৭৬তম অধ্যায়
গোদানবিধি—মান্ধাতা ও বৃহস্পতিসংবাদ
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! মনুষ্য যারা নিত্যলোকসমুদয় লাভ করে, সেই গোদানবিধি শ্রবণ করিতে আমার নিতান্ত অভিলাষ হইতেছে, আপনি তাহা কীর্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! গোদান অপেক্ষা উৎকৃষ্ট দান আর কিছুই নাই। ন্যায়ানুসারে অধিকৃত ধেনুদান করিবামাত্র কুল উদ্ধার হয়। পূর্ব্বকালে সাধুলোকের নিমিত্ত যে বিধি প্রবর্ত্তিত হইয়াছিল, এখনও তাহাই নির্দ্দিষ্ট আছে; অতএব সেই আদিকালপ্রবৃত্ত গোদানবিধি তোমার নিকট কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর।
“পূৰ্ব্বকালে মহারাজ মান্ধাতা দাতব্য গোসমুদয় সমানীত। হইলে গোদানবিধিবিষয়ে সন্দিহান হইয়া বৃহস্পতিকে জিজ্ঞাসা করাতে সুরগুরু তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘মহারাজ! গোদানের পূর্ব্বদিন পূর্ব্বাহ্নে ব্রাহ্মণকে সৎকারপূর্ব্বক রক্তবর্ণ ধেনুসমুদয় আহরণ করিয়া রাখিবে এবং ঐ ধেনুসকলকে “সমঙ্গে! মঙ্গলে!” বলিয়া সম্বোধন করিবে। পরে রজনীযোগে সেই সমস্ত ধেনুর মধ্যে প্রবেশপূৰ্ব্বক “বৃষ আমার পিতা এবং ধেনু আমার মাতা, স্বর্গ, সুখ ও আশ্রয়স্থান” এই শ্রুতি উচ্চারণপুরঃসর উহাদিগের মধ্যে ঐ রাত্রি বাস করিয়া মন্ত্রপাঠসহকারে গোপ্রদানবিষয়ে কৃতসঙ্কল্প হইবে। ধেনুসমুদয়ের সহিত রজনীযাপন করিবার সময় উহারা শয়ন করিলে শয়ন ও উপবেশন করিলে উপবেশন করা অবশ্য কর্ত্তব্য। এইরূপে ছায়ার ন্যায় ধেনুদিগের সহচারী হইলে অনতিবিলম্বে পাপ হইতে নির্ম্মুক্ত হওয়া যায়, সন্দেহ নাই। তৎপরে প্রাতঃকাল সমুপস্থিত ও দিবাকর সমুদিত হইলে বৎসের সহিত ধেনুসমুদয় দান করিবে। এইরূপ নিয়মে সবৎসা ধেনুদান করিলে নিশ্চয়ই স্বর্গলাভ হয়।
‘গোপ্রদান করিয়া প্রদাতা এইরূপ প্রার্থনা করিবেন যে, উৎসাহব্রতী, প্রজ্ঞাশালিনী, যজ্ঞীয় হবির ক্ষেত্রস্বরূপা, জগতের আশ্রয়ভূতা, ঐশ্বর্য্যপ্রদায়িনী, বংশবিস্তারকারিণী, প্রজাপতি, সুর্য্য চন্দ্রের অংশসম্ভূতা ধেনুসমুদয় আমার পাপ ধ্বংস, আমাকে স্বর্গ প্রদান এবং রজনীর ন্যায় আমার শরীর রক্ষা করুন, আর আমি যাহা যাহা প্রার্থনা করিলাম না, ইহার প্রসাদে সেই সেই অভিলষিত দ্রব্য সফল হউক। হে ধেনুগণ! ক্ষয়রোগাদি নিবৃত্তি ও দেহমুক্তিজনক কাৰ্য্যে তোমরা সেবিত হইয়া পবিত্র নদীর ন্যায় শ্রেয়ঃ প্রদান করিয়া থাক এবং তোমরা নিরন্তর পুণ্যসমুদয় বহন করিতেছ; অতএব এক্ষণে আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া আমাকে অভিলষিত গতি প্রদান কর।
“প্রদাতা এইরূপ প্রার্থনা করিয়া পুনরায় কহিবেন, ‘হে ধেনুগণ! আমি তোমাদিগের সারূপ্য লাভ করিয়াছি, অতএব অদ্য তোমাদিগকে প্রদান করাতে আমার আত্মপ্রদান করা হইয়াছে।’ দাতা এই কথা কহিলে পর গ্রহীতা কহিবেন, ‘হে ধেনুগণ! তোমাদিগের প্রতি দাতার মমত্ব বিলুপ্ত হইয়াছে, এক্ষণে তোমরা আমারই অধিকৃত হইলে, অতএব আমাদিগের উভয়কেই অভীষ্ট ভোগ প্রদান কর।’ যিনি গোপ্রতিরূপ মূল্য, বস্ত্র ও সুবর্ণাদি প্রদান করেন, তিনিও গোদাতা বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হয়েন। সেই প্রতিরূপ গোদানকালে দাতা গ্রহীতাকে “এই উৰ্দ্ধাস্যা, ভাগ্যবতী ও বৈষ্ণবী ধেনু গ্রহণ কর” এই বলিয়া প্রদান করিবেন। প্রতিরূপগোদানে বিংশতি সহ চতুশ্চত্বারিংশৎ বৎসরব্যাপী স্বর্গলাভ হয়। গ্রহীতা গ্রহণ করিয়া আপনার গৃহাভিমুখে আট পদ গমন করিলেই প্রতিরূপগোদাতা সমগ্র দানফল লাভ করিতে সমর্থ হয়েন। যিনি গোদান করেন, তিনি ইহলোকে সচ্চরিত্র, যিনি গোমূল্য প্রদান করেন, তিনি নির্ভয়, যিনি গোপ্রতিরূপ বস্ত্র ও সুবর্ণ দান করেন, তিনি সুখী হয়েন। আর পরলোকে ঐ ত্রিবিধ ব্যক্তিই বিষ্ণুলোক, চন্দ্রের ন্যায় কান্তি ও অসাধারণ ঐশ্বর্য্য লাভ করিয়া থাকেন।
‘গোদান করিয়া তিনরাত্রি গোব্ৰতপরায়ণ হইবে, গোসমূহের সহিত একরাত্রি বাস করিবে এবং গোষ্ঠাষ্টমী হইতে তিনরাত্রি গোময়, গোমূত্র ও দুগ্ধদ্বারা জীবনধারণ করিবে। বৃষ দান করিলে ব্রহ্মচর্য্য ও দুইটি গোদান করিলে বেদলাভ হয় এবং যে যাজ্ঞিক গোবিধি অবলম্বনপূৰ্ব্বক গোদান করেন, তাঁহার নিশ্চয়ই শ্রেষ্ঠ লোকসমুদয় লাভ হইয়া থাকে। যিনি গোবিধি অবগত নহেন, তাঁহার কোনরূপেই শ্রেষ্ঠ লোক লাভ হইবার সম্ভাবনা নাই। যিনি একটিমাত্র কামদুঘা ধেনু দান করেন, তাঁহার পৃথিবীস্থ সমুদয় পদার্থ এককালে দান করিবার ফললাভ হয়। যে ব্যক্তি শিষ্য নহে, যে ব্যক্তি ব্ৰতানুষ্ঠানে পরাঙ্মুখ, যে ব্যক্তি অশ্রদ্ধান্বিত এবং যাহার বুদ্ধি অতিশয় বক্র, তাহাদিগকে এই ধৰ্ম্মে উপদেশ প্রদান করিবে না। এই ধৰ্ম্ম সকলেরই গোপনীয়; অতএব ইহা সকল স্থানে প্রচার করা কর্ত্তব্য নহে। এই জীবলোকে অশ্রদ্ধান্বিত, ক্ষুদ্রাশয়, রাক্ষসস্বরূপ অনেক মনুষ্য আছে এবং ইহাতে অল্পপুণ্য নাস্তিকের সংখ্যাও নিতান্ত অল্প নহে; যদি তাহাদিগকে এই ধর্ম্মের উপদেশ প্রদান করা হয়, তাহা হইলে নিশ্চয়ই অনিষ্ট ফল উৎপন্ন হইবে।
“হে ধৰ্ম্মরাজ! যেসমস্ত মহীপাল এই বৃহস্পতিনিৰ্দিষ্ট ধর্ম্ম শ্রবণ করিয়া গোদানপূৰ্ব্বক শুভলোকসমুদয় লাভ করিয়াছেন, এক্ষণে আমি সেই পুণ্যশীল মহাত্মাদিগের নাম কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। মহারাজ উশীনর, বিশ্বগশ্ব, নৃগ, ভগীরথ, যৌবনাশ্ব, মান্ধাতা, মুচুকুন্দ, ভূরিদ্যুম্ন, নৈষধ, সোমক, পুরূরবা, ভরত, দাশরথি রাম, দিলীপ ও অন্যান্য রাজারা বিধি অনুসারে গোদান করিয়া স্বর্গলাভ করিয়াছেন। মহারাজ মান্ধাতা যজ্ঞ, দান, তপস্যা ও গোদানে সততই নিযুক্ত ছিলেন; অতএব তুমিও কৌরব রাজ্য গ্রহণ করিয়া বৃহস্পতিনিৰ্দিষ্ট ধর্ম্মানুসারে প্রীতমনে ব্রাহ্মণগণকে গোদান কর।”
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে জনমেজয়! মহাত্মা ভীষ্ম এইরূপ উপদেশ প্রদান করিলে ধৰ্ম্মরাজ গোপ্রদানবিষয়ে কৃতসঙ্কল্প হইয়া মান্ধাতার অনুষ্ঠিত ধর্ম্মের অনুসরণপূর্ব্বক গোময়ের সহিত যবের কণা ভক্ষণ ও বৃষের ন্যায় ক্ষিতিতলে শয়ন করিয়া কালযাপন করিতে লাগিলেন। ঐ দিন অবধি তিনি আর কখন গোসমুদয়দ্বারা যানাদি বহন করান নাই; অশ্বে বা অশ্বযোজিত যানে আরোহণ করিয়াই গমনাগমন করিতেন।
