2 of 4

৬২. ভূমিদানের প্রশংসা

৬২তম অধ্যায়

ভূমিদানের প্রশংসা

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! ধর্ম্মশাস্ত্রে ভূপতিদিগের যে বিবিধ দানের নিয়ম আছে, তন্মধ্যে কোন্ দান শ্রেষ্ঠ, তাহা আমার নিকট কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! ভূমিদান সমুদয় দান অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। ভূমি অক্ষয় ও অচল, ভূমি কামপ্রসবিনী ধেনুর ন্যায় লোকের সমুদয় কামনা পূর্ণ করিতে পারে। ভূমি হইতে বস্ত্র, রত্ন, পশু এবং ধান্য ও যব প্রভৃতি শস্যসমুদয় সমুৎপন্ন হইয়া থাকে। অতএব ইহলোকে ভূমিদান অপেক্ষা উৎকৃষ্ট দান আর নাই। ভূমিদাতা বহুকাল সমৃদ্ধিশালী হইয়া পরমসুখে কালহরণ করিতে সমর্থ হয়েন। যাঁহারা পূৰ্ব্বজন্মে ভূমিদান করেন, তাঁহারাও পরজন্মে ভূমিভোগ করিতে পারেন। কারণ, ইহলোকে হউক বা পরলোকে হউক, মনুষ্যমাত্রেই স্ব স্ব কার্য্যের ফলভোগ করিয়া থাকে। মহাদেবী ধরিত্রী ভূমিদাতাকে পতিত্বে বরণ করিয়া থাকেন। অতএব যে ব্যক্তি ইহজন্মে ভূমি দক্ষিণা প্রদান করেন, তিনি পরজন্মে যেরূপ দান করেন, তিনি পরজন্মে তদনুরূপ ফলভোগ করিয়া থাকেন।

“পণ্ডিতেরা সম্মুখযুদ্ধে দেহত্যাগ ও পৃথিবীদানকেই ক্ষত্রিয়ের পরমধৰ্ম্ম বলিয়া নির্দ্দেশ করেন। ব্রহ্মঘ্ন মিথ্যাবাদী পাপাত্মারাও যদি ভূমিদান করে, তাহা হইলে ঐ ভূমি তাহাদিগকে পাপমুক্ত করিয়া তাহাদিগের পবিত্রতা সম্পাদন করিতে সমর্থ হয়। সাধুব্যক্তিরা পাপাত্মা রাজাদিগের নিকট সুবর্ণাদি গ্রহণ করিলে পাপভাগী হয়েন, কিন্তু ভূমি গ্রহণ করিলে তাঁহাদের কিছুমাত্র পাপ জন্মিবার সম্ভাবনা নাই। পৃথিবী ভূমিদাতা ও ভূমিগ্রহীতা উভয়েরই প্রিয়কার্য্য সাধন করিয়া থাকেন বলিয়া উহার প্রিয়দত্তা নাম হইয়াছে। যে রাজা বিদ্বান্ ব্রাহ্মণকে ভূমিদান করেন, তিনি ইহজন্মে অভিলষিত রাজ্যভোগ ও পরজন্মে সার্ব্বভৌমত্ব লাভ করিতে সমর্থ হয়েন, সন্দেহ নাই। অতএব ভূমিদান করা রাজাদিগের অবশ্যকর্ত্তব্য কৰ্ম্ম। ভূমিপতি ব্যতীত অন্যের ভূমিদানের অধিকার নাই। অযোগ্য পাত্রে ভূমিদান করা কদাপি কৰ্ত্তব্য নহে। অন্য দানের ন্যায় ভূমিদান করিয়া গোপন করিবার কিছুমাত্র প্রয়োজন নাই। যে সমুদয় ভূপতি জমি লাভ করিতে বাঞ্ছা করেন, তাঁহাদিগের জমিদান করা অবশ্য কর্ত্তব্য। যে রাজা বলপূৰ্ব্বক সাধুদিগের ভূমি গ্রহণ করেন, তিনি পরজন্মে ভূমিলাভে বঞ্চিত হয়েন। আর যে ধৰ্ম্মপরায়ণ নরপতি সাধুদিগকে ভূমিদান করেন, তিনি ইহজন্মে, ও পরজন্মে উক্তৃষ্ট ভূমি ও ফললাভ করিতে পারেন।

“ব্রাহ্মণগণ সৰ্ব্বদা যে রাজার ভূমির প্রশংসা করেন, বিপক্ষেরা কখনই তাঁহার রাজ্য আক্রমণ করিতে সমর্থ হয় না। লোকে অর্থকৃচ্ছ্রনিবন্ধন যে কিছু পাপাচরণ করে, দ্বিসহস্র একশত হস্তপরিমিত ভূমি প্রদান করিলেই তাহার সেই পাপ ধ্বংস হইয়া যায়। অতি ঘৃণিত ও কুকৰ্ম্মনিরত রাজারাও উৎকৃষ্ট ভূমিদান করিলে পবিত্র হইতে পারে। পূর্ব্বতন পণ্ডিতেরা কহিয়াছেন, অশ্বমেধযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিলে যে ফললাভ হয়, সাধুদিগকে ভূমিদান করিলেও প্রায় সেই ফললাভ হইয়া থাকে। পণ্ডিতেরা অন্যান্য পুণ্যকর্ম্মের অনুষ্ঠান করিয়া তাহার ফললাভবিষয়ে সংশয় করেন, কিন্তু উৎকৃষ্ট ভূমিদানের ফললাভ বিষয়ে তাঁহাদের কখনই শঙ্কা হয় না। ভূমিদান করিলে, তপস্যা, যজ্ঞ, বিদ্যা, সুশীলতা, অলোভ, সত্যবাদিতা, দেবার্চ্চনা, গুরুশুশ্রূষা এবং সুবর্ণ, রজত, বস্তু, মণিমুক্তা প্রভৃতি বিবিধ ধনলাভের ফললাভ হয়। যাঁহারা প্রভুর হিতানুষ্ঠাননিরত হইয়া গমন করেন, তাঁহারাও ভূমিদাতাকে অতিক্রম করিতে সমর্থ হয়েন না। যেমন জননী সৰ্ব্বদা ক্ষীরপ্রদান করিয়া স্বীয় শিশুসন্তানকে প্রতিপালন করেন, তদ্রূপ পৃথিবী সমুদয় রস প্রদান করিয়া ভূপতিকে পালন করিয়া থাকেন। মৃত্যু, কাল, দণ্ড, তমোগুণ, সুদারুণ বহ্নি ও ভয়ঙ্কর পাপসমুদয় ভূমিদাতাকে স্পর্শ করিতে সমর্থ হয় না। শান্ত প্রকৃতি হইয়া ভূমিদান করিলেও দেবতা ও পিতৃগণের তৃপ্তিসাধন করা হয়। কৃশ, ম্রিয়মাণ ও দরিদ্র ব্রাহ্মণকে ভূমিদান করিলে যজ্ঞফললাভ হইয়া থাকে। বৎসপ্রিয়া ধেনু যেমন ক্ষীরধারা বর্ষণ করিতে করিতে বৎসের নিকট গমন করিয়া তাহাকে দুগ্ধ প্রদান করে, তদ্রূপ পৃথিবী ভূমিদাতা ভূপতিকে উভয়লোকে বিবিধ ভোগ প্রদান করিয়া থাকেন।

“যে ব্যক্তি ইহজন্মে ব্রাহ্মণকে ফলকৃষ্ট, বীজসম্পন্ন ও ফলসমন্বিত ভূমি অথবা উৎকৃষ্ট গৃহদান করেন, তিনি সমুদয় লোকের কামনা পূর্ণ করিতে পারেন। যে রাজা আহিতাগ্নি, ব্রতপরায়ণ, সচ্চরিত্র ব্রাহ্মণগণকে ভূমিদান করেন, তাহাকে কখনই বিপদগ্রস্ত হইতে হয় না। চন্দ্রমা যেমন দিনে দিনে বর্দ্ধিত হয়েন, তদ্রূপ ভূমিদানের ফল, প্রদত্ত ভূমিতে যতবার শস্য হয়, ততগুণ পরিবর্দ্ধিত হইয়া থাকে।

ভূমিগীতা—ভূমিদানের শ্রেষ্ঠতা কীৰ্ত্তন

“পুরাণজ্ঞ পণ্ডিতগণ এই ভূমিগীতা কীৰ্ত্তন উপলক্ষে কহিয়া গিয়াছেন যে, ভূমি স্বয়ং কহিয়াছেন, আমাকে দান ও আমাকে গ্রহণ কর। আমাকে দান করিলে পুনরায় আমাকে লাভ করিতে পারিবে। কারণ ইহলোকে যে ব্যক্তি যাহা প্রদান করে, সে পরলোকে তাহাই লাভ করিয়া থাকে। মহাত্মা জামদগ্ন্য এই ভূমিগীতা শ্রবণ করিয়া কশ্যপকে সমুদয় পৃথিবী প্রদান করিয়াছিলেন। যে ব্রাহ্মণ বেদতুল্য এই ভূমিগীতা অবগত হয়েন, অথবা যিনি শ্রাদ্ধকালীন ইহা পাঠ করেন, তিনি নিশ্চয়ই ব্রহ্মলোক লাভ করিয়া থাকেন। প্রবল ব্যক্তিদিগের আভিচারিকী [মারণ, উচাটন প্রভৃতি অনিষ্টজনক কার্য্য] ক্রিয়া দ্বারা যে অনিষ্টপাত হয়, ভূমিদান তাহার শান্তিকর প্রায়শ্চিত্তরূপ। যে ব্যক্তি ভূমিদান করে, তাহার দশ পুরুষ পবিত্র হয়। ভূমি সমুদয় জীবের উৎপত্তির কারণ; অগ্নি ইহার অধিষ্ঠাত্রী দেবতা। নরপতিকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিয়াই তাহার নিকট এই ভূমিগীতা কীৰ্ত্তন করা অবশ্য কর্ত্তব্য। কারণ, তাহা হইলে তিনি সাধুব্যক্তিদিগকে ভূমিদান করিবেন এবং তাঁহাদের ভূমি হরণ করিতে বাসনা করিবেন না।

“রাজার সমুদয় অর্থই ব্রাহ্মণগণের নিমিত্ত সঞ্চিত হইয়া থাকে, সন্দেহ নাই। রাজা ধার্ম্মিক হইলেই প্রজাদিগের ঐশ্বর্য্যবৃদ্ধি হয় এবং অধার্ম্মিক ও নাস্তিক হইলে তাঁহাদিগের সুখে কালযাপন করা দূরে থাকুক, দুঃখের পরিসীমা থাকে না। তাহার অসদাচরণে প্রজাদিগের সতত উদ্বিগ্ন হইতে হয়। ঐরূপ ভূপতির রাজ্য কদাচ পরিবর্দ্ধিত হয় না, প্রত্যুত অচিরাৎ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। রাজা ধার্ম্মিক ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন হইলে প্রজাগণ নিদ্রাদি সুখানুভব করিয়া পরমসুখে গাত্রোত্থান করে। রাজার শুভকাৰ্য্যানুষ্ঠানদ্বারা প্রজাগণ যারপরনাই সুখী ও পরিবর্দ্ধিত হয়। যে নরপতি পৃথিবী দান করেন, তিনিই কুলীন, বন্ধু, মহাপুরুষ, পুণ্যাত্মা, দাতা ও যথার্থ পরাক্রান্ত। যাঁহারা বেদজ্ঞ, ব্রাহ্মণকে ভূমিদান করেন, তাঁহারা সূর্য্যের ন্যায় মহাতেজে দেদীপ্যমান হইয়া থাকেন। যেমন বীজ বপন করিলে তাহা হইতে শস্য সমুৎপন্ন হয়, তদ্রূপ ভূমিদান করিলে সকল কামনা সফল হইয়া থাকে। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর, চন্দ্র, সূর্য্য, অগ্নি ও বরুণ ইহারা সকলেই ভূমিদাতার প্রশংসা করেন। মানবগণ ভূমি হইতে জন্মপরিগ্রহ করিয়া আবার ভূমিতে বিলীন হইয়া থাকে। জরায়ুজাদি চতুৰ্ব্বিধ জীবই ভূমির বিকার। ভূমি সমুদয় জগতের পিতামাতাস্বরূপ। ভূমির তুল্য উৎকৃষ্ট পদার্থ আর কিছুই নাই।

ভূমিদানের প্রশংসা—ইন্দ্র-বৃহস্পতিসংবাদ

“হে ধৰ্ম্মরাজ! আমি এই স্থলে ইন্দ্র-বৃহস্পতিসংবাদনামে এক পুরাতন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। পূৰ্ব্বকালে ত্রিলোকাধিপতি ইন্দ্র ভূরিদক্ষিণ একশত যজ্ঞ সমাপনানন্তর বৃহস্পতিকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিয়াছিলেন, ‘ভগবন্! কোন্ বস্তু দান সর্ব্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট ও কোন্ দানপ্রভাবে স্বর্গে অবস্থান করিয়া অনায়াসে পরমসুখে কালযাপন করা যায়, তাহা কীৰ্ত্তন করুন।‘

“তখন দেবপুরোহিত মহাতেজস্বী বৃহস্পতি ইন্দ্রের বাক্য শ্রবণ করিয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘দেবরাজ! সুবর্ণ, গো ও ভূমি এই সকল বস্তু দান করিলে সমুদয় পাপ হইতে মুক্ত হওয়া যায়। কিন্তু পণ্ডিতগণের বাক্যানুসারে আমার বোধ হয়, ভূমিদান, অপেক্ষা উৎকৃষ্ট আর কিছুই নাই। যেসকল বীর সমরাঙ্গনে নিহত হইয়া স্বর্গলোকে গমন করেন, তাঁহারাও ভূমিদাতাকে অতিক্রম করিতে পারেন না। ভূমিদাতা পূর্ব্বতন পাঁচ ও অধস্তন ছয় এই একাদশ পুরুষকে পরিত্রাণ করেন। যিনি রত্নসমলঙ্কৃত ভূমি প্রদান করেন, তাঁহার পাপের লেশমাত্রও থাকে না। তিনি পরমসুখে স্বর্গলোকে বাস করেন। ইহজন্মে সর্ব্বগুণসমন্বিত অধিক পরিমাণ ভূমি প্রদান করিলে, জন্মান্তরে তাঁহার রাজাধিরাজত্ব লাভ হয়। যে রাজা সৰ্ব্বশস্যপরিপূর্ণ পৃথিবী দান করেন, তিনি সমুদয় পদার্থদানের ফললাভে অধিকারী হইয়া থাকেন। মধু, ঘৃত, দুগ্ধ ও দধিপ্ৰবাহিণী নদীসকল পরলোকে ভূমিদাতার তৃপ্তিসাধন করিয়া থাকে। নরপতি ভূমিদান করিলে অনায়াসে সমুদয় পাপ হইতে মুক্ত হইতে পারেন। ফলতঃ ভূমিদান অপেক্ষা উৎকৃষ্ট দান আর কিছুই নাই।

‘যে নরপতি স্বীয় বাহুবলে সসাগরা পৃথিবী জয় করিয়া সমুদয় ব্রাহ্মণসাৎ করেন, যত কাল পৃথিবী বিদ্যমান থাকে, ততকাল মানবগণ তাঁহার যশ ঘোষণা করে। যিনি সমৃদ্ধিসম্পন্ন ভূমি প্রদান করেন, তিনি অক্ষয় স্বর্গলাভে সমর্থ হয়েন। যে নরপতি রাজ্যসুখ অভিলাষ করেন, ভূমিদান করা তাঁহার সর্ব্বতোভাবে কৰ্ত্তব্য। মানবগণ পাপানুষ্ঠান করিয়া ভূমিদান করিলে অনায়াসে পাপ হইতে মুক্ত হয়। একমাত্র ভূমিদান করিলেই এককালীন সস্র নদী, পর্ব্বত, বন, তড়াগ, উদপান, সরোবর, স্নেহাদি বিবিধ রস, বীর্য্যবান ঔষধ ও পুষ্পফলসমন্বিত পাদপসমুদয় দানের ফললাভ হইয়া থাকে। প্রভূত দক্ষিণা প্রদান করিয়া অগ্নিষ্টোমাদি যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিলেও ভূমিদানের তুল্য ফললাভ করা যায় না। ভূমিদাতা ভূমিদান করিয়া তাহা প্রত্যাহরণ করিলে স্বয়ং নরক হয়েন এবং স্বীয় দশপুরুষকে নরকে নিপতিত করেন।

‘যে ব্যক্তি প্রতিশ্রুত হইয়া দান না করে এবং যে দান করিয়া প্রত্যাহরণ করে, তাঁহাদিগকে মৃত্যুর নিদারুণপাশে বদ্ধ হইতে হয়। যাঁহারা অতিথিপ্রিয়, সাগ্নিক, যজ্ঞানুষ্ঠাননিরত ব্রাহ্মণের উপাসনা করেন, তাঁহাদিগকে কখনই শমনসদনে গমন করিতে হয় না। ব্রাহ্মণের ঋণ পরিশোধ এবং দুর্ব্বল ব্যক্তিদিগকে রক্ষা করা রাজার অবশ্য কর্ত্তব্য। ব্রাহ্মণকে ভূমিদান করিয়া প্রত্যাহরণ করা কদাপি বিধেয় নহে। আর ঐ ক্ষেত্রহরণনিবন্ধন একান্ত অবসন্ন ব্রাহ্মণদিগের অশ্রুপাত হইলে অপহর্ত্তার তিন কুল এককালে ধ্বংস হইয়া যায়। যে ব্যক্তি রাজ্যচ্যুত নরপতিকে পুনরায় রাজ্যমধ্যে সংস্থাপিত করে, তাহার অনন্তকাল স্বর্গবাস হইয়া থাকে। ইক্ষু, যব, গোধূম, বিবিধ রত্ন, নিধিগৰ্ভ এবং গো-অশ্বাদি বিবিধ বাহনপরিপূর্ণ বাহুবলাৰ্জিত ভূমিদান করিতে পারিলে অক্ষয় লোকলাভ করিতে পারা যায়। পণ্ডিতেরা ঐ দানকে ভূমিযজ্ঞ বলিয়া কীৰ্ত্তন করেন।

ভূমিদান করিলে পাপের লেশমাত্রও থাকে না। ইহাদ্বারা সাধু ব্যক্তিদিগের নিকট সম্মান লাভ করা যায়। সলিলমধ্যে তৈলবিন্দু নিপতিত হইলে যেমন ইতস্ততঃ পরিব্যাপ্ত হয়, তদ্রূপ ভূমিদানের ফল সেই দত্ত ভূমিতে যত বার শস্য সমুৎপন্ন হয়, ততই বিস্তীর্ণ হইতে থাকে। ভূমিদাতা মহাবলপরাক্রান্ত, সম্মুখসংগ্রামে প্রাণপরিত্যাগপূৰ্ব্বক ব্রহ্মলোকগত নরপতিগণের ন্যায় দিব্যমাল্যবিভূষিত, নৃত্যগীতবিশারদ অপ্সরাগণকর্ত্তৃক উপাসিত এবং দেবতা ও গন্ধৰ্ব্বগণকর্ত্তৃক পরাজিত হইয়া থাকেন। ভূমিদান করিলে জন্মান্তরে সিংহাসন, শ্বেতচ্ছত্র, শঙ্খ, উৎকৃষ্ট অশ্বাদিবাহন, পুষ্প, ধান্য, কুশ, বালতৃণ ও সুবর্ণরাশি লাভ হয়। ভূমিদাতার আজ্ঞা কেহই অগ্রাহ্য করে না এবং চতুর্দ্দিকে তাঁহার উদ্দেশে জয়ধ্বনি হইতে থাকে। ফলতঃ ভূমিদানের তুল্য দান, মাতৃসদৃশ গুরু, সত্যের সমান ধর্ম্ম ও দানের সদৃশ নিধি আর কিছুই নাই।

“হে ধৰ্ম্মরাজ! দেবরাজ ইন্দ্র অঙ্গিরার পুত্র বৃহস্পতির নিকট এইরূপ ভূমিদানের ফল শ্রবণ করিয়া তৎক্ষণাৎ তাঁহাকে ধনরত্নপরিপূর্ণ এই বসুন্ধরা প্রদান করিয়াছিলেন। শ্রাদ্ধকালে এই ভূমিদানমাহাত্ম্য কীৰ্ত্তন করিলে রাক্ষস বা অসুরগণ কখনই ঐ শ্রাদ্ধের বিঘ্ন করিতে পারে না এবং পিতৃলোকের উদ্দেশে ঐ শ্রাদ্ধে যাহা প্রদত্ত হয়, তৎসমুদয় অক্ষয় হইয়া থাকে। অতএব শ্রাদ্ধসময়ে ব্রাহ্মণগণ ভোজনে প্রবৃত্ত হইলে তাঁহাদিগের নিকট এই ভূমিদানমাহাত্ম্য কীৰ্ত্তন করা কর্ত্তব্য। এই আমি তোমার নিকট সৰ্ব্বদান অপেক্ষা উস্কৃষ্ট ভূমিদানের বিষয় কীৰ্ত্তন করিলাম। এক্ষণে তোমার আর কি শ্রবণ করিতে বাসনা হয়, কীৰ্ত্তন কর।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *