৯৬তম অধ্যায়
পবিত্র ছত্রপাদুকাদি দান মাহাত্ম্য
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! দিবাকর ব্রাহ্মণবেশে এইরূপ প্রার্থনা করিলে তেজস্বী জমদগ্নি কি কার্য্যের অনুষ্ঠান করিলেন?”
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! দিবাকর এইরূপ প্রার্থনা করিলেও হুতাশনসমপ্রভ জমদগ্নি কিছুতেই ক্রোধ সংবরণ করিলেন না। তখন সূর্য্য তাঁহাকে প্রণাম করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে মধুরবাক্যে পুনরায় কহিলেন, ‘ভগবন্! সূর্য্য অন্তরীক্ষে সততই পরিভ্রমণ করিয়া থাকেন; অতএব আপনি কিরূপে সেই চঞ্চললক্ষ্য বিদ্ধ করিবেন?’ জমদগ্নি কহিলেন, ‘ব্ৰহ্মন্! আমি জ্ঞানচক্ষুঃ প্রভাবে তোমাকে সূর্য্য বলিয়া অবগত হইয়াছি, এবং তুমি কোন্ সময়ে পরিভ্রমণ ও কোন্ সময়েই বা স্থিরভাবে অবস্থান কর তাহাও সবিশেষ জ্ঞাত আছি। তুমি মধ্যাহ্নকালে নিমেষাৰ্দ্ধ নভোমণ্ডলে বিশ্রাম করিয়া থাক। আমি অসঙ্কুচিতচিত্তে সেইক্ষণে তোমাকে বিদ্ধ করিব।” তখন দিবাকর তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘ভগবন্! আপনি আমাকে শরদ্বারা নিশ্চয়ই বিদ্ধ করিবেন বলিয়া যে সঙ্কল্প করিয়াছেন, তাহা পরিত্যাগ করুন। আমি আপনার শরণাপন্ন হইলাম। আমি আপনার অপকার করিয়াছি যথার্থ বটে, কিন্তু আপনাকে আমায় রক্ষা করিতে হইবে।’
“তখন ভগবান্ জমদগ্নি হাস্যমুখে সূর্য্যকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘দিবাকর! তুমি যখন আমার শরণাপন্ন হইলে, তখন তোমার আর কিছুমাত্র শঙ্কা নাই। যে ব্যক্তি ব্রাহ্মণের সরলতা, পৃথিবীর স্থিরতা, শশাঙ্কের সৌম্যতা, বরুণের গাম্ভীর্য্য, অগ্নির উজ্জ্বলতা, সুমেরুর প্রভা ও পবনের প্রতাপ অতিক্রম করিতে পারে, সেই ব্যক্তিই শরণাগত ব্যক্তির বিনাশসাধনে সমর্থ হয়। শরণাগত ব্যক্তিকে বিনাশ করিলে গুরুতল্পগমন, ব্রহ্মহত্যা ও সুরাপানজনিত পাপে দূষিত হইতে হয়, সন্দেহ নাই। যাহা হউক, এক্ষণে যাহাতে তোমার উত্তাপপ্রভাবে পথিমধ্যে আমার পত্নীর গমনাগমনের কোন কষ্ট না হয়, তুমি তাহার উপায় অবধারণ কর।’ এই বলিয়া মহর্ষি জমদগ্নি তূষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করিলেন।
“তখন দিবাকর ছত্র ও পাদুকাযুগল প্রদান করিয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘ভগবন্! আমার কঠোর কিরণ হইতে মস্তক ও চরণ রক্ষা করিবার নিমিত্ত এই ছত্র ও পাদুকাদ্বয় গ্রহণ করুন। অদ্যাবধি অক্ষয়ফলপ্রদ ছত্র ও পাদুকাযুগল পবিত্র দানকার্য্যে প্রচলিত হইবে।
“হে ধৰ্ম্মরাজ! ছত্র ও পাদুকাযুগল সূর্য্যদেব হইতেই প্রচারিত হইয়াছে। এই দুই বস্তু প্রদান করা ত্রিলোকমধ্যে অতিপবিত্র কার্য্য বলিয়া প্রখ্যাত হইয়াছে। অতএব তুমি ব্রাহ্মণগণকে ছত্র ও পাদুকা প্রদান কর। আমি নিশ্চয়ই কহিতেছি, ইহাতে তোমার সমধিক ধৰ্ম্মসঞ্চয় হইবে। যিনি ব্রাহ্মণগণকে শতশলাকাযুক্ত শুভ্র ছত্র প্রদান করেন, তাঁহার দেহান্তে অতুল সুখলাভ হয় এবং তিনি অপ্সরা ও দ্বিজাতিগণকর্ত্তৃক সমাদৃত হইয়া ইন্দ্রলোকে বাস করিয়া থাকেন। যে ব্রাহ্মণ সূর্য্যকিরণসন্তপ্ত ভূমিতে গমননিবন্ধন দগ্ধ হয়েন, সেই ব্রাহ্মণকে যিনি পাদুকা প্রদান করেন, তিনি অনায়াসে সুরগণের প্রশংসিত লোকসমুদয় লাভ এবং পুলকিতচিত্তে গোলোকে বাস করিতে সমর্থ হয়েন। হে ধৰ্ম্মরাজ! এই আমি তোমার নিকট ছত্র ও পাদুকাদানের ফল কীৰ্ত্তন করিলাম।”
