১৮৮৪, অক্টোবর – বর্ধমানের নদীচরের আলেয়া ভূত আর নিশিকান্ত
বর্ধমানের রাজবাড়িতে ঢোকার কিছুদিন পরে নিশিকান্ত বুঝতে পারল যে তখনকার লেঠেল সর্দার রঘুনাথ চৌবে তাকে ঠিক মেনে নিতে পারছে না। তবে নিশিকান্তর লাঠির ওপরে দখল আর তার নতুন অস্ত্রের ঝাঁঝ দেখে তাকে নিজের জায়গাটা মানে মানে ছেড়ে দিয়েছিল সে; যদিও তার এতদিনের আধিপত্য হারানোর জন্যে মনে মনে একটা হিংসা পোষণ করত। কিন্তু নিশিকান্ত যে স্বয়ং মহারাজা, এমনকী মহারানিরও পেয়ারের লোক। তাই মনের হিংসা মনেই চেপে রাখত চৌবে।
রোজ সকালে আর বিকেলে লেঠেলদের মহড়া চলে। তবে কোথাও কাজ পড়ে গেলে অন্যকথা। এদিকে মহারাজের অনুমতি নিয়ে গোমস্তা আদ্যাপ্রসাদের সাহায্যে বাইশটা বুমেরাং বানিয়েছে সে। কিছু বাছাই করা লেঠেলদের সেগুলো চালানো শেখায়। সেইসঙ্গে চলে সড়কি, বল্লম, তরোয়াল আর ছোরা নিয়ে নকল যুদ্ধ। এই তো ক-দিন আগেই, তার এখানে আসার ছ-মাস পরে দুর্গাপুজোর দশমীর পরের দিন কলকাতা থেকে আসা সায়েবসুবো আর আরও অনেক গণ্যমাণ্য অতিথিদের সামনে তার দলবলের মহড়া দেখাতে হয়েছিল। মহারাজ আফতাব চাঁদও তাদের মহড়া দেখে খুশি হয়ে তাকে একটা সোনার আংটি বখশিশ দিয়েছিলেন। চিকের আড়াল থেকে রানিমা আর রাজবাড়ির মহিলারাও তাদের খেলা দেখেছিলেন। ক-দিন পরে রানিমা আদ্যাপ্রসাদকে দিয়ে তার হাতে তুলে দিয়েছিলেন অষ্টধাতুর তৈরি একটা শিবমূর্তি। সেইসঙ্গে রানিমা এটাও বলে দিয়েছিলেন যে তার যেকোনো দরকারে সে যেন দ্বিধা না করে তা আদ্যাপ্রসাদের মাধ্যমে সরাসরি তাঁকে জানায়। মহারাজা আর মহারানির এই দাক্ষিণ্যে খুবই খুশি হয়েছিল নিশিকান্ত।
কিন্তু তার কিছুদিন পর থেকেই মহারাজের শরীরটা খারাপ হতে থাকে। রক্তে শর্করা বৃদ্ধির কারণে মহারাজ ধীরে ধীরে কমজোরী হতে থাকেন। কলকাতা থেকে সায়েব ডাক্তার আসেন, দেখে যান, ওষুধও দিয়ে যান। মহারাজ তাইই সেবন করেন নিয়মমাফিক। কিন্তু তবুও তাঁর শরীর পড়তে থাকে।
এদিকে মহারাজ নিঃসন্তান। রাজবাড়ির আনাচে-কানাচে ঘোরাফেরা করে একটা কথা যে— মহারাজ আফতাবের মৃত্যু হলে তাঁর উত্তরাধীকারী কে হবে? তবে এসবে নিশিকান্তর কিছু যায় আসে না। সে একটা কথা সাফ বোঝে যে— যতদিন শরীর দেবে, ততদিন তাকে কাজ করে যেতে হবে। মহারাজ গত হলে তাঁর উত্তরাধীকারী যদি তাকে বহাল না রাখে তবে সে আবার ফিরে যাবে জমিদার রণবিজয়ের কাছে, তাদের গ্রামে। সত্যি বলতে কী এখানে সম্মান পেলেও রাজবাড়ির ঠাটবাট, হালচাল তার ভালো লাগে না। তার সঙ্গে সে যেন মানিয়ে নিতে পারে না নিজেকে। আর রঘুনাথ চৌবে যে নানান ফিকিরে তাকে বিব্রত করার চেষ্টা করে তাতেও সে তিতিবিরক্ত।
নিশিকান্ত আরও বুঝেছে যে— ঠগিরা মানুষ মারত অভাবের তাড়নায়, নিজেদের অন্নসংস্থান করতে। যাদেরকে তারা মারত, তাদের কোনোভাবেই ঠগিদের শত্রু বলা যায় না। কিন্তু বর্ধমানে এসে এই ছ-মাসেই সে দেখেছে প্রভূত সম্পদ থাকলেও আরও সম্পদের লালসা মানুষের শত্রু তৈরি করে। এই যে মহারাজের লেঠেল দল, তাদেরও তো মহারাজ পুষছেন তাঁর নিজের শত্রুদের থেকে বাঁচতে, সম্পত্তির অধিকার কায়েম রাখতে আর নিজের সম্পদ, বৈভব আর ক্ষমতা আরও বাড়াতে।
তাই এসব মানসিক চাপ থেকে নিজেকে হালকা করতে প্রায় রোজই জমিদার রণবিজয়ের কাছ থেকে নেওয়া কালো ঘোড়াটায় চেপে চলে যায় রাজবাড়ি থেকে মাইল দুয়েক দূর দিয়ে বয়ে চলা দামোদরের পাড়ে। সঙ্গে নেয় সে একটা সড়কি আর তার বুমেরাং।
সেদিনটা ছিল কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আগের দিন। আকাশে জ্বলজ্বল করছে শুক্লাচতুর্দশীর চাঁদ। দামোদরের পাড়ে বালির ওপরে বসেছিল নিশিকান্ত। পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে তার ঘোড়াটা। হালকা হালকা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে আসছে নদীর দিক থেকে। ভারি আরাম লাগছে। তাই বালিতে চিত হয়ে শুয়ে পড়ে সে। মাথার ওপরে খোলা আকাশ যদিও চাঁদের আলোয় বেশ উজ্জ্বল, তবুও একটু ঠাহর করলেই বোঝা যায় মাথার ওপরে ‘কালপুরুষ’ নক্ষত্রমণ্ডলী জ্বলজ্বল করছে। তার কোমরে কোমরবন্ধ আর সেটা থেকে ঝুলছে তার তরোয়াল। এই কালপুরুষকে ভালোভাবেই চেনে নিশিকান্ত। সে জানে যে ওই তরোয়ালের মুখ সর্বদা দক্ষিণদিক নির্দেশ করে। আর কালপুরুষের পা থেকে খানিকটা দূরে ওই যে তারাটা তার নাম ‘লুব্ধক’। কালপুরুষকে যদি এক শিকারি হিসেবে ধরা যায়, তবে লুব্ধককে তার কুকুর হিসেবে ভাবতে দোষ কোথায়? ওই কালপুরুষের সঙ্গে নিজেকে বেশ খানিকটা যেন মেলাতে পারে নিশিকান্ত। শিকারির সব গুণগুলো যে তার চরিত্রের মধ্যে সঞ্চারিত করে দিয়েছে রতন কত্তা, তার বাবা নীলকান্ত আর তার গ্রামের লোকজন। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার পুরোনো গাঁয়ের কথা মনে পড়তেই। আনমনে হাতের আঙুল দিয়ে নিজের চুলে বিলি কাটে সে।
হঠাৎই তার নজরে পড়ে দামোদরের এইপাড়ে বেশ খানিক দূরে দপ্ করে জ্বলে উঠছে একটা আলো। একটু জ্বলেই নিভে যাচ্ছে। আবার খানিকটা পরেই দপ্ করে জ্বলে উঠছে। খানিকটা জ্বলেই নিভে যাচ্ছে আবার।
সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। ঠাহর করে দেখে সে বুঝতে পারে যে আলোটা এখনও দূরে থাকলেও ক্রমশ এগিয়ে আসছে তারই দিকে। একেই কি বলে ‘আলেয়া-ভূত?’
অন্য কেউ হলে এতক্ষণে পড়ি কি মরি করে ছুটে পালাত। কিন্তু নিশিকান্ত যে অন্য ধাতুতে গড়া। সে বুমেরাংটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। অপেক্ষা করতে থাকে আলোটা তার আরও কাছে এগিয়ে আসার জন্যে। একটু পরে আলোটা জ্বলা-নেভা করতে করতে আরও কাছে এগিয়ে আসতে সেও এগিয়ে যায় আলোটার দিকে। একসময় হঠাৎ আলোটা দপ্ করে জ্বলে উঠতেই সে বুঝতে পারে যে ওটা কোনো ভূত-টুত নয়, লালপাড় সাদা শাড়ি পরা একজন সাধারণ সধবা মহিলা। নদীর জনমানবহীন চর ধরে দ্রুত পায়ে হেঁটে আসছে। সেদিকে দৌড়ে যায় নিশিকান্ত। হাঁক পাড়ে— ‘এ্যাই, কে তুমি?’ তার হাঁক শুনে মহিলা দৌড়ে পালাতে যায়। কিন্তু নিশিকান্ত ততক্ষণে দু-হাত ছড়িয়ে তার পথ আগলে দাঁড়িয়েছে। সে স্পষ্ট বুঝতে পারে এ কোনো ভদ্রঘরের মহিলা। কিন্তু এতরাতে এইভাবে সে কোথায় যাচ্ছে? মহিলাও খুব ভয় পেয়ে গেছে। তাকে ডাকাত-টাকাত ঠাউরেছে বোধ হয়।
নিশিকান্ত তাকে আশ্বস্ত করে বলে— ‘ভয় নেই তোমার। আমি মহারাজ আফতাব চাঁদের পেধান লেটেল নিশিকান্ত রায়। আমি থাকতে তোমার কোনো খেতি হবেনি। একন বল তো, কে তুমি আর কোতায়ই বা যাচ্চ?’
মহিলার বোধ হয় নিশিকান্তর কথায় একটু ভয় কমেছে। সে দাঁড়িয়ে গেছে; কিন্তু মানুষটাকে দেখতে না পেলে তার ভয় পুরোপুরি কাটছে না। তাই সে তার কোঁচড় থেকে একমুঠো গুঁড়ো কিছু নিয়ে ফেলে দিল তার মাথায় গামছা দিয়ে তৈরি বিড়ের ওপরে বসানো সরার আগুনে। দপ্ করে জ্বলে উঠল এক ঝলক আগুনের শিখা। হাওয়ায় ভেসে আসা গন্ধ নাকে লাগতেই নিশিকান্ত বুঝতে পারল যে ওই গুঁড়োটা হোলো ধুনো আর গন্ধকের মিশেল। সেই আলোতে তাকে দেখে মহিলা মনে হয় কিছুটা আশ্বস্ত হল। নিশিকান্ত তাকে আবার জিজ্ঞেস করল— ‘কী হল? নাম কী তোমার? বল।’
—‘হরিমতী দাসী।’
—‘ভদ্দরঘরের ইস্তিরি বলেই তো মনে হচ্চে। তা তোমার শোউরবাড়ি কোতায়?’
মহিলা পেছনদিকে হাত দেখিয়ে বললে— ‘একান থেকে দু-কোশ দূরে কেশবপুর গেরামে।’ তারপর হঠাৎ বসে পড়ে নিশিকান্তর পা ধরে বললে— ‘আমাকে সেকানে ফিরিয়ে দিওনি গো। সেকানে ফিরে গেলে ওরা আরও অত্যেচার করবে। টিকতোতে দেবেনে।’
—‘সে কী? কেন? অত্যেচার করে কেন?’
—‘আমার বাপ পণের ট্যাকা একোনো দে উটতি পারেনি। তাই মাতাল সোয়ামী রোজ রেতের বেলা ঘরে ফিরে মারে। শউরঠাউর আর দ্যাওররাও গায়ে হাত তোলে। একবচ্চর অনেক সয়েচি। আর পারিনি। সারা গায়ে কালশিটে ফেলে দেচে।’
নিশিকান্ত বলে— ‘ঠিক আচে, ঠিক আচে। এবার পা-টা ছাড়ো দিকিনি।’ হরিমতী এবার উঠে দাঁড়ায়।
—‘ও, তাই তুমি বুজি পাইলে বাপের ঘরে যাচ্চিলে?’
—‘হ্যাঁ।’
—‘তা সেকানে গে তুমি রেহাই পাবে ভেবেচো? তোমার শোউরবাড়ির লোক সেকানে গে ঠিক তোমায় ধরে নে আসবে।’ মহিলা চুপ করে থাকে। তা দেখে একটু পরে নিশিকান্ত বললে— ‘আমায় যদি তোমার বিশ্বেস হয়, তাইলে রাজবাড়িতে তোমায় একটা কাজ জোগাড় করে দিতি পারি। সেকানে কত্তো মানুষ থাকে; একজন বেশি হলে তাদের কিচ্চু যাবে আসবেনি।’
মহিলা একটু দোটানায় ভুগছে। সামনে দাঁড়ানো মানুষটাকে বিশ্বাস করা যায় কি না। তারপর ভেবে দেখলে— তার তো প্রাণ আর ইজ্জত ছাড়া হারাবার আর কিছুই নেই। যদি তার ইজ্জত নেবারই থাকত, তাহলে এই নির্জন জায়গায় এই মানুষটা তা অনায়াসেই করতে পারত। কিন্তু তা করার বিন্দুমাত্র চেষ্টাও সে করেনি। তাহলে এই মানুষটাকে একবার বিশ্বাস করে দেখতে ক্ষতি কি। তাই সে নিশিকান্তকে বললে—‘আপনি যা বলচেন তাইই হবে। মান-ইজ্জতের সঙ্গে দু-বেলা দুটি ভাত আর পরণের কাপড় পেলে আর কিচ্চু লাগবে না আমার।’
নিশিকান্ত বললে— ‘রানিমা আমাকে স্নেহ করেন। তাঁকে গে বললে একটা ব্যবস্তা নিশ্চই হয়ে যাবে।’ মহিলা সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল।
—‘তাইলে চল। আমার ঘোড়া ওই যে দাঁইড়ে আচে। আর তোমার ওইসব বিদঘুটে জিনিসপত্তরগুলো ফেল দিকি।’ মহিলা তার কোঁচড় থেকে ধুনো আর গন্ধকের গুঁড়ো ফেলে দিল। মাথা থেকে খুলে ফেলল গামছার বিড়েটা। বেঁধে নিলো কোমরে। তারপর এগিয়ে চলল নিশিকান্তর পিছুপিছু।
ঘোড়ার কাছে গিয়ে নিশিকান্ত হরিমতীর কোমর দু-হাতে ধরে তাকে আড়াআড়ি বসিয়ে দিয়ে নিজেও উঠে বসল ঘোড়ার পিঠে। ঘোড়ার পেটের কাছে গোড়ালি ঠুকতেই সেটা টগবগিয়ে উঠল। হরিমতী আগে কখনো ঘোড়ায় চড়েনি। তাই ঘোড়া ছুটতেই সে ভয়ে দু-হাতে আঁকড়ে ধরল নিশিকান্তকে। নিশিকান্ত বুঝতে পারল তার ভুল হয়ে গেছে। তাই সে ঘোড়াকে ধীরে ধীরে হাঁটিয়ে নিয়ে চলল। হরিমতীর ভয় তবু যায় না। সে আঁকড়ে ধরেই থাকে নিশিকান্তকে। সে যে পরপুরুষ, ভয়ে তা খেয়ালই থাকে না তার। তবুও তার মাতাল সোয়ামীর হাতের, শোউরবাড়ির লোকেদের হাতে মার খাওয়ার ভয়ের চেয়ে অচেনা এক পুরুষের সাথে এই ঘোড়ায় চড়ার ভয়টা কম। লোকটা শক্তহাতে যেভাবে লাগাম ধরে আছে তাতে মনে হয় যেন তার ওপরে নির্ভর করা যায়। আর কি জানি কেন এই মানুষটাকে ভালোও লাগছে। ঘোড়া থেকে পড়ে যাবার ভয়ে নিশিকান্তর দরাজ বুকে রাখা তার মাথা। কখনো তো সে এইভাবে তার স্বামীর বুকে মাথাও রাখতে পারেনি। জ্যোৎস্নামাখা নদীর হাওয়ায় উড়ছে তার চুল। সেই চুল কখনো কখনো গিয়ে পড়ছে নিশিকান্তর মুখে।
হঠাৎই তার মনে পড়ে যায় এসব কি যা তা ভাবছে সে। সে তো সধবা আর এই মানুষটার ঘরে তো তার বউও থাকতে পারে। কোনো এয়োস্ত্রীকে তার নিজের মনে এইরকম ভাবনার প্রশ্রয় দিতে নেই। তা ছাড়া এই মাত্র কয়েক দণ্ড আগেই তাদের দেখা হয়েছে। তারা কেউ কাউকেই জানে না, ভালো করে চেনে না। অথচ এখনই…। না। এটা ঠিক নয়। নিজেই নিজেকে ধমক দেয় হরিমতী। আর তাই নিশিকান্তকে ছেড়ে সোজা হয়ে বসতে যায়। কিন্তু আবার টাল সামলাতে না পেরে আঁকড়ে ধরে নিশিকান্তকেই।
আর নিশিকান্ত? আজ পর্যন্ত কোনো মহিলার সান্নিধ্যে আসেনি সে। অস্বস্তি হওয়ারই কথা। কিন্তু আজ তার একী হয়েছে? একজন অচেনা, অজানা বিবাহিতা মহিলা এই চাঁদনী রাতে তাকে চেপে ধরে জড়িয়ে আছে বুকের সঙ্গে। তার এলোচুলের নারকোল তেলের সুবাস, তার গরম নিঃশ্বাস, বুকের সঙ্গে ঠেকে থাকা তার গাল, আজ কেমন যেন একটা নতুন রকম ভালোলাগার অনুভূতি দিচ্ছে তাকে। তাই বুঝি আজ বড়ো গান পাচ্ছে নিশিকান্তর। কিন্তু রতন কত্তার কাছে শেখা গান ছাড়া আর কোনো গান তো সে জানে না। হাঁতড়ে বেড়ায় সে। অবশেষে গেয়ে ওঠে— ‘…সে যে মুক্তকেশী শক্ত বেড়া, তার কাছেতে যম ঘেঁষে না। মনরে কৃষিকাজ জানো না…।’
কিন্তু একটু পরেই সম্বিৎ ফিরে পায়। গান যায় থেমে। আচ্ছা, এই মহিলা তো কারোর বাড়ির বউ। এযাবৎ সব মহিলাদেরই সম্মান দিয়ে এসেছে সে। কারোর সম্বন্ধে কোনো কুচিন্তাকে প্রশ্রয় দেয়নি। কিন্তু আজ সে হরিমতী সম্বন্ধে এ কীসব ভাবছে। ছিঃ, ছিঃ, ছিঃ। নিজেকে ধিক্কার দেয় সে। সে ঠিকই করে যে রাজবাড়িতে হরিমতীর একটা ব্যবস্থা করে দিয়ে সে নিজের জগতেই আবার ফিরে যাবে।
রাজবাড়িতে পৌঁছে নিশিকান্ত হরিমতীকে একটু অপেক্ষা করতে বলে সোজা গিয়ে কাছারিবাড়িতে দেখা করে আদ্যাপ্রসাদের সঙ্গে। আদ্যাপ্রসাদ তখন হিসেবের খাতাপত্র গুছিয়ে তৈরি হচ্ছিলেন বাড়ি যাবেন বলে। কিন্তু নিশিকান্ত গিয়ে তাঁকে প্রণাম জানাতেই তিনি থমকে গেলেন।
—‘কী ব্যাপার নিশিকান্ত, এত রাতে? কোনো জরুরি খবর কি?’
—‘আজ্ঞে, একটা বিশেষ কতা কইবার ছিল। যদি একটু সময় দেন তো একান্তে কই।’
আদ্যাপ্রসাদ জানেন যে নিশিকান্তকে রানিমা স্নেহ করেন। তা ছাড়া বিশেষ কোনো প্রয়োজন না থাকলে সে তো এই সময়ে আসার লোক নয়। তাই সহকারী ছেলেদুটিকে আসতে বলে উনি আবার ফরাসে বসে পড়ে বললেন— ‘বল, কী বলবে।’
নিশিকান্ত সংক্ষেপে তাঁকে সব কথা বলে। সব শুনে প্রাজ্ঞ আদ্যাপ্রসাদ বললেন—‘ঠিক আছে। আজ সে দাসীমহলেই থাকুক। আমি খাসদাসীকে ডেকে পাঠাচ্ছি। আর আমি কাল সকালে রানিমাকে সব জানাব। দেখি, উনি কী বলেন। তুমি বরং কাল দুপুরের একটু আগে আমার সঙ্গে দেখা করে সব জেনে যেও।’
—‘যে আজ্ঞে।’ বলে নিশিকান্ত কাছারিবাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। দেখা হয় হরিমতীর সঙ্গে। তাকে বলে— ‘একটু অপেক্ষা কর। নোক আসচে। ততক্ষণ না হয় আমি আচি সঙ্গে।’
খানিক পরেই একজন দাসী এসে হরিমতীকে সঙ্গে নিয়ে দাসীমহলের দিকে এগিয়ে চলে। দাসীমহলে ঢোকার ঠিক আগেই হরিমতী একবার পেছন ফিরে দেখলে। নিশিকান্ত তখনও সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। রাজবাড়ির সহবত এতদিনে বেশ শিখে গেছে নিশিকান্ত। কখন কি করতে হয়, আজ আর অজানা নয় তার। তাই পরেরদিন মহড়ার শেষে নিশিকান্ত দেখা করলে আদ্যাপ্রসাদের সঙ্গে। আদ্যাপ্রসাদ জানালেন যে দাসীমহলে ঠাঁই হয়েছে হরিমতীর। নিশিকান্ত নিশ্চিন্ত হল।
ক্রমে দিন কেটে যায়। কিন্তু নিশিকান্ত আর হরিমতী চেষ্টা করলে কী হবে, দামোদরের চরের সেই রাতের স্মৃতি থেকে যায় দুজনের বুকেই। তাই বুঝি রোজ সন্ধেবেলা দাসীমহলে হরিমতীর খবর নিয়ে যায় নিশিকান্ত আর সকালে বিকেলে কাজের মাঝে সুযোগ পেলেই চিকের ফাঁক দিয়ে দূরের মাঠে নিশিকান্তদের মহড়া দেখে হরিমতী। দামোদরের সেই শুক্লাচতুর্দশীর রাতের সুখস্মৃতি ক্রমে ক্রমে শিকড় ছড়াতে থাকে তাদের অন্তরমহলে। এদিকে দাসীমহলে গুঞ্জন শোনা যায় যে দীপাবলী উপলক্ষ্যে নিশিকান্ত কোনো এক দাসীর মাধ্যমে হরিমতীর জন্যে একখানা শাড়ি পাঠিয়েছে। আর সেই কথাটা একসময়ে পৌঁছেও যায় রানিমার কানে।
দীপাবলীর পরে একদিন রানিমা আদ্যাপ্রসাদের মাধ্যমে ডেকে পাঠান নিশিকান্তকে। ভয়ে ভয়ে নিশিকান্ত একজন দাসীর সাথে যায় অন্দরমহলের দ্বারে। দাসী সেখান থেকেই ফিরে যায়।
নিশিকান্ত এর আগে কখনো রাজবাড়ির অন্দরমহলে আসেনি। সে দেখতে থাকে দূরের দরাজ বারান্দায় হাতির দাঁতের তৈরি সাদা টেবিল আর চেয়ার রাখা। টেবিলের ওপরে রাখা পানের বাটা, শ্বেতপাথরের গেলাস, জর্দার কৌটো আর একটা পিকদানী। চেয়ারে সাদা খোল আর সোনালি জরীপাড়ের শাড়ি পরে বসে জাফরী চুঁইয়ে আসা সদ্য হেমন্তের সোনালি রোদ মেখে রানিমা তালপাতায় লেখা একখানা পুঁথি পড়ছেন সুরেলা গলায়—
সপনে দেখিলোঁ মো কাহ্ন চিত্তে না পড়এ আন
তাক পাঅবোঁ কমণ পরকারে।
আইল চৈত মাস কি মোর বসতী আশ
নিফল যৌবন ভারে॥
কী সুন্দর রানিমার গলা। তবু নিশিকান্তর ভয় কাটছে না। কি জানি, হরিমতীকে শাড়ি পাঠিয়েছে বলেই কি রেগে গেছেন রানিমা? তাইই হবে বোধ হয়। ভয়ে চুপ করে অন্দরমহলের দ্বারেই দাঁড়িয়ে থাকে সে। এই প্রথম বোধ হয় সে বুঝতে পারছে ভয় বস্তুটা কী। কই, আগে তো তার বুক এমন দুরুদুরু করেনি? তাহলে এখন কেন করছে?
আসলে সে জানে না যে ভালোবাসার গোপন অনুভূতি মানুষকে ভেতরে ভেতরে ভীতু করে দেয়।
…সাগরসঙ্গম গিআঁ গাএর মাঁস কাটিআঁ
আপণা মগর ভোজ দিআঁ।
এ জন্মে বা না কয়িলোঁ ভাগ হারায়িলোঁ কাহ্নের লাগ
আর তার না পায়িবোঁ লাগ॥
রানিমা যে ভাষায় পুঁথিটা পড়ছেন তার ভাষা নিশিকান্তর অজানা। তবে বাংলা ভাষার সঙ্গে কোথায় যেন একটা মিল খুঁজে পাচ্ছে সে। দুর্বোধ্য, তবু যেন কোথায় একটা স্বর্গীয় সুর লুকিয়ে আছে ওই লেখায়। রানিমা পড়েই যাচ্ছেন। কোনোদিকে তাঁর হুঁশ নেই।
…তিঅজ পহর নিশী মোঞঁ কাহ্নাঞিঁর কৌলে বসী
নেহানিলোঁ তাহার বদনে।
ঈসত বদন করী মন মোর নিল হরী
বেআকুলী ভয়িলোঁ মদনে॥
চঊঠ পহরে কাহ্ন করিল আধর পান
মোর ভৈল রতিরস আশে।
দারুণ কোকিল নাদে ভাঁগিল আহ্মার নিন্দে
গাইল বড়ু চণ্ডীদাসে॥
পড়া শেষ হলে পুঁথিটা বন্ধ করে রাখলেন রানিমা। তারপরে গেলাস থেকে জল খেয়ে পানের বাটা থেকে একখিলি পান মুখে পুরলেন। রুপোর কৌটো খুলে এক চিমটে জর্দা নিয়ে মুখে দিতে যেতেই তাঁর নজরে পড়ল নিশিকান্তকে। দরজার কাছে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে সে।
—‘এদিকে এসো নিশিকান্ত। কথা আছে।’ জর্দা মুখে দিয়ে বলেন রানিমা।
তাই পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে দণ্ডবৎ হয়ে সে রানিমাকে প্রণাম করে। তারপর চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।
—‘কতক্ষণ এসেছ?’
—‘আজ্ঞে, খানিক আগে। আপনি পুঁথি পড়চিলেন বলে ডাকিনি। শুনচিলাম।’
—‘তা শুনে কী বুঝলে?’
—‘আজ্ঞে মা, আমি মুকখু মানুষ। আমি এর কি বুইবো।’ নিশিকান্তর অকপট স্বীকারোক্তি। ‘তবে ভাষাটা ক্যামন যেন বাংলা বাংলা লাগচিলো।’
—‘ঠিকই ধরেছ। ওটা বাংলাই। আমি বড়ু চণ্ডীদাসের লেখা শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের রাধা-বিরহ অংশটা পড়ছিলাম। তা এখানে শ্রীকৃষ্ণের জন্যে রাধার বিরহের কথা লেখা আছে, বুঝলে?’ মনে হচ্ছে রানিমার মেজাজ এখন ভালোই আছে। হয়তো বকাঝকা করবেন না। তবু বলা তো যায় না। আশা আর শঙ্কা একইসঙ্গে জুড়ে থাকে নিশিকান্তের মনে।
—‘অ, তা আমি কি আর এসব বুজি রানিমা।’
—‘কেন বুঝবে না। এতে তো তোমার জন্যেই শ্রীরাধার বিরহের কথা লেখা আছে।’ নিশিকান্ত রানিমার এই রহস্য বুঝতে পারে না। তাই সে বলে— ‘আমি ঠিক বুজলুম নি, মা।’
ঈষৎ ভারী গলায় রানিমা বলেন— ‘তুমি কি তোমার নামের মানেও জানো না?’
—‘আজ্ঞে, না মা।’
—‘তোমার নামের মানে হল শ্রীকৃষ্ণ। আমি তাই তোমার সাথে একটু রহস্য করছিলাম।’ তার নামের অর্থ শুনে নিশিকান্তও অবাক। এসব কথা বড়োমানুষেরা ছাড়া আর কে জানবে? তবে হ্যাঁ, রতন কত্তা থাকলে বলতে পারত। সেইই তো দিয়েছিল নামটা।
—‘তা হ্যাঁ, যে জন্যে তোমায় ডেকেছিলাম।… শোনো নিশিকান্ত, দাসীমহলে তোমাকে আর হরিমতীকে নিয়ে নানান কথা উড়ছে। আমি চাই এইসব বন্ধ হোক। তাই আমি একটা ব্যবস্থা নিতে চাইছি।’
ভয় ক্রমশ বাড়ছে নিশিকান্তর। কি জানি রানিমা কি ব্যবস্থা নিতে চাইছেন। তাকে অথবা হরিমতীকে, কিংবা হয়তো তাদের দুজনকেই দূর করে দেবেন। তাকে বের করে দিলে সে তার গ্রামে ফিরে গিয়ে চাষ-আবাদ শুরু করবে। কিন্তু হরিমতী? তার তো আর কোথাও যাবার জায়গা নেই। তার কী হবে? তাই কাঁচুমাচু মুখে সে বলে— ‘কী ব্যবস্থা মা?’
—‘তোমায় হরিমতীকে বিয়ে করতে হবে।’
—‘কিন্তু…কিন্তু তার যে সোয়ামী বত্তমান মা। আর সমাজই বা কী কইবে? তা চাড়া একানে আমারও তো বাপ-মা নেই। তারাই বা কি কইবেন এই কতা শুনলে।’
—‘সে দায়িত্ব আমার। এখন বল, তুমি কি রাজি? হরিমতীর সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে। সে মত দিয়েছে, যদিও সে তোমার মতোই সমাজের ভয় করছিল। তবে আমি তাকে বুঝিয়ে বলেছি।’
—‘কিন্তু মা, একানে থাকলে পরে যে নোকে কতা শোনাবে। তা চাড়া তার শোউরবাড়ির নোকজনও আমাদের শান্তিতে থাকতে দেবে নি।’
—‘তার ব্যবস্থাও আমি করে রেখেছি নিশিকান্ত। তবে তোমাদের শুধু এই শহরে থাকা চলবে না। জানোই তো যে তোমাদের মহারাজ শয্যাশায়ী। সেইকারণে আমাকেই সব দেখতে হচ্ছে। তা ক-দিন আগেই আদ্যাপ্রসাদ বলছিল যে আমাদের চাঁপাডাঙা তালুকের লেঠেলদের শক্তিশালী করার দরকার। কারণ মহারাজের অসুস্থতার সুযোগের সদ্ব্যবহার করার লোকের অভাব নেই সেখানে। কাছাকাছি চন্দননগরেও তো ফরাসিদের আড্ডা। তাই আমার ইচ্ছে এক মাসের মধ্যেই তোমরা সেখানে যাও। আমি কাল আদ্যাপ্রসাদকে বলে রেখেছি। সে যেন সেখানে তোমার পছন্দমতো জায়গায় কিছু নিষ্কর জমির ব্যবস্থা করে দেয়। আর বিয়ের দিনে তোমার পরিবারের লোকজনও হাজির থাকবে সেখানে। সে বন্দোবস্তোও আমি করে দেব। তাঁরা রাজি হবেনই। আর সমাজের কথা বলছ? রাধারও তো স্বামী ছিল। তবু তাঁর আর শ্রীকৃষ্ণের সম্পর্ককে আজও শ্রদ্ধার চোখে দেখি আমরা। তাহলে তোমাদেরই বা দোষটা কোথায়?’
রানিমার কাছ থেকে এতটা আশা করেনি নিশিকান্ত। উনি তাঁর সময়ের চেয়ে এতটা এগিয়ে ভাবতে পারেন? সে আর কি বলবে? রানিমা যে মানুষের ভালোবাসার সম্পর্ককে এতটা দামি মনে করেন তা সে জানত না আগে। সে ভাবতে থাকে— ভাগ্য তার জীবনটাকে এ কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? এমনটাতো সে কস্মিনকালেও ভাবেনি।
—‘আমার কথা তো শুনলে। এবারে সেইমতো কাজ হোক। একটা সময়ে জীবনে থিতু হতে হয়।’ রানিমা উঠে দাঁড়ালেন।
—‘তাহলে তুমি এখন এসো নিশিকান্ত।’
এরপরে অঘ্রাণ মাসের এক শুভদিনে চাঁপাডাঙার দামোদরের পাড়ের এক দু-কামরার বাড়িতে তারা সংসার পাতে। আর আজ রজনীকান্ত থাকে সেই বাড়িতেই।
