দিন পনেরো পরে
ক্যামাক স্ট্রিট। কলকাতার বিত্তশালীদের এলাকা। নামিদামি দোকানপাটও আছে। সেই রাস্তা ধরেই শ্যামাদাস উত্তরমুখী হেঁটে চলেছে পার্ক স্ট্রিটের দিকে। দু-দিকেই চলছে তার নজর। দোকানের সাইনবোর্ডগুলো পড়ে যাচ্ছে সে। প্রায় মিনিট সাতেক হাঁটার পরে তার নজরে আসে একটা সাইনবোর্ড যাতে ইংরাজি আর বাংলা দু-ভাষাতেই লেখা ‘গোল্ডেন গ্যালারি’। পেয়ে গেছে সে। এবারে রাস্তা পার হয়ে ওপারে যেতে হবে।
দরজায় বন্দুকধারী পাহারাদার। তবু স্মার্টলি ঢুকে পড়ে। এখন তার আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে— ডন আঙ থিহার হাত যে আছে তার মাথার ওপরে।
দু-চারজন ক্রেতা বিরাট কাউন্টারের এদিকে ওদিকে বসে গয়না দেখছে। দোকানের কর্মচারীরা কাঁচের শো-কেস থেকে ভেলভেট কাপড়ে মোড়া গয়নার বাক্স পেড়ে তাদের দেখাচ্ছে। ওসবে শ্যামাদাসের কোনো দরকার নেই। তার দরকার দোকানের মালিককে। চারপাশে নজর ঘোরাতেই দেখে ডানদিকে খানিকটা দূরে একটা উঁচু জায়গার ওপরে সাদা কাপড়মোড়া গদি। তার চারপাশ ঝকঝকে পেতলের নীচু রেলিং দিয়ে ঘেরা। গদির ওপরে সাদা শার্ট, ধুতি আর ধূসর রঙের কোট পরা একজন বসে। চোখে রিমলেস চশমা। একটা লাল কাপড় দিয়ে বাঁধানো খাতায় মগ্ন হয়ে কী যেন লিখছে। তার পেছনে প্রায় ফুট পাঁচেক উঁচু একটা হাতল লাগানো সিন্দুক। ওই লোকটাই মনে হয় হরিশরণ ভাটিয়া। তাই শ্যামাদাস সোজা এগিয়ে যায় তার দিকে।
পেছন থেকে কাউন্টারের একজন কর্মচারী বলে— ‘মে আই হেল্প ইউ স্যার।’ কিন্তু তাকে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে সে পৌঁছে যায় সেই রেলিংঘেরা জায়গাটায়। সে গিয়ে দাঁড়াতেই লোকটা খাতা থেকে মুখ তুলে তার দিকে তাকায়। বলে— ‘এক্সকিউজ মি। হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ?’
শ্যামাদাস বলে— ‘আমার নাম শ্যামাদাস রায়। আমি মিস্টার হরিশরণ ভাটিয়ার সঙ্গে দেখা করতে চাই।’
লোকটা জহুরির চোখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। বোধ হয় ভালো করে খতিয়ে দেখে নেবার জন্যেই। তার কাছে ইতিমধ্যেই রেঙ্গুন থেকে খবর পৌঁছে গেছে। তবুও আরেকবার বাজিয়ে দেখার জন্যে সে বলে— ‘আপনি কোথা থেকে আসছেন?’
—‘রেঙ্গুন। রেফারড বাই…।’
—‘নাম নেবেন না। এনি পাসওয়ার্ড?’
—‘হ্যাঁ, ব্ল্যাক টিউলিপ।’
ভদ্রলোক কলমটায় খাপ লাগিয়ে খাতার মাঝখানে রেখে বন্ধ করেন খাতা। তারপরে উঠে দাঁড়িয়ে শ্যামাদাসের উদ্দেশ্যে বলেন— ‘প্লিজ কাম।’
ঘেরা জায়গাটা থেকে নেমে সে পাশের একটা দরজা ঠেলে খোলে। ভেতরে আলো জ্বলছে। শ্যামাদাসকে ভেতরে যেতে ইশারা করেন হরিশরণ। সে ভেতরে ঢুকতে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিতে দিতে বলেন— ‘প্লিজ বি সিটেড। হামার নাম হরিশরণ ভাটিয়া।’
এই ঘরটা একটা অফিসঘর। তারই একটা চেয়ারে নিজে বসে সামনের একটা চেয়ারে বসতে ইঙ্গিত করেন তাকে। শ্যামাদাস বসলে হরিশরণ শুরু করেন— ‘পিটারের হাউস হামার লোকেরা রেইকি করে এসেছে মিস্টার রয়। দ্য প্লেস ইজ ওয়েল চুজেন। এখোন বোলেন, আপনি ক্যাইসে কিডন্যাপ করতে চান রজনীর কিডকে?’
—‘স্যার, ও যখন স্কুল থেকে বেরিয়ে খেলতে যাবে, তখন ওকে তুলে নিতে হবে।’
—‘লেকিন আপনি তো একেলা ওহি কাম করতে পারবেন না। ফেথফুল ড্রাইভার লাগবে। উসকে বাদ লেড়কাকে যোখোন পিক আপ করবেন তোখোন ও সাউট করবে। রাস্তার আদমি ওহি গাড়িকা নাম্বার নোট করে নেবে। পোলিশে খোবোর হয়ে যাবে। ব্যাস, আপনাকে পোলিশ… ক্যা মিস্টার রয়, বাত সহি হ্যায় ইয়া নেহি?’
—‘সেইজন্যেই তো আপনার হেল্প লাগবে। আপনার লোক আমার সঙ্গে থাকলে আর গাড়িতে ফলস নম্বর প্লেট লাগালে ব্যাপারটা হয়ে যাবে।’
—‘নেহি, নেহি, অপারেশন কে বাদ ওহি ঝুটা নাম্বার প্লেট বদলনে মে যিতনা টাইম লাগবে, উতনা হি টাইম পর পোলিশ আপনাকে ট্র্যাক করে নেবে। নো, নো, মিস্টার রয়, আপনার প্ল্যান ফুলপ্রুফ নেহি।’
—‘তাহলে অপারেশন কীভাবে হবে স্যার?’ আগ্রহের সঙ্গে প্রশ্ন করে শ্যামাদাস।
—‘শোনেন মিস্টার রয়, হামার আইডিয়া কী বোলে।’
—‘বলুন।’
—‘রজনীকান্ত যোখোন ওফিসে আসবে তোখোন আপনি দূর সে হামার আদমিদের ওকে দেখিয়ে দেবেন। হামার আদমি ওর মুভমেন্ট ওবসার্ভ করবে। আর ও যোখোন পিটারের বাড়িতে যাবে, তোখোন হামার আদমি ওকে… সমঝে না?’
—‘হ্যাঁ।’
—‘বাচ্চাকো যব কিডন্যাপ করা হোবে, আপনি ওহি গাড়ি মে থাকবেন। আপনি হামার আদমিদের সির্ফ বাচ্চাটাকে দেখিয়ে দেবেন। ওহ গাড়িকা অ্যারেঞ্জমেন্ট, আদমিকা বন্দোবস্ত, সোব আপ মুঝ পর ছোড় দিজিয়ে। অগর রজনী কুছ গড়বড় করনে কা কোশিশ কোরবে তো হামার আদমি উসসে নিপট লেঙ্গে। ক্যা, ঠিক হ্যায় না? সমঝে না আপ হামার বাত?’
—‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, বুঝেছি। থ্যাঙ্ক ইউ মিস্টার ভাটিয়া, থ্যাঙ্ক ইউ।’
মিষ্টি হেসে হরিশরণ বললেন— ‘ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম। আপনি এক উইক বাদ একবার হামার সাথে দেখা কোরবেন। সোব জেনে যাবেন। ওক্কে।’
—‘ওক্কে স্যার। থ্যাঙ্ক ইউ।’
রাস্তায় বেরিয়ে শ্যামাদাস ভাবতে থাকে— এখন এরা তাকে যেদিকে চালাবে, সেদিকেই তাকে চলতে হবে। এসব থেকে যে সে বেরিয়েও আসবে, তারও কোনো উপায় নেই। শয়তানের ঘরের একটাই দরজা, আর সেটা শুধু ভেতরে ঢোকার জন্যে, বেরোনোর জন্যে নয়।
