৩০ অগাস্ট – অক্টোপাসের ফসিল, কানাইয়ের গ্রেনেড আর গান্ধীজির অটোগ্রাফ
কাঁধের ঝোলা ব্যাগটা চেয়ারের পাশে নামিয়ে রেখে টেবিলে ঢাকা দিয়ে রাখা গ্লাসের জলটা এক চুমুকে শেষ করে রজনী। তারপরে টাইপরাইটারের ঢাকা খুলে একপাশে রেখে মেশিনে কাগজ লাগাতেই ড্যানীবাবুর কথা ভেসে আসে— ‘দাঙ্গায় সব লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে রজনী। কলকাতা আর সভ্য কলকাতা নেই।…মানুষ যেন দৈত্য হয়ে গেছে।…আমরা সবাই দিনের পর দিন গৃহবন্দি। …অফিসে তো আসতে পারিনি। তাই এই ক-দিনে বাড়িতে বসেই ফসিলের ওপরে একটা পেপার লিখছিলাম। প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আর দিন দুয়েকের মধ্যেই পুরোটা লেখা হয়ে যাবে আশা করি। তা কমপ্লিট হয়ে গেলে তুমি সেটা বেশ গুছিয়ে টাইপ করে দিও তো। ভাবছি ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিকে পাঠাব।’
—‘হ্যাঁ স্যার দেবেন। নিশ্চয়ই টাইপ করে দেব।’ উৎসাহের সঙ্গে বলে রজনী। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পেরে ভালো লাগছে তারও।
এদিকে মুক্তোরাম চা নিয়ে ঘরে ঢুকেছে। ঘরের লাগোয়া বেসিনে কাপ-প্লেটগুলো ধুচ্ছে সে। জলের আওয়াজ, পোর্সেলিনের টুং-টাং আর পাখার হাওয়া কাটার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই ঘরে।
কাপ-প্লেট ধুয়ে মুক্তোরাম যখন চা দিচ্ছে টেবিলে, তখনই ড্যানীবাবু একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন।
—‘আচ্ছা রজনী, বল তো, আধুনিক অক্টোপাসের ফসিল এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি কেন?’
আচমকা এই প্রশ্নে একটু থতমত খেয়ে যায় রজনী। সত্যিই তো, এই কথাটা সে তো আগে কখনো ভাবেনি। অবশ্য এই প্রশ্ন তার ভাবনাতেও আসার কথা নয়। সে তো বিজ্ঞানের ছাত্রও নয়। তাই মনে মনে নিজস্ব যুক্তি দিয়ে খুঁজতে থাকে প্রশ্নটার জবাব।
টেবিলে চা দিয়েছে মুক্তোরাম। রজনীকে একটু চিন্তিত দেখে বলে— ‘কী ভাবচেন স্যার?’
চায়ে একটা চুমুক মেরে ওপাশ থেকে ড্যানীবাবু হেসে বলেন— ‘অক্টোপাসের ফসিল কেন পাওয়া যায় না সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে রজনী।’
—‘অ, তাই বলেন।’ তারপরেই ড্যানীবাবুর দিকে প্রশ্ন ছোঁড়ে মুক্তোরাম— ‘দশভূজা দুগ্গিমায়ের কোনো ফসিল দেকেচেন সায়েব?’
এই বেমক্কা প্রশ্নে চায়ে চুমুক দিতে গিয়েও থমকে যান দীনেন্দ্রনাথ। তারপরে সামলে নিয়ে মুক্তোকে বলেন— ‘আরে সে তো হয় পাথরের কিংবা মাটি দিয়ে তৈরি মূর্তি। তার আবার ফসিল হবে কী করে?’
—‘ঠিক তেমনই অক্টোপাস হল গে সুমুদ্দুরের জলের তলার অষ্টভূজা দেবী। তাই তারও ফসিল হয় না।’ অদ্ভুত যুক্তি। কে এর কীই-বা উত্তর দেবে?
তবু মুক্তোকে থামাবার শেষ চেষ্টা করে রজনী— ‘কেন? যে শালগ্রাম শিলাকে নারায়ণ হিসেবে পুজো করা হয়, সেটাও তো শামুক জাতীয় একটা প্রাণীর ফসিল। তা সেটার যদি ফসিল হতে পারে, তো অক্টোপাসেরই বা ফসিল হবে না কেন?’
—‘জানি না বাপু অত্তোসব গেরমভারী কতা। বামনেরা বলতে পারবে এসবের উত্তর।’ বলে মানে মানে সরে পড়ে মুক্তোরাম।
শালগ্রাম শিলার কথায় হঠাৎই রজনীর মাথায় ঝিলিক মেরে যায় ড্যানীবাবুর প্রশ্নের উত্তর। ড্যানীবাবুর দিকে তাকাতেই সে দেখে মৃদু মৃদু হাসছেন উনি। রজনী তাঁর দিকে তাকাতেই বললেন— ‘মুক্তোরামকে যে এক্সাম্পেলটা দিয়ে থামালে, তার মধ্যেই কিন্তু লুকিয়ে আছে আমার বলা প্রশ্নটার উত্তর। ভালো করে যুক্তি দিয়ে খুঁজে দেখ।’
কিন্তু ড্যানীবাবু বলার আগেই সে পেয়ে গেছে প্রশ্নটার জবাব। সে ড্যানীবাবুকে বললে— ‘আজ পর্যন্ত যতরকম ফসিল পাওয়া গেছে, মানে আপনার কাছ থেকেই যা জেনেছি, তাতে বুঝেছি যে শরীরে শক্ত কিছু, যেমন হাড়, কার্টিলেজ বা গাছের ক্ষেত্রে শক্ত টিস্যু, এইসব না থাকলে ফসিল তৈরি হয় না। আর অক্টোপাসের শরীরে যেহেতু হাড় নেই, তাই তার ফসিলও হয় না। সমস্ত শরীরটাই মাটির স্তরের নীচের চাপে আর তাপে গলে যায়।’
—‘সাব্বাস, ইউ আর রাইট মাই বয়।’ উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন ড্যানীবাবু। ‘এইটাই তো চাই, নইলে দীনেন্দ্রনাথের শিষ্য হবে কী করে?’
স্মিত হেসে রজনী বলে—‘না স্যার, সে যোগ্যতা আমার নেই।’
সত্যি, ড্যানীবাবু মানুষটাই এমন। একদিকে যেমন মিশে যেতে পারেন সমাজের উচ্চস্তরে, তেমনই মিশে যেতে পারেন একজন অধস্তন বেয়ারার সাথেও। পাণ্ডিত্য তাঁকে উদ্ধত করেনি, বরং করেছে মাটির কাছাকাছি থাকা একজন প্রকৃত অন্তর-আলোকিত মানুষ। রজনী ধন্য যে, এমন একজন মানুষের সান্নিধ্য সে পেয়েছে।
এদিকে ক-দিন ধরেই তার মনের মধ্যে একটা ইচ্ছে ঘুরছে। সেটা হল, কাছ থেকে গান্ধীজিকে একবার দেখার, তাঁর একটা অটোগ্রাফ নেওয়ার। রজনী জানে— এ যেন, আকাশের চাঁদ ধরতে চাওয়া। কিন্তু ইচ্ছে ইচ্ছেই। তবে ইচ্ছে থাকলেই যে উপায় সবসময় হবে তার কোনো মানে নেই। আসলে রজনীর এই ধরণের ইচ্ছের একটা কারণও আছে। সে দেখতে চায় কী এমন শক্তি আছে ওই মানুষটার মধ্যে যে, যার জন্যে তাঁর উপস্থিতিকে সাধারণ মানুষ থেকে দাপুটে রাজনীতিকও সম্মান করে।
রজনী জানে যে তার এই ইচ্ছেটাকে সফল করতে হলে একটা উপায় তাকে খুঁজে বের করতেই হবে। কথায় বলে না— কি না হয় চেষ্টায়। তাই রজনীও একটা শেষ চেষ্টা করে। নয় নয় করে সে ড্যানীবাবুকে বলেই ফেলে— ‘স্যার একটা কথা বলব?’
টেবিলে ঘাড় গুঁজে কাজ করতে করতেই ড্যানীবাবু বলেন— ‘কী? বল?’
—‘স্যার, আমার একটা ইচ্ছে আছে। বলব?’
—‘ভণিতা না করে বলেই ফেল। শুনি।’
—‘স্যার, গান্ধীজিকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে। খুব ইচ্ছে হয় ওনার একটা অটোগ্রাফ নেওয়ার। উনি তো এখন কলকাতায় আছেন।’
এবারে যেন একটা ধাক্কা খেলেন ড্যানীবাবু। টেবিলের কাগজ থেকে মুখ তুলে চশমার ওপর দিয়ে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন রজনীর দিকে। ঠিক শুনছেন তো তিনি? ছেলেটার মাথার ঠিক আছে তো, নইলে এইরকম ইচ্ছে কারোর হয়? ও বোধ হয় জানে না গান্ধীজির গুরুত্ব।
তাই বলেন— ‘তোমার মাথার ঠিক আছে তো? তুমি কি জানো যে উনি কীরকম হাই-সিকিওরিটিতে থাকেন। বাড়ির বাইরে সর্বক্ষণ পুলিশ মোতায়েন। পুলিশের বড়ো বড়ো কর্তাব্যক্তিরা থাকেন সেখানে। আর তা ছাড়া তুমি তো রাজনীতির কোনো কেউকেটা নও বাপু যে চাইলেই যেতে পারবে ওনার কাছে।’
তবু রজনী একবার শেষ চেষ্টা করে। বোঝে যে সে একটা অন্যায্য আব্দার করে ফেলেছে। কিন্তু তার যে সত্যিই বড়ো ইচ্ছে গান্ধীজিকে কাছ থেকে দেখার।
তাই সে আমতা আমতা করে বলে— ‘স্যার, বলছিলাম কী, ওপরমহলে তো আপনার কিছু জানাশোনা আছে। মানে…তাই ওঁদের বলে কয়ে যদি একটু ব্যবস্থা করে দেন…।’
ড্যানীবাবু বলেন— ‘আমাকে ভালো মানুষ পেয়ে বেশ ভালোই আব্দার করতে শিখেছ দেখছি।’ রজনী লাজুক হাসে।
—‘ঠিক আছে দেখছি কতদূর কী করা যায়। তবে কথা দিতে পারছি না। আসলে সময়টাওতো এখন ভালো যাচ্ছে না। তবু দেখি…।’ চোখবুজে একটু ভাবেন ড্যানীবাবু। হয়তো ভাবছেন কাকে এই রিকোয়েস্ট করা যায়। উদগ্রীব হয়ে বসে থাকে রজনী। একটুপরে চোখ খুলে ফোনটা তোলেন।
—‘হ্যালো, আমি ইন্ডিয়ান মিউজিয়ম থেকে প্যালিএন্টোলজিস্ট দীনেন্দ্রনাথ সোম বলছি। কাইন্ডলি ডক্টর রায়কে একটু লাইনটা দেবেন?’ ফোন ধরে অপেক্ষা করতে করতে ফোনে হাতচাপা দিয়ে নীচুস্বরে রজনীকে বলেন— ‘বিধানবাবু আমাদের ধর্মীয় সমাজের লোক তো। তাই ওনাকেই রিকোয়েস্ট করছি।’
একটুপরেই ড্যানীবাবু বলতে থাকেন— ‘হ্যালো বিধানবাবু, আমি মিউজিয়ম থেকে দীনেন্দ্রনাথ বলছি…আপনার কাছে একটা রিকোয়েস্ট ছিল… মানে, আমাদের এখানে কাজ করে একটি ছেলে সে গান্ধীজির বড়ো ভক্ত। তা সে ওনার একটা অটোগ্রাফ নিতে চায়। তাই বলছিলাম কী আপনি যদি কোনোভাবে একটু ব্যবস্থা করে দিতে পারেন।…না না, খুবই ভালো ছেলে। আমার সঙ্গেই কাজ করে আর পাস্ট হিস্ট্রিও ভালো। তাই বলছিলাম আর কী…।’
ফোনের ওপার থেকে কিছু বলা হচ্ছে। ড্যানীবাবু চুপ করে শুনে যাচ্ছেন। তারপরে হাত বাড়িয়ে টেবিলে রাখা রাফ-প্যাড টেনে নিয়ে কলম রেডি করে বললেন— ‘ডক্টর রয়, প্লিজ আর একবার নাম আর ডেজিগনেশনটা বলবেন? আমি চিঠি লিখে দেব।…হ্যাঁ, আচ্ছা আচ্ছা, আমি তাহলে মিনিট পনেরো পরে আপনাকে কল-ব্যাক করছি। থ্যাংক ইউ মিস্টার রয়।’
রিসিভারটা ক্রেডেলে রেখে রজনীকে বললেন— ‘উনি স্পেশাল ব্রাঞ্চের ডিসির সঙ্গে কথা বলে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করিয়ে দেবার ব্যবস্থা করবেন বলেছেন। এখন ডিসির পারমিশন পেলে তবেই তোমার গান্ধী-দর্শন হবে। বুঝলে? তাই মিনিট পনেরো অপেক্ষা কর। তারপরই দেখা যাবে যে বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে কি না।’
অতএব অপেক্ষা। কিন্তু এই পনেরো মিনিট রজনীর কাছে যেন অনন্তকাল বলে মনে হচ্ছে। একবার তো সে চেয়ার ছেড়ে উঠে টয়লেটে গিয়ে ঘাড়ে মুখে জল দিয়ে এল।
এদিকে ক্রমে পনেরো মিনিট কেটে গিয়ে পঁচিশ মিনিট হতে চলল। ড্যানীবাবু আগের মতোই নিজের কাজে ব্যস্ত। কোনো হেলদোল নেই। রজনী ভাবছে— পনেরো মিনিট হয়ে গেছে, তবু ড্যানীবাবু ফোন করছেন না কেন? উনি কি ভুলে গিয়েছেন কথাটা?
—‘কী? টেনশন হচ্ছে?’ ড্যানীবাবু বোধ হয় তার মনের কথাটা টের পেয়েছিলেন।
—‘আরে, ওনারা সবাই ব্যস্ত মানুষ। দিনে হয়তো কয়েকশো ফোন অ্যাটেন্ড করতে হয়। তাই একটু সময় নিলাম যাতে ওনারা কথাবার্তা বলে নিতে পারেন।’ আর তারপরেই টেলিফোনটা তুলে নিলেন।
ফোনে কথাবার্তা চলতে লাগল আর সেইসঙ্গে ড্যানীবাবু রাফ-প্যাডে টুকটাক কী যেন লিখে চলেছেন। মিনিট তিনেক পরে কথা শেষ করে ড্যানীবাবু রজনীকে বললেন— ‘মনে হচ্ছে বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েছে। শোনো, বিধানবাবু ডিসি আর বাপুজির সেক্রেটারি কল্যাণমকে তোমার নামে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট লিখিয়েছেন। আগামীকাল রাত সোওয়া ন-টায়। আর আমি তোমাকে দুটো চিঠি করে দেব। তার একটা দেবে ডিসিকে আর অন্যটা দেবে কল্যাণমকে। বুঝলে?’
—‘হ্যাঁ স্যার, বুঝেছি।’ আনন্দে রজনীর বুকটা ভরে গিয়েছিল।
—‘তাহলে বাড়ি ফেরার সময়ে ধর্মতলা থেকে একটা অটোগ্রাফ নেওয়ার খাতা কিনে নিয়ে যেও। আর হ্যাঁ, সঙ্গে যদি সুরাওর্দীকে দ্যাখো, তবে ওনারও একটা অটোগ্রাফ নিও, নইলে লোকটার শিক্ষাকে আর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে অবমাননা করা হয়। আর কল্যাণমেরও একটা সই নিয়ে নিও। এঁদের নাম তো ইতিহাসে লেখা হয়ে যাচ্ছে। পরে কোনোদিন তুমি সবাইকে বলতে তো পারবে যে তুমি এঁদের সবাইকে কাছ থেকে দেখেছ।’
—‘নিশ্চয়ই স্যার। আপনি একদম ঠিক বলেছেন।’
স্মিত হেসে ড্যানীবাবু বললেন— ‘বাড়ি যাওয়ার আগে চিঠিদুটো টাইপ করে আমাকে দিয়ে সই করিয়ে নিও। বয়ান আমি লিখে দিচ্ছি দশ মিনিটের মধ্যেই। আর ডিসিকে লেখা চিঠিটায় মুক্তোরামের হাত দিয়ে লালবাজার থেকে অ্যাপ্রুভাল অর্ডারটা আনিয়ে নিও কাল দুপুরের মধ্যেই। নইলে ভাগ্যে জুটবে লবডঙ্কা।’
বাড়ি ফেরার পথে চৌরঙ্গিতে অটোগ্রাফ-বুক কিনতে গিয়ে রজনীর হঠাৎ মনে পড়ল যে কানাই তাকে এক শিশি গ্লিসারিন আর মুখ ধোওয়ার জন্যে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট কিনে নিয়ে যেতে বলেছিল। ওর মুখের ভেতরে নাকি ছোট ছোট রাশ বেরিয়েছে। তাই গ্লিসারিন আর পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দিয়ে মুখ ধোবে।
অটোগ্রাফ-বুক কেনার পরে কাছেরই একটা ওষুধের দোকান থেকে কানাইয়ের চাওয়া ওষুধ দুটো কিনেই তাই সে সোজা বাড়ির পথ ধরলে। অগাস্টের মেঘলা আকাশ, তবু আজ তার মনটা শেষ বিকেলের ওই মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারা স্বচ্ছ নীল আকাশের টুকরোটার মতোই খুশি।
.
বাড়ি ফিরে নিজের দোতলার ঘরে ঢুকে রজনী দেখে কানাই একমনে ভগ্নাংশের অঙ্ক কষছে। ছেলেটার মাথা রীতিমতো ভালো। তবু সে জিজ্ঞেস করে— ‘কি রে? পারছিস তো সব? অসুবিধে হলে বলিস।’
—‘হ্যাঁ স্যার পারছি। এগুলো তো সোজা। তুমি নীচে গিয়ে চা-মুড়ি খাও। দরকার হলে আমি তোমায় ডাকব।’
—‘আর এই নে তোর ফরমায়েশি জিনিসগুলো।’ বলে ব্যাগ থেকে ওষুধ দুটো বের করে টেবিলে রাখে রজনী। তারপর নতুন কেনা টিনের ছোটো তোরঙ্গে ব্যাগটা ঢুকিয়ে তালাবন্ধ করে।
মুখ হাত ধুয়ে জামাকাপড় পালটে যখন সে নীচে নামছিল তখনও দেখে কানাই একমনে অঙ্ক কষে চলেছে।
.
নীচে নেমে মেসোমশাইয়ের পাশে থাকা চৌকিতে গিয়ে বসে রজনী। কেষ্টদা তেলমাখা মুড়ি-বাদামের বাটি ধরিয়ে দিয়ে যায় হাতে। একগাল মুড়ি খেয়ে রজনী মেসোমশাইকে বলে— ‘মেসোমশাই, একটা ভালো খবর আছে।’
রেডিয়োটার ভল্যুম কম করে দিয়ে মেসোমশাই বলেন— ‘কী? প্রোমোশন টোমোশন হল নাকি?’
—‘না মেসোমশাই, সেসব নয়। আমি কাল হয়তো গান্ধীজির সঙ্গে দেখা করতে যাব।’
চরম বিস্মিত মেসোমশাই খানিকক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। রজনীর কথাটা বিশ্বাসই হতে চায় না তাঁর। শেষমেশ বলেন— ‘কি বলছ তুমি? মাথাটাতা খারাপ হয়ে যায়নি তো তোমার? গান্ধীজির সঙ্গে দেখা করাটা কি অত্তো সোজা? তুমি কি জানো যে উনি কে আর ওনার চারপাশে কি সিকওরিটি থাকে?’
—‘জানি মেসোমশাই। কিছুদিন ধরেই আমার খুব ইচ্ছে ছিল ওনাকে কাছ থেকে দেখার। তাই আজকে ড্যানীবাবুকে আমার সেই ইচ্ছের কথাটা বলেছিলাম। তা উনিও প্রথমটায় বেশ অবাকই হয়েছিলেন। তবে উনি মানুষ ভালো আর আমাকে ভালোবাসেন বলে ডক্টর রায় আর স্পেশাল ব্রাঞ্চের ডিসির সঙ্গে ফোনে কথা বলে সব ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। দুটো চিঠিও লিখে দিয়েছেন। আগামীকাল রাত সোওয়া ন-টায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট। কারণ ওই সময়টায় বাপুজি ফাঁকা থাকবেন।’
সব শুনে মেসোমশাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন। ব্যাপারটাকে এখনও বিশ্বাসই করতে পারছেন না উনি। তাই রজনীকে তাঁর অবাক প্রশ্ন— ‘সত্যি বলছ তো?’
—‘আমি আপনাদের মিথ্যে বলব, একথা ভাবলেন কী করে মেসোমশাই?’
এইবারে বিশ্বাস হয় মেসোমশাইয়ের। বলেন— ‘আমি উঁচু সরকারি পদে থেকেও যা পারিনি, অবশ্য ইচ্ছেও হয়নি, তুমি কিন্তু তাইই করে দেখাচ্ছ রজনী। প্রথমে গোপালের সঙ্গে দেখা করলে, তারপরে দেখা যুগল ঘোষের সঙ্গেও, আর এবার স্বয়ং গান্ধীজি!… ওগো, শুনছ, একবার এসো তো এদিকে।’ শেষের কথাটা মাসিমার উদ্দেশ্যে বলা।
রজনী আরও একগাল মুড়ি মুখে তোলে। আর ঠিক সেই সময়েই শোনা যায় উচ্চস্বরে মাসিমা বলছেন— ‘এই কে রে? কে ফেললি ওটা? ওমা গো, কেমন গলগল করে ধোঁওয়া বেরোচ্ছে আর আগুন জ্বলছে। ওরে ও কেষ্ট, দ্যাখ দ্যাখ, কী হল… ও মা গো…।’
মাসিমা দৌড়ে বাইরের ঘরের দিকে আসতে থাকেন। ততক্ষণে তাঁর চিৎকার শুনে ঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে এসেছে রজনী আর মেসোমশাই। রান্নাঘর থেকে দৌড়ে আসে কেষ্টদাও। প্রথমে তো সবাই ভয় পেয়ে খানিক পিছিয়ে যায়।
মাসিমা কেষ্টদাকে বলেন— ‘ওই দেখ কেষ্ট, ওই দেখ। ও মা গো, কী আগুন আর ধোঁওয়া। বোমা-টোমা নয়তো? ও বাবা রজনী, দ্যাখো তো ওটা কী?’
সত্যিই তো! উঠোনের একপাশে দূরে ইঁটের গাদার পাশে ভসভসিয়ে জ্বলছে জিনিসটা। রজনী আন্দাজ করতে থাকে ওটা কী। বোমা হলে এতক্ষণে নিশ্চয়ই ফেটে যেত। তাহলে ওটা কী, আর এলই বা কোত্থেকে? কে পাঁচিল টপকে ছুঁড়ে দিয়ে গেল ওটা?
এমনসময় দোতলার বারান্দা থেকে যাত্রাপালার রাবণের ঢঙে হো-হো হাসি।… কানাই। সে দু-হাতের মাসল ফুলিয়ে হাসতে হাসতে বলল— ‘সরে যাও ঠাম্মি। আমি গ্রেনেড ছুঁড়েছি। এখুনি ফাটবে ওটা। সরে যাও, সরে যাও। ….হা-হা-হা-হা।’
মাসিমা ভয়ে খানিকটা দূরে সরে যান। তারপরে যখন বুঝতে পারেন যে এটা কানাইয়ের নিছকই একটা ছেলেমানুষি তামাশা, তখন ওপরের বারান্দার দিকে তাকিয়ে বলেন— ‘ও, তাহলে এটা তোমারই কাণ্ড? আমি তাই ভাবি, এইবাড়িতে তো এর আগে এমনটা কখনো হয়নি।’
কানাইয়ের এই হঠাৎ ছেলেমানুষিতে বিব্রত হয়ে পড়ে রজনী। একটু কড়া গলায় সে বলে— ‘এ্যাই, নীচে আয়। আজ তোর…।’
স্যারের গলার স্বর শুনে কানাই বুঝতে পেরেছে যে রজনী রেগে গেছে। তাই সে ধীরপায়ে সিঁড়ির দিকে এগোয়। সে ফাঁকে মেসোমশাই বলেন— ‘গায়ে হাত তুল না রজনী। এসব বাচ্চা ছেলের দুষ্টুমি। কিন্তু ও এসব পেল কোথা থেকে? এত কোনো বাজি নয়।’
কেষ্টদাও বলে— ‘হ্যাঁ গো দাদাবাবু, ও কোতা থেকে পেল এসব? দিনকাল তো ভালো নয় না।’
ততক্ষণে কানাই গুটিগুটি পায়ে এসে হাজির। তার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে রজনী বলল— ‘ঘরে আয়।’
সবাই ঘরে গিয়ে বসে। শুধু কানাই অপরাধীর মতো মুখ করে দাঁড়িয়ে থেকে। সে ধরেই নিয়েছে যে আজ তার কপালে দুর্ভোগ আছে।
—‘হ্যাঁরে ওটা কী?’
—‘খেলনা বাজি।’
—‘ও আচ্ছা। তা এটা কোথা থেকে পেলি শুনি?’ রজনীর গম্ভীর প্রশ্ন। তার দুশ্চিন্তা— ছেলেটা বদ সঙ্গে পড়ল না তো?
—‘আমি বানিয়েছি।’ তার এই অকপট স্বীকারোক্তিতে অবাক সবাই।
—‘তা কী দিয়ে বানিয়েছিস শুনি?’
—‘তুমি যে ওই গ্লিসারিন আর পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট এনে দিলে, সেগুলো দিয়ে।’
এবারে সবাই আরও বিস্মিত।
এবারে মেসোমশাই প্রশ্ন করেন— ‘তা কীভাবে ওটা বানালে শুনি’ ?
—‘একটা হোমিওপ্যাথি ওষুধের শিশিতে গ্লিসারিন ভরে তার মুখটা আটকে দিতে হয়। অন্য আরেকটা হোমিওপ্যাথি শিশিতে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ভরে সেটারও মুখটা আটকে দিতে হয়। তারপরে দুটো শিশিকে পাশাপাশি রেখে পাতলা কাগজ দিয়ে ভালো করে মুড়ে জোরে ছুঁড়ে মারতে হয়। তাহলেই শিশি ফেটে কেমিক্যাল মিশে গিয়ে আগুন জ্বলে ওঠে।’
উত্তর শুনে সবাই চুপ। এমনকী রজনীও। একইসঙ্গে বিস্মিত সে। এই বিদ্যে কানাই কার কাছ থেকে শিখল? তাই সে তাকে জিজ্ঞেস করে— ‘হ্যাঁরে, কোথা থেকে শিখলি এসব?’
—‘স্কুলের বড়ো দাদারা শিখিয়েছে। নাইন ক্লাসের মৃন্ময়দা আর সুহাসদা এসব জানে।’
এতক্ষণে রহস্যটা পরিষ্কার হল। সেইজন্যেই কানাই রজনীকে ওইদুটো কেমিক্যাল আনতে বলেছিল। মুখের রাশ এইসবের একটা অজুহাত মাত্র। কানাই তাকে মিথ্যে বলার জন্যে সে যত না কষ্ট পেয়েছে; তার থেকে বেশি আজ তার মনে একটা আশঙ্কা উঁকি মারছে। আর সেটা হল— দাঙ্গার সময়ে গ্রেনেড ছোঁড়ার দৃশ্য কানাইয়ের মনে গভীরভাবে ছাপ ফেলে গেছে। আর তারই প্রকাশ ঘটেছে স্কুলের দাদাদের কাছ থেকে শেখা এই নিরীহ বিস্ফোরক খেলনায়। এখন এই উগ্রতার প্রতি ওর অবচেতনের আকর্ষণ বয়স বাড়ার সাথে সাথে কমে গেলেই হয়।
মাসিমা ততক্ষণে কানাইকে কাছে টেনে নিয়ে বলতে শুরু করেছেন— ‘আগুন নিয়ে খেলতে নেই দাদুভাই। তুমি তো জানো না, যদি বড়ো কোনো কাণ্ড ঘটে যেত।’
কানাই করুণ স্বরে বলল— ‘আমি তো মজা করার জন্যেই বানিয়েছি।’
রজনী জানে যে এইসব ক্ষেত্রে বকাঝকা করলে বাচ্চাদের আরও জেদ চেপে যায়। তাই মাসিমা যা করলেন সেটাই ঠিক পথ। তাই সে আবার মুড়ির বাটি হাতে তুলে নিয়ে বললে— ‘ঠিক আছে, যাও। এবার একটু বই নিয়ে বসো। আমি আসছি।’
মুড়ি খেতে খেতে রজনী ভাবতে থাকে, সেও ছোটোবেলায় গ্রামে থাকতে শিখেছিল বোতলে কেরোসিন ভরে তাতে পলতে লাগিয়ে কীভাবে ছুঁড়ে মেরে কোনো কিছুতে আগুন ধরাতে হয়। সেইভাবেই সেনবাড়িতে রাখা শ্যামাদাসের বোমা-বারুদের স্তূপে পল্টু, পটাই আর নেলোকে দিয়ে আগুন ধরিয়েছিল সে।
তবে আজ যুগ পালটেছে। কেরোসিনের বদলে কানাইয়ের হাতে উঠেছে কেমিক্যালস।… তাই ভয় হয়। বড়ো ভয় হয় রজনীর।
.
পরের দিন অফিস থেকে ফিরে ধোপদুরস্ত জামাকাপড় পরে চা-মুড়ি খেয়ে রজনী রেডি। আজ আর সে তার ঝোলা ব্যাগটা নেয়নি, কারণ ওতে যা আছে তা নিয়ে ওখানে যাওয়া যাবে না। তাই রোজকার মতোই ব্যাগটা বন্দি রইল তার টিনের তোরঙ্গে। শুধু চিঠিদুটো আর অটোগ্রাফের খাতা আর একটা ভালো কলম সঙ্গে নিল সে।
কানাইও যাবার জন্যে বায়না ধরেছিল; কিন্তু মেসোমশাই বললেন— ‘ওসব রাজনীতির ব্যাপার দাদাভাই। তাই ওখানে শুধু বড়োদেরই যেতে দেয়।’
তবুও একটু অভিমান করে সে বলে— ‘আমি তো গোপাল জেঠুর কাছেও গিয়েছিলাম। স্যারই তো নিয়ে গিয়েছিল।’
কানাইয়ের এই অভিমান বুঝতে পারে রজনী। বলে— ‘গোপালদার অফিস আর গান্ধীজির বাড়ি কি এক হল? তা ছাড়া সব জায়গায় তো ছোটোদের যেতে দেয় না। ঠিক আছে আমি না হয় কাল অফিস থেকে ফেরার সময় তোর জন্যে একটা অটোগ্রাফ খাতা কিনে আনবো।’
কথাটা চুপচাপ মেনে নেয় কানাই আর রজনীও বেরিয়ে পড়ে। তারপর যথারীতি ঠিক সময়ে বেলেঘাটায় পৌঁছেও যায় সে।
.
বেলেঘাটার মিঞাবাগানের হায়দারি মঞ্জিলের সামনে সিকিওরিটি বেল্টে পৌঁছতেই পুলিশ আটকায় তাকে। পাশে একটা পুলিশ জিপ দাঁড় করানো আছে। তা থেকে ঘড়ঘড় শব্দে ভেসে আসছে ওয়্যারলেসের নানান বার্তা। সেটার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইনস্পেকটর গোছের কেউ একজন এগিয়ে এল তার কাছে। সেই অফিসার কোনো কথা বলার আগেই রজনী পকেট থেকে ড্যানীবাবুর লেখা চিঠিদুটো বের করে দেয় তাঁর হাতে। সেইসঙ্গে বলে— ‘আমি গান্ধীজির অটোগ্রাফ নিতে এসেছি। অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া আছে। আপনাদের স্পেশাল ব্রাঞ্চের ডিসি আর বাপুজির সেক্রেটারি জানেন। ডিসিকে লেখা চিঠিতে অ্যাপ্রুভাল অর্ডারও নেওয়া আছে।’
—‘আচ্ছা, একটু দাঁড়ান। ভেরিফাই করে নিই।’ বলে একজন কনস্টেবলের হাতে কল্যাণমের চিঠিটা ধরিয়ে দিয়ে বলে— ‘এটা ওনাকে দিয়ে বলবে যে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা আছে। পার্টি দেখা করতে এসেছে।’ তারপরে আর একজন কনস্টেবলকে ডেকে বলে— ‘এনাকে একবার সার্চ করে নিন। আমি ডিসি সায়েবকে দিয়ে কনফার্মড করিয়ে নিচ্ছি।’ বলে ইনস্পেকটর চলে যায় খানিক দূরের বাড়িটার দিকে।
কনস্টেবল রজনীর সারা গায়ে হাত বুলিয়ে দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে বলল— ‘একটু ওয়েট করুন। স্যার এলে যেতে পারবেন।’
অপেক্ষা করতে করতেই রজনী দেখল ইনস্পেকটর ভদ্রলোক ওই বাড়ির খানিক আগে দাঁড়ানো একজন পদস্থ অফিসারকে চিঠিটা দেখাল। প্রায় ছ-ফুট লম্বা সেই সৌম্যদর্শন অফিসার আর কেউ নন, আমাদের নির্মল সেন। এখন কোনো চাপ নেই; তাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উনি ভাবছিলেন বন্ধু নিখিলেশের কথা। সে এখন ঢাকায় গেছে স্কুপের সন্ধানে, আর পলিটিক্যাল স্কুপ তো প্রায় থাকেই না। তাই অনেকদিন দেখাসাক্ষাৎ হয়নি। এখন হাতে দেওয়া চিঠিটা পড়ে সেটা ইনস্পেকটরকে ফেরত দিয়ে সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে কিছু বললেন। তারপর ইনস্পেকটর ফিরে এসে রজনীকে বলল— ‘আরেকটু দাঁড়াতে হবে। গান্ধীজির ওখান থেকে কী উত্তর আসে দেখি। বাব্বাঃ, এ তো খোদ ডাক্তার রায়ের রেকমেন্ডেশন দেখছি। তা পার্টি করেন নাকি?’
—‘আজ্ঞে না, আমি মিউজিয়মে কাজ করি। এই যে আমার আইডেন্টিটি কার্ড।’ বলে পকেট থেকে কার্ডটা বের করে রজনী।
—‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, রেখে দিন।’
একটু পরেই যে লোকটা কল্যাণমের চিঠি নিয়ে গিয়েছিল, সে ফিরে এসে বলল—‘ভেতরে গিয়ে স্যারকে চিঠিটা দেখাবেন। যান।’
চিঠিটা নিয়ে রজনী এগিয়ে গিয়ে বাড়িতে ঢোকে। বাইরের অফিসঘরে গান্ধীজির সেক্রেটারি কল্যাণমকে ‘নমস্তে’ বলে চিঠিটা দেখায়। চিঠির এককোণে ওনার ইনিসিয়াল ছিল। সেটা দেখে উনি অফিসের অন্য টেবিলে বসা একজনকে চিঠিটা দেন। এই দ্বিতীয় ব্যক্তি চিঠিটা থেকে রজনীর নাম, ঠিকানা, পেশা, উদ্দেশ্য ইত্যাদি ভিজিটার্স বুকে লিখে রজনীকে দিয়ে সই করায়। তারপরে চিঠিটায় ‘অ্যালাউড’ লেখা স্ট্যাম্প মেরে রজনীর হাতে দিয়ে বলে— ‘ভেতরে যান। দশ মিনিট সময় পাবেন। আর হ্যাঁ, বাপুজিকে ছোঁওয়ার চেষ্টা করবেন না।’
খানিকটা বারান্দা পেরিয়ে বাপুজির ঘর। তার দরজার সামনে একজন দাঁড়িয়ে। সম্ভবত সাদা পোশাকের পুলিশই হবে। সে চিঠিটা দেখতে চায়। সেটা দেখে সন্তুষ্ট হয়ে একটা কাঁটা ফাইলে সেটা গেঁথে রেখে বলে— ‘যান’।
ভেতরে ঢুকে রজনী দেখে সাদা ফরাসের ওপরে পা দুটো পাশের দিকে ভাঁজ করে বসে গান্ধীজি একটা নীচু ডেস্কের ওপরে রাখা কিছু কাগজ পড়ছেন মনোযোগ দিয়ে। ঘরের এককোণে একটা চরকা রাখা। গান্ধীজির বাঁ-পাশে খানিক দূরে বসে সুরাওর্দী।
সে ধীরপায়ে এগিয়ে যায় গান্ধীজির দিকে। হাঁটু মুড়ে বসে জাতির জনকের সামনে। গান্ধীজি এবারে কাগজটা উলটে পরের পাতাটা পড়তে থাকেন। অটোগ্রাফের খাতা হাতে নিয়ে চুপ করে বসে থাকে রজনী। তার মনে হয়— তার খাতাটা নিয়ে কল্যাণমের লোকই তো সই করিয়ে আনতে পারত। কিন্তু তাকে এতোদূর অ্যালাউ করা হয়েছে কেন? এ নিশ্চয়ই ডাক্তার রায়ের রেকমেন্ডেশনের জোর, কিংবা তার কপালের।
এদিকে মিনিট তিনেক হয়ে গেল সে বসে। বাপুজি কাজে মগ্ন। তাঁকে সামনা সামনি দেখে রজনী এখন বুঝতে পারছে, কেন লোকে ওনাকে এত সম্মান করে। উনি যেন ধ্যানমগ্ন এক সন্ন্যাসী। ইচ্ছে হলেই উনি আরামে, বিলাসে জীবন কাটাতে পারতেন। মহামূল্য পোশাক পরে মহার্ঘ্য গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়াতে পারতেন। কিন্তু সে পথ না মাড়িয়ে এই জ্ঞানী বৃদ্ধের জীবনদর্শন হল— ‘আরাম হারাম হ্যায়।’ তাই বুঝি এই বৃদ্ধ বয়সেও উনি অহর্নিশ কাজ করে চলেন, আচ্ছা আচ্ছা যুবকেরাও হার মানে তাঁর চলার বেগের কাছে। এমনই ফিটনেস এখনও।
এমন সময় গান্ধীজির হুঁশ ফিরল। যে কাগজটা পড়ছিলেন তার নীচে সই করে পাশে রাখা একটা পেপার ওয়েট নিয়ে সেটা দিয়ে কাগজটা চাপা দিয়ে বললেন— ‘ক্যা চাহিয়ে বেটা?’
রজনী অটোগ্রাফের খাতাটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে— ‘বাপুজি, অটোগ্রাফ।’
গান্ধীজি খাতাটা নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন— ‘তুমহারা নাম ক্যা হ্যায় বেটা?’
—‘রজনীকান্ত রায়, বাপুজি।’
তারপরে উনি প্রথম পাতাতে ইংরাজিতে লিখলেন— ‘ডিয়ার রজনীকান্ত, মেক ইন্ডিয়া এ গ্রেট নেশন’ আর তার নীচে ইংরাজিতেই সই করে খাতাটা সুরাওর্দীর দিকে বাড়িয়ে ধরে মৃদু হেসে বললেন— ‘তুম ভি এক অটোগ্রাফ দে দো, সি এম।’
খাতাটা নিয়ে মৃদু হেসে সুরাওর্দী বাংলায় লিখলেন— ‘রজনীকান্তকে হার্দিক শুভেচ্ছাসহ’। তবে তার নীচে সই করলেন ইংরাজিতেই।
খাতাটা নিয়ে দু-জনকে হাতজোড় করে নমস্কার করে রজনী উঠে দাঁড়াল। দু-জনেই প্রতিনমস্কার জানালেন। তারপরে ঘরের বাইরে এসে রজনী কল্যাণমের সহকারীকে বললে কল্যাণমকে দিয়ে একটা সই করিয়ে দিতে। কল্যাণমকে সরাসরি বলতে তার সাহস হল না। সহকারী অটোগ্রাফ খাতাটা নিয়ে উঠে গিয়ে তাঁর টেবিলে গিয়ে কিছু বলতেই কল্যাণম একবার চোখ তুলে দেখলেন রজনীকে। আগের পাতাদুটো উলটেপালটে দেখে খসখস করে সই দিয়ে খাতাটা ফেরত দিয়ে দিলেন সহকারীকে।
তারপর? তারপরে আচম্বিতেই ঘটে গেল ঘটনাটা। বাইরে থেকে একটা সমবেত চিৎকার শোনা গেল। তার পরক্ষণেই দড়াম করে জানলার কাঁচে এসে লাগল একটা কিছু। ঝনঝনিয়ে ভেঙে পড়ল কাঁচটা। ছড়িয়ে গেল অফিসঘরের মেঝেতে।
ঘটনার আকস্মিকতায় বিহ্বল সবাই। কল্যাণম আর তাঁর সহকারী উঠে দাঁড়িয়েছেন। বাইরে থেকে ভেসে আসছে উন্মত্ত জনতার চিৎকার। তার মানে, যে অল্পসংখ্যক পুলিশ বাইরের সিকিওরিটির ব্যবস্থায় ছিল, তাদের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি এই ক্ষিপ্ত জনতাকে। প্রবল ক্ষোভের ধাক্কায় ভেঙে গেছে তাদের পলকা প্রতিরোধের বেড়া। দাঙ্গার সময় থেকেই জনতার মধ্যে একটা চাপা ক্ষোভ ছিলই। কিন্তু কোনো কারণে সেটা যে হঠাৎ এত তীব্র হতে পারে তা পুলিশ আগে আন্দাজ করতে পারেনি।
এদিকে বাইরের বিক্ষুব্ধ জনতা ঢুকতে চায় ভেতরে। একসময় তারা দু-চারজন ঢুকেও পড়ে অফিসঘরের সামনের দিকে। হকিস্টিক, লাঠি আর পাথরের আঘাতে চূর্ণ হতে থাকে দেওয়ালে টাঙানো ছবি, টেবিল, চেয়ার। হাওয়ায় উড়তে থাকে টেবিলের কাগজপত্র। জনতার ক্ষোভ এখন পরিণত হয়েছে আক্রোশে। তাই ক্ষিপ্ত জনতা চিৎকার করতে থাকে। সেই চিৎকার থেকে রজনী যেটুকু বুঝতে পারে, তা হল— কাঁচড়াপাড়ার এক মসজিদের আজানের সময় দু-সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। সেই সংঘর্ষ ক্রমে এমনই সাংঘাতিক হয়ে ওঠে যে বাধ্য হয়ে সেখানে পুলিশকে গুলি চালাতে হয়। তাতে নাকি কয়েকজনের মৃত্যু ঘটে। আর তারই ফলে উন্মত্ত জনতা চায় সুরাওর্দীকে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হোক।
তবুও অফিসঘরের মুখে বাকি যে ক-জন পুলিশ ছিল, তারা আপ্রাণ চেষ্টা করছে অফিসঘর থেকে জনতাকে বের করে দিতে। একসময় অফিসঘরের মুখে তারা জনতাকে আটকে রাখতে সমর্থও হয়। ওদিকে অবস্থার গুরুত্ব বুঝে ডিসি অ্যান্টি-রায়ট ফোর্স চেয়ে ওয়্যারলেসে খবর পাঠান। গতিক সুবিধের নয় বুঝে কল্যাণম তাঁর সহকারীকে নিয়ে গান্ধীজিকে খবর দিতে ভেতরের ঘরে যান। তাঁর কাছে সব শুনে একটু পরেই গান্ধীজি বেরিয়ে আসেন। এখন তিনি রজনীর ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে। জনা চারেক লাঠিধারী পুলিশ ঘিরে রেখেছে তাঁকে। রজনী যে পাশেই দাঁড়িয়ে আছে, সে খেয়ালই নেই তাদের। এদিকে ক্রোধান্ধ জনতা ক্রমাগত দাবি করে যাচ্ছে সুরাওর্দীকে তাদের হাতে তুলে দেবার জন্যে।
গান্ধীজি হাতজোড় করে জনতাকে শান্ত হতে বলছেন, কিন্তু তাদের চিৎকারে বাতাসেই হারিয়ে যাচ্ছে তাঁর কথা। তা ছাড়া যদিও বা তারা তাঁর কথা শুনতে পেত, তবুও তারা থামত কি? আর তাই বাইরে থেকে ছুটে আসা ইঁটের আঘাতে গান্ধীজিকে আগলে রাখা দু-জন পুলিশ মাথা চেপে ধরে বসে পড়েছে মাটিতে। বাকি দু-জনও উদ্ভ্রান্ত। তারা তাদের আহত সহকর্মীদের সরাবে, নাকি বাপুকে রক্ষা করবে? কল্যাণমও বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছেন গান্ধীজির ঠিক পিছনেই।
এমনসময় রজনী হঠাৎ দেখে একটা আধলা ইঁট ছুটে আসছে গান্ধীজির দিকে। সে খপ করে ধরে ফেলে সেটা। পরক্ষণেই আর একটা আধলা। গান্ধীজি আর কল্যাণম কোনোরকমে মাথা সরিয়ে নিতেই সেটা গিয়ে আছড়ে পড়ল ঘরের জানলার শার্সিতে।
একের পর এক আধলা ইঁট আর পাথর ছুটে আসছে বাপুর দিকে। যেকোনো মুহূর্তে সেগুলো আঘাত করতে পারে তাঁকে। উন্মত্ত জনতা আজ গান্ধীজিকেও রেয়াত করছে না। ওই যে আবারও দুটো আধলা পথভুলে ছুটে আসছে রজনীর দিকে। রজনী তার একটাকে আটকায় হাত দিয়ে, কিন্তু আরেকটা এসে আঘাত করে তার কাঁধে। সেসবে আমল না দিয়ে সে কল্যাণমকে বলে গান্ধীজিকে ভেতরে নিয়ে যেতে আর নিজের শরীর দিয়ে আড়াল করে দাঁড়ায় তাঁদের। রজনীর কথা শুনে কল্যাণম যতক্ষণে বাপুজিকে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছেন, ততক্ষণে রজনীর পিঠে আছড়ে পড়েছে গোটাকয়েক আধলা ইঁট আর পাথর।
এদিকে অফিসঘরের মুখের পুলিশেরাও প্রাণ বাঁচাতে পালিয়েছে আর কল্যাণমও ভেতরের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। এদিকে ক্ষিপ্ত জনতা ঢুকে পড়েছে অফিসঘরে। এখন এই উন্মত্ত আক্রোশের পরিধির বাইরে যেতে হবে তাকে। ঠেলাঠেলি করে দরজা দিয়ে ঢুকছে লোক। তাদের লক্ষ্য ওই বন্ধ দরজার দিকে যার আড়ালে এখন আছেন সুরাওর্দী। রজনী বা বাকি পুলিশ তাদের লক্ষ্য নয় আর সেই সুযোগটাই নেয় রজনী। সে অফিসঘরের একটা থামের আড়ালে গিয়ে তেড়ে আসা একটা লোকের পাঁজরে সজোরে একটা কিক করে। লোকটা পড়ে যায় মাটিতে। তার হাতের হকিস্টিকটা ছিটকে পড়ে মাটিতে। অন্য লোকেরা তা খেয়ালই করে না। তারা এখন রাগে অন্ধ। রাগের চোটে ধেয়ে আসা পেছনের লোক হুমড়ি খেয়ে এসে পড়ছে সামনের জনের গায়ে। কিন্তু তাতে তাদের ভ্রুক্ষেপ নেই। তারা তাদের রাগ মেটাতে হাতের সামনে যা পাচ্ছে তাইই ভাঙছে। আর তাদের সেই বিশৃঙ্খলতার সুযোগ নিয়েই রজনী তুলে নেয় মাটিতে পড়ে থাকা স্টিকটা। সেটা দিয়ে দেওয়ালে, বন্ধ দরজায় আর ভাঙা আসবাবপত্রে পেটাতে পেটাতে ক্রমশ অফিসঘরের খোলা দরজার দিকে এগোতে থাকে। রাগে পাগল জনতা তার এই ভাণ বুঝতে পারে না। কে কাকে খেয়াল করছে তখন? এইরকমভাবেই একসময় দরজা দিয়ে বেরিয়ে উন্মত্ততার অভিনয় করতে করতে বাইরে জড়ো হওয়া জনতার বেষ্টনির বাইরে বেরিয়ে আসে সে। তারপরে খানিকটা দূরে এসে হাতের হকিস্টিকটা ছুঁড়ে ফেলে দেয় আর বাঁ-দিকের একটা গলিতে ঢুকে পড়ে। এখানে কেউ নেই। এই গলিটাই একটু দূর দিয়ে ঘুরে বাড়ির পেছন দিক দিয়ে পাক মেরে গিয়ে মিশেছে বড়ো রাস্তায়। রজনী সেইপথেই রাতের বাতাসে ভেসে আসা উন্মত্ততার আওয়াজ শুনতে শুনতে এগিয়ে চলে বড়ো রাস্তার দিকে। যেতে যেতে একসময় প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে দেখে নেয় অটোগ্রাফের খাতাটা। না, সেটা ঠিকই আছে, শুধু ডামাডোলের মাঝে পড়ে একটু বেঁকে গেছে।
বড়ো রাস্তায় আসতেই সে শুনতে পেল দুম-দুম করে কয়েকটা চাপা আওয়াজ। না, এগুলো হাতবোমার বা ফায়ারিংয়ের শব্দ নয়। ধর্মতলার মিছিলে একসময় সে এই আওয়াজ শুনেছে। টিয়ার-শেল ছোঁড়ার শব্দ। রজনী বুঝতে পারল যে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে অ্যান্টি-রায়ট ফোর্স কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়েছে। তাই হনহনিয়ে হাঁটতে থাকে সে। কিন্তু একটু পরেই বুঝতে পারে যে তার চোখদুটোও জ্বলছে। জল কাটছে। এখন যে করেই হোক গান্ধীজির বাড়ির দিক থেকে ধেয়ে আসা হাওয়ার বাইরে বেরোতেই হবে তাকে। তাই রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে সে কোনোরকমে বড়ো রাস্তাটা পার হয়ে গিয়ে একটা রাস্তা ধোয়ার চাপাকলের কাছে পৌঁছয়। তখনও সেটা থেকে গলগল করে গঙ্গার জল বেরোচ্ছে। কলটার পাশে বসে পড়ে সেই জলেরই ঝাপটা দিতে থাকে চোখে। বেশ ভালো করে কয়েকবার ধোওয়ার পরে বুঝতে পারে যে জ্বালাটা ক্রমশ কমছে। তাই ভেজা রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে উঠে দাঁড়ায় রজনী।
তার মনে হতে থাকে— এই অরাজকতা, এই সাম্প্রদায়িক হানাহানি, এই গণহিস্টিরিয়া কবে কমবে? এভাবেই কি আসবে স্বাধীনতা? জানে না। এর উত্তর সে জানে না। তাহলে জানে কে?… সব বিখ্যাত রাজনৈতিক মুখগুলোই যেন ক্রমে ক্রমে মুখোশ হয়ে যাচ্ছে।
তবে সেইসঙ্গে একটা গভীর সুখও পাচ্ছে সে। একসময় পরিস্থিতির চাপে কয়েকজন মানুষের প্রাণ নিতে হয়েছিল তাকে; কিন্তু মানুষের প্রাণরক্ষা করাতে যে এত তৃপ্তি তা সে আগে জানত না। তাই তার পিঠে লাগা ইঁট-পাথরের আঘাতের ব্যথাও এখন তার কাছে তুচ্ছ। এই ব্যথা যেন তার কাছে কোনো স্নেহময় হাতের স্পর্শের পেলব অনুভূতি। একটা আশীর্বাদ। ব্যথা তো ক-দিন পরে কমে যাবেই; কিন্তু তার এই আত্মতৃপ্তিটা থেকে যাবে আজীবন।
