এপ্রিল, ১৯৬৫ – মানিভঞ্জং এর রডোডেনড্রন আর পাইন বনের সুপারম্যান
মানিভঞ্জং এর ট্রেকপথ বেয়ে রোজ সকালে উঠে যায় রজনী। আজও যেমন সে উঠছে। আঁকাবাঁকা চড়াই বেয়ে উঠে নীচের পাইন গাছের সারির মাথার ওপর দিয়ে তাকালে নীচে দেখা যায় এই ছোট্ট গ্রামটার একটুকরো খেলার মাঠ, শিবমন্দিরের সাদা চূড়ো আর একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাড়িগুলোর মাথা। ভারি সুন্দর লাগে দেখতে; যেন একটা লিলিপুটদের গ্রাম। একটা নির্দিষ্ট ছোটো পাথুরে চাতাল থেকে সেই দৃশ্য দেখে রজনী। তবে কোনো কোনো দিন আরও ওপরে উঠে যায় সে। তখন এই পাহাড়ি গ্রীষ্মে দেখা মেলে ডোয়ার্ফ রডোডেনড্রনের। পথের দু-পাশে আর পাহাড়ের খাদের ঢালের গায়ে ফুটে থাকে তাদের লাল বা গোলাপি রঙের ফুল। মনে হয় যেন কেউ পাহাড়ের ওই ঢালে বিছিয়ে দিয়েছে সবুজের ওপরে লাল-গোলাপি নক্সাকাটা কোনো কার্পেট। আগে এত সুন্দর দৃশ্য দেখেনি রজনী। তাই সে রোজই খানিক বিশ্রামের ফাঁকে চোখ ভরে দেখে সেই রূপ।
মাত্র এক হপ্তা হল এখানে পবন প্রধানের হোম-স্টেতে উঠেছে সে, যেমনটা সে থেকেছিল আগেরবার ছুটির সময়েও। পবন লোক ভালো। তাকে খুব সম্মানও করে। এখানে বাঙালি ট্রেকারদের আসা-যাওয়ার সুবাদে বাংলাটা সে মোটামুটি ভালোই বলতে আর বুঝতে পারে। রজনী তাকে বলে রেখেছে, এখানেই কোথাও একটা ভাড়ার ঘর জোগাড় করে দিতে। আসলে পবনের এখানে দেশি-বিদেশি ট্রেকাররা এসে ওঠে। রাতে ঠাঁই নিয়ে ভোর হতে না হতেই তাদের কেউ বেরিয়ে যায় সান্দাকফু-ফালুটের পথে। আবার কেউবা টংলু পর্যন্ত গিয়ে আবার এখানে ফিরে রাতের বিশ্রাম নিয়ে ফিরে যায় দার্জিলিংয়ে। তাই পবনের হোম-স্টেতে থাকতে গেলে খরচটা বেশিই পড়ে যায়। তবে পবন তাকে কথা দিয়েছে যে ট্যুরিস্ট সিজন শেষ হয়ে গেলেই সে রজনীর একটা থাকার ব্যবস্থা করে দেবে।
এখানে দুপুর গড়ালেই পাহাড়ের খাদে থিতিয়ে থাকা কুয়াশার চাঁই রোদের তাপে আস্তে আস্তে মেঘ হয়ে ভেসে ওঠে ওপরে। হাওয়ার সাথে খেলতে খেলতে সেই মেঘ কখনো ঢেকে দেয় পথচলতি মানুষকে আবার কখনো বা খোলা জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকে স্যাঁতস্যাঁতে করে দেয় জামাকাপড়, বিছানা। তাই এখানে সন্ধের আগেই কুয়াশায় ঢাকা পড়ে যায় পথঘাট; গাঢ় মেঘলা দিনের মতো অকালছায়া ঘনিয়ে আসে চারপাশ জুড়ে। তারপরে যখন সন্ধে নামে, তখন পাথুরে পথ আর এই গ্রাম নিজেকে আড়াল করে নেয় কুয়াশার চাদরে। খাদ আর পথ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ঠাহর করে না চললেই বিপদ— কেন না এখনও এখানে বিজলী এসে পৌঁছয়নি। আর কাছাকাছি শহর বলতে হয় ঘুম, নয়তো তারপরে দার্জিলিং।
গতবারে ছুটি নিয়ে এসে দার্জিলিংয়ের একটা ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খুলে গিয়েছিল রজনী। ভেবেছিল যে বাকি জীবনটা দার্জিলিংয়েই কাটাবে। তখন লোকমুখে শুনে এই গ্রামে এসে ফালুট পর্যন্ত ট্রেক করে গিয়েছিল সে। আর তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে যে থাকতে হলে বাকি দিনগুলো এখানেই কাটাবে। তাই এবারে এখানে আসার পথে চাকরি ছাড়ার পরে পাওয়া চেকটা দার্জিলিংয়ের ব্যাঙ্কে জমা করে দিয়ে এসেছে। সামনের মাস থেকে তার মাসিক পেনশনের টাকাটাও জমা পড়বে সেই ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে। তাই প্রতি মাসেই অন্তত একবার তাকে যেতেই হবে দার্জিলিংয়ে।
বিকেল বেলায় গ্রামের ছোটো মাঠটায় ছেলেরা ফুটবল খেলে। সাইড লাইনের ধারে দাঁড়িয়ে রজনী তাদের খেলা দেখে। তখন মনে পড়ে যায় তার গ্রামের কথা, তার ছোটোবেলায় বাতাবী লেবু দিয়ে ফুটবল খেলার কথা। তারপরে সন্ধে নামলে খেলা শেষে ছেলেরা যখন বাড়ি ফিরে যায়, তখন রজনী সেই মাঠে শুরু করে তার প্র্যাকটিস। তবে এখানে আসার দিন চারেক পর থেকেই সে খেয়াল করেছে যে বছর বারোর একটা ছেলে অন্ধকার কুয়াশায় মিশে মাঠের একপাশে দাঁড়িয়ে তাকে লক্ষ্য করে যায়। অন্ধকারেও রজনী বুঝতে পারে যে তার কপালে একটা কাটা দাগ আছে। তার মনে একটা সন্দেহ উঁকি মারে— ছেলেটাও কি তার মতোই অন্ধকারেও দেখতে পায়? নইলে কী করে দেখে সে অন্ধকার মাঠে রজনীর প্র্যাকটিস? তাই সে ঠিকই করেছে যে আজ যদি ছেলেটার দেখা পায়, তবে তার সঙ্গে আলাপ করবে।
কোমরে ঝোলানো বোতল থেকে কয়েক ঢোঁক জল খেয়ে গলা ভিজিয়ে নেয় রজনী। গায়ের ঘাম এতক্ষণে শুকিয়ে গেছে। এবার উৎরাই ধরে ফিরতে হবে গ্রামে।
সন্ধেবেলা ছেলের দলের খেলা শেষ হতে রোজকার মতোই তাইকোন্ডোর গাউন পরে রজনী শুরু করে তার প্র্যাকটিস। প্র্যাকটিস করে আর মাঝেমাঝেই তার চোখ খুঁজে ফেরে অন্ধকারের আড়ালে থাকা সেই কপালে কাটা দাগওয়ালা ছেলেটাকে। কিন্তু কই? আজ তো সে এল না। তাকে না দেখতে পেয়ে খানিকটা হতাশই হল রজনী। এদিকে ঘণ্টাধ্বনি শোনা যাচ্ছে। তার মানে শিবমন্দিরে সন্ধ্যার আরতি শুরু হয়ে গেছে। প্র্যাকটিস শেষ করে তাই সে হাঁটা লাগায় মন্দিরের দিকে। আজকাল রোজই প্র্যাকটিস শেষে সে মন্দিরে আসে। চুপ করে বসে থাকে খানিকক্ষণ। কারোর সাথে কথা বলে না। এমনকী মন্দিরের পুরোহিতের সঙ্গেও না। দেবমূর্তিকেও প্রণাম করে না। মনটাকে একেবারে শূণ্য করে দিয়ে হালকা করে নেয় তার মনের ভার।
মন্দিরে পৌঁছে দেখে যে গ্রামের বেশ কয়েকজন পুরুষ-মহিলা মন্দির চাতালে বসে আরতি দেখছে। এই ছোট্ট গ্রাম্য মন্দিরে এত লোকসমাগম সে আগে কখনো দেখেনি। আজ বোধ হয় কোনো বিশেষ তিথি হয়ে থাকবে, আর সেইজন্যেই এত লোকজন এসেছে। তাই চুপচাপ গিয়ে ভিড়ের পেছনে দাঁড়ায়। হঠাৎই তার নজর পড়ে বিশেষ একজনের ওপরে। আরে, ওই তো সেই ছেলেটা। আর তখনি সে ঠিক করে ফেলে যে আজকে ওকে ধরতেই হবে। আজই সেরা সময়। তাই সে চুপ করে অপেক্ষা করে থাকে।
একসময় আরতি আর পুজো শেষ হয়। রজনী আনচান করতে থাকে। ভিড়টা একটু হালকা হলেই ছেলেটার সঙ্গে কথা বলতে হবে। কিন্তু বৃথাই আশা তার। ছেলেটা এক মহিলার হাত ধরে, তাঁর গায়ের সঙ্গে প্রায় লেপটে পুরোহিতের কাছ থেকে প্রসাদ নিয়ে আর সকলের সঙ্গে মন্দির চাতাল থেকে বেরিয়ে যায়। এভাবেই একে একে জড়ো হওয়া লোকেরা মন্দির ছেড়ে বেরিয়ে মিশে যায় অন্ধকার মেঘ ঢাকা পথে। ধ্যুস, ছেলেটাকে নাগালে পেয়েও সে পারল না কথা বলতে। নির্বাক রজনী শুধু সেই অন্ধকার পথের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে একা সেই পাহাড়ি গ্রামের মন্দির-চাতালে।
—‘প্রসাদ লিজিয়ে বাবুজি।’
রজনী ঘুরে দেখে গায়ে শাল দেওয়া মন্দিরের পুরোহিত প্রসাদের থালা নিয়ে তার পেছনে দাঁড়িয়ে। সে প্রসাদ নিয়ে মুখে পুরে তাঁকে জিজ্ঞেস করে— ‘অচ্ছা, ওহ যো বচ্চা মা কে সাথ বৈঠা থা, আপ উসে জানতে হ্যায়?’
—‘কৌন সা বাচ্চা বাবুজি? ইধার তো বহোত সারে বাচ্চা আতে হ্যায়। আপ কিসকা বাত বোল রহা হ্যায়?’
—‘ওহি এক লড়কা। বারা ইয়া তেরা সাল উমর হোগা। উসকা শির কি বাঁয়া তরফ এক চোট কি নিশান হ্যায়। মা কে সাথ বৈঠা থা উধর।’ রজনী আঙুল দিয়ে জায়গাটা দেখিয়ে দেয়।
—‘ক্যা, আপ নিহিতান কা বাত বোল তো নেহি রহে হ্যায়? বহোত জিদ্দি অউর হিম্মতদার লড়কা হ্যায় ও। লেকিন বাবুজি, আপ উসকা বারে মে কিঁউ পুছ রহে? ও আপসে কুছ বত্তমিজি কিয়া হ্যায় ক্যা?’
অপ্রস্তুত হয়ে যায় রজনী। সত্যিই তো, ওই ছেলেটার সঙ্গে তো তার কোনো সম্পর্কই নেই। একজন অজানা, অচেনা ছেলের সম্বন্ধে কাউকে জিজ্ঞেস করলে সে তো সন্ধিহান হবেই। তাই পুরোহিতকে সে বলে— ‘নেহি নেহি। মেরে সাথ কোই বত্তমিজি নেহি কিয়া হ্যায় ও। মৈনে তো অ্যায়সা হি পুছ রহা থা।’
পুরোহিতের কাছে ব্যাপারটা কেমন যেন গোলমেলে ঠেকে। তিনি বলেন— ‘আপকা শুভনাম ক্যা হ্যায় বাবুজি? ইধর কাঁহা ঠহরে হ্যায় আপ?’
—‘মেরা নাম রজনীকান্ত। … রজনীকান্ত রায়। ইধর পবন প্রধান কি হোম-স্টে মে ঠহরে হ্যায়।’
—‘অচ্ছা, অচ্ছা। আপ বঙালি হ্যায়। তো আপ কব আয়ে হ্যায় ইধর? কুছ দিনোঁ সে আপকো মন্দির মে আতে হুয়ে দেখ রহা হ্যায়।’
—‘হাঁ, ম্যায় বঙালি হুঁ। ইধর সাতদিন হো চুকা হ্যায়।’
—‘অচ্ছা, অচ্ছা। আপসে মিলকর বড়ি খুশি মিলা। মৌকা মিলেনেসে মন্দিরমে চলে আনা বাবুজি। শিউজি আপকা ভালা করে।’
—‘হাঁ আউঙ্গা। জরুর আউঙ্গা। অচ্ছা নমস্তে জি। অব চলে?’ রজনী নমস্কার জানায় পুরোহিতকে।
—‘নমস্তে বাবুজি।’ পূজারিও একহাত কপালে ঠেকিয়ে প্রতিনমস্কার জানান।
রজনী বেরিয়ে আসে বাইরে। প্রায় জনহীন মেঘঢাকা অন্ধকার পথে খানিকক্ষণ ঘুরেফিরে ফিরে আসে হোম-স্টেতে। তাইকোন্ডোর গাউন পালটে মুখ-হাত ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে তৈরি হয় রাতের খাবারের জন্যে। এখানে লোকে তাড়াতাড়িই খেয়ে নেয়। এতক্ষণে হয়তো অতিথিরা অনেকেই খেয়ে নিয়েছে রাতের খাবার। সাতসকালেই তাদের বেরোতে হবে যে।
একটু পরেই পবনের লোক খাবার নিয়ে আসে। তার পেছনে পেছনে পবনও হাজির। হয়তো সে হাতে খানিকটা সময় পেয়েছে। রজনীর খাবার টেবিলে নামিয়ে রেখে লোকটা চলে গেলে পবন একটা চেয়ার নিয়ে বসে। মনে হয় তার কিছু কথা আছে।
—‘আপকা সাথ আজ বিবেকজির মুলাকাত হয়েছে? তো ক্যায়সা লাগা?’
একটু বিস্মিত হয়েই রজনী বলে— ‘বিবেকজি? মানে কে বলুন তো?’
—‘মন্দিরকা পূজারি বাবুজি। উনকা নাম আছে বিবেক ভট্টরাই। বহোত ভালো আদমি। উনহি নে বোলা কি আপনি নিহিতানের তালাশ করছেন।’
রজনী বুঝে গেল যে এরই মধ্যে মন্দিরের খবর পৌঁছে গেছে পবনের কাছে। তার মানে পবনের এখানে যেমন প্রতিপত্তি আছে, তেমনি এই ছোট্টো পাহাড়ি গ্রামে খবর ছড়াতেও দেরি লাগে না।
—‘দেখুন পবনজি, আমি তো বাচ্চাটার নাম জানি না। তবে আমি যখনই সন্ধেবেলা মাঠে প্র্যাকটিস করি, তখনই দেখি ওই নিহিতান নামের ছেলেটা অন্ধকারে মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে আমার প্র্যাকটিস দেখে। আর আজকে শিউজির মন্দিরেও মায়ের সাথে ওই ছেলেটাকে দেখলাম। আমার মনে হয়, আমি যে কসরত করি, সেটা ওই ছেলেটা শিখতে চায়। তাই আমি ভট্টরাইজির কাছে…।’
—‘আপ মৈদান মে কী কসরত করেন?’
—‘তাইকোন্ডো পবনজি। আপনি জানেন তো তাইকোন্ডো কি?’
—‘ক্যা হ্যায় ও চিজ?’ পবন প্রধান এবারে খানিক বিব্রত।
—‘ওটা একটা মার্শাল আর্ট। তা মার্শাল আর্ট কি জিনিস সেটা জানেন কি?’
পবন এবারে বোকা বোকা হেসে বলেন— ‘হাঁ হাঁ, ওটা হামি জানি। তাইকোন্ডা মার্শাল আর্ট আছে। শুনা হ্যায় কি দার্জিলিং কা ইংলিশ স্কুলে মার্শাল আর্ট শেখানো হোয়।’
—‘ওটা তাইকোন্ডা নয়। তাইকোন্ডো। ওটা জানলে আত্মরক্ষা করা যায়। তাই আমার ইচ্ছে যে আমি এই গ্রামের ছেলেদের তাইকোন্ডো শেখাব। তাতে ছেলেরা আরও হিম্মতদার হবে, কেউ অ্যাটাক করলে খালিহাতেই লড়তে পারবে। তার সাথে মনেও শান্তি আসবে। খেলার মাঠটা তো আছেই। আর সেইজন্যেই আমি নিহিতানের খোঁজ করছিলাম।’
—‘ও, তাই বোলেন। এ তো বড়িয়া কোথা আছে।’ এবারে যেন পবনজি রজনীর কথায় সন্তুষ্ট হন।
—‘তা পবনজি, ছেলেটার কপালে কাটা দাগ হল কী করে?’ একটু্করো রুটি ডালে ডুবিয়ে মুখে তুলে বলে রজনী।
—‘ও অনেক বাত আছে বাবুজি। শুনবেন?’
—‘বলুন না, আপনার হাতে সময় থাকলে বলুন না। ওর গল্প শুনতে আমার ভালোই লাগবে।’
হাতে সময় আছে। অথিতিদের সবার ঘরে খাবার পৌছানো হয়ে গেছে। এবারে বাকি কাজ বেয়ারাদের। তাই চেয়ারে জাঁকিয়ে বসে পবন প্রধান শুরু করেন নিহিতানের গল্প।
‘নিহিতানের বাবার নাম ছিল বিজয় ছেত্রী। সে দার্জিলিংয়ে ট্যুরিস্ট জিপ চালাত। ঘরে ছিল ওর বিবি কুসুম অউর লড়কা নিহিতান। বহোত সুখী থে ও লোগ। লেকিন বাবুজি, নসিব খারাপ হোলে যা হোয়। একরোজ বারিশ কে পানি সে ভিগা হুয়া রাস্তে সে জিপ চলাকর দার্জিলিং সে ইস গাঁও কে লিয়ে সবজি, চাওল অউর বহোত সারে সামান লেকর লৌট রহা থা বিজয়। লেকিন ওনেক রাত হো যানে কে বাদ ভি বিজয় নেহি লৌটা। হমার তো টেনশন হোনে লগা। তো আমি তোখোন ফোন লাগাই দার্জিলিংয়ে হমার এক জিপ অপারেটর দোস্ত কে।’ একটু থামেন পবন। তারপরে উদাস দৃষ্টিতে ঘরের ছোটো খোলা জানলা দিয়ে দূরের গাঢ় অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলতে থাকেন— ‘তো বাবুজি, ও দোস্ত নে কহা কি বিজয় বহোত পহলে নিকল গয়া, অউর ও লোগ কা পাশ খবর হ্যায় কি সুখিয়াপোখরি কে বাদ নাগরি মে ল্যান্ডস্লাইড হুয়া হ্যায়। শুনকর তো মুঝে লগা, জরুর কুছ গড়বড় হয়েছে। বিজয়কা জিপমে হমার ভি রেশন থা। তো হামি অউর দের না করে হমার বাইক লেকর নিকল পড়ে। সীমানা বস্তি ক্রশ করকে নাগরি কে থোড়া আগে যাকে দেখা কি রাস্তা বন্ধ। হামি বাইক ঘুমাকর লৌটতে সময় সোচ রহা থা কি বিজয় কা বিবি কুসুম কো ম্যায় ক্যা কহুঙ্গা। ঝুট তো বোলতেই হোবে। ইসিলিয়ে হামি উসকো বোলা কি বারিশ কে বজয় সে বিজয় দার্জিলিং মে রুখ গয়া। বিসোয়াস কোরেন বাবুজি, উসি রাত মুঝে নিদ নেহি আয়া।… দুসরা দিন সুবহ হোতে হি হামি নাগরি মে গয়া। পৌঁহুছনেকে বাদ দেখা কি মিলিটারি কা আদমিয়োঁ নে কাম শুরু কর দিয়া।… উসকে বাদ বাবুজি… দো দিন কে বাদ বিজয় কা বডি…।’ মাথা ঝুঁকে পড়ে পবনের। রজনীও খাওয়ার কথা ভুলে চুপ করে বসে থাকে। তার কল্পনায় সত্যি হয়ে ভাসতে থাকে পবনের বলা কথাগুলো। সময় কেটে যায়…। খোলা জানলা দিয়ে ছোটো একটুকরো মেঘ ঘরে ঢুকে মুখ ভিজিয়ে দিতেই বাস্তবে ফিরে আসে রজনী।
—‘তা সেটা কতদিন আগেকার ঘটনা, পবনজি?’
মুখ তুলে হাত দিয়ে মুখটা রগড়ে পবন বলেন— ‘নিহিতান কা উমর তব পাঁচ সাল হোবে।’
—‘তার মানে প্রায় সাত-আট বছর আগেকার ঘটনা, তাই না?’
—হাঁ বাবুজি।’
—‘তা ওদের চলে কী করে?’
—‘গাঁও কা আদমি যো জিতনা দে সকতা হ্যায়, দেতা। হাম ভি কুছ দেতা হ্যায়। অউর ভট্টরাইজি হররোজ মন্দির সে কুছ না কুছ ভেজ দেতে হ্যায়। ইসি তরহা চল রহা হ্যায়।’
রজনীর আর খেতে ইচ্ছে করছিল না। তাই দেখে পবন তাড়া দিলেন— ‘আরে বাবুজি, খানা তো খেয়ে নিন।’
পবনের অনুরোধে ‘হ্যাঁ খাচ্ছি’ বলে আর এক টুকরো রুটি মুখে পুরে জিজ্ঞেস করল— ‘তা বাচ্চাটার কপালটা কাটল কী করে?’
—‘আরে বাবুজি, বোলিয়ে মত… পাইন কা ফল হোতা হ্যায় না, ও বহোত হার্ড আছে।’ তারপর এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেওয়ালের গায়ে কাঠের রাকে রাখা খাঁজকাটা কাঠের আনারসের মতো দেখতে একটা ক্যান্ডেল-স্ট্যান্ড দেখিয়ে বলে— ‘ওহি হ্যায় বাবুজি পাইন কা ফল।’
—‘ও আচ্ছা, বুঝলাম। তারপর?’
—‘দো সাল আগে ওরা ইয়ার-দোস্ত খেলা কোরছিল ওহি ফল নিয়ে। উসি টাইম দুসরা এক বাচ্চা পাইন ফলকে বদলে মে একটা পত্থর ফেকে দেয়। ওহি পত্থর লাগ কর নিহিতানের শির ফাট যায়। আমি তোখোন ওকে বাইকে করে সুখিয়ার হেলথ-সেন্টারে নিয়ে যাই। উসকা শিরমে চারটে স্টিচ হোয়। লেকিন ইতনা খুন দেখকর অউর স্টিচ কা টাইম মে ভি ও রোয়ে নেহি। তভি হামি সমঝা কি ও এক সাচ্চা গোর্খা লড়কা হ্যায় বাবুজি। উসকা নস নস মে বিজয় কা জ্যায়সা গোর্খা খুন আছে।’
—‘ও আচ্ছা, আর সেই দাগটাই রয়ে গেছে ওর কপালে।’
—‘হাঁ বাবুজি। অচ্ছা, আপ খানা খা লিজিয়ে। আভি হামি যাচ্ছে। বাতোঁ বাতোঁ মে বহোত দের হো গয়া।’ পবন প্রধান উঠে দাঁড়ান।
—‘আচ্ছা পবনজি, আর একটা কথা বলবেন?’
—‘কী বাবুজি?’
—‘মানে, আমাদের বাঙালিদের নামের একটা মানে থাকে। আপনাদেরও তো থাকে। এই যেমন আপনার নামের মানে হল ‘‘হাওয়া’’। তা নিহিতান নামটা তো আগে কখনো শুনিনি। মনে হয় এটারও কোনো একটা মানে আছে। তাই নয় কি পবনজি?’
—‘হাঁ, আছে তো। বিজয় খুব আংরেজি সিনেমা দেখতে ভালবাসতো। ওহি লড়কার নাম রাখল নিহিতান; মতলব ‘‘সুপারম্যান’’। না জানে কিঁউ। লেকিন একরোজ বিজয় হামাকে বোলা থা কি ও একটা সিনেমা মে ‘‘সুপারম্যান’’ নাম কা এক ইংলিশ সিনেমার হিরোকো দেখা থা। ও হিরো আসমান মে উড় সকতা হ্যায় অউর দুনিয়া কো কিসি ভি খতরোঁ সে সেভ করতা হ্যায়। সায়দ ইসি সে ও আপনা লড়কার নাম রাখল…।’
—‘ও…আচ্ছা। এবারে বুঝলাম নিহিতান নামের মানে। থ্যাংক ইউ পবনজি।’
পবন চলে গেলে রজনীর কেন জানি না মনে হতে লাগলো যে হয়তো এই নিহিতানের মধ্যেই সে খুঁজে পাবে তার সবটুকু বিদ্যে ঢেলে দেবার আধার। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।
.
এরপরে প্রায় তিনমাস কেটে গেছে। গ্রামের সরপঞ্চের মাথা ভট্টরাইজির সাথে পঞ্চায়েতের সবাই একমত হয়ে তার মতো একজন আগন্তুককে ঠাঁই দিয়েছে এই গ্রামে। বিশ্বাস রেখেছে তার ওপরে। তাই পবন প্রধান নিজেই উদ্যোগী হয়ে একটা ঘর খুঁজে দিয়েছে তাকে। সেখানে রজনী নিজেই রেঁধে খায়। তাতে খরচ অনেক কম পড়ে। এদিকে রোজই সন্ধের আঁধার নামলে রজনী যখন খেলার মাঠে প্র্যাকটিস করে, তখন তার কিক বা পাঞ্চের সময়ের চিৎকার শুনে ধীরে ধীরে শুধু নিহিতান কেন, আরও চার পাঁচজন ছেলে মেঘমাখা অন্ধকারে মিশে তার কসরত দেখে।
এদিকে বর্ষা এসে গেছে পাহাড়ে। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রজনী দেখে আকাশটা মেঘলা। গম্ভীর। হয়তো বৃষ্টি হলেও হতে পারে। পাহাড়ি বৃষ্টির মর্জি বোঝা ভার। বছরের এই সময়টায় এখানে বৃষ্টিই হিরো। রোদ্দুর এখন মুখ লুকিয়ে থাকে মেঘের মুখোশের আড়ালে। তাই ব্রেকফাস্ট খেয়ে সে বেরিয়ে পড়ে চড়াই পথে জগিং করতে। বৃষ্টি আসার আগেই যে রোজকার কাজটা শেষ করতে হবে।
গ্রামটাকে অনেক নীচে ফেলে পাথুরে রাস্তায় সে জগিং করে চলেছে। পথে দেখা হল জনা ছয়েকের একটা বিদেশি ট্রেকার দলের সঙ্গে। তারা চলেছে সান্দাকফুর পথে। চড়াই পথে উঠতেই মনে হচ্ছে যেন তাদের বুক ফেটে যাচ্ছে। হাঁপাচ্ছে। তাই তার মতো একজন বয়স্ক লোককে তাদের পাশ কাটিয়ে জগিং করে উঠে যেতে দেখে তারা অবাক। রজনী তাদের উদ্দেশ্যে থামস আপ করে হেসে এগিয়ে গেল আপন পথে।
মাইল দেড়েক উঠে যাবার পরেই ঘন পাইন বনের শুরু। সেখানেই থামল সে। মুখ বন্ধ রেখে লম্বা গভীর শ্বাস নিতে নিতে ঢুকে পড়ল বনের ভেতরে। এখানে সে আগেও এসেছে। খানিকটা ভেতরে গেলে একটা পাথরের চাঁই আছে। সেখানেই বসে রজনী বিশ্রাম নেয় আর গাছপালার, পাখপাখালির কথা শোনে। ক-দিন আগে সে একটা অজানা পাখির ডাক শুনেছিল ওই পাথরের চাতালটায় বসে। দু-একবার ভালো করে ডাকটা শোনার পরে সেও ডেকে উঠেছিল পাখিটার ডাক। দু-তিনবার ডাকতেই একটু দূরের ঝোপের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসেছিল একটা মুরগির মতো দেখতে নীলরঙা পাখি। তার চোখের কাছটা লাল। রজনী আর একবার ডাক দিতেই পাখিটা রজনীর দিকে একবার তাকিয়েই মাটি ঘেঁষে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে মিলিয়ে গেল দূরের একটা ঝোপের মধ্যে। কলকাতার মিউজিয়মে সে ওই পাখিটার স্টাফড স্পেসিমেন দেখেছে। তাই খানিকক্ষণ স্মৃতি হাতড়াতেই মনে পড়ে গেল পাখিটার নাম। ওটা ছিল একটা পুরুষ কালিজ ফেজেন্ট।
নিশ্চিন্তে কোমরে বাঁধা জলের বোতল থেকে খানিকটা জল খেয়ে হিমালয়ের বনের সৌন্দর্য দেখতে থাকে সে। আদতে সে তো গ্রামের ছেলে। তার ওপরে জঙ্গলের গন্ধ তার শিরায় শিরায়। সত্যি বলতে কী, এতদিনের শহরের জীবন একটুও ভালো লাগেনি তার। শুধু পেটের দায়ে সেখানে টিকে ছিল সে। তাই এই হিমালয়ের বনের শ্যাওলাধরা দেবদারু-পাইনের গন্ধে মুক্তির স্বাদ পায় রজনী। ওইসব গাছের ডাল থেকে ঝুলে থাকা পরগাছার শ্বাসমূল, নানান রঙের অর্কিড মুগ্ধ হয়ে দেখে সে। তার মনে হয় জঙ্গল যেন রোজই তার রূপ বদল করে; পুরোনো হয় না তা। তার সাথে মিশে থাকে কতরকম জংলি গন্ধ। পায়ের নীচের ভেজা পাতার সোঁদা গন্ধের সাথে মিশে থাকে অর্কিডের ফুলের হালকা গন্ধ। ভালো লাগে; রজনীর বড়ো ভালো লাগে এই গন্ধ। তাই সেই গন্ধটা বুক ভরে নেয়। এখানে আসার পরে সে বুঝতে পেরেছে যে মেঘেরও গন্ধ আছে। এক এক রকম মেঘের এক এক রকম গন্ধ। নীচের দিক থেকে ভেসে আসা মেঘে মিশে থাকে চমরি গাইয়ের গায়ের আর চুলা জ্বালাবার পোড়া কাঠের গন্ধ আবার ওপর থেকে নেমে আসা মেঘে মিশে থাকে পাইনের গন্ধ আর কখনো বা নাম না জানা পাহাড়ি ফুলের গন্ধ। আর রোজই সে বারে বারেই চোখ বন্ধ করে কানপেতে শুনতে থাকে এই জঙ্গলের অজানা ভাষা। নতুন পাহাড়ি জঙ্গলে এসে নতুন করে এখানকার প্রকৃতির পাঠ শুরু করেছে রজনী আবার।
কিন্তু একটা অন্যধরণের শব্দ আসছে না আজ? পচা পাতার ওপরে একজন মানুষের পায়ের হালকা শব্দ। কে আসে এই বনের ভেতরে? দেখতে হবে তো। চোখ খোলে রজনী। কিন্তু….
তাই সে চটপট কোমরে জলের বোতলটা আটকে লুকিয়ে পড়ে পাথরের চাঁইটার আড়ালে। যে আসছে আগে তাকে দেখে তবেই সে তার নিজের অস্তিত্ব জানান দেবে তাকে। এমনও তো হতে পারে, যে আসছে সে জঙ্গলের কাঠের চোরাচালানকারী দলের লোক। জঙ্গলের ভেতরে হয়তো কোথাও তাদের ঠেক আছে। তাই আগে যাচাই করে নেওয়াই শ্রেয়।
কিন্তু একী? এ যে নিহিতান। একটা হাত দুয়েক লম্বা পাইন গাছের ডাল তার হাতে। কোমরে বেল্টের মতো করে বাঁধা দড়ি থেকে ঝুলছে একটা কুকরি। সে সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে আসছে গাছের ওপরের ডালপালার দিকে নজর ফেরাতে ফেরাতে। কিন্তু কী করতে এই পাইন বনে ঢুকেছে সে? কী খুঁজছে গাছের ডালে ডালে? দেখতে হবে।
পাথরের যে চাঁইটার পেছনে নিজেকে আড়াল করেছে রজনী তার সামনে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা। সেখানেই এসে দাঁড়াল নিহিতান। তারপরে ঝুঁকে আসা পাইন আর দেবদারুর ডালে ভালো করে নজর চালিয়ে ডেকে উঠল কাঠবেড়ালির ডাক। একেবারে নিঁখুত। দু-তিনবার ডেকেই চুপ করে গেল। এরপরে খানিক্ষণের অপেক্ষা। তারপরে আবার ডেকে উঠল সে।
রজনীর এখান থেকে বড়োজোর হাত দশেক দূরের একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে নিহিতান। কাঠবেড়ালির ডাক ডাকছে আর মাঝেমাঝেই থেমে গিয়ে কানপেতে কিছু যেন শোনার চেষ্টা করছে। সেইসঙ্গে গাছের ডালে ঘুরছে ফিরছে তার দৃষ্টি।
মিনিট পাঁচেক এইভাবে কাটার পরে হঠাৎই তার হাতে ধরা গাছের ডালটা অল্প অল্প দোলাতে থাকে সে। তারপরে আরও একবার ডেকে ওঠে। এবারে রজনীকে অবাক করে ফিরতি জবাব এল গাছের ডাল থেকে। পাতার আবডালে দেখা যাচ্ছে না প্রাণীটাকে; তবে ডাক শুনে বোঝা যাচ্ছে যে সেটা একটা কাঠবেড়ালি।
কয়েক পলক। তারপরেই নিহিতানের হাতের ভারী ডালটা উড়ে গেল বাতাস কেটে। সাঁ করে গিয়ে সেটা লাগল একটা গাছের ডালে আর পরক্ষণেই নিহিতানের শরীরটা যেন উড়ে গেল। হাত আষ্টেক দূরে গিয়ে সে মাটি ছুঁয়েই চকিতে দিল একটা সামার সল্ট। তখন তার হাতে ধরা পড়েছে একটা একটু বড়ো সাইজের কাঠবেড়ালি। সাধারণ কাঠবেড়ালির মতো নয় সেটা। পেটের কাছটা হালকা কমলা রঙের। চিঁ চিঁ করে তারস্বরে ডাকছে মুক্তির আশায়। নিহিতানের এইসব ব্যাপার স্যাপার দেখে রজনী অবাক। … ওঃ! কী সাঙ্ঘাতিক স্কিল ছেলেটার। সার্থক নাম বটে।
ততক্ষণে নিহিতান উঠে দাঁড়িয়েছে। তার বাঁ-হাতে ধরা প্রাণীটা ছাড়া পাবার আশায় ডেকেই চলেছে আর হাওয়ায় পা ছুঁড়ছে। কিন্তু নিহিতানের তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই। তার হাত গিয়ে পড়েছে কুকরির বাঁটে।
না, কাঠবেড়ালিটাকে বাঁচাতে হলে রজনীকে কিছু একটা করতেই হয়। কিন্তু কী করবে সে? এই ছেলেটাকে বশে আনতে গেলে ধমক-ধামকে কাজ হবে না। তাই তাকে এমন কিছু করতে হবে যাতে নাকি কাঠবেড়ালির গলায় কুকরির কোপ বসানোর আগেই ছেলেটা ঘাবড়ে যায়। তাই সন্তর্পণে পাথরের চাঁইয়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে সে। এদিকে নিহিতানও ততক্ষণে কোপ বসাবে বলে সামান্য ডানদিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। হাতে তার কুকরি। এখন রজনীকে যা করার তা করতে হবে খুব তাড়াতাড়ি। কিন্তু তার থেকে নিহিতানের দূরত্ব এখন প্রায় বারো ফুট। তাই হাতের ওপরে ভর দিয়ে পরপর তিনটে ভল্ট। রজনী গিয়ে ল্যান্ড করে ওর থেকে মাত্র ফুট তিনেক দূরে। তার এই আকস্মিক আগমনে ঘাবড়ে যায় নিহিতান। চমকে উঠে দু-তিন পা পিছিয়ে যায় সে। আর সেই সুযোগে রজনী বসে পড়ে চকিতে বাঁ-পায়ের একটা হালকা কিক চালায় নিহিতানের বাঁ-হাতে। মাপা ওজনের কিকের ধাক্কায় হাত থেকে ছিটকে যায় কাঠবেড়ালি। জঙ্গলের দিকে দৌড়ে একটা গাছে উঠে পড়ে সেটা। কয়েক সেকেন্ডের দেখা; তবু রজনী চিনতে পারে প্রাণীটাকে। সেটা ছিল একটা অরেঞ্জ বেলিড হিমালয়ান স্কুইরেল।
এবারে দু-জনে মুখোমুখি। কিন্তু হাতের শিকার ফস্কে যাওয়ায় নিহিতানের গোর্খা রক্তের গর্বে আঘাত লাগে। সে বাগিয়ে ধরে তার কুকরি। ওইটুকু ছেলের সাহস দেখে রজনী অবাক। কিন্তু নিহিতানকে ব্যথা না দিয়ে তার হাতের কুকরিটা কেড়ে নিতে হবে। তাই সে এমন ভাণ করে যেন সে নিহিতানের পেছনে কিছু একটা দেখেছে। মুখ দিয়ে ‘চুঃ চুঃ’ আওয়াজ করতেই নিহিতান পেছনে তাকায় আর সেই মুহূর্তেই রজনীর হাতের মুঠোয় ধরা পড়ে যায় তার কুকরি ধরা হাত। সে আপ্রাণ চেষ্টা করে হাতটা ছাড়িয়ে নেবার; কিন্তু তার তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের মাঝে রজনী একটু জোরে আঙুল দিয়ে চাপ দিতেই হাত থেকে খসে পড়ে কুকরি। ‘আঃ’ বলে কাতরে উঠে হাতটা ঝাঁকাতে থাকে নিহিতান। রজনী এগিয়ে গিয়ে তার হাতটা নিয়ে ম্যাসাজ করে দিতেই একটু পরেই কমে যায় ব্যথাটা। তখন মাটি থেকে কুকরিটা তুলে গুঁজে দেয় সে নিহিতানের কোমরে ঝোলানো খাপে। তারপরে নাম জানা সত্বেও আলাপ জমাতে তার কাঁধে হাত রেখে বলে— ‘নাম ক্যা হ্যায় তেরা?’
নিহিতান তাদের খেলার মাঠের অন্ধকারে অনেকদিন ধরে এই লোকটাকে কীসব কসরত করতে দেখেছে। তারপরে আজ যেভাবে লোকটা তার সামনে উড়ে এসে পড়ল, তার হাত থেকে কাঠবেড়ালিটাকে মুক্তি দিল, এমনকী তার কুকরিটা কেড়ে নিয়েও আবার তার কোমরে গুঁজেও দিল— তাতে সে কেমন যেন একটু ভয় পেয়ে গেছে লোকটাকে। তাই সে চুপ করে থাকে।
রজনীও বুঝতে পারে তার এই থতমত অবস্থা। তাই আরও নরম গলায় বলে— ‘বোল বেটা, ক্যা নাম হ্যায় তেরা?’ এবারে নিহিতান ভয় কাটিয়ে বলে— ‘নিহিতান। নিহিতান ছেত্রী।’
—‘ডরো মত। আচ্ছা, তেরা পিতাজিকা নাম বিজয় ছেত্রী, হ্যায় না?’
নিহিতান ভাবে— লোকটা কি তাকে চেনে?… নইলে তার বাবার নাম জানল কী করে? হয়তো বা লোকটা চিনতো তার বাবাকে। তাই সে চোখ নামিয়ে বলে— ‘হাঁ’। তারপরেই সোজা রজনীর দিকে তাকিয়ে বলে— ‘লেকিন আপ মেরা শিকার কো ভাগনে দিয়া কিঁউ? অব গোস্ত মিলেগা কঁহা?’
রজনীও বুঝতে পারে যে এটা গোর্খাদের আত্মসম্মানবোধের প্রকাশ। তাই সে নরম সুরেই বুঝিয়ে বলে— ‘জঙ্গল কা জানোয়ারোঁকো মারনা সহি নেহি হ্যায়। অগর তুঝে গোস্ত খানা হ্যায় তো বাজার সে খরিদকে খানা অচ্ছা হ্যায়।’ বলেই রজনীর মনে পড়ে গেল যে এই পিতৃহারা ছেলেটা মাংস কেনার পয়সা কোথায় পাবে?
—‘গোস্ত খরিদনেকা পৈসা আপ দেঙ্গে ক্যা?’ নিহিতানের কচি স্বরে একই সঙ্গে ব্যঙ্গ আর রাগ ফুটে বেরোয়।
—‘ম্যায় তেরা পিতাজিকা দোস্ত হুঁ।’ অম্লানবদনে মিথ্যে বলে রজনী। তারপরে বলে— ‘মুঝসে পৈসা লেনে মে তো ইতরাজ নেহি?’
—‘নেহি। আপ যো ভি হো, ম্যায় কিসিসে পৈসা নেহি লেতা হুঁ।’
রজনী বুঝে গেল যে, এই ছেলে গরিব হতে পারে কিন্তু এর আত্মসম্মান প্রখর। তাই সে ঠিক করল যে সে পবনজিকে দিয়ে ওর বাড়িতে খানিকটা মাংস পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু এখন আগে নিহিতানের রাগটা কমাতে হবে। তাই সে মন্দিরের পূজারি ভট্টরাইয়ের গলা নকল করে বলে উঠল— ‘আরে এ নিহিতান, কভি গুসসা না কর না। গুসসা হোনে সে আদমীকা দিমাগ ঠিক সে নেহি চলতা হ্যায় বেটা।’
নিহিতান রজনীর গলায় পূজারিজির কণ্ঠস্বর শুনে বেশ আশ্চর্য হয়ে গেল। বিস্ময়ে তার ভুরুদুটো কুঁচকে গেছে। সে নিজে তার মায়ের স্বর, পবনজির স্বর, তার দু-তিনজন বন্ধুর স্বর আর নানান পশুপাখির ডাক নকল করতে পারে। এই খেলাটা তার আর তার বন্ধুদের বেশ ভালোই লাগে। তবে বুড়ো পূজারিজির স্বর সে নকল করতে পারে না এখনও। কিন্তু এই নাম না জানা লোকটা কী করে পূজারিজির স্বর নকল করল? এই লোকটাও কি তাহলে তারই মতো অন্যের স্বর নকল করতে পারে? নাকি লোকটা জাদু জানে?
নিহিতানের বিস্ময় দেখে রজনী এবার নিজের স্বাভাবিক গলায় বলল— ‘আচ্ছা, অব ম্যায় গিলহরী কা বোল শুনাতা হুঁ। এ ভি হো সকতা কি ইয়ে বোল শুনকর ওহ দুবারা আ যায়ে, নেহি তো কোই দুসরা। লেকিন চল; পহলে হামলোগ উস পত্থর কে পিছে ছুপ যায়ে।’ বলে সে আগে যে পাথরটার পেছনে বসেছিল সেটাকে দেখাল। কিন্তু নিহিতান এখনও তাকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না; ভরসা করতে পারছে না তাকে। তবু চেষ্টা করতে হবে। তাই সে পাথরটার দিকে এগোতে এগোতেই নিহিতানের মতো করেই কাঠবেড়ালির ডাক ডাকতে থাকে। কিন্তু কয়েকপা এগিয়েই পেছন ফিরে দেখে যে নিহিতান তখনও ভুরু কুঁচকে দাঁড়িয়েই আছে। তবু রজনী তাকে হাতছানি দিয়ে ডেকে নিজে পাথরটার পেছনে লুকিয়ে যায়। নিজের চোখ পর্যন্ত পাথরের ওপরে জাগিয়ে রেখে আবার কাঠবেড়ালির ডাক দেয়।
খানিকক্ষণ সব চুপচাপ। তারপরই দূর থেকে একটা কাঠবেড়ালির ডাক শোনা যায়। তাই আরেকবার ডাক ডেকে সে নিহিতানকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। হ্যাঁ, এইবারে কাজ হয়। নিহিতান দৌড়ে এসে পাথরের পেছনে তার পাশে বসে দেখতে থাকে কী ঘটে। একটুপরেই আবার কাঠবেড়ালির ডাক শোনা যায়। তবে এবারে অনেকটাই কাছে। তাই রজনী আর একবার ডাক ছোঁড়ে।
এরপরে অপেক্ষা…। খানিক পরে আবার কাঠবেড়ালির ডাক শোনা যায়। এবারে খুবই কাছে। দু-জনেই দেখে যে নিহিতান আগে যেখানে দাঁড়িয়েছিল, সেখানেই হাজির হয়েছে একটা অরেঞ্জ বেলিড হিমালয়ান স্কুইরেল। লেজটা তুলে পেছনের দু-পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে সেটা। রজনী আবার নীচু গলায় ডাক ছোঁড়ে। তাই শুনে কাঠবেড়ালিটা আরও খানিকটা এগিয়ে আসে। কিন্তু এমন একটা মোক্ষম সময়ে নিহিতান উঠে দাঁড়ায়। বোধ হয় তার ভেতরের শিকারি স্বত্বা জেগে উঠেছিল। ব্যাস, সেটাই হল কাল। নিহিতানকে দেখতে পেয়েই কাঠবেড়ালিটা লেজ তুলে ভোঁ দৌড়। তড়বড়িয়ে একটা দেবদারুর গুঁড়িতে খানিকটা উঠে সে দেখতে থাকে নিহিতানকে। আর আশা নেই বুঝে রজনী যেই না উঠে দাঁড়ায় ওমনি কাঠবেড়ালিটা তরতরিয়ে গাছ বেয়ে উঠে মিলিয়ে যায়।
আর হবে না। তাই পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে রজনী নিহিতানের কাঁধে হাত রেখে বলে— ‘চল, আভি ওয়াপস চলে। বারিশ আ সকতা হ্যায়।’ এইবারে আর নিহিতান কিছু বলে না। চুপচাপ রজনীর পেছনে পেছনে চলতে থাকে।
প্রায় ফুট চল্লিশেক বনের মধ্যে দিয়ে যাবার পরে হঠাৎই রজনী দাঁড়িয়ে পরে। মাটিতে বিছিয়ে থাকা ভেজা পাতার ওপরে একটা ঘসটানো কিছুর আওয়াজ শুনতে পেয়েছে তার সজাগ কান। পাছে নিহিতান এগিয়ে যায়, তাই সে খপ করে তার হাতটা ধরে তাকে দাঁড় করিয়ে দেয়। ঠোঁটের ওপরে আঙুল রেখে ইশারায় তাকে চুপ করে থাকতে বলে। রহস্যময় একটা কিছু ঘটতে চলেছে বুঝে নিহিতানও চুপ করে দাঁড়িয়ে যায়। এতক্ষণে পাতার ওপরে ঘসটানো আওয়াজটা তারও কানে গেছে। এতদিন এই জঙ্গলে সে আসছে, কিন্তু এই আওয়াজটা সে আগে কখনো শোনেনি।
আওয়াজটা ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসছে। আর একটু পরেই তার বিস্ফারিত চোখের সামনে ধরা পড়ল আওয়াজের উৎস। অদ্ভুত দেখতে ফুট চারেক লম্বা কুমিরের মতো একটা প্রাণী, তবে সারা গায়ে মাছের আঁশের মতো বর্ম দিয়ে ঢাকা। সেটা চারপায়ে ধীরে ধীরে হেলেদুলে হাঁটছে আর তার লম্বা আঁশে ঢাকা লেজটা ঘসটে যাচ্ছে ভেজা পচা পাতার ওপরে। তাতেই ওইরকম ঘসটানির শব্দ হচ্ছে। ছুঁচলো মুখের প্রাণীটার মুখ দিয়ে মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসছে সরু লম্বা লকলকে জিভ। ভেজা পাতার তলায় মাঝেমধ্যেই চালাচ্ছে সে জিভটা। সামনে খানিকটা খোলা জায়গা। সেখানেই চরে বেড়াচ্ছে জন্তুটা। এই জঙ্গলে এলেও নিহিতান কখনো দেখেনি এই প্রাণীটাকে। খানিকক্ষণ অবাক হয়ে দেখে সে রজনীর হাতে অল্প টান দেয়। রজনী তাকায় তার দিকে। নিহিতান বোধ হয় তাকে কিছু বলতে চায়। তাই ফিসফিসিয়ে বলে— ‘ক্যা?’
নিহিতানও ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করে— ‘ইয়ে ক্যা হ্যায় বাবুজি?’
—‘ইসে প্যাঙ্গোলিন কহা যাতা হ্যায়। ইয়ে জানোয়ার দীমক অউর চিট্টিয়াঁ খাতে হ্যায়। বহোত হি নাজুক হ্যায় ইয়ে।’
নিহিতান এবারেও খুব নীচু স্বরে বলে— ‘ইসকা গোস্ত খায়া যা সকতা হ্যায় ক্যা?’
—‘নেহি। ইসকা পৈর মে যো নোখুন হ্যায়, ওহ বহোত খতরনাক হোতে হ্যায়। কভি ইসে পকড়নেকা কোশিশ না কর না।’
তারা চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখতে থাকতে প্যাঙ্গোলিনের হালচাল। আর নিহিতান তার ছোট্ট মাথায় ভাবতে থাকে— জঙ্গলের কতোই না রহস্য। এখানে চুপ করে না থাকলে, চোখ আর কান খোলা না রাখলে সেই রহস্য ধরা দেয় না। আর এই বাবুজি তার থেকে অনেক বেশি জঙ্গলকে জানে।
ওদিকে খাবারের সন্ধানে এদিক-ওদিক ঘুরতে ঘুরতে প্যাঙ্গোলিনটা চলে এসেছিল অনেকটাই কাছে আর তখনই তার চোখে পড়ে যায় রজনী আর নিহিতানকে। আচমকা মানুষের দেখা পেয়ে ভয়ে প্রাণীটা পড়িমড়ি করে টাল খেতে খেতে দৌড় লাগায়। কয়েক সেকেন্ডেই সেটা অদৃশ্য হয়ে যায় একটা ঝোপের মধ্যে। তার এই হালচাল দেখে হেসে ফেলে নিহিতান।
রজনীও মিষ্টি হেসে বলে— ‘অব ঘর চলে?’
—‘হাঁ বাবুজি, চল।’ এখন অনেকটাই সহজ হয়ে গেছে নিহিতান। ‘আপনি’ থেকে নিজের অজান্তেই নেমে এসেছে ‘তুমি’ তে; আর এটাই তো চেয়েছিল রজনী।
একটুপরেই দু-জনে মিলে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে উৎরাই ধরে নামতে থাকে। শ-দুয়েক ফুট নামতেই দেখা হয়ে যায় আগের সেই বিদেশি ট্রেকার দলের সঙ্গে। রজনী হাত নাড়াতে তারাও হাত তুলে তাদের থামতে বলে। তারপর তাদেরই একজন নিহিতানের হাতে তুলে দেয় একমুঠো লজেন্স। রজনীকেও দেয় দুটো। নিহিতান তো লজেন্স পেয়ে খুব খুশি। সে হাসিমুখে রজনীর দিকে তাকায়। রজনী একটা লজেন্স মুখে পুরে তাকেও বলে খেতে। নিহিতান একটা লজেন্স মুখে পুরে বাকিগুলো প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে রাখতে রাখতে বলে— ‘মাম্মি কো দুঙ্গা। বড়ি খুশি হোগি ও।’
তারপরে ট্রেকার দলটাকে ‘থ্যাঙ্কস। এনজয় দ্য হিমালয়ান বিউটি অ্যান্ড উইশ ইউ বেস্ট অফ লাক’ বলে রজনী আবার জগিং করে নামতে থাকে নীচে। পাশে পাশে নামছে নিহিতানও। নামতে নামতেই সে বলে— ‘বাবুজি, তুমনে ও সাহাব লোগোঁ কো ক্যা কহা?’
—‘ইধর আনে কে লিয়ে মৈনে উনলোগোঁ কো বধাই দিয়া অউর বোলা ইস পাহাড়িয়োঁ কা মজা লেনে কা।’
—‘হাঁ, তুমনে সহি বোলা বাবুজি। ইস পাহাড়িয়াঁ অউর জঙ্গল বহোত খুবসুরত হ্যায়।’ রজনী নিহিতানের কথা শুনে হাসে। তার পিঠ চাপড়ে দেয়। হাসে নিহিতানও।
তারপরেই নিহিতান বলে ওঠে— ‘বাবুজি, তুম বঙ্গালি হো না?’
—‘ক্যায়সে সমঝা তু?’
—‘তুমহারা বোলি সে।’ রজনী হাত দিয়ে ওর মাথার চুল এলোমেলো করে দেয়।
—‘বাবুজি, তুমহারা কোই নেহি হ্যায়?’ নামতে নামতেই বলে নিহিতান।
—‘কৌন বোলা কোই নেহি হ্যায়? তু তো হ্যায় না মেরে সাথ‘। শুনে আবারও হেসে ফেলে নিহিতান।
তারপরে বলে— ‘আচ্ছা বাবুজি, তুম ইধার হি রহোগে না?’
—‘হাঁ বেটা। লেকিন কিঁউ ইয়ে বাত মুঝসে পুছা?’
—‘তব তো তুমহে তুমহারা ওহ কসরত মুঝে শিখানে পড়েগা।’
—‘জরুর। জরুর তুঝে শিখাউঙ্গা বেটা।’
—‘মেরা দোস্তোঁ কো ভি শিখাওগে?’
—‘কিঁউ নেহি। মৈ সবকো শিখাউঙ্গা।… ঠিক হ্যায়, অগর বারিশ না হো তো দোস্তোঁ কে সাথ আজ শাম কো মৈদান মে চলে আনা।’
—‘ঠিক হ্যায়। আউঙ্গা। লেকিন বাবুজি একরোজ মেরা ঘর মে আও না। মাম্মি বহোত খুশ হোগি।’
—‘ঠিক হ্যায়। একরোজ জরুর আউঙ্গা। লেকিন পহলে তো কসরত শিখনা শুরু করেঁ। মুঝে দেখনা হ্যায় তুঝমে কিতনা দম হ্যায়।’
—‘বাবুজি, মৈ গোর্খা হুঁ। অউর হামলোগ কভি হার নেহি মানতে, সির্ফ মৌত কে সিবা।’ বলে হাসতে থাকে পাহাড়ি ‘সুপারম্যান’ নিহিতান।
আর ঢালু পথে নামতে নামতে রজনীর মনে হয়— সে উপযুক্ত কাঁচামাটি বোধ হয় পেয়েই গেছে। এখন এই কাঁচামাটিকে রূপ দিতে হবে ধীরে ধীরে। অতি যত্নে গড়ে তুলতে হবে তার অধীত সবটুকু বিদ্যে রাখার আধার। নিশিকান্ত রায়ের ঘরাণা যেন হারিয়ে না যায়।
ক্রমে দু-জনে নেমে আসে গ্রামের সমতলে। নিহিতান বাড়ি চলে যায় আর রজনী দূরের ওই সবুজ পাহাড়ের দিকে অপলক তাকিয়ে থেকে মনে মনে বিড়বিড় করে বলতে থাকে— ‘দাদু, এবারে আর কিছুদিন পরে হয়তো আমার পথচলা শেষ হয়ে যাবে; কিন্তু তার আগেই আমার নিয়তি আমায় দিয়ে গেল এমন একজনকে যে হয়তো বা তোমার ঘরাণা বয়ে নিয়ে যেতে পারবে। আমাকে আশীর্বাদ কর দাদু, আমি যেন তোমার ইচ্ছে পূর্ণ করতে পারি।’
এমন সময় আকাশ চুঁইয়ে নেমে আসে বৃষ্টি। ভিজতে থাকে রজনী। একটুকুও নড়ে না। এখন সে পরম তৃপ্তিতে তার দাদুর আশীর্বাদ মেখে নিচ্ছে সারা শরীর জুড়ে যে।
***
