১৯৪৩, সেপ্টেম্বর – ব্রাগানজার লাঠিচার্জ, শ্যামাদাসের টার্গেট আর ছদ্মবেশী
মন্বন্তর লাগার সাথে সাথে বেশ থিতিয়ে গেছে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন। গান্ধীজি এখন পুনার আগা খান প্যালেসে বন্দি। তবে তাঁর শরীর খুবই খারাপ। তাঁর অনশনেও কোনো টনক নড়েনি সরকারের। সেইসঙ্গে কংগ্রেসের শীর্ষনেতারাও বন্দি। এ ছাড়া গত একবছরে সারা দেশে প্রায় চারশো প্রতিবাদী স্বেচ্ছাসেবক মারা গেছে পুলিশের হাতে। প্রায় একলাখ মানুষকে জেলে পুরেছে ব্রিটিশ রাজশক্তি। চাষিদের ওপরে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে নতুন ‘যুদ্ধ-কর’; আর দেশে উৎপন্ন শস্য পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে বাইরে। যেটুকুও বা অবশিষ্ট খাদ্যশস্য থাকে, তারও সুষম বন্টন হয় না। বেশিরভাগটাই চলে যায় কালোবাজারে। তারই ফলে গ্রামগঞ্জ থেকে শহরে আসছে হাজার হাজার ভুখা মানুষ। দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষিপ্তভাবে এখনও চলছে প্রতিবাদী আন্দোলন। তবে সেগুলোকে জোর করে দমিয়ে দিচ্ছে ব্রিটিশের পুলিশ। দেশের সাধারণ মানুষও এইসব দেখে ক্ষুব্ধ। তাদের অন্তরে জ্বলছে চাপা আগুন। কলকাতাও তার ব্যতিক্রম নয়।
রজনীকান্ত সব শোনে, সব দেখে। তারও ইচ্ছে করে প্রতিবাদী মিছিলে সামিল হতে। কিন্তু তার ছেলেদের কথা ভেবে সে বিরত থাকে।
এই তো যেমন ক-দিন আগেই ধর্মতলায় একটা প্রতিবাদীদের মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে এক উচ্চপদস্থ ইংরেজ পুলিশ অফিসার শুধু নির্মমভাবে লাঠিচার্জ করাই নয়, কাঁদানে গ্যাসও ব্যবহার করতে নির্দেশ দেয়। সেদিনটাও ছিল বুধবার। খানিক আগেই অফিস থেকে বেরিয়ে রজনীকান্ত যাচ্ছিল বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের পান্ডের দোকানে। ধর্মতলার কাছাকাছি আসতেই তার চোখ জ্বলতে শুরু করে। কোনোরকমে রাস্তার ধারের ঘোড়ার জলখাওয়ার জায়গা থেকে পকেটের রুমালটা ভিজিয়ে নিয়ে চোখ মুছতে মুছতে যাচ্ছিল সে। প্রায় আধা-দৌড় আর কী। এমনসময় তার গায়ে এসে পড়ে প্রতিবাদীদের একজন। অল্পবয়েস। তাকে এক নাকেচোখে ঠুলি পরা ইংরেজ পুলিশ অফিসার নির্মমভাবে হাতের ব্যাটন দিয়ে পেটাচ্ছে। মাটিতে পড়ে গেছে ছেলেটা। দু-হাতে মাথা চেপে ধরে আছে। সেখান থেকে চুঁইয়ে পড়ছে রক্ত। যন্ত্রণায় চেঁচাচ্ছে সে, তবু পুলিশ অফিসারের ব্যাটন থামার নাম নেই। সায়েবের ওই নৃশংসতা দেখে শেষপর্যন্ত রজনী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। সে এগিয়ে যায় কোনোরকমে ওই অফিসারের আক্রোশ থেকে ছেলেটাকে সরিয়ে নিতে। তার পিঠে ততক্ষণে আছড়ে পড়তে শুরু করেছে ব্যাটন। পাছায় লাগছে সায়েবের শক্ত বুটের ডগার গুঁতো। কিন্তু এসব মার অবলীলায় সহ্য করার মতো শরীর তৈরি করেছে সে। তাই রজনীকান্ত ওই আছড়ে পড়া ব্যাটন থেকে ছেলেটাকে আড়াল করে তাকে চাগিয়ে তুলে নেয় কাঁধে। ছেলেটার ওজন পঞ্চাশ-বাহান্ন সেরের কাছাকাছি হবে। কিন্তু যে রাতের অন্ধকারে নুড়ি-বালির বস্তা পিঠে নিয়ে নদীর চরে দৌড়োয়, তার কাছে এই ওজনটা কিছুই নয়। তাই দৌড়…দৌড়…দৌড়। যে করেই হোক ছেলেটাকে কাঁদানে গ্যাসের আওতার বাইরে নিয়ে যেতেই হবে। প্রায় আধমাইল দৌড়ে একসময়ে সে পৌঁছেও যায় গ্যাসের চৌহদ্দির বাইরে। সেখানে একটা টিউবওয়েলের কাছে ছেলেটাকে নামিয়ে জল দিয়ে ধুইয়ে দেয় তার মুখ চোখের রক্তের ধারা। ততক্ষণে জমা হয়ে গেছে স্থানীয় কিছু লোক। তারাও হাত লাগায়। ছেলেটাকে ধরাধরি করে তারাই নিয়ে যায় কাছেরই এক ডাক্তারখানায়।
খানিকপরেই বেরিয়ে আসে রজনী। তাকে এবার তাড়াতাড়ি পৌঁছতে হবে পান্ডের দোকানে। কিন্তু ছেলেটার মাথা থেকে চুঁইয়ে পড়া রক্তের ফোঁটা ভিজিয়ে দিয়েছে তার জামার কিছুটা অংশ। এই অবস্থায় তো আর ঘোরাফেরা করা যায় না। তাই সে কাছেরই একটা কাপড়ের দোকান থেকে একটা সস্তা দামের গাঢ় খয়েরি রঙের গায়ের চাদর কিনে জড়িয়ে নেয় গায়ে। তারপর সে সটান হাজির হয়ে যায় পান্ডের দোকানে।
আজকাল আর পান্ডেকে দেখিয়ে দিতে হয় না কোন প্যাকেটটা নিতে হবে। যে বেঞ্চে রজনী বসবে সেই বেঞ্চে আগে থাকতেই সাজিয়ে রেখে দেয় প্যাকেটগুলো যাতে অন্য কেউ যেন সেই বেঞ্চে বসতেই না পারে। আর সুযোগ বুঝে বিশেষ প্যাকেটটা টুক করে নিজের ব্যাগে চালান করে দেয় রজনী। তবে আজ দোকানের কাজ সেরে বাইরে বেরিয়ে সে দেখল উলটোদিকের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা আর নেই। স্রেফ ভ্যানিশ।
এবারে সে হাঁটতে থাকে ফুটপাথ দিয়ে। হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন তার নাম ধরে ডাকে। তবু শুনতে পেয়েও সাড়া না দিয়ে সে দু-পা পাশে সরে গিয়ে হাঁটতে থাকে। সারা শরীর সজাগ হয়ে ওঠে তার।
কিন্তু আবার ডাক আসে পেছন থেকে— ‘কী রে রজনী। চললি কোথায়?’
গলাটা কেমন যেন চেনা চেনা লাগল এবার। পেছন ফিরে দেখে, তার কলেজের বন্ধু সুবিমল। কলেজ জীবনে রীতিমতো বন্ধুত্ব ছিল কিন্তু এখন তাদের চলার পথ আলাদা। তবু পুরোনো বন্ধুর দেখা পেলে কার না ভালো লাগে। তাই দাঁড়িয়ে যায় সে।
—‘আরে সুবিমল যে, কী খবর বল?’
—‘সেই কখন থেকে তোকে ডাকছি, সাড়াই দিচ্ছিস না। তা এখন চললি কোথায় বল তো?’
—‘এই বাড়ি ফিরছিলাম। তা তুই এখন কী করছিস?’
—‘দেখ, সব জবাব পাবি, কিন্তু এইভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে…তা তোর হাতে একটু সময় আছে তো? তাহলে চল না, কোথাও একটু বসে গ্যাঁজাই। হাতে ঘণ্টাখানেক সময় আছে তো?’
রজনী হাতের ঘড়িটা দেখে। এতক্ষণ খেয়াল করেনি যে ঘড়ির কাঁচটা ভেঙে গেছে। যদিও ঘড়িটা চলছে। সাড়ে ছ-টা বাজে। সেপ্টেম্বরের সন্ধে আস্তে আস্তে শহরের ওপর বিছিয়ে দিচ্ছে তার ধূসর চাদর। তবু ঘণ্টাখানেক সময় তো দেওয়াই যেতে পারে পুরোনো বন্ধুকে। আর মাঝেমাঝে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে একটু আড্ডাও তো মারতে ইচ্ছে করে। তাতে মনটা বেশ ফ্রেশ লাগে।
তার জবাব দিতে দেরি হচ্ছে বলে সুবিমল বলে— ‘কী রে, চুপ করে রইলি কেন?’
—‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, সময় আছে। তা কোথায় গিয়ে বসবি বল তো?’
—‘যেতে যেতেই না হয় কথা হবে।’ বলেই পাশ দিয়ে যাওয়া একটা ছ্যাকরা গাড়িকে থামিয়ে উঠে বসে রজনীকে বলে— ‘উঠে আয়।’ তারপরে কোচোয়ানকে বলে— ‘পার্ক স্ট্রিট।’ গাড়ি চলতে থাকে। যেতে যেতে সুবিমল বলে— ‘তা গায়ে চাদর জড়িয়েছিস কেন? শরীর খারাপ নাকি?’
—‘এই একটু জ্বর জ্বর হয়েছে। তেমন কিছু নয়। ভাদ্রমাসের ঘাম বসে বসে যা হয় আর কী।’
—‘তা তুই এখন কী করছিস?’
—‘আমি একটা প্রাইভেট অফিসে কাজ করি। ডালহৌসি পাড়ায়। তা তুই কী করছিস?’
—‘আমি তো মিউজিয়মে আছি। এই পাশেই।’
সুবিমল একটা সিগারেট ধরায়। গাড়ি ততক্ষণে পার্ক স্ট্রিটে ঢুকছে। জাপানি বোমার আতঙ্কে পার্ক স্ট্রিটও আজ ম্যাড়মেড়ে অন্ধকারে ডুবে। বার আর রেস্টুরেন্টের বাইরে ম্লান আলোর একটা করে কম ওয়াটের বাল্ব ঝোলানো। তারও ওপর দিকটা কালো রং করা। যুদ্ধ যেন কেড়ে নিতে চাইছে কলকাতার উচ্ছল উদ্দাম জীবনের প্রতীক পার্ক স্ট্রিটের প্রাণশক্তির নির্যাসটুকুও।
একটা বারে ঢুকতে ঢুকতে সুবিমল বলে— ‘কতদিন পরে তোর সঙ্গে দেখা। তাই আজ একটু সেলিব্রেশন করব। আয়, ভেতরে আয়।’ রজনী বুঝতে পারে যে সুবিমল ভালোই রোজকার করে।
—‘কিন্তু…মানে এইভাবে চাদর গায়ে…।’
—‘আরে ধুর। ছাড়তো। ওসব পাত্তা দিস না। কলকাতায় পকেটে পাত্তি থাকলে ভিখিরিও বাদশাহী কেতা মারে।’
একটা টেবিলে মুখোমুখি বসে তারা। রজনী একটু জড়োসড়ো। তার একটু অস্বস্তি হচ্ছে। সে তো কখনো ঢোকেনি এইসব জায়গায়। তবু সুবিমলকে সে তা বুঝতে দেয় না। বারটা মোটামুটি ফাঁকা। বড়ো পিপাসা পেয়েছে তার। অনেক দৌড়ঝাঁপ আর টেনশন গেছে। তাই টেবিলে রাখা দু-গ্লাস জলই সে খেয়ে নেয়। আর তখনই ওয়েটার টেবিলে এসে হাজির।
সুবিমল জিজ্ঞেস করে— ‘তা তোর জন্যে কী নেব? বিয়ার, হুইস্কি না রাম।’
—‘আমি তো ওসব খাই না রে।’
—‘যাকগে, তোকে জোর করব না। তুই সেই আগের মতোই আছিস। তা আইসক্রিম সোডা খেতে আপত্তি নেই তো তোর?’
—‘না, সেটা চলতে পারে।’
রজনীর জবাব শুনে নিয়ে সুবিমল ওয়েটারকে বললে— ‘একটা চিলড লায়ন আর একটা আইসক্রিম সোডা।’ অর্ডার নিয়ে চলে যায় বেয়ারা।
সুবিমলের মুখে জাদুঘরের নামটা শুনেই রজনীর মনে পড়ে গিয়েছিল কথাটা। আরে, সে তো ওখানেই চাকরির দরখাস্ত করেছিল। আজ তাহলে সময় সুযোগ করে সুবিমলকে বলতে হবে কথাটা। তবে দুম করে তো আর কথাটা পাড়া যায় না। তাই আড্ডাটা একটু জমে উঠলে কথাটা সে পাড়বে।
—‘তা হ্যাঁরে সুবিমল, তুই কি এখনও বিরাটিতেই থাকিস? আর বিয়ে-থা করেছিস নাকি?’
—‘হ্যাঁরে ওখানেই থাকি। আর বিয়ে? তা করেছি বটে একটা। আর একটাই কন্যে। বয়স সাড়ে তিন হবে সামনের মাসে। তা তুই কি বিয়ে করেছিস?’
বেয়ারা ততক্ষণে বিয়ার নিয়ে এসে ঢেলে দিল কাঁচের মগে। তারপরে পপকৰ্নের বাটিটা রেখে সোডাটা খুলে রেখে দিল টেবিলে। বিয়ারে একটা লম্বা চুমুক মেরে সুবিমল বললে— ‘কী রে বললি না তো, বিয়ে করেছিস কি না।’
—‘না, তবে কুড়িটা ছেলে আছে আমার।’ মৃদু মৃদু হাসতে থাকে রজনী।
সুবিমল বুঝতে পারে হেঁয়ালি করছে রজনী। তাই সেও হেসে বলে— ‘সে কী রে, বিয়ে না করেও কুড়িটা ছেলে? এটা কি তোর পরকীয়ার দায়ভার নাকি? তা দোস্ত, হেঁয়ালি না করে ব্যাপারটা একটু ঝেড়ে কাশো তো। পরকীয়া করার মতো মাল তো তুমি নও।’
সোডায় একটা সিপ দিয়ে রজনী বলে— ‘তাহলে শোন। আমি আমাদের গ্রামে জনা কুড়ি ছেলেকে তাইকোন্ডো শেখাই। তাদের খেলার গাউন কিনে দিতে হয়। প্র্যাকটিসের আগে তাদের ছোলা-গুড় দিতে হয় আর প্রতি রবিবার দুপুরে তাদের জন্যে খিচুড়ির ব্যবস্থা করতে হয়। এইসব করতেই যা মাইনে পাই তার মোটামুটি বেশিরভাগটাই খরচ হয়ে যায়। তাই আর বিয়ে…।’
তাকে আর বলতে না দিয়ে সুবিমল সিরিয়াসলি বলে— ‘বুঝেছি। দেশসেবা করিস।’ বিয়ারে আবার চুমুক দিয়ে একটা সিগারেট ধরায় সে।
—‘না, মানে ঠিক তা নয়। আসলে ওই আধপেটা খেয়ে থাকা ছেলেগুলোকে একটু খাবারের জোগান না দিলে ওরা আমার কাছে আসবে কেন, বল? তা ছাড়া ওরা আমাকে খুব ভালোওবাসে। আর আমিও ওদের ছাড়া থাকতে পারি না।’
—‘হুম, বুঝলাম। তাহলে তো তোর এখন একটা ভালো মাইনের চাকরির দরকার। নইলে বিয়ে-শাদি করতে পারবি না। তা ভালো কোনো চাকরির খোঁজখবর করছিস? নাকি শুধু দেশসেবাই করছিস?’
রজনী দেখল এটাই সুবর্ণ সুযোগ। তাই সে কথাটা পাড়লে— ‘হ্যাঁরে সুবিমল, তুই মিউজিয়মে কোন ডিপার্টমেন্টে আছিস বল তো?’
—‘ডিরেক্টরের অফিসে। কেন?’
—‘শোন না, আমি মাস ছয়েক আগে মিউজিয়মের একটা টাইপিস্ট কাম ক্লার্কের জন্যে অ্যাপ্লিকেশন করেছিলাম। এখনও পর্যন্ত কোনো জবাব আসেনি। তা ওই পোস্টটায় কি লোক নিয়ে নিয়েছে? জানিস কিছু?’ রজনী উদগ্রীব হয়ে থাকে উত্তরের জন্যে।
সিগারেটের ছাইটা অ্যাশট্রেতে ঝেড়ে সুবিমল বলে— ‘যতদূর জানি, বোধ হয় নেয়নি। বুঝতেই পারছিস, সরকারি দপ্তরের কাজ। দিল্লি থেকে স্যাংকশন এলে তবেই না প্রসেসিং শুরু হবে। ঠিক আছে, আমি খোঁজ নিয়ে তোকে জানাব ব্যাপারটা কতদূর প্রোগ্রেস করেছে। এইনে, আমার কার্ডটা রাখ তোর কাছে। এতে আমার অফিসের আর বাড়ির, দু-জায়গারই ফোন নম্বর দেওয়া আছে।’ বলে পকেট থেকে নিজের কার্ডটা বের করে দেয় সুবিমল। রজনীও তার অফিসের নম্বর দেয় সুবিমলকে। সে টিস্যু পেপারে লিখে নেয়।
—‘শোন না, যদি ওই ভ্যাকেন্সিটা থাকে তাহলে তুই আমার হয়ে একটু রেকমেন্ড করতে পারবি? অবশ্য তোর যদি কোনো অব্লিগেশন না থাকে।’
সুবিমল একটু চেয়ে থাকে পুরোনো বন্ধুর দিকে। সে বুঝতে পারে রজনীর কত প্রয়োজন চাকরিটার। তাই সে রজনীকে আশ্বস্ত করে বলে— ‘তোর জন্যে করব না? এটা তুই ভাবলি কী করে? আলবাৎ করব। আর সেটা না করলে তুই দিল্লি কা লাড্ডু পাবি কী করে?’ ভুরু নাচিয়ে মুচকি হাসে সে।
রজনী সোডায় আবার একটা সিপ করে চাদরটা খানিকটা তুলে সুবিমলের দেওয়া কার্ডটা বুক পকেটে ঢোকাতে যায় আর তখনই সুবিমলের নজরে পড়ে রজনীর জামার কাঁধের কাছটায় রক্তের দাগটা। সে রজনীকে জিজ্ঞেস করে— ‘একটা সোজা কথা বল তো ইয়ার, তুই কি আজ প্রতিবাদীদের মিছিলে গিয়েছিলিস?’
—‘কই। না তো।’
—‘তাহলে তোর কাঁধে চোট লাগল কী করে?’
—‘আরে না না, ওটা কোনো ইনজুরি নয়। আজ ধর্মতলা দিয়ে যখন আসছিলাম, তখন দেখলাম এক লালমুখো বড়ো পোস্টের পুলিশ অফিসার একটা অল্পবয়সি ছেলেকে ব্যাটন দিয়ে নির্মমভাবে মারছিল। ছেলেটার মাথা ফেটে গিয়েছিল, রক্ত বেরোচ্ছিল, কিন্তু তবুও তাকে নির্দয়ভাবে পিটিয়ে যাচ্ছিল ওই অফিসার।’
—‘তা, তুই তখন কী করছিলিস?’
—‘আমি ছেলেটাকে ওই অফিসারের হাত থেকে রেসকিউ করে দূরে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম।’
—‘তা তোর কাঁধে ক-টা ব্যাটনের বাড়ি পড়েছিল যে তোর কাঁধে চোট লাগল?’
—‘আমার গায়েও গোটা সাতেক ব্যাটনের বাড়ি আর বুটের গুঁতো পড়েছিল। তবে আমার ওসবে কিছু যায় আসে না। ওতে লাগে না আমার। আর কাঁধের এই দাগটা ছেলেটার রক্তের।’
—‘হ্যাঁ, অফিসে বসেই শুনেছিলাম যে নারকোটিক্সের পিটার ব্রাগানজা আজ স্পেশাল ডিউটিতে গিয়ে ধর্মতলায় টিয়ার গ্যাস ছেড়েছে আর লাঠিচার্জও করিয়েছে। তা তোর সঙ্গেই যে তার মোলাকাত হয়েছিল এখন বুঝলাম। আর এও বুঝলাম যে তোর জ্বরটর কিছু হয়নি। রক্তের দাগটা লোকের চোখের আড়াল করতেই চাদর জড়িয়েছিস।’ বলেই হেসে সুবিমল বিয়ারের তলানিটুকু শেষ করে আবার বলতে থাকে— ‘তবে কী জানিস রজনী, ওই লোকটা, ইন জেনারেল, প্রতিবাদীদের ওপরে তেমন নির্দয় নয়। ও আমাদের অফিসেও এসেছিল বার তিনেক। ডিরেক্টরের সঙ্গে দেখা করতে। ডিরেক্টর সায়েব ওর বন্ধু। একটু আড্ডাবাজ আর মুডি আছে লোকটা। বারে মদ খেতে গিয়ে মাঝেমাঝে মুড হলে হাতে গিটার তুলে নেয়, আবার কখনো বা পিয়ানো বাজাতে বসে পড়ে। পুলিশের উঁচু পদের লোক বলে বারের লোকেরাও কিছু বলে না। তোয়াজ করে চলে আর কী। তবে আমি কখনো দেখিনি। কিন্তু শুনেছি যে লোকটা নাকি বেশ ভালোই পিয়ানো আর গিটার বাজায়। আমাদের সায়েব ওর বাড়িতে ক্রিসমাসের সময়ে গিয়ে ওর বাজনা শুনে এসেছে।’
—‘আচ্ছা, তাই নাকি।’
—‘তবে দেখিস রজনী। এসব প্রতিবাদ-টতিবাদের মধ্যে জড়িয়ে পুলিশের খাতায় তোর নাম যেন না ওঠে। জানিস তো, কোনো সরকারি চাকরির আগে পুলিশ ভেরিফিকেশন হয়।’
—‘আরে না না। আমি ওসবের মধ্যে থাকি না। তুই নিশ্চিন্ত থাকতে পারিস।’
ততক্ষণে কথার মাঝেই বেয়ারা এসে দাঁড়িয়েছে সুবিমলের ইশায়ার। তাকে ড্রিঙ্কসের দাম আর টিপস দিয়ে বিদেয় করে সুবিমল। বাইরে বেরিয়ে এসে রজনীকে বলে— ‘তাহলে শোন রজনী, তুই বরং সামনের সপ্তায় শনিবারে আমার সঙ্গে এই বারের সামনেই দেখা করিস। দু-চার মিনিট এদিক ওদিক হলেও কেটে পড়িস না যেন আবার। বেস্ট হয়, তুই যদি সেদিন বিকেল চারটে নাগাদ আমার অফিসে একবার ফোন করে নিস। দেখা যাক না, কত দূর কী করতে পারি। তবে যাইই হোক না কেন, শনিবার সব জানতে পেরে যাবি। অফিস থেকে ফোনে তো আর সব কথা বলা যায় না। তাইই এখানে আসতে বলছি। তা ছাড়া একটু আড্ডাও হবে। সেটাই বা কম কী? আচ্ছা, আজ আসি তাহলে? মেয়েটা আবার বাপের ন্যাওটা, বুঝলি। অপেক্ষা করে বসে থাকবে।’
—‘হ্যাঁ, আয়। আমি শনিবারে ফোন করে তবেই আসব। সাবধানে যাস।’
একটা ছ্যাকরা গাড়ি থামিয়ে উঠে পড়ে সুবিমল। কোচোয়ানকে বলে— ‘শিয়ালদা স্টেশন।’ টংয়ের পাদানীর ঘণ্টি বাজাতে বাজাতে এগিয়ে যায় গাড়ি। আর রজনী একা দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকে পিটার ব্রাগানজার কথা। অদ্ভুত এই লোকটা। যে হাতে সে সুর ধরে, সেই হাতে সে আবার লাঠিও ধরে? এরকম দ্বৈতসত্বা কি সব মানুষেরই থাকে?
একটু পরেই সে চৌরঙ্গির দিকে এগিয়ে যায় হাওড়ার বাস ধরার জন্যে।
.
বাড়িতে পৌঁছে দেখে বিষ্টুচরণ অপেক্ষা করছে তার দাওয়ায়। বিষ্টুর টর্চের আলোয় প্যাকেটটা ব্যাগ থেকে বের করতে গিয়ে রজনীর সামান্য অসাবধানতায় তার জামার রক্তের দাগটা চোখে পড়ে যায় বিষ্টুর।
সে বলে— ‘কী হয়েচে গো। জামায় এত রক্ত কেন? বলি কোতায় চোট পেলে?’
—‘ও কিছু নয়। রাস্তায় পড়ে গিয়ে কাঁধটা ছড়ে গেছে।’
আর কথা না বাড়িয়ে রজনী ব্যস্ত হয়ে পড়ে চাবি দিয়ে দরজার তালা খুলতে। তাকে একটুখানি দেখে বিষ্টু দাওয়া থেকে নেমে নিজের পথ ধরে। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে রজনী বুঝতেই পারে যে এই কথাগুলো শ্যামাদাসদার কানে পৌঁছবেই, আর সে ঠিক দুয়ে দুয়ে চার করে নেবে। যাকগে, যা হবার তা হবেই। অত ভেবে লাভ কী? বরং এইসব ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়াই ভালো।
কলতলায় গিয়ে, জামা ধুয়ে, চান করে ঘরে আসে রজনী। সোডাটা খাওয়ার জন্যে আজ তার খুব খিদে পেয়েছে। তাই তাড়াতাড়ি খেয়ে নেয় সে। এরপরেই বুঝতে পারে আজ তার বড্ডো ঘুম পাচ্ছে। তাই মিনিট পনেরো পরেই সে চলে যায় বিছানায়।
সেদিন ঘুমের মাঝে স্বপ্নে দেখতে থাকে— সে জাদুঘরের অশোকস্তম্ভের সামনে বসে একমনে টাইপ করে চলেছে আর স্তম্ভের একটা সিংহ তাকে ডিকটেশন দিচ্ছে। সিংহটার কথামতোই সে টাইপ করতে চাইছে, কিন্তু তার কাগজে বারবার টাইপ হয়ে যাচ্ছে ‘বন্দেমাতরম’। হঠাৎ তার কাঁধে কে যেন সজোরে আঘাত করে। চমকে সে ফিরে দেখে যে তার পেছনে উদ্যত ব্যাটন হাতে দাঁড়িয়ে আছে একজন পুলিশ অফিসার। সে আর কেউ নয়— চোখে নাকে ঠুলি পরা পিটার ব্রাগানজা।
ঘুমটা ভেঙে গেল তার। তখন সবে সকাল হচ্ছে। পুবদিকের জানলা দিয়ে একফালি রোদ মশারি ভেদ করে ছুঁয়ে যাচ্ছে তার শরীর। বিছানা থেকে নেমে মুখ-হাত ধুয়ে আয়নায় নিজের পিঠটা দেখে সে। চার-পাঁচটা কালশিটে পড়ার দাগ। তাই দেখে হেসে ফেলে রজনী; কারণ এই প্রথম কেউ তাকে প্রতিরোধহীন আঘাত করতে পারল।
সেদিন অফিস থেকে ফেরার পরে রাত দশটা নাগাদ বিষ্টুচরণ এল। দূর থেকেই তার পায়ের আওয়াজ আর টর্চের আলো ধরা পড়েছিল রজনীর কাছে। সে জানতই যে আজ না হয় কাল বিষ্টু আসবেই।
—‘কী খবর এনেছ বিষ্টু? বলে ফেল।’
—‘শোনো, শ্যামাদা বলে পাঠিয়েচে হপ্তা দুয়েক চুপচাপ থাকতে। একোন পান্ডের দোকানেও তোমার যাবার দরকার নেই। পুলিশের লোক হয়তো চিন্নত করে ফেলেচে তোমায়। তাই কলকেতার জায়গাও পালটাতে হবে। সব ঠিকঠাক হলে তবেই আবার কাজ শুরু হবে। বুইলে?’
—‘হ্যাঁ, বুঝলাম।’
—‘আর হ্যাঁ, শনিবার একবার সেনেদের ভিটেয় যেও দিকিনি।’
—‘আচ্ছা, ঠিক আছে। যাব।’
বিষ্টুচরণ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় অন্ধকারে।
.
—‘আরে, এসো রজনী। বসো।’ দরজা খুলতেই বলে ওঠে শ্যামাদাস। দিনেশ আর বিষ্টু ছাড়াও আরও কয়েকজন আধাচেনা, অচেনা লোক সেখানে হাজির। সব্বাই চুপ। রজনীকান্ত একটা ফাঁকা চেয়ারে বসতেই একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে শ্যামাদাস বললে—‘অবস্থাটা তুমি আশাকরি বুঝতে পেরেছ রজনী। পুলিশের চোখে তুমি মার্কড হয়ে গেছ। সেদিন ধর্মতলায় অ্যাকশনের সময় তুমি পিটার ব্রাগানজার সামনে পড়ে গিয়েছিলে। তবে তোমার কপাল ভালো যে ওর বডিগার্ড তখন ওর সঙ্গে ছিল না। থাকলে হয়তো সে তোমায় জাস্ট শুট করে দিত; আর তাহলে সেটা হত আমার কাছে অতীব দুঃখজনক।’ সিগারেটের ছাইটা ক্রমশ লম্বা হচ্ছে শ্যামাদাসের হাতে। সে আবার শুরু করে— ‘তাই এখন তোমার পক্ষে কাজ করাটা রিস্কি হয়ে যাবে। এখন কিছুদিন চুপ করে থাকতে হবে। কলকাতার জায়গাটা দু-চার দিনের মধ্যেই পালটানো হয়ে যাবে আর আমাদের লোকও পালটাতে হবে। আর সেজন্যেই তোমাকে এখানে ডেকেছি।’ একটানা বলে এবার সিগারেটের ছাইটা ঝেড়ে তাতে একটা লম্বা টান দেয় শ্যামাদাস। আর রজনী ভাবতে থাকে— পিটার ব্রাগানজার বডিগার্ড কেন তাকে বিনা কারণে দিনের আলোয় শুট করত? সে তো সায়েবকে মারতে যায়নি। এটা কী তাহলে…?
—‘তা আমাকে এখন কী জন্যে ডেকে পাঠিয়েছেন শ্যামাদা? বিশেষ কোনো কাজ আছে কি?’
—‘হ্যাঁ আছে।…রজনী, তুমি এমন একজনকে রেফার কর যে তোমার জায়গায় কাজটা করে দেবে। বলছিলাম কী, তোমার ওখানে তো অনেক ছেলেই তাইকোন্ডো শিখতে আসে। তা তাদের মধ্যে কাউকে যদি…বা তোমার অন্য কেউ চেনা জানা বিশ্বাসী লোক থাকলে তুমি তারও নাম আমায় বলতে পার।’
শ্যামাদাস সিগারেটে ঘন ঘন টান দিতে থাকে উত্তরের প্রত্যাশায় আর রজনীর মনে ভাবনার ঢেউ ওঠে। এমন কেউ তার জানা নেই যাকে সে এইকাজ করতে বলতে পারে। আর তার দলের পুলিনই যা একটু বড়োসড়ো। এইমাসেই আঠারো পূর্ণ হবে তার। কিন্তু তাদেরকে যে সে সন্তানের মতো ভালোবাসে। কী করে সে তাদের এই রিস্কি কাজের মধ্যে ঠেলে দেবে? না, সে তা পারবে না।
—‘কী রজনী? কী এত আকাশপাতাল ভাবছ? তোমার দলেই তো একজন আছে যে এই কাজটা করতে পারে।’
—‘আপনি কার কথা বলছেন?’
—‘কেন, পুলিন। সে তো বেশ চৌখস ছেলে বলেই আমার মনে হয়েছে।’
বিস্মিত রজনী বলে— ‘কী বলছেন শ্যামাদা? ও এখনও সাবালক হয়নি। তা ছাড়া কলকাতা ও চেনে না ভালো করে। প্লিজ শ্যামাদা, আপনি অন্য কাউকে দেখুন। ওকে বাদ দিন। ও এখনও বাচ্চা।’
—‘কিন্তু তুমি তো জানো ওই বয়সের কত ছেলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়েছে। আর তারা যদি পারে, তাহলে পুলিনই বা কেন পারবে না এই সামান্য কাজটা করতে? তুমি নিজেই তো কাজটা করে দেখেছ। কোনো রিস্ক আছে কি, বল? আর আমি আমার লোকজনের নিরাপত্তার কথাটা মাথায় রাখি বলেই তো তোমাকে সরিয়ে নিতে চাইছি। একইভাবে পুলিনকেও আমি নিরাপত্তা দেব। তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পার। পুলিনের সব দায়িত্ব আমার।’
রজনী বুঝতে পারে যে শ্যামাদাস পুলিনকে টার্গেট করে ফেলেছে। অতএব যেমন করেই হোক তাকে দলে টানবেই। তবু সে একবার শেষ চেষ্টা করে— ‘শ্যামাদা, আমাকে না হয় অফিসের কাজে কলকাতায় যেতে হত। তাই খরচ-খরচা কিছুই লাগত না। কিন্তু ও তো গরিব ঘরের ছেলে…।’
হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে শ্যামাদাস বলে— ‘তুমি কি ভেবেছ যে আমি সে কথাটা ভেবে দেখিনি? ওকে প্রতিবার যাওয়া-আসার গাড়িভাড়া ছাড়াও দুটো করে টাকা দেব। আশা করি তাতে ওর অসুবিধে হবে না। আর আমার লোক তাকে ওই নতুন জায়গাটা চিনিয়েও দেবে।’ সিগারেটে আবার টান দেয় শ্যামাদাস।
রজনী চুপ করে থাকে। অবস্থাটা এখন তার হাতের বাইরেই চলে গেছে বলে মনে হচ্ছে। এই গ্রামে শ্যামাদাসের বেশ প্রতিপত্তি আছে আর সেইসঙ্গে আছে গরিব ছেলেটাকে দেওয়া টাকার টোপ। এই দুটোকে সে কী করে সামলাবে। সে না চাইলেও শ্যামাদাস পুলিনকে ঠিক ম্যানেজ করে ফেলবে।
—‘শোনো রজনী, তুমি বরং কাল এই সময়ে এখানে পুলিনকে পাঠিয়ে দিও তাহলে।’
মন তার মানছে না। তবু মনের কষ্ট মনেই চেপে রেখে রজনী বলে— ‘আচ্ছা, পাঠিয়ে দেব। তবু আর একবার ভেবে দেখুন শ্যামাদা। আপনার তো গ্রামের অনেকের সঙ্গে জানাশোনা। দেখুন না, তাদের কেউ যদি রাজি হয়। আসলে পুলিনটা যে বড্ডো ছোটো।’ বড়ো অসহায় বোধ করে সে।
কিন্তু তার কথার কোনো জবাব না দিয়ে হাতের সিগারেটটায় শেষ সুখটান দিয়ে মাটিতে সেটা ফেলে পা দিয়ে পিষে নিভিয়ে দেয় শ্যামাদাস।
.
মাঝে রবিবারের প্র্যাকটিসের সময় একফাঁকে রজনী পুলিনকে একান্তে জিজ্ঞেস করলে— ‘কলকাতার জায়গাটা কোথায়?’ পুলিন মাথা নীচু করে নিলো। রজনী বুঝতে পারল, কলকাতার ঠিকানা কাউকে না বলতে শ্যামাদাসই পুলিনকে বারণ করে দিয়েছে। তবু একবার সে শেষ চেষ্টা করলে— ‘দ্যাখ পুলিন, আমি রোজ কলকাতায় যাই, সেখানকার পথঘাট ভালো করে চিনি। তাই সেখানে তোর কোনো আপদ-বিপদ হলে আমিই তোকে বাঁচাতে পারব। তুই শুধু ডেলিভারি নেবার দিন, সময় আর ঠিকানাটা আমায় বলে রাখ। তাহলেই হবে। কেউ কিচ্ছুটি জানবে না।’
গুরুর এই কথায় বুঝি ভরসা পেল পুলিন। বললে— ‘বৃহস্পতিবার সন্ধে ছ-টা। সতেরো বাই দুই মার্কুইস স্ট্রিট।’
দু-দিনের মধ্যেই অফিস শেষে রজনী ঘুরে দেখে এল জায়গাটা। সেটা একটা চীনা জুতোর দোকান। দেখে তো মনে হয় না খুব একটা বিক্রিবাটা চলে। আচ্ছা, তাহলে পুলিনকে আসতে হবে এখানেই। তার ওপরে রাস্তার বাল্বগুলোর ওপর দিকটা কালো রং করে রাখার জন্যে সন্ধেবেলা রাস্তার অনেক জায়গাতেই বেশ আলো-আঁধারীর খেলা। এরপরে সে সেখান থেকে সোজা চলে গেল নিউমার্কেটে। কিনল একটা সস্তার গান্ধীটুপি আর পাশের একটা ওষুধের দোকানে ঢুকে কিনল একটা ছানী অপারেশনের পরে পরার সানগ্লাস, একটা সরু ব্যান্ডেজ আর খানিকটা তুলো। তারপরে বাড়িতে ফিরে মাথায় টুপিটা দিয়ে চোখে পরল সানগ্লাস আর একটা চোখের নীচে ঢুকিয়ে দিল খানিকটা ব্যান্ডেজে মোড়া তুলোর প্যাড। আয়নায় ভালো করে দেখে সে নিশ্চিন্ত হল যে তাকে আর চট করে চেনা যাচ্ছে না। পুলিনই হোক, পিটার ব্রাগানজার লোকই হোক বা অন্য কেউ হোক, তারা দূর থেকে তাকে আর সহজে চিনে উঠতে পারবে না। এরপর সব খুলে সেগুলোর সঙ্গে একটা খদ্দরের পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামাও ঢুকিয়ে রাখল ব্যাগে।
.
বৃহস্পতিবার এসে গেছে। রজনী অফিস থেকে বেরিয়ে গড়ের মাঠে একটা ফাঁকা জায়গায় বসে ব্যাগ থেকে বের করে তার সরঞ্জাম। মিনিট পাঁচেক পরে তাকে দেখলে যে কেউ ভাববে যে তার চোখে একটা অপারেশন হয়েছে। তারপর মাঠ থেকে উঠে, চৌরঙ্গি রোড ক্রস করে ফুটপাথ ধরে হাঁটতে থাকে সে। একচোখে হাঁটতে সামান্য অসুবিধে হচ্ছে বটে, তবে ঘড়িতে দেখল এখনও প্রায় কুড়ি মিনিট আছে হাতে। ধীরে সুস্থে হেঁটে সে যখন মার্কুইস স্ট্রিট আর ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের মোড়ে পৌঁছল তখনও হাতে সময় আছে মিনিট তিনেক। এখান থেকে চীনে জুতোর দোকানটা স্পষ্ট দেখা যায়। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে নেয় সে। এখানে সবাই চলতি-ফিরতি মানুষ। পান্ডের দোকানের মতো এখানে সন্দেহজনক তো তেমন কাউকে দেখা যাচ্ছে না। তবু নিজের ছদ্মবেশ নিখুঁত করতে সে মোড়ের মাথার দোকান থেকে একটা মিষ্টি পান আর একটা সিগারেট কিনল। পান চিবোতে চিবোতে সিগারেট ধরিয়ে ফুটপাথের একধারে দাঁড়াল। তবে তার ধোঁওয়া ছাড়া দেখলেই যেকোনো অভিজ্ঞ চোখ বুঝতেই পারত যে সে এসবে অভ্যস্ত নয়।
আরে ওই তো, ওই তো পুলিন আসছে। তারও কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। এদিক ওদিক একটু তাকিয়ে সে সোজা দোকানে ঢুকে গেল। এখন আর কিছু দেখতে পাচ্ছে না রজনী। দোকানের ভেতরে কি হচ্ছে কে জানে। ভারি চিন্তা হচ্ছে তার পুলিনের জন্যে। সে কি একবার এগিয়ে গিয়ে দেখবে? নাঃ, সেটা ঠিক হবে না। দূর থেকে নজর রাখাই উচিত হবে। এদিকে তার হাতের সিগারেট হাতেই পুড়ছে। হঠাৎ ছ্যাঁকা লাগতেই সিগারেটটা ফেলে দিল সে। আর তারপরেই তাকে স্বস্তি দিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এল পুলিন। তার কাঁধের ব্যাগটা তখন বেশ খানিকটা ফুলে আছে। তাহলে আজ ওর কাছে কি একটার বেশি প্যাকেট আছে? সে যাইহোক, একটু দেখা যাক, পুলিন এখন কোথায় যাচ্ছে। প্রায় বিশ হাতের দূরত্ব রেখে রজনী তাকে অনুসরণ করে চলল। তারপর পুলিন যখন চৌরঙ্গি রোড পার হয়ে হাওড়ার বাস ধরলে, তখন সে নেমে গেল অন্ধকার গড়ের মাঠে। যেন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিচ্ছে এমনভাবে দাঁড়িয়ে একমিনিটে খুলে ফেলল তার টুপি, সানগ্লাস আর চোখের ব্যান্ডেজে মোড়া তুলোর প্যাড। ঢুকিয়ে রাখল তার ব্যাগে। পাঞ্জাবি আর পাজামা রইল তার পরনে। তারপর রাস্তায় উঠে এসে সে একটু এদিক-ওদিক ঘুরল যাতে পুলিনের সাথে এক ট্রেনে যেতে না হয়।
.
শনিবারে সুবিমলকে ফোন করেছিল রজনী। সে আসবে বলেছে। তাই রজনী দাঁড়িয়ে আছে সেদিনের সেই বারটার সামনেই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পার্ক স্ট্রিটের রঙ্গ দেখছে সে।
—‘কী রে, কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছিস।’ একগাল হেসে হাজির হয়েছে সুবিমল।
—‘এই মিনিট দশেক।’
—‘সরি, চ ভেতরে চ।’
দু-জনে একটা টেবিলে গিয়ে বসল। সুবিমল বললে— ‘শোন রজনী, স্যারকে আমি তোর কথা বললাম। তা একটু রিকোয়েস্ট করতে স্যার কাকে যেন ফোন করে তোর নামটা বলল। এই দিন তিনেক আগে। তারপরে আমাকে বলল— তোমার ফ্রেন্ডের ব্যাপারটা আশাকরি হয়ে যাবে। আমিও স্যারকে বললাম যে, তুই আমার কলেজের ফ্রেন্ড। ভদ্র আর অনুগত। তখন স্যার আমাকে বলল যে, মাস তিনেক পরে তুই যেন আমার সাথে দেখা করিস।’
আবেগে রজনী সুবিমলের হাত ধরে বললে—‘থ্যাংকস ব্রাদার। তোর এই অবদানের কথা আমি কখনো ভুলবো না রে। যা করলি আমার জন্যে।’
সুবিমলও বুঝতে পারে যে রজনীর কাছে চাকরিটা কত জরুরি। তাই হঠাৎই এই গুমোট হয়ে যাওয়া পরিবেশটা হালকা করার জন্যে সে বলে—‘দূর,আমি কোন্ হরিদাস রে, যে তোর চাকরির ব্যবস্থা করে দেব। সবে তো পাত্র দেখা শুরু হয়েছে। আগে নেমন্তন্নো খেয়ে আঁচা, তারপরে তো। আরে, আমি তো শুধু আমার ক্ষমতা মতো ঘটকালি করিয়েছি মাত্র। আর সেটা করালাম কেন জানিস?’
—‘কেন?’
—‘আমার ডিয়ার ফ্রেন্ড যাতে দেশসেবার সাথে সাথে তার ঘরে শিগগিরই দিল্লি কা লাড্ডু আনতে পারে, তাই।’ হো হো করে হেসে ওঠে দু-জনেই।
রজনী বলে— ‘তোর কিন্তু একটা ট্রিট পাওনা রইল।’
—‘সে তো নিশ্চয়ই। তবে হাতে প্রথম মাইনে পাবার পরে। আর হ্যাঁ, সেদিন কিন্তু বিয়ার নয়, দুটো পেগ চাই আর সঙ্গে যেন কাবাব থাকে।’
—‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। সেদিন যা খেতে চাইবি খাওয়াব।’
বেয়ারা ততক্ষণে অর্ডার নিতে টেবিলে হাজির।
.
পরের বৃহস্পতিবারও পুলিনের ওপরে নজর রাখার জন্যে রজনী দাঁড়িয়ে থাকে মার্কুইস স্ট্রিট আর ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের মোড়ে, সেই একই জায়গায়, একই ছদ্মবেশে, একই ভাবে মুখে পান আর হাতে সিগারেট নিয়ে। আজও পথচলতি মানুষজন তাকে দেখেও দেখছে না। তার মানে সে সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে যেতে পেরেছে। একটু পরেই পুলিন এল সেই জুতোর দোকানে। কিন্তু আজ সরাসরি ভেতরে না ঢুকে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক দেখল খানিকক্ষণ। তারপর সে ঢুকে গেল দোকানে। আবার খানিকক্ষণ পরে বেরিয়েও এল ব্যাগে প্যাকেট নিয়ে। কিন্তু এবারেই ঘটল বিপত্তি। চৌরঙ্গির দিকে না গিয়ে পুলিন আসতে লাগল রজনীরই দিকে। রজনী উলটোদিকে মুখ ঘুরিয়ে সিগারেটে টান দিতে দিতে দোকানপাট দেখতে লাগল— যেন সে একজন উদ্দ্যেশ্যহীন মানুষ, একটু রিল্যাক্স করছে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে।
হঠাৎই— ‘স্যার, আপনি? এখানে কী করছেন?’ রজনী বুঝতেই পেরেছিল যে এরকম একটা কিছু ঘটবে। তাই সে বাধ্য হয়েই ঘুরে দাঁড়ায় পুলিনের দিকে।
—‘না, মানে কিছু না। এই একটু রিল্যাক্স করছিলাম আর কী।’
—‘ও তাই? তা আপনি পান, সিগারেট খাচ্ছেন?’
—‘এই ইচ্ছে হল, তাই। শহরের হাওয়াও বলতে পারিস।’ অপ্রস্তত রজনী একটা ব্যাখ্যা দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু পুলিন কি তা বিশ্বাস করবে?
—‘তা হঠাৎ আপনার চোখে কী হল? কাল যখন হাটতলার কাছে বাস থেকে নামলেন তখন তো কিছু ছিল না?’
—‘মনে হয় চোখে কিছু একটা ইনফেকশন হয়েছে। তাই ডাক্তার বলল…।’ হাতের সিগারেটটা ফেলে দেয় রজনী।
—‘তবে স্যার, গত বৃহস্পতিবারও আপনাকে একই ড্রেস পরে বাস থেকে নামতে দেখেছি। কিন্তু আপনি তো পাঞ্জাবি-পাজামা, গান্ধীটুপি পরে অফিসে আসেন না।’ এবারে পুলিনের গলার সুরটা যেন অন্যরকম লাগল।
রজনী বুঝতে পারল যে সেদিন গ্রামের বাস থেকে নামার সময়ে হয় শ্যামাদাসের লোক কিংবা হয়তো পুলিন নিজেই তাকে দেখে থাকতে পারে। তাই সে চুপ করে থাকে। সে ধরা পড়ে গেছে পুলিনের কাছে।
—‘না, মানে, মাঝেমাঝে একটু অন্যরকম জামাকাপড়ও তো পরতে ইচ্ছে করে, তাই না?’
—‘ও আচ্ছা। তা স্যার একটা কথা বলব?’
—‘কী? বল।’ রজনী স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করে কিন্তু সেইসঙ্গে অপ্রত্যাশিত কিছু শোনার জন্যেও নিজেকে তৈরি করে ফেলে।
—‘আমি বলি কী স্যার, এখন আমি কিন্তু যথেষ্টই বড়ো হয়ে গিয়েছি। আর আপনিও জানেন যে ক-দিন আগেই আমার আঠারো পূর্ণ হয়েছে। আমি এখন সাবালক। তাই এখন নিজের জ্ঞানবুদ্ধি মতো চলার অধিকার আমার আছে। জানেনই তো কত বিপ্লবী আমারই বয়সে হাতে বোমা তুলে নিয়েছিল; আর আমি তো নিয়েছি সামান্য সাবানের প্যাকেট।’
রজনী বুঝতে পারে যে এই কথাগুলো পুলিনকে কেউ শিখিয়ে দিয়েছে। পুলিন তো এইভাবে কথা বলে না। সে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে পুলিনের মুখের দিকে।
পুলিন বলতে থাকে— ‘তাই বলছিলাম কী স্যার, আপনার কাছ থেকে যা শিখেছি, তা দিয়েই আমি আমার আত্মরক্ষা নিজেই করতে পারব। আপনি আপনার সময় নষ্ট করে এভাবে আর আমাকে পাহারা দেবেন না, প্লিজ।’
রজনী কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই পুলিন— ‘আচ্ছা, আসি স্যার’ বলে চৌরঙ্গির দিকে হাঁটা দিল।
রজনী স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। খুবই আঘাত পেয়েছে সে পুলিনের ব্যবহারে। পুলিন এমনভাবে তাকে কথাগুলো বলবে তা আদৌ আশা করেনি সে। আসলে এই বয়েসটা বড়ো খারাপ। রক্ত গরম থাকে আর তারই জোশে এই ছেলেগুলো আগুপিছু না ভেবেই দুমদাম অনেক কাজ করে ফেলে, অনেক কিছু বলে ফেলে।
তার আজ বড়ো মনে পড়ছে পুলিনের অনেক পুরোনো কথা। ছোট্টো থেকে দেখছে সে এই ছেলেটাকে। বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াত, ঘুরে বেড়াত নদীর চরে। একবারের একটা ঘটনা তো তার এখনও স্পষ্ট মনে পড়ছে। সেটা ছিল শীতকাল। গ্রামের অন্য ছেলেদের সাথে মিলে পুলিনও খেলছিল দামোদরের ছিপছিপে জলে। গামছা কাঁধে রজনীও পাড়ে বসে দেখছিল তাদের খেলা। হঠাৎই একটা চিৎকার শুনে সে দেখে দলছুট পুলিন চেঁচাচ্ছে। নদীর চরে গজিয়ে ওঠা হোগলা ঝোপের পাশের বালিতে ডুবে গেছে পুলিনের কোমর পর্যন্ত। রজনী চকিতে বুঝতে পারে যে পুলিন চোরাবালিতে পড়েছে। রজনী জানে দু-পাশের এক মাইলের মধ্যে কোথায় কোথায় চোরাবালি আছে। কিন্তু এই বাচ্চাগুলো তো সেটা জানে না। তাই দলছুট পুলিন গিয়ে পড়েছে সেই চোরাবালির মধ্যেই। হাঁচোড় পাঁচোড় করে যতোই উঠতে চেষ্টা করছে সে, ততোই সে ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে বালিতে। ওই চোরাবালি থেকে কীভাবে বেরোতে হয় তা জানে না পুলিন। কিন্তু রজনী জানে। তাই সে দৌড়ে যায়। পুলিনের থেকে হাত পাঁচেক দূরে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে বালিতে তার গামছাটার একপ্রান্ত ছুঁড়ে দেয় পুলিনের দিকে। পুলিন ততক্ষণে ভয়ে কাঁদতে শুরু করে দিয়েছে। তার বুকের পাঁজর পর্যন্ত ডুবে গেছে বালিতে। রজনী চেঁচিয়ে বলে— ‘ছটফট করিস না পুলিন। ভয় নেই। গামছাটা দু-হাতে চেপে ধর।’ বাকি ছেলেরা ততক্ষণে হাজির হয়ে গেছে সেখানে। পুলিন গামছাটা ধরতেই রজনী অন্য বাচ্চাদের বলে তার দুটো পা ধরে টানতে। বাচ্চারা সবাই মিলে রজনীর দু-পা ধরে পেছনের দিকে টানতে থাকে। সেই টানে বালির ওপর দিয়ে রজনীর শরীর পেছোতে থাকে আর ধীরে ধীরে চোরাবালি থেকে উঠে আসতে থাকে পুলিনের শরীর। একসময় সে নিষ্কৃতি পায় চোরাবালি থেকে। ভাগ্যিস, সেদিন রজনী বসে ছিল পাড়ে। নইলে…।
আরও মনে পড়ছে যে গতবছরে পুলিনের জন্মদিনে পুলিনের নাম খোদাই করা মেহগনি কাঠের একটা বুমেরাং উপহার দিয়েছিল সে। ছুতোর বাড়িতে বিশেষভাবে তদারকি করে নিজের অন্যতম প্রিয় ছাত্রের জন্যে বানিয়েছিল সেটা। তাতে খুব খুশি হয়েছিল পুলিন; আর পুলিনের খুশিতে খুশি হয়েছিল রজনীও। অথচ আজ সেই ছেলেটাই…।
হয়তো এটাই পৃথিবীর নিয়ম। তবে পুলিন আজ তাকে অবজ্ঞা করলেও সে চিরকাল তাকে ভালোবাসবে নিজের সন্তানেরই মতো। তাই কষ্ট হলেও সে নিজেই নিজেকে বলে— ‘ওহে রজনী! স্নেহ অতি বিষম বস্তু।’
