১৭ অগাস্ট, ১৯৪৬
পরের দিন সকালে ছাদে উঠতেই সবাই বুঝতে পারল অবস্থা কতটা ভয়ানক। বাড়ির সামনের রাস্তাটা একেবারে খাঁ খাঁ করছে। দূরের আকাশে কালো ধোঁওয়া এখনও উড়েই চলেছে। তবে সবচেয়ে বীভৎস হল তাদের বাড়ির কিছুদূরে পড়ে থাকা মৃতদেহগুলোর অবস্থা। কাল রাতের অন্ধকারে যে ক্রুরতা স্পষ্ট দেখা যায়নি, এখন দিনের আলোয় তা অতিমাত্রায় প্রকট।
কারোর হাত-পা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন, কারোর বা ধড়-মুন্ডু আলাদা। চেরা পেট থেকে বেরিয়ে এসেছে নাড়িভুঁড়ি। কারোর বা একটা পা উর্দ্ধমুখী হয়ে টানটান। রাস্তা ভিজিয়ে রক্ত গড়িয়ে গেছে। তারই কালো ছোপ রাস্তার ঢাল বেয়ে নেমে গেছে পাশের নর্দমায়। রাস্তার দুটো নেড়ি কুকুর শবের পেট থেকে বেরিয়ে আসা অন্ত্র চিবোচ্ছে মহাসুখে। চেটে নিচ্ছে শবদেহের অবশিষ্ট রক্ত আর দেহরস।
হঠাৎ কোথা থেকে একটা শকুন উড়ে এসে বসলো মন্টুর চায়ের দোকানের চালায়। কুকুরদের ভয়ে তার একা নামতে সাহস হচ্ছে না বোধ হয়; তাই অপেক্ষা করছে দলবলের জন্যে।
দেখতে দেখতে মিনিট পাঁচ-সাতেকের মধ্যেই আকাশ থেকে নেমে এল আরও সাত-আটটা শকুন। এবারে তারা দলে ভারী হয়েছে। দেখতে দেখতে তারা ডানা মেলে ঝাঁপিয়ে পড়ল রাস্তায় পড়ে থাকা শবদেহগুলোর ওপরে। তাদের দাপটে কুকুরদুটো ভয় পেয়ে পালাল। দূর থেকে শকুনদের দাপাদাপি দেখে তারা চলে গেল অন্য কোথাও; হয়তো বা অন্য কোনো শবের সন্ধানে।
কয়েক মিনিটে এসে জুটলো আরও দুটো শকুন। তারা নামতেই ঝগড়া বাঁধল আগের দলের সঙ্গে। এত্তো খাবার! এত অযাচিত খাবার! তবু খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি। শবের শ্রেষ্ঠ অংশটা কে খাবে তাই নিয়ে। সব দেখেশুনে রজনীর মনে হয়— তার মাতৃভূমিও যেন আজ ওই শবদেহগুলোর মতোই, যাকে ছিঁড়ে খাচ্ছে কিছু মানুষরূপী শকুন। শকুনগুলো তবু ভালো। তারা শবের পুরোটাই খেয়ে সাফ করে দেয়; আর মানুষরূপী শকুনগুলো?… না, আর ভাবা যাচ্ছে না। সাময়িক হতাশায় ডুবে যায় রজনী।
এই দৃশ্য দেখে মাসিমা বলে উঠলেন— ‘ইস মা গো, কী সাংঘাতিক!’
কানাই যেন আরও বেশি চুপচাপ। রজনী জানে— এইসব নারকীয় দৃশ্য কিশোর মনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সে বলে— ‘মাসিমা আপনি কানাইকে নিয়ে নীচে যান। আমার মনে হয় সেটাই ভালো হবে।’
.
এদিকে বেলা যত বাড়ছে, ততোই আরও জোরালো হচ্ছে ‘আল্লাহ হু আকবর’ আর ‘বন্দে মাতরম’ আওয়াজ। অথচ রাস্তায় কোনো মিলিটারি গাড়ি বা দমকলের চলাচলের আওয়াজ নেই। তার মানে পুলিশ আর মিলিটারির গাড়িও আর শহরের দাঙ্গা সামলাতে পারছে না।
দুপুরের দিকে একটা ফোন এল। ড্যানীবাবুর ফোন। সামান্য কুশল বিনিময়ের পরে উনি রজনীকে জানালেন— ‘জানো, আজ মেটেবুরুজের কেশোরাম কটন মিলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওদের ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট তাতে মদত জুগিয়েছেন।’
—‘তাই নাকি?’
—‘জানো রজনী, শুধু তাইই নয়, ওই মিল বস্তির সাতশো শ্রমিককেও খুন করা হয়েছে, তাদের বস্তিতেও আগুন লাগানো হয়েছে। ওরা বেশির ভাগই উড়িষ্যাবাসী।’
—‘সাতশো লোক? তা পুলিশ?…’
তার কথা কেটে দিয়ে উত্তেজিত ড্যানীবাবু বলেন— ‘পুলিশের বাপ-ঠাকুরদার সাধ্য নেই কিছু করার, তবে শুনেছি মিলিটারি নাকি যাচ্ছে সেখানে। আর…।’
—‘আর কী স্যার? বলুন।’
—‘শুনলাম গোপাল পাঁঠা আর যুগল ঘোষও নাকি যাচ্ছে।’
—‘হ্যাঁ, যা ভেবেছ, ঠিক তাইই। অবস্থা আরও গুরুতর হবে। গান্ধীবাদী যুগলও এসব দেখে খেপে গেছে। সেও তার দলের ছেলেদের অ্যাকশন নিতে ইনস্ট্রাকশন দিয়েছে। তাদের চাগিয়ে তোলার জন্যে রিওয়ার্ডও ঘোষণা করেছে। তবে এসব কথা রেডিয়োতে বলবে না নিশ্চয়ই। তাতে উত্তেজনা আরও ছড়াতে পারে।’
—‘তা স্যার আপনি এইসব জানলেন কোথা থেকে?’
—‘তুমি কি ভুলে গেলে রজনী যে সোসাইটির ওপরমহলের মানুষদের সঙ্গে আমার একটু আধটু আলাপ পরিচয় আছে?… যাইহোক, তোমরা সবাই সাবধানে থেকো আর আমি কাল আবার ফোন করব। আচ্ছা, এখন রাখছি।’
—‘আপনিও সাবধানে থাকবেন স্যার।’ কিন্তু ততক্ষণে ফোনটা কেটে দিয়েছেন ড্যানীবাবু।
ফোনটা রাখতেই মেসোমশাই কিঞ্চিত গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করলেন— ‘ফোনটা কার? স্যার, স্যার করছিলে যে?’
—‘আজ্ঞে মেসোমশাই মিউজিয়মের দীনুবাবু ফোন করেছিলেন। আমরা ঠিকঠাক আছে কি না জিজ্ঞেস করলেন।
—‘আর কিছু বললেন না? ‘সাতশো’ না কি যেন একটা কথা বললে যে তুমি।’ মেসোমশাইয়ের স্বর সন্দিগ্ধ।
কানাই, মাসিমা আর কেষ্টদা কাছেই রয়েছে। তাই মেসোমশাইয়ের পাশে বসে একটু নীচু গলায় রজনী বলে— ‘হ্যাঁ, কেশোরাম কটন মিলে আর সেখানকার বস্তিতে আগুন ধরানো হয়েছে। প্রায় সাতশো মানুষকে খুন করা হয়েছে।’
গম্ভীর হয়ে যান মেসোমশাই। ভ্রু দুটো কুঁচকে যায় তাঁর। নিজের মাথার পাকা চুলে হাত বুলোতে বুলোতে বললেন— ‘হুম, বুঝলাম।… শোনো, দুপুরবেলা তুমি আর কেষ্ট একটু ঘুমিয়ে নিও। ওই সময়টা আমি ছাদে থাকব। আর কেষ্ট, শোন, কালকের মতো আজও উনুনে জল চাপিয়ে রাখিস আর পারলে কিছু আধলা ইঁটও তুলে রাখিস। উঠোনের কোণে অনেক ইঁটের টুকরো রাখা আছে।’
মেসোমশাই থামলেন বটে, কিন্তু তাঁর বলা কথা থেকেই রজনী বুঝতে পারে যে দাঙ্গা আরও প্রবল হতে পারে। আরও প্রবল হতে পারে জনজীবনে তার অভিঘাত।
তাই সে বলে— ‘দুপুরে আমি চিলেকোঠায় ঘুমোবো মেসোমশাই। আসলে সে মেসোমশাইকে ছাদে একলা ছাড়তে চায় না।
—‘ঠিক আছে তাইই কর।’
সেদিন দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পরে রজনী নিজের ঘরে একবার উঁকি মেরে দেখল। জানলা সব বন্ধ করে ক্লান্ত কানাই বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছে। সে তাই কাছে গিয়ে সাবধানে বইটা নিয়ে সরিয়ে রাখতে গিয়ে দেখে, কানাই যে বইটা পড়ছে সেটা হল বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা ‘আনন্দমঠ’।
