১৯৫৬

১৯৫৬

আজ মাস্টার ডিগ্রির রেজাল্ট বেরোবে। তাই সকাল সকাল ছাদে রজনীর সঙ্গে তাইকোন্ডো ঝালিয়ে নিয়ে কানাই বেরিয়ে পড়েছে একটু আগেই। উদ্দেশ্য হল, বন্ধুদের সঙ্গে কফিহাউসে বসে খানিক আড্ডা মেরে রেজাল্টের আগের টেনশনটা কাটিয়ে নেওয়া। সে জানে যে ফাৰ্স্টক্লাস সে পাবেই কিন্তু তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু অ্যান্টনি সিনহাকে সে টপকাতে পারবে কি না, সেটাই এখন তার টেনশনের বিষয়। মার্চেন্ট নেভির ক্যাপ্টেন দেবরাজ সিনহার ছেলে হলেও, প্রাচুর্যে মানুষ হলেও কেমিস্ট্রিতে অ্যান্টনির দখল রীতিমতো ভালো। তাই মার্কসে তাকে টপকে যাওয়াই কানাইয়ের কাছে চ্যালেঞ্জ। আসলে কানাই যে হারতে ভালোবাসে না— তা সে তাইকোন্ডোই হোক, কী লেখাপড়া।

কানাই কফিহাউসে পৌঁছে দেখে সেখানে ইতিমধ্যেই একটা টেবিলে জাঁকিয়ে বসেছে অ্যান্টনি, অরুণোদয়, বৈভব আর সৌগত। এরা সকলেই বেশ ভালো স্টুডেন্ট। কানাই দেখে টেবিলের ওপরে রাখা একটা মার্লবোরোর প্যাকেট। অ্যান্টনির বাবার আনা। এমনকী ওর বুকপকেট থেকে যে রেব্যান ওয়েফেয়ারার সানগ্লাসটা উঁকি মারছে সেটাও। কানাইয়েরও শখ ওইরকম একটা সানগ্লাসের। কিন্তু তার কাছে এটা এখন শুধুই স্বপ্ন। তবে হ্যাঁ, একদিন না একদিন সে সেটা অর্জন করবেই। ভালো একটা কোম্পানিতে চাকরি পেলেই সে ছ-মাসের মধ্যে ওরকম একটা সানগ্লাস কিনবেই। হয়তো আজকের রেজাল্টেই তার ভবিষ্যতের একটা আভাষ পাওয়া যাবে। আজকের রেজাল্টই হয়তো বলে দেবে সে ওই সানগ্লাসের যোগ্য কি না।

একটা চেয়ার দখল করে বসতেই বৈভব বলে উঠল— ‘আরে গুরু, প্রায় হাফ অ্যান আওয়ার লেট। কী ব্যাপার বল তো?’

কানাই ইয়ার্কি মেরে মুচকি হেসে বলে— ‘আরে বস, তোরা তো জানিস যে রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে আমার একটু হাত-পা ছোঁড়ার অভ্যেস আছে। তাই একটু… যাকগে, একটা কফি বল তো দেখি।’

অ্যান্টনি ধীরেসুস্থে বেয়ারাকে ডেকে কানাইয়ের জন্যে একটা কফির অর্ডার দিয়ে সিগারেটের প্যাকেটটা এগিয়ে দিয়ে বললে— ‘আজকের জন্যে অন্তত একটা নে। টেনশনটা কমবে। তোর চোখমুখ দেখেই মনে হচ্ছে যে তুই আজ একটু টেনশনে আছিস।’

কানাই চোখ মেরে হেসে বললে— ‘আরে ইয়ার, হাত-পা ছোঁড়া ছেলেরা সিগারেট খায় না। তা ছাড়া রেজাল্টের দিনে একটু টেনশন তো থাকবেই।’

অ্যান্টনিও কম যায় না। সে প্যাকেটটা সরিয়ে নিয়ে টেবিলে রেখে ছদ্মগাম্ভীর্যে বলে— ‘তো মিস্টার মিল্কফেড, বলি এতদিন ধরে যে হাত-পা ছুঁড়ছিস, তা কতজনকে একসঙ্গে হাসপাতালে পাঠাতে পারবি শুনি?’

কানাই তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে আড়মোড়া ভেঙে বললে— ‘জনা ছয়েক কোনো ব্যাপার নয়।’

অরুণোদয় একটা খবরের কাগজ নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল। সে কানাইয়ের কথাটা শুনে চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে বললে— ‘আর উইপনস নিয়ে থাকলে?’

—‘উইপনস বলতে তুই যদি ছেনি-হাতুড়ি বোঝাস, তাহলে একজনকেও নয়। তবে হাতে বোমা-গ্রেনেড ছাড়া আর অন্য কোনো উইপনস থাকলে সংখ্যাটা ওই ছয়ই থাকবে।’ বলে কানাই মৃদু হাসে।

সৌগত ছুঁড়ে দেয়— ‘কনফিডেন্ট?’

—‘ইয়েস কনফিডেন্ট।’

অ্যান্টনি বললে— ‘আর রেজাল্টের ব্যাপারে?’

—‘আরে ওটাতেই তো ঠিক কনফিডেন্ট নই। তাই একটু টেনশন…।’ হেসে বলে কানাই। শুনে সবাই হেসে ওঠে।

বৈভব হেসে বলে— ‘এতক্ষণে কানুর বাঁশি ঠিক সুর মিলিয়েছে আমাদের সাথে।’

—‘তাহলে হয়ে যাক বেটিং।’ কথাটা অ্যান্টনির।

খবরের কাগজ পড়তে পড়তেই অরুণোদয় বলে— ‘হ্যাঁরে, কীসের বেটিং রে? অ্যান্টনি, তুই কি আজকাল আবার ঘোড়ার ল্যাজ ধরতে শুরু করেছিস নাকি? কই, জানতাম না তো?’

—‘ধ্যার শালা। শোন, দু-পেগ মাল খেলে ক্যাপ্টেন সিনহা হয়তো কিছু বলবে না, কিন্তু ঘোড়ার পেছনে পড়েছি জানলে…। তা ছাড়া গ্যাম্বলিংয়ে আমার তেমন ইন্টারেস্টও নেই। ওটা পুরো প্রোব্যাবলিটির খেল।’

সৌগত খিঁচিয়ে উঠে অ্যান্টনিকে বলে— ‘তা কীসের বেটিং বলছিস, সেটা ঝেড়ে কাশ না শালা।’

—‘বেটিংটা হবে কানাইয়ের সঙ্গে।’

কানাই খানিকটা ঘাবড়ে গিয়ে বলে— ‘মানে? আমার সাথে বেটিং। কীসের বেটিং বল তো?’

অ্যান্টনি বলে— ‘এক্সামের মার্কসের।’

—‘ও, তাই বল। তা সেটা কীরকম শুনি?’ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কানাই।

—‘আজ আমার মার্কস পার্সেন্টেজ তোর থেকে বেশি থাকলে ট্রিট দেব আমি, আর তোর পার্সেন্টেজ আমার থেকে বেশি থাকলে ট্রিট দিবি তুই। রাজি? দেখি কে জেতে আর কে হারে।’ অ্যান্টনি মিটিমিটি হাসতে থাকে। তার এই কথায় কিন্তু কোনো হিংসে বা ঐশ্বৰ্যের অহমিকা ছিল না; ছিল অকৃত্রিম বন্ধুত্বমূলক প্রতিযোগিতার আহ্বান। কানাই সেটা বেশ বুঝতে পারল। তবুও কথাটা শুনে কানাই ভেতরে ভেতরে বেশ অপ্রস্তুত হয়ে যায়।

সে জানে যে সে গরিব ঘরের ছেলে। তার জীবনে এতকিছু সে পেয়েছে শুধুমাত্র তার স্যারের জন্যে। কখনো মুখ ফুটে চাইতে হয়নি, কিন্তু স্যার ঠিক বুঝে নিয়ে নিজে থেকেই তার পড়াশোনার খরচ, তার হাতখরচা জুগিয়ে এসেছে। এমনকী পড়াশোনার ক্ষতি হবে বলে স্যার তাকে টিউশনিও করতে দেয়নি। কিন্তু ট্রিট দিতে গেলে যে পয়সাটা লাগবে, সেটা কি স্যারের কাছ থেকে চাওয়া যায়? তবু বন্ধুদের কাছে নিজের মান রাখতে সে বলে— ‘আচ্ছা। ঠিক আছে। সে দেখা যাবে। তবে আগে রেজাল্টটা তো বেরোক।’

আর্দালি কফি দিয়ে যায় কানাইকে। গরম কফিতে সবে একটা চুমুক দিয়েছে কানাই আর ঠিক তখনই অরুণোদয় খবরের কাগজের একটা খবর সবাইকে দেখিয়ে বলে ওঠে— ‘এই দ্যাখ দ্যাখ, কী লিখেছে। বোম্বাই থেকে দমন যাবার পথে একজন নাকি চারটে সোনার বিস্কুট নিয়ে ধরা পড়েছে।… ইস মাইরি, আমরা যদি ওইরকম এক একটা সোনার বিস্কুট পেতাম…।’

বৈভব তাকে ভেঙিয়ে বলে— ‘সোনার বিস্কুট পেতাম…। শালা এমনি বিস্কুট জোটে না, আবার সোনার বিস্কুট…।’ আরও হয়তো কিছু বলতে যাচ্ছিল সে, কিন্তু পাছে কিছু স্ল্যাং বেরিয়ে যায়, তাই সৌগত তাকে থামিয়ে দিয়ে অরুণোদয়কে বলে— ‘নে নে, ভ্যান্তারা না করে বাকিটা পড়ত দেখি।’

—‘লিখেছে— বোম্বাই পুলিশের ধারণা যে ওই লোকটা নাকি গালিব শেখ নামে এক আরবের লোক হতে পারে; কারণ দিন-পাঁচেক আগে গালিব শেখ বোম্বাইতে এসেছিল আর ওই শেখের সঙ্গে দমনের স্মাগলার সুকুর নারায়াণ বখিয়ার যোগ আছে। তা পুলিশ এখন ওই ক্যারিয়ারটাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।’

কফিতে চুমুক দিতে দিতে কানাই অরুণোদয়ের কথা শুনছিল।

এদিকে সব শুনে অ্যান্টনি একটা ধোঁওয়ার রিং উড়িয়ে দিয়ে বললে— ‘হ্যাঁ, ক-দিন আগে বাবার কাছে শুনছিলাম যে, বোম্বাইতে এখন নাকি আন্ডারওয়ার্ল্ড খুবই অর্গানাইজড। সবাইকার এলাকা ভাগ করা আছে। কেউ কারোর এলাকায় ঢোকে না। তারজন্যে এখন নাকি খুনোখুনি প্রায় নেই বললেই চলে।’

—‘…আর ওখানকার আন্ডারওয়ার্ল্ড এত অর্গানাইজড হয়েছে একজন লোকের জন্যে।’ বলেই কফিতে একটা লম্বা চুমুক দেয় কানাই।

সৌগত আর বৈভব প্রায় একসঙ্গেই বলে ওঠে— ‘কে? কে সেই মহান ব্যক্তি শুনি? নামটা জানিস নাকি?’

—‘নামটা হল ‘‘মস্তান হায়দার মির্জা’’। তামিল অরিজিন। বোম্বাইয়ের ক্রফোর্ড মার্কেট এলাকায় ওদের সাইকেলের দোকান ছিল। কিন্তু অ্যাম্বিশাস হায়দার সে কাজ ছেড়ে বোম্বাই ডকে পোর্টারের কাজ নেয়। আর কলাটা, মুলোটা স্মাগলিং করতে করতে একসময় তার আলাপ হয় গালিব শেখের সঙ্গে।’ একটু থেমে কফিতে আর একটা চুমুক দিয়ে বলতে শুরু করে— ‘তারপর থেকেই তার প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়তে থাকে। আর ইদানীং নাকি তার কথাই বোম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডের শেষ কথা। তবে হ্যাঁ, তার নিজস্ব কোনো গ্যাং নেই… মানে দু-চারজন খুব বিশ্বাসী লোকের মাধ্যমে সে অপারেট করে সবকিছু। আর সবচেয়ে বড়োকথা এই যে, এতসব করতে গিয়ে কখনো একটাও গুলি ছোঁড়েনি। তোরা দেখে নিস, ওই যে লোকটা ধরা পড়েছে, ওর কিচ্ছু হবে না। থানায় একটা ফোন যাবে আর তারপরে সব ধামাচাপা পড়ে যাবে।’

অরুণোদয় ঠেস মেরে বললে— ‘তা তুই এতসব জানলি কী করে, অ্যাঁ? আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কি তোমার টাই-আপ আছে নাকি গুরু?’

—‘আরে শালা, তোরা তো শুধু টেক্সট বুক আর তার রেফারেন্স বুকেতেই নিজেদের আটকে রেখেছিস। চারপাশে কী ঘটছে না ঘটছে, কিছুই তো খবর রাখিস না।’ কানাই একটু বিরক্তিতেই জবাব দিল।

—‘তা তুই কী করে এসব জানলি?’ প্রশ্নটা সৌগতর।

—‘বাড়িতে দাদু TOI রাখে। সন্ধেবেলা বই নিয়ে বসার আগে তাতে একবার চোখ বোলাই। তা সেখানেই ওই মস্তান হায়দার মির্জাকে নিয়ে কিছুদিন আগে একটা আর্টিকেল বেরিয়েছিল। প্রায় আধপাতা জোড়া। সেটাই পড়েছিলাম আর সেটা থেকেই তোদের এখন জ্ঞান ঝাড়লাম। বুঝলি?’ কানাই হাসে।

—‘মানে পরের ধনে পোদ্দারি করলি, তাই তো?’ হো-হো করে হেসে ওঠে সবাই।

.

রেজাল্ট বেরিয়েছে।

মার্কস দেখে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কানাই। সে পেরেছে। অ্যান্টনি সিনহাকে সে পার্সেন্টেজে টপকেছে। সে পেয়েছে এইট্টি ওয়ান পার্সেন্ট, অ্যান্টনির এইট্টি পয়েন্ট ফাইভ আর অরুণোদয়ের জাস্ট এইট্টি পার্সেন্ট। তফাৎ সামান্যই। তবু, তফাৎ মানে তফাৎই। বাকিদের সবারই মার্কস বেশ ওপরের দিকেই, তবে কেউ আশির কোটা ছুঁতে পারেনি। তিন বন্ধু কানাইকে শুধু যে কনগ্র্যাচুলেশনস জানাল তাইই নয়; অ্যান্টনি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। সবাই আনন্দে আত্মহারা। কানাইও খুব খুশি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা জিনিস তাকে খোঁচা মেরেই চলেছে; আর সেটা হোলো তার অস্বচ্ছলতা। এবার বন্ধুদের যে ট্রিট দিতে হবে, কিন্তু পকেটে তার অতো পয়সা কোথায়?

ঠিক এমন সময়েই সৌগত বলে উঠল— ‘ফাৰ্স্টক্লাস তো হল। টপকালিও তো আমাদের সবাইকে। তা এবার ট্রিট দাও বস। জমিয়ে খাওয়াতে হবে কিন্তু, বলে দিলাম।’

কানাই বলল— ‘আচ্ছা, অন্য একদিন হলে হত না? আজ আমি ঠিক প্রিপেয়ার্ড হয়ে আসিনি।’

বৈভব ফুট কাটলো— ‘শালা, ঢপ মারছিস কেন বল তো? খাওয়াবিনা সেটা বল।’

—‘না রে, সত্যি বলছি। আমরা বরং নেক্সট রোববারে মিট করি আমাদের বউবাজারের বাড়িতে। সেদিন জমিয়ে খাব সবাই।’

এদিকে কানাইয়ের কথাবার্তা শুনে অ্যান্টনি আঁচ করে নিয়েছে কানাইয়ের অবস্থা। তা ছাড়া বহুবার কানাইয়ের বাড়িতে যাতায়াতের সুবাদে সে ভালোভাবেই জানে কানাইয়ের আর্থিক অবস্থা। কিন্তু বাকিরা যে আজ নাছোড়বান্দা। তাই সে সুকৌশলে সবাইকে বলে— ‘আচ্ছা, আচ্ছা, শোন। দেখ, কানাইয়ের পরেই তো আমি আছি। আজ না হয় আমিই ট্রিটটা দিই আর নেক্সট রোববার কানাইয়ের বাড়িতেই না হয় কব্জি ডুবিয়ে মাংস-ভাত খাব সবাই। কি রে কানাই, ঠিক আছে তো?’

কানাই তাতে স্বস্তি পেয়ে বলে— ‘সার্টেনলি। আজ অ্যান্টনি ট্রিট দিক আর নেক্সট সানডে আমি।’

অরুণোদয় এবার বলে— ‘তা অ্যান্টনি, কোথায় ট্রিট দিবি শুনি?’

একটু ভেবে অ্যান্টনি বলল— ‘দেখ, সন্ধে তো প্রায় হতেই চলল। আমরা বরং আজ যদি পার্ক স্ট্রিটে যাই?’

—‘পার্ক স্ট্রিটে? কোথায় খাওয়াবি?’

—‘মোকাম্বোতে যেতে তোদের আপত্তি নেই তো?’

কানাই বলল— ‘কিন্তু ওটা তো বার।’

—‘তাতে কী হয়েছে? বারে কি লোকে শুধু মদ খেতেই যায়? আরে, রিল্যাক্স করতেও লোকে ওখানে যায়। কতরকম কন্টিনেন্টাল ডিশ পাওয়া যায় জানিস? আর তা ছাড়া মোকাম্বোতে নাকি রিসেন্টলি প্যাম ক্রেন নামে একজন সিঙ্গার এসেছে। দারুণ জ্যাজ গায়। লোকে তাকে বলে ‘‘Diva of Calcutta’’ আর তার সঙ্গে উপরি পাওনা সিক্স প্যাক ব্যান্ড। সন্ধে সাতটা থেকে শুরু। বাবার কাছে শুনেছি, তবে আমি কখনো যাইনি। তাই আজ ইচ্ছে হচ্ছে তোদের সঙ্গে একসাথে প্যামের গান শোনার।’

অরুণোদয়, বৈভব, সৌগত বা কানাই এসব কখনো দেখেওনি বা শোনেওনি। তবে ওরা অ্যান্টনির টেস্ট জানে। তাই সৌগত বলেই ফেলল— ‘আমায় কিন্তু স্কচ খাওয়াতে হবে গুরু।’

—‘আরে ব্রাদার, তাইই হবে। ক্যাপ্টেন সিনহা আজকে আমায় যা দিয়েছেন তা যথেষ্টই। এখন চল তো, কাটি এখান থেকে।’

.

মোকাম্বোতে ঢুকে একটা টেবিলে জাঁকিয়ে বসে পাঁচজন। টেবিলে বসে চারপাশের পরিবেশ দেখেই অ্যান্টনি বাদে বাকিদের মুখে আর কথা সরে না। তারা তো এর আগে কখনো কোনো বারে ঢোকেনি। তাই মোকাম্বোর নরম আলো, সুদৃশ্য মেনুকার্ড, সুন্দর ইন্টেরিয়োর ডেকরেশন, প্রতিটা টেবিলের ওপরে ঝুলন্ত ল্যাম্পশেড, এমনকী টেবিলে রাখা ফুলদানিও তাদের কাছে একই সঙ্গে সুন্দর আর রহস্যময়। অনেকক্ষণ সবারই জল খাওয়া হয়নি। খুব পিপাসা পেয়েছে। তাই অ্যান্টনি চোখের ইশারায় টেবল-অ্যাটেনড্যান্টকে ডেকে জল দিতে বলল।

মিনিট চারেকের মধ্যেই এসে গেল জল। এক নিশ্বাসে জলটা খেয়েই অ্যান্টনি বলল— ‘এ্যাই, বিফে তোদের আপত্তি নেই তো? নাকি চিকেন বলব?’

সবাই এ ওর মুখ চাওয়া চাওয়ি করলে। তারপরে সৌগত বলল— ‘আরে না না, তুই যা খাওয়াবি তাইই খাব।’ কানাই আর অরুণোদয়ের মনে একটু দ্বিধা ছিল। কিন্তু এই বয়সটাই তো অ্যাডভেঞ্চারের সময়, নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আকর্ষণের বয়েস। তাই তারাও আর কিছু বলল না, চুপ করে রইল। দেখাই যাক না কেমন খেতে। তবে অ্যান্টনি যা বোঝার বুঝে নিয়েছে। সে চায় না কেউ দ্বিধা রেখে খাক। তাই সে অ্যাটেনড্যান্টকে ডেকে বলল— ‘চার প্লেট চিকেন কাবাব আর চারটে ডাবল পেগ ভ্যাট উইথ আইস।’

—‘থ্যাংক ইউ স্যার’ বলে অ্যাটেনড্যান্ট চলে যেতেই কানাই অ্যান্টনিকে বলল—‘তুই আমার জন্যে ড্রিঙ্কস বললি কেন?’

—‘কী হয়েছে তাতে? একদিন খেয়েই দেখ না। তা ছাড়া কামিং সানডেতে তোর বাড়িতে খাওয়া দাওয়ার পরে কে কোথায় থাকব কে জানে। তাই একদিন টেস্ট করেই দেখ। জাস্ট ফর সেলিব্রেশন।’

বৈভব বলল— ‘ঠিক বলেছিস মাইরি অ্যান্টনি। এরপরে কে কোথায় থাকব, কী করব কে জানে। তবে আমাকে কিন্তু এবারে একটা চাকরি খুঁজতে হবে। বাবার আর পড়ানোর ক্ষমতা নেই। মাস ছয়েক পরেই রিটায়ার করছে।’

টেবিলের ওপরে রাখা খালি জলের গ্লাসটাকে নাড়াচাড়া করতে করতে অরুণোদয় বলল— ‘বুঝলি বৈভব, বাবার ইচ্ছে ছিল পি এইচ ডি করি। কিন্তু সত্যি বলছি রে, আমার আর পড়াশোনা ভালো লাগছে না। আসলে মন বসাতে পারছি না আমি।’

—‘কেন রে? তোর বাবা পড়াতে চাইছে, আর তুই কিনা…।’

—‘ঋতিকাদের বাড়িতে আর দেরি করতে চাইছে না রে। তাই কোনো একটা স্কুলে যদি একটা কেমিস্ট্রি টিচারের চাকরি জুটে যায়…।’ একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার বুক থেকে।

তার কাঁধে হাত চাপড়ে সৌগত সান্ত্বনা দিয়ে বলল— ‘আরে, পেয়ে যাবি, পেয়ে যাবি। তোর মতো ভালো স্টুডেন্ট একটু চেষ্টা করলেই একটা কিছু পেয়ে যাবি।’ তারপরে বেশ ক্ষোভের সুরেই বলল— ‘শালা, মধ্যবিত্ত বাঙালির এই এক দোষ। মেয়ে গ্রাজুয়েট হল কি হল না, তাকে ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারলেই শালা বেঁচে যায়। কেন রে বাপ, এতদিন যে মেয়েটাকে মানুষ করে বড়ো করলি, তাকে আরেকটু লেখাপড়া শিখিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে দে না। মেয়ে মানেই যেন একবস্তা রাবিশ…শালা।’

অ্যান্টনি এতক্ষণ চুপ করে বসে টিস্যু পেপার দিয়ে একটা নৌকো বানাচ্ছিল আর ওদের কথা শুনছিল। এখন সৌগত উত্তেজিত হয়ে পড়েছে দেখে সে বলল— ‘আচ্ছা, ঠিক আছে, ঠিক আছে। অরুণোদয় নিশ্চয়ই কিছু একটা জোগাড় করে ফেলবে। ওর ওপরে আমার যথেষ্ট ভরসা আছে। কিন্তু সৌগত, কলেজে তো দেখতাম যে ক্লাস না থাকলেই তুই ইউনিয়ন রুমে গিয়ে পড়ে থাকতিস। তা এবার কি রাজনীতিতে নামবি নাকি? তোর তো এসবে খুব অ্যাফিনিটি আছে।’

—‘আরে, ধ্যুস। আর যাইই করি, রাজনীতি নয়। দ্যাখ, ইউনিয়ন রুমে দিনের পর দিন গিয়ে আমি যা বুঝেছি তা হল— ভালো অভিনেতা না হলে তার রাজনীতিতে আসা উচিত নয়। আমার মতো ছেলের সেই ক্ষমতা নেই ব্রাদার। আমি রাজনীতি করে কোনোদিনই কিছু করে উঠতে পারব না। তবে হ্যাঁ, এটাও সত্যি যে কোনো দেশের প্রতিটা মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে আছে। এইই দেখ না, রাজধানীতে বসে আমাদেরই নির্বাচিত করা একমুঠো মানুষ যা সিদ্ধান্ত নেবে, তার প্রভাব পড়বে আমাদের সবার ওপরেই। কেউ বাদ যাবে না। ঠিক কি না বল?’

—‘সবই তো বুঝলাম। তা সেই একমুঠো রাজনীতিকদের নীতিটাকে তৈরি করে কারা? এক্সিকিউট করে কারা? সব দোষ কি রাজনীতিকদের?’

—‘রাজনীতিকদের দোষ তো আছেই— কারণ পলিসি তৈরি করে আমলারা আর সেই পলিসিতে স্ট্যাম্প দেয় মন্ত্রীমশাই। আমলাদের তৈরি পলিসি যদি সঠিক না হয় তা বোঝার ক্ষমতা অনেক মিনিস্টারের নেই রে। আসলে আমাদের দেশের আসল নায়ক হল মন্ত্রীর পার্টির নির্দেশ আর সেই অনুযায়ী তৈরি হয় আমলাদের পলিসি আর তার এক্সিকিউশন।’ বলতে বলতে খানিকটা উত্তেজিতই হয়ে পড়ে সৌগত।

অ্যান্টনি বলে— ‘তোর সব কথা শুনলাম, বুঝলাম, এমনকী ধর মেনেও নিলাম। তা এতগুলো কথা যে বললি, তার সঙ্গে তোর ফিউচার-টার্গেটের সম্বন্ধ কী? তুই তো বললি যে তুই পলিটিশিয়ান হতে চাস না। তাহলে কী হতে চাস, সেটাই বল না বাপ।’

—‘ভাবছি আই এ এসের জন্যে প্রিপারেশন নেব। শালা একবার যদি লেগে যায়…। তা গুরু, তোমার কী টার্গেট, সেটা বললে না তো?’

এমনসময় টেবিলে খাবার আর ড্রিঙ্কস হাজির। গরম চিকেন কাবাবের সুবাসের সাথে কাটগ্লাসের মদিরায় ভাসছে আইস কিউব।

যে যার প্লেট টেনে নিল কাছে। গ্লাসে গ্লাস ঠেকিয়ে বলে উঠল— ‘চিয়ার্স’ আর তারপরে এক চুমুক দিয়ে এক এক টুকরো কাবাব ফর্ক দিয়ে তুলে মুখে চালান করে দিল চার বন্ধু।

কানাই এবার বলল— ‘কি রে অ্যান্টনি, তোকে করা প্রশ্নের উত্তরটা কিন্তু পেলাম না।’

টিস্যু পেপারের নৌকোটা টেবিলে রেখেছিল অ্যান্টনি। এবারে সেটাকে নিয়ে দুমড়ে মুচড়ে একটা দলা পাকিয়ে টেবিলের মাঝখানে রাখল। তারপরে ধীর অথচ গম্ভীর গলায় বলল— ‘ক্যাপ্টেন সিনহার মতো বছরে ছ-মাস সমুদ্রে ভেসে বেড়ানোর ইচ্ছে আমার মোটেই নেই।’ বলে খানিক চুপ করে যায় সে।

বাকি তিনজন গ্লাসে চুমুক দিতে থাকে। জিভ ছুঁয়ে গলা দিয়ে নামতে থাকা অ্যালকোহলের উষ্ণতাকে ঢাকা দিতে চায় বরফের শীতলতা। এমন বিপরীত অনুভূতি আগে তাদের কখনো হয়নি। তারা চুপচাপ চেয়ে থাকে অ্যান্টনির দিকে, তার বাকি কথা শোনার আশায়।

একটুপরেই অ্যান্টনি বলতে থাকে— ‘আচ্ছা, তোরা কি ‘‘বাইসাইকেল থীভস্’’ দেখেছিস?’

সবাই চুপ করে থাকে। শুধু একটুকরো কাবাব মুখে পুরে কানাই বলে— ‘দেখার সৌভাগ্য হয়নি, তবে কাগজে রিভিউ পড়েছি। এ ছাড়াও অনেক ম্যাগাজিনেও লেখাঝোখা হয়েছে সিনেমাটা নিয়ে। ভিত্তোরিয়ো দ্য সিকার ছবি। যতদূর খেয়াল পড়ছে যে ছবিটা উনিশশো পঞ্চাশে আকাডেমি অনারারি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিল। এ ছাড়া আরও অনেক অ্যাওয়ার্ড জুটেছিল ছবিটার কপালে। তাই তো?’

—‘সেন্ট পার্সেন্ট রাইট বস’ অ্যান্টনি উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। তারপরে অন্যদের বলে— ‘আচ্ছা, তোরা নিশ্চয়ই সত্যজিৎ রায়ের ‘‘পথের পাঁচালী’’ দেখেছিস?’

বৈভব বলে— ‘হ্যাঁ, তা দেখেছি। এখন তো ছবিটা নিয়ে চারিদিকে রীতিমতো শোরগোল চলছে। তা এর সঙ্গে তোর কেরিয়ারের সম্পর্ক কী?’

—‘সম্পর্ক এটাই, কানাই তুই হয়তো জানিস, যে ফ্রান্সে ফ্রেঞ্চ নিউওয়েভ ফিল্্মের যুগ শুরু হয়ে গেছে। সেই ছবিগুলোতে গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে অন্যরকমভাবে অন্যকথা বলা হয়। খুবই টাইট বাজেট হয় ছবিগুলোর। তবে খুশির কথা এই যে ইদানীং লোকে ধীরে ধীরে নিতেও শুরু করেছে ওই ধরণের ছবিকে। তাই আমারও ইচ্ছে ওই ধরণের সিনেমা বানানোর; যেখানে আমি অন্যধরণের কথা অন্যভাবে বলতে পারব।’ একটানা কথাগুলো বলে লম্বা একটা চুমুক দেয় গ্লাসে। তারপরে শরীরটা এলিয়ে দেয় চেয়ারে। মনের যে কথাগুলো সে বাড়িতে বলে উঠতে পারেনি, এতদিন পরে বন্ধুদের কাছে সেই কথাগুলো বলতে পেরে খুব হালকা লাগছে তার।

এমনসময় স্পিকারে শব্দ ওঠে। সিক্স পিস ব্যান্ডের বাদকেরা উঠে পড়েছেন ডায়াসে। যে যার নিজেদের যন্ত্র বাজিয়ে সেগুলো টেস্ট করে নিচ্ছেন। এখন সাতটা বেজে পনেরো। আর একটু পরেই আসবেন মোকাম্বোর সেলিব্রিটি গায়িকা প্যাম ক্রেন।

কানাইয়ের শরীরে এখন কেমন যেন একটা অনুভূতি হচ্ছে। এটা সে আগে কখনো অনুভব করেনি। সবকিছু সে দেখছে, শুনছে; অথচ তার শরীর জুড়ে কেমন যেন একটা ভালোলাগার আলতো শৈথিল্য। আঃ, দারুণ রিল্যাক্সড লাগছে তার। সব টেনশন এখন একেবারে ভ্যানিশ। তার শরীর-মন জুড়ে এখন শুধুই ভালোলাগা আর ভালোলাগা। তাই চেয়ারে হেলান দিয়ে শরীরটাকে রিল্যাক্সড মোডে রেখেই একটুকরো কাবাব মুখে পোরে। মদিরা যে এত মদির তা সে আগে জানত না। থাকুক, থাকুক এই মদির শৈথিল্য তার শরীর জুড়ে থাকুক। তাই সে গ্লাসের বাকি তরলটুকু একচুমুকে শেষ করে দেয়। তারপরে অ্যান্টনিকে বলে— ‘অ্যান্টনি, তুই যা চাস, তাইই যেন হতে পারিস। তোর তৈরি সিনেমা দেখার অপেক্ষায় রইলাম। গুড উইশেশ ইন অ্যাডভান্স মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড।’

অরুণোদয় বলল— ‘তবে তখন আমাদের ভুলে যাস না। মাঝে মাঝে আসিস আমাদের বাড়ি।’

সৌগতও তার গ্লাসে শেষ চুমুকটা দিয়ে ঝুঁকে পড়ে ফিসফিস করে অ্যান্টনিকে বলল— ‘তখন আমাদের তোর অটোগ্রাফ দিস মাইরি। ‘‘না’’ বললে শুনব না কিন্তু। নইলে খিস্তি দেব।’ সবাই সৌগতর কথায় হো-হো করে হেসে ওঠে। বোঝাই যাচ্ছে যে ডাবল পেগ ভ্যাট তার আবেশ ছড়াতে শুরু করেছে চার বন্ধুর মধ্যেই। তারই মধ্যে ব্যান্ডের আওয়াজ ছাপিয়ে বৈভব বলে— ‘আরে এই ব্যাটা কানু, তুই কী করবি সেটা বললি না তো?’

—‘আমি?… আমি আর কী করব? এই একটা চাকরি-বাকরি করব। ভদ্রলোকের মতো বেঁচে থাকতে হবে তো।’

অ্যান্টনি বলে— ‘এটা তুই ঠিক বলেছিস কানাই। সবার আগে কিন্তু আমাদের ভদ্রলোক হতে হবে।’

এদিকে চারবন্ধুরই গ্লাস শেষ কিন্তু প্লেটে তখনও পড়ে রয়েছে কয়েকটুকরো কাবাব আর স্যালাড। তাই দেখে অ্যান্টনি বলল—‘ক্যা দোস্তোঁ, অউর এক এক পেগ হো জায়ে?’

সকলেই প্রায় সমস্বরে বলে উঠল— ‘হাঁ, হাঁ, হো জায়ে বস।’ তাই গ্লাসে ফর্ক ঠুকে অ্যান্টনি অ্যাটেনড্যান্টকে ডেকে সবার জন্যে আরও একটা করে পেগের অর্ডার দেয়। কয়েক মিনিটেই টেবিলে পৌঁছে যায় নতুন গ্লাস। এখন আর চার বন্ধুর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। তারা আমেজের প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করতে চায় যে যার নিজের মধ্যে আত্মস্থ থেকে। ধীরে ধীরে চুমুক দিতে থাকে পানীয়ে। ওদিকে ডায়াসে তখন জ্যাজের মূর্চ্ছনা, আর তারই মধ্যে ডায়াসে উঠলেন প্যাম ক্রেন। তাঁকে দেখেই অন্য সব টেবিল থেকে উঠল হাততালির ঝড়। স্মিত হেসে বাও করে প্যাম শুরু করলেন তাঁর গান—

When I was just a little girl

I asked my mother what will I be?

Will I be pretty? Will I be rich?

Here’s what she said to me—

Que sera sera… Whatever will be, will be.

The future’s not ours to see.

Que sera sera… Whatever will be, will be.

গান চলছে। সত্যিই অসাধারণ গান গায় প্যাম ক্রেন। গান চলতে থাকে। এদিকে ধীরে ধীরে সুর আর সুরা দুটোই জাঁকিয়ে বসতে শুরু করেছে চার বন্ধুর মধ্যে। সৌগত তো ফর্ক দিয়ে সুরের তালে তালে টোকা মেরে চলেছে গ্লাসে। ওদিকে কানাইয়ের মনেও সেই গানের অনুরণন। তার মনে হতে থাকে— প্যাম ক্রেনের ওই গানের কথার মতোই যেন তাদের ভবিষ্যৎ— …Whatever will be, will be. পুরোটাই অজানা…এক্কেবারে অজানা। যাকগে, যখন যা হবার, তা তখন দেখা যাবে। এখন এই সুন্দর সন্ধেটা ওসব ভেবে মাটি করে লাভ নেই। বরং আজকের এই সেলিব্রেশনটা চুটিয়ে উপভোগ করা যাক। তার মনে হয়, আরেকটা পেগ হলে ভালো হত। আরও মদির হত আজকের সন্ধেটা।

রাত তখন প্রায় দশটা। অ্যান্টনি একটা ট্যাক্সি করে বন্ধুদের প্রত্যেককে তাদের বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে তবেই বাড়ি ফিরবে। সেইমতো সে কানাইকেও নামিয়ে দিল তার বউবাজারের বাড়ির সামনে।

—‘বাই বাই, তাহলে সামনের রোববারে এখানে আবার দেখা হবে।’ বলতে গিয়েই কানাই টের পেল যে তার জিভটা যেন ভারী হয়ে আছে। সে নিজেকে যতটা সম্ভব সামলে নেবার চেষ্টা করল। ঠিক করে নিল যে কারোর সঙ্গে বিশেষ একটা কথা না বলে সে সোজা ঢুকে পড়বে তার ঘরে।

ট্যাক্সিটা চলে যেতেই কানাই খেয়াল করল যে বাড়ির সদর দরজা তখনও হাট করে খোলা। এমন তো হয় না। কিন্তু ভেতরে ঢুকতেই সে বুঝতে পারল যে বাড়িতে কিছু একটা ঘটেছে।

কেষ্টদার মুখোমুখি হতেই সে কানাইকে বলল— ‘এত দেরি করলে তুমি? আর ঘণ্টাদুয়েক আগে আসতে পারলে না?’

—‘কেন কী হয়েছে?’

—‘বড়দাবাবু আমাদের ছেড়ে চলে গেচেন গো। এই এখন ডাক্তারবাবু এসেচেন।’

কেষ্টদার কথা শুনে কানাইয়ের আমেজে একটা প্রচণ্ড ধাক্কা লাগে। এই অপ্রত্যাশিত দুঃসংবাদে টুকরো টুকরো হয়ে যেতে থাকে মদিরার আমেজ। সে নিজেকে সামলে নিয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখে যে বাইরের ঘরের তক্তপোশে শুয়ে আছেন তার দাদু। নীথর, নিঃস্পন্দ। তাঁর পায়ের কাছে বসে তার ঠাম্মি মুখে আঁচল চাপা দিয়ে ফোঁপাচ্ছেন। পাশে দাঁড়িয়ে অঞ্জনা কাকিমা।

দাওয়ায় উঠে দেখে যে তাদের হাউস-ফিজিসিয়ান অক্ষয় ডাক্তার চেয়ারে বসে তাঁর লেটারহেডে কিছু লিখছেন। তার স্যার, সুবিমলকাকু, পাশের বাড়ির ঘনশ্যাম বাগচী আর দাদুর বন্ধু আনন্দ লাহিড়ীবাবু একপাশে দাঁড়িয়ে। ডাক্তারবাবু তাঁর লেখা কাগজটা লেটারহেড থেকে ছিঁড়ে সুবিমলকাকুর হাতে দিয়ে বললেন— ‘সার্টিফিকেট দিয়ে দিলাম, তবে ঘণ্টাদুয়েক পরে বডি বের করবেন।’

—‘ঠিক আছে’ বলে সুবিমলকাকু ডাক্তারের ফিসটা দিতে তিনি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। ডাক্তারবাবুর ব্যাগটা নিয়ে কেষ্টদা গেল তাঁকে সদর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে।

বাগচীবাবু তখন রজনীকে বললেন— ‘আপনারা এখানে থাকুন। আমি মন্টুকে সঙ্গে নিয়ে জিনিসপত্রগুলো কিনে আনি বরং। মন্টু দোকান বন্ধ করে এখুনি এল বলে।’ রজনী তাঁর হাতে কিছু টাকা তুলে দিল খাট, ফুলমালা, ধূপ, নতুন কাপড়, অগুরু ইত্যাদি কেনার জন্যে। এমনসময় মন্টুদাও এসে ঢুকল। তাকে নিয়ে বাগচীবাবু বেরিয়ে গেলেন।

কানাই এখন স্তম্ভিত, বাক্যহারা। এমনটা যে ঘটে যাবে তা তার কল্পনাতেও আসেনি। তার প্রিয় দাদু এইভাবে তাকে ছেড়ে চলে গেলেন, অথচ তাঁর শেষ সময়ে কানাই তাঁর পাশে থাকতে পারল না। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় ঠাম্মির দিকে। তাকে দেখে ঠাম্মি বলে ওঠেন— ‘আর খানিক আগে আসতে পারলে না দাদুভাই। সেই বিকেল থেকে মানুষটা বারবার তোমার রেজাল্টের কথা জানতে চাইছিল। বারবার আমাকে জিজ্ঞেস করছিল— ‘দাদুভাই ফিরেছে?’

আর নিজেকে ক্ষমা করতে পারল না কানাই। মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসে ঠাম্মির কোলে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে উঠল সে। সুবিমল আর রজনী বেশ বুঝতে পারল কানাইয়ের মনস্তাপ। তাই একটু পরে সুবিমল গিয়ে কানাইয়ের পিঠে হাত রেখে বলল— ‘কানাই ওঠ। এখন আমাদের অনেক কাজ বাকি।’

আস্তে আস্তে ফোঁপানি কমে এল কানাইয়ের। সে হাতের তালুতে চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল। তারপরে অপলক চেয়ে রইল তার প্রিয় দাদুর প্রশান্ত মুখের দিকে। দাদু এখন অনন্ত ঘুমে আচ্ছন্ন। তার দাদুর এই প্রশান্তির ঘুম যাতে না ভাঙে তাই সে ধীর পায়ে সুবিমল আর রজনীর পাশ কাটিয়ে বেরোতে যায়। আর তখনই সুবিমল তাকে নরম স্বরে বলে— ‘এত দেরি করলি কেন রে?’

—‘বন্ধুদের সাথে গল্প করতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল।’

এবার রজনী একটু কড়া গলাতেই বলল— ‘এত রাত অবধি কীসের আড্ডা? রেজাল্ট তো সেই কখন বেরোনোর কথা। কেন সন্ধেবেলা কি বাড়ি ফেরা যেত না?’ কানাই মাথা নীচু করে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।

সুবিমল তাই জিজ্ঞেস করল— ‘রেজাল্ট কেমন হল?’

—‘এইট্টি ওয়ান পার্সেন্ট।’ আর ঠিক তখনই রজনীর নাকে এল সেই বিশেষ গন্ধটা। হালকা হলেও সে বুঝতে পারল কানাইয়ের এত দেরি হবার কারণটা কী। তাই নিজেকে ঠিক রাখতে না পেরে সে চাপা গলায় বলে উঠল— ‘কানাই তুই…।’ কিন্তু কাঁধে সুবিমলের হাতটা পড়তেই চুপ করে যায় রজনী। নিজেকে সংযত করে নেয় সে। আসলে সে বুঝতে পারেনি যে, কানাই এখন আর ছোটোটি নেই। তাই পরিস্থিতির খেয়াল না করেই সে…।

ঘর থেকে বেরিয়ে কানাই ধীরে ধীরে দাওয়ায় গিয়ে বসে। এতক্ষণ সে প্রাণপণ চেষ্টায় নিজেকে ধরে রেখেছিল। এবারে তার বিস্ফোরণ ঘটল। হাউহাউ করে ককিয়ে উঠল কানাই। মিনিট কয়েক এইভাবে কাঁদার পরে কিছুটা হালকা হলে দাওয়ার সিঁড়িতে বসে দু-হাতের চেটোয় চোয়ালের ভর রেখে উঠোনের ওপরের তারাভরা আকাশের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল সে।

সেদিন শেষরাতে শ্মশানে দাদুর জ্বলন্ত চিতার দিকে তাকিয়ে কানাই চোখের জলে দাদুকে বলেছিল— ‘আমি আর কখনো মদ খাব না দাদু। কক্ষনও না। এর জন্যেই তোমাকে…। তুমি আমাকে মাফ করে দিও দাদু, মাফ করে দিও।’

আর বেশ খানিকটা তফাতে বসে থাকা সুবিমল রজনীকে বলছিল— ‘এই বয়সে ছেলেরা এমন ভুল করেই থাকে। আমিও তো করেছিলাম। তা ছাড়া যুগটাও পালটেচ্ছে রজনী। তাই তুই আর ওকে এসব নিয়ে কিছু বলিস না। ছেলেটার একদিনের এই ছোট্ট ভুলটাকে ক্ষমা করে দিয়ে তুই বরং ওর রেজাল্টের দিকে তাকা। ভেবে দেখ তো, তুই ওকে আগলে আগলে গড়ে তুলেছিলিস বলেই না আজ ও এইট্টি ওয়ান পার্সেন্ট পেয়েছে। নইলে গ্রামে থাকলে তো ও কোথায় তলিয়ে যেত। যাইহোক, তুই আর ওকে বকাঝকা করিস না। তোর নিজের হাতে গড়ে তোলা স্বপ্নটাকে তুই ভেঙে দিস না রজনী।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *