৬৯তম অধ্যায়
গোদানপ্রসঙ্গে গোপ্রশংসা
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! ক্ষত্রিয়ই কেবল যজ্ঞানুষ্ঠানকারী ব্রাহ্মণকে ভূমিদান এবং ব্রাহ্মণ সেই দত্ত ভূমি গ্রহণ করিতে পারেন। ক্ষত্রিয় ভিন্ন অন্য কাহারও ভূমিদান করিবার অধিকার নাই। এক্ষণে ফলাভিলাষী হইয়া সমুদয় বর্ণে যাহা দান করিতে পারা যায় এবং বেদে যাহা বিহিত বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে, আপনি তাহাই কীর্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! গোদান, পৃথিবীদান ও বিদ্যাদান এই ত্রিবিধ দানই তুল্যফলপ্রদ। ঐ ত্রিবিধ পদার্থই অবশ্য দেয়। যিনি শিষ্যকে ধর্ম্মার্থযুক্ত বেদবাক্যে উপদেশ প্রদান করেন, তাঁহার পৃথিবী ও গোদানের তূল্য ফললাভ হয়। গোদানও সমধিক প্রশংসনীয়, উহা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট দান আর কিছুই নাই। গোদানের ফল অচিরাৎ লাভ হইয়া থাকে। গাভীসমুদয় জীবগণের প্রসূতিস্বরূপ এবং নানাপ্রকার সুখের নিদান। মঙ্গলাভিলাষী ব্যক্তিদের নিত্য গোপ্রদক্ষিণ করা অবশ্য কর্ত্তব্য। গোশরীরে পদাঘাত এবং গোকুলের মধ্যস্থল দিয়া গমন করা কদাপি বিধেয় নহে। গাভীসকল সমুদয় মঙ্গলের আয়তনস্বরূপ। অতএব ভক্তিপূর্ব্বক উহাদিগের পূজা করা অবশ্য কর্ত্তব্য। দেবগণ যজ্ঞভূমি কর্ষণসময়ে বলীবর্দ্দদিগকে কশাঘাত করিয়াছিলেন বলিয়া যজ্ঞভূমি কর্ষণকালে উহাদিগকে কশাঘাত করিলে দোষাবহ কাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করা হয় না; কিন্তু কৃষিকার্য্যের নিমিত্ত উহাদিগকে প্রহার করিলেই উহা দোষাবহ হইয়া উঠে। পলায়ন ও শয়নকালে গোকুলকে বিরক্ত করা কর্ত্তব্য নহে। গোসমুদয় তৃষ্ণার্ত্ত হইয়া যদি গৃহস্বামীর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, তাহা হইলে ঐ ব্যক্তি সবংশে বিনষ্ট হইয়া যায়। যাহাদিগের বিষ্ঠায় শ্রাদ্ধভূমি ও দেবতাস্থান সর্ব্বদা পবিত্র হইয়া থাকে, তাহাদিগের অপেক্ষা আর কি অধিকতর পবিত্র বলিয়া পরিগণিত হইতে পারে? যে ব্যক্তি এক বৎসরকাল প্রতিদিন আহারের পূর্ব্বে অন্যের গাভীকে ঘাসমুষ্টি প্রদান করে, তাহার পুত্র, যশ, অর্থ ও সম্পত্তি প্রভৃতি সমুদয় অভিলষিত বস্তু লাভ হয় এবং দুঃস্বপ্নদর্শনজন্য দোষ ও অমঙ্গল এককালে বিনষ্ট হইয়া যায়।”
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! কিরূপ ধেনু দেয় ও কি প্রকার ধেনু অদেয় এবং কীদৃশ ব্যক্তি গোদানের উপযুক্ত আর কীদৃশ ব্যক্তিই বা অনুপযুক্ত, তাহা কীৰ্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! আচারভ্রষ্ট, মিথ্যাবাদী, হব্যকব্যবিবর্জ্জিত, লুব্ধস্বভাব পাপাত্মাকে গোদান করা কদাপি, বিধেয় নহে। বহুপুত্ৰসম্পন্ন সাগ্নিক শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণকে দশটি গোদান করিলে দাতার অতি উৎকৃষ্ট লোকলাভ হয়। গ্রহীতা প্রতিগ্ৰহলব্ধ ধনদ্বারা ধৰ্ম্মানুষ্ঠান করিয়া যে ফল উৎপাদন করেন, ধনদাতা তাহার অংশভাগী হইয়া থাকে। যে ব্যক্তি জন্মদান, যিনি ভয় হইতে পরিত্রাণ এবং যিনি জীবিকপ্রদান করেন, তাঁহারা তিন জনই পিতা বলিয়া পরিগণিত হয়েন। গুরুশুশ্রূষা করিলে পাপ নষ্ট, অহঙ্কার জন্মিলে যশ নষ্ট, তিন পুত্র উৎপন্ন হইলে অপুত্ৰতা এবং দশটি গাভী থাকিলে দরিদ্রতাদোষ বিনষ্ট হয়। যে ব্রাহ্মণ বেদান্তনিষ্ঠ, শাস্ত্ৰপারদর্শী, জ্ঞানবান, জিতেন্দ্রিয়, শিষ্ট, অতিথিপ্রিয়, প্রিয়বাদী ও স্ত্রীপুত্রাদি পরিবারসম্পন্ন এবং যিনি ক্ষুধার্ত্ত হইয়াও অসৎকার্য্যে প্রবৃত্ত না হয়েন, তাদৃশ ব্রাহ্মণকে বৃত্তি দান করা সর্ব্বতোভাবে কর্ত্তব্য। উৎকৃষ্ট পাত্রে গোদান করিলে যেরূপ উৎকৃষ্ট ফললাভ হয়, ব্রহ্মস্ব অপহরণ করিলে আবার তাদৃশ গুরুতর পাপ জন্মিয়া থাকে। ব্রাহ্মণের ধন ও পত্নী অপহরণ করা কদাপি বিধেয় নহে।”
