৮২তম অধ্যায়
গোময়মাহাত্ম্য—গোলক্ষ্মীসংবাদ
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! কিরূপে গেময়ে লক্ষ্মীর অধিষ্ঠান হইল, তদ্বিষয়ে আমি নিতান্ত সংশয়ারূঢ় হইয়াছি; অতএব আপনি উহা কীর্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! আমি এই উপলক্ষ্যে গোলক্ষ্মী সংবাদনামক পুরাতন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। একদা লক্ষ্মী মনোহর মূর্ত্তি ধারণ করিয়া গোসমূহের মধ্যে প্রবেশ করিয়াছিলেন। গোসমুদয় তাহার অলৌকিক রূপসন্দর্শনে বিস্মিত। হইয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিল, ‘দেবি! তুমি কে, কোথা হইতে এ স্থানে উপস্থিত হইলে এবং কোন্ স্থানেই বা গমন করিবে, আমরা তোমার অসামান্য রূপদর্শনে নিতান্ত বিস্ময়াবিষ্ট হইয়াছি। অতএব তুমি আমাদিগের নিকট ঐ সমস্ত বৃত্তান্ত সবিস্তর কীৰ্ত্তন কর।’
“তখন লক্ষ্মী কহিলেন, ‘হে গোসমুদয়! আমি লোককান্তা [লোকসকলের অধীশ্বরী ও কান্তিবিধায়িনী লক্ষ্মী] শ্ৰী; দৈত্যগণ মৎকর্ত্তৃক সমাশিত হইয়া চিরকাল সুখভোগ করিতেছে। ইন্দ্র, চন্দ্র, সূর্য্য, বরুণ ও অগ্নি প্রভৃতি দেবতা এবং মহর্ষিগণ আমাকে আশ্রয় না করিলে কখনই সিদ্ধিলাভে সমর্থ হয়েন না। আমি যাহাদিগের শরীরে প্রবিষ্ট না হই, তাহাদিগকে অবশ্যই বিনষ্ট হইতে হয়। ধৰ্ম্ম, অর্থ ও কাম কেবল আমারই আশ্রয়লাভপূৰ্ব্বক অবস্থান করিয়া থাকে। এই আমি তোমাদিগের নিকট আপনার প্রভাব কীৰ্ত্তন করিলাম। এক্ষণে আমি তোমাদিগের দেহে বাস করিতে বাসনা করিতেছি; তোমরা আমার সহিত সমবেত হইয়া পরমসুখে কালযাপন কর।’
“ধেনুগণ কহিল, ‘দেবি! তুমি অতিশয় চঞ্চলা ও বহুজনভোগ্যা, এই নিমিত্ত তোমাকে আশ্রয় করিতে আমাদিগের অভিলাষ নাই। আমরা স্বভাবতঃই রূপসম্পন্ন রহিয়াছি; সুতরাং তোমাকে আশ্রয় করা কিছুতেই আবশ্যক বোধ হইতেছে না; অতএব তুমি যথা ইচ্ছা প্রস্থান কর।’
“ধেনুগণ এইরূপে প্রত্যাখ্যান করিলে লক্ষ্মী তাহাদিগকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘ধেনুগণ! আমি তোমাদিগের বাক্য শ্রবণ করিয়া বিস্ময়াপন্ন হইলাম। লোকে বহুযত্নেও আমাকে লাভ করিতে সমর্থ হয় না; কিন্তু তোমরা অনায়াসে অনাদরপূৰ্ব্বক আমাকে পরিত্যাগ করিতে উদ্যত হইয়াছ। এক্ষণে বুঝিলাম, “লোকে আহূত না হইয়া স্বয়ং অন্যের নিকট উপস্থিত হইলে তাহাকে অবশ্যই পরাজিত হইতে হয়” [এই যে] যে এক লোকপ্রবাদ রহিয়াছে, ইহা কখনই অমূলক নহে। যাহা হউক, দেব, দানব, গন্ধৰ্ব্ব, পিশাচ, উরগ, রাক্ষস ও মনুষ্যগণ কঠোর তপানুষ্ঠান করিয়া আমার উপাসনা করেন; অতএব আমাকে গ্রহণ করা তোমাদিগের অবশ্য কর্ত্তব্য। দেখ, ত্রিলোকমধ্যে কেহই আমার অবমাননা করে নাই।
“তখন ধেনুগণ কহিলেন, ‘দেবি! তোমাকে অবমানিত বা পরাজিত করা আমাদের উদ্দেশ্য নহে; আমরা কেবল তোমার চঞ্চলচিত্ততানিবন্ধন তোমাকে পরিত্যাগ করিতেছি। যাহা হউক, আর অধিক বাক্যব্যয়ে প্রয়োজন নাই; তুমি এক্ষণে স্বস্থানে প্রস্থান কর। যখন আমাদিগের স্বাভাবিক শরীরসৌষ্ঠব রহিয়াছে, তখন আমরা কি নিমিত্ত তোমাকে গ্রহণ করিব?’
“শ্রী কহিলেন, ‘ধেনুগণ! আমি তোমাদিগকে শরণ্য, মহাভাগ ও সৰ্ব্বলোকের মানদাতা জানিয়া তোমাদিগের শরণাপন্ন হইয়াছি; আমাকে প্রত্যাখ্যান করিয়া অপমান করা তোমাদিগের কদাপি কর্ত্তব্য নহে। অতএব তোমরা প্রসন্ন হইয়া আমার সম্মান রক্ষা কর। আজ তোমরা আমার অবমাননা করিলে আমি সৰ্ব্বলোকের অজ্ঞাত হইব। তোমাদিগের অঙ্গের মধ্যে কোন কুৎসিত প্রদেশ থাকিলেও তাহাতে বাস করিতে আমার অসম্মতি ছিল না। কিন্তু তোমাদিগের কোন অঙ্গই কুৎসিত নহে। তোমরা পরমপবিত্র ও মঙ্গলের আধার। এক্ষণে আমি তোমাদিগের দেহের কোন্ অংশে অবস্থান করিব, তাহা আদেশ কর।
“লক্ষ্মী এইরূপ বিনয় প্রদর্শন করিলে, দয়াপরায়ণ ধেনুগণ তাঁহার প্রতি প্রসন্ন হইয়া, পরস্পর মন্ত্রণা করিয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিল, ‘দেবি! তোমার সম্মান রক্ষা করা আমাদের অবশ্য কর্ত্তব্য। অতএব আমরা তোমাকে অনুমতি প্রদান করিতেছি, তুমি আমাদিগের পরমপবিত্র মূত্রপুরীষে অবস্থান কর।’
“গোসমুদয় এই কথা কহিলে লক্ষ্মী যারপরনাই আহ্লাদিত হইয়া তাহাদিগকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘হে ধেনুগণ! তোমরা প্রসন্ন হইয়া আমার প্রতি যথেষ্ট অনুগ্রহ প্রকাশ করিলে; এক্ষণে তোমাদিগের মঙ্গল হউক।’ লোকমাতা শ্রী ধেনুগণকে এই কথা কহিয়া তাহাদিগের সমক্ষেই অন্তর্হিত হইলেন। হে ধৰ্ম্মরাজ! এই আমি তোমার নিকট গোময়ের মাহাত্ম্য কীৰ্ত্তন করিলাম, এক্ষণে গোসমুদয়ের মাহাত্ম্য কহিতেছি, শ্রবণ কর।”
