জানুয়ারি, ১৯৪৫ – কানাইয়ের মমি দর্শন, জবানবন্দির ফোটোকপি আর নির্মল সেন
পয়লা জানুয়ারি। তাই আজ ছুটি। যুদ্ধের বাজারেও যার যেমন সামর্থ্য, তেমন করেই নতুন ইংরাজি বছরকে বরণ করে নিয়েছে সবাই। যুদ্ধের বাজার হলেও গতকাল মাঝরাতে সায়েবপাড়ায় যে আতসবাজি পুড়েছে তার রোশনাই দেখা গেছে বউবাজারের ছাদ থেকেও। কানাই এই প্রথমবার দেখছে সব। তাদের গ্রামে তো এসবের কোনো বালাই নেই। তাই তার মনটাও বেশ খুশি খুশি।
সেইজন্যেই বোধ হয় দুপুরের খাওয়া শেষ হতেই কানাই বলল— ‘স্যার, আজ তোমার আর সুবিমল কাকুর অফিসটা দেখে এলে হত না?’
বুদ্ধিমান ছেলে। আসলে সে জাদুঘরটা দেখতে চাইছে। তাই সরাসরি না বলে ঘুরিয়ে বলল কথাটা। তার ইচ্ছেটা বুঝেই রজনী বলল— ‘ঠিক আছে চল। দেখবি কেমন কাঁচের বাক্সে শুয়ে আছে মমি।’
মিশর দেশে পিরামিড আর মমি, দুটোই আছে। পিরামিডের মধ্যে থাকত মমি। আর আছে নীলনদ। এসব কথা বইতে পড়েছে কানাই। তাই আজ মমি দেখতে পাবে বলে বেশ উত্তেজিত সে। তাই দুপুর একটা নাগাদ বেরিয়ে পড়ে তারা।
জাদুঘরের গেটে ঢুকেই সে বলে ওঠে— ‘ওই দেখ স্যার, অশোকস্তম্ভ।’ যেন রজনী কখনো দেখেনি সেটা আগে। সে কানাইয়ের এই উৎসাহ আর কৌতূহলকে দমিয়ে দিতে চায় না। বলে— ‘আগে আমার অফিস ঘরটা দেখে নে। তারপর মেলাই সময় পাবি।’ রজনী তাকে নিয়ে যায় সেই ঘরে, যেখানে সে বসে কাজ করে।
ঘরে ঢুকে দেখে আজ ছুটির দিনেও ড্যানীবাবু তাঁর টেবিলে বসে কাজ করছেন। তাকে দেখে হেসে বললেন— ‘আরে রজনী যে। এসো এসো। তা কেমন যেন একটা লাগছে তোমায়। হুম, বুঝেছি, ক-দিন দাড়ি কামাওনি মনে হচ্ছে।’
—‘হ্যাঁ স্যার। মানে এই নানান ব্যস্ততায়…। তারপর একে নিয়ে কলকাতা দেখাতে হচ্ছে। তাই আর কী…।’
—‘ও, তা এই বুঝি তোমার সেই ছেলে যার জন্যে তুমি স্কুল খুঁজছিলে?
—‘হ্যাঁ স্যার, এইই সেই। এই কানাই স্যারকে প্রণাম কর।’
কানাই গিয়ে ড্যানীবাবুকে প্রণাম করতেই উনি তাকে কাছে টেনে নিয়ে একটু জড়িয়ে ধরেন।
—‘তা তোমার নাম কী বাবু?’
—‘আজ্ঞে কানাই। মানে শ্রীকানাই দত্ত।’
—‘তা তুমি কি মিউজিয়ম দেখতে এসেছ তোমার স্যারের সঙ্গে?’
—‘হ্যাঁ। আমার স্যার বলেছে যে এখানে নাকি মিশর দেশের মমি আছে?’
—‘তা শুধু মমি কেন, এখানে আরও কতকিছু আছে যা তুমি একদিনে দেখে শেষ করতে পারবে না।’
—‘আবার অন্যদিন এসে দেখব। স্যার আর সুবিমল কাকু তো এখানেই কাজ করে।’
—‘তবে এবারে তো তোমায় এখানের স্কুলে ভরতি হতে হবে। সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে যে।’
—‘ঠিক আছে স্যার, আমি তো কলকাতায় পড়বো বলেই এসেছি।’
—‘তা তোমায় তো হস্টেলে থাকতে হবে।’
বিস্ময়ে রজনী বলে— ‘হস্টেলের ব্যবস্থাও হয়ে গেছে স্যার?’
—‘হ্যাঁ। গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের মুকুলবাবুকে বলেছিলাম। রিটায়ার করলে কি হবে, উনি একজন বিখ্যাত ব্যক্তি। সবাই সম্মান করে। তা উনিই বলে কয়ে হস্টেলের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।’ বলে ড্রয়ার খুলে একটা খাম রজনীর হাতে দিয়ে বললেন—‘এই নাও ওনার রেফার লেটার। তুমি আজ না এলে আমিই ফোন করে আসতে বলতাম তোমায়। মনে থাকে যেন, পরশু দিন অ্যাডমিশন।’
—‘বাঃ, তাহলে তো ভালোই হল। কানাই, তোর হস্টেলের ব্যবস্থা স্যার করে ফেলেছেন।’
কানাই ড্যানীবাবুকে বলে— ‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।’
—‘ওয়েলকাম মাই বয়। তা শুনেছি যে তুমি নাকি জুডো জানো?’
—‘জুডো নয় স্যার, তাইকোন্ডো।’
—‘ও আচ্ছা, আচ্ছা। বুঝেছি। তা কখনো রাগ হলে যেন হস্টেলের ছেলেদের ওপরে ওটার প্রয়োগ করে বোসো না। তাহলে কিন্তু হস্টেল থেকে তাড়িয়ে দেবে।’
—‘না স্যার, ওরা তো আমার বন্ধু হবে। বন্ধুদের সাথে তাইকোন্ডো খেলতে হয়। বন্ধুদের মারতে নেই।’
—‘ঠিক বলেছ। তবে আমার মনে হয় ওরা তাইকোন্ডো জানে না।’ এই সরল ছেলেটার সাথে ড্যানীবাবু গল্প জুড়েছেন বলেই মনে হচ্ছে।
—‘আমি ওদের শিখিয়ে দেব স্যার।’
—‘হুমম, হি ইস আ ভেরি স্মার্ট বয় রজনী। যাও, আর সময় নষ্ট না করে ওকে মিউজিয়মটা ঘুরিয়ে দেখাও।’
এমন সময় হাজির মুক্তোরাম। রজনীকে দেখেই সে বলে উঠল— ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার স্যার। ভালো আচেন তো?’
শহরে থাকতে থাকতে মুক্তোরামও আদব-কায়দা বেশ শিখে গেছে। জবাবে তাই রজনী বলে— ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার। তা তোমার কী খবর কি মুক্তোরাম?’
—‘এই চলে যাচ্চে। অপিসের আদ্দেকের বেশি লোকই তো ছুটিতে স্যার। ক্যান্টিনে খাবার লোক খুবই কম। তা আপনাকে একটু চা দেব নাকি? সবারই তো চা খাওয়া হয়ে গেচে।’
—‘না, চা লাগবে না। তা তোমার হাতে কি সময় আছে? যদি থাকে, তাহলে এই ছেলেটাকে একটু মিউজিয়মটা ঘুরিয়ে দেখাতে পারবে?’
—‘এটি কে স্যার?’ মুক্তোরাম কথাটা বলে কানাইকে দেখে।
—‘এ আমার ছাত্র। এখানকার স্কুলে ভরতি হবে। তাই ক-দিন কলকাতা ঘুরে দেখছে আমার সাথে।’
—‘সে তো ভালোই। ইস্কুল খুলে গেলে তো আর ছুটিছাটা ছাড়া দেকা হবে না। তা তোমার নাম কী বাবু?’ শেষের কথাটা কানাইকে বলা। সে এতক্ষণে বুঝে গেছে যে মুক্তোরাম জাদুঘরে কাজ করে।
—‘শ্রীকানাই দত্ত।’
—‘বাঃ। বেশ সোন্দর নাম। তা চল, আমরা ঘুরে দেকে আসি সব।’
—‘আগে আমাকে মমির ঘরে নিয়ে চল।’
—‘বেশ তো, মমি দিয়েই শুরু করা যাক। চল।’
কানাই আর মুক্তোরাম চলে যেতেই জাদুঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে রজনী। কাছেই ৪৭ নম্বর কিড স্ট্রিটে খোঁজ করে শ্যামাদাসের দেখা পায় না। সে নাকি তিনদিন আগে ঘর ছেড়ে চলে গেছে। তার মানে সে পিটারের মারা যাওয়ার খবর পেয়েই কেটে পড়েছে। পিটারের মৃত্যুর পর থেকেই রজনীর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে বলতে থাকে আবার হয়তো কিছু একটা ঘটবে। বিশেষ করে ডনের তরফ থেকে। তাই সে তার কাঁধের ঝোলানো অফিসে আসার ব্যাগে বিশেষ বিশেষ কিছু জিনিসপত্র নিয়েই বেরোয়। কখন কী ঘটে তার জন্যে আগে থেকেই সবরকমভাবে তৈরি থাকা ভালো। কে জানে কখন কোনটা কাজে লাগে। তাই অফিসে ফেরার পথে সে একটা ভ্যাটের কাছে একটু দাঁড়িয়ে ব্যাগ থেকে বের করে একটা শিশি। তার ভেতরের তরলটা দু-হাতের চেটোয় ভালো করে মেখে শিশিটা ছুঁড়ে ফেলে দেয় ভ্যাটে। অফিসে ঢুকতে ঢুকতেই শুকিয়ে যাবে হাতে মাখা তরলটা।
আধঘণ্টার মধ্যেই অফিসে ঢুকে নিজের টেবিলে বসে তার ব্যাগ থেকে বের করে সে লিন আঙের টেলিগ্রাম আর পিটারের লেখা জবানবন্দির ফোটোকপি। বাড়ি থেকে একফাঁকে বেরিয়ে ধর্মতলার একটা স্টুডিয়ো থেকে ছবি তুলিয়েছে সেগুলোর। তবে সেগুলো স্টুডিয়োতে দেওয়ার বা নেওয়ার সময়ে আগে থেকেই সে হাতে মেখে নিয়েছিল তার ব্যাগে রাখা সেই বিশেষ তরলটা। অর্থাৎ কি না, কোনো কিছুতেই তার হাতের ছাপ থাকবে না। তাই এবারে টেবিলের টাইপ মেশিনের ঢাকা খুলে একটা সাদা কাগজ লাগায় সেটায়।
—‘পার্সোনাল কাজ বুঝি?’ ভেসে এল ড্যানীবাবুর গলা।
—‘হ্যাঁ স্যার।’
—‘ঠিক আছে কর।’ বলেই স্মিত হেসে নিজের কাজে ডুবে গেলেন ড্যানীবাবু। তারপরেই বলে ওঠেন— ‘কোথায় যেন স্পিরিটের গন্ধ পাচ্ছি। ল্যাব থেকে কি? মনে হয় বোতলের ছিপিটা খুলে রেখে এসেছি।’ তাড়াতাড়ি উঠে ল্যাবরেটরির দিকে দৌড়ন ড্যানীবাবু।
চিঠির টাইপ শেষ করে ব্যাগ থেকে একটা মাঝারি সাইজের খাম বের করে মেশিনে চড়ায় সে। খামের ওপরে টাইপ করে লিখল— ‘ডি.সি, ডি ডি ডিপার্টমেন্ট, লালবাজার, কলকাতা’। তারপরে সেই খামের মধ্যে টাইপ করা চিঠি, টেলিগ্রাম আর জবানবন্দির ফোটোকপি ঢুকিয়ে খামের মুখটা আঠা দিয়ে আটকে দিল। একটা স্ট্যাম্পও লাগিয়ে দিল খামে। কানাইকে আজ যখন কে.সি.দাসের কড়াপাকের সন্দেশ খাওয়াতে নিয়ে যাবে, তখন ওখানেরই একটা লেটার বক্সে ড্রপ করে দিলেই হবে।
