২৯ অগাস্ট

২৯ অগাস্ট

বেলেঘাটার বাড়িতে রাত আটটা নাগাদ ধবধবে সাদা ফরাসে বাপুজি বসে আছেন তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায়। দুটো হাঁটু মুড়ে ভাঁজ করে একহাতের ওপরে শরীরের উর্দ্ধাংশের ভর রেখে। তাঁর বাঁ-দিকে কিছুটা দূরে বসে সুরাওর্দী। গান্ধীজি যেন বেশ চিন্তামগ্ন। মহামিছিলের পরেও তিনি হয়তো বা কিছুটা শঙ্কিতও। তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে— কলকাতা আপাতত শান্ত। দুই সম্প্রদায়ের মানুষই তাদের অস্ত্র সমর্পণ করেছে, শুধু একজন বাদে। সে গোপাল মুখোপাধ্যায়। এর আগে যুগল ঘোষকে তিনি পাঠিয়েছিলেন গোপালের কাছে। কিন্তু গোপাল তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। লোকটার সাহস আছে বলতে হবে, কারণ তাঁর বার্তাকে সে গুরুত্ব দেয়নি। তাই এবারে কংগ্রেসের আরও নেতাদের সাথে তাঁর সেক্রেটারি কল্যাণমকে পাঠিয়েছেন গোপালের কাছে। দেখা যাক, এবারে সে কী করে? এ ছাড়াও বিহার আর উত্তরপ্রদেশে শুরু হয়েছে বিক্ষিপ্ত দাঙ্গা। সেটাও তাঁর একটা দুশ্চিন্তার কারণ। এইভাবে দেশটা জ্বলতে থাকলে…।

এমন সময় কল্যাণম ঘরে ঢোকে। গান্ধীজির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই উনি প্রশ্ন করেন— ‘তা কল্যাণম, গোপাল কি অস্ত্র সমর্পণ করবে? কী বলল সে?’

—‘বাপুজি, আমি তাকে অনেক অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু…’ কথাটা বলতে ইতস্তত করে কল্যাণম।

—‘বল, কী বলল সে?’

—‘কংগ্রেসের নেতারা তাকে বোঝাবার চেষ্টা করেন। এমনকী আমিও তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিলাম যে সে কেন অস্ত্র সমর্পণ করছে না।’ একটু থামেন কল্যাণম। গোপালের উত্তর শুনতে গান্ধীজির মতো উদগ্রীব সুরাওর্দীও।

কল্যাণম আবার বলতে শুরু করেন— ‘সে বলল যে— আমার অস্ত্র দিয়ে আমি আমার এলাকার মহিলাদের, এলাকার সাধারণ মানুষদের রক্ষা করেছি। তাই সেই অস্ত্র আমি সমর্পণ করব না। তারপর আমাকে বলে— ‘শুনে রাখুন কল্যাণমজি; আমি যদি সামান্য একটা পেরেক দিয়েও দাঙ্গাবাজদের কাউকে খুন করে থাকি, তবে সেই পেরেকটাও আমি সমর্পণ করব না।’

গোপালের জবাব শুনে বিমূঢ় বাপুজি। কী করবেন এই লোকটাকে নিয়ে? তাই সেক্রেটারিকে আসতে বলে তিনি আবার চিন্তায় ডুবে যান।

কিন্তু একটু পরেই কল্যাণম আবার ফিরে এসে বলে—‘বাপুজি, কমিশনার অাপনার সঙ্গে দেখা করতে চান।’

—‘ঠিক আছে। আসতে দাও।’

পুলিশ কমিশনার ঘরে ঢুকে স্যালুট করেন। গান্ধীজি মুখ তুলে তাকান। কোনো গুরুত্বপূর্ণ খবর না থাকলে তো কমিশনার আসেন না।

কমিশনার বলতে থাকেন— ‘নোয়াখালিতে হিন্দুরা নাকি অস্ত্র মজুত করছে বলে খবর আছে বাপুজি। তবে হয়তো এটা গুজব। কিন্তু তারই জেরে ফেনী নদীতে যখন একদল হিন্দু জেলে মাছ ধরছিল তখন তাদের ওপরে একদল সশস্ত্র লোক হামলা চালায়। সেই জেলেদের একজন মারা যায় আর দু-জন গুরুতর জখম। এরপরে চারুরিয়ায় আরও একদল হিন্দু জেলে আক্রান্ত হয়। শুধু তাইই নয়, ওখানে অনেক হিন্দুদের বাড়িও আক্রান্ত হয়েছে।’

কমিশনার থামতে গান্ধীজি বললেন— ‘আর কিছু?’

—‘না বাপু। আপনি এখানে আছেন, তাই নিজেই এলাম আপনাকে সব জানাতে।’

গান্ধীজি চুপ করে শুনলেন। তিনি আগেই জানতেন যে, কলকাতায় তাঁর এই মহামিছিলের জয় ক্ষণস্থায়ী। আর এখন বুঝলেন যে, দাঙ্গার বীজ ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। তাই এখন তাঁকে ছুটে বেড়াতে হবে। তবে সবার আগে যেতে হবে নোয়াখালি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *