2 of 4

৬৩. অন্নদানের প্রশংসা

৬৩তম অধ্যায়

অন্নদানের প্রশংসা

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! দানশীল নরপতি গুণবান্ ব্রাহ্মণগণকে কি কি বস্তু প্রদান করিবেন? কিরূপ দানদ্বারা ব্রাহ্মণেরা আশু পরিতুষ্ট হয়েন এবং কিরূপ দানই বা ইহলোক ও পরলোকে ফলপ্রদ হয়, এই বিষয় শ্রবণ করিতে আমার নিতান্ত বাসনা হইতেছে; অতএব আপনি আমার নিকট উহা সবিস্তর কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! পূৰ্ব্বে তপোধনাগ্রগণ্য, দেবর্ষি নারদ আমার নিকট এই বিষয়ে যে যে কথা কহিয়াছিলেন, আমি তৎসমুদয় তোমার নিকট কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। দেবতা ও ঋষিগণ অন্নেরই প্রশংসা করিয়া থাকেন। লোকযাত্রা ও যজ্ঞ অন্নে প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে। অন্নদানের তুল্য দান আর কিছুই নাই। এই নিমিত্ত মানবগণ বিশেষরূপে অন্নদান করিতে ইচ্ছা করিয়া থাকেন। অন্ন অতি তেজস্কর। অন্ন বিনা কেহই জীবনধারণ করিতে সমর্থ হয় না। অন্নই সমুদয় বিশ্বসংসার ধারণ করিয়া রহিয়াছেন। গৃহস্থ, ভিক্ষুক ও তাপসগণ অন্নদ্বারাই জীবনধারণ করিয়া থাকেন। অতএব অনুকেই প্রাণের উৎপাদক বলিয়া নির্দ্দেশ করা যাইতে পারে, সন্দেহ নাই। যে ব্যক্তি আপনার মঙ্গল ইচ্ছা করেন, তিনি পরিবারকে কষ্ট প্রদান করিয়াও ভিক্ষুক ব্রাহ্মণকে অন্নদান করিবেন। যে ব্যক্তি লক্ষণযুক্ত যাচক ব্রাহ্মণকে অন্নদান করেন, তিনি আপনার পরলোকহিতকর পরমনিধি স্থাপন করিয়া রাখেন।

“পথশ্রান্ত বৃদ্ধ ব্যক্তি গৃহে উপস্থিত হইলে তাঁহাকে যথোচিত সৎকার করা মঙ্গলাভিলাষী গৃহস্থের অবশ্য কর্ত্তব্য। যে ব্যক্তি সুশীল ও মাৎসর্য্য শূন্য হইয়া ক্রোধপরিত্যাগপূৰ্ব্বক অন্নদান করেন, তিনি উভয়লোকেই পরমসুখ অনুভব করিতে সমর্থ হয়েন। গৃহাগত ব্যক্তিকে অবজ্ঞা বা প্রত্যাখ্যান করা কদাপি কর্ত্তব্য নহে। চণ্ডাল বা কুক্কুরকে অন্নদান করিলেও নিষ্ফল হয় না। যে মহাত্মা অকাতরে অদৃষ্টপূৰ্ব্বক পরিশ্রান্ত পথিকদিগকে অন্নদান করেন, তাঁহার পরম ধর্ম্মলাভ হয়; যে ব্যক্তি অন্নদ্বারা দেবতা, পিতৃলোক, ঋষি, ব্রাহ্মণ ও অতিথিগণকে পরিতৃপ্ত করেন, তিনি উৎকৃষ্ট পুণ্যফললাভে সমর্থ হয়েন, সন্দেহ নাই। যদি কোন ব্যক্তি গুরুতর পাপকর্ম্ম করিয়াও যাচক ব্রাহ্মণকে অন্নদান করেন, তাহার সেই পাপ অচিরাৎ বিনষ্ট হইয়া যায়। ব্রাহ্মণকে অনুদান করিলে অক্ষয় ফল ও শূদ্রকে অন্নদান করিলে মহালাভ হয়; ধর্ম্মশাস্ত্রে ব্রাহ্মণ ও শূদ্রকে অন্নদান করিবার এইরূপ বিশেষ ফল নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে।

“ব্রাহ্মণ গৃহে উপস্থিত হইয়া অন্ন প্রার্থনা করিলে তাঁহার দেশ, গোত্র, বেদ, শাখা ও বেদাধ্যয়নের বিষয় কিছুমাত্র জিজ্ঞাসা না করিয়াই তাঁহাকে অন্নদান করা কর্ত্তব্য। যে রাজা ইহলোকে অন্নদান করেন, পরলোকে তাহার সেই অন্ন সৰ্ব্বকামফলপ্রদ বৃক্ষরূপে পরিণত হইয়া থাকে, সন্দেহ নাই। পিতৃগণ সুবৃষ্টি প্রতীক্ষানিরত কৃষিজীবীর ন্যায় স্বীয় পুত্র ও পৌত্র হইতে সতত অন্নলাভের প্রত্যাশা করিয়া থাকেন। ব্রাহ্মণ স্বয়ং অন্ন প্রার্থনা করিলে যে ব্যক্তি তাঁহাকে অন্নদান করেন, তিনি ফললাভের আকাঙ্ক্ষা করুন বা না করুন, অবশ্যই তাঁহার পুণ্যলাভ হয়। অতিথি ব্রাহ্মণকে অন্নাদির অগ্রভাগ প্রদান করা অবশ্য কর্ত্তব্য। ব্রাহ্মণগণ যাঁহার গৃহে সৰ্ব্বদা অর্থিকভাবে সমুপস্থিত হইয়া সৎকারলাভপূৰ্ব্বক প্রতিগমন করেন, তিনি ইহজন্মে ঐশ্বর্য্যশালী হইয়া সুখে কালহরণ করেন এবং পরজন্মে মহাভোগযুক্ত উত্তম কুলে উৎপন্ন হয়েন। অন্নদাতার পরলোকে উৎকৃষ্ট স্থানলাভ হয়। মিষ্টান্নদাতা অনন্তকাল স্বর্গে সৎকৃত হইয়া বাস করিতে পারেন। অন্ন সমুদয় লোকের প্রাণস্বরূপ। সমুদয় বস্তুই অন্নে প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে। যিনি শ্রদ্ধাসহকারে অন্নদান করেন, তিনি পশুশালী, ধন্যবাদসম্পন্ন, পুত্রবান্, বলবান্ ও রূপবান্ হইয়া স্বচ্ছন্দে কালযাপন করিতে পারেন। অন্নদাতাকে প্রাণদাতা ও সৰ্ব্বদাতা বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়। যে ব্যক্তি অতিথি ব্রাহ্মণকে যথাবিধি অন্নদান করেন, তিনি ইহলোকে পরমসুখ ও পরলোকে দেবগণের নিকট সমাদর লাভ করিতে পারেন।

‘ব্রাহ্মণ উৰ্ব্বরা ভূমিস্বরূপ; যে ব্যক্তি ঐরূপ ভূমিতে ধৰ্ম্মরূপ বীজ বপন করেন, তিনি অনায়াসে পুণ্যরূপ ফললাভ করিতে সমর্থ হয়েন। অন্নদান দাতা ও ভোক্তা উভয়েরই প্রীতি উৎপাদন করিয়া থাকে; সুতরাং অন্নদানদ্বারা যেমন প্রত্যক্ষফল লাভ করা যায়, অন্য কোন দানেই সেরূপ ফললাভ করা যায় না। অন্ন হইতে প্রাণীগণের উৎপত্তি হইয়া থাকে। অন্নই রতি, ধর্ম্ম ও অর্থের উৎপাদক এবং রোগনাশের মূল। পূৰ্ব্বে প্রজাপতি ব্রহ্মা অন্নকে অমৃতস্বরূপ বলিয়া কীৰ্ত্তন করিয়াছেন। পৃথিবী, স্বর্গ ও আকাশ সমুদয়ই অন্নে প্রতিষ্ঠিত আছে। অন্নের নাশ হইলে শরীরস্থ পঞ্চভূত বিনষ্ট হইয়া যায়। অন্নের অভাবে বলবাদিগের বলের হানি হয়। অন্ন ব্যতীত আহার, বিহার ও যজ্ঞ প্রভৃতি কোন কার্য্যই সম্পন্ন হইবার সম্ভাবনা নাই। অন্ন না থাকিলে বেদ পর্য্যন্ত বিলীন হইয়া যায়। ত্রিলোকে ধৰ্ম্ম, অর্থ ও স্থাবরজঙ্গম প্রভৃতি সমুদয় পদার্থই অন্ন হইতে উৎপন্ন হয়। অতএব অন্নদান পণ্ডিতদিগের অবশ্য কর্ত্তব্য। যে ব্যক্তি অন্নদান করেন, তাহার বল, যশ ও কীৰ্ত্তির পরিসীমা থাকে না।

“ভগবান্ সূর্য্য স্বীয় কিরণজালদ্বারা ভূমির রস গ্রহণ করেন। ঐ রসসমুদয় মেঘরূপে পরিণত হইলে দেবরাজ ইন্দ্র বায়ুদ্বারা সেই মেঘসমুদয়কে সঞ্চালিত করিয়া পৃথিবীতে বারিবর্ষণ করেন। মেঘ হইতে বারিধারা নিপতিত হইলে বসুমতী স্নিগ্ধ হইলেই তাহাতে জগতের জীবনোপায়স্বরূপ শস্যাদি সমুৎপন্ন হইয়া থাকে। ঐ শস্য হইতে মাংস, মেদ, অস্থি ও শুক্র সমুদ্ভূত হয় এবং শুক্র হইতে প্রাণীগণের উৎপত্তি হইয়া থাকে। শরীরস্থ, অগ্নি ও চন্দ্র শুক্রের সৃষ্টি ও পোষণ করেন। এইরূপে অন্নদ্বারা শুক্র উৎপন্ন হইয়া শরীরস্থ সূর্য্য ও পবনের সহিত একত্র মিলিত হইয়া, জন্তুগণের সৃষ্টি করে। যে ব্যক্তি গৃহাগত অতিথিকে অনুদান করেন, তিনি তেজ ও প্রাণদানের ফলভোগ করিতে সমর্থ হয়েন।

“হে ধৰ্ম্মরাজ! আমি দেবর্ষি নারদের মুখে এইরূপ অন্নদানের ফল শ্রবণ করিয়া অবধি এতাবৎকাল বিধিপূৰ্ব্বক অন্নদান করিয়াছিলাম; অতএব এক্ষণে তুমিও অসূয়াবিহীন হইয়া অকাতরে অন্নদান কর। বিধিপূৰ্ব্বক সুব্রাহ্মণদিগকে অনুদান করিলে নিঃসন্দেহে তোমার স্বর্গলাভ হইবে। যে মহাত্মারা ইহলোকে অন্নদান করেন, তাঁহারা পরলোকে স্বর্গারূঢ় হইয়া তারামণ্ডলের ন্যায় সমুজ্জ্বল, নানাস্তম্ভসমন্বিত, তারামণ্ডলের ন্যায় শুভ্রবর্ণ, কিঙ্কিণীজালজড়িত, বালার্কসদৃশ, বিবিধ অচল ও সচল গৃহ, বৈদূর্য্য ও সূর্য্যকান্তমণির ন্যায় প্রভাসম্পন্ন সুবর্ণ ও রজতময় অসংখ্য জলগৃহ, সৰ্ব্বামফলপ্রদ বৃক্ষসমুদয়, সহস্র সহস্র বাপী, সভা, কূপ, দীঘিকা, বাহনযুক্ত যান, পৰ্ব্বতাকার ভক্ষ্যভোজ্য, বস্ত্র, আভরণ, ক্ষীরনদী, অন্নপর্ব্বত, পাণ্ডু ও তাম্রবর্ণ প্রাসাদসমুদয় এবং কনকের ন্যায় সমুজ্জ্বল বিবিধ শয্যা লাভ করিয়া থাকেন। অতএব তুমি যত্নপূৰ্ব্বক অন্নদান কর। ইহলোকে অন্নদান করা সকলের অবশ্য কর্ত্তব্য।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *