১৯৪৩, এপ্রিল – সেনেদের পোড়োবাড়ি, হিংয়ের চা আর স্বদেশি সাবান
আজ যেতে হবে জলার ধারে সেনেদের পোড়োভিটেয় শ্যামাদাসদার সঙ্গে দেখা করতে। তাই সাড়ে নটা নাগাদ রজনীকান্ত রাতের খাবার খেয়ে নিলো। দাদুর ছবির নীচে বাসনকোসনের ট্রাঙ্কের ওপরে রাখা দাদুর তোরঙ্গ। তাতে নতুন তালা লাগিয়েছে সে যাতে কেউ সেটা খুলতে না পারে। পকেট থেকে চাবি বের করে তালা খোলে রজনী। তারপর তোরঙ্গের ভেতর থেকে বের করে আনে মাথায় ভারী সীসের বল লাগানো সরু লম্বা কাছি। পুরোনো হয়েছে। তবে এখনও শক্তপোক্ত আছে। একবার সময় সুযোগ করে পালটাতে হবে কাছিটা। তোরঙ্গের তালা লাগিয়ে আবার বন্ধ করে দিল। তারপরে একের পর এক পাক মেরে পাজামার কোমরের কাছে জড়িয়ে নিলো কাছি। তার ওপরে পরে নিলো মোটা খদ্দরের পাঞ্জাবি। হয়তো এসবের কোনো দরকারই পড়বে না; তবু সাবধানের মার নেই। স্বদেশি যারা করে, তারা তো আর খুনে গুন্ডা নয়। তবু…। ঠান্ডা মাথায় ভেবেচিন্তে হাতে নিলো একটা টর্চ। এই টর্চ জ্বালানোর প্রয়োজন তার পড়বে না। সে অন্ধকারেও দিব্যি দেখতে পায়। কিন্তু তার এই বিশেষ ক্ষমতাগুলোর আঁচ সে কাউকে জানান দিতে চায় না। শুধু স্বদেশিদের কেন, সাধারণ মানুষদের চোখেও সে একজন চাকুরিজীবি আর তাইকোন্ডো শিক্ষক হয়েই থাকতে চায়।
ঘরে তালা লাগিয়ে আঙিনায় নামল রজনী। এখান থেকে মাইল দুয়েক গেলে কচুরিপানা ভরতি জলা আর তার পাশেই সেনমশাইদের পোড়ো ভিটে। গ্রাম থেকে বেশ খানিকটা দূরে হওয়ার জন্যে আর সাপখোপের ভয়ে এদিকটায় কেউ বড়ো একটা আসে না। গোপন স্বদেশি কাজকর্ম করার জন্যে বেশ ভালো জায়গাই বেচেছে শ্যামাদাসদা।
বাড়ির কাছে পৌঁছে আশপাশটা ভালো করে দেখে নিলো রজনী। জলার পাশ দিয়ে একটা মেঠোপথ চলে গেছে বাড়িটার দিকে। বড়োজোর একটা গোরুরগাড়ি যেতে পারে সেইপথে। পথের মাঝামাঝি এসে উবু হয়ে বসে রাস্তার মাটির দিকে নজর চালায় সে। কয়েকটা সাইকেলের চাকার দাগ। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বাড়িটাকে ভালো করে দেখে। ওপরের তলার জানলার খড়খড়ি অনেক ভেঙে পড়েছে, নাকি কেউ খুলে নিয়ে গেছে। একই অবস্থা নীচের তলারও।
তারপরে আস্তে আস্তে বাড়ির সদর দরজায় এসে দাঁড়ায়। দরজাটা একটু ফাঁক করে সন্তর্পণে মাথাটা গলিয়ে ভালো করে দেখে নেয়। মাঝে মস্ত উঠোন আর তার চারপাশে মোটা মোটা থামের ওপর দাঁড়িয়ে আছে দোতলাটা। সেই থামের গায়ে হেলান দিয়ে ইতিউতি রাখা তিনটে সাইকেল। সেইসঙ্গে নজরে পড়ে বাঁ-দিকের একটা দরজার দিকে। বন্ধ। তবু তার ফাঁক দিয়ে একটা সরু আলোর রেখা এসে পড়েছে উঠোনে।
এবারে সদর দরজা খুলে ইচ্ছে করেই টর্চটা জ্বালায়। সামান্য আওয়াজ করে দরজাটাও ভেজিয়ে দেয় ঘরের ভেতরের লোকেদের তার আগমন জানান দেওয়ার জন্যে। আর তারপরেই খানিক চাপা গলায় কে যেন বলে ওঠে— ‘টর্চটা নেভান। ভেতরে আসুন।’ রজনী ঘুরে দেখে, যে ঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে সে আলোর রেখা দেখেছিল সেই দরজাটা খানিক ফাঁক হয়ে গেছে আর তার সামনে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ। সে যে শ্যামাদাসের চ্যালা দিনেশ, তা আর বুঝতে বাকি থাকে না। যেন অন্ধকারে ভালো করে দেখতে পাচ্ছে না, এমন ভাণ করে ঘরের সামনে গিয়ে পৌঁছায় রজনী। দিনেশই দরজা খুলে তাকে ভেতরে যাওয়ার পথ করে দেয় আর তারপরে ঘরের দরজা ভেজিয়ে দেয় সে।
ঘরের একধারে একটা টেবিল-চেয়ার আর এদিকে ওদিকে ছড়ানো চারটে কাঠের পেটি, একটা মোড়া, হাতল ভাঙা দুটো চেয়ার। ঘরের একদিকের তাকে একটা জ্বলন্ত মোমবাতি আর টেবিলের পেছনে রাখা চেয়ারটায় বসে শ্যামাদাসদা। একটা পেটিতে বসে বিষ্টুচরণ। অবশ্যই সাধারণ বেশে।
—‘এসো, রজনী এসো। খানিক আগেই এসে পড়েছ দেখছি। তা পথে আসতে কোনো অসুবিধে হয়নি তো? যা অন্ধকার।’
—‘আজ্ঞে না শ্যামাদা। সঙ্গে তো টর্চ আছে।’
—‘পথে কারোর সঙ্গে দেখা হয়েছিল নাকি?’
—‘আজ্ঞে না।’
—‘তা আর কেউ কি জানে যে তুমি এখানে আসছ? তোমার সুরেশ কাকা জানে?’
—‘না না, কেউ জানে না শ্যামাদা।’
শ্যামাদাসদা মুচকি হেসে ঘাড়টা দোলায়। একটা সিগারেট ধরায়।
তারপর বলে— ‘বাঃ, বেশ বুদ্ধিমান ছেলে তুমি। কলকাতার অফিসে চাকরি কর। স্মার্ট। তাই স্বাভাবিক ভাবেই তোমার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে যে কেন আমি তোমাকে এইভাবে গোপনে ডেকে নিয়ে এলাম এখানে। সেটাই স্বাভাবিক।… কিন্তু কেন তোমাকে এখানে ডাকলাম বল তো?’ সিগারেটে একটা লম্বা টান দেয় শ্যামাদাস।
একটু বোকা সাজার ভাণ করে রজনী বলে— ‘আজ্ঞে, আপনারা তো স্বদেশি করেন। আর পুলিশ তো স্বদেশিদের পেছনে পড়ে আছে। তাই গোপন কোনো শলা-পরামর্শের জন্যেই হয়তো পুলিশের অজানা এই আড্ডায় আমায় ডেকে এনেছেন।’
একমুখ ধোঁয়া বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে শ্যামাদাস বললে— ‘তোমার এই ধারণা আধা-সত্যি রজনীকান্ত। আমরা যে স্বদেশি করি, তা এখানকার পুলিশ জানে; তবে আমাদের এই গোপন আড্ডার কথা শুধু পুলিশ কেন, গাঁয়ের কেউই জানে না। তা ছাড়া কোনো গোপন শলা-পরামর্শ করার জন্যে তোমাকে এখানে ডাকিনি; এমনকী আমাদের দলের সদস্যপদ নেওয়ার কথাও তোমাকে বলব না।’
—‘তাহলে কী জন্যে শ্যামাদা?’
—‘বলছি, বলছি। এত উতলা হবার কিছু নেই।’ সিগারেটে আবার একটা টান দিয়ে শ্যামাদাস বলতে থাকে— ‘তুমি তো কলকাতায় যাও। সেখানে আমাদের অন্যান্য বড়ো বড়ো স্বদেশি দলের তৈরি স্বদেশি সাবানের জোগান আসে। আমাদেরই কেউ গিয়ে সেই সাবান নিয়ে আসে। আমরা সেগুলো বিক্রি করে দলের খরচ-খরচা চালাই। এখানকার পুলিশ আমাদের দলের লোকেদের চেনে; তবে তাদের কিছু বলত না। কিন্তু ক-দিন আগে স্বদেশি সাবান আনতে গিয়ে দু-জন ধরা পড়েছে পুলিশের হাতে। অবশ্য তারা ভিন গাঁয়ের ছেলে। আমিই সদ্য সদ্য কাজে লাগিয়েছিলাম তাদের। তবে অনেক চেষ্টা করেছিলাম তাদের ছাড়িয়ে আনার। কিন্তু উলটে পুলিশ আমাকে ধমকাল। বলল যে, কলকাতা থেকে নাকি কড়া অর্ডার এসেছে কেউ স্বদেশি ভাবনা নিয়ে কিছু কাজ করছে দেখলেই তাকে অ্যারেস্ট করতে। তাই সেদিনের ওই অনুষ্ঠানটার আয়োজন আমি স্কুলের প্রেসিডেন্ট হেদায়েত মোল্লার নামে করিয়েছিলাম। জানো নিশ্চয়ই যে দারোগা জয়ন্ত রাহা একসময় এখানকার স্কুলেরই ছাত্র ছিল। তাই সেদিন আর পুলিশ আসেনি। তবে আমাদের এখানকার দলের সবার ওপরেই এখন পুলিশের নজর আছে। তার ফলে আমরা কেউ যে কলকাতায় গিয়ে সাবান আনবো তারও উপায় নেই। এদিকে সেদিনের স্বদেশি গানের আসরের আয়োজন করতে গিয়ে বেশ কিছু টাকাও খরচ হয়ে গেছে। হাতে পয়সাকড়ি বিশেষ কিছু নেই। তাই সাবানের জোগান না এলে দলের খরচ-খরচা চলে কী করে বল তো? বড্ড টানাটানি চলছে। তাই আমরা এমন কাউকে চাইছি, যে পুলিশের খাতায় আমাদের দলের লোক নয় অথচ এই গ্রামেরই লোক।’
—‘তা আমাকে কলকাতা থেকে স্বদেশি সাবান এনে দিতে হবে। তাইতো শ্যামাদা?’ ব্যাপারটা বুঝে রজনী সন্তুষ্ট হয়। তার মন থেকে এতক্ষণের সব দ্বিধা দূর হয়ে যায়। দেশের জন্যে এই সামান্য কাজটুকু করতে পারবে ভেবে তার ভালো লাগে।
শেষ একটা টান মেরে সিগারেটের বাকি অংশটা বিষ্টুকে বাড়িয়ে দিয়ে শ্যামাদাস দিনেশকে বললে— ‘দেখেছিস, কেমন বুদ্ধিমান ছেলে। ওরে, আমার জহুরির চোখ। দ্যাখ, কেমন আমার মুখের কথা খসাবার আগেই ব্যাপারটা ধরে নিয়েছে রজনী।’
—‘কিন্তু কলকাতার কোথায় ওই সাবান পাওয়া যায় তা তো জানি না শ্যামাদা?’
—‘জানবে, জানবে, সব জানবে। এত তাড়া কীসের? তোমাকে যখন একটা কাজের ভার দিতে যাচ্ছি, তখন তো তোমাকে সব বলতেই হবে। নইলে তুমি কাজটা করবে কী করে? তা তুমি বিয়ে-থা করবে না?’
রজনী বুঝতে পারে কলকাতার ঠেকের কথা বলার আগে এটাসেটা কথা বলে শ্যামাদাস তাকে মেপে নিতে চাইছে। এসব লাইনে বাইরের লোককে ঢোকানোর আগে বুঝে নিতে হয় যে সে কতখানি নির্ভরযোগ্য। তাই সে বিনয়ীর হাসি হেসে বলে— ‘কত লোকেই তো বিয়ে-থা করে না। এই আপনিও তো দেশের কাজ করবেন বলে বিয়ে করেননি। হয়তো কিছু কিছু মানুষের ভাগ্যটাই এমন হয় দাদা।’
আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে সেটাতে দুটো টান মেরে টেবিলে দুই কনুইয়ের ভর রেখে চশমার ওপর দিয়ে তার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে শ্যামাদাস। রজনী বুঝতে পারে যে কলকাতার কাজকর্ম বিশদে বলার আগে তাকে শেষবারের মতো গভীরভাবে জরিপ করে নিতে চাইছে শ্যামাদাস।
—‘শোনো রজনী, কলকাতার বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটে পান্ডের চায়ের দোকান। দোকানটা লালবাজারের খুব কাছেই, বুঝলে। মাঝারি রকমের কাস্টমার হয়। তা তোমার অফিসের কাজ শেষ হলে তুমি ওই পান্ডের দোকানে গিয়ে কপালে চন্দনের তিলক কাটা, হাফহাতা গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরা পান্ডেকে বলবে একটা ‘‘হিংয়ের চা’’ দিতে। হ্যাঁ, এই কথাটা তখনই তাকে বলবে যখন তার কাছাকাছি কেউ থাকবে না। ওটাই কোড-ওয়ার্ড। পান্ডে তোমাকে দোকানের ভেতরে টেবিলে বসতে বলবে। তুমি দোকানের ভেতরে একটু একান্তে বসবে। খানিক পরেই ও তোমার টেবিলে ব্রাউন কাগজে মোড়া কতকগুলো গুঁড়ো চায়ের প্যাকেট রেখে যাবে। তার মধ্যে একটা প্যাকেটের গায়ে ক্রশ চিহ্ন দেওয়া থাকবে। তুমি সুযোগ বুঝে সাবধানে সেই মার্কা দেওয়া প্যাকেটটা নিয়ে তোমার ব্যাগে রাখবে। ওটাতেই থাকবে সাবান।’
একটানা কথা বলে একটু থামে শ্যামাদাস। সিগারেটে ধীরে সুস্থে আবার দুটো টান দেয়। তারপরে আবার শুরু করে— ‘তোমার কাজ শেষ হলে পান্ডের লোক তোমায় চা দিয়ে যাবে। তুমি চা খেয়ে পয়সা দেবে। পান্ডেও তোমায় তার ক্যাশবাক্স থেকে তোমাকে সেই পয়সাটাই ফেরত দেবে। দেখলে মনে হবে যেন তোমার চায়ের দাম কেটে বাকি পয়সা তোমায় ফেরত দিচ্ছে সে। দোকানের বাইরে পুলিশের সাদা পোশাকের ‘‘ওয়াচ-ডগ’’ থাকলেও সে কিছু বুঝতেই পারবে না। ব্যাস, তোমার কাজ শেষ। এরপরে তুমি বেরিয়ে সোজা হাওড়া থেকে ট্রেন ধরবে।… কি রজনী? বুঝতে পারলে? করতে পারবে তো কাজটা?’ আবার সিগারেটে টান দেয় শ্যামাদাস। এবারে একটু গা ছেড়ে দিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে।
একটু ভেবে নিয়ে রজনীকান্ত বলে— ‘কাজটা তো হয়ে যাবে। কিন্তু আপনাকে আমি প্যাকেটটা দেব কী করে? তা ছাড়া কাজটা রোজই করতে হবে নাকি?’
শ্যামাদাস বললে— ‘পাগল হয়েছ? এসব কাজ রোজ কেউ করে নাকি? পুলিশের নজরে পড়ে যাবে যে সে। তাই শুধু প্রতি বুধবার তুমি পান্ডের দোকানে যাবে। আর সেদিন রাত দশটার সময় বিষ্টুচরণ গিয়ে তোমার বাড়ি থেকে প্যাকেটটা কালেক্ট করে নেবে। ব্যাস, তোমার কাজ শেষ। তা সবকিছু তো জানলে। এবার বল, কাজটা তুমি করবে কি?’
শ্যামাদাসের শেষ কথাটায় অন্য সুর। সেটা বুঝতে রজনীর অসুবিধে হয় না। আর শ্যামাদাসের শাসানির ভয়?…
—‘তাহলে সামনের বুধবার পৌঁছে যাব পান্ডের দোকানে।’
শামাদাস বললে— ‘এখন এসো তাহলে।’ তারপরে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে সিগারেটটা মেঝেতে ফেলে পা দিয়ে চেপে নিভিয়ে দেয়।
সেনেদের ভিটে থেকে বেরিয়ে নিজের বাড়ির পথে হাঁটতে থাকে রজনী। এবারে ইচ্ছে করেই একটু পরে পরেই টর্চ জ্বালতে থাকে। তার অনুমান মিলে যায় যখন খানিক সময়ের তফাতে তফাতে তার পাশ দিয়ে একে একে সাইকেল চেপে বেরিয়ে যায় দিনেশ, বিষ্টুচরণ আর শ্যামাদাস। রজনীকান্ত শুধু মুচকি মুচকি হাসে আর সাইকেলে যেতে যেতে একান্তে হাসছিল শ্যামাদাসও।
.
বুধবারে ফ্রেডরিক সায়েবের অফিসে কাজের চাপ একটু কমই। যুদ্ধের বাজারে এমনিতেই জিনিসের দাম বেশ চড়া। তাই ব্যবসা বাণিজ্যেও একটা মন্দার ধাক্কা। তার মধ্যে রয়েছে মন্বন্তরের জ্বালা। তবে এরই মধ্যে লুটেপুটে খাচ্ছে কিছু ব্যবসায়ী। ফ্রেডরিক সায়েব ইলেকট্রিক সরঞ্জামের ডিস্ট্রিবিউটর। এই অফিস থেকে শুধু টাকাপয়সার হিসেব, অর্ডার নেওয়া আর অর্ডার ডেলিভারি সংক্রান্ত কাগজপত্রের কাজ হয়। গোডাউন অন্য জায়গায়। সেখান থেকেই মাল লোড-আনলোড করা হয়। ফ্রেডরিক সায়েব গেছেন সেখানেই তদারকি করতে।
আমিনদা একটা হিসেব দেখে নিয়ে দু-হাত তুলে আড়মোড়া ভাঙলেন। আর্দালি ডি-ক্রুজ খানিক দূরে একটা চেয়ারে বসে ঢুলছে। সেদিকে একবার দেখে নিয়ে আমিনদা তাঁর সাধের নেশার বস্তুর ডিবেটা বের করে সবে একখিলি জর্দাপান মুখে পুরতে যাবেন, এমনসময় রজনীকান্ত বললে— ‘আমিনদা, একটু চা খেলে হত না?’
মুখের সামনে পানের খিলিটা ধরে রেখেই আমিনদা বলেন— ‘হ্যাঁ, সে তো ভালোই হত। কিন্তু রাডু বেটা তো ঝিমোচ্ছে। ডাকলেই তো খ্যাঁক খ্যাঁক করে উঠবে।’
—‘একটু ভালোভাবে ডেকে বলুন না। ঠিক এনে দেবে। তবে এবারে দামটা আমার। ওকে বলুন, ভালো হিংয়ের চা আনতে।’
শেষটুকু শুনেই বিষম খেলেন আমিনদা। আরেকটু হলেই হাত থেকে পানটা মাটিতে পড়ে যাচ্ছিল আর কী। সেটা সামলে নিয়ে রজনীকে বললেন— ‘কী বললে? কীসের চা?’
—‘হিংয়ের চা।’
—‘সেটা আবার কী? হিং দিয়ে কেউ চা খায় নাকি?’
—‘আরে খায় খায়। কাবলেরা খায়। হিং, আদা, পাতিলেবু আর বিটনুন দিয়ে।’
—‘তাই নাকি?’
—‘হুম। হিং-চা রেগুলার খেলে গ্যাস, অম্বল কিচ্ছু থাকে না। কাবলেদের কখনো ঢেঁকুর তুলতে দেখেছেন?’
‘হেউউ’ করে একটা বিশাল ঢেঁকুর তুলে ডি-ক্রুজের ঝিমুনি ছুটিয়ে দিয়ে আমিনদা বললেন— ‘না, কাবলেদের কখনো ঢেঁকুর তুলতে দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না।’
—‘তাহলেই বুঝে দেখুন, হিং-চায়ের কত গুণ। অথচ আপনি দিনে কতবার ঢেঁকুর তোলেন গুনে দেখেছেন কি? আজ অফিসে আসা থেকে এই নিয়ে তেইশটা হল।’
—‘তা, তুমি কি সকাল থেকে আমার ঢেঁকুর গুনছ নাকি?’
—‘তা কেন? কাজের ফাঁকে ফাঁকে যখনই ঢেঁকুরের আওয়াজ পাচ্ছি, তক্ষুনি এই কাগজটাতে একটা করে ঢ্যাঁড়া দিয়ে রাখছি। আগেই বাইশটা হয়ে গিয়েছিল। তাই হিং-চায়ের কথাটা বললাম।’
এবারে আমিনদা বোধ হয় একটু অপরাধবোধে আক্রান্ত হলেন। পানটা ডিবেতে ঢুকিয়ে রেখে বললেন— ‘সত্যি? তাহলে তো এইটা নিয়ে তেইশটা হয়ে গেছে। কিন্তু ঢেঁকুর কমাবার জন্যে হিং-চা ছাড়া আর কি কোনো উপায় নেই রজনী?’
—‘থাকবে না কেন? খুব সহজ একটা উপায় আছে; আর সেটা হল ওই জর্দাপান ছেড়ে দেওয়া।’
আঁতকে উঠলেন আমিনদা। —‘সে কী গো রজনী, সেই সতেরো বছর বয়েস থেকে ঠাকুমার ডিবে থেকে পান চুরি করে খাচ্ছি…। এতদিনের অভ্যেস। ছাড়ি কী করে বল তো? না, না, অন্য কোনো উপায় জানা থাকে তো বল।’
—‘তাহলে ওই হিং-চা। মাসখানেকের মধ্যেই অফিসটাইমে ঢেঁকুরের সংখ্যাটা দশে নেমে আসতে পারে। তবে দিনে অন্তত বার তিনেক খেতে হবে।’
—‘তাহলে রাডুকে বলি হিং-চা আনতে? দামটা না হয় আমিই দেব।’ আমিনদা মনে হয় একটু প্রসন্ন হলেন এবারে।
—‘বলে দেখুন।’
আমিনদা ডি-ক্রুজকে ডেকে বললেন— ‘বাবা রাডু। সায়েব তো এখন ঘরে নেই। তাই বলি কী কেটলিটা নিয়ে গিয়ে সামনের দোকান থেকে তিন কাপ হিং-চা এনে দাও না বাবা।’
রডরিক্স উঠে এসে বলে— ‘ক্যা চায়?’
—‘আরে বাপু, হিং-চা, হিং-চা। কাবলেরা খায়। গ্যাস, অম্বল কমে।’
রজনীকান্ত মুচকি মুচকি হাসছে আমিনদাকে আড়াল করে।
রডরিক্স খেঁকিয়ে ওঠে— ‘হিং মিলাকে চায় কভি বনতা হ্যায় ক্যা? ইউ ফুল। আরে, হামার জ্যায়সা ইংলিশ দারু পিয়ো। গ্যাস দূর ভাগেগা। পিনা হ্যায় তো বোলো। পৈসা দো, লা দেতে হ্যায়। হাঁ, লেকিন অফিস মে পিনা মত।’
—‘ছিঃ ছিঃ ছিঃ। সে কী কথা। দেখেছ রজনী, শেষে কিনা মদ খেতে বলছে।’
—‘তবে আপনার রাডুর কথাটাও ফ্যালনা নয়। মদ খেলেও ঢেঁকুরের সংখ্যা কমবে কিন্তু। এখন ভেবে দেখুন কী করবেন।’
—‘না না বাপু, দরকার নেই মদ খেয়ে। শেষে বাড়ির রোয়াকে বসে কাটাতে হবে সারারাত। ছেলেপিলেরাও ভাববে কি। না বাবা রাডু, তোমায় হিং-চাও আনতে হবে না আর মদও আনতে হবে না। তুমি তোমার কাজ করোগে যাও।’
রডরিক্স গজগজ করতে থাকে— ‘এইসা বুরবক আদমি ম্যায়নে জিন্দগি মে নেহি দেখা।’ বলতে বলতে সে আবার নিজের চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ে।
—‘ওঃ বাব্বাঃ, যেন ঝড় বয়ে গেল।’ বলে আমিনদা খানিকটা জল খেয়ে আবার একটা ঢেঁকুর তুলে নিজেই বললেন— ‘এটা নিয়ে চব্বিশটা। ঢ্যাঁড়া কাটো রজনী।’
রজনী কিন্তু এবারে সত্যিই হো-হো করে হেসে ফেলল।
.
বুধবার সন্ধে ছ-টা নাগাদ রজনী গিয়ে পৌঁছল বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের পান্ডের চায়ের দোকানে। শ্যামাদাসের দেওয়া চেহারার বর্ণনা দেখে বুঝে নিলো যে চা বানাচ্ছে, সেইই পান্ডে। একটা বেয়ারা রেকাবে করে পান্ডের কাছ থেকে চার ভাঁড় চা নিয়ে ভেতরে যেতেই রজনী তার কাছে গিয়ে একটু নীচু স্বরেই বলল— ‘এক হিং-চায় দিজিয়ে।’ পান্ডে তাকে একবার আপাদমস্তক মেপে নিয়ে বললে— ‘অন্দরমে দারোয়াজাকে পাস এক টেবল খালি হ্যায়। উধার যা কে বৈঠিয়ে।’ সেই টেবিলে গিয়ে বেঞ্চে বসে রজনী তার কাঁধের ঝোলা ব্যাগটা রাখলে টেবিলের ওপরে, যাতে তার কাজের সুবিধে হয়। মিনিট চারেক পরেই পান্ডে তার চা বানানো বন্ধ রেখে রজনীর টেবিলের পাশেই ভেজানো দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। সেখান থেকে ছ-টা ব্রাউন কাগজের চায়ের প্যাকেট বের করে কাছেই রজনীর টেবিলের ওপরে রেখে হাঁক পাড়লে— ‘জয়লাল, আজ বিনোদবাবু নে কিতনা পাকিট সিটিসি ভেজা?’ ভাবখানা এমন যেন সে বিনোদবাবুর পাঠানো প্যাকেটের হিসেব মেলাচ্ছে।
ওদিক থেকে জয়লাল জবাব দিল— ‘পাঁচ’।
পান্ডে প্যাকেটগুলো রজনীর টেবিলে রেখেই একটা একটা করে গুনতে লাগল। সেই ফাঁকে একটা প্যাকেটের গায়ে এমনভাবে টোকা মারল, যেন রজনী সেটা দেখতে পায়। পান্ডে টোকা মারতেই সে দেখল যে সেই প্যাকেটের গায়ে একটা ক্রশ চিহ্ন দেওয়া আছে। সে চটপট নিজের ব্যাগটা টেনে নিয়ে অন্য প্যাকেটের আড়ালে সেই বিশেষ প্যাকেটটা টুক করে নিজের ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলল। ব্যাগটা নামিয়ে পাশেই বেঞ্চের ওপরে রাখল।
পান্ডেও গলা তুলে বললে— ‘হাঁ, সহি ভেজা হ্যায়।… আরে, এ বুরবক, ইয়ে সাব কবসে বৈঠা হ্যায়। ইনকো চায় দেগা কব?’
—‘হাঁ, দেতা হুঁ’ বলেই জয়লাল চটপট একটা গরম চায়ের ভাঁড় এনে নামিয়ে রাখল রজনীর টেবিলে। ধীরে সুস্থে চায়ে চুমুক দিতে লাগল রজনী। পান্ডে কিন্তু চা টা ভালোই বানায়।
চা শেষ করে মিনিট পাঁচেক বসে থেকে পয়সা দেওয়া নেওয়ার চালবাজি খেলে রজনী নেমে পড়ল রাস্তায়। উলটোদিকের ফুটপাথে একটা ভাতের হোটেলের সামনে একটা ধুতি আর বাংলা শার্ট পরা লোক দাঁড়িয়ে খৈনি ডলছে। তার পাশে একটু দাঁড়িয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছতে মুছতে সে লক্ষ্য করলে যে তার নজর রয়েছে পান্ডের দোকানের দিকে। তারপরে রুমালটা ভাঁজ করে পকেটে ঢুকিয়ে সে লালবাজারের দিক দিয়ে হাঁটা মারল হাওড়ার দিকে।
.
সুরেশ কাকা বললে— ‘কিগো দা-বাবু, আজ এত দেরি হল যে।’
—‘আর বলো না। যখন তখন সাইরেন বাজে আর কাজকম্ম সব ফেলে রেখে গিয়ে ঢুকতে হয় সেই বালির বস্তার আড়ালে। তা তখনকার ফেলে রাখা কাজগুলো শেষ করতে হবে তো।’
রজনীকান্তর মুখে কলকাতার গল্প শুনে শুনে সুরেশ কাকাও জানে যে সাইরেন কখন বাজে। তাই রজনীর কথাটা তার কাছে বিশ্বাসযোগ্যই মনে হয়। ঘরের ডুপ্লিকেট চাবিটা নিজের ট্যাঁকে গুঁজতে গুঁজতে সে বলে— ‘আজ আর তাইলে জলখাবার খে কাজ নেই। হাত মুখ ধুয়ে এক্কেরে ভাত খেয়ে নিও। ঢাকা দেওয়া আচে বুইলে?’
—‘ঠিক আছে। তুমি এসো।’
সুরেশ কাকা দাওয়া থেকে নেমে নিজের বাড়ির পথ ধরে।
ঘরে ঢুকে একদমই সময় নষ্ট করতে চায় না রজনী। নিশ্চয়ই তাকে ফিরতে দেখেছে শ্যামাদাসের দলের লোকেরা। যেকোনো সময়ে হাজির হতে পারে বিষ্টুচরণ; যদিও সময় দিয়েছে দশটা। কিন্তু কী আছে প্যাকেটটাতে? সত্যিই কি সাবান? আর উলটোদিকের ফুটপাথে দাঁড়ানো লোকটাই বা কে? কেনই বা একটা প্যাকেটের জন্যে কোড-ওয়ার্ড ব্যবহার করতে হয়? এইরকম অনেক প্রশ্নে খচখচ করছে তার মন। একটা অস্বস্তি। তাকে তার সন্দেহ মেটাতেই হবে। তবে যা করার তা তাড়াতাড়ি করতে হবে। তাই চটপট জামাকাপড় পালটে নিয়ে সে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়। তারপরে একটা বাটিতে সামান্য একটু জল নিয়ে প্যাকেটটার আঠা দিয়ে জোড়া অংশে লাগায় সে। একটু ভিজে নরম হলে প্যাকেট খুলতে সুবিধে হবে। আঠা লাগানো জায়গাগুলো একটু ভিজলে পরে সে সাবধানে প্যাকেটের ভাঁজ খোলে। ভেতরে সাবানের প্যাকেট থাক থাক করে রাখা। সেগুলো কিন্তু সিল করা। দু-চারটে প্যাকেট খুলে হাতে ধরে শুঁকে দেখে। লন্ঠনের আলোয় ভালো করে পরীক্ষা করে। নাঃ, এগুলো সত্যিই সাবান। পুরোপুরি সন্দেহমুক্ত হয় সে। যাক, তাহলে শ্যামাদাসদা মোটেই মিথ্যে বলেনি। তাই তড়িঘড়ি আবার সাবধানে সব প্যাকেট ঠিকমতো সাজিয়ে ব্রাউন কাগজটা আগের মতোই নিঁখুত ভাঁজ করে দেয়। তাক থেকে আঠার শিশিটা নামিয়ে জুড়ে দেয় ঠিক আগের মতো। তারপর কাঁচা আঠা লাগানো জায়গাগুলো লন্ঠনের কাঁচের গায়ে চেপে ধরে ঝটপট শুকিয়ে ফেলে সে।
যাক, এবার নিশ্চিন্ত। প্যাকেটটা তার ঝোলাব্যাগে ঢুকিয়ে রেখে জামাকাপড় পালটে টিউবওয়েল থেকে হাত-মুখ ধুয়ে আসে।
একটু পরেই টর্চের আলো। এগিয়ে আসছে। রজনীকান্ত হাঁক মারে— ‘কে? বিষ্টু নাকি?’
—‘হ্যাঁ। সাবান এনেচ?’
—‘হুঁ। শ্যামাদাকে দিয়ে দিও।’
—‘সে আর বলতে। দাও।’ দাওয়ায় উঠে আসে বিষ্টুচরণ।
রজনী ব্যাগ থেকে প্যাকেটটা বের করে বিষ্টুকে দেয়। টর্চের আলোয় সেটা একবার দেখে নেয় বিষ্টুচরণ। তারপর দাওয়া থেকে নামতে নামতে বলে— ‘তাইলে সামনের বুধবার আবার দেকা হবে। এই সময়ে।’ রজনী ঘরে ঢুকে হাতঘড়িটা দেখে। দশটা বেজে বারো।
