মার্চ, ১৯৪৫ – মার্চেন্ট স্ট্রিট, গোখরো-নেউল আর বর্মার চায়না টাউন

মার্চ, ১৯৪৫ – মার্চেন্ট স্ট্রিট, গোখরো-নেউল আর বর্মার চায়না টাউন

বর্মায় পৌঁছেছে শ্যামাদাস অনেক বাধাবিপত্তি কাটিয়ে। জাহাজের ভাড়া, জাল কাগজপত্র তৈরির খরচ ছাড়াও খসেছে ট্যাঁকের কড়িও। রেঙ্গুন পোর্ট থেকে বেরিয়ে মানি এক্সচেঞ্জের দোকান থেকে কিছু ইন্ডিয়ান রুপি বদলে বর্মি ‘কায়াত’ নিল সে।

বর্মায় এখন জাপানি সেনার দাপাদাপি। রাস্তায় রাস্তায় মাঝে মধ্যেই দেখা মিলছে ‘চি-হি’ ট্যাঙ্কের। মোড়ে মোড়ে বসানো অ্যান্টি-এয়ারক্র্যাফট গান আর যখন তখন মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে জাপানি যুদ্ধবিমান। যুদ্ধ চলছে, আর তার পাশাপাশি চলছে জীবনও। পোর্টের বাইরে সারি সারি রিক্সা আর ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে জাহাজে আসা প্যাসেঞ্জার ধরবে বলে। ব্রিটিশ শাসনের দৌলতে তারা কিছু কিছু ইংরাজি শব্দ বলতে পারে আবার বুঝতেও পারে। অবশ্য শুধু এখানেই নয়, পৃথিবীর সব ইংরেজ ঔপনিবেশিক দেশের বন্দরের রিক্সাওয়ালারা বা ট্যাক্সিওয়ালারা একইরকম।

তাই একজন রিক্সাওয়ালাকে ‘মার্চেন্ট স্ট্রিট’ ‘দ্য ভিন্টেজ’ বলতেই সে শ্যামাদাসকে বলে— ‘সিট স্যার, সিট।’ হাতে টানা রিক্সা। কলকাতাতেও রিক্সা চড়েছে শ্যামাদাস; কিন্তু এখানকার রিক্সাগুলোর গঠন কিছুটা অন্যরকম। যথেষ্ট আরামদায়কও বটে। রিক্সা চলছে মোটরগাড়ি, গাধায় টানা গাড়ি আর মালবাহী খচ্চরদের পাশ কাটিয়ে। রিক্সা তো চলছে, কিন্তু সঠিক জায়গায় যাচ্ছে তো? সন্দেহ জাগে শ্যামাদাসের। তাই সে রাস্তার দু-পাশের দোকানগুলোর সাইনবোর্ড দেখতে দেখতে যায়। কিছু সাইনবোর্ডে শুধু বর্মি ভাষায় লেখা। সেগুলোর জিনিসপত্র দেখে ঠাহর করার চেষ্টা করে। কিছুর আবার কিছুই বোঝা যায় না। তবে তার মনে হল ‘দ্য ভিন্টেজ’ নামটা নিশ্চয়ই ইংরাজিতেই লেখা হবে। কিন্তু রিক্সাওয়ালা সেটা বুঝলে তো? তাই বারবার সে তাকে ঠিকানাটা বলতে থাকে আর বারবারই জবাব পায়— ‘ওক্কে স্যার, ওক্কে স্যার।’

এভাবেই চলতে চলতে একসময় রিক্সা এসে থামে একটা চওড়া রাস্তার ধারে একটা বড়ো বাড়ির সামনে। সারি সারি দোকান। নেমে ভাড়া মিটিয়ে রিক্সা ছেড়ে দেয় সে। তারপর দোকানগুলোকে ডাইনে রেখে এগিয়ে চলে। দারুণ সাজানো সব দোকান। কলকাতার পশ এলাকার দোকান যেমন হয় আর কী। কোনো দোকানের শো-কেসে সাজানো নানান বাদ্যযন্ত্র, কোনোটায় বিদেশি মদ আবার কোনোটায় বা থরে থরে সাজানো সিগার আর সিগারেটের প্যাকেট। বর্মার চুরুট বিখ্যাত। খেয়ে দেখতে হবে। তাই একটা কেনে সে। সযত্নে কাঁধের ঝোলা ব্যাগে রেখে দেয় সেটা। পরে একসময় খাবে।

হঠাৎই একটা বন্দুকের দোকান। একটু দাঁড়িয়ে যায় শ্যামাদাস। কাঁচের শো-কেসে সাজানো রাইফেল আর সুন্দর কারুকাজ করা তরোয়াল দেখে তার মনে হয়— ইস, এইরকম একটা সুন্দর অস্ত্র যদি তার থাকত!

কিন্তু না, সময় নষ্ট করলে হবে না। দোকানের সাইনবোর্ডগুলো দেখতে দেখতে এগিয়ে চলে সে। আরও মিনিট তিনেক এগোনোর পরে হঠাৎই নজরে পড়ে একটা সাইনবোর্ড। সোনালি ফ্রেমের সাইনবোর্ডের সবুজ মখমলের ওপরে উঁচু উঁচু সোনালি ইংরাজি অক্ষরে লেখা ‘দ্য ভিন্টেজ’। হ্যাঁ, এটাই তার আকাঙ্খিত লক্ষ্য।

কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই সুন্দর একটা গন্ধ নাকে লাগে। বোধ হয় কোনো ধূপেরই হবে। ওপরের তিনদিকের দেওয়ালে কাঁচে ঢাকা শো-কেসে সারি সারি সাজানো পুরোনো দিনের বন্দুক, পিস্তল, মিনের কাজকরা খাপওয়ালা তরোয়াল। নীচের শো-কেসে সাজানো নানান কিউরিও। কী নেই সেখানে? হাতির দাঁতের পালকি, ব্রোঞ্জের বুদ্ধমূর্তি, কাঠের জালিকাজ করা বর্মীবাক্স, পিতলের ওপরে নানান রঙিন পাথর বসানো পেখমমেলা ময়ূর, আরও কত কী। মনে হচ্ছে যেন কুবেরের ঘরে ঢুকে পড়েছে সে। দূরে সোজা দেওয়ালের বেশ ওপরে আটকানো একটা বাঘের ছাল। তার নীচের দেওয়ালে বেশ খানিকটা তফাতে ঝোলানো দুটো সুদৃশ্য পার্শি কার্পেট আর সেইদুটোর মাঝখানে কাউন্টারের ওপারে রিভলভিং চেয়ারে বসা স্যুট পরা একজন। মুখে তার আধা মোঙ্গোলিয়ান ছাপ স্পষ্ট। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। শ্যামাদাস এগিয়ে যায় তার দিকে।

লোকটা তাকে বলে— ‘What can I do for you, Sir?’

—‘I want to meet Mr. Aung Thiha.’

জবাব শুনেই ভুরু একটু কুঁচকে যায় লোকটার। সেটা বিস্ময়ে, সন্দেহে, নাকি তার কথা বুঝতে না পারার জন্যে, সেটা ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারে না শ্যামাদাস। তাই সে আবার বলে— ‘I am Shaymadas Roy coming from Calcutta to meet Mr. Aung Thiha.’

লোকটা কয়েক সেকেন্ড তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপরে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে— ‘Who is Aung Thiha? I don’t know anyone by that name.’

শ্যামাদাস ভাবে— লোকটা কি ভান করছে? নাকি পিটার তাকে ভুল ঠিকানা দিয়েছে? আচ্ছা, পিটার তো তাকে এই ঠিকানা দিয়েছে। তাহলে পিটারের কথা বললে কেমন হয়? তাই সে আরেকবার চেষ্টা করে— ‘Sir, Peter Braganza of Lalbazar has sent me here.’

লোকটা এবারে তার রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিয়ে মৃদু মৃদু এদিকে ওদিকে দুলতে থাকে। সে কি এবারেও তার কথা বুঝতে পারেনি? কিন্তু লোকটার চোখ অন্য কথা বলছে। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জরিপ করে যাচ্ছে তাকে। একটু পরেই সে টেবিলের নীচে লাগানো একটা সুইচ টেপে।

এক মিনিটের মধ্যেই ঘুরে যায় দেওয়ালে টাঙানো একটা পার্শি কার্পেট। সেই ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসে বর্মি পোশাক পরা একজন। কার্পেট সমেত দেওয়ালটা ঘুরিয়ে আবার আগের মতো করে দেয় সে। বোঝার উপায়ই নেই যে ওখানে একটা যাওয়া-আসার লুকোনো পথ আছে কার্পেটের পেছনে।

চেয়ারে বসা লোকটার ইশারায় সেই বর্মি লোকটা কাউন্টারের একটা অংশ সরিয়ে এসে দাঁড়ায় শ্যামাদাসের কাছে। ইঙ্গিতে তাকে দাঁড়াতে বলে। আপাদমস্তক হাত বুলিয়ে আর তার ব্যাগে উঁকি মেরে নিশ্চিত হয় যে শ্যামাদাসের কাছে কোনো অস্ত্র নেই। তারপর কাউন্টার পেরিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় চেয়ারে বসা লোকটার পাশে।

চেয়ারে বসা লোকটা এবারে বলে— ‘Can you show me any proof that Braganza has sent you?’

—‘Yes Sir’ বলে চেয়ারে বসে শ্যামাদাস তার ব্যাগের ভেতরে রাখা ডায়েরির ভাঁজ খুলে পিটারের দেওয়া তার ছবি লাগানো ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট মেলে ধরল লোকটার সামনে।

ভালো করে সেটা দেখে ফেরত দিয়ে লোকটা বলল— ‘Well Mr. Shayamadas, now why do you want to meet Mr. Thiha?’

—‘Sir, I want to carry on the business again and so I need his help.’

লোকটা চেয়ারে বসে মৃদু মৃদু মাথা নাড়ছিল। শ্যামাদাসের কথা শেষ হতে সে টেবিলে রাখা ফোনের রিসিভার তুলে একটা নম্বর ডায়াল করল। তারপরে মিনিট চারেক বর্মি ভাষায় কথা বলে ফোনটা নামিয়ে রেখে শ্যামাদাসকে বলল— ‘Well Mr. Roy, Meet here after three days at five in the afternoon.’

.

তিন দিন হোটেলের ঘরে বসে সময় কাটানো যে বেশ কঠিন ব্যাপার তা বেশ বুঝতে পারে শ্যামাদাস প্রথম দিনেই। তাই সেই দিনটা হোটেলের ঘরে কাটিয়ে সেখানকার রিসেপশন থেকে জেনে নেয় রেঙ্গুেনর দর্শনীয় জায়গাগুলোর নাম আর অবস্থান। তারপরে একটা রিক্সা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে স্যুইড্যাগন প্যাগোডার উদ্দেশ্যে যেটাকে স্থানীয়রা বলে ‘গ্রেট ড্যাগন প্যাগোডা’। বেশ খানিকক্ষণ চলার পরে রিক্সা এসে থামে প্যাগোডার সামনে। এটা নাকি রেঙ্গুেনর দ্বিতীয় প্রাচীন প্যাগোডা। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন একটা উলটোনো ঘণ্টা। তবে এটাকে প্যাগোডা না বলে বৌদ্ধস্তূপ বলা যেতে পারে। কান্দ্যাওগি লেকের পশ্চিমে সিঙ্গুত্তারা পাহাড়ের মাথায় এর অবস্থান। সোনার জল করা পাতে মোড়া মূল চূড়োর গায়ে শেষ বসন্তের রোদ ঠিকরে পড়ে চকচক করছে। মূল স্তূপের চারপাশে আরও অনেক ছোটো ছোটো স্তূপের মতো চূড়ো। যুদ্ধের বাজার বলে সাদা চামড়ার বিদেশি ট্যুরিস্ট প্রায় নেই বললেই চলে।

প্রায় ঘণ্টাখানেক সেখানে ঘোরার পরে বেরিয়ে আসে শ্যামাদাস। কিন্তু ঘুরেও শান্তি নেই মনে। বিশেষ করে শান্তির দূত বুদ্ধের এই স্মারক মন্দিরে ঘুরেও। সর্বদাই একটা টেনশন তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাকে। সর্বদাই মনে হচ্ছে কেউ যেন তাকে অনুসরণ করে চলেছে।

হ্যাঁ, সে জানে না যে তাকে নজরে রাখা হচ্ছে দিনরাত— এমনকী হোটেলের ঘরেও যখন সে থাকে। সে জানে না হোটেলে তার ঘরে রুম সার্ভিস দেয় যে ছেলেটা, সেও আঙ থিহারই একজন নজরদার। এমনকী শ্যামাদাস এও জানে না যে হোটেলের বাইরেও কেউ না কেউ তাকে পালা করে অনুসরণ করে চলেছে। আর এই অদৃশ্য অনুসরণটাই সর্বক্ষণ তাকে খোঁচা দিচ্ছে।

প্যাগোডা থেকে বেরিয়ে আরেকটা রিক্সা ধরে এবার পৌঁছে যায় রেঙ্গুনের চিড়িয়াখানায়, যদি তাতে মনের খচখচানিটা একটু কমে। কিন্তু যুদ্ধের এই টালমাটাল সময়ে সর্বত্রই অরাজকতা। তার ছাপ যেমন পড়েছে কলকাতা শহরে, তেমনই পড়েছে এই রেঙ্গুনেও; এমনকী চিড়িয়াখানাতেও। সংখ্যায় কম বলে কলকাতার চিড়িয়াখানার থেকেও এখানকার প্রাণীরা অনেক খোলামেলা জায়গায় থাকে। তবে কাছে গেলেই বোঝা যায় যে কতটা বুভুক্ষু তারা। যদিও চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীর সংখ্যা বেশ কম, তবু প্রানীগুলো একটু খাবার পাবার আশায় দর্শকদের কাছাকাছি এগিয়ে আসে। শ্যামাদাস বোঝে যে যুদ্ধের জন্যে ছাঁটাই হয়েছে চিড়িয়াখানার বাজেটে আর তাই পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে উরাংউটাং, হাতি এমনকী জলহস্তীও খাবার চায়। কেউ কিছু খাবার দিলে বাছবিচার না করেই তা খায়। এ যেন বাংলার দুর্ভিক্ষের ছবি রেঙ্গুনের চিড়িয়াখানায়।

বেশি বড়ো নয় চিড়িয়াখানাটা, তবু ঘুরে দেখতে দেখতে বেলা পড়ে আসে। তাই সেখান থেকে বেরিয়ে হোটেলমুখী হয় সে। রিক্সায় ফিরতে ফিরতে তার নজরে পড়ে রাস্তার ধারে সাপখেলা দেখাচ্ছে এক সাপুড়ে। একটা শঙ্খচূড় আর একটা গোখরো। সঙ্গে আবার একটা বেজিও রেখেছে সে। লোক জমতে শুরু করেছে তার পাশে। একটু পরেই হয়তো খেলা শুরু হবে।

রিক্সা ক্রমে এগিয়ে চলে। খানিক পরেই একটা পাবলিক পার্ক। সেখানে জুডো শিখছে একদল ছেলেছোকরা। তাই দেখে শ্যামাদাসের হঠাৎই মনে পড়ে যায় চাঁপাডাঙার রজনী আর তার ছেলেদের কথা। অস্বস্তি হয় ভাবলেই। আর সেটা কাটাতেই একটা চুরুট ধরায় সে। আগুনের তাপে তামাকপাতা ধোঁওয়া হয়ে উড়ে যায় পেছনে; কিন্তু অস্বস্তিটা তার থেকেই যায়।

সেইদিন রাতে ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন আসে শ্যামাদাসের কাছে। আঙ থিহা শঙ্খচূড়ের মতো সামান্য ফণা তুলে এগিয়ে আসছে তার দিকে। গোখরো হয়ে পুরো ফণা তুলেও সে আটকাতে পারছে না শঙ্খচূড়ের আগ্রাসন। হিসহিসিয়ে ওঠে গোখরো। সমস্ত শক্তি দিয়ে বারবার ছোবল মারতে চায় শঙ্খচূড়টাকে। বারবার…। কিন্তু কিছুতেই থামছে না শঙ্খচূড়। সেটা এগিয়ে এসে কামড়ে ধরে গোখরোর ঘাড়। কামড় ক্রমশ প্রবল হতে থাকে। শঙ্খচূড়ের বিষ ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন করে দিতে থাকে গোখরোরূপী শ্যামাদাসকে। তবু মরতে মরতেও সে দেখতে পায় বেজিটা ঝাঁপিয়ে পড়েছে শঙ্খচূড়ের ওপরে। চকিতে ঘাড়ে কামড় দিয়েই পায়ের নখ দিয়ে ফালাফালা করে দিতে চাইছে সেটার শরীর। কিন্তু গোখরোর মৃত্যু আসন্ন। তবু শেষবারের মতো তার যেন মনে হয় যে বেজিটার মুখটা যেন রজনীকান্তর মতো… ভয়ংকরেরও ভয়ংকর মৃত্যুদূত সে।

ঘুমটা ভেঙে যায় শ্যামাদাসের।

.

তীব্র টেনশন। টেনশন কমিয়ে মনটা হালকা করতে তাই সে বেরিয়ে পড়ে। আজ সে যাবে চায়না টাউনে।

স্যুলে প্যাগোডা। বর্মার সবচেয়ে পুরোনো প্যাগোডায় ঢুকতে যাচ্ছে সে। বাইরে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দেখে নিল প্যাগোডার রূপ। যতোই দেখে ততোই মোহিত হয়ে যায় সে। শেষ বসন্তের নীল আকাশে ছোটো ছোটো তুলোর টুকরোর মতো মেঘ জমেছে আজ। ছড়িয়ে গেছে আকাশের অনেক দূর পর্যন্ত আর আটকোণা সোনালি প্যাগোডার চূড়ো যেন ছুঁতে চাইছে সেই স্থির সাদা মেঘ-বন্ধুদের। বেশ খানিকক্ষণ সেদিকে অপলক তাকিয়ে থাকে শ্যামাদাস। হঠাৎ তার সম্বিৎ ফেরে। নিজের মনের গভীর তলটাকে উপলব্ধি করে সে নিজেই অবাক হয়ে যায়। এতটাই সুন্দর কি তার অন্তস্তল? কই, এতদিন তো সেটা ধরা পড়েনি তার কাছে? সব মানুষেরই কি মনের মধ্যে আরও একটা সুন্দরতর মন থাকে? থাকে হয়তো? হয়তো এতদিন সেটা তেমনভাবে বুঝতে পারেনি সে। তবে হ্যাঁ, একবার সে বুঝেছিল, যখন রসময়ীর কোলে এসেছিল তার সন্তান। এখন তারা কোথায় কে জানে। সব হারিয়ে সে এখন বুঝতে পারছে, কেন সে প্রতি সপ্তায় রসময়ীর কাছে যেত? সেটা কি শুধুই ব্যবসা আর রসময়ীর সান্নিধ্যসুখের জন্যে? না, শুধু সেই কারণেই সে সেখানে যেত না। সপ্তাহান্তে সন্তানের নিষ্পাপ মুখটা দেখার জন্যেও সে যেত। এক অব্যক্ত বাৎসল্যরসে তার অজান্তেই ভরে যেত তার অন্তর যখন সে তার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করত। অথচ আজ নিজের লোভের বশে সব হারিয়ে দীনের চেয়েও দীন সে।

ধ্যুস, এখন আর ওসব ভেবে কী হবে? যা ফিরে পাবার নয়, তা নিয়ে আর ভেবে লাভ কী? নিজেকে বোঝায় শ্যামাদাস। তবু একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার বুক চিরে। তারপরে সোজা রাস্তা ধরে ধীরপায়ে সে এগিয়ে যায় প্যাগোডার দিকে।

কী সুন্দর ভেতরটা। চারিদিকে সোনালি রঙের ছটা। মেঝেতে লাল কার্পেট পাতা। মাঝে মাঝে ঢং ঢং করে বাজছে গম্ভীর ঘণ্টা। এমন পরিবেশে এলে মানুষ নির্বাক হয়ে যায়। মনের ঔদ্ধত্য আপনিই নত হয়ে যায় এক অজানা সম্ভ্রমের আবেশে।

একপাশে উঠোনে নেমেছে একঝাঁক পায়রা। দর্শনার্থীদের আনাগোনাকেও তারা আমল দিচ্ছে না। চারিদিকে ধূপের গন্ধ। মাঝে মাঝেই মেরুন রঙা চাদর পরা বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের যাতায়াত। এসব পেরিয়ে ভেতরে ঢোকে শ্যামাদাস। সোনালি ধ্যানমগ্ন বুদ্ধমূর্তির গায়ে হলুদ রঙের কাপড় জড়ানো। বেদির দু-পাশে ফুলদানিতে রাখা সুগন্ধি ফুলের তোড়া আর একপাশে কোমর সমান উঁচু বার্নিশ করা আবলুষ কাঠের রাকের ওপরে সারি সারি রাখা দণ্ডায়মান বুদ্ধের বেশকিছু মূর্তি। এক একটা মূর্তির হাতের মুদ্রা এক এক রকমের।

শোনা যায় যে ‘তাপুসা’ আর ‘ভাল্লিকা’ নামের দুই ভাইকে বুদ্ধ স্বয়ং তাঁর মাথার চুল দিয়েছিলেন আর তার ওপরেই তৈরি করা হয় এই স্তূপ। শ্যামাদাসের মনে হয়— ভয় আর সম্ভ্রম থেকে ভক্তি যেমন উদ্্গত হয়, তেমনই বিশ্বাস থেকেও জন্ম হয় তার।

বেশ খানিকক্ষণ সেখানে কাটিয়ে বেরিয়ে পড়ে সে। এরপরে তার গন্তব্য চীনামন্দির খেং হক কিয়ং। সামনে লেখা বোর্ড পড়ে জানতে পারে যে এটা বর্মার প্রাচীনতম আর সবচেয়ে বড়ো চীনামন্দির। এই মন্দিরে পুজো পান চীনাদের সমুদ্রের দেবী ‘মাজু’। মূলত হোক্কিয়ান চীনারা এখানে পুজো চড়াতে আসেন। প্রবেশ পথের দু-ধারে নখ মেলে পাহারা দিচ্ছে দুই ড্রাগন আর লাল, হলুদ, সবুজ আর সোনালি রঙের কারুকাজ করা এই মন্দির দেখতেও বেশ সুন্দর বটে। আরও ভেতরে পেছনে সোনালি কাজ করা প্যানেলের মাঝে সোনালি ঝালর মাথায় অবস্থান করছেন দেবী ‘মাজু’। উজ্জ্বল হলুদ আর লাল রঙা সিল্কে ঢাকা তাঁর সর্বাঙ্গ। খানিকক্ষণ এসব দেখেশুনে এবার শ্যামাদাস চলল মাহা বান্দুলু রোডের দিকে। সন্ধে তখন নামছে।

উরিবাব্বা, এটা তো কলকাতার বড়োবাজারের মতো একটা রাস্তা। দু-পাশে নানান দোকান, ফুটপাথে মানুষের সারি আর রাস্তায় গাদাগাদি মোটরগাড়ি, রিক্সা, খচ্চর আর গাধায় টানা গাড়ি। আশেপাশের দোকান থেকে ভেসে আসছে দোকানিদের হাঁকডাক আর নানান খাবারের গন্ধ। ভিড়ে ঠাসা এই রাস্তা একেবারে নরক গুলজার।

খুঁজেপেতে একটা বার্মিজ লিকার শপে ঢুকে পড়ল শ্যামাদাস। একটা নড়বড়ে টুলের সামনে ছোটো একটা কাঠের টেবিল। সে শুনেছে এখানকার আখের রস থেকে তৈরি মান্দালয় বিয়ার নাকি খুব জনপ্রিয়। তাই সেটাই একবোতল অর্ডার করল। একটু পরেই বেয়ারা এসে তার টেবিলের ওপরে যব-ভাজা, নুন-লঙ্কা আর বিয়ারের বোতল রেখে গেল। এতক্ষণ ঘোরাঘুরি করে পিপাসাও পেয়েছিল বেশ। তাই ঢকঢক করে আদ্ধেক বোতল গলায় উপুড় করে দিয়ে খানিকটা যব-ভাজা মুখে পুরলো শ্যামাদাস। পকেট থেকে একটা চুরুট বের করে ধরাল। আঃ, এবারে একটু ভালো লাগছে। সে বাকি বিয়ারটাও ধীরে ধীরে গলায় ঢালতে লাগল। মিনিট বিশেক পরেই বুঝতে পারল যে এই বিয়ারে অ্যালকোহলের মাত্রা একটু বেশিই আর সেইজন্যেই বর্মিজদের কাছে এটা এত জনপ্রিয়। যাইহোক, আরও আধঘণ্টা পরে যখন শ্যামাদাস রাস্তায় বেরিয়ে এল, তখনই মেজাজটা তার ফুরফুরে। সমস্ত টেনশন ঢাকা পড়ে গেছে অ্যালকোহলের দরাজ মহিমায়।

হালকা ঠান্ডা বসন্তের হাওয়ায় বেশ আরাম লাগছে তার। ধূর, যে তাকে ফলো করে করুক। সে এখন থোড়াই কেয়ার করে সেইসব। তাই চুরুট টানতে টানতেই সে হেঁটেই ফিরতে শুরু করে হোটেলে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *