রজনীর জ্বর, কোল্ট পয়েন্ট থ্রি টু আর সত্য-সংবাদ
বৃহস্পতিবার বাড়ি ফিরে ধুম জ্বর এসেছিল রজনীর। তাই চুপচাপ দরজা ভেজিয়ে অঘোরে বিছানায় পড়েছিল সে। কেষ্টদা চা দিতে এসে বন্ধ দরজায় টোকা মেরে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে দরজা ঠেলে ঢোকে। দু-চার বার ডাকাডাকি করে গোঙানির শব্দ শুনে সে রজনীর গায়ে হাত দিয়ে বুঝতে পারে যে তার গায়ে ধুম জ্বর। তাই তার গায়ে কম্বলটা চাপা দিয়ে সে গিয়ে খবর দেয় বাড়িওয়ালা পরিতোষ মিত্তিরকে। পরিতোষবাবুই কেষ্টকে দিয়ে ওষুধের দোকান থেকে অ্যাসপিরিন ট্যাবলেট এনে খাইয়ে দেন রজনীকে। ঘণ্টাদুয়েক পরে আবার আসেন পরিতোষবাবু। ততক্ষণে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়তে শুরু করেছে।
পরিতোষবাবু বলেন— ‘জ্বরটা কমেছে মনে হচ্ছে।’
—‘হ্যাঁ।’
—‘শোনো, কালও যদি একইসময়ে জ্বর আসে তবে ডাক্তার দেখাতে হবে। কলকাতায় ম্যালেরিয়ার খুব উপদ্রব। ম্যালেরিয়া হলে ডাক্তার তখন হয়তো কুইনাইন প্রেসক্রাইব করবে। তা সেসব পরের কথা। এখন বল তো, জ্বরটা কি খুব কাঁপুনি দিয়ে এসেছিল?’
—‘না।’
—‘ঠিক আছে। আমি দুটো অ্যাসপিরিন ট্যাবলেট রেখে যাচ্ছি। রাতে দরকার পড়লে খেয়ে নিও। আর হ্যাঁ, আজ রাতে আর ভাত খেওনা। আমি বরং কেষ্টকে দিয়ে দুধ-সাবু পাঠিয়ে দেব।’
রজনী ঘাড় নেড়ে সায় দেয়।
পরিতোষবাবু যেতে যেতে বলেন— ‘এই কেষ্ট, দাদাবাবুর মশারীটা খাটিয়ে দিয়ে যা।’
.
শুক্রবার অফিসে বসে খবরের কাগজটা খুলতেই বোবা হয়ে যায় রজনী। প্রথম পাতাতেই তিনটে লাশের ছবি। ওপরে হেডলাইন—
বিপ্লবীর হাতে ওসি খুন
লালবাজারের পুলিশ কমিশনার R.E.A RAY তড়িঘড়ি সাংবাদিক সম্মেলন করে জানিয়েছেন যে চাঁপাডাঙা নিবাসী পুলিন বিশ্বাস নামের এক বিপ্লবী কলকাতার মার্কুইস স্ট্রিটের এক চীনে জুতোর দোকান থেকে রিভলভার পাচার করছিল। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে নারকোটিক্স ডিপার্টমেন্টের ডি.সি পিটার ব্রাগানজা নিউমার্কেট থানার ও.সি দূর্গাদাস সাহারায়কে ব্যাপারটা জানান। দূর্গাদাস তাঁর সহকারীকে নিয়ে মার্কুইস স্ট্রিটে গতকাল সন্ধে ছ-টা নাগাদ হানা দেন। কিন্তু ওই বিপ্লবী পুলিন বিশ্বাস ও.সি দূর্গাদাস আর তার সহকারীর দিকে গুলি ছুঁড়তে থাকে। জবাবে পুলিশও গুলি ছোঁড়ে। গুলি বিনিময়ের ফলে ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয়।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে কমিশনার আরও জানিয়েছেন যে, ঘটনাস্থলের পাশ থেকে পুলিশ ওই বিপ্লবী যে প্যাকেট পাচার করছিল সেটা খুঁজে পায়। তাতে পাওয়া যায় একটা কোল্ট পয়েন্ট থ্রি টু রিভলভার। কাগজে তার একটা ছবিও দেওয়া আছে। পুলিশ সেটা বাজেয়াপ্ত করেছে আর বডিগুলো পোস্ট মর্টেমের জন্যে পাঠানো হয়েছে। সাম্প্রতিককালে ক্যালকাটা পুলিশের এটা একটা সাফল্য। পুলিশ এখন ওই অস্ত্রপাচার চক্রের সন্ধান করছে।
খবরটা কোনোরকমে পড়ে ভাঁজ করে ঢুকিয়ে রাখে ব্যাগে। আর কোনো খবর তার পড়তে ইচ্ছে করছে না। মনটা বড্ডো ভারী হয়ে আছে। হয়তো এটাই ছিল পুলিনের নিয়তি।
মুক্তোরাম ডাকল— ‘স্যার চা।’
তার ডাকে হুঁশ ফিরল রজনীর। তাকে বিমর্ষ দেখে মুক্তোরাম জিজ্ঞেস করলে—‘কিচু হয়েচে স্যার?’
চায়ে চুমুক দিয়ে রজনী বুঝল— এটা তার কাজের জায়গা। মনে যতোই কষ্ট থাকুক এখানে বিষণ্ণ হয়ে থাকলে চলবে না। তাই নিজেকে খানিকটা সহজ করে নেবার জন্যেই বলল— ‘কাল রাতে ভূতে ধরেছিল আমায়।’
—‘সে কি স্যার। বলেন কি? আপনার বাড়িতেও ভূত? না না স্যার, আপনি নিশ্চই ভুল দেকেছেন।’
—‘হয়তো হবে।’ নির্লিপ্ত জবাব রজনীর। আসলে কথা বলতেই ইচ্ছে করছিল না তার।
—‘না স্যার। এসব ভালো জিনিস নয়। আপনি পারলে বাড়িটা বদল করে নিন।’
এমন সময় ঘরে ঢুকলেন ড্যানীবাবু। তারা দুজনেই তাঁকে ‘গুড মৰ্নিং’ জানাল। জবাবে উনিও তাদের ‘গুড মৰ্নিং’ জানিয়ে নিজের ঢাউস টেবিলটায় গিয়ে বসলেন। মুক্তোরাম ওনার কাপে চা ঢেলে দিয়ে ঘর ছাড়ল।
চায়ে দুটো চুমুক দিয়ে ড্যানীবাবু বললেন— ‘আজকের কাগজটা পড়েছ?’
—‘হুঁ।’ ছোট্টো জবাব রজনীর।
—‘অনেকদিন পরে এই দেখলাম একটা বাচ্চা ছেলেকে শহীদ হতে। কীসের অমোঘ টানে যে এরা ছোটে…। জানো রজনী তোমাকে একটা কথা পার্সোন্যালি বলছি। কাউকে বলবে না কিন্তু।’ এই কয়েকটা দিনেই ড্যানীবাবু বেশ আপন করে নিয়েছেন তাকে।
—‘না স্যার, বলব না।’
একটা গভীর শ্বাস ফেলে ড্যানীবাবু বলতে লাগলেন— ‘আমি এই যে সায়েবদের অধীনে কাজ করে অর্থ পাই, সম্মান পাই; এক এক সময়ে মনে হয় এসবই ফাঁকা কলসির মতো। ভেতরটায় কিচ্ছু নেই। মানে ওরা আমাকে যে অর্থ আর সম্মান দেয় তা স্রেফ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করার জন্যে। নইলে ওদের মনের ভেতরে গেলে দেখবে, ওরা আমাদের স্লেভ ভাবে, ঘেণ্ণা করে।’
একটু থেমে চায়ে চুমুক দিয়ে ড্যানীবাবু আবার বলতে থাকেন— ‘সত্যি বলছি, বয়সটা কম থাকলে আমিও নির্ঘাত ওই বিপ্লবীদের দলে নাম লেখাতাম। লেখাপড়া ভালোবাসতাম বলে যখন সময় ছিল তখন এসব নিয়ে ভাবিনি। তবে ইংরেজ যদি ভারত ছাড়ে; অবশ্য হয়তো ছাড়তেও বাধ্য হবে, তবু কিন্তু ওদের এই আড়াইশো বছরের শাসনের ছাপ রেখে যাবে সমাজের সর্বত্র। হয়তো স্বাধীন হওয়ার পরে আরও দু-শো বছর লাগবে ওদের ছড়িয়ে দেওয়া ঘুণপোকাগুলোকে শেষ করতে। অবশ্য আমরা যদি সৎপথে চলতে পারি তবেই।’
খানিকক্ষণ চুপচাপ। রজনীর মনে হয় ড্যানীবাবুর কথাগুলো হয়তো সত্যি। জ্ঞানী মানুষদের একটা অন্তর্দৃষ্টি থাকে। তাই উনি দেখতে পেয়েছেন দেশের ভবিষ্যৎ।
একটু পরে পকেট থেকে একটা রুপোর টাকা বের করে রজনীকে বললেন— ‘কবে যে এই টাকায় জর্জ দ্য সিক্সথ এর বদলে সুভাষ বোসের ছবি দেখব কে জানে।’ একটা দীর্ঘশ্বাস বেরোয় তাঁর বুক থেকে।
তারপরে চা টা শেষ করে বললেন— ‘চল ল্যাবে যাই। গুজরাটের কচ্ছ থেকে দুটো সি-হর্সের ফসিল এসেছে। আমি কাল দুটোকে ডিসটিলড ওয়াটারে ভিজিয়ে রেখে গেছি। চল, দু-জনে মিলে ও দুটোকে সাফ-সুতরো করে ফেলি। খুব সাবধানে এই কাজটা করতে হবে বুঝলে। আমি তো তোমাকে দেখিয়েই দিয়েছি সব। আগে অন্য কাজও তুমি করেছ। তবে আজকের নতুন এই কাজটাতে ইন্টারেস্ট পাবে এটুকু বলতে পারি।’
ল্যাবের দিকে যেতে যেতে রজনী বলল— ‘স্যার একটা কথা বলব?’
—‘বল।’
—‘কলকাতার কোনো স্কুলে কী আপনার জানাশোনা আছে?’
একটু ভেবে নিয়ে ড্যানীবাবু বললেন— ‘হ্যাঁ, হিন্দু স্কুলের প্রিন্সিপ্যালের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে। কিন্তু কেন বল তো? তুমি তো এখনও বিয়ে-থা করোনি? তবে কীসের জন্যে?’
—‘আমাদের গ্রামে আমার পরিচিত একটা বছর বারোর ছেলে আছে। খুবই ইনটেলিজেন্ট, তবে গরিব। আমার ইচ্ছে ওকে ভালো করে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করে তোলা। যখন গ্রামে ছিলাম তখন কোনো সাবজেক্টের কিছু বুঝতে না পারলে আমি ওকে দেখিয়ে দিতাম। তা এখন তো আমি প্রায় সারা সপ্তাই কলকাতায় থাকি। তাই চাইছিলাম যদি কলকাতায় ওর একটা ব্যবস্থা করে লেখাপড়াটা শেখানো যায়…’
—‘বাঃ, বাঃ। বেশ ভালো ভাবনা। তারিফ করার মতো। আচ্ছা, ঠিক আছে। দেখবোখন একবার ফোন করে। তা ফ্রি-শিপ চাই নাকি? আর হস্টেল?’
—‘হলে তো ভালোই হয় স্যার।’
—‘তা কোন ক্লাসে ভরতি করাতে চাও?’
—‘আজ্ঞে, ফিফথ ক্লাসে।’
—‘ঠিক আছে ফোন করব। ব্যাপারটা মাথায় রইল। তবে তুমিও পরে আমায় খেয়াল করিয়ে দিও।’
ল্যাবরেটরিতে ঢুকে ইস্তক ড্যানীবাবু লক্ষ্য করেন যে আজ রজনীকান্ত যেন বেশ বিমর্ষ। এমনিতে ছেলেটা একটু ইন্ট্রোভার্ট, তবুও আজ কেমন যেন আনমনা লাগছে তাকে। নইলে বলে দেওয়া সত্বেও ভিনিগার মেশানো জলে ফসিলটা ডুবিয়ে হালকা হাতে ম্যাট্রিক্সগুলো ব্রাশ-ওয়াশ করার বদলে নিডল-ওয়াশ করতে শুরু করে? এতে ফসিলের মূল অংশের ক্ষতি হতে পারে। উনি হাঁ হাঁ করে উঠতেই অবশ্য সামলে নেয় রজনী।
তবে ড্যানীবাবু এও খেয়াল করেন যে ছেলেটাকে আজ যেন একটু ক্লান্তও মনে হচ্ছে। এমনকী লাঞ্চ টাইমে নীচে লাঞ্চও করতে গেল না। অফিসার্স ক্যান্টিন থেকে লাঞ্চ সেরে এসে দেখেন টেবিলে দু-হাত আড়াআড়ি রেখে মাথা ঝুঁকিয়ে বসে আছে রজনী। পিঠে হাত রাখতে মুখ তোলে সে। চোখদুটো তার লাল।
—‘শরীর খারাপ লাগছে?’
—‘না স্যার।’
—উঁহু, তা বললে তো হবে না। আমি বেশ বুঝতে পারছি যে তোমার কিছু একটা হয়েছে।’
কপালে হাত ঠেকিয়ে ড্যানীবাবু বললেন— ‘গা তো একটু গরম গরম লাগছে।’
—‘না স্যার। ও কিছু না।’
—‘ও কথা বলে পার পাবে না রজনী। মনে হচ্ছে তোমার জ্বর আসতে পারে। তাই বলি কী, তুমি এখন বাড়িতে গিয়ে রেস্ট নাও। আর জ্বর এলে অবশ্যই ডাক্তার দেখাবে। দরকারে ছুটি নিও। তারপর সেরে গেলে ফিট সার্টিফিকেট নিয়ে জয়েন কর। আমি ডিরেক্টরকে দিয়ে স্পেশাল মেডিক্যাল লিভ স্যাংকশন করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেব। নাও, এবার ওঠো দেখি।’
টেবিলের জিনিসপত্র গুছিয়ে রেখে নিজের ঝোলা ব্যাগটা নিয়ে রজনী বললে—‘তাহলে আসি স্যার।’
—‘হ্যাঁ এসো। সাবধানে যেও। আর মশারি খাটিয়ে শোও তো? জানবে কলকাতা হচ্ছে ম্যালেরিয়ার বসত বাড়ি।’
অসময়ে তাকে ফিরতে দেখে সুবিমলের মেসো বলে উঠলেন— ‘কী হল? আবার জ্বর আসছে নাকি?’
—‘না।’
—‘তাহলে কেষ্ট গিয়ে চা দিয়ে আসুক? আজ কিন্তু বেশ ক্লান্ত লাগছে তোমায়।’
—‘হ্যাঁ মেসোমশাই’ বলে রজনী দোতলায় উঠে বিছানায় এলিয়ে দেয় শরীরটাকে। সত্যিই ভেতরে ভেতরে চূড়ান্ত বিধ্বস্ত সে। অ্যাসপিরিন বা কুইনাইনের সাধ্য নয় তা সারানো।
.
দৈনিক সত্যসংবাদের অফিসে বসে একটা খবর লিখছিল নিখিলেশ মিত্র। মানিকতলার একটা সোনার দোকানে চুরির কেসের খবর। নিতান্তই মামুলি। তবুও আটটার মধ্যে সাব-এডিটরের টেবিলে ফেলতে হবে এটা। লেখা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আর মোটামুটি সত্তর-আশিটা শব্দ লিখলেই রিপোর্টটা কমপ্লিট হয়ে যাবে। এখনও আধঘণ্টা সময় আছে। তার মধ্যে হয়ে যাবে। নইলে কালকের কাগজে বেরোবে না খবরটা। চুরি, ডাকাতি, খুন-খারাবির খবর খুব খায় লোকে। আর তার সঙ্গে ইদানীং যোগ হয়েছে মন্বন্তর আর যুদ্ধের খবরও। এবারে খবরটা লেখা শেষ হলেই একবার ফোন করতে হবে তার স্কুল আর কলেজের বন্ধু লালবাজারের ডি. সি. ডি. ডি. নির্মল সেনকে— যদি কোনো স্কুপ পাওয়া যায়।
লেখা শেষ করে সে নির্মল সেনকে ফোন লাগায়। কাছের বন্ধু বলে তাকে আর অপারেটরের মাধ্যমে যেতে হয় না। নির্মলের ডাইরেক্ট নম্বর তার কাছে আছে আর তার নম্বরও আছে নির্মলের কাছে।
—‘হ্যালো, সেন স্পিকিং।’
—‘হ্যাঁ, আমি নিখিলেশ বলছি।’
—‘ও, বল কী খবর? তা কোনো জিলিপির দরকার পড়েছে বলে মনে হচ্ছে।’
দুই বন্ধুই জানে ‘জিলিপি’ শব্দের মানে। তাদের কাছে ‘জিলিপি’ মানে স্কুপ।
—‘হ্যাঁ, তা ওই পুলিনের কেসটার ভেতরের কথা।…কিছু আছে কি?’
—‘হ্যাঁ আছে। তুই সোওয়া ন-টা নাগাদ নিজামের সামনে থাকিস।’
—‘আচ্ছা। এখন রাখছি।’
এই বাজারে যে কাগজ যত স্কুপ দিতে পারবে ততোই তার কদর। বিশেষ বিশেষ স্কুপ তাই সন্ধের মুখেই বের করতে হয়। মোড়ে মোড়ে কাগজের হকাররা সংক্ষেপে বিষয়বস্তু বলে হাঁক পাড়ে— ‘টেলিগ্রাম’ ‘টেলিগ্রাম’। ইদানীং তো প্রায় রোজই বের করতে হচ্ছে; যুদ্ধের বাজার যে। অফিস ফেরত লোকজন হামলে পড়ে কেনে। এটাও কাগজের অফিসগুলোর একটা বিজনেস পলিসি। হু হু করে ‘টেলিগ্রাম’ বিকিয়ে যায় সন্ধে সাড়ে সাতটার মধ্যেই। বেশ ভালোই লাভ থাকে। তাই যে রিপোর্টার যত বেশি স্কুপ আনতে পারে, এডিটরের কাছে তার কদরও তত বেশি। আর এই ব্যাপারে নিখিলেশের বেশ নামডাকও আছে।
নিজের টেবিলে আধঘণ্টার মতো অপেক্ষা করে সে উঠে পড়ে। কপিটা জমা দিয়ে সাব-এডিটরকে বলে শুধু— ‘একটু জিলিপি খেতে যাচ্ছি।’ তারা দুই বন্ধু ছাড়া এই সাব-এডিটরই জানেন শুধু ‘জিলিপি’ শব্দের মানে। সে জানে, সুলুক সন্ধানী নিখিলেশ প্রায়ই দারুণ সব স্কুপ নিয়ে আসে। তবে ‘সোর্স’ সে কখনোই বলে না। সাব-এডিটর জানেন নিখিলেশের এই এথিক্স। আর তাঁর ‘সোর্স’ জেনেই বা লাভ কী? নিখিলেশের দেওয়া খবরের জেনুইনিটি সম্বন্ধে তাঁর কোনো সন্দেহ নেই। তাই উনি চোখ তুলে বলেন— ‘ঠিক আছে। এসো।’
ন-টা পাঁচ নাগাদ নির্মল সেন সাদা পোশাকে বেরিয়ে তার গাড়ির ড্রাইভারকে বলে— ‘নিজাম চল। তারপর বউদিকে নিউমার্কেট থেকে তুলে বাড়িতে নামিয়ে আবার আমার কাছে এসো। বাড়ি ফিরব। আর বউদি যদি আমার কথা জিজ্ঞেস করে তো বলবে আমি অফিসে আছি।’
পুলিশের দুনিয়াটা যে কীরকম তা ড্রাইভার ভালো করেই জানে। এখানে চোখ যা দেখে, কান যা শোনে, তা মাথাতেই আটকে রাখতে হয়। নইলে…
ঠিক ন-টা বেজে দশে নির্মল গাড়ি থেকে নামে। নিখিলেশ তখন বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল। নির্মলকে নামতে দেখে হাতের সিগারেট ফেলে দিয়ে সোজা ঢুকে যায় ভেতরে। নির্মলও তার পেছন পেছন ঢুকে পড়ে। একটা কেবিনে মুখোমুখি বসে নিখিলেশ লাচ্ছা পরোটা আর কাবাবের অর্ডার দেয়। বেয়ারা খাবার দিয়ে যাওয়ার ফাঁকে নিখিলেশ তার ব্যাগ থেকে একটা রাইটিং প্যাড আর পেন্সিল বের করে রাখে। এতে শর্টহ্যান্ডে নোট নেবে সে তারপর বাড়িতে ফিরে তার থেকে একটা রিপোর্ট খাড়া করে সাব-এডিটরের টেবিলে সকালে জমা করবে।
বেয়ারা খাবার দিয়ে গেলে তারা তাকে বলে পর্দাটা টেনে দিতে যাতে বাইরে থেকে কেউ নির্মল আর নিখিলেশকে একসঙ্গে না দেখে।
একটুকরো পরোটার সাথে কাবাব মুখে পুরে নির্মল সেন বলে— ‘এই, খাবার মুখে দিয়ে নোটস নে না।’
—‘নারে, হাতে তেল লেগে গেলে অসুবিধে হবে। তার চেয়ে আগে নোটস নিয়ে নিই, তারপর খাওয়া যাবে। তুই খেতে খেতেই বলে যা না।’
নির্মল সেন খেতে খেতেই বলে— ‘কাটাছেঁড়া হয়ে গেছে। দুর্গার মেশিনে ছটা দানা ছিল। ফোন পেয়ে ফুল লোড করেই সে বেরিয়েছিল থানা থেকে।’
নিখিলেশ লিখতে থাকে।
—‘কে ফোন করেছিল?’
—‘সেটা তো আমারও অজানা। দুর্গা বেঁচে থাকলে বলতে পারত।’
নিখিলেশ মুখ তুলে বলে— ‘আচ্ছা। তারপর।’
—‘দুর্গার দুটো দানার একটা দিয়েছিল পুলিনকে আর একটা দিয়েছিল নিজের সঙ্গীকে।’ দ্রুত হাত চলছে নিখিলেশের।
—‘কিন্তু নিজের লোককেই সে দানা দিতে যাবে কেন?’
—‘সেটাই তো রহস্য। যাহোক, সেই দুটো দানাই ছিল কোল্ট পয়েন্ট থ্রি টু-র। আর দুর্গার বাঁ-পকেটে ছিল ওই ছেলেটার দেওয়া দানা। এক্কেবারে ফ্যাটাল শুট সবকটাই। কিন্তু…।’ আবার খাবার মুখে তোলে নির্মল।
—‘কিন্তু, কী?’
—‘ছেলেটার দেওয়া দানাটা কোল্টের নয়। অন্য রিভলভারের। কীভাবে পেয়েছিল সেটা এখনও জানতে পারিনি। তবে খোঁজ করছি। কিন্তু সেটা যে মুঙ্গেরের মাল নয় এটা নিশ্চিত। অনেক সফিস্টিকেটেড। আমেরিকান মাল।’
—‘তাহলে কাগজে যে পয়েন্ট থ্রি টু রিভলভারের ছবি, পুলিনের প্যাকেটে রিভলভার পাওয়ার কথা আর কমিশনারের বিবৃতি বেরিয়েছিল, সেগুলো?’ জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিখিলেশের।
—‘সাজানো। সব সাজানো। তদন্তের স্বার্থে অনেক সময় মিডিয়াকে ভুল তথ্য দেওয়া হয়। ওটা আমারই প্ল্যান। আমি শুধু কমিশনারকে রিকোয়েস্ট করে তাকে দিয়ে বলিয়েছি মাত্র। আর সাজানো রিভলভারের ছবিও তুলতে দিয়েছি মিডিয়াকে। তবে হ্যাঁ, আমার এই কথাগুলো ইনফর্মাটেটিভ ফর্মে লিখবি না কিন্তু। তোর নিউজ ফর্ম্যাট সেইরকম করবি, যাতে তার সোর্স বোঝা না যায়।’ হাসতে হাসতে বলে নির্মল সেন। নিখিলেশও ব্যাপারটা বুঝে যায়।
বলে— ‘তোরা পারিসও বটে। অবশ্য এইগুলো না করলেও তো…।’
সে এবারে খাবারের দিকে হাত বাড়তে যাবে এমন সময় নির্মল বলে উঠল— ‘আরও কিছু খবর আছে। তবে তার জন্যে তোর পরোটা ঠান্ডা করার দরকার নেই। ছোটো খবর, তবে এখনও কেউ জানে না। তুই শুধু শুনে রাখ, কিন্তু পাবলিশ করবি না।’
এবার একটুকরো পরোটা আর কাবাব মুখে পুরে নিখিলেশ বলে— ‘তুই নিশ্চিন্ত থাকতে পারিস। নে এবার বল।’
—‘তুই তো গিটারওয়ালাকে জানিস।’
—‘হ্যাঁ। তা সে আবার কী করল?’
—‘সে কিছু করেনি। তবে তার বাড়িতে চুরি হয়েছে। যে চোর ঢুকেছিল সে গিটারওয়ালার নাক ফাটিয়ে তার রিভলভার আর মানিব্যাগ নিয়ে পালিয়েছে।’
—‘সে কী রে? বলিস কী? তা তার জন্যে কোনো ইনভেস্টিগেশন হচ্ছে না?’
—‘হচ্ছে তো বটেই। রিভলভার হারানোর জন্যে গিটারওয়ালাকে শো-কস করা হয়েছে। এক হপ্তার মধ্যে উত্তর দিতে হবে। তবে এটা জাস্ট অফিসিয়াল ফর্মালিটি। আর চুরি হওয়ার এক ঘন্টার মধ্যেই তো ও এফ আই আর করেছিল। তা সেদিন ও নাকি ঘুমোচ্ছিল। আর চোর ঢুকেছে বুঝতে পেরে যেই না ও ঘরের বাইরে বেরিয়েছে, তখনই চোরটা ওকে পিটিয়ে নাকটাক ভেঙে ওর সার্ভিস রিভলভার আর মানিব্যাগ নিয়ে পালিয়েছে। ইনভেস্টিগেটিং অফিসারও ওর ফেভারেই রিপোর্ট দিয়েছে।’
—‘কিন্তু সার্ভিস রিভলভার তো বাইরে ফেলে রাখার কথা নয়। ইনফ্যাক্ট কেউই তা রাখে না। তাহলে?’
—‘অ্যাজ পার ইনভেস্টিগেটিং অফিসারের রিপোর্ট, চোর নাকি ওকে পিটিয়ে ওকে দিয়েই চাবি দিয়ে ড্রয়ার খুলিয়ে ওর মানিব্যাগ আর উইপনটা নিয়ে পালিয়েছে।’
খেতে খেতেই নিখিলেশ মজা করে বলে— ‘বাঘের ঘরেও তাহলে ঘোঘ ঢোকে, বল।’
—‘তা যা বলেছিস।’ হো হো করে হেসে ওঠে দু-জনেই।
