বড়োদিনের গভীর রাত, ১৯৪৪ – জিঙ্গল বেলস, ফিফথ সিম্ফনি আর পিটারের কনফেশন
বাইরে রাস্তার ধারে কয়েকটা গাড়ি পার্ক করা। পিটারের বাড়ির লনেও বেশ কিছু লোক জমা হয়েছে। বন্ধুবান্ধব আর তার কলকাতাবাসী আত্মীয়স্বজন। লনে একটা ছোটো ক্রিসমাস ট্রি লাগানো। তাতে লাগানো রঙিন ইলেকট্রিক বাল্ব শীতের হাওয়ায় মৃদু মৃদু দুলছে। গাছে ঝোলানো জরির গুঁড়ো মাখা তারায় আর রঙিন বলে তাদের আলো চিকমিকিয়ে উঠছে। ক্রিসমাস ট্রির পাশে রাখা লম্বা ডাইনিং টেবিল। সাদা কাপড়ে ঢাকা। তার ওপরে একপাশে রাখা নানান রকমের খাবার— কেক, প্যাস্ট্রি, প্লেট, ফর্ক আর চামচ। আর আরেকদিকে গবলেট আর নানান ধরণের বিদেশি মদের বোতল।
বাড়ির বাইরের গেট আর ড্রয়িংরুমের দরজা আজ হাট করে খোলা। ড্রয়িংরুমের একধারে রাখা একটা চেঞ্জার আর তারপাশেই পিটারের পিয়ানো। পিটার ক্ল্যাসিকাল ওয়েস্টাৰ্ন সিম্ফনি শুনতে ভালোবাসে; যদিও অন্য ধারার গানেও তার আপত্তি নেই। সেই সিম্ফনিরই একটা বাজছে চেঞ্জারে। সুরের লহরি ভেসে বেড়াচ্ছে ঘরময়। দরজা দিয়ে বেরিয়ে সেই সুর শীতের হাওয়ায় ভর করে পৌঁছে যাচ্ছে লনে; ক্রিসমাস ট্রির পাশ দিয়ে গিয়ে তা ছুঁয়ে যাচ্ছে উপস্থিত অতিথিদের হৃদয়।
ড্রয়িংরুমের ভেতরে একেবারে ডানদিকে একটা টেবিল। তার ওপরে সাদা লেসের টেবিলক্লথ। এটাই বেদি। মেঝের ওপরে বেদি পর্যন্ত কয়েকগজ লাল কার্পেট পাতা। টেবিলের দু-দিকে দুটো ফুলদানিতে সাজানো ফুল আর মাঝখানে একটা ভারী ব্রোঞ্জের তিনমাথাওয়ালা ক্যান্ডেল স্ট্যান্ডে জ্বলছে তিনটে মোটা সুগন্ধি মোমবাতি। একপাশে রাখা সবুজ মলাটের বাইবেল আর দেওয়ালে আটকানো ক্রুশবিদ্ধ যিশু আর মা মেরির পোর্সেলিনের মূর্তি। তার আরেকটু ওপরে মূর্তিদুটোর মাঝখানে ঝুলছে একটা প্রায় একহাত লম্বা ক্রুশকাঠ। বেদির চারপাশ জুড়ে খিলানের মতো করে লাগানো নানান রঙের ছোটো ছোটো বিজলিবাতি। আপাত সাধারণ কিন্তু মহিমাময়। আজ যে সেই জেরুসালেমের মহান পুরুষের জন্মদিন। তাই আজ খাওয়া দাওয়া, হাসি-হুল্লোড়ে আসর জমজমাট। অনেক রাত পর্যন্ত ফূর্তি হচ্ছে আজ। সানন্দে পালন করা হচ্ছে মহামানবের আগমণ।
পিটার একহাতে পানীয়ের গবলেট আর অন্যহাতে জ্বলন্ত সিগারেট নিয়ে কথা বলছে কখনো একজনের সঙ্গে তারপর আবার অন্যজনের সঙ্গে। ছোটো ছোটো বাচ্চাগুলো তো ক্রিসমাস গিফট পেয়ে খুব খুশি। পিটার তাদের সঙ্গে মজার মজার কথা বলছে আর তারা হেসে উঠলে আঙুল দিয়ে তাদের মাথার চুল ঘেঁটে দিয়ে হো-হো করে হেসে উঠছে।
রাত প্রায় একটা বাজে। এখানে সেলফ সার্ভিস। তাই অতিথিরা অনেকেই প্লেটে খাবার তুলে নিয়েছে। খেতে খেতেই সবাই মনে হয় পিটারকে কিছু বলল। সিগারেটটা নিভিয়ে দিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকে গেল সে। ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসা সিম্ফনির সুর বন্ধ হয়ে গেল। একহাতে গবলেট আর অন্যহাতে গিটার নিয়ে লনে বেরিয়ে এল পিটার। একজনের এগিয়ে দেওয়া হাতলছাড়া চেয়ারে বসে গবলেটের পানীয়তে একটা চুমুক মারল। তারপর গবলেটটা টেবিলে নামিয়ে রেখে হাতে গিটার তুলে নিয়ে গান ধরলে—
Dashing through the snow
In a one horse open sleigh
Over the fields we go,
laughing all the way.
Bells on bob tail ring
making spirits bright
What fun is to ride and sing
A sleighing song tonight…
খেতে খেতেই প্লেটে ফর্ক ঠুকতে ঠুকতে এরপরে সবাই একসঙ্গে সুর জুড়লো—
Jingle bells, jingle bells,
Jingle all the way…
Oh! what fun is to ride
In a one horse open sleigh…
পুরোটাই একেবারে নিখুঁত আর নির্ভুল গাইল পিটার। মদ্যপান করলেও সুর কখনো তার কাছ থেকে দূরে সরে যায় না। সে যেন সুরের বরপুত্র। তারপরে গানটা শেষ করে গবলেট তুলে এক চুমুকে শেষ করে দিল সে বাকি পানীয়টা।
অতিথিদের খাওয়া দাওয়া প্রায় শেষের মুখে। সে ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে টেবিলে রাখা তার সিগারেটের কৌটো থেকে একটা নিয়ে ধরিয়ে ফিরে এসে আবার চেয়ারে বসে।
একটু পরেই অতিথিদের খাওয়া শেষ হয়। ডাইনিং টেবিলের একপাশে এঁটো প্লেট সাফ করছে দু-জন বেয়ারা। এই কাজটা হলেই তারা চলে যাবে। সায়েব বাবুদের ফুরতির সময় তাদের থাকা মানা। এদিকে ভালোমন্দ খেয়ে তৃপ্ত অতিথিরা। মহামানবের জন্মদিনের আনন্দের আশ্লেষে তারা আজ রোমান্টিক। সবকিছুই ভালো লাগছে তাদের— এই আতিথেয়তা, শীতের আমেজ আর তার সঙ্গে পানীয়ের মোহময় আবেশ। তারা এসে পিটারকে অনুরোধ করে আর একটা গান গাইতে যাতে তারা যুগলে নাচতে পারে। পিটারও ফেলতে পারে না তাদের অনুরোধ। তাই এবারে উঠে দাঁড়াল সে। সিগারেটে পরপর কয়েকটা টান মেরে সেটা হাতে নিয়ে ঈষৎ স্খলিত পায়ে ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে যায়, যেখানে রাখা তার পিয়ানো। পাশের টুলের ওপরে অ্যাশট্রেতে রাখে সিগারেটটা।
তারপরে শুরু করে রবার্ট বার্ণেসের লেখা একটা স্কটিশ গান—
Ye banks and braes o’ bonnie Doon
How can ye bloom sae fresh and fair?
How can ye chaunt, ye little birds,
And I sae weary, fu’ o’ care.
এরপরেই তার ভাঙা ভাঙা বাংলায় পিটার যোগ করে—
ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে বহে কি বা মৃদু বায়
তটিনী হিল্লোল তুলে কল্লোলে বহিয়া যায়।
Ye’ll break my heart, ye warbling birds
That wanton o’ver the flowerin’ thorn,
Ye mind me o’ departed joys,
Departed, never to return…..
ছোটোবেলায় তার মায়ের কাছে পিটার এই গান শুনেছে, তারপরে শিখেছে। এইগানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার কত দুঃখ-সুখের স্মৃতি। সেইসব মনে আসছে আজ। তাই গভীর তন্ময়তায় সে গেয়ে চলে গানটা; সঙ্গে সুর মেলাচ্ছে তার পিয়ানো। সত্যিই পিটারের এদিকে ড্রয়িংরুমের টেবিলের পাশে হাতে হাত ধরে পাক মেরে মেরে নেচে চলেছে খুদেরা আর পাশের ফাঁকা জায়গায় জোড়ায় জোড়ায় একে অন্যের কাঁধে হাত রেখে নেচে চলেছে মহিলা আর পুরুষেরা। তারা কেউবা নাচছে স্ত্রী-র হাত ধরে, কেউবা বাগদত্তার আবার কেউবা তার সদ্য ভালোলাগা মেয়েটার সাথে।
পিটার চোখবুজে এই বন্ধনের গান আজ নিবেদন করছে সমবেত সকলকে; এমনকী সেই পরমপুরুষকেও যিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন মৈত্রীর বাণী, শান্তির বাণী। এখন সে যেন যিশুর প্রথম ভক্ত সেন্ট পিটার। তাই এমন স্বর্গীয় আনন্দসুর বেরোচ্ছে তার গলা থেকে।
একসময় গান শেষ হয়। পিয়ানোর পাশের টুলের ওপরে অ্যাশট্রেতে রাখা সিগারেটটা তুলতে গিয়ে দেখে যে নিভে গেছে সেটা। সুরের স্নিগ্ধ আর্দ্রতা বুঝি নিভিয়ে দিয়েছে তার যন্ত্রণার আগুন।
.
এখন রাত প্রায় আড়াইটে। একে একে বিদায় নিচ্ছে অতিথিরা। পিটার এসে দাঁড়িয়েছে বাইরের গেটের মুখে। পুরুষেরা তাকে আলিঙ্গন করে ভালোবাসা জানাচ্ছে আর মহিলারা হ্যান্ডশেক করে গিয়ে বসছে তাদের গাড়িতে।
কুয়াশায় ঢাকা ম্লান আলোর পথ ধরে একে একে শেষ গাড়িটাও চলে গেল। গেটটা বন্ধ করে পিটার এগিয়ে যায় ড্রয়িংরুমের দিকে। ভেতরে ঢুকে একটা গবলেটে খানিকটা পানীয় ঢালে সে। বোতলের মুখ বন্ধ করে টেবিলের ওপরে রাখতে গিয়েই তার হঠাৎ মনে হল ছাদের দরজায় যেন একটা আওয়াজ হল। পানীয়তে একটা চুমুক মেরে, গবলেটটা টেবিলে রেখে দু-তিন ধাপ সিঁড়িতে উঠে বুঝতে চেষ্টা করে ছাদে কেউ আছে কিনা। কেউ যে ওপরে নেই সেটা নিশ্চিত হয়ে সে নামতে যাচ্ছে, এমন সময় হঠাৎই ড্রয়িংরুমের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু বন্ধ দরজার সামনে কে ও? ভুল দেখছে না তো সে? চোখ কচলে আবার দেখে। মনে হচ্ছে ওখানে কেউ একজন দাঁড়িয়ে।
হ্যাঁ, ঠিকই দেখেছে পিটার। তার ড্রয়িংরুমের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে হাতে পায়ে কাপড় জড়ানো, কালো হাফপ্যান্ট আর চোখে গোল ঠুলির মতো চশমা পরা এক কালো মূর্তি। তার কাঁধ থেকে কোমর পর্যন্ত জড়ানো একটা ল্যাসো, কোমরে গোঁজা রিভলভার আর একটা বুমেরাং। আর আজ কী যেন একটা অন্যরকম গন্ধ পাচ্ছে সে। গন্ধটা কেমন যেন স্পিরিটের গন্ধের মতো মিষ্টি।
মদের ঘোরেও চমকে ওঠে সে। এই লোকটাই তো ক-দিন আগে এসেছিল তার ঘরে। বেদম মেরে লুঠ করেছিল তার মানিব্যাগ আর রিভলভার। লোকটা আজ আবার না মারধর করে। কিন্তু সেদিন স্পিরিটের এই গন্ধটা তো ছিল না। আজ কি তাহলে লোকটা স্পিরিট ঢেলে জ্বালিয়ে দেবে সব? তাই ভয়েই সে একটু জড়ানো গলায় চেঁচিয়ে বলে— ‘Who are you? W… Why are you here again? What d…do you want from me?’
আগন্তুক লোকটা কোমরে গোঁজা রিভলভার বের করে তার দিকে তাক করে বলে— ‘Don’t shout. I am the messenger of the devil.’
—‘But a few days ago you robbed my house, bastard.’ পিটারের স্বর খানিকটা উচ্চগ্রামে।
—‘Yes, I did. But now I have come not to rob, but for your answers on some matters.’
—‘On what matters? I don’t want to talk to you on any matter.’ একটু জোরেই বলে উঠল পিটার। তার এই ঔদ্ধত্য সহ্য হল না আগন্তুকের। একহাতেই সে পিটারের বাঁ-হাতটা মুচড়ে ধরল পেছনে আর সেইসঙ্গে একটা হাঁটুর গুঁতো মেরে তার কানের পাশে হিসহিসিয়ে উঠল— ‘Keep quiet you bloody swine and do what I say.’
—‘What to do?’ ভয় পেয়ে গেছে পিটার।
—‘Put a few disk on your changer. Don’t you know, devil’s messenger also likes symphonies?’ বিদ্রূপ ঝরে পড়ে আগন্তুকের গলায়।
নিতান্ত অনুগতের মতো পিটার এগিয়ে গেল চেঞ্জারের দিকে। আগের বারের অভিজ্ঞতা থেকে সে জেনেছে এই কালো মূর্তি কতটা নৃশংস হতে পারে। তাই দু-চারটে সিম্ফনির ইম্পোর্টেড লং প্লেয়িং রেকর্ড নিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে চেঞ্জারে চাপায় সে। তারপর সুইচ টিপে দিয়ে এসে দাঁড়ায় কালো মূর্তির সামনে।
‘খুট’ করে একটা আওয়াজ আর তারপরেই সারা ঘরে গমগম করতে থাকে বেঠোভেনের ফিফথ সিম্ফনি। যেন কোনো শিকারি ঈগল ডানা মেলে উড়ছে ঘরময়।
—‘Now tell me what was in those soap packets?’
—‘Which packets are you talking about? I don’t know. Really I don’t know anything.’ পিটার চেষ্টা করে আগন্তুককে ঠেকানোর।
—‘Tell me Peter, what was in those packets of the kid who was shot dead by the O.C.’ কালো মূর্তির স্বরে নির্মমতা স্পষ্ট। সে বুঝেছে, এবারে আর মায়াদয়া নয়। পিটারের কাছ থেকে কথা বের করতে গেলে তাকে নির্মম হতেই হবে। তাই আবার পিটারের বাঁ-হাতটা পেছনে মুচড়ে ধরল সে। ‘কট’ করে একটা আওয়াজ। ‘Oh my God’ বলে হাতের কবজি ধরে নুয়ে পড়ল পিটার। তার হাতের কড়ে আঙুলটা ভেঙে দিয়েছে কালো মূর্তি। কিন্তু তার কাতরানির আওয়াজ চাপা পড়ে যায় সিম্ফনির শব্দে।
ককিয়ে উঠে সে কোনোরকমে বলে— ‘Co…Co…Cocaine.’
—‘Humm, now you have come to the track. Well, go to your writing table and take out your official writing pad.’
পিটার কোনোরকমে গিয়ে বসে তার রাইটিং টেবিলে। কাঁপা কাঁপা ডান হাতে বের করে তার অফিসিয়াল প্যাড আর কলম।
—‘Write what was in those packets.’
পিটার লিখতে চায় না। ইতঃস্তত করে। তার দেরি দেখে আগন্তুক রিভলভারের বাঁট দিয়ে তার ঘাড়ের নীচে আঘাত করে। পিটারের চাপা আর্তনাদ ঢাকা পড়ে যায় সিম্ফনির উচ্চগ্রামের আওয়াজে। এখানে তাকে সাহায্য করার কেউ নেই। তাই সে বাধ্য হয়েই লিখতে থাকে।
বাক্যটা লেখা শেষ হতেই আগন্তুক জিজ্ঞেস করে— ‘Who arranged the killing of the kid?’
—‘Not me. O.C of the local P.S killed him.’
—‘How did he know that the kid was a carrier unless he was informed earlier by someone?’
—‘That I don’t know.’
পিটার ভাঙবে, তবু মচকাবে না। তাই আবার একটা ‘কট’ করে হালকা শব্দ। ভাঙল এবার বাঁ-হাতের অনামিকাটা। গুঙিয়ে উঠে পেছনদিকে ধনুকের মতো বেঁকে যায় পিটার। বুঝতেই পারে— নাঃ, এ তাকে আজ ছাড়বে না। যন্ত্রণায় তার মুখ থেকে কথা বেরোয় না।
আগন্তুক কঠিন গলায় বলতে থাকে— ‘Tell me the truth Peter. I know your car was waiting at the very next bend so that you can come to the spot as soon as the murder is committed. Isn’t it?’
—‘Oh…Oh…Yes. I had informed the O.C earlier. He chased the kid and shot him. I expected two shots— one from O.C and the other from that kid. But when I heard the third sound, I felt there was something unusal.’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলে পিটার। তারপর আবার শুরু করে— ‘So I rushed to the spot with Karim. But believe me, I’m still cofused. I don’t know who shot the constable.’
—‘You will get that answer in time. But right now, you put your words on paper. Confess that you had planned the murder of that kid and that was for your double profit, you greedy bastard.’
পিটারকে চুপ করে বসে থাকতে দেখে আবার হাতের রিভলভারের খোঁচা মেরে কালো মূর্তি বলে— ‘Write that. Quick.’ পিটার বাধ্য হয়েই অনুগত ভৃত্যের মতো লিখতে থাকে। কালো মূর্তির এই অত্যাচার ক্রমশ আর সহ্য করতে পারছে না সে। কখন যে এ তাকে মুক্তি দেবে?…
লেখা শেষ হয়ে গেলে ঠান্ডা গলায় অর্ডার আসে— ‘Now tell me Pit, where is Shyamadas?’
নামটা শুনেই এত যন্ত্রণার মধ্যেও চমকে ওঠে পিটার। দিন চারেক আগে চাঁপাডাঙা থেকে পালিয়ে আসার পরে পিটারই তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে; কাছাকাছিই একটা মেসের মতো বাড়িতে তার থাকার ব্যবস্থা করে দেয়, যাতে নাকি তারা আবার নতুন করে রাকেট গড়ে তুলতে পারে। তখনই শ্যামাদাসের মুখে সে শুনেছে রজনীকান্ত বলে একজনের নাম, যে একাই ধ্বংস করে দিয়েছে তাদের রাকেটের একটা ঠেক। তাই আগন্তুকের মুখে শ্যামার নাম শুনে বিস্ময়ে তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে— ‘You Rajonikant?… Oh my God. You have reached even here?’
—‘Yes, You are right. I am that Rajonikanto Roy. Now tell me where is Shyama?’
—‘He lives at 47 Kid Street.’
—‘Well write it down and don’t try to fool me. Write.’ ভয়ে আর মারে বিধ্বস্ত পিটার প্যাডের কাগজে লিখতে থাকে শ্যামাদাসের ঠিকানা। কোনোরকমে সঠিক ঠিকানাটা লেখে সে। এখন সে চাইছে এই কালো মূর্তির হাত থেকে কোনোভাবে পরিত্রাণ পেতে।
এইসময়ে দেওয়ালের কাক্কু ক্লকটা ডেকে উঠল। রাত এখন সাড়ে তিনটে। যা করার তাড়াতাড়িই করতে হবে রজনীকে। হাতে সময় কমে আসছে। একবার ঘড়ির দিকে চেয়ে সে কলার টেনে দাঁড় করায় পিটারকে।
বলে— ‘Now give me that telegram you have got from Dispur.’
—‘Telegram? What telegram?’ পিটার কি সময় নিচ্ছে? অন্য কোনো মতলব আছে নাকি তার? কিন্তু তা তো হতে দিলে চলবে না। সন্দেহ আর রাগ দুটোই চড়তে থাকে রজনীর।
সে সাপের মতো হিসহিসিয়ে ওঠে— ‘Don’t try to make me a fool. I know where you have kept it. Just take it out, otherwise I will break all your fingers.’ বলে পিটারের পেছনে কষিয়ে এক লাথি মারে। আজ একটু বেশিই মদ খেয়েছে পিটার, তাই বোধ হয় তার আঙুল ভাঙার ব্যথাটা ততোটা প্রবল বোধ হচ্ছে না তার। কিন্তু পায়ে তার এখনও তেমন বশ নেই। লাথির ধাক্কায় কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে তাই ধড়াম করে সে আছড়ে পড়ে পিয়ানোটার ওপরে। বেঠোভেনের ফিফথ সিম্ফনিকে ছাপিয়ে বিকট গর্জনে বেজে ওঠে গ্র্যান্ড পিয়ানো।
তবু কোনোরকমে উঠে নিজেকে সামলে নিয়ে পকেট থেকে চাবির গোছা বের করে এগিয়ে যায় দোতলায় তার শোওয়ার ঘরের দিকে। রজনী তুলে নিয়ে যায় তার রাইটিং প্যাড আর কলম। ঘরে ঢুকে চাবি দিয়ে খোলে তার আলমারি। আলমারির ভেতরে হয়তো তার নতুন পাওয়া সার্ভিস রিভলভার লুকিয়ে রাখতে পারে পিটার। তাই রজনী নিজের অস্ত্রটার নল ঠেকিয়ে রাখে তার মাথায়। পিটার রিভলভার বের করার আগেই গুলি চালাবে সে। এমনও হতে পারে যে প্রথমবার তার বাড়িতে রজনী আসার পরে পিটার টেলিগ্রামটা নষ্ট করে ফেলেছে। কিন্তু না, পিটার সেটা রাখার তাক বদল করেছে মাত্র। হয়তো সে এটা রেখে দিয়েছে এই কারণে যে যদি কখনো পুলিশের জেরার সামনে পড়তে হয় তাকে, তবে সে এইটা দিয়েই নানান যুক্তি সাজিয়ে নিজের পিঠ বাঁচাতে চেষ্টা করবে।
টেলিগ্রামটা বের করতে করতে পিটার ভাবে-এটা নষ্ট করে ফেলাই তার উচিত ছিল।
খপ করে তার হাত থেকে টেলিগ্রামটা ছিনিয়ে নেয় রজনী। একঝলক উলটে-পালটে দেখেই বুঝতে পারে এটাই সেই টেলিগ্রাম।
এবার সে পিটারকে জিজ্ঞেস করে— ‘Who is Lin Aung?’
স্খলিত কণ্ঠে জবাব আসে— ‘He is just a carrier from Burma.’
পিটারকে কলার ধরে টেনে একটা চেয়ারে বসায়। তার কোলের ওপরে রাইটিং প্যাড আর কলমটা দেয়। এবার কিছু বলার আগেই সে লিখতে থাকে। তার বাঁ-হাতটা ঝুলে আছে চেয়ারের পাশে। মার খেয়ে আর টেনশনে তার মদের নেশা হালকা হতে শুরু করেছে। সে বুঝতেই পারছে যে সে এখন ডাবল ক্রশে পড়ে গেছে। রজনী তার কীর্তিকলাপ লালবাজারকে জানালে সে অ্যারেস্ট হবেই; আর সেইসঙ্গে বর্মার ডনও তাকে ছেড়ে কথা বলবে না। রাকেটে সে বিশ্বাসঘাতক বলে চিহ্নিত হয়ে যাবে; আর এই লাইনে বিশ্বাসঘাতকের শাস্তি মৃত্যু। তার ওপরে আজ হয়তো রজনীও তার কিডের খুনের বদলা নিতে তাকে শেষই করে দেবে আর তারপরে হিসেব নেবে শ্যামাদাসের।
—‘Now write the name of your don and also write his address.’ কিন্তু এটা লেখা মানেই নিজের মৃত্যুকে নিশ্চিত করা। তাই তার হাতের পেনটা থরথর করে কাঁপছে। এবারে ‘খুট’ করে একটা ছোট্ট শব্দ। রজনী তার রিভলভারের সেফটি ক্যাচ টেনেছে।
তাই পিটার মুখে বলে— ‘Aung Thiha. Lives in Rangoon. There he runs a curio shop at Merchant Street.’
—‘What’s the name of that shop?’
—‘The… ‘‘The Vintage’’… Oh… that much I know. Believe me. I know nothing more.’
—‘Write it.’ হুকুম করে রজনী। নিতান্তই অপারগ হয়ে লেখে পিটার। মদের নেশা প্রায় কেটেই গেছে তার। আঙুল ভাঙার যন্ত্রণা আর মৃত্যুভয়ে মাঝে মাঝেই কেঁপে উঠছে তার শরীর।
—‘Put your signature below.’
পিটার সই করে লেখার নীচে। রজনী সঙ্গে সঙ্গে প্যাড থেকে কাগজটা ছিঁড়ে নিয়ে সেটা আর টেলিগ্রামটা চালান করে দেয় কোমরের পাউচ ব্যাগে।
লং-প্লেয়িং রেকর্ডটা থেমে গেছে। ওপর থেকেও স্পষ্ট শোনা গেল ‘খুট খুটাস’ করে একটা শব্দ। তার মানে চেঞ্জারে আর একটা রেকর্ড এসে পড়ল। একটু পরেই বেজে উঠল আরেকটা সিম্ফনি। এবারে মোজার্ট। এখন আর ঈগল নয়, ঘরময় উড়ছে সুরের প্রজাপতি।
তারপরে রজনী বলতে থাকে— ‘Listen Pit, I had shot that constable. But you cannot prove that anyway. Then I had to be a brut because I lost my beloved kid. But you … you have become a monster because of your greed.’
—‘Yes… yes… I am a monster. But you know, once this monster was a man… He also had a family… a wife, a little girl… All I had. But I lost those just because of my greed for money.’ পিটারের চোখ ছলছল করে ওঠে।
তার মনে হয়— এ যেন প্রভু যিশুর কাছে বড়োদিনে পিটারের কনফেশন। তাই চুপ করে শুনতে থাকে রজনী। মারার আগে পিটারকে তার শেষ কথাগুলো বলতে দিতে চায় সে।
—‘Where are they now? What happened to them?’
পিটার বলতে থাকে— ‘Before coming here we used to stay together in my bunglow near Bagbazar ghat… My wife told me to leave them when she came to know that I got involved with such a notorious smuggler racket. She wanted me to remain an honest dutiful police officer… She was well aware of the dangers of smuggling… tried a lot to refrain me, but I didn’t listen to her. In the mean time I became habituated with the lavish life-style and also there was no way to escape from that racket.’ পিটার এবারে বাঁ-হাতের কবজি ধরে একটু থামে। হাড় ভাঙার যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠছে সে। রজনীও চায়নি তাকে এতটা মারধর করতে। কিন্তু কথা বের করার জন্যে তার আর অন্য উপায় ছিল না।
পিটার আবার বলতে শুরু করে— ‘So, one day I had to leave them…and after that I started living here…She even kept away my little princess from me. You know Rajni, when my little girl had cancer I told my wife that I would bear all the expenses of her treatment. But she refused to accept my offer. Being a father I couldn’t stand by my dear princess that time. And then on….’
—‘But where does your wife live now?’
—‘After the death of my daughter, she went to her native village in England. Forever.’
পিটারের চোখে জল। একটু সামলে নিয়ে সে আবার বলতে শুরু করে— ‘And I… this devil’s son is still alive… Oh Jesus, why don’t you…?’
কান্নার ভারে পিটারের কথা আটকে যায়। নুয়ে পড়ে সে; যত না শরীরের ব্যথায়, তার চেয়েও বেশি মানসিক যন্ত্রণায়। রজনীর মনে হতে থাকে— এইসব কথা পিটার আগে কখনো কাউকে বলে উঠতে পারেনি। তাই আজ তাকে তার মৃত্যুদূত জেনেও, শারীরিক কষ্ট সহ্য করেও পিটার তাকে তার এতদিনের বুকে চেপে রাখা কষ্টগুলো বলছে। আজ সেই কষ্টগুলো থেকে হালকা হতে চাইছে সে।
তাই রজনী ঠিকই করে ফেলে, আজকের এই বিশেষ দিনে নরহত্যা সে করবে না। যথেষ্ট হয়েছে। পিটারকে সে তুলে দেবে পুলিশের হাতেই। তাতে হয়তো সে ডনের মৃত্যু-পরোয়ানা থেকে বেঁচে গেলেও যেতে পারে।
তাই সে বলে— ‘Where is the telephone?’ পিটার কোনোরকমে ডান হাত দিয়ে ঘরের কোনে রাখা এক্সটেনশন রিসিভারটা দেখিয়ে দেয়। সে যেন আর কথা বলতে পারছে না। একেবারে থম মেরে গেছে।
রজনী দেখে দূরে ঘরের বিছানার একপাশে রাখা এক্সটেনশন রিসিভারটা। সে এগিয়ে গিয়ে ডায়াল করে একশো নম্বরে।
—‘হ্যালো, লালবাজার?’
—‘বলছি। বলুন কী চান?’ নিশ্চয়ই টেলিফোন অপারেটর। প্রয়োজন মতো লাইনটা দিয়ে দেবে নির্দিষ্ট ডিপার্টমেন্টে। কী বলবে রজনী? একটু থমকে থেকে সে বলে— ‘ডি ডি ডিপার্টমেন্টে দিন।’
—‘দিচ্ছি। একটু ধরুন প্লিজ।’ মহিলা কন্ঠে অনুরোধ।
লাইন পাওয়ার জন্যে একটু অপেক্ষা করতে হবে এবার। তাই কানে রিসিভারটা ধরে পিটারের অবস্থা দেখার জন্যে ঘুরতেই দেখে পিটার ঘরে নেই। মেঝেতে পড়ে তার প্যাড আর কলম। তবে কোথায় গেল সে? তাড়াতাড়ি রিসিভার রেখে ঘর থেকে বেরোতেই দেখে ছাদে যাবার সিঁড়ির বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেল পিটারের শরীরটা। ছাদে কেন যাচ্ছে সে? তাড়াতাড়ি সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকে রজনী। কিন্তু সিঁড়ির দরজায় যখন সে পৌঁছোলো ততক্ষণে বড়ো দেরি হয়ে গেছে। শেষ শক্তি দিয়ে দৌড়ে পিটার পৌঁছে গেছে ছাদের নীচু পাঁচিলের কাছে, আর পরমুহূর্তেই তার শরীরটা পাঁচিল টপকে খসে পড়ল নীচে। ধপ করে একটা আওয়াজ। পাঁচিলের কাছে ছুটে এসে রজনী দেখে— নীচের বাঁধানো চাতালে পিটার পড়ে আছে চিৎ হয়ে। তক্ষুনি তরতরিয়ে ছাদের ড্রেন পাইপ বেয়ে নেমে সে টিপে দেখে পিটারের নাড়ি।
নাঃ। সব শেষ। আর কিচ্ছু করার নেই। তাই আবার পাইপ বেয়ে সে উঠে পড়ে ছাদে আর তারপরে সোজা চলে যায় দোতলার টয়লেটে। সাবান দিয়ে কালি ধুতে ধুতে রজনী অনুভব করে যে তার ভেতরেও কেমন যেন একটা উথালপাতাল চলছে।
সব কালি ধুয়ে নীচে নেমে ড্রয়িংরুমের যিশুর বেদির সামনে সে হাতজোড় করে দাঁড়ায় কিছুক্ষণ। তবুও তার ভেতরের উথালপাতাল ভাবটা যাচ্ছে না কেন? ধীরে ধীরে চোখদুটো বোজে সে, আর তখনই কাক্কু ক্লকটা জানান দেয় চারটে বাজল।
ধীর পায়ে রজনী বেরিয়ে আসে লনে। তখনও শীতের আকাশ অন্ধকার। ভোররাতের কুয়াশা আরও ঘন হয়েছে। তবু লনের ক্রিসমাস ট্রিতে লাগানো রঙিন বাতিগুলো তখনও আলো ছড়াচ্ছে। বাইরের ডিনার টেবিলে রাখা গবলেট আর কিছু খালি আর কিছু ভরতি কয়েকটা মদের বোতল।
ভেতরের উথালপাতাল ভাবটা এখনও একটা দলা হয়ে আটকে আছে তার গলার কাছে। বিশ্রী লাগছে। খুব…খুব বিশ্রী। কিন্তু এই বিশ্রী ভাবটা না কাটালেই নয়। কেন? কেন এমন লাগছে তার? উত্তর খুঁজে পায় না রজনী। তাই হঠাৎই একটা মদের বোতল তুলে নিয়ে ছিপি খুলে ঢকঢক করে চার-পাঁচ ঢোঁক গিলে নেয়। জীবনে প্রথমবার।
গলা দিয়ে নামছে তরল আগুন। আর যত সে আগুন নামছে, ততই তার গলার কাছে আটকে থাকা বিশ্রী দলাটা গলে গলে যাচ্ছে।
টেবিলে বোতলটা নামিয়ে রেখে একটু অপেক্ষা করে সে। তারপরে বাকি বোতলগুলো থেকে সব মদ ছড়িয়ে দেয় লনে। এবার বেশ একটু স্বাভাবিক লাগছে। শুনতে পাচ্ছে সে— পিটারের ড্রয়িংরুমের ভেতর থেকে ভেসে আসছে মোজার্টের ফর্টিয়েথ সিম্ফনির সুর। সেই সুর এখন উড়ছে প্রজাপতির ভেলভেট নরম রঙিন পাখার মতো।
লোহার গেট ঠেলে বেরিয়ে রাস্তার দু-দিক দেখে নিয়ে উলটোদিকের বাড়ির পাইপ বেয়ে ছাদে উঠে পড়ে রজনী। ওখানেই যে সে রেখে এসেছে তার শার্ট, প্যান্ট আর ঝোলাব্যাগ।
বউবাজারের বাড়িতে ঢোকার মুখেই দেখা পরিতোষ বাবুর সঙ্গে। উনি মৰ্নিং ওয়াকে বেরোচ্ছেন। রজনীকে দেখে বললেন— ‘হাঁটা হয়ে গেল? তা ঠান্ডায় সোয়েটার গায়ে দাওনি কেন? কেমন লাল হয়ে আছে চোখদুটো। জল কাটছে।’
—‘হ্যাঁ মেসোমশাই। বোধ হয় ঠান্ডা লেগে গেছে। কেমন জ্বালা জ্বালা করছে চোখদুটো।’ পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢোকে সে।
অন্যান্য রাতের মতো আজও সকালে বড়োদিনের পবিত্র আনন্দ-রাত চলে গেছে। তবে যাবার আগে সে শুধু রেখে গেছে একজন ব্যাকুল পিতার শব আর একজনের কুয়াশা ভেজা ভারী মন।
