১৯৪৩, জানুয়ারি
জাপানি বোমা, তাইকোন্ডো আর রজনীকান্ত
গ্রামের একপাশে একটা দু-কামরার মাটির বাড়ি। খড়ের ছাউনি দেওয়া। সেই বাড়ির আধ মাইল দূর দিয়ে বয়ে গেছে দামোদরের এক শাখানদী। বর্ষাতে এই নদী ভরভরন্ত থাকে। তখন নদীর বুকে ঘোলা জলের ঘূর্ণী পাক খেয়ে খেয়ে ওঠে। মাঝে মাঝেই ঝুপ-ঝাপ আওয়াজ তুলে স্রোত টেনে নেয় চাঙড়-চাঙড় পাড়ের মাটি। খসে পড়া সেই মাটি মিলিয়ে যায় নদীর ঘোলা জলে। আবার কখনো কখনো নদীর জলে দূরের কোনো বানভাসি গ্রাম থেকে ভেসে আসে খড়ের চাল, কাঠকুটালি আর গোরু ছাগলের ফুলে ফেঁপে ওঠা শব। এইসব নিয়েই বয়ে চলে নদী তার আপন পথে।
আবার শরৎ এলে ক্রমে কমতে থাকে নদীর জল। তখন নদীর বুকের জলঘেরা ছোটো ছোটো চড়ায় গজিয়ে ওঠা কাশফুলের ঝাড় তাদের সাদা মাথা দুলিয়ে জানান দেয়— আর ক-দিন পরেই সন্ধের বাতাসে লাগবে হিমের ছোঁয়া।
ক্রমে হেমন্ত আসে। এরপরে যত দিন যায়, ততোই কমতে থাকে জল। দক্ষিণে হেলে পড়তে থাকে সূর্য। তারপরে একসময় শীতের শুখা মরশুমে বালির চড়া আর ছিপছিপে জল মিলেমিশে থাকে নদীর বুকে। সেই জলে ফুরফুরে ঝিলিক তুলে খেলে বেড়ায় সোনালি রোদ্দুর আর তখন গায়ে শীতের রোদ্দুর মেখে নদীর ওই ছিপছিপে জলে দাপাদাপি করে গ্রামের ছেলেরা। তারা কেউ আধভেজা বালির ওপরে গড়াগড়ি খায় আবার কেউবা নদীর পাতাডোবা জলে চিত হয়ে শুয়ে পা দিয়ে জল ছোঁড়ে। শীতের রোদ্দুরের তাপে সেই ঈষদুষ্ণ জলে স্নান করে ভারি আরাম। তবে মাঝনদীর দিকে গ্রামের কেউই যাবার সাহস করে না; কারণ মাঝনদীর বুকে যেখানে সেখানে ওঁত পেতে বসে আছে চোরাবালি। একটু বিপথ হলেই গিলে খাবে সে। তবে গ্রীষ্মকালে এ ধারের দিকের নদীর চড়ায় কোথাও কোথাও কেউ কেউ তরমুজের চাষ করে আর শিয়ালের হাত থেকে ফসল বাঁচাতে সেই ক্ষেত ঘিরে দেয় বাবলা কাঁটার বেড়া দিয়ে, কেন না সেই শুকনো নদীর ওপারেই শুরু হয়ে গেছে জঙ্গল। সেই জঙ্গলে বাঘ, চিতাবাঘ কিংবা হরিণ নেই বটে; তবে সেখানে ঘর বেঁধে থাকে বুনো শুয়োর, বেজি, শজারু, ভাম, নানান জাতের সাপ, পাখপাখালি আর শিয়ালের দল। সন্ধের আগে তারা অনেকেই জল খেতে আসে নদীতে। তাই ওই জঙ্গলে গ্রামের মানুষ বড়ো একটা কেউ ঢোকে না। তবে ওপাড়ের দিকে মাঝেমাঝে আদিবাসীরা ঢোকে ওই জঙ্গলে। তারা ঢোকে শজারু মারতে। মাংস খাবে বলে। তাই গ্রামের মানুষ পারতপক্ষে এড়িয়েই চলে জঙ্গলকে। বিশেষত বিষাক্ত সাপের জন্যে।
কিন্তু সবাই কি? কেউ একজন, এই গ্রামেরই মানুষ, প্রায়ই ঢোকে ওই জঙ্গলে। বিশেষ করে রাতের আঁধারে। নদীর বুককে সে চেনে তার হাতের তালুর মতো। তবে তার এই ব্যাপারের কথা গ্রামের মানুষ কেউ জানে না।
আজ শুক্রবার। তবে ক-দিন অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে রজনী। বেলা প্রায় তিনটে হবে। খানিক হেলে পড়া শীতের সূর্যে সবে সোনালি রং ধরতে শুরু করেছে। হালকা ধোঁয়াশায় ঢাকতে শুরু করেছে ওপাড়ের জঙ্গল। পড়ন্ত বেলায় দাওয়ায় বসে সে তাকিয়ে আছে দূরের ওই জঙ্গলের দিকে। ছোটোবেলার কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে তার ওই জঙ্গলকে ঘিরে। ওই জঙ্গল যে তাকে অন্যভাবে লড়তে শিখিয়েছে, বাঁচতে শিখিয়েছে, শিখিয়েছে নানান গুপ্তবিদ্যে। সে জানে জঙ্গলেরও ভাষা আছে। সে ভাষা সবাই বোঝে না। সে ভাষাকে পড়তে, জানতে হয়। জঙ্গলকে ভালোবাসতে জানলে, দিনের পর দিন তার সাথে মিশলে তবেই জানা যায় তার সেই অব্যক্ত ভাষা। ছোটোবেলা থেকে সে মিশেছে ওই জঙ্গলের সঙ্গে। তাই আজ সে জানে জঙ্গল কখন কী বলতে চায়।
.
পুরোনো স্মৃতিতে একটু ডুবে গিয়েছিল রজনীকান্ত।
এমন সময় মাথার ওপরে গোঁ-গোঁ শব্দ।
রজনী আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে-উড়ে যাচ্ছে একটা প্রমাণ সাইজের যুদ্ধবিমান। গায়ে তার ইউনিয়ন জ্যাকের ছাপ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে সেই ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। তাই মাঝেমধ্যেই যুদ্ধবিমানের আওয়াজ শোনা যায় এই গ্রামের শান্ত আকাশেও। হয়তো রসদ বা গোলাবারুদ নিয়ে তারা উড়ে যায় কলকাতার দিকে। তবে তাদের গ্রামে যুদ্ধের আঁচ তেমন না পড়লেও, সেখানে বাংলার দুর্ভিক্ষের ছাপ ক্রমে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। চালটা, আলুটা না হয় এখানে হয়; কিন্তু ডাল, তেল, নুন আর নানান মনিহারী জিনিসের দাম আক্রা। আর কলকাতায়? সেখানে নির্মম দুর্ভিক্ষ আর নির্দয় বিশ্বযুদ্ধ দুটোরই ছাপ অত্যন্ত প্রকট। নেহাত কলকাতায় চাকরি করে বলেই রজনীকান্ত জানে সে কথা।
সেখানে বিমান হানা থেকে বাঁচাতে হাওড়া ব্রিজের দু-পাশে স্টিলের দড়িতে বেঁধে আকাশে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে পটলের মতো দেখতে সারি সারি গ্যাস ভরা বেলুন; যাতে নাকি জাপানি যুদ্ধবিমান গোঁত্তা খেয়ে ব্রিজের ওপর বোমা ফেলতে এলে জড়িয়ে যায় ওই গ্যাস বেলুনে; মুখ থুবড়ে পড়ে নীচের নদীর জলে। ওদিকে রেড রোডেও গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ফোর্ট উইলিয়ম থেকে। সেখানে এখন ব্রিটিশের যুদ্ধবিমান ওঠানামা করে। ধর্মতলা থেকে খিদিরপুরের দিকে যেতে রেড রোডের পরেই যে রাস্তাটা বাঁয়ে চলে গেছে, সেখানের মাঠে শালখুঁটি পুঁতে, তার ওপরে খড়ের চাল তৈরি করে বানানো হয়েছে যুদ্ধবিমানের জন্যে অস্থায়ী হ্যাঙ্গার আর খিদিরপুরের দিকের রাস্তার পাশের মাঠে ব্রিটিশ সেনা ছাউনি গেড়েছে। সেখানে বসিয়েছে অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট গান। জাপানি-বিমান এলেই সেগুলো আকাশমুখী হয়ে গর্জে ওঠে। এদিকে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের দুধসাদা পাথরের ওপরেও পড়েছে কালো রঙের পোঁচ; যাতে নাকি রাতের আঁধারে ওই ধবধবে সাদা সৌধ শত্রু-বিমানের নজরে না পড়ে।
অন্যদিকে সরকারি নির্দেশে রাস্তার টিমটিমে বিজলী বাতির বাল্বগুলোর ওপরের দিকটায় কালো রং করে দেওয়া হয়েছে। যাতে ওই বাতি থেকে শুধুমাত্র রাস্তাতেই আলো পড়ে। অফিস-কাছারি, বসতবাড়ির সমস্ত কাঁচের জানলায় কাগজ সেঁটে দেওয়া হয়েছে। সেখান দিয়ে যেন ভেতরের এক চিলতে আলোও বাইরে না আসে। তা ছাড়া কাগজ সাঁটা থাকলে বোমার ভাইব্রেশনে জানলার কাঁচও ভেঙে পড়বে না। এদিকে আবার সব গাড়ির হেডলাইটের কাঁচের ওপরের আধখানাও কালো রং করা হয়েছে, যাতে সেই আলো শুধুমাত্র রাস্তাতেই পড়ে। সব মিলিয়ে একেই বলে ‘ব্ল্যাক-আউট’। এর ফলে আকাশ থেকে কলকাতাকে শহর বলে চেনা মুশকিল হবে কিংবা শত্রু-বিমান তার টার্গেট গুলিয়ে ফেলবে আলো-আঁধারির খেলায়।
কিন্তু তবু তারা আসে। দু-চারদিন ছাড়া ছাড়াই আসে। আকাশ কাঁপিয়ে আসে, মানুষের বুক কাঁপিয়ে আসে— বিমানের ইঞ্জিনের শব্দে, সাইরেনের তীক্ষ্ণ ওঠাপড়া গোঙানিতে আর অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট গানের রাট-ট্যাট-ট্যাট শব্দে। তাদের টার্গেট কলকাতা আর তার আশেপাশের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো। ফোর্ট উইলিয়ম, হাওড়া ব্রিজ, টালার জলের ট্যাঙ্ক, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, খিদিরপুরের ডক আর পোর্ট, দমদম আর বারাকপুরের বিমানবন্দর, ডালহৌসির অফিসপাড়া, এইরকম আরও কত কিছু।
সরকার থেকে বলা হয়েছে যে বিপদসংকেতের সাইরেন বাজলেই গৃহস্থেরা যেন সবাই আলো নিভিয়ে বা একেবারে কম করে ঘরের খাট বা তক্তপোশের নীচে ঢুকে উপুড় হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে কনুইয়ে ভর রেখে কানে আঙুল গুঁজে শুয়ে থাকে। তাতে বিপদ থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পাওয়া যাবে। ছাদ ধ্বসে পড়লেও খাটের নীচে থাকা মানুষগুলো প্রাণে বাঁচবে। অন্যদিকে অফিস-কাছারির সামনে খোলা জায়গায় বালির বস্তা সাজিয়ে ঘেরা জায়গা তৈরি করা হয়েছে। এমনকী ব্যস্ত রাস্তার দু-পাশেও মাঝে মধ্যেই করা হয়েছে এমনই অনেক বালির বস্তার ঘেরাটোপ। সাইরেন শুনলেই পথচলতি মানুষ আশ্রয় নেয় সেখানে। বোমার স্প্লিনটার ছিটকে এলেও আটকে যাবে ওই বস্তার বালিতে। বাঁচবে মানুষের প্রাণ। এন সি সি-র ছেলেরা আর সিভিক ভলেন্টিয়াররা শহরের সমস্ত বাড়ি আর অফিস-কাছারিতে ঘুরে হাতে কলমে দেখিয়ে দিয়ে গেছে সব। বিমানহানা হলে কী করা উচিত আর কী উচিত নয়, তার নির্দেশিকা ছাপিয়ে বিলি করে গেছে সর্বত্র।
এই যেমন সেদিন। ডালহৌসিতে ফ্রেডরিক সায়েবের অফিসে বসে নিজেরই একখানা চাকরির দরখাস্ত টাইপ করছিল রজনী। সে শুনেছে যে কলকাতার জাদুঘরে নাকি লোক নেবে। তাই এই দরখাস্ত লেখা। আসলে এখনকার এই চাকরিটাতে মাইনে খুব একটা বেশি নয়। তাই সে একটা ভালো চাকরি খুঁজছে। এমনসময় হঠাৎই বেজে উঠল ওঠানামা গোঙানির সাইরেন। মানে বিমানহানা শুরু হয়েছে। বেলা তখন প্রায় চারটে। সাইরেনের আওয়াজ শুনেই হুড়মুড় করে সবাই নামতে লাগল নীচে। একেবারে নীচের উঠোনে বালির বস্তার ঘেরাটোপে আশ্রয় নিতে হবে জলদি।
সব্বাই দুদ্দাড় করে নামছে পুরোনো বাড়ির কাঠের তৈরি সিঁড়ি বেয়ে। এমন সময় ঘটল বিপত্তি। আর সেই বিপত্তিটা ঘটালেন হেডক্লার্ক আমিনুল হক। সাঁকরাইলে বাড়ি। একটু ভারী চেহারার মানুষ। হুড়মুড় করে নামতে গিয়ে তাঁর ঝুলন্ত ধুতির পাড় জড়িয়ে গেল পাম্প সু-র ডগায়। হাত থেকে ছিটকে গেল পানের ডিবে। ল্যান্ডিং-এ ছড়িয়ে পড়ল সেই ডিবে আর জর্দাপানের খিলিগুলো আর তিনি দুটো সিঁড়ি টপকে হুমড়ি খেয়ে সরাসরি গিয়ে ল্যান্ড করলেন তাঁর পানের ডিবের পাশেই। কাঠের মেঝেতে ঠুকে দাঁতের ঘায়ে কেটে গেছে নীচের ঠোঁটটা। রজনী আর শম্ভু ঘোষ দু-জনে মিলে টেনে তুলল তাদের আমিনদাকে। ঠোঁট থেকে তখন রক্ত গড়াচ্ছে, কিন্তু তাতে তাঁর ভ্রূক্ষেপ নেই। তিনি তাঁর সাধের নেশার জর্দাপানের খিলিগুলো তুলে ডিবেতে রাখতে ব্যস্ত। তাই দেখে রজনীরা তাঁকে বারণ করছে। কিন্তু বারণ করলে শুনছে কে? ভাগ্যিস তখন ফ্রেডরিক সায়েবের আর্দালি রডরিক্স ডি-ক্রুজ অফিসে তালা লাগিয়ে হুড়মুড় করে নামছিল নীচে। তারই হাঁটুর গোঁত্তা খেয়ে সোজা হলেন আমিনদা। ডি-ক্রুজ ধ্যাতানি দিলে— ‘গড ড্যাম আমিনবাবু, গেট ডাউন ইমিডিয়েটলি। গেট ডাউন।’ গোয়ানিজ হয়ে রডরিক্সের এই নিজেকে সায়েব ভাবাটা রজনীর মোটেই সহ্য হয় না। তবে এখন তার ধ্যাতানিতেই কিন্তু কাজ হল। বাকি ক-টা পানের খিলি তাড়াতাড়ি কুড়িয়ে নিয়ে ডিবেতে ভরতে ভরতে ভারী শরীর নিয়ে যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব নীচে নেমে উঠোনে পৌঁছে গেলেন। বালির বস্তার ঘেরাটোপে গিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লেন সেই রডরিক্সেরই পাশে। দাঁতে দাঁত চাপতে গিয়েই টের পেলেন যে তাঁর নীচের ঠোঁটটা কেটেছে। নোনতা স্বাদ রক্তের। তবুও ডিবে খুলে একখিলি পান মুখে পুরে ডিবে বন্ধ করে পকেটে রাখলেন। তারপরে দু-কানে আঙুল গুঁজে কনুইয়ের খোঁচা মেরে রডরিক্সকে জিজ্ঞেস করলেন— ‘এই রাডু, মুখের লালা আর পানের রসে রক্ত বন্ধ হয়ে যায়, না রে? তাহলে আর টিটেনাস নিতে হবে না, কি বল?’ ভাগ্যিস দু-কানে আঙুল গোঁজা ছিল, তাই রডরিক্স আমিনদার কথা শুনতে পায়নি। তার ওপরে সাইরেনের আওয়াজ। রীতিমতো টেনশন। তাই কনুইয়ের খোঁচা খেয়ে দুর্মুখ রডরিক্স খিঁচিয়ে উঠল— ‘ইউ শাট আপ, ব্লাডি আমিনবাবু।’ ব্যাস, আমিনদা চুপ। আর তারপরই একটা বিকট আওয়াজ। দূরে কোথাও বোমা ফেলেছে জাপানিরা আর তাতেই থরথর করে কেঁপে উঠেছে ডালহৌসির অফিসপাড়া। গোঁ-গোঁ করে আকাশ দাপিয়ে উড়ে যাচ্ছে ব্রিটিশ যুদ্ধবিমানও। কী হবে কে জানে? এবার কি অফিসপাড়াতেই পড়বে বোমা? এর আগেও তো পড়েছে এই পাড়ায়। ভাবতে না ভাবতেই আবার বিকট আওয়াজ। মানে, আবার বোমা। কিন্তু কোথায় পড়ল? সাইরেন তো বেজেই চলেছে একটানা যুদ্ধবিমানের আওয়াজকে সঙ্গী করে। সবার মনেই মৃত্যুর আতঙ্ক। প্রতিটা মিনিট যেন এক এক ঘন্টার সমান।
এইভাবে মিনিট পনেরো চলার পরে আস্তে আস্তে কমে এল বিমানের শব্দ। একটানা তীক্ষ্ণ চিৎকার করে দম ফুরিয়ে থামল সাইরেন। স্বস্তি, এবার স্বস্তি। তাই উঠে দাঁড়াল সবাই। এতক্ষণের তীব্র টেনশন থেকে মুক্তি। আমিনদার খদ্দরের পাঞ্জাবির বুকটা ধুলোমাখা। অবশ্য সবারই অবস্থা তথৈবচ। তবে উঠে দাঁড়িয়ে রজনীকান্তর কাছে এসে ধুলোমাখা পাঞ্জাবির বুকটা ঝাড়তে ঝাড়তে আমিনদা বললেন— ‘বুঝলে রজনী, ভেবেছিলাম বুঝি জীবনের শেষ পানটা খাওয়া হয়ে গেল আজ। উঃ, যা ঝড় গেল। আরেকটু হলেই মুখের পানটা বেরিয়ে পড়ে যাচ্ছিল আর কী।’ এমনসময় ফ্রেডরিক সায়েব বস্তার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে কোট ঝাড়তে ঝাড়তে হুকুম দিলেন সবাইকে ওপর থেকে নিজের নিজের ব্যাগট্যাগ নিয়ে বাড়ি চলে যেতে আর ডি-ক্রুজকে বললেন তাঁর ব্যাগটা নিয়ে অফিসে আবার তালা লাগিয়ে নীচে নেমে আসতে। পাঁচটা তো প্রায় বাজতেই চলল। এখন আর অফিস খুলে কী হবে।
তিনতলা থেকে ব্যাগট্যাগ গুছিয়ে নিয়ে আমিনদার সঙ্গে হাওড়ার দিকে যাবার পথে রজনীকান্ত লোকমুখে শুনলো যে জাপানিরা নাকি খিদিরপুরের ডকে বোমা ফেলতে এসেছিল। তবে টার্গেট মিস হওয়ায় দুটো বোমা পড়ে ওয়াটগঞ্জ অঞ্চলে আর একটা গঙ্গার জলে পড়েছিল বলে ফাটেনি।
.
পরের দিন। শীতের শনিবারের কুয়াশামাখা বিকেল তিনটে। ওয়ার্ম আপ, ডিপস, স্ট্রেচ ইত্যাদি সেরে আখড়ার একপাশের সিলিং থেকে ঝুলিয়ে রাখা বালি আর নুড়ি পাথর বোঝাই করা বস্তায় পাঞ্চ প্র্যাকটিস করে জমির এককোনায় দাঁড়িয়ে থাকা একটা তালগাছের সামনে এসে দাঁড়ায় রজনী। গাছটার গায়ে সাড়ে ছ-ফুট উঁচুতে চটের বস্তা দিয়ে মুড়ে মোটা করে একটা চওড়া প্যাড বানিয়ে রেখেছে সে। আর গাছের গোড়া থেকে সাড়ে চার ফুট উঁচুতে আরেকটা প্যাড। নীচেরটা ছোটোদের জন্যে। তারপর শুরু করে কিক প্র্যাকটিস। অফিসে যাওয়ার আগে এটা তার নিত্যকর্ম। তবে আজ টিউবওয়েলের মিস্ত্রি এসেছিল বলে সকালে ‘চাগি’, ‘জিরিউগি’ করা হয়ে ওঠেনি। তাই এখন সেটা সেরে নিচ্ছে সে। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, কোনোদিন এর ব্যতিক্রম হয় না। একমাত্র শুধু শরীর খুব খারাপ হলে নিজের প্র্যাকটিস বন্ধ রাখে। তাইকোন্ডো যে তার কাছে একটা নেশার মতো। একটা সাধনা।
নিজের বাড়ির সামনে দশ কাঠা ফাঁকা জমির মাঝখানে একটা আটখুঁটির চালা বানিয়ে রজনীকান্ত তৈরি করেছে তার তাইকোন্ডো শেখানোর আখড়া। সেই চালার নীচে ঠিক মাঝখানে নদী থেকে সাদা মিহি বালি আনিয়ে বিছিয়ে দিয়েছে বারো ফুট বাই বারো ফুট জায়গায়। তার ওপরে একটা নারকেল ছোবড়ার তোষক পাতা হয়। সেখানেই লড়াই প্র্যাকটিস করে তার ছেলেরা। বছর তিনেক ধরে প্রতি শনি, রবি আর অন্যান্য ছুটিছাটার দিনে নিজে হাতে ধরে ধরে প্রতিটা ছেলেকে প্যাঁচ শেখায়, স্টাইল আর টেকনিকের ভুল শুধরে দেয় সে। বাকি দিনগুলোতে বিকালে স্কুল ছুটির পরে ছেলেরা নিজেরাই এসে প্র্যাকটিস করে। প্রায় জনা কুড়ি ছেলে তার কাছে শিখতে আসে। তারা বেশিরভাগই বেশ গরিব। তবু তারা তাদের রজনীস্যারের কাছে আসে কারণ স্যার যে তাদের আপন করে নিয়েছে, আর স্যারকে তারা যেমন শ্রদ্ধা করে তেমনই ভালোওবাসে। তা ছাড়া ছোটোদের মধ্যে তো লড়াই করার একটা স্বাভাবিক প্রবণতা থাকেই, থাকে অন্যদের মধ্যে নিজেকে বীর প্রতিপন্ন করার একটা ইচ্ছে। সেটাকেই কাজে লাগিয়েছে রজনী। তাই তাদের প্রত্যেকের লড়াইয়ের পোশাক সে তার মাইনের একটু একটু করে জমানো টাকা থেকে কিনে দিয়েছে। ভাগ্যিস রজনী সংসারধর্ম করেনি। নইলে কি আর এইসব কাজ করতে পারত?
হঠাৎই ছেলেদের চিৎকার কানে ভেসে আসে। গাছের গায়ে শেষ কিকটা করার আগেই আখড়ায় ঢুকে পড়েছে তারা। তাই শেষ কিকটা করে নিজের প্র্যাকটিস থামায় রজনী। এবার ওদের জন্যে সময় দিতে হবে। তবে তার আগে ওরা সামান্য কিছু খেয়ে ওয়ার্ম-আপ করবে। ওরা জানে কী কী রুটিনবাঁধা কাজ করতে হয়। সেগুলো ওরা নিজেরাই সেরে নেবে আর তারপরে রজনী যাবে আখড়ায়। মাঝের এই সময়টুকু একান্তই তার একটু জিরিয়ে নেবার সময়। আখড়ার বাইরে এসে দাওয়ায় ঠেস দেয় সে। আজ কেন জানি না তার মনে ভেসে উঠছে বছর আটেক আগেকার ঘটনা। তার প্রথম তাইকোন্ডো শেখার কথা।
ছোটোবেলা থেকেই সে ছিল দাদু নিশিকান্ত রায়ের বড়ো ন্যাওটা, কারণ তার বাবা তমোনাথ রায় কলকাতায় চাকরি করতেন আর ছুটির দিনে জমিজমার দেখাশোনা করার পরে ছেলের জন্যে বিশেষ সময় থাকত না তাঁর হাতে। অন্যদিকে দাদু তাকে ফল পাড়া, গাছে চড়া শেখাত। শেখাত নানান পশুপাখির ডাক। সেসব ভারি ভালো লাগত তার। আগ্রহ নিয়ে শিখত সেসব রজনী। তারপর সে একটু বড়ো হতে দাদু তাকে শিখিয়েছিল আরও নানান বিদ্যে। কখনো প্রশ্রয়ে আবার কখনো বা শাসনে। দাদু নিশিকান্তর কাছ থেকেই সে জেনেছিল যে জাপানে নাকি একধরণের কুস্তি হয় যার নাম ‘জুজুৎসু’। সেই কুস্তিতে নাকি খালি হাতেই মোকাবিলা করা যায় লাঠি, সড়কি, বল্লম এমনকী তরোয়ালধারী শত্রুরও। বাবা তমোনাথ তখন কেরানিগিরি করতেন রজনী এখন যেখানে কাজ করে সেই ফ্রেডরিক সায়েবের অফিসেই। আরও বড়ো হয়ে সে যখন কলেজে পড়তে কলকাতায় এল, তখন কলেজের বন্ধুদের মাধ্যমে জানতে পারল যে সুকুমার ভদ্র নামের একজন নাকি গড়ের মাঠে রোজ বিকেলে ‘তাইকোন্ডো’ শেখান। এটাও নাকি জুজুৎসুর মতো একটা মার্শাল আর্ট। সুকুমারবাবু একসময়ে শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করেছিলেন আর সেই সময়ে নাকি সেখানে শিনজো তাগাকির কাছে জুজুৎসু শেখার সুযোগ পান। এই শিনজো তাগাকি বিশ্ববরেণ্য রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণেই শান্তিনিকেতনে আসেন জুজুৎসু শেখাতে। পরে সুকুমার ভদ্র কোরিয়ায় পড়াশোনা করতে গিয়ে তাইকোন্ডো শেখেন। সেদেশে নাকি কলেজেও ওই মার্শাল আর্টটা শেখানোর ব্যবস্থা আছে।
তখনই রজনীকান্ত ঠিক করে ফেলে যে সে সুকুমার ভদ্রের কাছে তাইকোন্ডো শিখবে। বাবা আর দাদুকে সেকথা বলতে তাঁরা রাজি হয়ে যান। এভাবেই একদিন কলেজ ছুটির পরে বাবার সাথে সুকুমার ভদ্রের কাছে নাড়া বাঁধা। আগ্রহী ছাত্র রজনীকে কিছুদিন দেখেই সুকুমারবাবু বুঝে যান যে এই ছেলেটি একটি রত্ন। তাই ধীরে ধীরে নিজের শেখা সবটুকুই দিতে থাকেন রজনীকে। মোট আটটা বছর শীত, গ্রীষ্ম আর বর্ষাকে উপেক্ষা করে রজনী পৌঁছে যেত স্যারের বিকেলের ক্লাসে। অবশ্য বর্ষার দিনে ক্লাস হত স্যারের জোড়াসাঁকোর বাড়ির বিরাট গাড়িবারান্দায়। সেখানে একপাশের দেওয়ালে কাঁচের শোকেসে রাখা ছিল চারফুট লম্বা একটা কুমিরের চোয়ালের হাড়। সেই কুমিরটাকে সুকুমার স্যারের ঠাকুরদা একসময় শিকার করেছিলেন। তাই ট্রোফি হিসেবে ওটা রাখা ছিল ওইখানে। তবে হাঁ করা কুমির-চোয়ালের সেই সুপ্ত আগ্রাসনের ছাপ অভিজ্ঞ সুকুমার স্যার লক্ষ্য করেছিলেন রজনীর আক্রমণে। রজনী রোজ ‘কিয়ুগনেত’এর আগে মিনিটখানেক তাকিয়ে থাকে ওই কুমির-চোয়ালের দিকে। সেটার থেকেই সে যেন রোজ আরও আরও শক্তি সংগ্রহ করে। সেকারনেই রজনী হয়ে উঠেছিল তাঁর প্রিয়তম শিষ্য আর তাই সুকুমার স্যার তাঁর বিদ্যে অকৃপণ হাতে বিলিয়েছিলেন রজনীকে। তাকে করে তুলতে চেয়েছিলেন তাঁর যোগ্য উত্তরসূরী। আর রজনী?
সব ঠিকঠাকই চলছিল। সে তখন কলকাতায় যেত শুধু সুকুমার স্যারের কাছে তাইকোন্ডো শিখবে বলে। কিন্তু হঠাৎই চার বছরের মাথায় ঘটে গেল ছন্দপতন। রজনীর তখন কলেজ শেষ। এমন সময় দুরারোগ্য কলেরায় তে-রাত্তিরেই রজনীকে হারাতে হল বাবা-মা দু-জনকেই। গ্রামের লোকেরা মহকুমা হাসপাতালে ভরতি করিয়েছিল বটে, কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। আকস্মিক আঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে যায় সে। একরাশ বিহ্বলতা নিয়ে তাই সে একা একা ঘুরে বেড়াত কখনো দামোদরের চড়ায় আবার কখনো বা জঙ্গলের গভীরে। কলকাতায় যাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছিল। সেই সময়ে সবচেয়ে বেশি পাশে ছিল যে মানুষটা সে হল তাদের প্রৌঢ় ভাগচাষি সুরেশ বাগদি। ছোটোবেলা থেকেই সে সুরেশকে ‘সুরেশ কাকা’ বলেই ডাকত। সুরেশ কাকাই তার শূন্যঘর পরিষ্কার করে দিত, তাকে ভাত রেঁধে দিত। সেই সুরেশ কাকাই তাকে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করত। বলত— ‘ছোরদাবাবু, অত ভেঙে পড়লে চলবেনি গো। মনে কর বরদা ঠাউরের কতা। সেইই তো তোমায় গড়েচে। সেইই তো শেকেয়েচে শক্ত হয়ে বেপদের মোকাবেলা করতে। বেপদ হল গে দুষমন। তাকে ঠান্ডা মাতায় শক্তহাতে শেষ না কল্লে জেবন চলবে ক্যামন করে? শোক, তাপ তো জেবনে আসবেই। তবু উটে দাঁড়াতে হয় যে গো।’
সুরেশ কাকার এই কথাগুলো রজনীকে বেশ কিছুটা চাগিয়ে তুলেছিল। তারপর একদিন ওপাড়ের জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে সে পৌঁছে গিয়েছিল সেই অর্জুন গাছটার কাছে, যে গাছটাকে ছুঁইয়ে দাদু নিশিকান্ত রায় একদিন তাকে দিয়ে শপথ করিয়ে বলেছিল— ‘গাচটা ছুঁয়ে পিতিজ্ঞে কর, যা তোকে এ্যাদ্দিনে শিকিয়েচি আর আরও যা যা শেকাবো তা তুই বেথা যেতে দিবিনি। যোগ্য পাত্তর না পেলে সবটা শেকাবিনি কাউকে। আর মনে রাকবি, কষ্ট পেলে রাগ জম্মায় আর সেই রাগ থেকে কিন্তু অনেক সময় মনে পিতিহিংসা জম্মায়। তাই নিজের মনের কষ্টকে আর রাগকে কক্কনো বাড়তে দিবিনি। শুদু অজ্জুনের মতো মাতা উঁচু করে থির লোক্কে এগিয়ে যাবি।’
এরপরে আরও হপ্তাখানেক লেগেছিল রজনীর নিজেকে ধাতস্থ করতে, নিজেকে আবার ফিরে পেতে। তারপরে সুরেশ কাকারই পরামর্শ মতো কলকাতায় গিয়ে ফ্রেডরিক সায়েবকে সব কথা জানাতে উনিই আমিনবাবুর হাতে সঁপে দিয়েছিলেন রজনীকে। নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁকে কাজকর্ম সব বুঝিয়ে দিতে। এমনকী দু-সপ্তাহের মধ্যে তমোনাথের প্রাপ্য টাকাও মিটিয়ে দিয়েছিলেন সায়েব। একটু মেজাজি হলেও মোটের ওপর মানুষ ভালো ছিলেন ফ্রেডরিক। তাই তাঁরই সাহায্যে কলকাতার ব্যাঙ্কে খাতা খুলে একমাসের হাতখরচের টাকা নিজের কাছে রেখে বাকি টাকা সেই খাতায় জমা করে দিয়েছিল রজনী। আর কলেজ পাশ করা বলে চটপট কাজকর্ম ধরে নিতে পেরেছিল সে। এমনকী ছ-মাসের মধ্যে টাইপ করাও শিখে নিয়েছিল। ফ্রেডরিক সায়েবও তার কাজকর্মে খুশিই ছিলেন। আর কিছুদিন পর থেকেই অফিস শেষ করে আবার সে যেতে শুরু করেছিল সুকুমার স্যারের ক্লাসে। এইভাবে আরও চার বছর তাইকোন্ডো চালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারপরেই হই হই করে এসে পড়ল যুদ্ধ আর শম্ভু ঘোষ রিটায়ার করাতে অফিসের কাজও বাড়তে লাগল। তাই অনিয়মিত হতে হতে একসময় বন্ধ হয়ে গেল তার ভদ্র স্যারের ক্লাসে যাওয়া।
তবে এরপরে একদিন অফিস ছুটির শেষে সে সোজা চলে গিয়েছিল সুকুমার ভদ্রের জোড়াসাঁকোর বাড়িতে। তাঁর সাথে দেখা করে নিজের অপারগতার কথা জানাতে আর তাঁর মতামত জানতে। চা খেতে খেতে বৈঠকখানার সোফায় বসে সব কথা শুনে সুকুমার স্যার খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে একটু ভেবে নিয়ে বললেন— ‘তাহলে একটা কথা তোমায় বলি। তোমার এখন বিয়ে করাটা বড্ড জরুরি। থিতু হতে হবে। আর এখন চাকরিও তো করছ। আরও একটা ব্যাপার কী জানো, তুমিও একদিন বুড়ো হবে। তোমার সুরেশ কাকাও ততদিন হয়তো থাকবেন না। তাই শেষজীবনের জন্যে একজন সঙ্গীর বড়ো প্রয়োজন হয়। নইলে বড়ো একা হয়ে যেতে হয়। জীবনে বার্দ্ধক্য বড়ো সাংঘাতিক সময়, রজনী।’
জবাবে সে বলেছিল— ‘আমি তা জানি স্যার, কিন্তু আমি ঠিক করেছি যে আপাতত জীবনটাকে একটু আমার মতো করে চালাব। তাই এখনই বিয়ে, মানে…।’ কথাটা অসমাপ্ত থেকেই যায়। মাথা নীচু করে নেয় রজনী।
—‘বেশ, বুঝলাম তোমার কথা। নিজের জীবনটাকে নিজের মতো করে চালাবার অধিকার সব্বার আছে; কিন্তু তার সঙ্গে তোমার বিয়ে না করার সম্পর্ক কোথায় বল তো? সদিচ্ছা থাকলে বিয়ে করেও তো কত কিছু কাজ করা যায়। কেন, তোমার দাদু আর বাবাও তো সংসারধর্ম করেছিলেন। তাহলে?’ সুগন্ধি চায়ের কাপে একটা চুমুক দেন সুকুমার ভদ্র।
—‘না, মানে ঠিক তা নয় স্যার… মানে আমি যে ভাবে চলতে চাই…।’ আমতা আমতা করে রজনী। সে ঠিক বুঝতে পারে না স্যারকে তার মনের কথাটা কিভাবে বলবে।
—‘কীভাবে? তা তুমি কি জঙ্গী রাজনীতিতে যেতে চাও নাকি?’ রজনীর কথা কেটে দিয়ে বলে ওঠেন সুকুমার স্যার। তাঁর ভ্রূ-দুটো কুঁচকে গেছে।
—‘না স্যার, ও জিনিস আমার জন্যে নয়। তবে এই যুদ্ধের ডামাডোলে আর একটা পরাধীন দেশে থেকে আমি আমার সামান্য সামর্থ দিয়ে মানুষের জন্যে কিছু করতে চাই।’
—‘কী? কী বললে? পরাধীন দেশের মানুষের জন্যে? ব্যাপারটা ঠিক বুঝলাম না…।’
—‘স্যার, আমি ভাবছি আমার গ্রামের ছোটোছোটো ছেলেদের তাইকোন্ডো শেখাব। তার জন্যে খরচ-খরচা আছে। তাদের যথাসম্ভব লেখাপড়া শেখানোর ব্যাপারে সাহায্য করা, কিছু জলখাবারের ব্যবস্থা করা, এইসব আর কী…। তাই বিয়ে থা করলে এই মাইনেতে আমি সেই বাড়তি খরচটা সামলাতে পারব না স্যার। তবে যদি কখনো একটা ভালো মাইনের চাকরি পাই তখন না হয় বিয়ের কথাটা ভেবে দেখতে পারি।’ রজনী নম্রভাবে কথাটা বলে চুমুক দেয় চায়ে।
—‘হুম, এইবারে বুঝলাম। খুবই ভালো ভাবনা। I appreciate it.’ আসলে সুকুমার ভদ্র ধরে ফেলেছেন তাঁর প্রিয় ছাত্রের মনের ইচ্ছে। এত বছর ধরে তিনি তো দেখছেন তাকে। তাই বুঝে গিয়েছেন যে কিছু মানুষকে হয়তো সংসারের সাধারণ নিয়মে বাঁধা যায় না। তাদের জন্ম আর কর্ম হয় বৃহত্তর জগতের জন্যে। নইলে রজনী অনায়াসেই বিয়ের কথা ভাবতে পারত; কিন্তু তা না করে সে চাইছে তার নিজের টাকায় গ্রামের ছেলেদের তাইকোন্ডো শেখাতে। তবু প্রিয় ছাত্রকে আরও একবার বাজিয়ে নেবার জন্যে বললেন— ‘বেশ তো, এখন বিয়ে না হয় নাইই করলে, কিন্তু এই যে বাবা মারা যাওয়ার জন্যে প্রাপ্য যে টাকাটা পেলে সেটা দিয়ে ছেলেদের শেখানোর জন্যে খরচ খরচার পাশাপাশি নিজেও একটু আরাম করে থাক না। নিজেকেও একটু দেখ। নিজের স্বাচ্ছন্দের জন্যেও না হয় কিছু খরচই করলে।’
—‘স্যার, ছোটো মুখে হয়তো বড়ো কথা হয়ে যাবে, তবু বলছি, ওই টাকাটা কিন্তু আমার নিজের অর্জন করা নয়, তাই এটা নিজের জন্যে খরচ করার অধিকার আমার নেই।’ চায়ের কাপটা আবার ঠোঁটে তোলে রজনী।
—‘তাহলে তোমার পৈতৃক সম্পত্তি? সেটাও তো তোমার অর্জন করা নয়। তার কী হবে?’ সুকুমার স্যারের স্বরে হালকা উষ্মা।
তবু রজনী শান্ত স্বরেই বলে— ‘স্যার, আমি ভেবে রেখেছি যে থাকার জন্যে আমাদের দু-কামরার বাড়িটা আর তার সামনের কিছুটা জমি নিজের জন্যে রেখে বাকি সব আমাদের ভাগচাষি সুরেশ কাকাকে একসময় লেখাপড়া করে দেব। তাতে সুরেশ কাকাকে আর আমার কাছে মাথা নীচু করে থাকতে হবে না। সেই ছোটোবেলা থেকে সে আমাদের জন্যে অনেক করেছে আর এখনও করছে।’
এবার সুকুমার স্যারের পরীক্ষা শেষ। তাঁর প্রিয় শিষ্য তার নিজের কাছে করা প্রতিজ্ঞা পালনে বদ্ধপরিকর। তাই চায়ে শেষ চুমুকটা দিয়ে চোখ বুজে আধমিনিট বসে থাকার পরে বললেন— ‘জানো রজনী, এক এক সময় কেন জানি না মনে হয় যে দেশের বড়ো দুর্দিন আসছে। তুমি বরং তোমার গ্রামের ডাকাবুকো ছেলেদের নিয়ে দেশের সেই দুঃসময়ের বিরুদ্ধে লড়ার জন্যে তৈরি হও। নিজের আর তাদের শরীর আর মনকে সেই লড়াইয়ের জন্যে গড়ে তোলো আর তুমি যেমনটা ভেবেছ তেমনটাই কর। আমার পূর্ণ সমর্থন আছে। তোমার গ্রামে তুমি একটা তাইকোন্ডোর আখড়া খোল। সেখানে তাদের শেখাও। সেইসঙ্গে নতুন নতুন কিছু ঢুকিয়ে খেলাটাকে আরও ইম্প্রুভ করার চেষ্টাটাও করে যেও, যেমন তুমি আগে করতে আর কী। তা ছাড়া তুমি তো জুজুৎসুরও বেশ কিছু টেকনিক জানো। শিখিয়েছিলাম তো তোমাকে। সেইগুলোকেও কাজে লাগাও। …কি পারবে না?’ মনে হয় সুকুমার স্যার কিছুটা আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছেন। তাঁর সেই আবেগ সঞ্চারিত হয় রজনীর মধ্যেও। তাই সে বলে— ‘পারব স্যার, পারব। পারতে আমাকে হবেই।’ গুরুর আশীর্বাদ পেয়ে, তাঁর আস্থাভাজন হয়েছে বুঝতে পেরে, চোখটা চকচক করে ওঠে রজনীর।
নিজের একটা ভিজিটিং কার্ড রজনীর হাতে দিয়ে স্যার বললেন— ‘বেশ, তবে তাইই হোক। আমার শুভকামনা রইল। আর হ্যাঁ, প্রয়োজন হলে আমার সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করো কিংবা নিজেও এসে আমার সাথে দেখা করতে পার। তোমার জন্যে আমার দরজা সবসময়েই খোলা।’
ব্যাস, সেইই শুরু।
—‘বলি এ্যাই ছোঁড়ারা, এবার ইদিকে আয় দিকি। ছোলা-গুড় নে যা’ সুরেশ কাকার হাঁক শোনা গেল।
লাইন করে দাঁড়ানো ছেলেদের ছোলা-গুড় আর আদার কুঁচি দিতে দিতে সুরেশ কাকা আবারও বললে— ‘ছোলা খেয়ে নিয়ে দাওয়ার তক্তপোশের ওপরে রাখা তোষকটা নে গে আকড়ায় পেতে দে। পল্টু আর পুলিন আজ তোদের পালা। নে নে, চটপট খেয়ে নিয়ে জল খেয়ে বিশখানা পাক মার দেকি। তোদের স্যার ততক্কনে তৈরি হয়ে যাবে। নে নে, জলদি কর দেকি বাবারা।’
সুরেশ কাকা লেখাপড়া না জানা এক গ্রাম্য চাষি হলেও এটা বোঝে যে রজনী যা করছে তা ওই ছেলেগুলোর ভালোর জন্যেই করছে। সে এটাও বুঝতে পারে যে এই হাড়হাভাতে বেনিয়মি ছেলেগুলো পালটে গেছে রজনীর হাতে পড়ে। এখন তারা অনেক সভ্যভব্য আর নিয়মানুবর্তী হয়েছে। গ্রামের অন্য অন্য ছেলেদের তুলনায় এরা অনেক বেশি শক্তসমর্থ আর আলাদা রকমের। ছোটোবেলা থেকে এইরকম শিক্ষা পেলে সব ছেলেরাই বড়ো হয়ে এক একজন ভালো মানুষ হয়ে উঠবে। তাই সে এই ছেলেদের এত স্নেহ করে। আবার গ্রামের অন্যকোথাও এদের বেচাল দেখলে দাবড়ানিও দেয়। আর তারাও সেটাকে ভালোবাসার শাসন বলে বুঝতে পারে বলেই তাকে মান্যও করে।
ছেলেরা ছোলা-গুড় আর টিউবওয়েল থেকে জল খেয়ে মোটা তোষকটা ধরাধরি করে আখড়ার মাটিতে পেতে দিল। এতে আছড়ে পড়লেও বড়োসড়ো চোট লাগার সম্ভাবনা কমে যায়। তারপর তারা লাইন করে আখড়ার চারিদিকে দৌড় শুরু করল। দাওয়ায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রজনী তীক্ষ্ণ নজরে দেখতে থাকল ছেলেদের দৌড়।
এই ছেলেদের অনেকে খুবই গরিব। এই আকালের যুগে অনেকেরই দু-বেলা পেটভরে ভাতও জোটে না। পুকুরের গেঁড়ি-গুগলি, ছোটো মাছ আর কখনো বা খেতের চিতি কাঁকড়া জুটলে তাই খেয়ে প্রোটিনের অভাব মেটায়। তবু এদের মুখে হাসি লেগেই আছে। অদম্য প্রাণশক্তি এদের। এরা যে রজনীর কাছে আসে, তা শুধুমাত্র শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার টানেই নয়। সেটা তো আছেই। কিন্তু আরও অন্য কারণও আছে। প্রথম কারণটা হল যে তারা রোজ বিকেলে প্র্যাকটিসের আগে সুরেশ কাকার কাছ থেকে ছোলা-গুড় পায়, তা সে রজনী থাকুক বা না থাকুক। তাতে তাদের টিফিনের ক্ষিদেটা মেটে আর দ্বিতীয় কারণটা হল— রজনী রবিবার সকাল দশটায় যে প্র্যাকটিসের ব্যবস্থা করেছে তারপরে তাদের ভাগ্যে জোটে সুরেশ কাকার রাঁধা ঢালাও খিচুড়ি আর আলুভাজা। রজনীও তাদের সঙ্গে পংক্তিভোজনে বসে। সেইজন্যেই ওই ছেলেরা একদিকে রজনীকে গুরু বলে যেমন মান্যও করে, তেমনি ভালোওবাসে।
এই তো মাসখানেক আগে রজনীর একবার ধুম জ্বর হয়েছিল। ম্যালেরিয়া। কিন্তু সুরেশ কাকা তাকে কখনো একা ফেলে রাখেনি। খুব দরকার পড়লে রজনীদের একটেরে বাড়ির পাশের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে শর্টকাট পথ ধরে নিজের বাড়িতে গিয়ে তার সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসের জোগান দিয়েই আবার ফিরে আসত রজনীর কাছে। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া, জলপট্টি দেওয়া, ওষুধ খাওয়ানো সবই করত সে। এমনকী রাত্তিরেও সে রজনীর বিছানার পাশের মাটিতে চাটাই পেতে শুতো— কখন কী দরকার পড়ে তাই। আর এই ছেলের দল তখন রোজ স্কুলে যাওয়ার আগে আর স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখা করে যেত তাদের স্যারের সঙ্গে। তবে তা সত্বেও তারা কিন্তু তাদের প্র্যাকটিস বন্ধ করেনি। কোনোদিন সতেরো বছরের পুলিন আবার কোনোদিন বা এগারো বছরের কানাই প্র্যাকটিসের ভার নিত। একহপ্তা পরে রজনীর জ্বর একটু কমতে সে দুর্বল শরীর নিয়ে দাওয়ায় এসে বসে ছেলেদের কসরত দেখত। ছেলেরা তখন দাওয়ায় বসে থাকা তাদের গুরুকে ‘কিয়ুগনেত’, মানে ‘বাও’ করেই তবে প্র্যাকটিস শুরু করত। কাহিল অবস্থাতেও রজনী তাদের নির্দেশ দিত। তবে সুরেশ কাকার দায়িত্ববোধের জন্যে ছেলেদের ছোলা-গুড় বা খিচুড়ি খাওয়া বন্ধ হয়নি।
আজকেও যেমন তারা সারবেঁধে দাঁড়িয়ে তাকে ‘কিয়ুগনেত’ করল। তারপরে রজনী ঘরের দাওয়া থেকে কয়েকগাছা নারকেলদড়ি দিয়ে তৈরি একটা লুপ নিয়ে সবাইকে বললে তাকে ফলো করতে। তাদেরকে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাল সামনের ফাঁকা জমির একধারে একটা নারকেল গাছের সামনে। গাছটা খাড়াই উঠে গেছে প্রায় চারতলা বাড়ির সমান। রজনী প্রথমে দলের সবচেয়ে বড়ো ছেলে পুলিনের হাতে লুপটা দিয়ে বললে— ‘নে, পায়ে এই লুপটা লাগিয়ে এই গাছটায় চড় দেখি। পাতার গোড়া ছুঁতে হবে কিন্তু।’ পুলিনও বাধ্য ছেলের মতো দু-পায়ে লুপটা লাগিয়ে গাছটা আঁকড়ে ধরল দু-হাতে আর তারপরে একটা ছোট্ট লাফে পা-দুটো তুলে নিয়ে দড়ি আর পা চেপে ধরল গাছের গায়ে। নারকেলদড়ির জন্যে পা হড়কে যাবার ভয় নেই। এরপরে সে পায়ে ভর দিয়ে দু-হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরল গাছের আরও খানিকটা ওপরের অংশ। তারপরে আবার পা-দুটো তুলে চেপে ধরল গাছের আরও খানিকটা ওপরের অংশে। সেইসঙ্গে হাতদুটোও উঠে গেল ওপরে। এইভাবে পুলিন ধাপে ধাপে উঠে যেতে লাগল ওপরের দিকে। এই জিনিসটা করলে হাত, পা, কাঁধ, পিঠ আর পেটের পেশি শক্ত হয়। এটা রজনীই মাথা খাটিয়ে বের করেছে। তারপর সে ছেলেদের দিকে ফিরে বললে— ‘এ্যাই, সব ভালো করে দেখ পুলিন কীভাবে উঠছে। সবাইকে উঠতে হবে এরপরে। কেউ ছাড় পাবে না।’
মিনিট চারেকের মধ্যেই গাছের পাতার গোড়া ছুঁয়ে ফেলল পুলিন। ওপর থেকেই জিজ্ঞেস করল— ‘স্যার, নামব?’ রজনী ‘হ্যাঁ’ বলতেই তরতর করে নেমে এল সে। কুড়ি পাক দৌড়োনো আর গাছে ওঠার পরেও একটুও হাঁপায়নি ছেলেটা। অফুরন্ত প্রাণশক্তি আর অদম্য ফুসফুসের জোর। এরপরে রজনী কানাইকে লুপটা দিয়ে বলল— ‘যা’। কানাই এই দলে সবচেয়ে ছোটো, কিন্তু তা হলে কী হবে, সবকিছুতেই চৌখস সে। রজনী জানে যে, কোনোদিন যদি কেউ তার নাম রাখে তাহলে এই পুলিন আর কানাইই তা পারবে।
কুড়িজন ছেলের গাছ বেয়ে ওঠানামা করতে করতেই প্রায় ঘন্টাখানেক কেটে গেল। এদের মধ্যে চারজন পাতার গোড়া ছুঁতে পারেনি। রজনী সেই চারজনকে দড়ির লুপটা দিয়ে বললে— ‘বাড়িতে প্র্যাকটিস করবি। সামনের সপ্তায় আমি যেন দেখি যে তোরা প্রত্যেকেই পাতার গোড়া ছুঁতে পারছিস, বুঝলি?’ তারা একসঙ্গে মিলিটারি কায়দায় জবাব দিলে— ‘হ্যাঁ স্যার’।
এবারে সবাই আখড়ার ম্যাটের তিনদিকে ফাঁক ফাঁক হয়ে সারি দিয়ে দাঁড়াল। অন্য দিকটায় রজনী। প্রত্যেকের দু-হাত কোমরের পাশে চাপা, কনুই থেকে জমির সমান্তরালে ভাঁজ করা আর শক্ত করে রাখা মুঠি। ওরা সবাই জানে এরপরে কী করতে হবে। বুকভরে শ্বাস টেনে নিয়েই মুষ্টিবদ্ধ ডানহাত মাথার ওপরে সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল— ‘ভারতমাতা কী জয়’। এরপরে সেইহাত নামিয়ে বাঁ-হাত একই কায়দায় শূন্যে ছুঁড়ে বলে উঠল— ‘বন্দে মাতরম’। আসলে রজনী ছেলেদের এগুলো শিখিয়েছে তাদের মনে দেশাত্মবোধ জাগিয়ে তোলার জন্যে। অন্যদিকে সে সুকুমার স্যারের কাছ থেকে শেখা জুজুৎসু আর তাইকোন্ডো মিশিয়ে ঢেলে সাজিয়েছে নিজেকে। তবে এই ছেলেরা তো সবে কয়েক বছর হল শিখছে। এখনও এদের সেসব জটিল আক্রমনের ট্রেনিং দেবার সময় আসেনি। সময় এলে সে ঠিকই দেবে তাদের।
এরপরে রজনীর নেতৃত্বে শুরু হল তাইকোন্ডো প্র্যাকটিস। ছেলেরা বাঁ-পা পেছনে রেখে ডান পা সামনে এগিয়ে হাঁটু থেকে খানিকটা ভাঁজ করে ডান হাতের মুঠি সর্বশক্তি দিয়ে সামনে ছুঁড়ে দিচ্ছে যেন কোনো অদৃশ্য প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যে আর চিৎকার দিচ্ছে— ‘কী ইহ্যাপ’। আবার বাঁ-পা সামনে রেখে বাঁ-হাতের মুঠি সামনে ছুঁড়ে চিৎকার দিচ্ছে— ‘কী ইহ্যাপ’। খানিকক্ষণ এভাবে চলার পরে স্ট্রেচ করার পালা। সেই সেশনটাও চলল প্রায় মিনিট পনেরো। এর ফলে দু-পায়ের সংযোগস্থল নমনীয় হয়। ‘চাগি’ মানে ‘কিক’ করতে সুবিধে হয়। এরপরে শুরু হল ‘চাগি’ প্র্যাকটিস। ছেলেরা রজনীর অনুকরণে অদৃশ্য শত্রুর মাথা লক্ষ্য করে একবার ছুঁড়ে দিচ্ছে ডান পা আবার পরক্ষনেই ছুঁড়ে দিচ্ছে বাঁ-পা। সঙ্গে তীব্র ‘কী ইহ্যাপ’ চিৎকার। এইভাবে অনুশীলন চলল আরও মিনিট কুড়ি।
তারপরে রজনী গিয়ে ম্যাটের মাঝামাঝি দাঁড়াল। ডেকে নিলো নগেন আর সন্তোষকে। রজনীর সামনে এসে দু-পাশে দু-জনে দাঁড়িয়ে তারা ‘কিয়ুগনেত’ করল স্যারকে আর তারপরে দু-জনে সরে গেল তফাতে। স্যার এখন ‘জু সিম’, মানে রেফারি। লড়াই হবে নগেন আর সন্তোষে। লড়াই শুরু করার আগে একে অপরকে ‘কিয়ুগনেত’ করতেই রজনীর আলতো চাঁটা পড়ল নগেনের মাথায়। ধমক দিয়ে বলে উঠল— ‘চোখ নামছে কেন? সবসময় শত্রুর চোখে চোখ রাখবি। তাতে আগে থেকেই আন্দাজ করতে পারবি যে সে কীভাবে তোকে অ্যাটাক করতে পারে। চোখ থেকে চোখ কখনোই সরাবি না। তবে কখনো তোর যদি মনে হয় যে শত্রু তোর থেকেও সবল, তাহলে তখন তাকাবি তার দুই ভুরুর ঠিক মাঝখানে। দেখবি শত্রু তাতে অস্বস্তি বোধ করছে আর সেই সুযোগটাকেই কাজে লাগিয়েই স্ট্রাইক করবি। বুঝলি?’ নগেন মাথা নেড়ে জানাতেই রজনী বললে— ‘জুন বি’ … ‘চি গি’। মানে ‘রেডি’… ‘স্ট্রাইক’।
নগেন আর সন্তোষ ম্যাটের ওপরে ছোটোছোটো লাফে অনবরত জায়গা বদল করছে আর চোখে চোখ রেখে সুযোগ খুঁজছে প্রতিপক্ষকে আঘাত হানার। লড়াই চলছে। অনেকটা যেন সাপ আর নেউল মুখোমুখি। একে অপরকে মেপে যাচ্ছে, সুযোগ খুঁজছে কে কোন অস্ত্রের প্রয়োগ করবে।
হঠাৎই সন্তোষ ঝপ করে বসে বাঁ-হাতে ভর রেখে নগেনের পা লক্ষ্য করে ডানপায়ে একটা ‘চাগি’ মানে ‘কিক’ দিতে যেতেই নগেন চকিতে পিছিয়ে গেল আর টাল সামলাতে না পেরে সন্তোষ কাত হয়ে পড়ে গেল মাটিতে। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। তবে নগেনও সুযোগের সদব্যবহার করতে ছাড়ল না। চকিতে একটা ব্যাককিক ছুঁড়ল। কিন্তু সন্তোষ মাথাটা সরিয়ে নিয়েছিল ঠিক সময়ে। আর ঘুরেও গিয়েছিল একটু। তাই নগেনের ব্যাককিক গিয়ে লাগল তার পিঠে। সেইসঙ্গে টালমাটাল সন্তোষকে নগেন দিল ‘মিলগি’, মানে ধাক্কা। তাই দেখে সঙ্গে সঙ্গেই রজনী হেঁকে উঠল— ‘ক্যালিও’, অর্থাৎ ‘স্টপ’। রজনী দু-হাতে দু-জনকে সরিয়ে দিয়ে লড়াই শেষ করে দিল। দুই যোদ্ধা একে অপরকে কিয়ুগনেত করে, স্যারকে ‘বাও’ করে ফিরে গেল নিজেদের জায়গায়। তারপরে রজনী বলতে শুরু করলে— ‘এই লড়াইটায় নগেন জিতেছে। তবে আশা করি এরপরে সন্তোষ নিজের ভুলগুলো শুধরে নেবে। আজ সন্তোষ যখন নগেনের পায়ে ‘চাগি’ দিতে গেল, তখন ও নিজের বাঁ-হাত আর মাথাটাকে বড়োবেশি সামনে রেখেছিল। তাই যখন ‘চাগি’টা মিস হল, তখন ও ব্যালেন্স হারিয়ে পড়ে গিয়েছিল মাটিতে। সন্তোষ, এইবারে আমি দেখাচ্ছি বডিটা তখন কীভাবে রাখবি। ‘এই দ্যাখ’, বলে রজনী সবাইকে করে দেখাল ভুলটা ছিল কোথায় আর ঠিকটা কেমনটা হবে।
—‘আচ্ছা, এরপরে আসবে পুলিন আর কানাই।’
দুই অসমবয়সি যোদ্ধা ম্যাটের ওপরে এসে দাঁড়িয়ে প্রথমে স্যারকে তারপর একে অপরকে ‘কিয়ুগনেত’ করল। বাও করার সময়েই রজনী লক্ষ্য করেছিল যে কানাইয়ের চোখের ফোকাস পুলিনের দুই ভুরুর মাঝখানে। কানাই খুব তাড়াতাড়িই তার কথাটা ধরে নিয়েছে। সে বুঝে গেছে যে তার প্রতিপক্ষ তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাবান। কানাইয়ের এই তাৎক্ষণিক গ্রহন ক্ষমতায় রজনীও খুশি। লড়াই শুরুর নির্দেশ দিতেই ম্যাটের ওপরে ক্ষিপ্রগতিতে নড়াচড়া করতে লাগল দুই যোদ্ধার শরীর। একে অপরের দুর্বলতা খোঁজার চেষ্টা করছে। দৈর্ঘ্যে ছোটো কানাই তার চেয়ে লম্বা পুলিনকে বিভ্রান্ত করতে চোখের পলকে জায়গা পালটাচ্ছে, শরীরী ভঙ্গি পালটাচ্ছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি সে আক্রমণ করবে উপরের দিক থেকে আবার পরক্ষনেই মনে হচ্ছে আক্রমণ আসবে নীচের দিক থেকে।
আর তারপরেই চকিতে ঘটে গেল ঘটনাটা। সন্তোষের মতো কানাইও পায়ে টার্গেট করতে পারে ভেবে পুলিন একটু বেশিই সামনে ঝুঁকে পড়েছিল আর সেই সুযোগটাই নিল কানাই। এক লাফ মেরে ‘কী ইহ্যাপ’ বলে চিৎকার করে তার ডান-পা ছুঁড়ে দিল পুলিনের চোয়াল লক্ষ্য করে। কিন্তু পুলিনও দক্ষ যোদ্ধা। সে চকিতে মাথাটা হেলিয়ে দিল বাঁ-পাশে আর তার ফলে কানাইয়ের ‘চাগি’ সোজা গিয়ে পড়ল তার ডান কাঁধে। লাগেনি তেমন, তবে হঠাৎ আসা ধাক্কাটা সামলাতে একটু পিছিয়ে গিয়ে সোজা হতে চেয়েছিল সে। আর সেই সুযোগটাই নিলো কানাই। লাফ মেরে পুলিনের রোবটা ধরে তার পায়ের পেছনে নিজের একটা পা রেখে পুলিনের শরীরের উপরের অংশে দিল ‘মিলগি’। সেইসঙ্গে গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল— ‘কী ইহ্যাপ’। সেই ধাক্কা সামলাতে না পেরে পুলিন চিত হয়ে পড়ল তোষকের ওপরে।
সঙ্গে সঙ্গে রজনী হেঁকে উঠল— ‘ক্যালিও’। মানে লড়াই শেষ। দুই যোদ্ধা মাথা ঝুঁকিয়ে স্যারকে ‘কামসা হামনি দা’ অর্থাৎ ‘ধন্যবাদ’ জানিয়ে একে অপরকে বাও করে ফিরে গেল নিজের নিজের জায়গায়।
ঘন্টাখানেক আরও কেটে গিয়েছে প্র্যাকটিস শেষ হতে। ততক্ষণে সূর্যও ম্লান হয়ে জঙ্গলের দিকে ঢলতে শুরু করেছে। তাই রজনী ছেলেদের উদ্দেশ্যে বলে— ‘এবার বাড়িতে গিয়ে কিছু খেয়ে মন দিয়ে পড়াশোনা করবি। আর শোন, নজর সবসময় খোলা রাখবি। জানবি, সকলেরই কিছু না কিছু দুর্বলতা আছে। প্রকৃত যোদ্ধা শত্রুর দুর্বলতাকে অস্ত্র বানায় আর তার গুণগুলো থেকে শেখে। আচ্ছা, ঠিক আছে, কাল সকালে আবার দেখা হবে। নে, এবার তাহলে বল ‘‘ভারতমাতা কী জয়’’।’ ছেলেরাও সমস্বরে বলে উঠল— ‘ভারতমাতা কি জয়’, ‘বন্দে মাতরম’।
ছেলের দল চলে গেলে রজনীকান্ত ঘরে ঢুকে পোশাক পালটায়। সন্ধে নেমে গেছে। বাইরের দাওয়ায় এসে একটা মোড়া নিয়ে বসে। সুরেশ কাকা ততক্ষণে ঘরে আর দাওয়ায় লন্ঠন জ্বালিয়ে দিয়েছে। শীতকালেও দু-একটা জোনাকি আখড়ায় আর তার আশেপাশে টুপটাপ করে জ্বলছে। রজনী জোনাকিগুলোকে গোনার চেষ্টা করে। কিন্তু উড়ন্ত জোনাকি গোনা? নিজের ছেলেমানুষিতে নিজেই হেসে ফেলে রজনী। পরে আবার ভেবে দেখে— উড়ন্ত জোনাকিদের ফলো করতেও তো চোখের রিফ্লেক্স অ্যাকশন দরকার। তাহলে ঠিকই আছে। প্রকৃতি তাকে আরও আরও শিখতে বাধ্য করাচ্ছে তার অজ্ঞাতেই।
—‘কী গো ছোরদাবাবু হাঁসচো কেন?’
—‘আর বলো না সুরেশ কাকা। আমি জোনাকি গুনছিলাম।’
—‘ওমা, সে কী কতা গো। জোনাক আবার গোনা যায় নাকি?’
—‘সেইজন্যেই তো হাসছি। কী বোকা আমি দেখেছ।’
—‘সে তো দেকতেই পাচ্চি। নাও, বাটিটা ধর। সেই কোন দুপুরে খেয়েচো।’
খানিকটা আখের গুড় ফেলা জল-মুড়ির বাটিটা এগিয়ে দেয় রজনীর সামনে। নিজেও একটা বাটি নিয়ে মাটিতে বসে সুরেশ কাকা। দু-জনে খেতে থাকে। শীতের বাতাস বইতে শুরু করেছে। যত রাত বাড়বে, ততোই বাড়বে ঠান্ডা। এমন সময় দূরের নদীপারের জঙ্গলে প্রথম প্রহরের শিয়াল ডেকে উঠল। সবাই মিলে হাঁকাহাঁকি করে কয়েক মিনিট পরে থেমেও গেল। গ্রামের একপ্রান্তে বাড়ি বলে চারিদিক নিস্তব্ধ। তবে অন্ধকারেরও বিশেষ শব্দ আছে। সুরেশ কাকা জানে না সে কথা; কিন্তু রজনীকান্ত জানে। সে টের পাচ্ছে কত রকম শব্দ। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই সব শব্দের ধরণ ধারণও পালটে পালটে যায়। তার দাদু নিশিকান্ত তাকে অন্ধকারের শব্দ চিনিয়েছে, অন্ধকারে দেখতে শিখিয়েছে। ওই দূরের ঝাপসা নদীপাড়ের জঙ্গলে সে গোপনে কত রাত দাদুর সঙ্গে ঘুরেছে। দাদু তাকে দিয়েছিল একটা বুমেরাং। ওই বুমেরাং দিয়েই অন্ধকারেও শব্দভেদ করতে দাদুই তাকে শিখিয়েছিল।…
—‘বলি, খালি বাটিটা এবারে দাও।’ সুরেশ কাকার কথায় ঘোর কাটে রজনীর। বাটিটা সে এগিয়ে দেয়। বাটি নিয়ে সুরেশ কাকা বলে— ‘শোনো ছোরদাবাবু, আজকে হাটতলায় স্বদেশিগানের আসর বসবে। বলি, শুনতে যাবে নাকি? মুকুন্দদাসের গান শোনাবে কেউ একজন। শ্যামাদাস বললে বটে নামটা, কিন্তু ভুলে গেচি বুইলে?’
—‘হুঁ, যাব। তা তুমি যাবে না?’
—‘হ্যাঁ, যাব বইকী। তাইলে যাই, তাড়াতাড়ি রান্নাটা সেরে ফেলিগে। তুমি না হয় একোনই বেইরে পড়। বটতলায় গে পাঁচটা লোকের সাতে গল্পগুজব কর। মনটা ভালো থাকবে। আমি রান্না সেরে ঠিকসময়ে হাজির হয়ে যাবোকোন।’
—‘হুঁ, ঠিকই বলেছ। আমি তাহলে এগোই। তুমি তাড়াতাড়ি রান্নাটা সেরে এসো।’ বলে দাওয়া থেকে নেমে বেরোতে যায় রজনী। পেছন থেকে সুরেশ কাকা হাঁক পাড়ে— ‘আরে, টর্চটা তো নে যাও।’ এগিয়ে যেতে যেতে রজনী জবাব দেয়— ‘তুমি আসার সময় ওটা নিয়ে এসো। তোমার কাজে লাগবে। আমার অসুবিধে হবে না।’
—‘আচ্চা।’ সুরেশ কাকা জবাব দিল। সে জানে ছেলেটা বড়ো একবগ্গা।
আকাশে চাঁদ নেই, তবু কোনো অসুবিধে হচ্ছে না রজনীর। পথঘাট তার কাছে বেশ স্পষ্টই। জঙ্গলের অন্ধকারে যে দেখতে পায়, এই আঁধার তার কাছে কিছুই নয়। হাঁটতে হাঁটতে সে গুনগুনায়— ‘ভয় কী মরণে, রাখিতে সন্তানে, মাতঙ্গী মেতেছে আজ সমর রঙ্গে। তাথই তাথই থই, দ্রিমি দ্রিমি দ্রম দ্রম…।’ দাদু নিশিকান্তই শিখিয়েছিল তাকে। বড়ো ভালো লাগে তার এই গানটা। কোথায় যেন একটা ভয়াল উন্মাদনা আছে গানের কথায় আর সুরে। আর এটাই যে তাকে তার দাদুর শেখানো শেষ গান।
