৯৮তম অধ্যায়
দেবোদ্দেশে পুষ্প-ধূপ-দীপ-দানফল
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ। আলোকদান কিরূপ, কিরূপে উহার প্রথা প্রবর্ত্তিত হইল এবং উহার ফলই বা কি?”
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! এই স্থলে সুবর্ণ-মনুসংবাদনামক এক প্রাচীন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। পূৰ্ব্বকালে সুবর্ণনামক এক ধর্ম্মপরায়ণ ঋষি ছিলেন। তাঁহার বর্ণ সুবর্ণের ন্যায় উজ্জ্বল, এই নিমিত্ত তাঁহার নাম সুবর্ণ বলিয়া প্রখ্যাত হইয়াছিল। ঐ স্বাধ্যায়সম্পন্ন মহর্ষি স্বীয় গুণগ্রামদ্বারা অনেকানেক সদ্বংশোদ্ভব ব্যক্তিকে অতিক্রম করিয়াছিলেন। একদা ঐ মহর্ষি তপোধনাগ্রগণ্য মনুকে অবলোকন করিয়া তাঁহার নিকট গমন করিলেন। মহর্ষি মনু তাঁহার যথোচিত সংবর্দ্ধনা করিয়া সুমেরুপৰ্ব্বতে গমনপূৰ্ব্বক তাঁহার সহিত এক রমণীয় শীলাতলে উপবিষ্ট হইলেন। ঐ স্থানে তাঁহাদের উভয়ের ব্রহ্মর্ষি, দেব, দানব ও পুরাণসংক্রান্ত নানাবিধ কথোপকথন হইতে লাগিল। তখন মহর্ষি সুবর্ণ স্বায়ম্ভূব মনুকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘ভগবন্! পুষ্প, ধূপ ও দীপদ্বারা দেবতারা অর্চ্চিত হইয়া থাকেন, ঐ প্রণালী কে প্রবর্ত্তিত করিলেন এবং উহার ফলই বা কি? আপনি লোকের হিতানুষ্ঠান করিবার নিমিত্ত আমার এই প্রশ্নের প্রকৃত প্রত্যুত্তর প্রদান করুন।’
“মনু কহিলেন, ‘তপোধন! আমি এই স্থলে বলি শুক্ৰসংবাদনামক এক প্রাচীন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। একদা ভূগুকুলতিলক শুত্রু ত্রিলোকের অধীশ্বর বিবোচননন্দন বলির নিকট গমন করিলে দানবরাজ অর্ঘ্যাদিদ্বারা তাঁহার অর্চ্চনাপূৰ্ব্বক উপবেশন করাইয়া তাঁহার সমীপে উপবিষ্ট হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “ব্রহ্মন্। দেবতাদিগকে পুষ্প ও ধূপ দীপদ্বারা অর্চ্চনা করিবার ফল কি, আপনি তাহা সবিস্তর কীৰ্ত্তন করুন।”
‘তখন শুক্র কহিলেন, “দানবরাজ! প্রথমে তপস্যা, তৎপরে ধৰ্ম্ম উৎপন্ন হয়। ঐ সময় ওষধি, লতা এবং বহুবিধ বৃক্ষ উৎপন্ন হইয়াছে। চন্দ্র উহাদিগের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা। ঐ সমস্ত উদ্ভিদজাতির মধ্যে কতকগুলি বিষ বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকে। যাহার দর্শনমাত্রেই আন্তরিক ভক্তি উৎপন্ন হয়, তাহাই অমৃত আর যাহার গন্ধে মনের গ্লানি উপস্থিত হয়, তাহাই বিষ। অমৃতকে মঙ্গল ও বিষকে অমঙ্গল বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়। ওষধিমধ্যে কতকগুলি অমৃত ও কতকগুলি বিষ আছে। যেসমুদয় নিতান্ত উগ্রতেজস্বী, তাহারাই বিষ ও যেসমুদয় সৌম্য, তাহারাই অমৃত। বৃক্ষ ও লতার মধ্যে আবার ঐরূপ অমৃত ও বিষ এই দুইটি জাতি আছে। তন্মধ্যে যে বৃক্ষ ও লতার পুষ্পসমুদয় মনকে আহ্লাদিত করে, তাহাই অমৃত। মনকে আহ্লাদিত করে বলিয়াই পুষ্পের নাম সুমনা হইয়াছে। যে মনুষ্য দেবগণকে সুগন্ধি পুষ্পসমুদয় প্রদান করে, দেবগণ তাহার প্রতি যারপরনাই সন্তুষ্ট হইয়া তাহাকে পুষ্টি প্রদান করিয়া থাকেন।
বিভিন্ন লক্ষণান্বিত বিবিধ পুষ্প
“এক্ষণে দেবতা, অসুর, রাক্ষস, উরগ, যক্ষ, মনুষ্য ও পিতৃগণের মাল্য এবং দেবগণের উপভোগ্য ভূমিকৰ্ষণানন্তর রোপিত গ্ৰাম্য ও অযত্নসম্ভূত বন্য কণ্টকাকীর্ণ ও অকণ্টক বৃক্ষ হইতে সমুৎপন্ন পুস্পসমুদয়ের বিষয় কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। পুষ্পের দুই প্রকার গন্ধ আছে, ইষ্ট ও অনিষ্ট। তন্মধ্যে ইষ্টগন্ধসম্পন্ন পুষ্প দেবগণের প্রীতিকর হইয়া থাকে। যেসমস্ত শ্বেতবর্ণ পুষ্প অকণ্টক বৃক্ষে পুষ্পিত হয়, তৎসমুদয় দেবগণের সবিশেষ প্রীতিকর বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়া থাকে, পদ্মমাল্যসমুদয় গন্ধৰ্ব্ব নাগ যক্ষগণকে প্রদান করা কর্ত্তব্য। অথৰ্ব্ববেদমধ্যে এইরূপ নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে, শত্রুগণের অনিষ্টসাধনোদ্দেশে প্রবৃত্ত আভিচারিক কার্য্যে কটুগন্ধসম্পন্ন কণ্টকাকীর্ণ রক্তপুষ্প এবং তীক্ষ্ণবীর্য্য, কণ্টকসংযুক্ত, প্রাণীগণের নিতান্ত অপ্রীতিকর, কৃষ্ণবর্ণ পুষ্পসমুদয় প্রদান করিবে।
“যেসকল পুম্প প্রিয়দর্শন ও সুমধুরগন্ধযুক্ত, তৎসমুদয় মনুষ্যদিগের ব্যবহার্য্য। বিবাহ ও ক্রীড়াসময়ে শ্মশান ও দেবতায়তনে সমুৎপন্ন পুস্পসমুদয় কদাচ প্রদান করিবে না। গিরিশৃঙ্গসমুৎপন্ন সৌম্যদর্শন পুষ্পসমুদয় প্রোক্ষিত করিয়া দেবগণকে প্রদান করা উচিত। দেবগণ পুষ্পের গন্ধ, যক্ষ ও রাক্ষসেরা উহার দর্শন, নাগগণ উহার উপভোগ এবং মনুষ্যেরা উহার গন্ধ, দর্শন উপভোগদ্বারা প্রীতিলাভ করিয়া থাকেন। যিনি দেবগণকে পুষ্প প্রদান করেন, দেবতারা তাঁহার প্রতি প্রীত হইয়া তাঁহার শুভ সম্পাদন করিয়া থাকেন। দেবতারা মনুষ্যের কাৰ্য্যে প্রীত হইলে তাঁহার সম্মানবর্দ্ধন এবং অবজ্ঞাত হইলে তাহাকে নিঃশেষে বিনাশ করিয়া থাকেন।
বিবিধ ধূপদীপলক্ষণ—ধূপদীপদানফল
“অতঃপর আমি ধূপের লক্ষণ ও ধূপদানের ফল কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। ধুপ তিন প্রকার—নির্য্যাস, সারী ও কৃত্রিম। এই সমুদয় ধূপের গন্ধেও ইষ্ট ও অনিষ্ট হইয়া থাকে।
শল্লকীর নির্য্যাস ব্যতিরেকে অন্যান্য বৃক্ষের নির্য্যাসসমুৎপন্ন ধূপ নিৰ্য্যাসধূপ বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হয়। ঐ ধূপ দেবগণের প্রীতিপ্রদ হইয়া থাকে। এই নিৰ্য্যাসসমুৎপন্ন ধূপসমুদয়ের মধ্যে গুগ্গুল সর্ব্বোকৃষ্ট। যেসমুদয় কাষ্ঠ অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হইলে সুগন্ধ ধূপ উৎপন্ন হয়, তাহার নাম সারীঘূপ। সারীধুপই দেবতাদিগের প্রীতিকর। অগুরু সর্ব্বপ্রকার সারীধূপ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। শল্লকীবৃক্ষের নির্য্যাসসমুৎপন্ন ধূপ যক্ষ-রাক্ষসাদির প্রতি উৎপাদন করে। সর্জ্জরস ও সুগন্ধ কাষ্ঠাদিদ্বারা সমুদয় ধূপ প্রস্তুত করা যায়, তাহাদের নাম কৃত্রিম ধূপ। ঐরূপ ধূপ দেবতা, মনুষ্য ও দানব প্রভৃতি সকলেরই প্রীতিপ্রদ হইয়া থাকে। এতদ্ভিন্ন বিহারোপযোগী বিবিধ ধূপ আছে। তৎসমুদয় কেবল মনুষ্যেরই ব্যবহার্য্য। পুষ্পপ্রদানে যেপ্রকারে ফল নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে, ধূপদানে সেইরূপ ফল পরিগণিত হইয়া থাকে।
“এক্ষণে যে সময়ে যেরূপে যে প্রকার দীপসমুদয় প্রদান করিতে হয়, তাহা সবিস্তারে কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। দীপ ঊর্ধ্বগামী তেজঃ-পদার্থ; অতএব দীপদান করিলে মনুষ্যের তেজোবৃদ্ধি ও উর্দ্ধগতি লাভ হইয়া থাকে। অন্ধতমিস্র নরকনিবারণের নিমিত্ত উত্তরায়ণের রজনীতে দীপদান করা লোকের অবশ্য কর্ত্তব্য। দেবগণ তেজস্বী, প্রভাসম্পন্ন ও প্রকাশশালী এবং রাক্ষসগণ অন্ধকারস্বরূপ। অতএব দেবগণের সমগুণসম্পন্ন দীপদান করিয়া তাঁহাদিগের প্রীতিসম্পাদন করা লোকের অবশ্য কর্ত্তব্য। দীপনিৰ্ব্বাণপূৰ্ব্বক অন্ধকার উৎপাদন করা কদাপি বিধেয় নহে। আলোকদান করিলে মনুষ্য উত্তম চক্ষুম্মান ও প্রযুক্ত হইয়া স্বর্গে দীপমালার ন্যায় প্রকাশিত থাকে; আর যে ব্যক্তি দীপ হরণ করে, সে প্রভাবিহীন ও অন্ধ হইয়া অনন্তকাল নরকভোগ করে। ঘৃতদ্বারা দীপ প্রজ্বলিত করিয়া দান করাই সর্ব্বাপেক্ষা প্রশস্ত। ধৃতের অভাবে ওষধিরসদ্বারাও দীপ প্রজ্বলিত করিয়া দান করা যাইতে পারে। কিন্তু বসা, মেদ ও অস্থিনিৰ্য্যাসদ্বারা দীপ প্রজ্বলিত করিয়া দান করা কখনই কর্ত্তব্য নহে। যে ব্যক্তি আপনার উন্নতিলাভের বাসনা করেন, তিনি প্রতিদিন পর্ব্বতসন্নিধানে, চৈত্যবৃক্ষের মূলে ও চতুষ্পথে দীপদান করিবেন। দীপদাতা মহাত্মারা ইহলোকে কুলপ্রকাশক ও বিশুদ্ধান্তঃকরণ হইয়া চরমে চন্দ্ৰসূৰ্য্যাদি জ্যোতিষ্মান্দিগের স্বরূপত্ব লাভ করিতে পারেন, সন্দেহ নাই।
দেবোদ্দেশে বলিস্বরূপ অন্নদানকল্প
“এক্ষণে দেবতা, যক্ষ, উরগ, মনুষ্য, ভূতও রাক্ষসগণকে বলি প্রদান করিলে যে ফললাভ হয়, তাহা কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। যাহারা ব্রাহ্মণ, দেবতা, অতিথি ও বালকদিগকে ভক্ষ্যবস্তু প্রদান করিয়া ভোজন করে, তাহাদিগকে রাক্ষস বলিয়া নির্দ্দিষ্ট করা যায়। অতএব প্রযত ও অতন্দ্রিত হইয়া দেবগণকে অন্নের অগ্রভাগ প্রদান ও বলিকৰ্ম্ম সম্পাদন করা লোকের অবশ্য কর্ত্তব্য। দেবতা, পিতৃগণ, যক্ষ, রাক্ষস, পন্নগ ও অতিথিগণ গৃহস্থদিগের প্রদত্ত অন্নাদিলাভের বাসনা করিয়া থাকেন। গৃহস্থদিগের প্রদত্ত অন্নাদিদ্বারাই পিতৃগণ ও দেবগণের তৃপ্তিসাধন হয়। উহারা পরিতৃপ্ত ও প্রীত হইলেই গৃহস্থদিগের আয়ু, যশ ও ঐশ্বর্য্যের বৃদ্ধি হয়, সন্দেহ নাই। দেবগণকে পুষ্পসমন্বিত বলি, যক্ষ ও রাক্ষসগণকে দধি, দুগ্ধ, রুধির ও মাংসসম্পন্ন সুগন্ধমিশ্রিত বলি, নাগগণকে সুরা, লাজ, পিষ্টক, পদ্ম ও উৎপলসম্পন্ন বলি এবং ভূপগণকে গুড়তিলসম্পন্ন বলি প্রদান করিতে হয়। যে ব্যক্তি দেবগণকে অন্নাদির অগ্রভাগ প্রদান করেন, তিনি বলবীর্য্যসমম্বিত হইয়া উৎকৃষ্ট ভোগ লাভ করিতে পারেন, সন্দেহ নাই। অতএব দেবগণকে অন্নাদির অগ্রভাগ প্রদান করা সৰ্ব্বতোভাবে কর্ত্তব্য। গৃহদেবতাগণ গৃহমধ্যে প্রতিনিয়ত অবস্থান করেন। অতএব যে ব্যক্তি আপনার উন্নতিলাভের বাসনা করেন, তিনি প্রতিদিন অন্নাদির অগ্রভাগদ্বারা গৃহদেবতাদিগের অর্চ্চনা করিবেন।”
“হে ধৰ্ম্মরাজ! সর্ব্বাগ্রে মহাত্মা শুক্রাচার্য্য দানবরাজ বলির নিকট এই কথা কীৰ্ত্তন করেন। তৎপরে মহাত্মা মনু সুবর্ণকে, সুবর্ণ নারদকে ও নারদ আমাকে উহা শ্রবণ করাইয়াছেন। এক্ষণে আমিও তোমার নিকট উহা কীৰ্ত্তন করিলাম; অতএব তুমি এইরূপ উপদেশানুসারে কার্য্যানুষ্ঠানে যত্নবান্ হও।”
