রঙিন ফেউ, সাজাহান আর দারোগার তলব
গরমের ছুটি পড়ে গেছে। তাই কানাইকে নিয়ে রজনী এসেছে তাদের গ্রামে। সেই চেনা মাঠ, চেনা রাস্তা, চেনা হাটতলা আর চেনা বন্ধুদের অনেকদিন পরে দেখতে পেয়ে কানাইয়ের খুশি আর ধরে না। ভালো দিনেই এসেছে তারা। বাস থেকে নেমেই তারা বুঝতে পারে যে আজ গ্রামে শীতলা পুজো। পল্টু, নেলো, পটাই আর সব ছেলেরা মিলে বাঁশের চ্যাঁচাড়ি আর রঙিন কাগজ দিয়ে হাটতলার বটগাছটার নীচে মণ্ডপ বানিয়েছে। বেশ দেখতে লাগছে। রজনী ভাবে— সত্যি, এই বুড়ো বটগাছটা কতই না হর্ষ-বিষাদের সাক্ষী।
রঘুর চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে এইসবই দেখছিল সে। বাড়িতে পৌঁছতে না পৌঁছতেই কানাই ছুট লাগিয়েছিল হাটতলার দিকে। তাই কানাইয়ের বাড়িতে বসে এককাপ চা খেয়েই রজনীও এসে পৌঁছেছে এখানে। তবে রঘুর চায়ের দোকানের সামনে তার আসার দুটো কারণ আছে। প্রথমত সে জানতে এসেছে যে এখানকার কেউ কানাইয়ের কিডন্যাপ হওয়ার খবরটা জানে কি না। দু-চার জনের সঙ্গে কথা বলে সে নিশ্চিন্ত হয় যে কানাইয়ের ব্যাপারটা এখানে কেউ জানে না। অবশ্য কলকাতাতেও খবরের কাগজে ঘটনাটা ছাপেনি। আসলে এত কম সময়ের মধ্যে ঘটনাটা ঘটে গিয়েছিল যে হয়তো রিপোর্টাররা খবরটা পায়নি। আবার এমনও হতে পারে যে, তদন্তের স্বার্থে পুলিশও খবরটা প্রেসকে জানায়নি। সে যাকগে। পুলিশের কাজ পুলিশ করুক। তাতে তার মাথাব্যাথা নেই। আর দ্বিতীয়ত, সে ভালো করে বুঝে নিতে চায় যে পুলিশের ফেউ এখানেও তার পিছু নিয়েছে কি না। তাই সে চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আশেপাশের প্রতিটা লোককে জরিপ করে নিচ্ছে। এরপরে বেলা যত বাড়বে, লোকও ততো বাড়বে। বেলা আরেকটু বাড়লে গ্রামের বউ-ঝিরা আসবে। শীতলা মায়ের কাছে তাদের অনেকেরেই মানত থাকে। তাই তারা সারি বেঁধে হাটতলার পাশের পুকুরে ডুব দিয়ে ভিজে শাড়ির ওপরে গামছা জড়িয়ে দণ্ডি কাটতে কাটতে মায়ের থানে আসবে। গ্রামের সমর্থ ছেলেরা বালতি বালতি জল ঢেলে ঠান্ডা করে দেবে তাদের দণ্ডি কাটার পথ যাতে তপ্ত মাটির জ্বালা ওই দণ্ডি কাটা মহিলাদের পক্ষে কিছুটা সহনীয় হয়।
কিন্তু ওই ধুতি ফতুয়া পরা, মাথায় গামছা জড়ানো লোকটা কে? বাস রাস্তার ওপারে একটা গাছের তলায় বসে। পাশে শোওয়ানো তার লাঠি। বয়স হবে মধ্য চল্লিশ। তা এই গ্রামের সবাইকে তো রজনী চেনে। প্রতিটা পুরুষ ছাড়াও, প্রতিটা ভিখিরি, বাউল, আলখাল্লা পরা হাতে ধুনুচি আর চামর নেওয়া পীর, সব্বাই তার চেনা। তাহলে এ কে?
লোকটা একমনে বসে বিড়ি টানছে আর মাঝে মাঝে তাকিয়ে দেখছে রঘুর চায়ের দোকানের দিকে। রজনীর বুঝতে বাকি থাকে না যে লোকটা ফেউ। সে ঠিকই করে নেয় যে বাড়াবাড়ি করলে ফেউটাকে সে এমন দাওয়াই দেবে যে, সেটা যেন তার চিরকাল মনে থাকে। অবশ্য তার আগে নিশ্চিত হতে হবে যে ওই লোকটাই ফেউ।
—‘স্যার, স্যার, চাঁদা দাও।’ দৌড়ে এসেছে পল্টু, নেলো, পটাই, কানাই আর সব ছেলেরা।
—‘আরে দেব, দেব। নিশ্চয়ই দেব। তবে আমার একটা শর্ত আছে।’
—‘কী? কী?’ সমস্বরে সোরগোল করে ওঠে ছেলেরা।
—‘চাঁদা আমি দিতে পারি, যদি তোরা কাল সকালে প্র্যাকটিসে আসিস। কি রে, আসবি তো?’
—‘আসব, আসব। এখন চাঁদা দাও তো। আর আমরা তো মাঝেমাঝেই তোমার ওখানে প্র্যাকটিস করি।’ বলে ওঠে নেলো।
মানিব্যাগ থেকে এগারোটা টাকা বের করে দিতে দিতে রজনী বলে— ‘ঠিক আছে। তাহলে এই ক-দিনে তোদের কয়েকটা নতুন জিনিস শেখাব। সেইজন্যেই তোদের আসতে বলছি। আমি জানি, আমি না থাকাতে তোরা গা ঢিলে দিয়েছিস। এখন ছুটি আছে, আর তাই কাল থেকে রোজ সকালে বিকেলে প্র্যাকটিস চলবে টানা পনেরো দিন। এটা করতেই হবে। কি রে, রাজি তো?’
—‘হ্যাঁ স্যার, আসব, আসব।’ ছেলের দল কথা দেয়।
রজনী তখন পল্টু আর নেলোকে একধারে টেনে নিয়ে গিয়ে তাদের হাতে কিছু পয়সা দিয়ে কী যেন বলল। অন্যেরা তা শুনতে পেল না। এরা রজনীর বিশ্বস্ত সৈনিক— সেনবাড়ির ঘটনাতেই তার প্রমাণ রেখেছে এরা।
এরই ফাঁকে রজনী লক্ষ্য করে দেখেছে যে, সে যখন পল্টু আর নেলোর সঙ্গে একান্তে কথা বলছিল, তখন ওই মাথায় গামছা জড়ানো লাঠিহাতে লোকটা তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। তাই সে ভাবে— রাখুক গে নজর, মওকা পেলে ফেউটাকে সে বুঝিয়ে দেবে কত ধানে কত চাল। তাই ছেলের দল চলে যেতে সে সনাতন মুদির দোকান থেকে একসের ছোলা আর একহাঁড়ি এখোগুড় কিনে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিল। কাল সকালে ছেলেদের দিতে লাগবে যে।
বাড়ির পথে যেতে যেতে চোখে পড়ে গ্রামের একমাত্র হাইস্কুলটা। এই স্কুলেই সে একসময় পড়াশোনা করেছে। তার কতই না দুষ্টুমি সহ্য করেছে এই বাড়িটা। তখনও বাড়িটার অবস্থা ছিল মোটামুটি ভালো। অথচ আজ সেই বাড়িটারই কী করুণ হাল। একটা স্মৃতিমেদুরতা কাজ করে তার ভেতরে। তাই সে দাঁড়িয়ে পড়ে দেখতে থাকে স্কুলটাকে। পলেস্তারা খসে পড়া দেওয়ালগুলো দেখে মনে হয় যেন ওটা একটা হানাবাড়ি। দু-চারটে ভেঙে পড়া জানলার পাল্লার মধ্যে দিয়ে দেখা যাচ্ছে আলুথালু হয়ে থাকা ফাটাফাটা বেঞ্চগুলো।
নাঃ, স্কুলটার সংস্কার করা দরকার। কিন্তু করবে কে? এর পেছনে যে অনেক খরচা আছে। ইস্, সে যদি তার সুকুমার স্যারের মতো পয়সাওলা ঘরের ছেলে হত…। একটা চাপা হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে রজনী।
এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই সে পৌঁছে যায় তার বাড়িতে। বাড়ির সামনের ফাঁকা আখড়াটা এখন ভর দুপুরে বড়োই নিঃসঙ্গ। তবে আখড়ার মাটি দেখলেই বোঝা যায় যে কিছু ছেলে এখনও এখানে প্র্যাকটিস করে। কিন্তু শেখানোর লোক না থাকলে তারা আর এগোতে পারবে না। তবে যারা এখনও প্র্যাকটিস করছে, তারা নতুন কিছু না শিখলেও তাদের শরীরটা ফিট আছে। এটাই রজনীর সান্ত্বনা।
দাওয়ায় একটা নেড়ি কুকুর পরম নিশ্চিন্তে দিবানিদ্রা দিচ্ছিল। রজনীর পায়ের আওয়াজ পেয়েই সে দাওয়া থেকে নেমে দে ছুট।
ঘরের তালা খুলতেই একটা ভ্যাপসা গন্ধ এসে নাকে লাগল। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত হয়ে পড়ে থাকলে যা হয়। ভেতরে ঢুকে কাঁধের ব্যাগ আর চামড়ার স্যুটকেসটা নামিয়ে রাখে। তারপর থাবড়ে থাবড়ে বিছানার ধুলো ঝেড়ে বসে। এখন ঘরটা পরিষ্কার করতে হবে। মেলাই কাজ।
ঘণ্টাখানেক পরে ঘরটাকে ভদ্রস্থ করে চান সেরে নেয় রজনী। স্যুটকেস থেকে একপ্রস্থ ইস্ত্রি করা শার্ট-প্যান্ট পরে সেটাকে তালাবন্ধ করে চালান করে দেয় খাটের তলায়। ওটাতেই যে তার দাদুর প্যাঁটরাটা আছে। সময়মতো রাতের অন্ধকারে ওটার ব্যবস্থা করতে হবে। তবে এখন তাকে কানাইদের বাড়িতে যেতে হবে। কানাইয়ের মায়ের অনুরোধে এই ক-দিন তাকে কানাইদের বাড়িতেই দু-বেলা খেতে হবে। তাই কাল কিছু বাজারও করে নিয়ে যেতে হবে। না, আর দেরি করে লাভ নেই। কানাইয়ের মা নিশ্চয়ই তার জন্যে অপেক্ষা করে বসে আছে। তাই জামাকাপড় পরে কাঁধের ঝোলা ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল সে। পথে যেতে যেতে কিন্তু সেই মাথায় গামছা বাঁধা লোকটাকে দেখতে পেল না সে। হয়তো বা হাটতলার কাছে কোনো হোটেলে খেতে গেছে। ফেউ বলে কি তার খিদে-তেষ্টা নেই?
ভাত খেতে খেতে একফাঁকে একা পেয়ে কানাইকে জিজ্ঞেস করে রজনী— ‘হ্যাঁরে, ওই কথাটা কাউকে বলিসনি তো?’
—‘না, না। তাহলে আর কলকাতায় ফেরা হবে না।’
—‘বন্ধুদের কাউকে?’
—‘উঁহু। না।’
কানাই বুঝে গেছে কোন কথাটা বলতে হয় আর কোনটা নয়। গ্রামে আসার পথে রজনী তাকে পইপই করে বলে দিয়েছিল হস্টেলে থাকার কথা আর তার কিডন্যাপ হওয়ার কথাটা কাউকে না বলতে। তখনই কানাই বুঝে গিয়েছিল তার কলকাতার জীবনের কতটুকু এখানে বলতে হবে আর কতটুকু নয়।
.
পরেরদিন সকালে নিজের প্র্যাকটিস সেরে আখড়ার মাটিটা পরীক্ষা করছিল রজনী। এমনসময় হই হই করে এসে পড়ল ছেলের দল। নিজেরাই পাশের ঘরটা থেকে ম্যাটটা বের করে পেতে দিল আখড়ার মাটিতে আর তারপরে রজনীর রাখা ভিজে ছোলা আর গুড় খেয়ে রুটিনমাফিক দৌড় শুরু করল আখড়ার চারপাশে ঘুরে ঘুরে। রজনী তার অভ্যেস মতো দাওয়ায় হেলান দিয়ে দেখতে লাগল তাদের। সংখ্যায় কমে গেছে ছেলেরা। এটাই স্বাভাবিক। কানাইয়ের ব্যাপারে তার দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে অনেক ছেলেই হয়তো আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। তাই সে ঠিক করে যারা আসেনি, এই ক-দিন তাদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে কথা বলবে তাদের সঙ্গে আর সেইসঙ্গে রঘুদাকে বলে একটা লোক ঠিক করতে হবে যাতে এই ক-দিন দুপুরে সেই লোকটা এসে খিচুড়ি রেঁধে দিয়ে যায়। তাহলে এই ক-দিন না হয় সে দুপুরবেলা কানাইদের বাড়িতে খাবে না। তাতে কানাইয়ের মায়ের ধকলটাও কমবে।
এইসব কথা ভাবতে ভাবতেই তার চোখ চলে যায় গজ তিরিশেক দূরে বাসরাস্তার দিকে। সেখান থেকে তার এই আখড়া আর বাড়িটা দেখা যায়। কিন্তু বাসরাস্তার ধারের কলাগাছ আর ছোটো ছোটো খেজুর ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে ওটা কে? মাথার গামছা আর সাদা ফতুয়ার খানিকটা উঁকি মারছে ঝোপের আড়াল থেকে। রজনীর বুঝতে বাকি থাকে না যে লোকটা হল সেইই ফেউটা। কিন্তু কাল রাতে লোকটা ছিল কোথায়? এই গ্রামেরই কোনো লোকের বাড়িতে, নাকি হাটতলায় শুয়ে থাকা অনেক মুটে-মজুরের দলে মিশে রাত কাটিয়েছে? যাইহোক না কেন, সে বেশ বুঝতে পারছে যে তার গতিবিধির ওপরে নজর রয়েছে পুলিশের। তার অনুমান একেবারে সত্যি।
—‘স্যার, আমরা রেডি।’ ছেলেরা দৌড় শেষ করে তাকে ডাকছে তালিম দেবার জন্যে।
.
সেদিন সন্ধে হবার পরে পল্টু আর নেলো আসে রজনীর বাড়িতে। রজনী তাদের জিজ্ঞেস করে— ‘হ্যাঁরে, লোকটাকে দেখলি?’
পল্টু বলল— ‘হ্যাঁ স্যার, দেখেছি। লোকটা হাটতলায় রঘুকাকার দোকানে চা খাচ্ছিল। কিন্তু লোকটা কেন আপনাকে নজরে রাখছে স্যার?’
রজনী জানত যে এই প্রশ্নের মুখোমুখি তাকে হতে হবে। তাই সে বলে— ‘বাড়িটা তো আমার একটেরে, বুঝলি। গ্রামের বাইরেই বলা যেতে পারে। এতদিন তো ঘরে কেউ ছিল না। এখন আমি মালপত্র নিয়ে ঢুকেছি। তা ছাড়া ঘরে তো কিছু কাঁসার বাসনপত্রও আছে, তাই মনে হয়, লোকটা মাল হাতানোর প্ল্যান করেছে। তবে আমিও কম যাই না। আজ ভেবে রেখেছি যে, বাবাজীবনকে এমন শাস্তি দেব যে আর যেন ও এ মুখো না হয়। তা হ্যাঁ রে, মালটা এনেছিস তো?’
—‘হ্যাঁ স্যার, হ্যাঁ স্যার। আজ ব্যাটাকে বুঝিয়ে দেব।’ অতি উৎসাহে বলে পল্টু।
—‘দাঁড়া, আর একটু অন্ধকার হোক। লোকটা মনে হয় আরও কাছে আসবে। তখনই ওকে দাওয়াই দিতে হবে। এখন আয়, সবাই মিলে বসে একটু মুড়ি খাওয়া যাক।’
তিনজনে মিলে একটা কাঁসার থালায় মুড়ি নিয়ে দাওয়ায় বসে। পাশে রাখা আছে লন্ঠন। তারই আলোয় চলছে গল্প। আজকে রাতে গ্রামের লোকেরা মিলে নাকি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘সাজাহান’ নাটকের অভিনয় করবে হাটতলায়। তিনদিক খোলা মঞ্চে অভিনয় হবে। শাজাহান সাজবেন স্কুলের একদা হেডমাস্টারমশায় আর বর্তমানের স্কুল কমিটির প্রেসিডেন্ট ঈষৎ ভারী চেহারার হেদায়েত মোল্লা সাহেব। গত দেড়মাস ধরে নাকি শশাঙ্ক চাটুজ্জের বাড়িতে রোজ সন্ধেবেলা জোরকদমে রিহার্সাল দেওয়া হয়েছে। আজ তারই ফাইনাল পরীক্ষা। গ্রামের সবাই দেখতে যাবে সেই নাটক।
এদিকে আখড়ায় এখন চলছে জোনাকিদের স্বপ্নউড়ান। তারই মাঝে নিঃস্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে বাসরাস্তা দিয়ে একটা বাস চলে গেল। তার হেডলাইটের আলো পথটাকে একঝলক আলো মাখিয়ে দিয়ে আবার মিলিয়ে গেল দূরে। ঠিক এমন সময় বাসরাস্তা থেকে দু-ধারে গাছপালা ঢাকা যে সরু পথটা রজনীর বাড়ির দিকে এসেছে সেটাতে একটা টর্চের আলো একবার জ্বলেই নিভে গেল। রজনী, পল্টু, নেলো, সবাই দেখেছে সেই আলো। নেলো ফিসফিস করে বললে— ‘স্যার, মনে হয় লোকটা বাড়ির দিকেই আসছে।’
রজনীও চাপা গলায় বললে— ‘হ্যাঁ, মনে হচ্ছে ঠিকই বলেছিস। যা তো, দৌড়ে গিয়ে ব্যাটাকে জাপটে ধর। তবে সাবধান, লোকটার কাছে যদি কোনো অস্ত্র থাকে, তাহলে কিক চালাবি। নইলে গায়ে একদম হাত তুলবি না। আর সঙ্গে আমার টর্চটা নিয়ে যা। আমি তোদের পেছনে আসছি।’
তার মুখের কথা খসতে না খসতেই পল্টু আর নেলো দাওয়া থেকে নেমে দে দৌড়। রজনীও ছুটল তাদের পেছনে। তারপরেই পল্টুর গলা—‘ব্যাটা চুরির মতলবে এখানে দেখতে আসা না?’ ততক্ষণে রজনীও হাজির হয়ে গেছে সেখানে। নেলোর হাত থেকে টর্চটা নিয়ে লোকটার মুখে ফেলে সে বলল— ‘এই, তুই এখানে কি করছিস রে? তুই তো এগাঁয়ের লোক নোস বাপ। নিশ্চয়ই চুরির ধান্দায় এখানে এসেছিস?’
লোকটা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু পাছে সে বিপাকে পড়ে সত্যি কথাটা বলে ফেলে তাই রজনী তার মুখটা চেপে ধরে বলল— ‘পল্টু, দে শিশিটা ওর মাথায় উপুড় করে। ব্যাটা বুঝুক যে কোথায় ও খেপ মারতে এসেছিল।’
ব্যাস, আর যায় কোথা। নেলো লোকটার মাথা থেকে গামছাটা টেনে খুলে নিতেই পল্টু পকেট থেকে একটা শিশি বের করে উপুড় করে দিল লোকটার মাথায়। গড়িয়ে পড়া আলতায় লোকটার মাথা, মুখ আর সাদা ফতুয়া ভিজে একেবারে লাল হয়ে গেল। লোকটা দু-হাত দিয়ে মুখটা মুছতে যেতেই রজনী নেলোর হাত থেকে গামছাটা নিয়ে লোকটাকে দিয়ে বলল— ‘নে ব্যাটা, এটা দিয়ে মুখটা মুছে নে, নইলে বাড়ি গেলে তোর বউও তোকে চোর ভেবে লোক ডেকে পিটুনি খাওয়াবে।’ লোকটা গামছা দিয়ে মুখ মুছতেই সেটাও লালে লাল হয়ে গেল। তাই দেখে পল্টু বলে উঠল— ‘আরিব্বাস, এ যে এক্কেবারে লালমুখো বাঁদর মাইরি।’ সবাই হেসে উঠল হো-হো করে আর সেইফাঁকে লোকটা দৌড় লাগাল ফিরতি পথে।
এদিকে নাটক শুরুর আগের ক্ল্যারিওনেট, হারমোনিয়াম, খোল, ঢোল আর করতালের জগঝম্প শুরু হয়ে গেছে। তাই শুনে ছেলেরা উতলা। তারা এখুনি হাটতলায় যেতে চায়। তাই রজনীকে বলল— ‘আপনি নাটক দেখতে যাবেন না স্যার?’
—‘যাব না আবার? অমন নাটক কি আর ছাড়া যায় রে, আর তার ওপরে দেখতে হবে হেদায়েত স্যারের পার্ট। দারুণ পার্ট করেন কিন্তু। ঠিক আছে, তাহলে তোরা এগো। আমি চানটান সেরে জিনিসপত্র সব গুছিয়ে, ঘরে তালা দিয়ে আসছি। ওঃ, যা খেল দেখালি তোরা আজ। সাব্বাশ।’ বলে হেসে ওঠে রজনী।
পল্টু আর নেলো চলে যেতেই রজনী ঘরে ঢুকে চটপট স্যুটকেস খুলে তার থেকে দাদুর প্যাঁটরাটা বের করে নেয়। তারপরে দরজায় তালা লাগিয়ে সটান হাঁটা লাগায় নদীচরের ওপারের জঙ্গলের দিকে। সেই অর্জুন গাছটার তলায় তাকে যে আবার ফিরিয়ে দিতে হবে তার দাদুর প্যাঁটরা।
.
—‘আসতে পারি দারোগাবাবু?’ সম্বোধনটা শুনেই কিঞ্চিত বিরক্ত হন কমল স্যানাল। কলকাতায় এইভাবে কেউ ওসি কে ডাকে না। তবু বিরক্তি চেপে রেখে বলেন— ‘হ্যাঁ, ভেতরে আসুন। বসুন।’
—‘তা কী ব্যাপারে আবার ডেকে পাঠালেন, যদি বলেন।… আসলে আপনাকে সাহায্য করতে পারলে খুশিই হব।’
—‘গ্রামে কেমন ছুটি এনজয় করলেন বলুন?’
—‘ভালোই। বেশ ভালোই। এই তো সবে দু-দিন হল জয়েন করেছি।’ রজনী বুঝতে পারে যে ওসি মূল কথায় আসার আগে ভূমিকা করছেন।
—‘ও। তা দিনেশ কি গ্রামে ফিরেছে?’
—‘না। পুলিশ থেকে যেভাবে ওর ছবি চারিদিকে ছড়ানো হয়েছে, তাতে ও গ্রামে ফিরলে গ্রামেরই কেউ না কেউ লোকাল থানায় নিশ্চয়ই খবর দিত।’
ইতিমধ্যে ওসি কমল সান্যাল তাঁর ডান দিকের ড্রয়ার খুলে ভেতরে হাত ঢুকিয়ে কী যেন একটা কিছু করলেন আর তারপর বের করে আনলেন একটা টিনের কৌটো। তাতে কালো রঙের কী যেন একটা পদার্থ। সেটা রজনীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন— ‘এটা কি বলতে পারেন? ভালো করে হাতে নিয়ে দেখুন তো।’
রজনী বুঝতেই পেরে গেছে দারোগার চাল। বহুরূপীদের গায়ে মাখার কালো রং এটা। আর সেইসঙ্গে দারোগা ওই কৌটোর গায়ে তার আঙুলের ছাপও নিতে চাইছেন। রজনীর তাতে কোনো আপত্তি নেই। নেলপালিশের গুণে কোথাও সে তার আঙুলের ছাপ ছেড়ে আসেনি। তবু যে কেন দারোগা এটা করছেন সে ভেবে পেল না। তাই সে স্বাভাবিক ভাবেই কৌটোটা নিল দারোগার হাত থেকে। তারপরে ভালো করে দেখে বলল— ‘এটা কি জুতোর কালি? নাঃ, কই সেরকম ঝাঁঝালো গন্ধ তো পাচ্ছি না।’ তারপরে ওসি-র মুখের দিকে তাকিয়ে বলল— ‘কি বলুন তো এটা? ছাপাখানার কালি কি? নাকি পোস্টঅফিসের চিঠিতে ছাপ্পা দেওয়ার কালি?’
—‘চিনতে পারলেন না?’
—‘দেখুন, আমি জুতোর পালিশ চিনি। এটা কিন্তু সেই কালি নয়। আর আমি ছাপাখানা বা পোস্টঅফিসে কাজও করি না। তাই এই জিনিসটা আমার চেনার কথা নয়।’ বলে সে কৌটোটা ফেরত দিয়ে দেয় দারোগাকে।
—‘এটা হল গায়ে মাখার কালি।’
—‘গায়ে মাখার কালি? সেটা কী রকম ব্যাপার?’ রজনী নিঁখুত অভিনয় করে।
—‘এটা গায়ে মেখে যাত্রায় কালি সাজা হয়। আপনাদের গ্রামের বিষ্টুচরণ কালি সাজতে এই রঙটাই ব্যবহার করত।’
—‘ও, তাই বলুন। তা আপনি এটা আমাকে দেখিয়ে কী জানতে চাইছেন বা কি প্রমাণ করতে চাইছেন?’ রজনী দৃঢ় স্বরে বলে।
—‘না না, তেমন কিছু নয়। যাকগে, ছাড়ুন ওসব কথা। তা আপনি যখন গ্রামে ছিলেন, তখন কি কোনো বিশেষ ঘটনা ঘটেছিল?’
—‘হ্যাঁ। তা ঘটেছিল বটে। এক নম্বর, শীতলা পুজো হয়েছিল। দু-নম্বর, শীতলা পুজোর দিন রাত্তিরে গ্রামের লোকেরা মিলে একটা নাটক অভিনয় করেছিল আর তিন নম্বর হল ওইদিন সন্ধের মুখে আমার বাড়িতে কেউ একজন অচেনা লোক চুরির চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সে আমার দুই ছাত্র আর আমার হাতে ধরা পড়ে যায়।’
বিস্মিত কমল দারোগা বলেন— ‘তা তাকে তখন ধরে আপনারা উত্তম-মধ্যম দিয়েছিলেন?’
—‘না, গায়ে হাত তুলিনি। তবে যে শাস্তিটা তাকে দিয়েছিলাম, সেটা সে জীবনে কখনো ভুলবে না।’
—‘কী, কী, শাস্তি দিয়েছিলেন শুনি?’ আগ্রহী হয়ে ওঠেন দারোগা। রজনী বোঝে, সব জেনেও না জানার ভান করছেন দারোগা।
তাই হাসতে হাসতে সে বলে— ‘তেমন কিছুই না। শুধু ঘরে থাকা আলতা দিয়ে গরমকালের সন্ধেবেলা গা ধুইয়ে দিয়েছিলাম ব্যাটার।’
ওসি কমল সান্যাল এই স্বীকারোক্তি শুনে শুধু একটু কাষ্ঠহাসি হাসলেন। আসলে মনের রাগ মনে চেপে রেখে হাসতে হয় তাই হাসলেন। উনি ভালোই বুঝে গেলেন যে রজনীকান্ত রায় কতখানি ধূর্ত যে তাঁর লাগানো চরের স্বরূপ তার কাছে ধরা পড়ে গেছে। তাই আর তাকে ঘাঁটাতে চাইলেন না। শুধু মুখে বললেন— ‘আপনি এখন আসতে পারেন মিস্টার রায়।’
অবশ্য এর পরেও আরও মাস দুয়েক ফেউ লাগিয়ে রেখেছিলেন রজনীর পেছনে, তবে বিশেষ কিছু না পেয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন শেষে।
