2 of 4

৮১. গোদানপ্রশংসাপ্রসঙ্গে গোলোপরিচয়

৮১তম অধ্যায়

গোদানপ্রশংসাপ্রসঙ্গে গোলোপরিচয়

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! এই জগতে যাহা অপেক্ষা পবিত্র ও পবিত্রতাসম্পাদক আর কিছুই নাই, আপনি তাহার বিষয় কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! পরমপাবন [অতি পবিত্র] মহার্দ্ধসাধন [প্রয়োজন সাধন] ধেনুগণ মনুষ্যদিগকে উদ্ধার এবং দুগ্ধদ্বারা তাহাদের পোষণ করিয়া থাকে। এই ত্রিলোকমধ্যে গোসমুদয় অপেক্ষা পবিত্র বস্তু আর কিছুই নাই। গোসমূহ দেবগণের [স্বর্গলোকের] উপরিভাগে অবস্থান করিয়া থাকে। পণ্ডিতগণ গোদান করিয়া অনায়াসে সুরলোকলাভে সমর্থ হয়েন। পূৰ্ব্বকালে মহারাজ মান্ধাতা, যৌবনাশ্ব, নহুষ ও য্যাতি অসংখ্য গোদান করিয়া দেবদুর্ল্লভ দিব্যস্থানসমুদয় অধিকার করিয়াছেন। অতঃপর পূর্ব্বকালে মহাত্মা ব্যাস শুকের নিকট যেরূপ গোমহিমা কীৰ্ত্তন করিয়াছিলেন, তাহা করিতেছি, শ্রবণ কর।

“একদা ধীমান শুকদেব কৃতাহ্নিক হইয়া বিশুদ্ধমনে মহর্ষি বেদব্যাসকে অভিবাদনপূৰ্ব্বক জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘পিতঃ! যজ্ঞসমুদয়ের মধ্যে কোনটি সর্ব্বোৎকৃষ্ট? কোন্ কাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করিলে মনুষ্য পরমস্থান লাভ করিতে সমর্থ হয়? দেবগণ কোন্ পবিত্র কার্য্যপ্রভাবে স্বর্গভোগ করিতেছেন? যজ্ঞের প্রধান সাধন কি? কোন্ দ্রব্য যজ্ঞে প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে? দেবগণের সমাদরণীয় বস্তু কি? পবিত্র পদার্থমধ্যে কোন্ বস্তু অপেক্ষাকৃত অধিক পবিত্র? আপনি আমার নিকট এই সমুদয় বৃত্তান্ত কীৰ্ত্তন করুন।’

“তখন ধর্ম্মাত্মা বেদব্যাস শুকদেবের বাক্য শ্রবণ করিয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘বৎস! ধেনুর প্রভাবে জীবগণ জীবিত রহিয়াছে। ধেনু মানবগণের উৎকৃষ্ট ব্রতস্বরূপ এবং ধেনুই পরমপবিত্র ও পবিত্রতাসম্পাদক পদার্থ। এইরূপ কিংবদন্তী আছে যে, পূর্ব্বে ধেনুগণের শৃঙ্গ না থাকাতে উহারা বিশ্বকৰ্ত্তা ব্রহ্মার নিকট গমন করিয়া শৃঙ্গলাভের নিমিত্ত তাঁহাকে বিস্তর স্তবস্তুতি করিয়াছিল। ভগবান্ কমলযোনি তাহাদিগকে শরণাগত সন্দর্শন করিয়া তাহাদের সকলকেই অভিলষিত বর প্রদান করিলেন। তখন তাহাদিগের মধ্যে যাহার যেরূপ অভিলাষ, তাহার তদনুরূপ শৃঙ্গ উদ্গত হইল। হব্যকব্যপ্রদ [দেব ও পিতৃপূজার প্রধান সামগ্রী দুগ্ধ-ঘৃতাদিপ্রদ] পরমপান বিবিধবর্ণ ধেনুসকল এইরূপে ব্রহ্মার বরে শৃঙ্গলাভপূৰ্ব্বক চমৎকার শোভা ধারণ করিয়াছে। গোসমুদয় দিব্যতেজঃস্বরূপ; এই নিমিত্ত গোদান সমুদয় দান অপেক্ষা প্রশস্ত। যেসকল সাধু ব্যক্তি অহঙ্কারপরিশুন্য হইয়া গোদান করেন, তাঁহারাই ইহলোকে কৃতী ও সর্ব্বপ্ৰদ বলিয়া পরিগণিত হয়েন এবং পরলোকে পরমলোক গোলোক লাভ করিয়া থাকেন।

‘গোলোকের বৃক্ষসমুদয় সতত সুগন্ধ পুষ্প, সুমধুর ফল ও সুকণ্ঠ বিহঙ্গমগণে পরিপূর্ণ; ভূমিসমুদয় মণিময় ও বালুকাসকল কাঞ্চনময়। ঐ স্থানের জলাশয়সমুদয় বালার্কসদৃশ মণিখণ্ড ও রক্তোৎপলবনে সুশোভিত, পঙ্কবিরহিত এবং সর্ব্বর্ত্তুসুখপ্রদ [সকল ঋতুতে সুখপ্রদ]; সরোবরসকল মণিময় পত্র ও সুবর্ণসদৃশ কেশরসমন্বিত নীলপদ্ম ও অন্যান্য পদ্মে পরিপূর্ণ; নদীসমুদয়ের তীরভূমি নিৰ্ম্মল মুক্তা, মহাপ্রভাযুক্ত মণি, সুবর্ণবিকশিত করবীরবৃক্ষ, কল্পবৃক্ষ এবং নানা রত্নময় ও সুবর্ণময় বিবিধ পাদপে সমলঙ্কৃত এবং সুবর্ণগিরিসকল, মণিরত্নখচিত অতি মনোহর শিলাতল ও রত্নময় উন্নতশৃঙ্গে সুশোভিত। পুণ্যকৰ্ম্মা ব্যক্তিরা শোকসন্তাপবিহীন হইয়া অপ্সরাগণের সহিত বিমানে আরোহণপূৰ্ব্বক পরমসুখে অহঃরহঃ তথায় পরিভ্রমণ করিয়া থাকেন।

গোসেবামাহাত্ম্য

‘গোদাতার তুল্য সৌভাগ্যশালী আর কেহই নাই। ভগবান ভাস্কর, বলবান্ বায়ু ও বরুণদেব যেসমুদয় স্থানে আধিপত্য করেন, গোদাননিরত মহাত্মারা অনায়াসে সেই সমুদয় লোক লাভ করিতে সমর্থ হয়েন। ভগবান্ প্রজাপতি গাভীদিগের যুগন্ধরা, সুরূপা, বহুরূপা, বিশ্বরূপা ও মাতা এই কয়েকটি নাম কীৰ্ত্তন করিয়াছেন, প্রতিনিয়ত সংযত হইয়া এই সমুদয় নাম জপ করা সৰ্ব্বতোভাবে কৰ্ত্তব্য। যে ব্যক্তি গোশুশ্রূষা ও গাভীর অনুগমন করে, গাভীগণ প্রসন্ন হইয়া তাহাকে দুর্ল্লভ বর প্রদান করিয়া থাকে। যাহারা কদাপি গোসমুদয়ের অনিষ্ট চিন্তা করে না, প্রত্যুত জিতেন্দ্রিয় হইয়া সন্তুষ্টচিত্তে নমস্কারাদিদ্বারা সতত উহাদের অর্চ্চনা করে, আর যাহারা তিন দিবস উষ্ণ গোমূত্রপান, তিনদিবস উষ্ণ দুগ্ধপান, তিন দিবস উষ্ণ ঘৃতপান, তিন দিবস বায়ুভক্ষণ করিয়া পরিশেষে দেবগণ যে ঘৃতপ্রভাবে উৎকৃষ্ট লোকে অবস্থান করিতেছেন, যাহারা সমুদয় পবিত্র পদার্থ অপেক্ষা পবিত্রতর, সেই ঘৃত মস্তকে বহন এবং তদ্বারা হোম ও স্বস্তিবাচন করে, তাহাদের নিশ্চয়ই গোসম্পত্তি বৃদ্ধি হয়।

‘যে ব্যক্তি একমাস প্রতিদিন গোময় হইতে যব [গোভুক্ত—গোময়ের সহিত পতিত যব] আহরণপূর্ব্বক তদ্দ্বারা যাবক প্রস্তুত করিয়া ভক্ষণ করে, তাহার ব্রহ্মহত্যাতুল্য পাতক হইতে মুক্তিলাভ হয়। দেবগণ দৈত্যদিগের প্রভাবে পরাজিত হইয়া এই নিয়ম অবলম্বনপূৰ্ব্বক পুনরায় দেবত্ব লাভ করিয়াছিলেন। ধেনুগণ পরমপাবন ও পবিত্র পদার্থ। ব্রাহ্মণদিগকে গোদান করিলে অনায়াসে স্বর্গলাভ হয়। পবিত্রজলে আচমন করিয়া ধেনুমধ্যে অবস্থানপূৰ্ব্বক গোমতীমন্ত্র জপ করিলে পরমপবিত্র ও পাপপরিশূন্য হয়। অগ্নি, ধেনু ও ব্রাহ্মণগণের মধ্যে শিষ্যগণকে গোমতীবিদ্যা অধ্যাপন করা বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণদিগের অবশ্য কর্ত্তব্য। তিনরাত্রি উপবাসপূৰ্ব্বক গোমতীমন্ত্র জপ করিয়া পুত্রকামনা করিলে পুত্রলাভ, অর্থকামনা করিলে অর্থলাভ এবং পতিকামনা করিলে পতিলাভ হয়। ফলতঃ এই মন্ত্র প্রভাবে মানবদিগের সমুদয় কামনা সিদ্ধ হইতে পারে। গোসমুদয়ের সেবা করিলে উহারা সন্তুষ্ট হইয়া নিশ্চয়ই অভিলষিত বর প্রদান করে। গাভীগণ যজ্ঞের প্রধান অঙ্গ ও সৰ্ব্বকামপ্রদ; উহাদিগের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আর কিছুই নাই।’

“হে ধৰ্ম্মরাজ! মহর্ষি বেদব্যাস এই কথা কহিলে, তেজস্বী শুকদেব তাঁহার উপদেশানুসারে প্রতিনিয়ত গোপূজা করিয়াছিলেন, অতএব তুমিও যত্নসহকারে নিত্য গোসমুদয়ের পূজা কর।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *