2 of 4

৯৭. গৃহস্থের মঙ্গলকর কার্য্য—দেবপিতৃপূজা

৯৭তম অধ্যায়

গৃহস্থের মঙ্গলকর কার্য্য—দেবপিতৃপূজা

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! গৃহস্থ কি কার্য্য করিলে শ্রেয়োলাভ করিতে পারে, তাহা আমি পরিজ্ঞাত নহি; অতএব আপনি আমার নিকট গার্হস্থ্যধৰ্ম্ম সবিস্তর কীৰ্ত্তন করুন।’

ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! আমি এই উপলক্ষ্যে বাসুদেব বসুধাসংবাদনামক পুরাতন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। পূর্ব্বে একদা ভগবান্ বাসুদেব পৃথিবীকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘দেবি! মাদৃশ গৃহস্থ ব্যক্তি কিরূপ কার্য্যের অনুষ্ঠান করিলে মঙ্গল লাভ করিতে পারে, তাহা আমার নিকট কীৰ্ত্তন করুন।’

“তখন পৃথিবী কহিলেন, ‘বাসুদেব! মহর্ষি, পিতৃলোক, দেবতা ও মনুষ্যগণের অর্চ্চনা করা গৃহস্থের অবশ্য কর্ত্তব্য। এক্ষণে কিরূপে উঁহাদিগের অর্চ্চনা করিতে হয়, তাহা কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। গৃহস্থ যজ্ঞদ্বারা দেবতা, আতিথ্যদ্বারা মনুষ্য ও গায়ত্র্যাদিদ্বারা বেদসমুদয়ের উপাসনা করিয়া মহর্ষিদিগের প্রীতি উৎপাদন করিবে। দেবগণের প্রীতিলাভের নিমিত্ত ভোজন না করিয়া অগ্নির আরাধনা ও বলিকৰ্ম্ম সমাধান করা আবশ্যক।

প্রতিদিন অন্ন, জল ও ফলমূলদ্বারা শ্রাদ্ধ করিলে পিতৃগণ প্রীত হইয়া থাকেন। সিদ্ধান্তদ্বারা অগ্নিতে যথাবিধি বৈশ্বদেবকার্য্য সম্পাদন করা অবশ্য কর্ত্তব্য। অগ্নি, সোম, বিশ্বদেব, ধন্বন্তরি ও প্রজাপতির পৃথক পৃথক হোম করিয়া দিলি প্রদান করা উচিত। দক্ষিণদিকে যমকে, পশ্চিমদিকে বরুণকে, উত্তরদিকে চন্দ্রকে, বাস্তুমধ্যে প্রজাপতিকে, উত্তর-পূৰ্ব্বকোণে ধন্বন্তরিকে, পূৰ্ব্বদিকে ইন্দ্রকে, গৃহদ্বারে মনুষ্যগণকে, গৃহমধ্যে দেবতা ও মরুদগণকে এবং আকাশে বিশ্বদেবগণকে বলি প্রদান করিতে হয়।

‘রজনীযোগে নিশাচর ও ভূতগণকে বলি প্রদান করা উচিত মনুষ্য এইরূপে সমুদয় দেবগণকে বলি প্রদান করিয়া ব্রাহ্মণকে অন্নাদি প্রদান করিবে। যদি ব্রাহ্মণ উপস্থিত না থাকেন তাহা হইলে গৃহস্থকে অন্নাদির অগ্রভাগ হুতাশনে নিক্ষেপ করিতে হইবে। গৃহস্থ যখন পিতৃলোকের শ্রাদ্ধে প্রবৃত্ত হইবেন, তখন তিনি বিধিপূৰ্ব্বক পিতৃলোকের পূজা ও তর্পণ করিয়া পূর্ব্বোক্ত দেবগণকে বলি প্রদান করিবেন। তৎপরে বৈশ্বদেবকার্য্য সম্পাদনপূর্ব্বক ব্রাহ্মণদ্বারা স্বস্তিবাচন করিয়া বৈশ্বদেবাবশিষ্ট অন্নদ্বারা সমাগত অতিথিদিগকে সমাদরে ভোজন করাইবে। আগন্তুকদিগের স্থিতি অনিত্য, এই নিমিত্ত উহারা অতিথিনামে অভিহিত হইয়া থাকেন। প্রথমে অতিথিদিগের অর্চ্চনা করিয়া পরিশেষে অন্যান্য লোকের তৃপ্তিসাধন করা গৃহস্থের অবশ্য কর্ত্তব্য। গৃহী ব্যক্তি আচার্য্য, পিতা, সখা ও অতিথির নিকট গৃহস্থিত কোন দ্রব্য গোপন করিবে না। সতত তাহাদের আজ্ঞা প্রতিপালন ও সকলের অবশেষে ভোজন করা গৃহস্থের অবশ্য কর্ত্তব্য। রাজপুরোহিত, স্নাতক ব্রাহ্মণ, গুরু ও শ্বশুর এক বৎসর গৃহে বাস করিলেও প্রতিদিন মধুপর্কদ্বারা তাঁহাদের পূজা করা কর্ত্তব্য। প্রতিদিন সায়ংকালে ও প্রাতঃকালে বিশ্বদেবগণের তৃপ্তিসাধনের নিমিত্ত ভূমিতে কুক্কুর, শ্বপচ ও পক্ষিগণকে অন্নাদি প্রদান করা গৃহস্থের পরমধর্ম্ম। যে ব্যক্তি অসূয়াবিহীন হইয়া এইরূপে গার্হস্থ্যধর্ম্ম প্রতিপালন করেন, তিনি ইহলোকে মহর্ষিদিগের বরলাভ করিয়া পরলোকে স্বর্গলাভ করিতে সমর্থ হয়েন।

“হে ধৰ্ম্মরাজ! ভগবান্ বাসুদেব পৃথিবীর নিকট এইরূপ গার্হস্থ্যধৰ্ম্ম শ্রবণ করিয়া অবধি তাঁহার উপদেশানুসারে ঐ ধর্ম্ম প্রতিপালন করিতেছেন; অতএব তোমার উহা পালন করা অবশ্য কৰ্ত্তব্য। যদি তুমি যথানিয়মে ঐ ধর্ম্ম পালন কর, তাহা হইলে নিঃসন্দেহ হইলোকে যশঃ ও পরলোকে স্বর্গলাভে সমর্থ হইবে।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *