১৮৫৫, জানুয়ারির প্রথমভাগ ঠগির দল, আর্তনাদ, নীলকান্ত আর শ্যামাঙ্গিনী

১৮৫৫, জানুয়ারির প্রথমভাগ
ঠগির দল, আর্তনাদ, নীলকান্ত আর শ্যামাঙ্গিনী

নদীয়া জেলার কেষ্টনগর থেকে আঠারো জনের এক তীর্থযাত্রীর দল তীর্থ করতে চলেছে। তারা যাবে কালীঘাটে পৌষকালী দর্শন করতে। কখনো নদীর পাশ দিয়ে আবার কখনো বা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ পথ। দলে দু-চারজন বৃদ্ধ, কয়েকজন মেয়েমানুষ আর একটা বাচ্চাও রয়েছে; তাই দ্রুত পথ চলা যায় না। বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে চলতে হয়। তার ওপরে শীতের বেলা। সন্ধে নামার আগেই ঠাঁই নিতে হবে কোনো বসতির আশেপাশে। পথের রসদ সঙ্গে নিয়েছে তারা। ভাজা ছোলা, চিঁড়ে, মুড়ি আর শক্ত পাকের মণ্ডা। কিন্তু এসব তো পথচলতি খাবার। সকালে বা দুপুরে খাওয়া যায়। তবে রাতের বেলা পেটভরে দুটো ভাত খেয়ে না ঘুমোলে যে পরেরদিন পথ চলাই দায় হয়। তাই বেলা থাকতে থাকতেই কোনো জনবসতির পাশে আস্তানা গেড়ে সঙ্গে আনা কোম্পানির টাকা খরচ করে দোকান থেকে জোগাড় করে আনতে হয় জ্বালানি কাঠ, চাল, ডাল আর আনাজ। তারপর আগুন জ্বেলে দুটো ভাত ফুটিয়ে খেয়ে আগুনের কুণ্ডের ধারে বসে চলে খানিক গানবাজনা। তাতে মনে ফূর্তি আসে, পরের দিনের পথচলার মনের জোরও পাওয়া যায়। শেষমেশ দ্বিতীয় প্রহরের শিয়াল ডেকে উঠলে তারা চাটাই বিছিয়ে কম্বল গায়ে শুয়ে পড়ে আগুনের কুণ্ডের চারপাশে খোলা আকাশের নীচে। মেয়েরা, ছোটো বাচ্চাটা আর বৃদ্ধরা শোয় আগুনের কাছাকাছি। বাইরের দিকের বেড়ে শোয় জোয়ান মদ্দ পুরুষেরা। পাশে রাখা থাকে তাদের লাঠি। এদিকে শনশন করে বয়ে যায় পৌষের কনকনে ঠান্ডা হাওয়া। রাত ধীরে ধীরে গভীর হতে থাকে আর প্রহরে প্রহরে ডেকে ওঠে শিয়ালের দল। তাদের ডাক শুনলেই লোকবসতির কুকুরগুলো তারস্বরে ডাক ছাড়ে আর তাতেই পুরুষদের কেউ না কেউ ঘুমমাখা চোখে আধা নিভন্ত আগুনে চাট্টি কাঠ ফেলে দেয়। শীতের হাওয়ায় ফুলকি ওঠে আগুন থেকে। তারপর আবার চোখে নেমে আসে ঘুম। সকালে সূয্যির আলো ফুটতে না ফুটতেই প্রাতঃকৃত্য সেরে, খানিক পরেই ফের শুরু হয় পথচলা। তবে তার আগে লোকবসতি থেকে বাচ্চাটার জন্যে দুধ জোগাড় করে আনতে হয়, তাদের বাড়ির কুয়ো বা পুকুর থেকে আনতে হয় খাওয়ার জল। বসতির মানুষজন সানন্দে তা করতে দেয় তাদের। কখনো কখনো কোনো বসতির জোতদার বা অতিসম্পন্ন গেরস্থ বেশকিছু আলু বা চাল দেয় তীর্থযাত্রীদের। তীর্থযাত্রীদের সেবা করাটা তারা পুণ্য বলে মানে। এতে অবশ্য তীর্থযাত্রীদের রাহাখরচও বেশ কিছুটা বাঁচে।

অথচ বছর তেইশ আগেও অবস্থাটা এত নিরাপদ ছিল না তীর্থযাত্রীদের কাছে। এতক্ষণে হয়তো সর্বস্ব লুঠ হয়ে যেত ঠগিদের হাতে আর সেইসঙ্গে যেত প্রাণটাও। তারা ছিল বড়ো নির্মম। সান্নাটা পথে চলা মানুষদের কাছে তারা ছিল মূর্তিমান আতঙ্ক। কত যে মানুষ মারা পড়েছে তাদের হাতে তা গোনা সম্ভব নয়, কারণ অনেক সময়েই তারা লাশ ভাসিয়ে দিত কোনো নদীর জলে আবার কখনো বা ফেলে দিত গভীর জঙ্গলে। সরকারি হিসেব অবশ্য বলছে ১৮৩০ সালে ঠগির দল নিশ্চিহ্ন হওয়ায় আগে দেড়শো বছরে প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ মরেছে তাদের হাতে। এতটাই সঙ্ঘবদ্ধ, দক্ষ আর শক্তিশালী ছিল তারা যে ছোটোখাটো অপরাধীরা পর্যন্ত তাদের সমীহ করে চলত।

কিন্তু এ তো ১৮৩০ সালের সরকারি হিসেব। ঠগিরা এত শক্তিশালী হল কী করে মাত্র দেড়শো বছরে? তারা তো আর কোনো সরকারি মদতপুষ্ট আধুনিক অস্ত্রধারী সৈন্যদল নয় যে সারা ভারতে ত্রাসের সৃষ্টি করবে?

আসলে ঠগিদের ইতিহাস প্রায় ছ-শো বছরের পুরোনো। সাতটা হতদরিদ্র মুসলিম উপজাতি থেকে তাদের উৎপত্তি হলেও কালের নিয়মে দরিদ্র হিন্দুরাও জড়িয়ে যায় তাদের সঙ্গে। প্রথমদিকে তারা ছোটোছোটো দল হিসেবে ভারতীয় উপমহাদেশে ছড়িয়ে ছিল কিন্তু ক্রমে ক্রমে এক একজন শক্তিশালী জিম্মেদারের অধীনে তারা এককাট্টা হয়ে এক একটা এলাকায় নিজেদের আধিপত্য কায়েম করতে থাকে। প্রথমদিকে তারা বড়ো রুমালের সাহায্যে বা গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করত পথিকদের। পরবর্তীকালে তাদের ভাণ্ডারে জমা পড়তে থাকে ঘরে তৈরি নানান অস্ত্র। আর আরও আশ্চর্য ব্যাপার হল এই যে ধীরে ধীরে তাদের আরাধ্যা দেবী হয়ে উঠলেন ‘ভবানী’ তথা ‘কালী’। এই ঠগিদের উপদ্রব এমনই চরমে পৌঁছেছিল যে ইংরেজ সরকার পর্যন্ত বিব্রত বোধ করতে থাকে। তাই ১৮৩০ সালে তৎকালীন ভারতের গভর্নর জেনারেল উইলিয়াম বেণ্টিঙ্ক ঠগিদের নির্মূল করার জন্যে ক্যাপ্টেন উইলিয়াম হেনরি স্লিম্যানকে দায়িত্ব দেন। সেই স্লিম্যানের বাহিনী উপমহাদেশ থেকে ঠগিদের উৎখাত করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। গ্রেফতার হয় ঠগিদের এক শীর্ষনেতা সইদ আমির আলি। আমির আলিকে রাজসাক্ষী করে আদায় করে নেওয়া হয় আরও ঠগি শীর্ষনেতাদের নাম। আর তারই ফলশ্রুতিতে উপমহাদেশ থেকে ঠগিরা নির্মূল হয়েছে বলে মনে করা হয়। রাজসাক্ষী হওয়ার কারণে মুক্তি পেয়ে যায় সইদ আমির আলি। তারপর থেকে সরকারের খাতায় ঠগির আক্রমণে প্রাণহানির ঘটনা আর লিপিবদ্ধ নেই।

তারপরে কেটে গেছে পঁচিশটা বছর। কিন্তু সত্যিই কি তারা নেই? এই প্রশ্নের উত্তর দেবে সময়।…

তীর্থযাত্রীর দল এগিয়ে চলেছে। এখনও দিন তিনেকের পথ বাকি। কিন্তু বৃদ্ধ আর মহিলারা সঙ্গে না থাকলে বাকিরা এই পথটুকু দু-দিনে সেরে দিত। তবু শীতের দিন বলে সূর্যের তেজ কম থাকায় পথ চলতে তেমন কষ্ট হচ্ছে না। খানিক চলার পরে একটা বসতি এল, কিন্তু না থেমে সেটা পেরিয়ে গেল তারা। ঠিক হল যে দুপুরের দিকে যে বসতিটা পড়বে সেখানে তারা স্নানটান সেরে হালকা কিছু খেয়ে একটু জিরিয়ে নেবে। সন্ধে নামার আগে রানাঘাটে পৌঁছতেই হবে।

দু-পাশে দিগন্তবিস্তৃত ক্ষেতজমি। কোথাও আলুর পাতায় সবুজ আবার কোথাও বা সর্ষেফুলে হলুদ হয়ে আছে। কিন্তু তাদের তো থামলে চলবে না। এমন সময় দূরের মাঠ থেকে হাঁক শোনা যায়। জনা পনেরো মানুষের একটা দল হাত তুলে তাদের ইশারা করছে। দূর থেকে দেখে তো মনে হচ্ছে তীর্থযাত্রীই। তাই তারা একটু দাঁড়িয়ে যায়। দলে ভারী হলে আপদবিপদ চট করে কাছে ঘেঁষে না। তবে আগে দেখে নিতে হবে অতিথিরা কেমন, কারণ এই দলে মহিলারা আছে।

দলটা ক্রমশ এগিয়ে আসতে তারা বুঝতে পারল যে ওই দলেও পাঁচজন মহিলা আছে, তবে কোনো বৃদ্ধ বা বাচ্চাকাচ্চা নেই। যাক, তবু খানিকটা নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। এবার অন্তত একটা দিন দলটাকে নজরে রাখতে হবে; তবেই বিশ্বাস করা যাবে পুরোপুরি।

আগত দলটা থেকে প্রশ্ন ভেসে এল— ‘কি গো, কালীঘাট নাকি? তা কোতা থেকে আসা হচ্চে?’

—‘হ্যাঁ। কালীঘাট। আসচি কেষ্টনগর থেকে। তা তোমরা?’

—‘আমরাও কালীঘাট। আসচি হাটচালি আড়ংঘাটা থেকে।’

ক্রমে দলটা মাঠের আলপথ ছেড়ে উঠে এল রাস্তায়। ওই দলের মাতব্বর গোছের একজন প্রৌঢ় বললে— ‘ভালোই হল। একসাতে থাকলে বেপদের ঝড়-ঝাপটা সহজেই কাটিয়ে ওটা যায়।’

—‘তা বটে। তাইলে এগোনো যাক। সময় নষ্ট করে লাব নেই। আজ রানাঘাটে পৌঁচতেই হবে।’

দুটো দল আগুপিছু করে চলতে থাকে। দু-তিন মাইলের মধ্যেই দেখা যায় দু-দলের মাতব্বরেরা কথা বলতে বলতে আগে আগে চলেছে। মাঝখানে দু-দলের মহিলারাও হেসে হেসে গল্প করতে করতে চলেছে। এতে পথশ্রম যেমন খানিক লাঘব হয়, তেমনি চলার গতিও বাড়ে। এভাবেই কখন যেন অজান্তেই মেশামিশি হয়ে যায় দুটো দলে।

ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসে সন্ধে। তাই রানাঘাটেরই কাছাকাছি একটা ছোটো বসতির পাশের সবুজ খোলা মাঠে একটা বড়ো গাছের নীচে থামল তারা। পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে চূর্ণী নদী। নদীর ওপার কুয়াশায় আর সদ্যনামা সন্ধের আলো-আঁধারীতে আবছা। নতুন দলের চারজনমিলে গাছের ডালে চড়ে সঙ্গে আনা চাদর জুড়ে জুড়ে একটা চাঁদোয়া খাটিয়ে ফেলল। এতে হিম পড়বে কম। দু-দলের বাকিরা মিলে চটপট আলু, আনাজ, তেল, ঘি, ফুলকপি আর চাল জোগাড় করে আনল। সেইসঙ্গে আনল আগুন জ্বালাবার কাঠও।

দু-দলের দুই মাতব্বর একটু দূরে বসে তামাক সেবা করছে। পালা করে হাতবদল হচ্ছে হুঁকো। যারা আগুন জ্বালিয়ে রান্নার তোড়জোড় করছিল তাদের একজন হাঁক পাড়লে— ‘হ্যাঁগো কত্তা, কী যেন নাম তোমার?’ এটা কেষ্টনগরের মাতব্বরের উদ্দেশ্যে বলা।

জবাব এল— ‘রাধামাধব…রাধামাধব চক্কোত্তি। তা কী বলবে বল?’

—‘বলি, হাঁড়ি কি আলাদা আলাদা হবে, নাকি একসঙ্গে?’

দুই মাতব্বর কী যেন শলা করলে। তারপরে জবাব এল— ‘একসঙ্গেই হোক। তাতে হাতে হাতে তাড়াতাড়ি রান্না হয়ে যাবে।’

প্রথম প্রহরের শিয়াল ডেকে উঠল। ফিরতি জবাব দিল গ্রামের কুকুরেরাও। রান্নার আর খানিক বাকি। আজ খিচুড়ি হচ্ছে পৌষের আনাজ দিয়ে। এদিকে কল্কের আগুন নিভে যাওয়াতে দুই মাতব্বর আবার নতুন করে তামাক সেজে হুঁকো চালাচালি করতে করতে গল্প জমিয়েছে।

রাধামাধব বললে— ‘তা আপনার নামটা জানা হলনি যে কত্তা।’

—‘এঁজ্ঞে, আমার নাম রতন রায়। গাঁয়ের লোকজন রতন কত্তা বলে ডাকে।’

—‘তা আপনাদের কি শুদুই পৌষকালী দেকা হবে? নাকি কারো মানতও আচে?’ রাধামাধবের প্রশ্ন।

—‘এঁজ্ঞে, আমাদের ওই হারাধনের বেটার গতবচরে মায়ের দয়া হয়েচিল। শইরের কোত্তাও বাদ ছেলোনি। বাঁচার আশা ছেড়েই দেছিল সক্কলে। শেষমেশ মা কালীর কাচে জোড়া পাঁটার মানত করতে তবে রক্কে হয়। তাই এবারে হারাধন যাচ্চে সেই মানত পুন্ন কত্তে। আর বাকিরা সব চলেচে মায়ের দর্শনে। তা আপনাদেরও কি মানত টানত আচে, নাকি এমনি দর্শনে চলেচেন?’

হুঁকোটা হাতবদল করে রাধামাধব বললে— ‘আমাদের তো বলি নিষেদ গো কত্তা। তা আমাদেরও ব্যাপারটা পেরায় আপনাদেরই মতো। গেরামের মনুর মা আর সতের পিসি ওলাওটা থেকে বেঁচে উটে মায়ের কাচে মানত করেচিল সোনার বেলপাতা আর মায়ের কপালের টিপ দেবে বলে। তা মেয়েমানুষ বলে কতা। কোতায় কী হাইরে ফেলবে ঠিক নেই। তাই আমার কাচে গচ্চিত রেকেচে সব।’

ফিরতি হুঁকোটা চক্কোত্তির হাতে দিয়ে গম্ভীর মুখে রতন কত্তা বলতে লাগলো— ‘পতে পড়বে রঘু ডাকাত, বিশে ডাকাত, চিতে ডাকাত আর মনোহর ডাকাতের দলবলের আড্ডা। তারা নাকি ঢেঁকিশালের ঢেঁকি দে অবস্তাপন্ন গেরস্তের দরজা ভাঙে। রনপা চড়ে, শিঙে ফুঁকে জানান দে ডাকাতি করে। তাই কইচিলাম কী ওইসব জিনিস সাবদানে রাকবেন চক্কোত্তি মশাই। দিনে দিনে পেরোতে হবে ওইসব জঙ্গলের পত।’

—‘হ্যাঁ, তা এক্কেরে ঠিক কইচেন কত্তা। দিনে দিনে জায়গাগুলো পেরিয়ে যেতে হবে। কিন্তু দলে ভিড়েচে বুড়ো হাবড়া আর মেয়েছেলের দল। সঙ্গে আবার একটা বাচ্চাও আচে। এদের নিয়ে চলাই তো সমিস্যে। কাউকে তো আর ‘‘নে যাবনি’’ কওয়া যায় না। তীত্থদর্শন বলে কতা।’

রাধামাধবের বাড়িয়ে দেওয়া হুঁকোয় দুটো টান মেরে রতন কত্তা বলে— ‘নিশ্চিন্তি থাকেন কত্তা। আমরা তো আচিই। সঙ্গে লাটি, বল্লমও আচে। একসঙ্গে থাকলে ডাকাতের দল কিচ্চুটি করতে পারবেনি।’

—‘তাই যেন হয়। জয় মা কালী বিপত্তারিনী। দেকো মা, যেন ঘরের সক্কলকে নে মানে মানে ঘরে ফিত্তে পারি।’

রতন কত্তা হুঁকো ধরা হাত কপালে ঠেকিয়ে বিড়বিড় করে বললে— ‘জয় মা করালবদনী।’

খানিক পরেই ডাক পড়ল— ‘এই, সব্বাই খেতে চলে এসো তাড়াতাড়ি। পেত্থম দিন বলে জোগাড় যন্তর কত্তে এট্টু দেরি হয়ে গেল। কাল থেকে আর হবেনি।’

খেতে বসার পরে দেখা গেল কেষ্টনগরের দল ওই নতুন দলটাকে বিশ্বাস করে ফেলেছে পুরোপুরি।

সদস্য সংখ্যা বেশি বলে দু-জায়গায় আগুন জ্বালানো হয়েছে। একটা চাঁদোয়ার বাইরে। সেখানে শোবে পুরুষের দল। আরেকটা জ্বালানো হয়েছে চাঁদোয়ার নীচে। সেখানে শোবে মেয়েরা। খাওয়াদাওয়ার পরে এবারে খানিক গান-বাজনা চাই। তাই খোল, বাঁশি আর খঞ্জনি নিয়ে কীর্তন ধরল কেষ্টনগরের দল। পুন্যি-যাত্রায় এর চেয়ে ভালো গান আর কী হতে পারে। নতুন দলের সদস্যেরা একটু তফাতে বসে শুনছে সেই গান। কেষ্টনগরের দলের গান শেষ হতে রতন কত্তার দলও ধরলে একটা শ্যামাসংগীত। সকলেরই মন খুশি।

গান শেষ হওয়ার একটু পরেই দ্বিতীয় প্রহরের শিয়ালের দল ডেকে উঠে থেমে গেল। এবারে শুতে যেতে হবে। উঠতে গিয়ে রতন কত্তা বললে— ‘সকাল বেলা আর এক পোস্ত শুনতে চাই। সারাদিনের জন্যে মনটা বড়ো ভালো হয়ে যায় গো মাধব কত্তা।’ তাই বাজনার যন্তরগুলোকে চাঁদোয়ার নীচে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হল। সকাল বেলায় নামগান সেরে হাতেহাতে গুছিয়ে নিলেই হবে।

আগুনের কাছাকাছি শুয়েছে কেষ্টনগরের পুরুষের দল। একটু তফাতে শোওয়ার তোড়জোড় করছে নতুন দলের বেটাছেলেরা। এমন সময় দেখা গেল নতুন দলের কত্তার ছেলে নীলকান্ত আর হারাধন গাড়ু হাতে যাচ্ছে নদীর দিকে। রতন কত্তার কড়া নজর এইসব ছেলে ছোকরাদের দিকে। তাই হেঁকে বললে— ‘বাহ্যি করে তাড়াতাড়ি ফিরিস।’ তারপর ‘এত রাত্তিরে কেন যে এদের বাহ্যি পায় কে জানে’ বলে গজগজ করতে করতে শুয়ে পড়ল সে। নীলকান্ত আর হারাধন গাড়ু হাতে মিশে গেল নদীর দিকের গাঢ় অন্ধকারে।

পৌষের হাওয়ায় শীতের কুয়াশামাখা অন্ধকারকে বারবার ফুঁড়ে দিচ্ছে আগুনের ফুলকি। খানিক ওপরে উঠেই হাওয়াতেই মিলিয়ে যাচ্ছে সেগুলো। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রাধামাধবের ক্লান্ত চোখে নেমে আসে ঘুম। সে তলিয়ে যেতে থাকে ঘুমের গভীর তলে।

হঠাৎই ঝপাস্। একটা বড়ো মাছধরার জালে জড়িয়ে পড়েছে কেষ্টনগরের ঘুমন্ত পুরুষেরা। তাদের ওপর চলছে দমাদ্দম লাঠির বাড়ি আর বল্লমের খোঁচা। মাথা ফেটে যাচ্ছে, হাত-পায়ের হাড় ভাঙছে, বল্লমের ফলা ফুঁড়ে দিচ্ছে কারোর বুক, কারোর পেট। আর্তনাদ উঠছে আকাশ ফাটিয়ে। কিন্তু সে চিৎকার শুনবে কে? একেই তো শীতের রাতে ঘুমিয়ে পড়েছে খানিক দূরের বসতি আর তার ওপরে নতুন দলের তিন সদস্য খোল, বাঁশি আর খঞ্জনি বাজিয়ে উঁচু গলায় শুরু করেছে শ্যামাসংগীত। সেই আওয়াজে চাপা পড়ে যাচ্ছে আর্তনাদের চিৎকার। ওদিকে রতন কত্তার দলের তিন মহিলা তাদের মাথার তলায় রাখা পুঁটুলি থেকে ছোরা আর দা বের করে শাসিয়ে যাচ্ছে কেষ্টনগরের মহিলাদের যাতে তারা টুঁ শব্দও না করে। অবশ্য এই শাসানিরও দরকার ছিল না। চোখের সামনে এই নৃশংস হত্যালীলা দেখে তারা এমনিতেই থম মেরে গেছে। তাদের দলের পুরুষদের প্রাণবায়ু তাদের চোখের সামনেই আগুনের ফুলকির মতো মিলিয়ে যাচ্ছে রাতের বাতাসে। শুধু তাদের দলের বাচ্চাটা তখনও ঘুমোচ্ছে অকাতরে।

সমস্ত ব্যাপারটা দাঁড়িয়ে থেকে তদারক করছে রতন কত্তা। কেষ্টনগরের কে একজন জাল গলে পালাতে যাচ্ছিল। কিন্তু সজাগ রতন কত্তার হাতের দড়ি সড়াৎ করে এসে পেঁচিয়ে ধরল তার গলা। ছোঁড়ার বিশেষ কায়দায় দড়ির মাথায় বাঁধা ভারী সীসের বল সজোরে আঘাত করল লোকটার মাথার পেছনে। তারপরে এক হ্যাঁচকা টানে তার দেহটা এসে পড়ল প্রায় রতন কত্তার পায়ের কাছে। একটুখানি হাত-পা ছুঁড়ে নিথর হয়ে গেল লোকটা।

কেষ্টনগরের সব পুরুষদের ভবলীলা সাঙ্গ হতে সময় লাগল মাত্র মিনিট দশেক। তারপরে নীলু আর হারু জাল ছাড়িয়ে নিতে নতুন দলের সবাই তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখতে লাগল প্রত্যেকটা পুঁটুলি আর মৃতদেহগুলোর ট্যাঁক। যে যা পেল নিয়ে এসে জমা করল তাদের জিম্মেদার রতন কত্তার কাছে। রতন কত্তা নিজে মাধব কত্তার কোমরে গোঁজা বটুয়া থেকে কাগজে মোড়া সোনার টিপ আর বেলপাতাটা বের করে নিজের ট্যাঁকে গুঁজে রাখল। গ্রামে ফিরে মা কালীর পায়ে সমর্পণ করবে তা। বাকি সব লুঠের মাল একটা গামছায় পুঁটুলি করে বেঁধে নিলো। সবার মধ্যে সমান ভাগে ভাগ হবে সেগুলো কাল সন্ধেবেলা মায়ের মন্দিরের চাতালে।

লুঠপাট শেষ হতে রতন কত্তা বললে— ‘এবার লাশগুলো জলদি নদীতে আর জঙ্গলে ফেলে দে আয়। তারপর জিনিসপত্তর গুইছে নে চটপট, তাইলে ভোরের মুকেই ঢুকতে পারব গেরামে।’

কত্তার কথামতো কাজ শেষ হতে হতে গড়িয়ে গেল তৃতীয় প্রহর। তারপরে ফিরতি পথে সদলবলে এগিয়ে চলল রতন কত্তা। সঙ্গে কেষ্টনগরের মহিলারা আর বাচ্চাটাও। পেছনে পড়ে রইল প্রায় নিভন্ত আগুনের কুণ্ডগুলো আর চূর্ণী নদীর পাড়ে ও জঙ্গলে পড়ে রইল কেষ্টনগরের পুরুষদের লাশ। আসলে কেষ্টনগরের সরল মানুষগুলো জানত না যে, পথের বন্ধুত্ব পথেই শেষ হয়ে যায়।

তবে সেদিন আর চতুর্থ প্রহরে শিয়ালগুলো ডাকেনি। তারা ব্যস্ত ছিল অন্য কাজে যে…।

.

গ্রামে যখন রতন কত্তার দল পৌঁছল তখন সবে ভোরের আলো ফুটছে। অন্ধকার কাটিয়ে দিয়ে কুয়াশার আড়াল থেকে আরেকটু পরেই উঁকি দেবেন সূয্যিদেব। আলোয় ভরে যাবে চারিদিক। দলের সঙ্গে আসা কেষ্টনগরের মহিলারা তখনও ফোঁপাচ্ছে। রতন কত্তার দলের তিন মহিলা তাদের ধরে ধরে নিয়ে আসছে।

দলটা গিয়ে থামল সোজা মা কালীর থানে। দলের পুরুষেরা ওই ঠান্ডার মধ্যেও পাশের পুকুর থেকে ডুব দিয়ে এল। ভিজে কাপড়েই রতন কত্তা প্রতিমার সামনে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে মূর্তির পায়ে অর্পণ করলে সেই সোনার বেলপাতাটা। তারপর উঠে টিপটা প্রতিমার কপালে লাগিয়ে দিয়ে দু-হাত জোড় করে বিড়বিড় করে বললে—‘অপরাদ নিসনি মা। তোর বেলপাতা আর টিপ তোকেই দিলাম। তুই তো জানিস মা আমাদের দু-বেলা ঠিকমতো ভাত জোটে না। সেচের অভাবে জমিতে ফসল হয় না। তোর এই গরিব ছেলে-মেয়েরা শুধু পেটের দায়েই অপরাদ করে। আমাদের তুই ক্ষমা করিস মা।’ তারপরে দলের দিকে ফিরে আদেশ দিলে— ‘এই মহিলাদের এক একজন আমাদের এক একজনের ঘরে ঠাঁই পাবে। তাদের সম্মান দিয়ে শিকিয়ে পড়িয়ে আমাদের যুগ্যি করে তোলার দায়িত্ব তোমাদের। তোমরা সে কতা জানো। তবু একবার স্মরণ কইরে দিলাম।’

হঠাৎই রতন কত্তার চোখ পড়ে যায় এক যুবতী বিধবার দিকে। তার সাথে এক শ্যামলা রঙের বছর দুয়েকের ছেলে। মায়ের আঁচল ধরে তার কোলটি ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। একটুক্ষণ কী যেন ভাবে রতন কত্তা। তারপর হাঁক দেয়— ‘নীলকান্ত ইদিকে আয় দিকি।’ নীলকান্ত ভেজা কাপড়ে উঠে আসে মায়ের মন্দিরের চাতালে। তারপরে কত্তা নিজেদেরই এক মহিলাকে বললে— ‘যাও, ওই মেয়েকে নে গে একটা ডুব দে আনোগে দেকি।’ সেই মহিলা ওই বিধবাকে নিয়ে গিয়ে পুকুরঘাটে একটা ডুব দিইয়ে নিয়ে হাজির করায় মন্দিরে, রতন কত্তার কাছে। তখন রতন কত্তা সেই যুবতী বিধবাকে বলে— ‘মা, তুমি বেধবা। তার ওপরে তোমার সন্তান আচে। এই গেরামের কেউ তোমাকে তাদের ঘরে ঠাঁই দেবেনি। তাতে তোমার কষ্টের সীমা থাকবে না মাগো। তাই বলি কী, তোমার একজনকে দরকার, যে তোমাকে আর তোমার সন্তানকে আপদে-বেপদে রক্কে করবে। তোমাদের যত্নআত্তি করবে, ভালোবাসবে।’ একটু থেমে কত্তা আবার ধীরে ধীরে বলতে থাকে— ‘তা তোমার যদি আপত্তি না থাকে, তবে আমার ছেলে নীলকান্ত তোমায় ঠাঁই দিতে পারে ইস্তিরির মতো। ওর অ্যাকোনো বে হয়নি। এবারে ভেবেচিন্তে কও তো মা, তুমি কি রাজি?’

বিধবা মহিলা ফ্যালফ্যাল করে একবার তাকায় নীলকান্তর দিকে আর একবার তাকায় রতন কত্তার দিকে। তারপরই আঁচলে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ওঠে। বিধবা হওয়ার কারণে শ্বশুরবাড়ির লাঞ্ছনা, বাপের বাড়িতে এসে থাকার সময় ভাই আর তাদের বউদের খোঁটা, সব কিছু তোলপাড় করে দেয় তার ভেতরটাকে। তার আর তার ছেলের কি ভবিষ্যৎ; তা সে নিজেই জানে না। তাই উত্তর খুঁজে না পেয়ে চুপ করে থাকে সে।

—‘কি মা, কইলে না তো তোমার কি মত?’

যুবতী এবার মুখ নীচু করে। ভাবে, তার তো আর হারাবার কিছুই নেই। সবাইকে হারিয়ে কেষ্টনগরেও আর ফেরা যাবে না। এখন ছেলেটাকে বড়ো করা দরকার। আর তা ছাড়া কতদিন যে হয়ে গেল স্বামীসঙ্গসুখ…।

আস্তে আস্তে মুখ তুলে সে এবারে তাকায় নীলকান্তর দিকে। শ্যামলা গায়ের রং, সুঠাম দেহ নীলকান্তর। মুখটাও মোটের ওপর বেশ সুন্দর। নতুন সূৰ্যের রাঙা আলোয় চিকচিক করছে নীলকান্তর দরাজ বুকের পাটার ওপরে লেগে থাকা জলের ফোঁটাগুলো। ভারি সুন্দর লাগছে তাকে। তাই ভালোলাগার নতুন লজ্জায় মুখ নীচু করে যুবতী। তারপর আস্তে ঘাড় হেলিয়ে সম্মতি জানায়।

—‘তোমার নাম কী মা?’

—‘শ্যামাঙ্গিনী।’

শুনেই চমকে ওঠে রতন কত্তা। আজ থেকে তবে কি কৃষ্ণ আর কালী যুগলমূর্তিতে বিরাজ করবে এই হতদরিদ্র গ্রামে? একবার আকুতিভরা চোখে কালীমূর্তির দিকে তাকায় সে। তারপরে নীলকান্তকে বলে— ‘নীলু, মায়ের ঘটের সিঁদুর পইরে দাও শ্যামাঙ্গিনীকে।’

নীলকান্ত বুড়ো আঙুলে করে দেবীমূর্তির ঘট থেকে সিঁদুর নিয়ে রাঙিয়ে দেয় শ্যামাঙ্গিনীর সিঁথি। গ্রামের মহিলারা উলু দিতে থাকে আর পুরুষেরা তাদের হাতের লাঠি উঁচিয়ে দাপিয়ে বলে ওঠে— ‘জয় মা ভবানী, জয় মা করালবদনী।’

সবাই থামলে পরে রতন কত্তা বলে— ‘নীলকান্ত আর শ্যামাঙ্গিনী, আজ থেকে তোমরা এই গাঁয়ে আমারই বাড়িতে থাকবে সোয়ামী-ইস্তিরির মতো। আর তোমাদের এই সন্তানের আগের নাম যাইই হোক না কেন, আজ থেকে সবাই তাকে নিশিকান্ত নামেই ডাকবে। এর অন্যতা যেন না হয়। আর সব্বাই শুনে রাকো, এই ছেলের মোদ্দে শ্যামা আর কৃষ্ণ যুগলে বিরাজ করবেন। তাই তোমাদের সকলের শেকা সেরা বিদ্যে একে দেবে। আমার পরে এইই হবে এই গেরামের রক্কেকত্তা। এ আমার হুকুম। সব্বার মনে থাকে যেন।’

এই কথা বলে নিশিকান্তকে বুকে তুলে নেয় রতন কত্তা। ততোক্ষণে সূয্যি অনেকটাই উঠে গেছে।

তাহলে কি আর এক ঠগি জিম্মেদারের বীজ বোনা হয়ে গেল নিশিকান্তের মধ্যে?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *