২৩ অগাস্ট, ১৯৪৬ – আমিনদাকে অ্যাটাক আর গোপালদার সাহায্য

২৩ অগাস্ট, ১৯৪৬ – আমিনদাকে অ্যাটাক আর গোপালদার সাহায্য

তেইশ তারিখ সকালে চা-বিস্কুট খেয়ে ছাদে উঠে রজনী বুঝতে পারল যে অবস্থা এখন অনেক বেশি স্বাভাবিক যদিও মন্টুদা তার চায়ের দোকান খোলেনি। রাস্তাও মনে হয় পরিষ্কার করা হয়েছে রাতের অন্ধকারে বা ভোরের দিকে। তাই সে কানাইকে ডেকে বলল— ‘চ, একটু জগিং করে আসি। শরীরটাতে মনে হচ্ছে যেন জং পড়ে গেছে তারপরে না হয় আজ ছাদে ভালো করে ডামিতে ল্যাসো ছোঁড়া প্র্যাকটিশ করাব।’ ‘ডামি’ আর কিছুই নয়— ভারী কাঠের ওপরে খাড়াভাবে আটকানো ছ-ফুট লম্বা একটা মোটা কাঠের থাম যার গায়ের চারপাশে বিভিন্ন উচ্চতায় ফুটখানেক করে কাঠের লাঠির টুকরো আটকানো থাকে। এতে হাতের আর পায়ের বিভিন্ন অংশ দিয়ে আঘাত করে করে হাত-পা লোহার মতো শক্ত করা হয়। থামের গায়ে লাগানো ছোটো দুটো লাঠির মাঝে বিভিন্ন জায়গায় চক দিয়ে রজনী এক একটা ঢ্যাঁড়া দিয়ে দেয় আর কানাইকে সেই সেই উচ্চতায় ছুঁড়তে হয় একমাথায় ধাতুর বল লাগানো ল্যাসো। রজনী জানে যে এখন থেকে এটা প্র্যাকটিশ করালে কয়েক বছরেই কানাই এই ল্যাসো ছুঁড়তে রীতিমতো দক্ষ হয়ে উঠবে।

তা কানাই তো এককথায় রাজি। টানা ক-টা দিন ঘরবন্দি থেকে হাঁপিয়ে উঠেছে সে। শুধু মাসিমা গাঁইগুঁই করে বললেন— ‘আজই কি দরকার বাপু? দু-একদিন পরে বেরোলে হত না?’

—‘দোকানপাট খুলেছে মাসিমা। এখন সবকিছু অনেকটা স্বাভাবিক। এদিকে ঘরেও তো খাবারের টান। আমরা বরং দেখি কিছু পাই কি না।’

এই জেদি ছেলেদুটোকে বেশ বুঝে গেছেন মাসিমা। তাই আর কথা না বাড়িয়ে বাজারের ব্যাগ তুলে দিলেন রজনীর হাতে।

এদিকে বেরোনোর আগে দোতলার ঘরে কানাই বলেছিল— ‘আমি কি স্যার তাহলে আমার বুমেরাংটা নেব?’ রজনী বলেছিল— ‘নে। সঙ্গে রাখ। কে জানে বাবা, কখন কোথায় কী ঘটে। তাই সাবধানে থাকাই ভালো।’

বাড়ি থেকে বেরিয়ে জগিং করতে করতে দু-জনে এসে পড়ল হ্যারিসন রোডের মোড়ে। এই রাস্তাতেই দাঙ্গার সময়ে বেশি অঘটন ঘটেছিল। কার্ফু উঠে যেতে তাই লোক চলাচল কিছুটা হলেও শুরু হয়েছে। টিনের বাক্স আর পুঁটুলি মাথায়, বগলে চাটাই আর ছাতা নিয়ে গরিবগুর্বো মানুষেরা হাওড়ামুখী। ট্রেন চলা শুরু হলেও বাস বা ট্রাম চলা এখনও শুরু হয়নি।

রজনী আর কানাই ফুটপাথ ধরে দৌড়ে যাচ্ছে। হঠাৎই কানে এল গাড়ির আওয়াজ। তাহলে কি বাস চলা শুরু হল? কী গাড়ি আসছে তা দেখার জন্যে একটু দাঁড়াল তারা। ওমা, এ যে ট্রাক! চার-চারটে ট্রাক আসছে। তাদের সামনে দিয়েই হাওড়ামুখী সেগুলো। কিন্তু একী? প্রতিটা ট্রাকে উপচে পড়ছে দাঙ্গায় নিহত মানুষের লাশ। বোধ হয় নিয়ে যাচ্ছে গণ-সৎকারের জন্যে। সেই ট্রাকগুলো থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্রী শবপচা গন্ধ আর তার থেকে টপটপিয়ে রাস্তায় পড়ছে তাদের মাথার ঘিলু আর রক্তরস। নারকীয় দৃশ্য।

একের পর এক ট্রাকগুলো চলে গেল। রজনী লক্ষ্য করে দেখল যে এই দৃশ্য দেখেও কানাই অবাক না হয়ে কোমরে দু-হাত রেখে শুধু বিরক্তিতে একটু ভ্রু কুঁচকে রইল খানিকক্ষণ আর তারপরে বলল— ‘ধ্যুস, কেন যে রায়ট হয়?’

ট্রাকগুলো চলে যেতেই আবার তারা জগিং শুরু করল। কলেজ স্ট্রিট ক্রশিং তখনও কিছুটা দূরে। ওইখান দিয়ে ঢুকে কলেজ স্ট্রিট বাজারে ঢুঁ-মারতে হবে, যদি কিছু পাওয়া যায়।

কিন্তু হঠাৎই ‘আল্লা হু আকবর’ চিৎকার। উলটোদিকের ফুটপাথের একটা গলি থেকে রড, লাঠি, তরোয়াল আর ছোরা নিয়ে পাঁচজন লোক তাড়া করেছে ধুতি-পাঞ্জাবি পরা এক প্রৌঢ় ভদ্রলোককে। দেখলেই বোঝা যায় যে ভদ্রলোক নিরীহ গৃহস্থ মানুষ।

চকিতে বিদ্যুৎ খেলে যায় রজনীর শরীরে। সে দৌড়োয় সেদিকে। কানাইয়ও বুমেরাং বাগিয়ে পিছু নেয় স্যারের।

ভদ্রলোক তাড়া খেয়ে দৌড়তে গিয়ে টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যান মাটিতে। আর ঠিক তার আগের মুহূর্তেই একজনের হাতের ছোরায় ফালা হয়ে গেছে তাঁর পাঞ্জাবি। ভদ্রলোক পড়ে যেতেই এক তরোয়ালধারী দু-হাতে অস্ত্রটা তুলে কোপ মারতে যাবে, এমনসময় রজনীর শরীরটা যেন উড়ে যায় হাওয়ায়। তার কিকটা সজোরে গিয়ে লাগে লোকটার চোয়ালে। কাটা কলাগাছের মতো সে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। ধাতব আওয়াজ তুলে তার তরোয়ালটা ছিটকে পড়ে রাস্তায়। দ্বিতীয়জন রড তুলতে যেতেই রজনীর বাঁ-পায়ের ব্যাকহিল গিয়ে লাগে তার পাঁজরে। দু-হাতে পাঁজর চেপে ধরে মাটিতে পড়ে যায় লোকটা। একহাতে কানাইকে নিজের পেছনে ঠেলে রজনী তাকে বলে— ‘কানাই, আমার পেছনে থাক।’ তবে কানাইও কম যায় না। পেছোতে পেছোতেই সে ছুঁড়ে দিয়েছে তার বুমেরাং। হাওয়ায় পাক খেতে খেতে গিয়ে সেটা সপাটে আঘাত করে আরেকজন রডধারীর মুখে। হাতের রড ফেলে দিয়ে লোকটা মুখ ধরে বসে পড়ে মাটিতে। বাকি দু-জন তখন পালাতে উদ্যত। কিন্তু কানাই ততক্ষণে দৌড়ে গিয়ে তুলে নিয়েছে তার বুমেরাং আর সেটা ছুঁড়েও দিয়েছে পলায়মান দু-জনের মধ্যে একজনের মাথা লক্ষ্য করে। নির্ভুল নিশানা। ঠিকানা লেখা বুমেরাং উড়ে গিয়ে আঘাত করে লোকটার মাথার পেছনে। হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায় সে। সঙ্গীদের এই অবস্থা দেখে ছোরা হাতে লোকটা আর পেছনে না তাকিয়ে সোজা দৌড় লাগায় ঊর্ধশ্বাসে। এদিকে মাটিতে পড়ে যাওয়া তরোয়ালধারী আর তার দু-স্যাঙাত উঠে বসতে যেতেই রজনী আর কানাইয়ের এক একটা কিক আবার সজোরে আছড়ে পড়ে তাদের চোয়ালে। এবার মাটিতেই সটান লুটিয়ে পড়ে তারা।

মাত্র চার-পাঁচ মিনিটেই ঘটে যায় পুরো ঘটানাটা। দাঙ্গাবাজদের নিকেশ করে শার্টটা ঠিক করতে করতে রজনী দেখে কানাই দৌড়েছে তার বুমেরাংটা আর বাজারের ব্যাগটা কুড়িয়ে আনতে। নিশ্চিন্ত রজনী এবার চোখ ফেরায়। আহত প্রৌঢ় উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। সে তাড়াতাড়ি এগিয়ে যায় সেদিকে। দেখতে হবে ভদ্রলোকের ইনজুরি কতটা; কারণ পাঞ্জাবিটা ভিজে গেছে রক্তে। সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি তো? কানাইও এসে পড়েছে ততক্ষণে। প্রৌঢ়ের কাছে গিয়ে তারা দেখে ছোরার আঘাতে তাঁর পিঠের মাংসপেশির খানিকটা অংশ ফালা হয়ে গেছে। রজনী হাঁটু গেড়ে পাশে বসে তাঁকে চিৎ করে দিয়েই বিস্ময়ে বলে ওঠে— ‘আমিনদা, আপনি!’

ভয়ে, আঘাতে জর্জরিত আমিনদা ককাচ্ছেন আর থরথর করে কাঁপছেন। ইনিই সেই আমিনদা যাঁর সাথে রজনী একসময়ে কাজ করত রডরিক্স সায়েবের অফিসে। এখন রজনীকে দেখেই আমিনদা চোখভরা জল নিয়ে হাতজোড় করে বলে ওঠেন—‘আমায় মেরো না রজনী, আমায় মেরো না ভাই। বিশ্বাস কর, আমি কিচ্ছু করিনি, আমি কারোর কোনো ক্ষতি করিনি।’

আমিনদার এই দশা দেখে রজনীর বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে। সে প্রৌঢ়কে সান্ত্বনা দিয়ে বলে— ‘আমি দাঙ্গাবাজ নই আমিনদা। আমি থাকতে কেউ আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। তা আপনি এদিকে কোথায় যাচ্ছিলেন?’

দু-হাতে রজনীর হাত চেপে ধরে আমিনদা কাতরাতে কাতরাতেই বলেন— ‘অফিস থেকে বেরিয়ে দাঙ্গার জন্যে আমি আর বাড়ি ফিরতে পারিনি। এখানেই আমার শালার বাড়িতে…। আ…আজ বাড়ি ফিরছিলাম। কিন্তু…কিন্তু ওরা আমায়…।’ ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেন প্রৌঢ়।

—‘ঘাবড়াবেন না আমিনদা। চোট বেশি নয়। হসপিটালে নিয়ে গেলে ঠিক হয়ে যাবে।’ সান্ত্বনা দেয় রজনী। কিন্তু এখন এই শূণ্য রাজপথে গাড়ি কোথায় পায় সে? কিন্তু…কিন্তু মনে হচ্ছে দূরে একটা গাড়ির আওয়াজ। রজনী প্রাণপণে আশা করে, গাড়িটা যেন এদিকেই আসে আর সে যেন আমিনদাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু কানাই সন্ত্রস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে— ‘স্যার, পুলিশের গাড়ি নয়তো?’ তার এই ভয় অমূলক নয়। এখানে যে কয়েকজন এখনও রাস্তায় পড়ে আছে। পুলিশ এসে দাঙ্গা করার দায়ে তাদেরই না ধরে।

কিন্তু না। ফাঁকা রাস্তায় তীব্রবেগে ছুটে আসতে আসতে হঠাৎই তাদের কাছে এসে ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষে দাঁড়ায় দুটো জিপ। প্রথম জিপটা থেকে নেমে আসেন গোপাল পাঁঠা আর তাঁর পেছনে পেছনে স্টিয়ারিং ছেড়ে নেমে আসে তাঁর ডানহাত বসন্ত।

তাদের কাছে এসে গোপাল জিজ্ঞেস করেন— ‘কী হয়েছে এনার?’

—‘পিঠে স্ট্যাব করা হয়েছে স্যার।’ বলে রজনী।

—‘স্যার নয়, বলুন ‘‘দাদা’’। আমি স্যার বলা পছন্দ করি না। ওটা ইংরেজদের জন্যে তুলে রাখুন। তা এনাকে কি ওরাই খুন করতে এসেছিল?’ রাস্তায় পড়ে থাকা লোকগুলোর দিকে ইঙ্গিত করেন গোপাল।

—‘হ্যাঁ দাদা, তবে একজন পালিয়েছে।’

বিস্মিত গোপাল কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেন— ‘তা এদের এই হাল করল কে? এদের কাছে তো অস্ত্র আছে দেখছি।’

—‘আর কেউ না জেঠু, শুধু স্যার আর আমি।’ কানাই গর্বের সুরে বলে ওঠে।

—‘শুধু তোমরা দু-জনে? কোনো অস্ত্র ছাড়াই?’ গোপাল আরও বিস্মিত হন।

—‘হ্যাঁ জেঠু।’

বসন্ত বলে— ‘দাদা, এদের হিম্মৎ আছে দেখছি। স্রেফ খালিহাতে এই অবস্থা করেছে এদের?’

কানাই বুমেরাং উঁচিয়ে বলে— ‘আর এইটা দিয়েও।’

গোপাল বলেন রজনীকে— ‘তা এনার পরিচয় জানেন? নাকি এমনিই বাঁচাতে এলেন?’

—‘দাদা, একসময়ে উনি আমার সাথে একই অফিসে কাজ করতেন। দাঙ্গা যেদিন শুরু হয়, সেদিন হাওড়া গিয়ে ট্রেন ধরতে পারেননি বলে এখানে ওনার শালার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আজ সকালে পরিস্থিতি ঠান্ডা হতে ট্রেন ধরতে যাচ্ছিলেন। তবে উনি আমার পরিচিত না হলেও আমি একই কাজ করতাম, কারণ উনি একজন শান্তিপ্রিয় মানুষ, দাঙ্গাবাজ নন। আর আপনিও তো তাইই করে থাকেন বলেই শুনেছি।’

গোপাল একটু চুপ করে থেকে বসন্তকে বললেন— ‘এই বসন্ত, এনাকে শিগগিরই হাসপাতালে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা কর। হাসপাতালে বলবে গোপালদা পাঠিয়েছে। আর শোনো, কোন হাসপাতালে ভরতি করেছ তা আমাকে পরে জানিয়ে দিও।’

দ্বিতীয় জিপটা থেকে তিনজন নেমে আমিন সায়েবকে ধরাধরি করে তুলে ওই জিপেরই সাইড সিটে উপুড় করে শুইয়ে দেয়। বসন্ত আমিন সায়েবকে জিজ্ঞেস করে—‘আপনার নাম কী? কোথায় থাকেন? হাসপাতালে লেখাতে হবে তো।’

আমিনদা কোনোরকমে বলেন— ‘আমিনুল হক। থাকি সাঁকরাইলে।’ তারপরেই জ্ঞান হারান।

জিপটাকে চলে যেতে বলে গোপাল বসন্তকে বলেন— ‘দেখ তো, শয়তানের বাচ্চাগুলো মরে গেছে নাকি?’

সবাইকে নেড়েচেড়ে দেখে বসন্ত বলে— ‘না দাদা, এখনও মরেনি। আধমরা। কী করব বল? শেষ করে দেব?’

গোপাল একবার কানাইয়ের দিকে তাকান। তারপর বসন্তকে বলেন— ‘না ছেড়ে দাও। যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে ওদের। তুমি শুধু ওদের অস্ত্রগুলো তুলে নাও গাড়িতে।’

বসন্ত অন্য ছেলেদের ইশারা করতেই তারা লেগে পড়ে কাজে। অস্ত্রগুলো নিজেদের জিপে তুলে হাত-পা ধরে লোকগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় ফুটপাতে।

—‘তা এদের চোট কেমন?’ গোপাল জিজ্ঞেস করেন রজনীকে।

—‘আজ্ঞে দাদা, ওদের বড়োজোর চোয়াল আর পাঁজরের হাড় ভেঙে গিয়ে থাকতে পারে।’

—‘তা আপনারা বুঝি জুডো জানেন? সেই জাপানি কুস্তি?’

—‘আজ্ঞে দাদা, জুডো নয়, আমরা তাইকোন্ডো জানি। ওটা কোরিয়ান।’

গোপাল তারপর কানাইয়ের কাঁধে হাত রেখে বললেন— ‘তা বাবু, তোমার হাতে কাঠের ওই অস্ত্রটা কী? আগে তো কখনো দেখিনি এ জিনিস।’

—‘আজ্ঞে জেঠু, এটা হল বুমেরাং। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের অস্ত্র। ঠিকমতো টিপ করে ছুঁড়ে দিলে এটা লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করে।’

—‘সাব্বাশ’ বলে গোপাল কানাইয়ের হাতের অস্ত্রটা নেড়েচেড়ে দেখে আবার ফেরত দিয়ে রজনীকে বললেন— ‘আপনাদের নাম জানতে পারি? থাকেন কোথায়?’

—‘আজ্ঞে, আমি রজনীকান্ত রায় আর ও হল কানাই দত্ত। থাকি বউবাজারে।’

গোপাল খানিকক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন রজনীর দিকে। তারপরে বলেন—‘শুনুন রজনীবাবু, আজ সন্ধেবেলা আমার অফিসে দেখা করে আমিনবাবু কোথায় ভরতি আছেন তা জেনে যাবেন, আর পারলে ওনার বাড়িতে একটা খবর করে দেবেন। আর হ্যাঁ, আমার তরফে আপনাদের দু-জনের জন্যে গিফট পাওনা আছে। সেটাও একদিন এসে নিয়ে যাবেন অফিস থেকে।’

গোপাল জিপে গিয়ে বসেন আর বসন্ত স্টার্ট দেয় জিপে। হ্যারিসন রোড ধরে হাওড়ার দিকে ছুটে যায় জিপটা। তারা শুধু তাকিয়ে থাকে সেদিকে। তবে এতদিন পরে একজন মানুষের প্রাণ বাঁচাতে পেরে রজনীর কেমন যেন একটা ভালোলাগার অনুভূতি হচ্ছে। সেইসঙ্গে বেশ তৃপ্তিও। তার মনে হচ্ছে যে— এতদিন সে অনেক ভুল করেছে। এখন সেইগুলো শোধরানোর সময় বুঝি আসছে। সময় আসছে প্রায়শ্চিত্ত করার।

ফেরার পথে তারা কলেজ স্ট্রিট বাজার থেকে কয়েক সের চাল, ডাল আর ডিম কিনে নিয়ে বাড়ির পথ ধরে। আজকের রাস্তার ঘটনা কাউকে বলতে বারণ করে দিয়েছিল রজনী। কানাইও স্যারের নির্দেশ মুখবুজে পালন করে।

সেইদিনই দুপুরের পরে কানাইকে নিয়ে আমিনদার সাঁকরাইলের বাড়ি ঘুরে সন্ধেবেলা রজনী গিয়েছিল গোপালবাবুর অফিসে। সেখানে গোপালবাবু তাদের পাঁচশো টাকা উপহার দিতে চেয়েছিলেন; কিন্তু রজনী সবিনয়ে তা ফিরিয়ে দিয়ে তাঁকে অনুরোধ করে যে তিনি যেন তাদের গ্রামের স্কুলটা সারিয়ে দেবার ব্যবস্থা করেন। রজনীর কথা শুনে গোপালবাবু খানিকক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন তার মুখের দিকে। তারপরে কী যেন একটু ভেবে নিয়ে তাকে বলেছিলেন যে এই ব্যাপারটা উনি যুগলবাবুকে নিশ্চয়ই বলবেন আর যথাসম্ভব চেষ্টা করবেন যাতে স্কুলের জন্যে কিছু ফান্ডের ব্যবস্থা করা যায়।

সেদিন আশা-নিরাশায় দুলতে দুলতে বাড়ি ফিরেছিল তারা। তবে স্যারের এই প্রস্তাবটা বেশ ভালো লেগেছিল কানাইয়ের। খুব খুশি হয়েছিল সে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *