১৮ই অগস্ট, রবিবার
পরের দিন সকালে জলখাবার খেয়ে খানিকটা ঘুমিয়ে নিল রজনী। দুপুরের খাওয়ার পরে মেসোমশাই বললেন— ‘দাঙ্গা আরও ভয়ানক হবে, বুঝলে রজনী। দেখলে তো কাল রাত থেকেই শিখরাও নেমে পড়েছে মাঠে। কলকাতায় তো ওদের সংখ্যা কম নয়। তা ছাড়া গোপালের সঙ্গে ওদের যোগাযোগ ভালোই আছে।’
রজনী কী আর বলবে। দাঙ্গার ব্যাপকতা তারা সবাই বেশ ভালোই টের পাচ্ছে। বাড়ির সবার মধ্যেই একটা চাপা উত্তেজনা রয়েছে। সবাই কথা বলছে কম, খাওয়া-দাওয়া করছে কম। রান্নাবান্না আর দৈনিক কাজকর্মেও একটা শিথিলতা। একটা অজানা আতঙ্ক যেন ছড়িয়ে আছে সারা বাড়িতে। এই বুঝি সাংঘাতিক একটা কিছু ঘটে যায়। আর এদিকে ভ্যাপসা গরমে রাস্তার লাশগুলো পচতে শুরু করেছে। হাওয়ায় ভেসে সেই লাশপচা গন্ধ পৌঁছে যাচ্ছে বাড়িতেও। কবে যে মুদ্দফরাসরা এসে তুলে নিয়ে যাবে ওই থ্যাঁতলানো লাশের টুকরোগুলো কে জানে।
কানাই একবার ওই দুর্বিসহ গন্ধের কথা তুলতেই কেষ্টদা বলেছিল— ‘দাঙ্গা না থামা পর্যন্ত এই গন্ধ তোমায় সহ্যি কত্তেই হবে। তবে কী জানো, যা সওয়াবে তাই সয়। সন্ধেবেলা দেখবে যে ওই লাশপচা গন্ধ আর তোমার নাকে লাগচে না। আর দাঙ্গা যদি চলতেই থাকে তবে দেখবে যে এই দাঙ্গার ভয়ও তোমার মন থেকে কমে গেছে।’
কেষ্টদার কথা শুনে মাসিমা ফুঁসে উঠলেন— ‘যত্তসব অলুক্ষণে কথা। বলি তুই থামবি?’ কেষ্টদা চুপ মেরে যায়। কিন্তু তার কথাগুলো যে সত্যি তা বোঝে রজনী। দীর্ঘদিন সন্ত্রাসের আবহাওয়ায় থাকতে থাকতে সন্ত্রাসও একসময় গা-সওয়া হয়ে যায়।
সন্ধে হতেই ছাদে উঠে দেখা গেল কেষ্টদার কথা বর্ণে বর্ণে সত্যি। লাশপচা গন্ধ কেমন যেন সয়ে গেছে নাকে আর দাঙ্গার রং হয়েছে আরও লাল।
ইতিমধ্যেই দুটো ট্রাক ‘বন্দে মাতরম’ আওয়াজ তুলে আর একটা শিখবোঝাই ট্রাক ‘বোলে সো নিহাল’ বলতে বলতে ছুটে গেছে তাদের বাড়ির সামনে দিয়ে। হ্যারিসন রোডের দিক থেকেও মাঝে মাঝে ভেসে আসছে ‘আল্লা হু আকবর’ ধ্বনি। ভেসে আসছে বোমা আর গুলির শব্দও।
এরই মাঝে নীচে থেকে মেসোমশাইয়ের হাঁক— ‘রজনী নীচে এসো। ড্যানীবাবুর ফোন।’
তাড়াতাড়ি ছাদ থেকে নেমে রজনী গিয়ে ফোন ধরে। —‘হ্যালো স্যার, আমি রজনী বলছি। ভালো আছেন তো?’
—‘তা আছি, তবে নীচের রাস্তায় গোটা তিনেক লাশ পড়ে আছে।’
—‘আমাদেরও একই অবস্থা স্যার। ষোলো তারিখ থেকে খান ছয়েক পড়ে আছে।’
—‘যাইহোক, শোনো, গোপালের দল ও শিখেরা মিলে এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শহরময়। বিশেষ করে জঙ্গি মুসলমান এলাকাগুলোতে। গোপাল আর যুগল মিলে ঘুরে ঘুরে তদারকি করছে সব। ওদের দলের কাছে ফায়ার-আর্মস আছে অনেক। তাই দিয়েই অ্যাকশন চালাচ্ছে।’
—‘আমরাও হ্যারিসন রোডের দিক থেকে গুলি বোমার শব্দ শুনতে পাচ্ছি।’
—‘শোনো রজনী, কলকাতার এই দাঙ্গার কথাটা ভাইসরয়ের কানে ঢুকেছে অবশেষে। এখন দেখার, ওই মহামহিম ব্যক্তিটি আই এন এর ট্রায়ালের দিক থেকে মন সরিয়ে এইদিকে মন দেন কি না। যেহেতু কথাটা ওনার কানে গেছে, তাই এবার উনি ভাববেন, বিচার বিবেচনা করবেন, আমাদের নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করবেন আর তারপরে হয়তো নড়েচড়ে বসবেন। আসলে এই দাঙ্গায় তো ইংরেজদের কোনো ইনভলভমেন্ট নেই। তাই ওনার নড়েচড়ে বসতে, ফরমান জারি করতে…বুঝেছ তো?’
—‘হ্যাঁ স্যার ঠিকই বলেছেন। তা আপনার খাওয়া-দাওয়া…।’
—‘ঘরে যথেষ্ট খাবার-দাবার আছে। তা তোমাদের?’
—‘আমাদেরও আরও দিন চারেকের মতো খাবার মজুত আছে। আশা করি তার মধ্যে দাঙ্গা থেমে যাবে।’
—‘ভালো, আশা করা ভালো। আচ্ছা, তাহলে তোমরা সাবধানে থেকো। গুড নাইট।’
—‘আপনিও সাবধানে থাকবেন স্যার। গুড নাইট।’
ফোন রাখতেই মেসোমশাইয়ের প্রশ্ন— ‘কী খবর দিলেন ড্যানীবাবু?’
রজনী গোপাল আর যুগলের খবরটা তাঁকে জানিয়ে বলল— ‘তারপরে ড্যানীবাবু বললেন যে, দাঙ্গার কথা ভাইসরয়ের কানে গেছে কিন্তু আমাদের নেতাদের সঙ্গে কথা না বলে উনি কিছু অর্ডার করতে পারবেন না।’
—‘হুঁ, দাঙ্গায় প্রাণ যায় আর নেতাদের সঙ্গে কথা বলে তবেই ভাইসরয় দেবেন রায়।’ ব্যঙ্গের সুর ঝরে পড়ে মেসোমশাইয়ের গলায়।
—‘তবে একটা জিনিস খেয়াল করেছেন কি মেসোমশাই?’
—‘কী?’
—‘আজকে নিয়ে গত দু-দিনে কিন্তু কোনো অ্যাম্বুল্যান্স বা দমকলের যাওয়ার আওয়াজ শুনেছেন কি?’
মাথা নেড়ে মেসোমশাই বললেন— ‘না শুনিনি। তার মানে বুঝতেই পারছ— সিচুয়েশন ইজ ভেরি গ্রেভ। এখন সব দেখেশুনে আমার কী মনে হচ্ছে জানো?’
—‘কী?’
—‘দেশের সর্বত্রই না ছড়িয়ে যায় এই দাঙ্গা।’
.
তবে সেদিন গভীর রাতে একটা ঘটনা ঘটেছিল। রাত তখন প্রায় দুটো। রজনীর একটু ঝিমুনির মতো এসেছিল। একঘেয়ে রাত হলে যা হয়। হঠাৎই তার তন্দ্রা ভেঙে যায়। হ্যারিসন রোডের দিক থেকে গাড়ির শব্দ আর মানুষের চিৎকার একসঙ্গে ভেসে আসছে। একই সঙ্গে শোনা যাচ্ছে ‘আল্লা হু আকবর’ আর ‘বন্দে মাতরম’ হুংকার। তারপরেই ডানদিকে দৃশ্যমান হল দুটো ট্রাক। পেছনেরটা তাড়া করে আসছে সামনেরটাকে। সঙ্গে সঙ্গে কেষ্টদাকে ডেকে তুলল রজনী। কেষ্টদা ছুটে এসে দেখল প্রথম ট্রাকটা তাদের বাড়ি থেকে প্রায় চল্লিশ গজ দূরে। তাড়াতাড়ি সে ছুটে গেল উনুনের কাছে। বড়ো মগের একমগ ফুটন্ত জল তুলে অপেক্ষা করতে লাগলো ট্রাকটার জন্যে।
আর ঠিক সেইসময়েই পেছনে ধেয়ে আসা ট্রাকটা থেকে উড়ে এল একটা ছোটো গোলমতো জিনিস। সেটা সামনের ট্রাকে গিয়ে পড়তেই বিকট কানফাটানো আওয়াজ। বিরাট একটা আগুনের গোলা লাফিয়ে উঠল আকাশে আর ট্রাকটা মাটি থেকে প্রায় দু-ফুট লাফিয়ে উঠল। ট্রাকের মানুষগুলো শূন্যে উড়ে গিয়ে ছিটকে পড়ল রাস্তায়। আগুন ধরে গেল ট্রাকে; এমনকী সেই অভিঘাতে ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল পেছনের ট্রাকটার উইন্ডস্ক্রিনও। সেটা দাঁড়িয়ে গেছে ততক্ষণে। প্রথম ট্রাকের মানুষগুলোর ছিন্নভিন্ন শরীর দেখে হুংকার দিয়ে উঠল পেছনের ট্রাকের লোকেরা। মত্ত উল্লাসে তারা নেমে পড়ল রাস্তায়। দাউদাউ আগুনের শিখায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তাদের পৈশাচিক আনন্দ।
আধমিনিট পরেই দূরে দেখা গেল আরও একটা গাড়ির আলো। একটা জিপ। সেটা পেছনের ট্রাকের পাশে একটুখানি দাঁড়িয়ে কিছু হয়তো বলল তাদের আর তারপরে দুটো ট্রাকের পাশ কাটিয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা লোকগুলোকে মাড়িয়েই ছুটে এল তাদের বাড়ির দিকে। এক লহমায় রজনী চিনতে পারল জিপের ড্রাইভারের পাশে বসা লোকটাকে। সে আর কেউ নয়, গোপাল পাঁঠা স্বয়ং। কেষ্টদা কিছু না বুঝেই গরম জল ছুঁড়তে যাচ্ছিল, কিন্তু রজনী তাকে আটকে দিল। আর একটু হলেই অনর্থ ঘটে যাচ্ছিল আর কী।
সাঁ করে তাদের বাড়ি পেরিয়ে বাঁ-দিকে চলে গেল জিপটা। বিমূঢ় কেষ্টদা তার হাতের মগ নামিয়ে রাখল ছাদের পাঁচিলে। তখনও মগের জল থেকে ধোঁওয়া উড়ছে; কিন্তু তার থেকে লক্ষ গুণ বেশি ধোঁওয়া উড়ছে দূরের ওই জ্বলন্ত ট্রাক থেকে।
একটা গভীর শ্বাস ফেলে রজনী। একটু থিতু হয়ে কেষ্টদা জিজ্ঞেস করে— ‘কী বোমা গো ওটা? কত্তো ছোটো, কিন্তু কী তেজ, মা গো!’
—‘ওটা হাতবোমা নয় কেষ্টদা। ওটা গ্রেনেড।’ বলে পেছনে ফিরতেই রজনী দেখতে পেল তার থেকে দু-হাত পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে কানাই। কোমর সমান উঁচু পাঁচিলের ওপর দিয়ে সে দেখছে জ্বলন্ত ট্রাকটাকে। হয়তো সে দেখেছে পুরো ঘটনাটাই। যে বীভৎসতা, যে ক্রুরতা সে কানাইকে দেখাতে চায়নি, এখন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সেটাই দেখল কানাই। এখানে রজনী একেবারেই নিরুপায়।
গভীর রাতে ওই বিকট আওয়াজে নিশ্চয়ই ঘুম ভেঙে গেছে সবার। তাই মেসোমশাই আর মাসিমাও উঠে এসেছেন ছাদে। সেইসঙ্গে আশেপাশের বাড়ির ছাদেও লোক জমতে শুরু করেছে। দ্বিতীয় ট্রাকটা এবার তার আরোহীদের পিঠে তুলে নিয়ে জ্বলন্ত ট্রাকটার পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল জিপটার চলে যাওয়ার পথ ধরেই।
আশেপাশের বাড়ির ছাদ থেকে বালতি করে জল ঢেলে ট্রাকের আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে অনেকেই। কিন্তু সেই আগুন নেভানো কী অতই সহজ! ওটা যে দাঙ্গার আগুন।
