ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৫ – স্কুলের হিরো কানাই দত্ত
একমাসের বেশি হল স্কুলে ভরতি হয়েছে কানাই। কাছাকাছি হস্টেলে থাকার বন্দোবস্তও হয়েছে তার। এমনিতেই সে চৌখস ছেলে। তাই নিজের জামাকাপড় কাচতে পারে, নিজের মশারি নিজেই খাটাতে পারে, নতুন বইখাতা সে সুন্দরভাবে গুছিয়ে রাখতে পারে নিজের বুককেসে। আর সেই বুককেসের ভেতরেই রাখে তার রজনী স্যারের দেওয়া নিজের বুমেরাংটা।
শহুরে বাংলা বলা সে তার স্যারের সঙ্গে থাকতে থাকতেই অনেকটা আয়ত্ত করেছিল, তবে তাতে এখনও মিশে আছে খানিকটা গ্রাম্য টান। তবে হস্টেলের কোনো ছেলেই সেটা নিয়ে মস্করা করে না, কেন না তারাও যে এসেছে গ্রাম থেকেই। বরং কানাইয়ের চেয়ে তাদের কথায় গ্রাম্য শব্দ আর টান দুটোই বেশি। তবে তাদের খুব কৌতূহল তার বুমেরাং নিয়ে আর তারা আরও আশ্চর্য হয় জেনে যে সে তাইকোন্ডো জানে। দুটোই তাদের কাছে পরম বিস্ময়ের।
তাই ইদানীং বিকেলে ছুটির পরে তারা কয়েকজন মিলে চলে যায় প্রেসিডেন্সি কলেজের মাঠে। সেখানে খোলা মাঠের দু-দিকে বাঁশ দিয়ে দুটো গোলপোস্ট করা আছে। তবে তাতে জাল লাগানো নেই। সেই গোলপোস্টের একটা বারপোস্টকে তাক করে কানাই তার বুমেরাং ছোঁড়ে। সাঁ করে উড়ে গিয়ে সেটা লাগে গোলপোস্টের বারে। ছেলেদের মধ্যেই কেউ একজন ভারি উৎসাহে দৌড়ে গিয়ে কুড়িয়ে আনে সেটা। এবার কানাই তাদের দেখায় যে টার্গেট মিস হলে বুমেরাং কী করে? তাই সে ইচ্ছে করেই টার্গেট মিস করে। বুমেরাংটা গোলপোস্টের বারটাকে পাক মেরে বোঁ বোঁ করে ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়ে কানাইদের থেকে খানিকটা দূরে। ছেলেরা এই আজব অস্ত্রের তাজ্জব করা কাণ্ডকারখানা দেখে হাততালি দিয়ে আনন্দে চিৎকার করে ওঠে।
আবার কখনো বা তারা তাইকোন্ডোর প্যাঁচ জানতে চায়, বুমেরাং ছোঁড়া শিখতে চায়। কানাই তখন তাদের দু-চারটে প্যাঁচ শিখিয়ে দেয় আবার কখনো বা তাদের বুমেরাং ছোঁড়ার কৌশল শেখায়। এইভাবে কিছুদিনের মধ্যেই তারা কানাইকে সম্ভ্রমের চোখে দেখতে শুরু করে। কানাইয়ের তাইকোন্ডোর গাউন, তার শক্তপোক্ত শরীর তাদের ভারি আকর্ষণ করে। তারা কানাইয়ের কাছে শিখতে চায়। কিন্তু তাইকোন্ডোর গাউন তারা পাবে কোথায়? তাই বুদ্ধিমান কানাই তাদের হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি গায়ে পরিয়েই তালিম দিতে শুরু করে।
এদিকে মাস দেড়েকের মধ্যেই স্কুলে ছড়িয়ে যায় তার কথা। তাই একদিন স্কুলের গেমস টিচার সুধাংশু স্যার টিফিনের সময়ে তাইকোন্ডোর প্যাঁচ দেখাতে বলেন। ছেলেদের মুখে উনি শুনেছেন কানাইয়ের এই গুণের কথা। তাই তাকে বলা। অন্যদিকে কানাইও চায় নায়ক হতে। একজন গাঁয়ের ছেলেও যে কলকাতার ছেলেদের চেয়ে কিছু বিষয়ে সেরা, সেটা সে জানান দিতে চায়। তাই তার সঙ্গী ছেলেরাই ব্যায়ামের ঘর থেকে জিমন্যাস্টিকস শেখানোর ম্যাট এনে পেতে দেয় উঠোনে। তার ওপরে দাঁড়িয়ে সে তার রোজের প্র্যাকটিসের সঙ্গী সুবীরকে নিয়ে তাইকোন্ডোর প্যাঁচ-পয়জার দেখাতে থাকে। একেবারে শেষে সুবীরের হাতে একটা স্কেল ধরিয়ে দিয়ে কীভাবে খালিহাতে ছুরির মোকাবিলা করতে হয়, তাও সে দেখায়।
এর ফলে ক্লাস ফাইভের কানাই দত্ত অল্পদিনেই বনে যায় স্কুলের হিরো। এমনকী তার থেকে বয়সে বড়ো ছেলেরাও তাকে চড়-চাপাটি মারতে সাহস করে না। সাহস করে না খামোখা তার পেছনে লাগতে বা তার সঙ্গীদের অযথা উত্যক্ত করতে।
এরই মধ্যে এক রবিবার সন্ধেবেলা তার রজনী স্যার হস্টেলে এসেছিল। এখানে তার লোকাল-গার্জেন তো সেইই। তবে এবারে তার স্যার কী একটা বিশেষ কাজে এখানে আটকে থাকবে বলে তাদের গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হয়নি। কিন্তু হস্টেলে এসে স্যার তাদের সবার সঙ্গে বসে খবরের কাগজের ওপরে মাখা মুড়ি-বাদাম-চানাচুর খেয়ে গেছে। রজনী যে কানাইয়ের তাইকোন্ডো-স্যার হয়েও তাদের সবার সঙ্গে বসে মুড়ি-চানাচুর খেলো, তাতেই হস্টেলের ছেলেরা আপ্লুত।
তবে এবারে গ্রামে যেতে পারল না বলে কানাইয়ের তেমন আফশোষ নেই। নতুন নতুন বন্ধুদের সাথে গল্পগুজব করা, খেলাধুলো করা, একসাথে পড়াশোনা করা, একসাথে খাওয়া-শোওয়া, এসবেই এক নতুন আনন্দের স্বাদ পাচ্ছে সে।
