2 of 4

৬১. যজ্ঞদানাদির অবশ্যকর্ত্তব্যতা

৬১তম অধ্যায়

যজ্ঞদানাদির অবশ্যকর্ত্তব্যতা

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! দান ও যজ্ঞানুষ্ঠানদ্বারা কি ইহলোকে মহাফল লাভ করা যায়, না পরলোকে ঐ কার্য্যদ্বয়ের ফল লব্ধ হইয়া থাকে? ঐ দুইটি কার্য্যের মধ্যে কোনটির ফল অপেক্ষাকৃত উৎকৃষ্ট, দানের পাত্র কিরূপ, কি প্রকারে যজ্ঞানুষ্ঠান করিতে হয়, আর কোন্ সময় দান ও যজ্ঞের প্রশস্ত সময় এবং যে ব্যক্তি যজ্ঞাদি অনুষ্ঠানপূর্ব্বক দান করে ও যে ব্যক্তি যজ্ঞাদির অনুষ্ঠানপূর্ব্বক দান করে ও যে ব্যক্তি যজ্ঞাদির অনুষ্ঠান না করিয়া দান করে, তাহাদের উভয়ের মধ্যে কোন্ ব্যক্তি অপেক্ষাকৃত উৎকৃষ্ট ফললাভ করিতে পারে, আপনি এই সমুদয় বিষয় অকপটে কীৰ্ত্তন করুন, ইহা শ্রবণ করিতে আমার একান্ত অভিলাষ হইতেছে।”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! ক্ষত্রিয়জাতি নিরন্তর হিংসাজনক কাৰ্য্যেই লিপ্ত থাকে, সুতরাং দান ও যজ্ঞ ব্যতিরেকে আর কোন কাৰ্য্যেই উহাদিগের পবিত্রতা সম্পাদনে সমর্থ হয় না। সাধু ব্যক্তিরা হিংসাদি পাপাচারনিরত ক্ষত্রিয়দিগের দান গ্রহণ করিতে প্রায়ই পরাঙ্মুখ হইয়া থাকেন; অতএব প্রভূত দক্ষিণাদানসহকারে যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়া সাধু ব্যক্তিদিগকে দান করা তাহাদিগের অবশ্য কৰ্ত্তব্য। আর যদি সাধুলোকেরা যজ্ঞানুষ্ঠান ব্যতিরেকেও ক্ষত্রিয়দিগের দান গ্রহণ করেন, তাহা হইলে তাঁহারা পরমশ্রদ্ধাসহকারে তাঁহাদিগকে প্রতিনিয়ত দান করিবেন। ইহা অপেক্ষা ক্ষত্রিয়জাতির পবিত্রতা সম্পাদনকর কিছুই নাই। যাঁহারা বেদজ্ঞ, সচ্চরিত্র, তপানুষ্ঠানপরায়ণ ও সকল প্রাণীর হিতানুষ্ঠাননিরত, সেই সমস্ত ব্রাহ্মণই দানের উপযুক্ত পাত্র। যদি সেইসকল ব্রাহ্মণেরা তোমার অর্থ প্রতিগ্ৰহ না করেন তাহা হইলে তোমার পুণ্যসঞ্চয় হইবে না, অতএব তুমি পুণ্যসঞ্চয় করিবার নিমিত্ত যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়া নানাবিধ ভোজ্য ও অর্থাদি ব্রাহ্মণগণকে প্রদান কর। যজ্ঞশীল ব্রাহ্মণেরা দাতার নিকট ধন গ্রহণপূর্ব্বক যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়া থাকেন, অতএব যদি তুমি তাদৃশ ব্রাহ্মণকে ধনদান কর, তাহা হইলে নিশ্চয়ই যজ্ঞানুষ্ঠানজন্য ফলের অংশভাগী হইবে। যাঁহারা পুত্রপৌত্রাদিসম্পন্ন ব্রাহ্মণকে ভরণপোষণ করেন, তাঁহাদের অচিরাৎ পুত্রপৌত্রাদি উৎপন্ন হইয়া থাকে। যেসমস্ত সাধুলোক উৎকৃষ্ট ধর্ম্মসমুদয় পরিবর্দ্ধিত করেন এবং যাঁহারা সতত পরোপকারে নিরত হয়েন, সৰ্ব্বস্ব প্রদান করিয়াও তাঁহাদিগের ভরণপোষণ করা অবশ্য কর্ত্তব্য। হে ধৰ্ম্মরাজ! তুমি অতুল ঐশ্বর্য্যের অধীশ্বর; অতএব ব্রাহ্মণগণকে ধেনু, বৃষ, অন্ন, বস্ত্র, উপানৎ[চর্ম্মপাদুকা-জুতা], অশ্বযুক্ত যান, গৃহ ও শয্যা প্রদান কর। যাজ্ঞিকদিগকে ঘৃতাদি যজ্ঞোপকরণ প্রদান করা তোমার সৰ্ব্বতোভাবে বিধেয়। যেসমস্ত ব্রাহ্মণ কোন অংশেই নিন্দনীয়, নহেন এবং পরিবারবর্গের ভরণপোষণে নিতান্ত অসমর্থ, রাজসূয় ও অশ্বমেধযজ্ঞানুষ্ঠানপূর্ব্বক গোপনে হউক বা প্রকাশ্যেই হউক, তাঁহাদিগকে প্রতিপালন করা নিতান্ত উচিত। তুমি এই প্রকার কার্য্যদ্বারা পাপ হইতে মুক্তিলাভ করিতে পারিলে অবশ্যই স্বর্গলাভে সমর্থ হইবে। দানাদিদ্বারা তোমার ধনক্ষয় হইলে যদি তুমি পুনরায় ধনসঞ্চয় করিয়া রাজ্যপালন করিতে পার তাহা হইলে পরজন্মে তোমার নিশ্চয়ই ব্রাহ্মণত্ব ও প্রচুর ধনলাভ হইবে। তুমি সতত সাবধান হইয়া আপনার ও অন্যের বৃত্তিরক্ষা কর এবং সুতনির্ব্বিশেষে ভৃত্য ও প্রজাবর্গকে প্রতিপালন করিতে প্রবৃত্ত হও। ব্রাহ্মণগণের জীবিকা নির্ব্বাহাৰ্থ তার্থ আহরণ ও তাহার রক্ষণাবেক্ষণ কর। তোমার জীবিতকাল যেন তাঁহাদিগের কার্য্যসংসাধন করিয়াই অতিবাহিত হয়। ব্রাহ্মণের প্রচুর অর্থ অনর্থের মূল। উহার প্রভাবে উঁহাদিগের অহঙ্কার ও মোহ উৎপন্ন হইবার বিলক্ষণ সম্ভাবনা। ব্রাহ্মণগণ মোহে অভিভূত হইলে ধর্ম্ম নিশ্চয়ই বিলুপ্ত হইয়া যায়, ধৰ্ম্ম অন্তর্হিত হইলে প্রাণীগণ ক্ষণকালও জীবনধারণ করিতে সমর্থ হয় না।

প্রজাপীড়নে গৃহীত অর্থে সাধিত যজ্ঞের নিন্দা

“যে রাজা একবার রাজ্য হইতে ধন আহরণপূৰ্ব্বক কোষাগারে সংস্থাপন করিয়া যজ্ঞানুষ্ঠানার্থ পুনরায় প্রজাপীড়নদ্বারা অর্থসঞ্চয় করিয়া যজ্ঞানুষ্ঠান করেন, তাঁহার যজ্ঞ প্রশংসনীয় নহে। সমৃদ্ধিশালী প্রজারা নিপীড়িত না হইয়া অনুরাগের সহিত যে ধনদান করে, সেই ধনদ্বারা যজ্ঞানুষ্ঠান করাই রাজার কর্ত্তব্য। প্রজাপীড়ন করিয়া যজ্ঞানুষ্ঠান করা কদাপি বিধেয় নহে। যখন রাজা প্রজারঞ্জনের দ্বারা তাহাদের যথোচিত অনুরাগভাজন হইবেন, সেই সময়েই প্রভূত দক্ষিণাদানসহকারে যজ্ঞানুষ্ঠান করা তাঁহার উচিত।

“রাজা বৃদ্ধ, বালক, অন্ধ ও দীনের ধন যত্নপূৰ্ব্বক রক্ষা করিবেন। প্রজারা অনাবৃষ্টিনিবন্ধন যদি কূপাদি হইতে জলসেচন দ্বারা ধান্যাদি উৎপাদন করে, তাহা হইলে সেই ধান্যাদি হইতে করগ্রহণ করা রাজার ন্যায়ানুগত কার্য্য নহে। যে স্ত্রীলোক রাজকরপ্রদানে নিতান্ত কাতর, রাজা তাহার নিকট কদাচ কর গ্রহণ করিবেন না। দীনজনের অত্যল্পমাত্র ধন হইতে কর গ্রহণ করিলে রাজার রাজ্য ও রাজশ্রী অচিরাৎ বিনষ্ট হইয়া যায়, সন্দেহ নাই। সাধুদিগকে নিরন্তর ভোগ্যদ্রব্য প্রদান করিয়া তাঁহাদিগের ক্ষুধানিবারণ করা অবশ্য কর্ত্তব্য। যে রাজার রাজ্যে বালকেরা সস্পৃহলোচনে সুস্বাদু ভোজ্যদ্রব্যের প্রতি দৃষ্টিপাত করে, কিন্তু তৃপ্তিপূৰ্ব্বক উহা আহার করিতে পায় না, সেই রাজার যারপরনাই পাপে লিপ্ত হইতে হয়। যদি তোমার রাজ্যে ব্রাহ্মণ ক্ষুধায় অতিশয় কাতর হয়েন, তাহা হইলে তোমার নিশ্চয়ই ব্রহ্মহত্যার পাপ জন্মিবে। মহারাজ শিবি কহিয়াছেন যে, যে রাজার অধিকার মধ্যে প্রজাগণ, বিশেষতঃ ব্রাহ্মণেরা আহারাভাবে অশেষবিধ ক্লেশ স্বীকার করেন, সে রাজার জীবনে ধিক্‌! যে রাজার রাজ্যে স্নাতক ব্রাহ্মণ একান্ত কাতর হয়েন, সে রাজার রাজ্য নিতান্ত অবসন্ন ও প্রতিপক্ষ ভূপালকর্ত্তৃক আক্রান্ত হয়, সন্দেহ নাই। যে রাজার রাজ্যে দুরাত্মারা রোরুদ্যমান স্ত্রীকে তাহার পতিপুত্রগণের সমক্ষেই বলপূৰ্ব্বক অপহরণ করিয়া লইয়া যায়, সেই রাজা জীবত। যে রাজা প্রজাদিগের রক্ষণাবেক্ষণে একান্ত অসমর্থ, যিনি কেবল প্রজাপীড়নপূর্ব্বক অর্থ অপহরণ করেন এবং যাঁহার সূক্ষ্মদর্শী মন্ত্রী নাই, প্রজারা সমবেত হইয়া সেই ধৰ্ম্মসংহারক নির্দ্দয় রাজ কুলাঙ্গারকে বিনাশ করিবে। যে রাজা রক্ষণাবেক্ষণের ভার গ্রহণ করিয়া তদ্বিষয়ে ঔদাসীন্য প্রদর্শন করেন, উন্মাদরোগাক্রান্ত কুক্কুরের ন্যায় তাঁহাকে সৰ্ব্বতোভাবে সংহার করা কর্ত্তব্য।

রাজাপ্রজার পরস্পর পাপপুণ্য-সংক্রামকতা

“প্রজারা ভূপালকর্ত্তৃক যথানিয়মে প্রতিপালিত না হইয়া যে পাপসঞ্চয় করে, রাজাকে সেই পাপের চতুর্থ ভাগ গ্রহণ করিতে হয়। কেহ কেহ কহেন, প্রজারক্ষণপরাঙ্মুখ ভূপতিকে প্রজাদিগের পাপের সম্পূর্ণ ফলভোগ করিতে হয় এবং কেহ কেহ কহেন, অপালক রাজা প্রজাদের পাপের অর্দ্ধাশ গ্রহণ করে, কিন্তু ধর্ম্মশাস্ত্রপ্রণেতা মহাত্মা মনুর মতে প্রজাদের পাপের চতুর্থাংশ অপালক রাজাতে সংক্রামিত হইয়া থাকে। এই শেষোক্ত মতই আমাদিগের অনুমোদিত। আর প্রজারা যথানিয়মে প্রতিপালিত হইয়া যে পুণ্যসঞ্চয় করে, সেই পুণ্যের চতুর্থাংশ রাজা অধিকার করিয়া থাকেন। হে ধৰ্ম্মরাজ! যেমন প্রজারা পৰ্জ্জন্যের, পক্ষিগণ বৃক্ষের, যক্ষেরা কুবেরের ও দেবগণ দেবরাজের আশ্রয়ে কালযাপন করেন, সেইরূপ তোমার প্রজা, জ্ঞাতি ও সুহৃদগণ তোমাকে আশ্রয় করিয়া কালাতিপাত করুন।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *