দিনেশ, চোরাবালি আর শ্যামাদাসের ধন্দ
এই সমস্ত ঘটনার সময়ে রজনীকান্ত সর্বদাই ছিল গাঁয়ের মাতব্বরদের সঙ্গে। বিষ্টুর সৎকার মিটে যেতে সে যখন ঘরে ফিরল তখন সুরেশ কাকা তাকে জিজ্ঞেস করলে— ‘হ্যাঁ গো ছোরদাবাবু, শুনচি নাকি বিষ্টুকে নিশিতে ডেকে নে গেসল?’
রজনী নির্লিপ্তভাবে বলল— ‘হবে হয়তো। তা খাবার কি তৈরি হয়ে গেছে? সারাদিন ঠিকমতো খাওয়া হয়নি। ক্লান্ত লাগছে। আচ্ছা সুরেশকাকা, তোমাকে তো কোথাও দেখলাম না।’
—‘কী আর বলবো ছোরদাবাবু, হুগলিতে যেতে হয়েচিল আজ। বউয়ের বাতের ওষুধ আনতে। ছেলেপিলেরা তো সব লায়েক হয়ে গেচে। তারা কি আর মায়ের জন্যে করবে? তাই এই বুড়োটাকেই যেতে হয়েচিল।’
—‘তা ওষুধ পেলে?’
—‘সে তো পেলামই, তবে আরও একটা জিনিস দেকলাম।’
—‘কী?’
—‘দেকলাম শ্যামাদাস একটা পানের দোকান থেকে পান কিনচে। আমি তো পেথমটায় খেয়াল করিনি। পান কিনতে গে এক্কেরে মুকোমুকি পড়ে গেলাম। আমরা তো জানি শ্যামা ক-দিনের জন্যে কলকাতায় গেচে। কিন্তু হুগলিতে সে কী কচ্চে? আজও তো সে গেরামে ফিরল নেকো। কী ব্যাপার বল তো?’
—‘হয়তো কোনো বিশেষ কাজ আছে হুগলিতে। আর হয়তো বিষ্টুর মারা যাওয়ার খবর ও পায়নি। খবর পেলে নিশ্চয়ই ফিরে আসত।’
—‘আর জানো, রঘুর চায়ের দোকানে দেকলাম শশ্মান ফেরত দিনেশ আর তোমার নরেশ কাকা চা খাচ্চে।’
—‘তা চা খাওয়াটা কি খুব অস্বাভাবিক সুরেশ কাকা?’
—‘না, তা নয় বটে। তবে ওই দিনেশটা তো শ্যামার ল্যাজে ল্যাজে ঘোরে। শ্যামা রয়ে গেল হুগলিতে। সক্কাল থেকে নরেশের টিকিও দেকা যায়নি গেরামে। আর একোন দেকি দিনেশের সঙ্গে গুজগুজ করচে। তাই বলচিলাম…।’
—‘সে ওদের দলের ব্যাপার-স্যাপার। তোমার আমার এসবে মাথা ঘামানোর দরকার কী?’
—‘তাইলে আমি আসি ছোরদাবাবু?’
—‘হ্যাঁ, এসো। সাবধানে যেও।’
সুরেশ কাকা চলে গেলে চোখ বুজে ঘটনাগুলো সাজানোর চেষ্টা করে রজনী। অদৃশ্য যোগসূত্রের সন্ধান করতে থাকে সে।
.
জিনিসপত্রের দাম বেশ চড়া হলেও দিনেশের পরিবারের তাতে খুব একটা অসুবিধে হচ্ছে না। কারণ দিনেশরা সেই অর্থে মোটামুটি অবস্থাপন্নই। তাদের উঠোনে ধানের গোলা, গোয়ালে দুটো দুধেল গাই। উঠোনের পুবদিকে রান্নাঘর আর দক্ষিণে খানিকটা তফাৎ রেখে দুটো ঘর। তারই একটায় দিনেশের বাবা-মা শোয় আর অন্যটাতে দিনেশ। দিনেশের ঘরের পাশেই কলাগাছের ঝোপ আর তারপরেই বাঁশ বাগান।
রাতে খাওয়া দাওয়া সেরে গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে রোজকার অভ্যেস মতোই দিনেশ কলাঝোপের পাশে পায়চারি করতে করতে সিগারেট খাচ্ছিল। খানিক আগেই মা ঘরকন্নার কাজ সেরে শুতে গেছে। মা জেগে ছিল বলেই এতক্ষণ সিগারেট খেতে পারছিল না। তাই এখন সে সিগারেট ধরিয়ে পায়চারি করছে উঠোনে আর মনে মনে ভাবছে— বিষ্টুর ঘাড় ভেঙেছে। জলে ডুবলে তো ঘাড় ভাঙার কথা নয়। তার মানে কেউ অবশ্যই খুন করেছে তাকে। কিন্তু কে করেছে? আর কেনই বা করেছে? শ্যামাদাসদাই কি এটা কাউকে দিয়ে করাল? লোক তো সে সুবিধের নয়। কিন্তু কেন খুন করাল? বিষ্টু কি শ্যামাদার কোনো গোপন কথা জেনে গিয়েছিল যা সে নিজে কিংবা নরেশকাকা জানে না? আবার শ্যামাদার তো এখন কলকাতায় থাকার কথা। কিন্তু চায়ের দোকানে নরেশ কাকা বলল যে শ্যামাদা এখন হুগলিতে। তার তো কলকাতা থেকে মাল আনার কথা ছিল। তাহলে সে হুগলিতে কী করছে? কলকাতা থেকে ফিরে এল নাকি? আর ফিরে এলেও সে গ্রামে এল না কেন? নাঃ! অনেক প্রশ্নে গুলিয়ে যাচ্ছে তার মাথা। এবার একটু না শুলেই নয়। ঘুমোলে মাথাটা পরিষ্কার হবে। তা ছাড়া সারাদিন অনেক ধকল গেছে। হঠাৎ তার মনে হল শুকনো বাঁশপাতার ওপর দিয়ে কিছু একটা দৌড়ে গেল। হয়তো শিয়াল কুকুর হবে। বিশেষ আমল দিল না সে। প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া সিগারেটটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে চেপে নিভিয়ে দিয়ে ঘরের দাওয়ায় উঠে যায়। ভেজানো দরজা খুলতে যাবে এমন সময় হঠাৎই তার কোমরে জড়িয়ে গেল একটা দড়ি। তারপরেই একটা হ্যাঁচকা টানে সে পড়ে যায় দাওয়া থেকে নীচে। ধপ করে একটা আওয়াজ। চোখের মোটা মাইনাস পাওয়ারের চশমাটা ঠিকরে পড়ে দাওয়াতেই। চোখে চশমা না থাকলেও সে আবছা বুঝতে পারে যে চোখে ঠুলির মতো চশমা পরা কালো মতো কেউ একজন দাঁড়িয়ে তার পাশে। সে ভয়ে চেঁচিয়ে উঠতে যাবে, কিন্তু মুহূর্তেই সেই কালো মূর্তি দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে ধরেছে তার গলা। স্বর বেরোচ্ছে না তার। শুধু কোনোরকমে শ্বাস নিতে পারছে মাত্র।
এদিকে কিছু একটা আওয়াজ শুনে পাশের ঘর থেকে দিনেশের মা তন্দ্রাজড়ানো গলায় বলে ওঠেন— ‘কী হল রে দিনু?’
কালো মূর্তি দিনেশের গলায় জবাব দেয়— ‘শ্যামাদা এসেছে দরকারি কথা বলতে। তুমি শুয়ে পড়ো মা। আমরা ঘরেই আছি।’
কিন্তু মায়ের মন। বিশেষ করে বিষ্টুর ঘটনাটা ঘটার পর থেকেই মনটা কেমন যেন খচখচ করে। তাই লেপ সরিয়ে হ্যারিকেনের আলো বাড়িয়ে বাইরে এসে দাওয়া থেকেই দিনেশের ঘরের দিকে উঁকি দেন তার মা। হ্যাঁ, দরজা তো বন্ধই আছে। তাই আবার ঘরে ঢুকে যান তিনি।
কালো মূর্তি ততক্ষণে দিনেশের শরীরটাকে তুলে নিয়েছে কাঁধে। অবলীলায় দৌড়ে চলেছে বাঁশবাগান ভেদ করে। এখান থেকে খানিকটা রাস্তার ওপর দিয়ে গিয়ে বাঁ-দিকে ঘুরলে তবেই দামোদরের চর। কিন্তু প্রথম শীতের রাস্তায় কয়েকটা কুকুর ছাড়া জনমনিষ্যির দেখা নেই। তবে তারাও কেউ ঘেউ-ঘেউ করে উঠল না। কেন? এদিকে কালো মূর্তিও রাস্তা দিয়ে গিয়ে বাঁ-দিকের সরুপথ ধরে পৌঁছে গেল দামোদরের চরে। এ ছাড়া আর উপায় ছিল না তার।
সেখানে দিনেশকে নামিয়ে রেখে তার গলায় পেঁচানো দড়িটা ঢিলে করে দেয় সে। না, দিনেশ এখনও অজ্ঞান হয়নি; খালি এতটা পথ গলায় দড়িটা পেঁচিয়ে রাখার জন্যে তার কথা বলতে আর শ্বাস নিতে খানিক অসুবিধে হচ্ছে। তবে উঠে বসেছে সে।
কালো মূর্তি তাকে জিজ্ঞেস করল— ‘কী রে? ঠিক আছিস?’
গলাটা চেনা দিনেশের। এতক্ষণে সে বুঝে গেছে বিষ্টুকে কে মেরেছে। তার মনে পড়ে যায় বিষ্টুর নিশির ডাকের কথা আর একটু আগেই কালো মূর্তির তার গলা নকল করার কথা। তাই সে হাঁফ ধরা গলায় আগেভাগেই বলে— ‘আমাকে মে…মে…মের না প্লিজ।’
—‘তাহলে আমাকে বল, কলকাতার নাম করে হুগলিতে শ্যামা আছে কেন?’
—‘ও..ও..ওখানে ওর নিজের বাড়ি আছে।’ গলায় হাত বোলাচ্ছে দিনেশ।
—‘বাড়িটা কোথায়?’
—‘শুনেছি কুমোর গলিতে।’ প্রাণের ভয়ে সত্যি কথাই বলে দিনেশ।
—‘তুই সেখানে কখনো গিয়েছিলিস? সত্যি করে বল।’
—‘না।…আমাদের সবকিছু জানা বারণ।’ তারপরে ঢোঁক গিলে বলে— ‘যার যেটা কাজ, সে শুধু সেটাই করে।’
কালো মূর্তি বলে— ‘শ্যামার ওই পৈতৃক বাড়িটাই কি চোরাচালানের ঠেক? হুগলির বাড়ি থেকেই কি শ্যামা পিস্তলও পাচার করে?’
—‘আমি ঠিক জানি না। হতেও পারে। আবার নাও হতে পারে। তবে কলকাতায় একটা ঠেক আছে জানি।’
—‘তা তুই ছাড়া হুগলির ওই বাড়ির কথা আর কে কে জানে?’
—‘নরেশ কাকা আর ওর ভাইপো জানে।’ দিনেশ তখনও নিজের গলায় হাত বোলাচ্ছে।
—‘ভাইপোর নাম কী? সে কোথায় থাকে?’
—‘তার নাম ভবেশ বাগদি। হুগলিতে মহামায়া মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে কাজ করে। শুনেছি ওই এখন কলকাতায় মাল লেনদেন করছে।’
—‘তাহলে শ্যামা কলকাতায় যায় কেন?’
—‘মনে হয় রিভলভার আর সাবান আনানোর ব্যবস্থা করতে। তবে সেখানে আর কি করে তা আমরা কেউই জানি না।’ প্রাণে বাঁচার তাগিদে না চাইতেই অনেক কথা উগরে দিচ্ছে দিনেশ।
—‘তা ভবেশ কখন কলকাতায় যায়?’
—‘নরেশ কাকা দূরের গ্রামের মাল নিয়ে চলে যাবার পরে ও রাতে শ্যামাদার কাছ থেকে কলকাতায় বিলির জন্যে মাল আর টাকাটা নেয় আর সেদিন রাতেই ট্রেন ধরে সেটা কলকাতায় ডেলিভারি করে।’
—‘ও আচ্ছা। তাই শ্যামা আজ গ্রামে ফিরল না। তা এবার বল তো মাণিক, বিষ্টুর মরার খবর কি শ্যামা পেয়েছে?’
—‘হ্যাঁ। নরেশ কাকা সকালেই বেরিয়ে গিয়েছিল। সেইই শ্যামাদাকে সব বলেছে।’
—‘তাহলেই দেখেছিস, শ্যামা তোদের কত্তো ভালোবাসে যে বিষ্টু মরতেও সে ফিরল না।’ ব্যঙ্গ ঝরে পড়ে কালো মূর্তির কথায়।
—‘মাল ঠিকঠাক বিলি না হলে তো শ্যামাদা ফিরতে পারবে না। তাইই…।’
—‘বাঃ। এখনও ওর হয়ে সাফাই গাইছিস? ও আচ্ছা, আচ্ছা। আমিই ভুল করেছি। তোদের কাছে তো মানুষের চেয়ে চোরাই মালেরই কদর বেশি।’
দিনেশ বুঝতে পারে যে শ্যামাদার হয়ে বলে সে বড্ডো ভুল করে ফেলেছে। পরে শ্যামাদাকে এসব কথা বলতেই হবে। তাই সে চুপ করে থাকে। এ ছাড়া এখন আর উপায়ই বা কি?
তার চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটে কালো মূর্তির কথায়। ক্যাঁৎ করে দিনেশের পাছায় একটা হালকা লাথি মেরে সে বলে— ‘কী রে? সারারাত বসে থাকবি নাকি এই নদীর চরে? যা বাড়ি যা। ভাগ এখান থেকে শালা শ্যামার পা চাটা নেড়িকুত্তা। যা ভাগ।’ আবার একটা লাথি পড়ে তার কাঁধে।
দিনেশ তাড়াতাড়ি উঠে পালাতে যায় আর ভাবে— ওঃ, এ যাত্রায় খুব বেঁচে গেছে সে…। কিন্তু হঠাৎই তার ভাবনা থেমে যায়। একটা দড়ি জড়িয়ে যায় তার গলায় আর মাথার ঠিক পেছনেই সপাটে আঘাত করে ভারী একটা কিছু। তার গলা থেকে ‘উঃ’ করে একটা হালকা শব্দ বেরোয়। তারপরই বালিতে লুটিয়ে পড়ে দিনেশ।
দিনেশের গলার দড়িটাকে ধরেই কালো মূর্তি তাকে টেনে নিয়ে যায় খানিক দূরের একটা শুকনো কাশঝোপের কাছে। গলা থেকে দড়িটা খুলে নেয়। তারপরে দিনেশের শরীরটা দু-হাতে তুলে ছুঁড়ে দেয় হাত আটেক দূরে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে কেমন করে দিনেশের শরীরটা ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে বালির নীচে— গভীর থেকে আরও গভীরে।
নাঃ, এবারে আর কালো মূর্তির ভয় করছে না। সব প্রমাণ লোপাট করে দিয়েছে সে আর সেইসঙ্গে নিজের সঙ্গে যুঝতে যুঝতে হয়ে উঠেছে ঠান্ডা মাথার একজন সিরিয়াল কিলার।
.
পরেরদিন সকাল হতে না হতেই হই চই। পাড়াসুদ্ধু লোক এসে জমেছে দিনেশদের বাড়িতে। দিনেশকে নাকি পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েকজন খুঁজতেও বেরিয়েছে তাকে।
সুরেশ কাকার মুখে খবরটা শুনে রজনীও যায় দিনেশদের বাড়ি। ততক্ষণে খোঁজ তল্লাশি সেরে সবাই ফিরে এসেছে। নানান লোকে নানান কথা বলছে। দিনেশের নিরুদ্দেশ হবার নানা সম্ভাবনার কথা বলছে। এরই মধ্যে দিনেশের বাবা একজনকে সঙ্গে নিয়ে টাউনের থানায় ছুটল।
থানা-পুলিশ হবে এইবার। তাই ভিড়টা আস্তে আস্তে হালকা হতে শুরু করে। রজনী আর সুরেশ কাকাও নিজেদের বাড়ি ফিরতে যাবে, এমন সময় সুখরঞ্জনের গলা কানে এল— ‘বলেচিলুম না, এ হল নিশির ডাক। তা তকোন তোমরা গেরাজ্জি করলে নে। সাবধানেও থাকলে নে। একোন বুইলে তো? ওগো, এই সুকরঞ্জনের কতা বাসি হলে তবে মিষ্টি হয়, হ্যাঁ।’
.
পরেরদিন সকাল দশটার বাসে শ্যামাদাস নামে হাটতলায়। রঘুর চায়ের দোকানে গিয়ে বসে। দোকান একন ফাঁকা। কোনো খদ্দের নেই। তাই শ্যামাদাস একটু বসতেই রঘু চা এগিয়ে দিয়ে বলে— ‘শ্যামাদা, তুমি তো ক-দিন ছিলে না। ইদিকে অনেক সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটে গ্যাচে গেরামে।’
বিস্মিত শ্যামাদাস বলে— ‘কাণ্ড? কী এমন সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটে গেল এই ক-দিনে?’
—‘আর বোলোনি শ্যামাদা। সাংঘাতিক ব্যাপার সব।’
রঘু ততক্ষণে চায়ের গ্লাস বাড়িয়ে দিয়েছে। সেটা হাতে নিয়ে শ্যামাদাস বলল—‘আরে, বলবি তো কী হয়েছে? খালি ধানাইপানাই।’
—‘বিষ্টুচরণ খুন হয়েচে গো।’
শ্যামাদাস চায়ে একটা চুমুক দিতে যাচ্ছিল। হঠাৎ কথাটা শুনে চমকে ওঠে সে। খানিকটা চা ছলকে পড়ে গ্লাস থেকে। বলে— ‘কি বললি? বিষ্টু খুন হয়েছে? কবে? কোথায়? কী করে?’ নিখুঁত অভিনয় শ্যামাদাসের।
একসঙ্গে এতগুলো প্রশ্নে থতমত খেয়ে রঘু বলতে থাকে— ‘শনিবার রেতে বিষ্টু ওর খিড়কি পুকুরে নাইতে যাবার সময় দিনেশ পুকুরপাড় থেকে তাকে ডাকে। দিনেশের গলা নাকি ওর বউ ঘুমের ঘোরে শুনেচে। তারপর সক্কালবেলা বিষ্টুর বউ ঘাটে গে দেকে যে পুকুরের জলে বিষ্টুর লাশ ভাসচে। ইদিকে ঘাটের কাচে পড়েচিল তার শুকনো লুঙ্গি আর গামচা। তাপ্পরে টাউনের থানা থেকে পুলিশ আসে। তারা বিষ্টুর লাশ নে যায়। সেইসঙ্গে তার জিনিসপত্তর আর দিনেশকেও নে যায়।’
শ্যামাদাস অবাক হবার ভান করে। রঘুর সরল চোখে তা ধরা পড়ে না। —‘শেষে দিনেশ খুন করল বিষ্টুকে? ওকে কি জলে ফেলে দিয়েছিল? কিন্তু বিষ্টু তো সাঁতার জানত।’
—‘আরে না গো দাদা, তা নয়। দিনেশ সেদিন রেতে তার ঘরেই ছেলো। সে নাকি তবলা বাজাচ্চিল। আশপাশের লোকেরাও তা জানে। কিন্তু নিশির ডাকে সাড়া দিয়েই ভুলটা করে বিষ্টু। ওই নিশিই তার ঘাড় মটকে জলে ফেলে দেচে।’
—‘ঘাড় মটকানোর কথা কে বললে? পুলিশ?’
—‘তা ছাড়া আর কে বলবে? সব্বাই তো ভেবেচিল জলে ডুবে মরেচে বিষ্টু।’
নরেশ যখন হুগলিতে তাকে খবরটা দিয়েছিল তখন তো পোস্ট মর্টেমের রিপোর্ট বেরোয়নি। তাই শ্যামাদাসকে সে সেটা বলতে পারেনি। তবে এখন রঘুর মুখে শুনে শ্যামাদাস বোধ হয় আন্দাজ করে পারছে বিষ্টুর খুনি কে হতে পারে। এবারে রঘুর কাছ থেকে আরও কিছু জানতে হবে।
তাই সে বলে— ‘তা দিনেশ এখন কি বাড়িতে? একবার ওর সঙ্গে দেখা করতে হবে।’
—‘আর দেকা? পুলিশ দিনেশকে গাঁ ছাড়তে বারণ করেচিল। কিন্তু কাল থেকে দিনেশও নিপাত্তা।’
শ্যামাদাস নরেশকে আর হুগলিতে আসতে বারণ করেছিল বলে এই খবরটা সে পায়নি। এটা তো এখন জানতে হবে বিশদে। তার জন্যে রঘুকে আরও একটু খোঁচাতে হবে।
—‘সে কী? কোথায় গেল সে? ওইই কি তাহলে বিষ্টুকে খুন করে গাঁ ছেড়ে পালিয়েছে?’
—‘আরে তা নয় গো শ্যামাদা। দিনেশের মা পুলিশকে বলেচে যে তুমি নাকি কাল রাতে দিনেশের সঙ্গে দেখা করতে গেচিলে। দিনেশ তো তার মাকে সেই কতাই বলেচিল। তাপ্পর থেকে আর দিনেশের খোঁজ পাওয়া যাচ্চে না।’
—‘আমি? আমি তো কাল এখানে ছিলামই না। তু…তু…তুই এসব সত্যি বলছিস তো রঘু?’
—‘তোমাকে আমি খামোকা মিচে কতা কইতে যাব কেন শ্যামাদা? তুমি গেরামের লোকেদের সঙ্গে কতা বলে দেকো আমি সত্যি বলচি কি না।’
এবার সত্যিই ধাঁধাঁয় পড়ে যায় শ্যামাদাস। সবকিছু কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। সে তো কাল রাত্তিরে হুগলিতে ছিল। তাহলে কে এসেছিল দিনেশের কাছে? দিনেশ কেনই বা তার নাম বলল মা-কে? ঠিক আছে। রঘুকে আরেকটু ঘেঁটে দেখা যাক। তার ভাগ্য ভালো যে এই সময়টায় দোকানে আর অন্য খদ্দের নেই। তাহলে এত কথা বলা কওয়া যেত না। ঠান্ডা চায়ের কাপটা তাই একপাশে সরিয়ে রেখে একটা সিগারেট ধরায় সে। তারপরে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে আবার অভিনয় শুরু করে— ‘এ তুই কি কথা শোনালি রে রঘু… বিশ্বাসই হচ্ছে না… আমার দলের দু-দু-জন… আমার দুটো পাঁজর চলে গেল রে …।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শ্যামাদাস।
তারপর খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে— ‘তা দিনেশ গাঁ ছাড়ার সময়ে কি ওর জামাকাপড়, সিগারেটের কৌটো আর মানে ওর নিজস্ব কিছু জিনিসপত্র নিয়ে গেছে? জানিস কিছু?’
—‘আজ্ঞে না শ্যামাদা। আমি তো ওর বাড়িতে যাইনি। তবে নরেশদা বলচিল যে দিনেশের মা নাকি বলেচে যে দিনেশের চশমাটা দাওয়ায় পড়েচিল। আর ও নিজের জিনিসপত্তর কিচুই নে যায়নি।’
—‘হুম বুঝলাম।’ গম্ভীর মুখে সিগারেটে টান দিতে থাকে শ্যামাদাস। তার মাথায় এখন অন্য চিন্তা ঘুরছে।
শ্যামাদাস জানে যে মাইনাস ফাইভ পাওয়ারের চশমা ছিল দিনেশের। সেটা না থাকলে ওর পক্ষে শুধু রাতে কেন, দিনের বেলাতেও চলাফেরা করা বেশ মুশকিল। আর বারবার দিনেশের গলা নকলই বা করেছে কে? রহস্য। এখানেই রহস্যটা আছে।
ঘন ঘন সিগারেটে টান দিতে শুরু করে সে।
