে আমার পশুরক্ষকেরা আমার সহস্ৰ ধেনুর মধ্যে তাহাকে পরিগণিত করিয়াছিল এবং আমিও পারলৌকিক ফললাভের নিমিত্ত সেই ধেনু এক ব্রাহ্মণকে দান করিয়াছিলাম। কিয়দ্দিন পরে সেই বিদেশগত ব্রাহ্মণ আবাসে প্রত্যাগমন করিয়া স্বীয় গোধন অন্বেষণ করিতে করিতে আমি যে ব্রাহ্মণকে গোদান করিয়াছিলাম, তাঁহার আলয়ে সেই ধেনু দেখিতে পাইলেন। তখন তিনি ঐ ব্রাহ্মণের নিকট সমুপস্থিত হইয়া তাঁহাকে কহিলেন, ‘এই ধেনু আমার, অতএব আমি ইহাকে লইয়া স্বীয় গৃহে গমন করিব।’ তখন ঐ ব্রাহ্মণ তাঁহাকে কহিলেন, ‘মহারাজ নৃগ আমাকে এই ধেনু প্রদান করিয়াছেন, সুতরাং আমি কখনই তোমাকে উহা প্রদান করিব না।’

‘তাহারা উভয়ে এইরূপ বিবাদ করিতে করিতে আমার নিকট সমুপস্থিত হইয়া বৃত্তান্ত বিজ্ঞাপনপূৰ্ব্বক কহিলেন, “মহারাজ! তুমি দাতা হইয়া কেন অপহর্ত্তা হইলে?” তখন আমি সেই গ্রহীতা ব্রাহ্মণকে সম্বোধন করিয়া কহিলাম, ‘ভগবন্! আমি আপনাকে অযুত গোদান করিতেছি, আপনি সেই ধেনু এই ব্রাহ্মণকে প্রদান করুন।’ আমি এই কথা কহিলে ব্রাহ্মণ ক্ষুব্ধচিত্তে আমাকে কহিলেন, ‘মহারাজ! সেই সুলক্ষণসম্পন্ন দুগ্ধবতী ধেনু আমার গৃহে অবস্থিত হইয়া নিত্য সুস্বাদু ক্ষীর প্রদানপূর্ব্বক আমার স্তন্যপানবিরহিত কৃশ পুত্রের পোষণ করিতেছে। অতএব আমি কখনই তাহাকে ঐ ধেনু প্রদান করিতে পারিব না।’ এই বলিয়া তিনি তৎক্ষণাৎ আমার নিকট হইতে আপনার আবাসে প্রস্থান চরিলেন। তখন আমি সেই প্রবাস হইতে আগত ব্রাহ্মণকে সম্বোধন করিয়া কহিলাম, ‘ভগবন্! আমি আপনার সেই ধেনুর পরিবর্তে আপনাকে লক্ষ গোদান করিতেছি, আপনি অনুগ্রহ করিয়া গ্রহণ করুন।’ তখন তিনি আমাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘মহারাজ! ভূপতিদিগের দান গ্রহণ করিতে আমার অভিলাষ নাই, আমি অনায়াসে আপনার ভরণপোষণ করিতে পারি। অতএব শীঘ্র আমাকে আমার ধেনু প্রদান করুন।’ তিনি এই কথা কহিলে আমি তাঁহাকে অসংখ্য সুবর্ণ, রজত, অশ্ব ও রথসমুদয় প্রদান করিতে স্বীকার করিলাম, কিন্তু তিনি কিছুতেই সম্মত না হইয়া পরিশেষে বিষণ্নমনে আপনার আবাসে গমন করিলেন।

‘অনন্তর অতি অল্পকাল পরেই আমি কালধৰ্ম্মানুসারে কলেবর পরিত্যাগপূৰ্ব্বক পিতৃলোক লাভ করিয়া যমের নিকট সমুপস্থিত হইলাম। ভগবান্ কৃতান্ত আমাকে দর্শনপূর্ব্বক যথোচিত সৎকার করিয়া কহিলেন, ‘মহারাজ! আপনার পুণ্যের ইয়ত্তা নাই; কিন্তু আপনি অজ্ঞানবশতঃ এক ব্রাহ্মণের গোধন হরণপূৰ্ব্বক পাপাচরণ করিয়াছেন। ঐ ব্রাহ্মণকে তাঁহার ধেনু প্রত্যর্পণ না করাতে আপনি প্রজাদিগকে রক্ষা করিব বলিয়া যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, আপনার সেই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ ও ব্রহ্মস্ব অপহরণ এই অধর্ম্মে লিপ্ত হইয়াছেন। এক্ষণে আপনার ইচ্ছানুসারে পাপের বা পুণ্যের ফলভোগ করুন।”

‘মহাত্মা যম এই কথা কহিলে আমি তাঁহার নিকট প্রথমে পাপের ও পশ্চাৎ পুণ্যের ফল ভোগ করিতে প্রার্থনা করিবামাত্র আমাকে তথা হইতে ভূতলে নিপতিত হইতে হইল। তখন ভগবান যম উচ্চৈঃস্বরে আমাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘মহারাজ! সহস্র বৎসর পরে দুর্গতিক্ষয় হইলে ভগবান্ বাসুদেব আপনার উদ্ধারসাধন করিবেন। তাহা হইলেই আপনি স্বীয় কৰ্ম্মবলে এই সনাতন লোক লাভ করিতে পারিবেন। আমি তাঁাহার এইমাত্র বাক্য শ্রবণ করিয়া তির্য্যগযোনিগত ও অধঃশিরা হইয়া এই কূপমধ্যে নিপতিত হইলাম। কিন্তু পূর্ব্ববৃত্তান্তসমুদয় আমার স্মৃতিপথ হইতে বহির্ভূত হইল না। আজ আপনি কৃপা করিয়া আমাকে পরিত্রাণ করিলেন, এক্ষণে অনুজ্ঞা করুন, আমি আপনার প্রসাদে স্বর্গে আরোহণ করি।’ মহারাজ নৃগ এই বলিয়া বাসুদেবের অনুজ্ঞা গ্রহণ ও তাঁহাকে নমস্কার করিয়া দিব্যবিমানে আরোহণপূর্ব্বক সুরধামে প্রস্থান করিলেন।

“মহারাজ নৃগ স্বর্গারোহণ করিলে মহাত্মা বাসুদেব লোকের হিতার্থ এই বলিয়া কীৰ্ত্তন করিয়াছিলেন যে, ‘মহারাজ নৃগ ব্রাহ্মণের গোধন হরণ করিয়া এই দুর্দ্দশাগ্রস্ত হইয়াছিলেন; অতএব ব্রহ্মস্ব হরণ করা কখনই কর্ত্তব্য নহে। আর দেখ সাধুসমাগমবশতঃ মহারাজ নৃগের নরক হইতে মুক্তিলাভ হইল, অতএব সাধুসংসর্গ কখনই নিষ্ফল হইবার নহে। দান করিলে যেরূপ ফললাভ হয়, অপহরণ করিলে তদ্রূপ অধৰ্ম্ম হইয়া থাকে। অতএব গোধনহরণ করা কাহারও কর্ত্তব্য নহে।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *