১৯৫০ – মেসোমশাইয়ের ব্ল্যাক-আউট, সোনার বিস্কুট, কানাইয়ের রেজাল্ট আর মোকাম্বোতে প্যাম ক্রেন

১৯৫০ – মেসোমশাইয়ের ব্ল্যাক-আউট, সোনার বিস্কুট, কানাইয়ের রেজাল্ট আর মোকাম্বোতে প্যাম ক্রেন

ভারত তো স্বাধীন হয়েছে তিন বছর হল। কিন্তু শরণার্থীর স্রোতে ভেসে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা আর পাঞ্জাব। পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায় আপ্রাণ চেষ্টা করছেন এই রাজ্যে আসা শরনার্থীর স্রোত সামাল দিতে। উদ্বাস্তু পুনর্বাসন, সাম্প্রদায়িক সংঘাত, বেকারত্ব আর খাদ্যসংকটের বিপুল সমস্যা মাথায় নিয়েও কাজ করে চলেছেন তিনি। কর্মযোগী পুরুষ। তাই স্বাধীন ভারতকে এক নতুন পশ্চিমবঙ্গ উপহার দিতে চান। সেইজন্যেই দেশের সবাই সম্মান করে, ভালোবাসে এই অকৃতদার মানুষটাকে।

এইরকম সময়ের এক সকালে পরিতোষ বাবু মৰ্নিং-ওয়াক সেরে এসে আর্মচেয়ারে বসে চা খেতে বসেছেন। ইদানীং একটা জিনিস লক্ষ্য করেছেন উনি। একটু বেশি হাঁটাহাঁটি করলেই হাঁপিয়ে পড়ছেন কেমন। মনে হয় যেন বুকে একটা চাপধরা ভাব। অবশ্য বাড়ির কাউকে এসব কথা বলেননি তিনি, পাছে সবাই দুশ্চিন্তা করে। তবে ইচ্ছে আছে দু-চার দিনের মধ্যেই একদিন সন্ধেবেলা বেরিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে আসবেন। কেষ্ট চা-বিস্কুট দিয়ে গেলে রেডিয়োর নবটা ঘোরান। একটু পরেই খবর শুরু হবে। কিন্তু কি জানি কেন আজ আর তাঁর খবর শুনতে ইচ্ছে করছে না। তাই অফ করে দিলেন রেডিয়োটা। চেয়ারে শরীরটা ছড়িয়ে দিয়ে বসে রইলেন চুপ করে। মনে হতে লাগল— অনেকদিন দুই মেয়ে আর নাতি-নাতনিদের মুখ দেখেননি তিনি। যুদ্ধ, দাঙ্গা, স্বাধীন ভারতের নতুন নতুন আইন ইত্যাদি নানান ঝক্কির ঠেলায় আসতে পারেনি তারা। তবে ফোনে কথা হয়েছে। এইতো দু-হপ্তা আগেই ছোটোর সঙ্গে কথা হল। ভালোই আছে তারা। তার দিন দশেক আগে ফোন করেছিল বড়োজামাই। তখন মেয়ে আর নাতির সঙ্গেও কথা হল। বড়ো নাতিটা বাংলাতেই কথা বলে তাঁদের সঙ্গে, তবে তাতে ইংরাজি টানটা থাকে। আর সেটাই তো স্বাভাবিক। সে তো ছোটোবেলা থেকেই ইংরাজি ভাষার আবহে বড়ো হচ্ছে কি না। তবে বাড়িতে বাংলার চর্চা আছে বলেই সে বাংলাতেও কথা বলতে আর বুঝতে পারে। তাতে খুশি উনি। অনেক প্রবাসী বাঙালি তো বাংলাকে ব্রাত্য ভাষা বলেই মনে করে। কিন্তু এদের ক্ষেত্রে সেটা হয়নি।

তবে অনেকদিন ধরেই তাঁর ইচ্ছে করছে ওদের দেখার। আর আজ সকালে যেন তাঁর সেই ইচ্ছেটাই আরও প্রবল হয়ে উঠেছে। ফ্লোরিডায় এখন প্রায় রাত সাড়ে ন-টা। এই সময়টাতেই কথা হয় বড়োর সঙ্গে। ওরাই ওদের সুবিধেমতো কল করে। আর অস্ট্রেলিয়ার পার্থ থেকে ছোটো ফোন করে বিকেল নাগাদ। তাদের সঙ্গে কথা বললে মনে হয় যে এখনও তাঁর রক্ত বহন করে কয়েকটা মানুষ সুখে আছে পৃথিবীর দুই প্রান্তে।

এদিকে কেষ্টর রেখে যাওয়া চা টা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। তাই সেটা নেবার জন্যে শরীরটা তুলতে যেতেই সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল। বেশ কয়েকমিনিট পরে আস্তে আস্তে চোখ মেললেন তিনি।

না, আজ সন্ধেবেলা ডাক্তারকে দেখাতেই হবে। এই সিম্পটমের অর্থ ভালোই জানেন পরিতোষ বাবু।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *