৬৬তম অধ্যায়
পাদুকাদি-দানপ্রসঙ্গে তিলদানপ্রশংসা
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! উত্তপ্ত বালুকায় ব্রাহ্মণের চরণ দগ্ধ হইতে আরম্ভ হইলে যে ব্যক্তি তাঁহাকে পাদুকাযুগল প্রদান করে, তাহার কি ফললাভ হয়, কীৰ্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! যে ব্যক্তি তাদৃশ উত্তাপের সময় সমাহিতচিত্তে ব্রাহ্মণকে পাদুকা প্রদান করে, তাহার সমুদয় কণ্টক নিরাকৃত হয়, গোযুক্তশকটদানের ফললাভ হয়, বিপদের লেশমাত্রও থাকে না, শত্রুগণ কখনই তাঁহাকে পরাস্ত করিতে পারে না এবং সে অচিরাৎ অশ্বতরীযুক্ত রৌপ্যকাঞ্চনবিভূষিত শুভ্র যান লাভ করে।”
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! আপনি ইতিপূৰ্ব্বে ভূমিদানাদির কীৰ্ত্তন করিয়াছেন। এক্ষণে পুনরায় ভূমিদান, গোদান, অন্নদান এবং তিলদানের ফল বিশেষরূপে শ্রবণ করিতে আমার বাসনা হইতেছে, অতএব আপনি তৎসমুদয় কীৰ্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! এক্ষণে আমি তিলদানের ফল কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করিয়া শাস্ত্রানুসারে ঐ কাৰ্য্যে প্রবৃত্ত হও। ভগবান্ ব্রহ্মা তিলকে পিতৃলোকের প্রধান ভোজ্যবস্তু বলিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন। তিলদান করিলে পিতৃলোকের আহ্লাদের পরিসীমা থাকে না। যে ব্যক্তি মাঘমাসে ব্রাহ্মণদিগকে তিলদান করে, তাহাকে কদাপি হিংস্ৰজন্তুসমাকীর্ণ ঘোরতর নরক সন্দর্শন করিতে হয় না। তিলদ্বারা পিতৃগণের তৃপ্তিসাধন করিলেই সমুদয় যজ্ঞের অনুষ্ঠান করা হয়। অকামী হইয়া তিলশ্রাদ্ধ করা কদাপি বিধেয় নহে। তিলসমুদয় মহর্ষি কশ্যপের শরীর হইতে সমুৎপন্ন হইয়াছে বলিয়া দানবিষয়ে পরমপবিত্ররূপে গণনীয় হইয়াছে। তিল পুষ্টিকর, রূপবর্দ্ধক ও পাপনাশক। অতএব সমুদয় দান অপেক্ষা তিলদানই প্রশংসনীয়। অসাধারণ ধীশক্তিসম্পন্ন মহর্ষি আপস্তম্ব, শঙ্খ, লিখিত ও গৌতম ইহারা সৎপথে অবস্থানপূৰ্ব্বক তিলদ্বারা। হোম ও তিল দান করিয়া স্বর্গলাভ করিয়াছেন। যাবতীয় মহাদান অপেক্ষা তিলদান অতি উৎকৃষ্ট ও অক্ষয়। পূৰ্ব্বকালে হবনীয় দ্রব্যসমুদয় উৎপন্ন হইলে মহর্ষি কুশিক গার্হপত্যাদি অগ্নিয়ে তিলাহুতি প্রদানপূৰ্ব্বক উৎকৃষ্ট গতি, লাভ করিয়াছেন। হে ধৰ্ম্মরাজ! এই আমি তোমার নিকট যে নিমিত্ত তিলদান প্রশংসনীয়, তাহা কীৰ্ত্তন করিলাম, অতঃপর অন্যান্য দানের বিষয় কহিতেছি, শ্রবণ কর।
“একদা দেবগণ যজ্ঞ করিবার মানসে ভগবান্ কমলযোনির নিকট গমন করিয়া কহিলেন, “ভগবন্! আমরা যজ্ঞানুষ্ঠান করিতে বাসনা করিয়াছি। আপনি চরাচর বিশ্বের অধীশ্বর; আপনার নিকট ভূমি গ্রহণ না করিয়া যজ্ঞানুষ্ঠান করিলে, তাহার কিছুমাত্র ফলোদয় হইবে না। অতএব আপনি আমাদিগকে যজ্ঞানুষ্ঠানের উপযুক্ত ভূমি প্রদান করুন।
“তখন ভগবান্ ব্রহ্মা তাঁহাদিগকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘হে দেবগণ! তোমরা যেস্থলে যজ্ঞানুষ্ঠান করিবে, আমি তোমাদিগকে পৃথিবীর সেই অংশ প্রদান করিলাম।’
“কমলযোনি এইরূপে ভূমি প্রদান করিলে, দেবগণ তাঁহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘ভগবন্! আমরা কৃতকার্য্য হইলাম, এক্ষণে দক্ষিণাদানসহকারে যজ্ঞানুষ্ঠান করিব। আপনি অনুমতি করুন, যেন মুনিগণ সৰ্ব্বদাই আমাদিগের যজ্ঞভূমিতে অবস্থান করেন।’
“দেবগণ ব্রহ্মাকে এই কথা কহিয়া কুরুক্ষেত্রে যজ্ঞ আরম্ভ করিলে অগস্ত্য, কন্ব, ভৃগু, অত্রি, বৃষাকপি ও অসিতদেবল প্রভৃতি মুনিগণ তাঁহাদিগের যজ্ঞস্থলে আগমন করিলেন। অনন্তর যথাকালে ঐ যজ্ঞ সমাপন হইলে সুরগণ সেই যজ্ঞভূমির ষষ্ঠাংশ ব্রাহ্মণকে প্রদান করিলেন। হে ধৰ্ম্মরাজ! প্রাদেশমাত্র ভূমিপ্রদান করিলেও কখন দুঃখে অবসন্ন বা বিপদসাগরে নিমগ্ন হইতে হয় না। যিনি শীত, বায়ু ও আতপজনিত ক্লেশনাশক সুসংস্কৃত গৃহ প্রদান করেন, পুণ্যক্ষয় হইলেও, স্বর্গ হইতে পরিভ্রষ্ট হয়েন না। বাসার্থে ভূমি প্রদান করিলে পরমসমাদরে ইন্দ্রলোকে অবস্থান করা যায়।
“অধ্যাপকবংশজাত জিতেন্দ্রিয় শ্রোত্রিয় যাহার গৃহে সন্তুষ্টচিত্তে বাস করেন, সে অনায়াসে অতি উৎকৃষ্ট লোকে অবস্থান করিতে সমর্থ হয়। যে ব্যক্তি গোকুলের অবস্থান নিমিত্ত শীতবৰ্ষাজনিত ক্লেশনাশক সুদৃঢ় গৃহ প্রদান করে, তাহার সাতপুরুষ উৎকৃষ্ট গতি লাভ করে। ক্ষেত্র দান করিলে সম্পত্তিলাভ এবং রত্নগর্ভা ভূমি দান করিলে বংশবৃদ্ধি হইয়া থাকে। ঊষর, দগ্ধ, শ্মশানপরিবেষ্টিত ও পাপাত্মাদিগের পরিভুক্ত ভূমি ব্রাহ্মণকে দান করা কদাপি বিধেয় নহে। পরকীয় ভূমিতে পিতৃলোকের উদ্দেশে শ্রাদ্ধ করিলে সেই ভূম্যধিকারীর পিতৃপুরুষগণ ঐ শ্রাদ্ধ নিস্ফল করিয়া থাকেন। অতএব অন্ততঃ অতি অল্পমাত্র ভূমি ক্রয় করিয়াও তাহাতে পিতৃলোকের পিণ্ড প্রদান করা অবশ্য কর্ত্তব্য। ক্রীত ভূমিতে পিণ্ড প্রদান করিলে ঐ পিণ্ড অক্ষয় হইয়া থাকে। বন, পর্ব্বত, নদ, নদী ও তীর্থস্থান এই সমুদয়ই অস্বামিক বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকে। অতএব এই সমুদয় স্থানে পিণ্ডদান করিতে হইলে মূল্য প্রদানপূর্ব্বক স্থান ক্রয় করিবার প্রয়োজন হয়।
গোদানফল
“হে ধৰ্ম্মরাজ! এই আমি তোমার নিকট ভূমিদানের বিশেষ ফল কীৰ্ত্তন করিলাম, অতঃপর গোদানের ফল কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। গোসমুদয় তাপসদিগের অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ, এই নিমিত্ত ভগবান্ মহাদেব গোসমুদয়ের সহিত একত্র তপানুষ্ঠান করিয়াছিলেন। সিদ্ধ ব্রহ্মর্ষিগণ যে ব্রহ্মলোক প্রার্থনা করেন, গোসকল চন্দ্রের সহিত সেই ব্রহ্মলোকে বাস করিয়া থাকে। গোসমুদয় দধি, দুগ্ধ, ঘৃত, গোময়, ধৰ্ম্ম, অস্থি, শৃঙ্গ ও লোমদ্বারা লোকের মহোপকারসাধন করে। শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষায় উহাদিগের কিছুমাত্র ক্লেশ হয় না। উহারা অবিশ্রান্ত পরিশ্রম করিয়া কার্য্যসাধন করে। গোসমুদয় ব্রাহ্মণের সহিত ব্রহ্মলোকে গমন করিয়া থাকে বলিয়া পণ্ডিতগণ ঐ উভয়কে অভিন্নরূপে নির্দ্দেশ করেন। পূৰ্ব্বকালে মহাত্মা রন্তিদেব স্বীয় যজ্ঞে গোসমুদয়কে পশুরূপে কল্পিত করিয়া ছেদন করাতে উহাদিগের চর্ম্মরসে চৰ্ম্মন্বতীনদী প্রবর্ত্তিত হইয়াছে। এক্ষণে উহারা আর যজ্ঞীয় পশুত্বে কল্পিত হয় না। উহারা এক্ষণে দানের বিষয় হইয়াছে। যাহারা ব্রাহ্মণগণকে গোদান করে তাহারা বিপদগ্রস্ত হইলেও অনায়াসে তাহা হইতে মুক্ত হয়। সহস্র গোদান করিলে পরকালে কখনই নরকগ্রস্ত হইতে হয় না এবং সর্ব্বত্রই জয়লাভ হইয়া থাকে। ত্রিদশাধিপতি ইন্দ্ৰ দুগ্ধকে অমৃততুল্য বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়াছেন; অতএব ধেনুদান করিলে অমৃতদানের ফললাভ হয়। বেদবেত্তা পণ্ডিতগণ গব্যকে প্রধান হবনীয় দ্রব্য বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়া থাকেন। অতএব গোদান করিলে হবনীয় দ্রব্য প্রদান করা হয়। বৃষভ মূর্ত্তিমান স্বর্গস্বরূপ; অতএব যে ব্যক্তি সদ্গুণসম্পন্ন ব্রাহ্মণকে বৃষভ প্রদান করে, সে অনায়াসে স্বর্গলাভ করিয়া থাকে। গোসমুদয় প্রাণীদিগের প্রাণস্বরূপ; অতএব গোদান করিলে প্রাণদান করা হয়। গোসমুদয় জীবগণের আশ্রয়স্বরূপ; অতএব গোদান করিলেই আশ্রয়দানের ফললাভ হয়। নাস্তিক, পশুঘাতী ও গোজীবীকে গোদান করা কদাপি বিধেয় নহে। ঐ পাপাত্মাদিগকে গোদান করিলে অনন্তকাল নরকভোগ করিতে হয়। ব্রাহ্মণকে কৃশ, বিবৎসা, বন্ধ্যা, রোগযুক্তা, বিকলাঙ্গী ও পরিশ্রান্তা গাভী প্রদান করা কদাপি কর্ত্তব্য নহে। দশসহস্র গোদান করিলে ইন্দ্রলোক এবং লক্ষ গোদান করিলে অক্ষয়লোক লাভ হইয়া থাকে।
অন্নদানপ্রশংসা
“হে ধৰ্ম্মরাজ! এই আমি তোমার নিকট গোদান, তিলদান ও ভূমিদানের বিষয় কীৰ্ত্তন করিলাম, অতঃপর অন্নদানের মাহাত্ম্য কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। অন্নদান অতি উৎকৃষ্ট দান, অন্নদান করিয়া মহাত্মা রন্তিদেব স্বর্গলাভ করিয়াছেন। যে ভূপতি ক্ষুধিত ও পরিশ্রান্ত ব্যক্তিকে অন্ন প্রদান করেন, তিনি অনায়াসে ব্রহ্মলোকে গমন করিতে সমর্থ হয়েন। অনুদানে যেরূপ শ্ৰেয়োলাভ হয়, হিরণ্য, বস্ত্র বা অন্য কোন দানদ্বারা সেরূপ শ্রেয়োলাভের সম্ভাবনা নাই। অন্ন অতি উৎকৃষ্ট পদার্থ ও লক্ষ্মীস্বরূপ। অন্নদ্বারা পরমায়ু, তেজঃ ও বীর্য্য পরিবর্দ্ধিত হয়। মহাত্মা পরাশর কহিয়াছেন যে, যে ব্যক্তি একাগ্রমনে সাধুদিগকে অন্নদান করেন, তাতাঁকে কদাপি কোন প্রকার বিপদে নিপতিত হইতে হয় না। যিনি যেরূপ অন্ন ভোজন করুন না কেন, শাস্ত্রানুসারে দেবগণকে তাহা নিবেদন করিয়া ভোজন করা কৰ্ত্তব্য। যে ব্যক্তি শুক্লপক্ষে অন্নদান করে, তাহার কোন প্রকার বিপদ থাকে না এবং সে অনায়াসে পরলোকে অনন্ত সুখসম্ভোগে সমর্থ হয়। যিনি স্বয়ং ভোজন না করিয়া সমাহিতচিত্তে আপনার ভক্ষ্য অন্ন অতিথিকে দান করেন, তিনি অনায়াসে ব্রহ্মলোকগমনে সমর্থ হয়েন, দুর্ব্বিষহ বিপদে নিপতিত হইলেও তাহা হইতে মুক্তিলাভ করেন এবং সমুদয় পাপ হইতে নির্ম্মুক্ত হইয়া পুণ্যসঞ্চয় করিয়া থাকেন।
“হে ধৰ্ম্মরাজ! এই আমি তোমার নিকট অন্নদান, তিলদান, ভূমিদান ও গোদানের ফল কীৰ্ত্তন করিলাম।”
