পুলিনের সৎকার, সেনবাড়ির মশলাপাতি আর ড্যানীবাবুর সি-হর্স
বাস থেকে যখন নামল রজনী ততক্ষণে পুলিনের দেহ সৎকার হয়ে গেছে। বাড়ি ফিরে সুরেশ কাকার মুখে শুনল— নদীর চরে সন্ধ্যের একটু আগেই পুলিনের শেষ কাজ হয়ে গেছে। গ্রামের লোক নাকি ভেঙে পড়েছিল। সৎকারের সময়ে হাজির ছিল শ্যামাদাস, দিনেশ, বিষ্টুচরণ আর তাদের দলের আরও অনেকে। শ্যামাদাসের তদারকিতেই ভালোভাবে মিটে গেছে সব কাজ। পুলিশের তরফেও হাজির ছিল দু-জন।
শ্যামাদাস খানিকটা আগেই পুলিনের বাড়িতে গিয়ে কিছু টাকা দিয়ে এসেছে পুলিনের বাবার হাতে। কিন্তু টাকা দিয়েই কি মাপা যায় জীবনের দাম?
আজ সুরেশ কাকাও যেন খানিকটা নিজের বশে নেই। রজনীর অবস্থাও তাই। সেই ছোটোবেলা থেকেই ছেলেটাকে দেখছে তারা। কখনো সঙ্গীসাথীদের সাথে পুকুরে ঝাঁপাচ্ছে, কখনো গোরুর ল্যাজ মুচড়ে তাকে ঊর্দ্ধশ্বাসে দৌড় করাচ্ছে আবার কখনো বা গ্রীষ্মের শুরুতে আমগাছের ডালে সদলবলে চড়ে কাঁচা আম খাচ্ছে। একবার তো রজনী দেখেছিল পুলিন একটা দাঁড়াশ সাপকে ল্যাজ ধরে ঘোরাচ্ছে। ওইভাবে ঘোরালে শিরদাঁড়া ভেঙে সাপটা মরে যেতে পারে। রজনী হাঁ হাঁ করে উঠতেই সাপটাকে ছেড়ে দিয়েছিল পুলিন। তখন কতই বা বয়স হবে তার। বড়জোর বছর দশ কী এগারো। তবে তখনই তার নজরে পড়ে গিয়েছিল ছেলেটা। রজনী মুগ্ধ হয়েছিল তার সাহস দেখে।
—‘তোমার জন্যে আজ ডাল, ভাত আর আলুসেদ্দ করেচি ছোড়দাবাবু। পুলিনের ওখানে গেসলাম তো। তাই আজ আর তেমন কিচু করে উটতে পারিনি।’ চা এগিয়ে দিতে দিতে বললে সুরেশ কাকা।
—‘ঠিক আছে ওতেই হবে।’ চায়ে চুমুক দেয় রজনী। ভাবতে থাকে এরপরে তার করণীয় কী? আজ তো শনিবার। একবার শ্যামাদাসদার ওখানে গেলে হত। সে হয়তো বিশদে জানলেও জানতে পারে পুলিনের মৃত্যুর পেছনের কারণটা কী।
চায়ের কাপ ধুয়ে রেখে সুরেশ কাকা বলে— ‘কষ্ট পেওনি গো ছোরদাবাবু। যার যা নেয়তি তা হবেই। কিন্তু তুমি যদি এইভাবে থম মেরে থাকো, তবে অন্য বাচ্চাগুলোর কী হবে? তাদের তো আগু বাড়িয়ে নে যেতে হবে তোমাকেই। যাও, একোন মুখ হাত ধুয়ে খানিক বেশ্রাম করে রাতের খাবারটা খেয়ে নিও তাড়াতাড়ি। আমি ছেলেদের বলে দিইচি কাল সকালে আসতে।’
—‘ঠিক আছে। খেয়ে নেবো।’
—‘আচ্ছা, আমি আসি তাইলে?’
—‘হ্যাঁ, এসো।’
সুরেশ কাকা চলে গেলে হাত মুখ ধুয়ে একটু বিশ্রাম নেয় রজনী। শরীর তার ক্লান্ত নয়, কিন্তু মনটা তার বিবশ। হাজার পুলিন একটা কষ্ট হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার বুকে। নাঃ, কাটিয়ে উঠতেই হবে এটা। হাজার ঝড়-ঝাপটা সয়েও বটগাছ যেমন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তেমনি তাকেও থাকতে হবে।
খেতে ইচ্ছে করছে না। তবু দুটো ভাত কোনোরকমে খেয়ে বাসনপত্র ধুয়ে রেখে সে রওয়ানা হল সেনেদের পোড়ো ভিটের দিকে। আজ শ্যামাদাস কী বলে তা জানতে হবে।
উঠোনের অন্ধকার পেরিয়ে শ্যামাদাসের ঘরে ঢোকার আগে নিঃশব্দে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ভেতরে ওরা কী বলাবলি করছে তা কান পেতে শুনতে চেষ্টা করে রজনী। এত নীচু স্বরে কথা বলছে ওরা যে বাইরে থেকে কিছু তেমন ভালো করে বোঝা যাচ্ছে না। তবু শ্যামাদাসের দু-একটা কথা আবছা বুঝতে পারল— ‘হ্যাঁরে, পেছনের ঘরে মশলাপাতি আর দানাদার ঠিকঠাক আছে তো?… ঝ্যান ইওং দোকান ফেলে কোথায় পালাল কে জানে।’
পুলিন মারা গেছে আর ওরা কি ভোজের আয়োজন করছে? আর ঝ্যান ইওং-ই বা কে? ও আচ্ছা, মনে হয় এটা মার্কুইস স্ট্রিটের সেই চীনে জুতোওয়ালাটার নাম। কিন্তু এদের ভোজের সঙ্গে ওই জুতোওয়ালার কী সম্পর্ক?
দরজায় মৃদু টোকা দিতেই ভেতর থেকে ভেসে এল দিনেশের গলা— ‘কে?’
—‘আমি রজনীকান্ত।’
—‘এই, ওকে ভেতরে আসতে দে।’ শ্যামাদাসদার গলা।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে রজনী দেখে ওরা অন্যদিন যেমন ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে থাকে আজ তেমন নয়। বেশ কাছাকাছি বসেছে। নিশ্চয়ই কোনো গোপন কথা আলোচনা করছিল।
—‘এসো, রজনী বোসো।’ নরম সুরেই বলে শ্যামাদাস।
রজনীকান্ত একটা পেটির ওপরে বসে।
শ্যামাদাসই শুরু করে— ‘তোমার মনের অবস্থা বেশ বুঝতে পারছি রজনী। আমাদেরও একই অবস্থা। আমি তোমায় কথা দিয়েছিলাম যে পুলিনকে আমরা যথাসাধ্য নজরে নজরে রাখব। তবে সবদিন তো আর তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। আর কাজটাতেও তো তেমন কোনো রিস্ক ছিল না। কিন্তু কি আর করা যাবে? তবে রজনী, ছেলেটা কিন্তু বড়ো বেশি রিস্ক নিয়ে ফেলেছিল।’
রজনী তার ব্যাগ থেকে সত্যসংবাদের টেলিগ্রামটা বের করে দেয়। একটা সিগারেট ধরিয়ে মোমবাতির আলোয় সেটা ভালো করে পড়ে দেখে শ্যামাদাস।
তারপরে বলে— ‘আরে বাবা, আমরা শুধু সাবান আনাই আর বেচি। তাতেই আমরা কোনোরকমে দল চালাই। আর পুলিশের নজরও আছে আমাদের ওপরে। আমরা শুধু শুধু কেন রিভলভার পাচারের রিস্ক নিতে যাব? এদিকে পুলিশ কমিশনার তো বলেই দিয়েছে যে প্যাকেটে নাকি রিভলভার পাচার হচ্ছিল।’ শ্যামাদাস সিগারেটে ঘনঘন তিন চারটে টান মেরে আবার বলতে শুরু করে— ‘তা বেশ। তর্কের খাতিরে না হয় ধরেই নিলাম যে রিভলভার পাচার হচ্ছিল। তা পুলিনের সৎকারের সময় তো পুলিশ উপস্থিত ছিল গ্রামে। তাহলে আমাদের তো এতক্ষণে অ্যারেস্ট হয়ে যাওয়ারই কথা। তাই না?’ শ্যামাদাস বেশ একটু উত্তেজিত হয়ে পড়েছে।
আবার সিগারেটে টান মেরে ধোঁয়া উড়িয়ে বলে— ‘আসলে পুলিশ আর সাংবাদিক এরা দু-জনেই মিথ্যে মিথ্যে খবর সাজায়। এদের কাউকেই বিশ্বাস করতে নেই। সবাই ইংরেজদের চাটুকার। এসব মনগড়া খবর পাবলিককে না খাওয়ালে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে কাগজগুলোর। শোনোনি ‘‘যুগান্তর’’-এর কথা?’
—‘তা শুনেছি।’
—‘তাহলেই বোঝ।’ আবার সিগারেটে টান মারে শ্যামাদাসদা। ‘মাঝখান থেকে হল কি? আমরা সাবানের প্যাকেটই পেলাম না। তবে আমার কী মনে হয় জানো রজনী, ওই ব্যাটা চীনেটা, আরে কি যেন নাম…ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে, ওয়াং লি, ওই ব্যাটাই মনে হয় অন্য কোনো কাজের সঙ্গে পুলিনকে জড়িয়েছিল। আর তার জন্যেই অকালে প্রাণটা দিতে হল ছেলেটাকে। ইস্্স্্,.. বেচারা বুদ্ধিমান, সাহসী ছেলে। জানো রজনী, ও আস্তে আস্তে আমার ডানহাত হয়ে উঠছিল। আর ঠিক সেই সময়েই কি না…।’ তার গলায় এবার বিষাদের সুর।
শ্যামাদাস খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে। তার উত্তেজনা যে একটু কমেছে তা তার সিগারাটে টান মারা দেখলেই বোঝা যায়।
একটু পরে রজনী বলে— ‘আচ্ছা শ্যামাদা, পুলিন রিভলভার পেল কোথা থেকে? ওর তো এসব জিনিস জোগাড় করার মতো পয়সা নেই। আর পুলিশ আপনাদের এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করেনি?’
শ্যামাদাস আবার উত্তেজিত— ‘আমরা? রিভলভার? কোথা থেকে পাব? আমার তো মনে হয় যে ওই চীনেটাই হয়তো নিজের ধান্দার জন্যে ওকে রিভলভার দিয়ে থাকবে। আর আমাদের ছেলেটাও বোকা, বুঝলে। রক্ত গরম তো, তাই পয়সার জন্যে যে অন্য ধান্দায় জড়িয়েছে তা আমাকে টেরই পেতে দেয়নি। তাতে লাভটা কী হল? বোকার মতো নিজের প্রাণটাই দিলি। ওরে, কেন ভুলে গেলি যে আমরা সশস্ত্র বিপ্লব করি না। ওটা আমাদের লাইন নয়। আর পুলিশ? তারা কি আর আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ না করেই ছাড়বে? যদি সেরকম কিছু ক্লু পেত, তাহলে এতক্ষণে আমরা তো থাকতাম পুলিশ হেফাজতে। তাই নয় কি? আচ্ছা, নাও, কাগজটা ধরো।’ শ্যামাদাস সত্যসংবাদের টেলিগ্রামটা ফেরত দিয়ে দেয় রজনীকে।
শ্যামাদাসের ঘনঘন টানে সিগারেটটা প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। সেটা মাটিতে ফেলে মাড়িয়ে হাতের ঘড়ি দেখল। বললে— ‘নাঃ, এবারে উঠতে হয়।’ তারপর রজনীর কাঁধে হাত রেখে শান্তভাবে বললে— ‘তা তোমার মিউজিয়মের কাজকর্ম ভালো লাগছে তো?’
মাথা নেড়ে সায় দেয় রজনী।
শ্যামাদাস বলে— ‘কাজ করা ভালো। তাতে মন ভালো থাকে। তবে একটা কথা মনে রেখো রজনী— যে তুমি ইংরেজদের অধীনে কাজ করছ। যাইহোক, চলি এবার। এই নে নে তোরাও ওঠ। অনেক রাত হয়েছে।’
শ্যামাদাস সাইকেল চেপে বেরিয়ে যায়। তার পিছু পিছু দিনেশ আর বিষ্টুও। রজনী হাঁটা পথ ধরে।
বাড়ির পথে যেতে যেতে রজনী ভাবতে থাকে— ঝ্যান ইওং হয়ে গেল ওয়াং লি। কিন্তু কেন? সেনেদের বাড়ির পেছনে মশলাপাতি আর দানাদার রাখা হয়েছে ভোজের জন্যে। কিন্তু কীসের জন্যে ভোজ? আর পুলিনকে রিভলভারই বা দিল কে? আর যদিবা অন্য কেউ তাকে অস্ত্রটা দিয়েই থাকে, তাহলে সে কে? ঝ্যান ইওং, নাকি অন্য কেউ? ঝ্যান ইওং-ই যদি অস্ত্রটা দিয়ে থাকে, তাহলে স্বদেশি সাবানের আড়ালে অন্য কীসের ধান্দা করত সে?
সেইদিন রাতে বিছানায় শুয়ে রজনীর মনে হল— এবারে তার অতি বিশেষ কিছু কাজ আছে। কিন্তু সেই কাজগুলো করতে গেলে আগে পুলিশি তদন্ত থেকে নিজেকে আড়াল করার বিশেষ কিছু উপায় তাকে জানতে হবে। সেগুলো কীভাবে করতে হয় তা সে জানে না। আর তার জন্যে কিছু পড়াশোনা করার দরকার। কিন্তু সেই বিশেষ বই সে পাবে কোথা থেকে? হঠাৎ তার মনে হল যে সুবিমল হয়তো তাকে সাহায্য করতে পারে। বলে দেখতে হবে তাকে। তবে ঘুরিয়ে বলতে হবে। পড়াশোনার আসল বিষয়টা তাকে জানতে দেওয়া চলবে না।
.
রবিবার যথারীতি ছেলের দল হাজির। ছোলা-গুড় খেয়ে তারা বলল— ‘স্যার, আজ আর দৌড়তে ইচ্ছে করছে না।’ রজনী বুঝতে পারে ছেলেদের মনের অবস্থা। তাই বলে— ‘ঠিক আছে। কুড়িটা পাক দে অন্তত।’ ছেলেরাও তাই করলে।
ট্রেনিং শুরু হল যথারীতি। কিন্তু রজনীর আজ কেমন যেন মন বসছে না। তবুও একটা নতুন আত্মরক্ষা পদ্ধতি শেখাল সে। যদি কোনো লোক সামনাসামনি এসে দু-হাতে কারোর গলা টিপে ধরে, তখন কীভাবে তার হাত ছাড়িয়ে তার মুখে আঘাত করতে হবে। জোড়ায় জোড়ায় ছেলেরা সেটা প্র্যাকটিস করতে লাগল। আখড়ার খুঁটিতে হেলান দিয়ে রজনী লক্ষ্য করেতে লাগল সব।
হঠাৎ বুনো চেঁচিয়ে উঠল— ‘এই তুই নাকে মারলি কেন?’
জবাব এল— ‘লেগে গ্যাছে। ইচ্ছে করে তো মারিনি।’ কথাটা বলেছে কানাই।
রজনী হাঁ হাঁ করে ছুটে গেল। না, বুনোর লাগেনি তেমন। তবে সে বুঝে গেছে যে এই কানাইকে একটু লেখাপড়ার পালিশ দিতে পারলে…।
তাই সন্ধ্যেবেলা বাস ধরার আগে সে কানাইদের বাড়িতে গেল। তার মা চা দিতে দিতে বললে— ‘গেরামে অবিসম্পেত নেগেচে গো দা-বাবু। একে তো জিনিসপত্তরের দামে হাতে ছ্যাঁকা নাগে, আবার ওদিকে অমন সোমোত্ত ছেলেটা বাপ-মায়ের বুক খালি করে দে চলে গ্যাল।’
চা খেতে খেতে রজনী বললে— ‘আমি কিন্তু একটা বিশেষ কথা বলার জন্যে এখানে এসেছি।’
—‘বলেন না, কী বলবেন।’
—‘বলছিলাম কী, আমি যদি কানাইকে কলকাতায় আমার কাছে নিয়ে গিয়ে রেখে ওকে লেখাপড়া শেখাই, তাহলে আপনাদের আপত্তি আছে কি?’
পুলিনের ঘটানাটা ঘটার পর থেকেই ‘কলকাতা’ নামটাই এখন এই গ্রামের মানুষের কাছে একটা আতঙ্ক হয়ে গেছে। কানাইয়ের মা বাবাও তার ব্যতিক্রম নয়। তাদের ধারণা, কলকাতায় গেলে তাদের ছেলেরও একটা কিছু অমঙ্গল ঘটে যাবে। অথচ তারা রজনীর মুখের ওপরে সরাসরি নাও বলতে পারছে না। তাই কানাইয়ের মা বললে— ‘দা-বাবু, কানাইয়ের বাপ তো একোনো ঘরে ফেরেনি। সে ফিরলে তার সাতে কতা বলে আপনাকে না হয় জানাব। আপনি তো শনিবার শনিবার আসচেনই। তকোন না হয় ওর বাপের সাতে কতা বলে নেবেন।’
রজনী চা শেষ করে বললে— ‘ঠিক আছে। তাইই হবে। আপনারা না হয় আলোচনা করে, ভেবেচিন্তে আমাকে জানাবেন। হাতে সময় আছে।’
এদিকে কলকাতার নাম শুনে কানাই নেচে উঠল— ‘আমি কলকাতায় যাব স্যার। জাদুঘর দেখব, মনুমেন্ট দেখব, ভিক্টোরিয়া দেখব। আমায় সব দেখাবে তো স্যার?’
—‘দেখাব, সব দেখাব। কিন্তু সেখানে গিয়ে তো টইটই করে বেড়ালে চলবে না। আমি স্কুলে ভরতি করে দেব। আমার কাছে থেকে লেখাপড়া করতে হবে, তবেই। আর আমার মতোই প্রতি সপ্তায় বাড়ি ফিরতে পারবি। এবারে আমি চাইলেই তো হবে না। তোর মা বাবারও তো মতামত দরকার, বুঝলি?’
.
দু-দিন পরে আবার ল্যাবে সি-হর্সের ফসিল নিয়ে কাজ করতে করতে ড্যানীবাবু বলতে লাগলেন— ‘বুঝলে রজনী, অদ্ভুত প্রাণী এই সি-হর্স। শিরদাঁড়া আছে। একধরণের মাছ। উষ্ণ অগভীর জলে থাকে। কিন্তু আবার পুরুষ সি-হর্স তার পেটের থলিতে বাচ্চা পালন করে।’
রজনী এসব কথা জানত না আগে। সে বিস্মিত হয়ে বলে— ‘সত্যি?’
—‘আর সায়েন্টিফিক নেম কি জিনিস জানো তো?’
—‘আজ্ঞে না।’ সে তো আর সুবিমলের মতো বিজ্ঞানের ছাত্র নয়। সে এইসব বিজ্ঞানের ভাষা বুঝবে কী করে?
—‘তাহলে শোনো, বুঝিয়ে দিচ্ছি। সায়েন্টিফিক নেম হল ল্যাটিন বা গ্রিক ভাষা থেকে শব্দ বেছে নিয়ে কোনো প্রাণী বা উদ্ভিদের নাম দেওয়া। অবশ্য তাতে ইংরেজি শব্দ বা যেখান থেকে এটা পাওয়া গেছে সেটাও ওই নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে।’
রজনীর কাছে ব্যাপারটা অর্ধবোধ্য থেকে যায়। তাই সে চুপ করে থাকে।
তার এই অবস্থা দেখে ড্যানীবাবু বলতে থাকেন— ‘আচ্ছা ধরো, আমরা জলকে বলি ‘‘জল’’, অবাঙালিরা বলে ‘‘পানি’’ আবার ইংরেজরা বলে ‘‘ওয়াটার’’। এ ছাড়া ভিন্ন ভিন্ন ভাষাতেও জলের ভিন্ন ভিন্ন নাম থাকতে পারে। কিন্তু যে শুধু জলকে ‘‘ওয়াটার’’ বলেই জানে, তাকে তুমি ‘‘জল’’ বা ‘‘পানি’’ বললে সে কি বুঝতে পারবে তুমি কোন জিনিসটা বোঝাতে চাইছ?’
—‘আজ্ঞে না।’
—‘আর ঠিক সেজন্যেই ওই সায়েন্টিফিক নেমের দরকার। ওই নামটা বললেই পৃথিবীর যেকোনো জীব-বিজ্ঞানী ওই বিশেষ প্রাণী বা উদ্ভিদটাকে সহজেই চিনতে পারবে। এবার বুঝলে?’
—‘বুঝলাম স্যার। তা এই সি-হর্সের সায়েন্টিফিক নেম কি সি-হর্সই?’
—‘আরে না না। গ্রিক ভাষা থেকে নেওয়া ওই চার-পাঁচ ইঞ্চি লম্বা মাছটার সায়েন্টিফিক নেম শুনলে তুমি হাসবে।’
—‘কী নাম স্যার?’
—‘হিপ্পোক্যামপাস স্লোভেনিকাস। জানো, গ্রিক শব্দ অনুযায়ী ‘‘হিপ্পো’’ মানে হল ‘‘ঘোড়া’’ আর ‘‘ক্যাম্পাস’’ শব্দটা এসেছে ‘‘ক্যাম্পোস’’ শব্দ থেকে যার মানে হল ‘‘সমুদ্র দানব’’।’ বলে হো হো করে হেসে ওঠেন ড্যানীবাবু।
—‘বলেন কি স্যার। এই চার-পাঁচ ইঞ্চি প্রাণীটার নাম এত ভয় জাগানো?’
—‘আসলে এর মুখের দিকটা হল ঘোড়ার মতো আর শরীরের গড়নটা অদ্ভুত রকমের বলেই হয়তো এই নিরীহ প্রাণীটার এইরকম নাম দেওয়া হয়েছে।’
—‘আর ওই বাচ্চা পালন ব্যাপারটা কী?’
—‘তাহলে শোনো, পুরুষ সি-হর্সের ল্যাজের ঠিক ওপরে পেটের সামনের দিকে ক্যাঙ্গারুর মতো একটা থলি থাকে। মাদী সি-হর্স ওই থলিতে প্রায় পনেরোশো ডিম পেড়ে দেয়। তারপরে ওই পুরুষ সি-হর্সের থলিতে ডিম ফুটে বেরোনো বাচ্চাগুলো বড়ো হতে থাকে। এরপরে ওই বাচ্চাগুলো যখন বড়ো হয়, এই সরু সুতোর মতো আর কী, তখন পুরুষ সি-হর্স তাদের জলে ছেড়ে দেয়। আরও জেনে রাখো যে প্রজাতি ভেদে এই লালন পালনের সময়টা ন-দিন থেকে পঁয়তাল্লিশ দিন পর্যন্ত হতে পারে।’
রজনী তো শুনেই অবাক। শুধু বললে— ‘বুঝলাম স্যার।’
—‘গুড। তা তোমার ওই ছেলেটার জন্যে হিন্দু স্কুলে ফোন করতে হবে তো?’
—‘হ্যাঁ স্যার, তবে মাস দুয়েক পরে করবেন।’
—‘কেন? মাস দুই পরে কেন?’
—‘আসলে ওই ছেলেটার মা একটু গাঁইগুঁই করছে। এর মাঝে আমি সময় সুযোগ করে ওর বাবাকে বুঝিয়ে বলব।’
—‘হ্যাঁ হ্যাঁ, সেটা তো ঠিকই। তবে তোমার এই ভালো কাজটার জন্যে তোমাকে একটা ‘‘সাবাশ’’ বলতেই হয়। জানবে আমি তোমার পাশে আছি। সময় এলেই বল, আমি হিন্দু স্কুলে ভরতির আগেই ফোন করব। আর হাতে তো এখনও অনেক সময় আছে। জানুয়ারি মাস না পড়লে তো ভরতি নেবে না।’
—‘ঠিক আছে স্যার। আপনি যা ভালো বুঝবেন তাই করবেন।’
