দু-দিন পরে
—‘আমি ভাবতেও পারছি না যে আমাদেরই একজন সিনিয়র অফিসার একজন কোকেন মাফিয়া।’ হতাশা ফুটে বেরোয় পুলিশ কমিশনারের গলায়।
—‘স্যার, তার কাজের শাস্তি সে পেয়েছে। এখন আমাদের নজর দিতে হবে অন্য জায়গায়। আমাদের সামনে অনেকগুলো প্রশ্ন এসেছে স্যার।’ বলল নির্মল সেন।
—‘কী কী? পরপর বলে যান।’
—‘স্যার, যদি ধরে নিই যে পিটার সুইসাইড করেছিল, তাহলেও তার সুইসাইড করার আগে কেউ তার ঘরে ঢুকেছিল। সে পিটারের মদ্যপ অবস্থার সুযোগ নিয়ে তাকে প্রচণ্ড মারধোর করে। এমনকী তার বাঁ-হাতের আঙুল ভেঙে দেয়।’
—‘রাইট ইউ আর মিস্টার সেন। পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট বলছে পিটারের আঙুল ভাঙা ছিল। ওপর থেকে কেউ পড়ে গেলে তার স্কাল ড্যামেজ হতে পারে। তার হিউমারাস, রেডিয়াস বা আলনা ভেঙে যেতে পারে; তার রিবস বা পায়ের টিবিয়া কিংবা ফিমার বোনসও ভেঙে যেতে পারে; এমনকী তার শোল্ডারের জয়েন্ট ডিসলোকেট হতে পারে। কিন্তু আমার সার্ভিস লাইফে কখনোই ফ্যালাঞ্জেস ভাঙতে দেখিনি। আই মিন, বিগ বোনস ভাঙতে পারে কিন্তু স্মল বোনস নয়। তাই আপনার অনুমান একেবারে ঠিক। কোনো একজন পিটারের বাড়িতে ঢুকেছিল সেই রাতে। তবে মিস্টার সেন, সে কি পিটারকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে মার্ডার করে থাকতে পারে না?’ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে যান কিঞ্চিৎ উত্তেজিত কমিশনার।
—‘ইয়েস স্যার, সেটারও চান্স আছে। তবে স্যার, এর আগেরবার যে লোক পিটারের পার্স আর রিভলভার চুরি করে সে, আর এই বড়োদিনের রাতের ইন্ট্রুডার কিন্তু একই লোক। দু-বারের ঘটনা থেকে পাওয়া কালো রং কিন্তু সেই কথাই বলছে। তার মানে সে মুখে কালো রং মেখে তার পরিচয় আড়াল করতে চেয়েছিল। তাহলে, পিটার কি তাকে আগে থেকেই চিনত? আরও একটা কথা এই যে, দু-ক্ষেত্রেই তার কোনো ফিঙ্গার প্রিন্ট পাওয়া যায়নি। লোকটা মনে হয় গ্লাভস পরে এসেছিল আর চারপাশে মদ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যে স্নিফার ডগও কোনো ট্র্যাক করতে পারেনি। আমার মনে হয় লোকটা প্রফেসনাল মার্ডারার, নইলে সে এত ট্রিক জানল কী করে।’
—‘হতেই পারে মিস্টার সেন। আচ্ছা সে তো পিটারের কনফেশন লেটার আর এই টেলিগ্রাম নিতে এবারে বাড়িতে ঢুকেছিল। তাহলে তার কাছে তো আগেরবারের চুরি যাওয়া পিটারের রিভলভারটাও থেকে থাকবে হয়তো। তা একটা বুলেটেই তো সে এবারের কাজটা মিটিয়ে দিতে পারত। কিন্তু সে সেটা করেনি কেন?’
—‘সে জন্যেই তো বলছি স্যার, হয় পিটারকে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে, নয়তো পিটার সুইসাইড করেছে বা তাকে তা করতে বাধ্য করা হয়েছে। আর ওই লোকটা হয়তো পিটারের রিভলভার চুরি করেনি। আবার এমনও হতে পারে যে পিটার সেটা স্মাগল করে দিয়েছে কাউকে। স্যার, চাঁপাডাঙার গ্রামে যে বুড়ো লোকটাকে গুলি করে মারা হয়েছিল, সেই বুলেটটা কিন্তু ছিল পয়েণ্ট থ্রি টু বোরের।’
—‘আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে মিস্টার সেন, যে এই ইন্ট্রুডার পিটারের রাইভ্যাল রাকেটের লোক। পিটারকে মারার পরে আমাদের কাছে এই ডকুমেন্টস পাঠিয়ে বলতে চাইছে যে আমরা যেন পিটারের ওই রাকেটটাকে নষ্ট করে দিই।’
—‘হতেই পারে স্যার। তবে রাইভ্যাল রাকেটের লোক হলে তো এসবের কোনো প্রয়োজনই হয় না। তারা গ্রুপে আসবে, মার্ডার করবে আর চলে যাবে। নিজেদের ব্যবস্থা তারা নিজেরাই করে থাকে স্যার। তাহলে এটাই দাঁড়ায় যে এই মার্ডারার কোনো রাকেটের লোক নয়। সে একা আর তাই সে পিটারের রাকেট ডেসট্রয় করার জন্যে পুলিশের হেল্প চাইছে।’ ব্যাখ্যা দেন নির্মল সেন।
একটুখানি চুপ করে ভাবেন কমিশনার। সেনের যুক্তিগুলো কিন্তু ফেলনা নয়। তবুও কতকগুলো প্রশ্ন এখনও থেকেই যায়।
তাই বলেন— ‘আচ্ছা, কালো কালিটার অ্যানালিসিস রিপোর্ট বলছে যে এটা নাকি যাত্রা বা থিয়েটারের সময় গায়ে রং করতে কাজে লাগে। তাহলে ইন্ট্রুডারের সঙ্গে কি যাত্রা বা থিয়েটারের কোনো কানেকশন আছে?’
—‘সেটাও সম্ভব স্যার। আর তাই কালিটার খোঁজে আমি লোক লাগিয়েছি। কয়েক দিনের মধ্যে কে কিনেছিল এই কালি?’
—‘নেক্সট বলুন, হু ইস দিস শ্যামাদাস রায়? এই চিঠি অনুসারে তো পিটারের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। তবে তার খোঁজ পেয়েছেন কি?’ রজনীর লেখা চিঠিটা দেখতে দেখতে প্রশ্নটা করেন কমিশনার।
—‘না স্যার তার খোঁজ পাইনি, তবে তার সম্বন্ধে যেটুকু জানতে পেরেছি যে সে হুগলির বাসিন্দা। সেখানে তার একটা পৈতৃক বাড়ি আছে। চাঁপাডাঙার সঙ্গেও তার একটা কানেকশন ছিল। সে সেখানে একটা স্বদেশি দল চালাত। কলকাতাতেও তার যাওয়া আসা ছিল। পিটারের কাছে তো সে যেতোই কিন্তু কলকাতায় আর কোথায় কোথায় তার যোগাযোগ ছিল, সেটা এখনও জানতে পারিনি। তবে কলকাতা, চাঁপাডাঙা বা হুগলি কোথাও কিন্তু তার হদিশ পাওয়া যায়নি। নট অনলি দ্যাট, তার সঙ্গী দিনেশ নামের ছেলেটাও এখনও মিসিং। তবে ওই পাগলের কেসটার জন্যে মিউজিয়মের সামনে নজরদারী রাখার ব্যবস্থা করেছি স্যার।’
চুপ করে থাকেন কমিশনার। কেসটা বড়ো জটিল। সব অঙ্ক কেমন যেন মিলতে মিলতেও মিলছে না। তাঁকে চুপ করে থাকতে দেখে একসময় নির্মল সেন বলেন—‘স্যার, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?’
—‘বলুন।’
—‘রেঙ্গুনের ওই মিস্টার আঙ থিহার ব্যাপারটায় কিছু করা যেতে পারে কি?’
চোখ থেকে চশমাটা নামিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে কমিশনার সাহেব বলেন— ‘ওই ব্যাপারটায় আপাতত তেমন কিছু করার নেই মিস্টার সেন। জানেনই তো বার্মা এখন জাপানিদের দখলে।’
—‘স্যার, আমরা কি ওখানে খোঁজখবর করার জন্যে কোনো সিক্রেট এজেন্ট পাঠাতে পারি না?’
—‘তা হয়তো যায়; কিন্তু কিছুটা মোঙ্গোলিয়ান দেখতে, বার্মিজ ল্যাংগুয়েজ জানা ইনটেলিজেন্ট কোনো লোক কি আপনার জানা আছে?’
—‘না স্যার। তবে চেষ্টা করে দেখতে পারি।’
—‘তাহলে ওই ব্যাপারটা এখন সেকেন্ডারি। প্রায়োরিটি দিন পিটারের বাড়ির ইন্ট্রুডারকে। হি ইজ নট অনলি ফেরোসাস অ্যান্ড ক্লেভার, বাট ইনটেলিজেন্ট অলসো। ওকে পেলে আমাদের সব প্রবলেম সল্্ভ হয়ে যাবে। সো ট্রাই টু ফাইন্ড হিম। উইশ ইউ বেস্ট অফ লাক।’
