২৪-২৫ ডিসেম্বর, ১৯৪৪ – আচার চোর, পার্ক স্ট্রিটের কালো কুমির আর সুবচনীর হাঁস
কেষ্টদা দরজা খুলে দিতেই শোনা গেল মেসোমশাইয়ের গলা— ‘কে? রজনী নাকি?’
—‘হ্যাঁ, মেসোমশাই।’
—‘শোনো, সুবিমল ফোন করেছিল তুমি দেশের বাড়ি থেকে ফিরেছ কি না জানতে। তা আমি হ্যাঁ বলতে ও বলল যে তুমি ফিরলে ওকে যেন একটা ফোন কর।’
—‘আচ্ছা মেসোমশাই করছি।’
—‘যাও। ফোনের কাছে আমি ওর বাড়ির নম্বরটা একটা কাগজে লিখে রেখেছি। নাকি তুমি ওর নম্বরটা জানো?’
—‘ওর নম্বরটা আমার কাছে আছে। ঠিক আছে, আমি কল করছি। আর এই কানাই, চাবিটা নিয়ে ওপরে গিয়ে জামাকাপড় পালটে মুখ হাত ধো। আমি ফোনটা করে আসছি।’ কানাইয়ের হাতে চাবিটা দিতেই ও ছুট্টে চলে যায় ওপরে আর রজনী বসার ঘরে ঢোকে ফোন করতে।
মিনিট দশেক কথা বলে সে যখন বেরিয়ে আসছে তখন মেসোমশাই বললেন—‘কী? কথা হল?’
—‘ও নাকি কাল বউ আর মেয়েকে নিয়ে সকালে আপনার এখানে আসছে?’
মিটিমিটি হেসে মেসোমশাই বললেন— ‘আমি ইচ্ছে করেই তোমাকে বলিনি। সারপ্রাইজ। বুঝলে? তা কাল তো বড়োদিন। ওরা না এলে বাড়িটা কেমন ম্যাড়মেড়ে হয়ে থাকত। কাল কিন্তু একটু ভালোমন্দ খাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। দুপুরবেলা খেয়েদেয়ে তারপরে তোমরা না হয় পার্ক স্ট্রিটে ঘুরেটুরে এসো।’
—‘হ্যাঁ মেসোমশাই, ওরও সেরকমই ইচ্ছে।’
—‘তা রজনী, কানুবাবু কোথায় গেল?’ গলাটা মাসিমার। উনি রজনীর গলা শুনে বেরিয়ে এসেছেন। গায়ে একটা শাল।
—‘একবার ডাকো দেখি তাকে। কেমন বেড়াল শুনি।’
রজনী হাঁক দেয়— ‘কানাই, এই কানাই, নীচে আয় তো একবার। ঠাম্মি ডাকছেন।’
ধুপ ধুপ করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল কানাই। এতক্ষণে তার জামাকাপড় পালটানো হয়ে গেছে। জল দিয়ে চুল হালকা করে ভিজিয়ে, আঁচড়ে পরিপাটি সে।
সে নেমে আসতেই মাসিমা বলেন— ‘এসো গো গোঠের কানু। একটু গল্প শুনি তোমার কাছে। কেমন দেখলে সব?’ বলে কানাইকে নিয়ে ঘরে ঢুকে গেলেন মাসিমা।
এদিকে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে রজনী ভাবতে লাগল— কানাইয়ের গা থেকে সে খুব হালকা আমের আচারের গন্ধ পেয়েছে। কিন্তু কোথা থেকে এল সে গন্ধ? একটু তদন্ত করতে হয়। তাই ঘরে না ঢুকে সে পাশে ছাদে যাবার সিঁড়ির পথ ধরল। দরজায় শিকল তোলা। শিকল খুলে সে ছাদে এসেই বুঝতে পারল যে ছাদে খান তিনেক আচারের বয়াম রাখা। রোদ খাওয়ার জন্যেই এগুলো রাখা থাকে ছাদে। ঝুঁকে পড়ে সে দেখল, তিনটে বয়ামের মুখই সাদা কাপড় দিয়ে বাঁধা। শুঁকে দেখল— একটায় আমের, একটায় কুলের আর একটায় লেবুর আচার রাখা। রজনী ভালো করে বয়ামগুলো দেখে। নিঁখুত করেই বাঁধা বোতলের মুখ। দেখে বোঝারই উপায় নেই যে কেউ খুলেছিল। তবে সে বুঝে গেছে এই কীর্তি কার। মিনিট পনেরোতেই কাজটা সেরেছে নিখুঁতভাবে।
ছাদ থেকে নেমে এসে মুখ হাত ধুয়ে একটা ম্যাগাজিন নিয়ে বসতেই কেষ্টদা এসে চা দিয়ে গেল। মিনিট পনেরো পরে চা শেষ করে কাপ-প্লেট টেবিলে রাখতেই কানাই এসে হাজির। হাতে তার একটা বই।
রজনী হাতের ম্যাগাজিনটা টেবিলে রেখে বলল—‘গল্প হল?’
কানাই হেসে বলল— ‘হ্যাঁ, অনেক। জানো ঠাম্মি না আমাকে চারটে ক্রিম বিস্কুট দিয়েছে।’
—‘তাই যখন দিল, তখন আমের আচার খাবার শখ হলে সেটা তো ঠাম্মিকেই বলতে পারতিস।’ একটু গম্ভীর ভাবে বলে রজনী।
—‘আর কখনো হবে না স্যার। আমি বয়ামের মুখ যেমনভাবে বাঁধা ছিল, তেমনভাবেই বেঁধে দিয়েছি। কেউ কিচ্ছু বুঝতে পারবে না।’
—‘ঠিক আছে। আর করবি না কিন্তু। ইচ্ছে হোলে ঠাম্মির কাছ থেকে চেয়ে নিবি।’
একটু চুপচাপ থেকে কানাই একটা গল্পের বই পড়তে শুরু করে। ঠাম্মি তাকে এটা দিয়েছে। অবন ঠাকুরের লেখা ‘বুড়ো আংলা’। আর রজনী ভাবতে থাকে কানাইয়ের স্কিলের কথা। ওইটুকু সময়ের মধ্যে সে জামাকাপড় পালটেছে, মুখ-হাত ধুয়েছে, নিঃশব্দে ছাদে উঠে আচার খেয়েছে আর ছাদের অন্ধকারেও আচার নিয়ে আবার নিঁখুত করে বেঁধে রেখেছে বয়ামের মুখ। এমনকী তারপরে হাতমুখ পরিষ্কার করে নীচেও নেমে এসেছে সে।
কানাইয়ের মধ্যে সে যেন কিছু একটা দেখতে পাচ্ছে।
.
পরের দিন। বড়োদিন। হই হই করে সকাল ন-টার মধ্যেই বউবাজারের বাড়িতে সুবিমল এসে পড়েছে তার পরিবার নিয়ে। সঙ্গে এনেছে ফ্রুট কেক আর প্যাস্ট্রি। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই তার মেয়ে সুরঞ্জনার সঙ্গে কানাইয়ের জমে গেছে বেশ। বড়ো দাদার মতো হাবভাব এখন কানাইয়ের। মাঝে মাঝে বোনকে শাসন করছে সে, আবার আদরও করছে। তবে রজনী তাদের ছাদে যেতে বারণ করে দিয়েছে।
কড়াইশুঁটির কচুরি, আলুর দম আর মোয়া দিয়ে জমিয়ে জলখাবার। বোন ঠিকমতো খেতে পারছে না দেখে কানাই সুবিমলের স্ত্রীর উদ্দেশ্যে হাঁক পাড়ে— ‘ও কাকিমা, বোন সব ফেলে ছড়াচ্ছে। ওকে খাইয়ে দাও না।’ কাকিমা অঞ্জনা এসে খাওয়াতে শুরু করে মেয়েকে। বলে— ‘বাড়িতে একা একা খাস কি করে? তখন কি আমি সবসময় থাকি?’ বোনও ছাড়বার পাত্রী নয়। বলে— ‘তকোন কি তুমি কতুলি দাও আমাকে?’
যাইহোক, দুপুরবেলা ফুলকপির তরকারি, খাসির মাংস, ভাত আর আরও কতকিছু খেয়ে দাদু-দিদা বাদে আর সবাই মিলে একটা ট্যাক্সি ডেকে পৌঁছে গেল ‘লাইটহাউস’ সিনেমার সামনে। সেখানে চলছে ওয়াল্ট ডিজনির ছবি ‘পিনোচ্চিও’। এর আগে শীতকালে দু-একবার গ্রামের মাঠে পর্দা খাটিয়ে যে সিনেমা দেখানো হত তা দেখেছে কানাই। কিন্তু অ্যানিমেটেড সিনেমা কখনো দেখেনি। তাই রজনীর পাশে বসে হাঁ করে গিলতে থাকে। মাঝে একফাঁকে রজনী তাকে জিজ্ঞেস করেছিল— ‘কী রে? কেমন লাগছে?’ পর্দা থেকে চোখ না সরিয়ে সামান্য বিরক্তি মিশিয়ে কানাই বলেছিল— ‘উফ, সিনেমাটা দেখতে দাও। ডিসটাব করো না।’ রজনী মজাই পেয়েছিল কানাইয়ের এই বিরক্তিতে। ও সিনেমার ইংরাজি ভাষা বুঝতে পারছে না ঠিকই; কিন্তু ছবির ভাষা বুঝতে পারছে সে। এখানেই ডিজনি সায়েবের কেরামতি।
ছোটো ছবি। তাই মাঝখানে কোনো ইন্টারভাল না দিয়েই একেবারে টানা চলে শেষ হল সিনেমা। হল থেকে বেরিয়ে সুবিমল জিজ্ঞেস করলে— ‘তা কানাইবাবু, কেমন লাগল সিনেমা?’ দু-হাত তুলে আড়মোড়া ভেঙে কানাই লাজুক হেসে বলল—‘দারুণ কাকু।’ রজনী বলল— ‘এই, কাকুকে ‘‘থ্যাঙ্ক ইউ’’ বল।’
—‘থ্যাঙ্ক ইউ, কাকু।’
—‘ওয়েলকাম মাই সন।’ কানাইয়ের কাঁধ ধরে কাছে টেনে নিয়ে একটু আদরের চাপ দিল সুবিমল।
এরপরে ফুচকা খাওয়ার পালা। কানাই আগে কখনো খায়নি। তাই প্রথমবারে ফুচকা দিতেই শালপাতার ঠোঙার তলা দিয়ে গড়িয়ে পড়া টকজল তার সোয়েটারের বুকের কাছটা ভিজিয়ে দিল।
রজনী বলল— ‘সামলে খা। এই দেখ, কেমন করে একটু ঝুঁকে মুখে তুললে জামায় জল পড়বে না।’ বলে নিজেই একটা ফুচকা মুখে পুরলো।
ব্যাস, আর দেখতে হল না। তার শালপাতায় ফুচকা পড়লেই কানাই তা মসৃণভাবে চালান করে দিচ্ছে মুখে আর মনে মনে ভাবছে— যাই বল বাপু, কলকাতার সেরা খাবার এটাই। যেন কলকাতার সব খাবারই চেখে দেখেছে সে।
ফুচকাপর্ব শেষ হতে সুবিমল অঞ্জনাকে জিজ্ঞেস করলে— ‘হ্যাঁগো, এবার কোথায় যাবে বল।’
—‘কোথায় আবার? সোজা পার্ক স্ট্রিট।’ কর্ত্রীর জবাব।
.
এবারে ছ্যাকরা গাড়িতে চেপে পার্ক স্ট্রিটের মুখে। গাড়ি থেকে নেমে কানাইয়ের মনে হল এটাই কলকাতার সেরা জায়গা। বাব্বাঃ, কত সুন্দর সুন্দর দোকান। কাঁচের ভেতর দিয়ে দেখা যায় টিমটিম করে আলো জ্বলছে ভেতরে। রজনী বলল— ‘জানিস কানাই, এগুলো কলকাতার সবচেয়ে নামিদামি খাওয়ার জায়গা।’
সুবিমল বলল— ‘ব্ল্যাকআউট চলছে। নইলে সারা ডিসেম্বর আর জানুয়ারি মাস রঙিন আলোয় ঝলমল করত এই রাস্তা।’
অঞ্জনা বলল— ‘কানাইয়ের ব্যাড লাক। প্রথমবার এল, কিন্তু পার্ক স্ট্রিটের সেই জমকালো সাজ দেখতে পেল না।’
কানাইয়ের মনে কিন্তু কোনো বিষণ্ণভাব নেই। সে তো আর জানে না আলোয় রঙিন পার্ক স্ট্রিটের সৌন্দর্য কেমন। তাই যা দেখছে তাতেই খুব খুশি সে। সে জানে কলকাতায় যখন থাকছে, তখন আরও কতকিছু দেখবে সে। অল্পে সন্তুষ্ট থাকার অভ্যেসটা তো তার তৈরি হয়ে গেছে এতদিনের গ্রাম্যজীবনে।
ফুটপাথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিল তারা। খেলনাওয়ালা ফেরি করছে রংবেরঙের মুখোশ, টিনের খেলনা, তালপাতার তৈরি ডোরাকাটা লম্বা ভেঁপু। একটা লম্বা লাঠিতে খড় জড়িয়ে তাতে আটকানো খেলনাগুলো। খেলনাওয়ালা মাঝে মাঝেই ভেঁপু বাজাচ্ছে।
আরেকজন খেলনাওয়ালা হাতের কাঠির টানে ফুটপাথে ঘুরপাক খাওয়াচ্ছে খাঁজকাটা কালো কাগজের তৈরি কুমির। এঁকেবেঁকে তাদের পায়ের সামনে দিয়েই ঘোরাচ্ছে সেটা। সেটা দেখে ভয় পেয়ে ছোট্ট সুরঞ্জনা জড়িয়ে ধরে তার দাদাকে। খেলনাওয়ালার হাতের টানে সাঁ করে তাদের পায়ের সামনে বাঁক খেয়ে যায় কুমিরটা। কানাই বোনকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেয়— ‘দূর বোকা, ভয় পাচ্ছিস কেন? ওটা তো কাগজের কুমির।’
তবে বেশ খানিকটা সময় দাঁড়িয়ে থেকে কানাই বুঝতে চেষ্টা করে কুমির চলার রহস্য। তার কৌতূহল বুঝতে পেরেই রজনী তাকে একটা কুমির কিনে দেয় আর সুরঞ্জনাকে কিনে দেয় একটা মুখোশ আর একটা ঢোল। বলে— ‘এইগুলো সব তোদের জন্যে সান্তাক্লজের গিফট।’ সান্তাক্লজ কে আর গিফটই বা কি, তা জানে না কানাই। কিন্তু নতুন পরিচিত লোকেদের সামনে সেটা জিজ্ঞেস করতে লজ্জাবোধ হয় তার। পরে একসময় স্যারকে জিজ্ঞেস করবে সে।
কেনাকাটা হয়ে যেতে খানিকক্ষণ ঘোরাঘুরির পরে সুবিমল বলল— ‘অনেকক্ষণ তো হল। তা এবারে ফ্লুরিজে গিয়ে হালকা কিছু খেয়ে নেওয়া যাক।’ সবাই মিলে তাই ফিরতি পথে এসে পৌঁছল ফ্লুরিজে।
ঢুকতেই একটা সুন্দর গন্ধ নাকে এল কানাইয়ের। একটা টেবিলে জাঁকিয়ে বসার পর রজনী বলল— ‘সুবিমল এবারেরটা কিন্তু আমার।’
—‘অ্যাজ ইউ উইশ।’
বেয়ারা টেবিলে এসে দাঁড়াতে রজনী বলল— ‘এই, কে কী খাবে বল।’
অঞ্জনা বলল— ‘ঠান্ডায় কিন্তু হট চকোলেট জমবে ভালো।’ সুবিমলও সায় দিল তাতে।
—‘বেশ তাইই হোক।’
হট চকোলেটে চুমুক দিয়ে কানাই বুঝল সত্যিই কী অপূর্ব স্বাদ। চুমুক দিতে দিতে সবাই গল্পগুজব করছে আর কানাই ভাবছে অন্য কথা— কলকাতার সেরা খাবার কোনটা? হট চকোলেট? নাকি ফুচকা?
খাওয়া শেষ হলে রজনী ইশারায় বেয়ারাকে ডাকল। দাম মিটিয়ে টিপস দিতেই সে বলল— ‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।’
—‘ওয়েলকাম।’ সব্বাই উঠে পড়ল চেয়ার ছেড়ে। বাইরে বেরিয়ে এসেই তারা বুঝতে পারল যে ঠান্ডাটা এখন বেশ একটু বেড়েছে।
সুবিমল তার পরিবারকে নিয়ে একটা ট্যাক্সিতে উঠে বসে বলল— ‘ঠিক আছে আবার দেখা হবে অফিসে। আমি চার তারিখে আসছি।’
—‘মেসোমশাই জানে যে তুই এখান থেকে ফিরে যাবি?’
সুবিমলের জবাব ভেসে এল— ‘হ্যাঁ জানে। আচ্ছা চলি। গুড নাইট।’
.
এরপরে দু-জনে চড়ে বসল একটা ছ্যাকরা গাড়িতে। কুমিরটা উলটে-পালটে দেখতে দেখতে কানাই প্রশ্ন করে— ‘হ্যাঁ গো স্যার, সান্তাক্লজ কে গো? আর ‘‘গিফট’’ এর মানে কী?’
বউবাজার পর্যন্ত যেতে যেতে সে রজনীর মুখে শোনে সান্তাক্লজের গল্প আর মনে মনে ভাবে— ইস, যদি তার বয়স দশ বছরের কম হত তাহলে সে বারান্দায় তার নতুন কেনা মোজা ঝুলিয়ে রাখত আর সক্কালে উঠে দেখত যে সান্তাক্লজ তাতে ‘গিফট’ মানে উপহার রেখে গেছে। কিন্তু সে তো এখন বড়ো হয়ে গেছে। কী আর করা যাবে।
বাড়িতে পৌঁছে সে জামাকাপড় পালটে মুখ হাত ধুয়ে রজনীকে জিজ্ঞেস করে—‘আচ্ছা স্যার, কলকাতার লোকেরা কথায় কথায় এত ‘‘থ্যাঙ্ক ইউ’’ বলে কেন গো?’
—‘ওটা এক ধরণের ভদ্রতা জানানোর কথা। এর মানে হল ‘‘আপনাকে ধন্যবাদ’’ কিংবা ‘‘তোমাকে ধন্যবাদ’’।’
—‘ও তাইই? তা আমাদের গ্রামে কেউ এমন বলে না কেন? ভাত বেড়ে দিলে বাবা তো কই মাকে ‘‘থ্যাঙ্ক ইউ’’ বলে না?’
কি উত্তর দেবে তা বুঝে উঠতে পারে না রজনী। তাই সে চুপ করে থাকে।
তাকে চুপ করে থাকতে দেখে কানাই বলে— ‘ও বুজেছি। গ্রামের চেয়ে কলকাতার লোকেরা বেশি ভদ্র।’
এমন সময় নীচের থেকে মাসিমার হাঁক শোনা যায়— ‘এই যে গোঠের কানু, বলি খেতে হবে না? এসো, নীচে এসে একটু রাতের খাবারটা খেয়ে যাও।’
খাওয়া দাওয়া সেরে কানাই বুক পর্যন্ত লেপ চাপা দিয়ে পড়তে শুরু করে ‘বুড়ো আংলা’। সুবচনীর খোঁড়া হাঁসের পাখায় ভর করে তার মন উড়ে যেতে থাকে রিদয় হয়ে। পড়তে পড়তে ক্রমে ঘুম নেমে আসে তার ক্লান্ত চোখে। ঘুম…ঘুম…ঘুম…গভীর ঘুম…।
তার বুকের ওপরে লুটিয়ে থাকা খোলা বইটা তুলে সেটা বন্ধ করে মাথার কাছে সরিয়ে রাখে রজনী। গায়ের ওপরের লেপটা টেনে ঢেকে দেয় তার গলা পর্যন্ত। পাশ ফিরে শোয় কানাই। ছেলেটার মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড চেয়ে দেখে পরম তৃপ্তিতে ঘরের আলোটা নিভিয়ে দেয়।
কিন্তু তার কেন ঘুম আসছে না আজ? কীসের জন্যে?
