আই এন এ ট্রায়াল, গোপালের গ্রেনেড আর নড়ে বসলেন ভাইসরয়
অনেকগুলো কুকুরের চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল রজনীর। বুঝতেই পারল যে শকুনদের উচ্ছিষ্টে ভাগ বসিয়েছে নেড়ি কুকুরদের দল। ঘড়িতে তখন বাজে সাতটা। ছাদে বেরিয়ে দেখে একপাশে বেশকিছু আধলা ইঁট জড়ো করে রেখে কেষ্টদা তোলা উনুনটা সাজাচ্ছে। রজনীকে দেখে হাতের কাজ থামিয়ে সে বললে— ‘দাদাবাবু, নীচে চলো, চা-মুড়ি খাবে।’
—‘কানাই কোথায় কেষ্টদা?’
—‘সে ছাতে আসতে চেয়েচিল। কত্তাবাবু আটকেচে। সে এখন রেডিয়োর সামনে বসে আচে দেকে এলুম।’
—‘আচ্ছা চল, নীচে যাই।’
সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে রজনী দেখে আজ আরও লালচে হয়ে গেছে আকাশ। মেঘেও লেগেছে সেই লালচে রং। দিগন্তে তাকালে মনে হয়— আজ যেন দূরের কোনো জঙ্গলে দাবানল লেগেছে। ধোঁওয়ার সাথে মাঝে মাঝে লকলকিয়ে উঠছে আগুনের ফুলকি। এই দাবানল যে কবে নিভবে? কে নেভাবে এই দাবানল? একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে রজনীর বুক থেকে। তারপরে কেষ্টদার সঙ্গে ধীরে ধীরে নীচে নেমে আসে সে।
চা-মুড়ি খেতে খেতে রেডিয়োর খবর শুনছেন মেসোমশাই। কানাই আর মাসিমাও পাশে দুটো চেয়ারে বসে। রজনী গিয়ে পৌঁছতেই কানাই উঠে গিয়ে পাশের একটা টুলে বসে। রজনী সেই চেয়ারে গিয়ে বসতেই কেষ্টদা মুড়ির বাটিটা এগিয়ে দেয়। সামনের সেন্টার টেবিলে চা টা ঢাকা দিয়ে রাখে।
একগাল মুড়ি গালে ফেলতেই মেসোমশাই বলেন— ‘রেডিয়ো সেন্সর করা হয়েছে। অবশ্য এইসময়ে সেন্সর করাই উচিত। নইলে দাঙ্গা আরও ছড়াবে। কেশোরাম মিলের কথা তো কিছু বললই না। খালি দিল্লিতে শাহনওয়াজ খান, প্রেম সাহগল আর গুরুবক্স সিংয়ের বিচারের কথাই কপচে যাচ্ছে মিনিট কুড়ি ধরে। আরে বাবা, সেখানে যখন এই বিচার নিয়ে গণ-বিক্ষোভ হচ্ছে, তখন ওদের ট্রায়াল কি ক-দিন পিছিয়ে দেওয়া যেত না? ওরা কি ব্রিটিশদের এত বড়ো শত্রু?’
কানাই এতক্ষণ চুপ ছিল। এবার হঠাৎ বলে উঠল— ‘ওরা তিনজন কি গুন্ডা?’
কানাইয়ের এই বালকসুলভ প্রশ্নে রজনী বিব্রত হলেও মেসোমশাই তাঁর অভিজ্ঞতা দিয়ে সামাল দিলেন পরিস্থিতি।
—‘না কানুভাই, ওনারা কেউই গুন্ডা নন। ওনারা হলেন আই এন এ মানে নেতাজির ‘‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’’-র তিনজন বড়ো অফিসার। আই এন এ হল নেতাজির সৈন্যদল, বুঝলে? ওঁদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকার দেশদ্রোহীতা, গণহত্যা এইসব নানান অভিযোগ এনে ওঁদের বিচার করছে বেশ কিছুদিন ধরে। সেই খবরই বারবার বলছে রেডিয়োতে।’
—‘ও, তাহলে তো ওরা মিলিটারির লোক। মিলিটারির লোক তো যুদ্ধ করবেই। আর ওরা তো আমাদের স্বাধীনতার জন্যে যুদ্ধ করছিল।’
—‘সেটা তুমি, আমি আর আমাদের দেশের লোক বুঝলে কী হবে; ব্রিটিশরা তো তা মানতেই চাইছে না। তাদের চোখে ওঁনারা দেশের শত্রু।’
কানাই একটু চুপ করে থেকে বলল— ‘নেতাজি যে কোথায় গেলেন কে জানে। এখন দেশটা স্বাধীন করবে কে?’
সবাই বুঝতে পারেন কানাইয়ের অবোধ বালক মনের এই নির্ভেজাল খেদোক্তি। এই খেদোক্তি যে তাঁদেরও অন্তরের কথা।
চায়ে চুমুক দিতে দিতে মেসোমশাই আবার বললেন— ‘সুবিমলকেও ফোন করেছিলাম। ওদের ওদিকেও ছুটকো-ছাটকা দাঙ্গা হচ্ছে, তবে তেমন ভয়ানক কিছু নয়। নাও, চা খাওয়া হয়ে গেলে সবাই একবার ছাদে চল।’
মাসিমা বললেন— ‘কী দরকার বাপু ওইসব বীভৎস জিনিস দেখার। আমি যাচ্ছি না। তোমরা গেলে যাও।’
তাই মাসিমা বাদে সবাই এল ছাদে। রাস্তা এখনও শুনশান। চার-পাঁচটা কুকুর শুধু টানা হেঁচড়া করে লাশগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়েছে রাস্তাময়। এরই মধ্যে ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ধুলো-মারা বৃষ্টি। রজনী চাইছে এখন বৃষ্টি নামুক জোরে। অঝোর বৃষ্টিতে যদি ওই আগুনের আগ্রাসন কমে। কিন্তু সে চাইলেই তো আর তা হবার নয়। বৃষ্টির ছোঁওয়া থেকে বাঁচাতে কেষ্টদা উনুন আর জলের হাঁড়ি সরিয়ে রাখল ছাদেরই একপাশে একটুকরো চালার নীচে। নইলে আগুন নিভে যেতে পারে। এরপরে সবাই নেমে এল নীচে।
.
রাতের খাওয়া সেরে রজনী আর কেষ্টদা আবার ছাদে আসে। বাকি সবাই নীচে শোওয়ার ঘরে। এই অঞ্চলটা মোটামুটি শান্ত। তাই গতকালের মতো কেষ্টদা চিলেকোঠার ঘরে শোওয়ার তোড়জোড় করছে। রজনী গিয়ে বসেছে পাঁচিলের ধারে তার নির্দিষ্ট চেয়ারে।
হঠাৎই দূর থেকে শোনা যায় গাড়ির আওয়াজ। সেই আওয়াজটা ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসছে। সেইসঙ্গে শোনা যাচ্ছে দলবদ্ধ মানুষের স্লোগান। খানিক কাছে আসতেই বোঝা যায় যে ওটা একটা ট্রাক। তাতে খোলা তরোয়াল হাতে একদল শিখ। রাতের থমমারা স্তব্ধতাকে খানখান করে তারা বলে উঠছে— ‘বোলে সো নিহাল, সৎ শ্রী আকাল।’
আওয়াজ শুনে কেষ্টদাও ছুটে এসেছে পাঁচিলের ধারে। কুকুরগুলোও যে যেদিকে পারে ছুট লাগিয়েছে। গাড়িটা তাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাবার সময় আর একবার শিখদের যুদ্ধ-নিনাদে কেঁপে ওঠে রাস্তা। কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে ফাঁকা রাস্তা দিয়ে গাড়িটা চলে যাওয়ার পরে রজনী আর কেষ্টদা দেখল গাড়ির চাকায় পিষে লাশগুলোর অবশিষ্ট অংশের বেশ কিছুটা চেপটে মিশে গেছে রাস্তায়।
যাইহোক, সেই রাতে আর বিশেষ কিছুই ঘটল না। শুধু মহাভোজে মত্ত কুকুরগুলোর চিৎকার বজায় রইল ভোরের আলো না ফোটা পর্যন্ত।
