আবার ১৯৪৩ – নিশিকান্তের গুপ্তধন, গোখরোর ফণা আর শব্দভেদ
সুরেশ কাকার রেখে যাওয়া খাবার খেয়ে রজনী তার আখড়ার চারপাশে পায়চারি করে খানিকক্ষণ। এটা খাবার ভালো করে হজম হতে সাহায্য করে। তারপর ঘরে ঢুকে মশারি খাটিয়ে টানটান হয়ে শোয় বিছানায়। কিন্তু মনের মধ্যে একটা খচখচানি। তাই লন্ঠনের আলোটাও কমাতে ভুলে গেছে সে। সেদিকে তাকাতেই হঠাৎ নজর পড়ে দেওয়ালে। সেখানে সারি সারি বাঁধানো ফটো— বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি সুভাষের পাশাপাশি ঠাঁই হয়েছে রজনীর বাবা-মায়ের আর দাদু নিশিকান্তের বাঁধানো ছবি।
দাদুর ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কত পুরোনো কথা মনে পড়ে রজনীর। দাদুর একান্ত নিজের সবকিছু রাখা আছে একটা শক্তপোক্ত লোহার তোরঙ্গে। না, না, দাদু চোর বা ডাকাত ছিল না কখনো। চুরি বা ডাকাতি করেওনি কোনোদিন; তবু রজনীর বাবা মা বেঁচে থাকতে সেসব বাড়িতে রাখতে চায়নি দাদু। পুঁতে রেখেছিল নদীপারের জঙ্গলের সেই অর্জুন গাছটার কাছে একটা মস্ত উইঢিবির পাশে। শুধু বুমেরাংটা রাখতে দিয়েছিল রজনীকে। সেটা দিয়ে শুধু দিনের আলোতে নয়, রাতের অন্ধকারেও শব্দভেদ প্র্যাকটিস করত রজনী। দিনের বেলা গাছের আম, পেঁপে, নারকোল পেড়ে হাত মকশো করত আর রাতের বেলা সবাই ঘুমিয়ে পড়লে দাদু তাকে চুপিচুপি ডেকে নিয়ে যেত দামোদরের চরে, চোরাবালি এড়িয়ে। সেখানে গিয়ে দাদু বিভিন্ন জায়গায় সরে সরে গিয়ে এক একবার এক একরকম পশুপাখির ডাক নকল করে ডাকত আর কালো কাপড় দিয়ে চোখবাঁধা রজনীকে সেই ডাক শুনে শুনে ছুঁড়তে হত হাতের বুমেরাং। প্রথম প্রথম টার্গেট ফসকাত। কিন্তু নাছোড়বান্দা দাদু নিশিকান্ত। নাতিকে শিখিয়েই ছাড়বে শব্দভেদী বুমেরাং ছোঁড়া। বারবার ছুঁড়তে ছুঁড়তে আর অস্ত্রটা কুড়িয়ে আনতে আনতে হাঁফ ধরে যেত রজনীর। সে থামতে চাইত। কিন্তু দাদু যখন ওই অন্ধকারে তার চোখে বাঁধা কাপড় খুলে দিয়ে তার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত, তখন আপনা থেকেই আবার অস্ত্রটা হাতে তুলে নিত রজনী। প্রখর সম্মোহন ছিল সে দৃষ্টিতে। তাই আবারও শুরু হত প্র্যাকটিস। এইভাবে দিনে রাতে প্র্যাকটিস করতে করতে অস্ত্রটায় দক্ষ হতে সময় লেগেছিল প্রায় ছ-মাস।
তবে এই ছ-মাসে আরও একটা বাড়তি লাভ হয়েছিল তার। কান পেতে শুনে শুনে সে খুব ভালো করে রপ্ত করে ফেলেছিল নানান পশুপাখির ডাক; এমনকী আরও অনেক কিছু। এইভাবে বেশ কিছুদিনে সে হয়ে উঠেছিল পাক্কা হরবোলা। এ ব্যাপারে তার দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। তার দাদুও এত ভালো এসব পারত না। সেকারণেই দাদু একদিন তাকে সাবধান করে দিয়ে বলেছিল— ‘বন্দুবান্দবেরা যদি কেউ বুমেরাং ছোঁড়া শিকতে চায়, তবে তাদের তুমি তা শেকাতে পার। আমার বুমেরাংটা তুমি তো ব্যাভার কোরচোই। আর তেমন হলে আমি না-হয় ছুতোরবাড়ি থেকে মেওগনি কাটের একটা নতুন অস্তর বানিয়ে দেব তোমায়। কিন্তু এই হরবোলার ডাক তুমি কারোর সামনে ডাকবেনি আর কাউকে শেকাবেওনি। এটাকে তোমার একটা গুপ্ত অস্তর করে রেকো। আর একটা কতা বলি শোনো— তুমি কিন্তু গুরুমারা বিদ্যেও শিকে ফেলেচ। আর এই গুরুর ঘরানাটা পারলে ধরে রেখো।’
দাদুর সেই কথা রেখেছে রজনী। তবে তার আরও গুপ্ত অস্ত্রের কথা জানে না গ্রামের কেউই। তারা শুধু জানে যে রজনী তাইকোন্ডো জানে আর বুমেরাং ছুঁড়তে জানে।
না, ঘুম আসছে না রজনীর। তাই বিছানা থেকে নেমে একটা ফুলহাতা কালো গেঞ্জি আর কালো হাফ-প্যান্ট পরে নেয় সে। লন্ঠনের আলো কমিয়ে দিয়ে, বুমেরাংটা নিয়ে বেরিয়ে দরজায় তালা লাগায়। আর তারপর পা বাড়ায় নদীর চরের দিকে।
জঙ্গলে পৌঁছে মাঝে মাঝে শিয়াল, প্যাঁচা আর ধনেশ পাখির ডাক ডাকতে ডাকতে এগিয়ে চলে অর্জুন গাছটার দিকে। তারাও কেউ কেউ সাড়া দেয় সেই ডাকে আর মাঝে মাঝে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ঠাহর করতে চেষ্টা করে জঙ্গলে অন্য মানুষ ঢুকেছে কিনা। অনেক সময়ে চোরা শিকারিরা জঙ্গলে ঢোকে শজারু, ধনেশ বা প্যাঁচা ধরতে। তারা রাতের বেলা ফাঁদ পেতে যায় আর পরেরদিন সান্নাটা দুপুরে জঙ্গলে ঢোকে সেই ফাঁদে কিছু পড়ল কি না দেখতে। ধরা পড়া বনের প্রাণীগুলোকে চোরাপথে শহরের বড়োলোকদের বাড়িতে পৌঁছে দেয় তারা। ভালোই দাম পায় আর তাতেই সেজে ওঠে অবস্থাপন্ন ভদ্র মানুষদের বাড়ির শখের চিড়িয়াখানা। তবে ফাঁদ পাততে যারা আসে তারা টর্চ নিয়ে আসে আর সেই আলো থাকলে তা চোখে পড়বেই রজনীর। নাঃ, এখন সেরকম কিছু নেই। তাই আবার সে চলতে শুরু করে আর একসময় পৌঁছেও যায় সেই অর্জুন গাছটার কাছে উইঢিবিটার পাশে। তারপরে বুমেরাং এর একটা মাথা দিয়ে খুঁড়তে থাকে মাটি। হাতখানেক খুঁড়তেই হদিশ মেলে নিশিকান্তর তোরঙ্গের। সাবধানে তুলে একপাশে সেটা রেখে মাটি দিয়ে ভালো করে বুজিয়ে দেয় গর্তটা। শুকনো পাতা দিয়ে ঢেকে দেয় জায়গাটা। তারপরে ওয়াটারপ্রুফ কাপড়ে মোড়া তোরঙ্গটা খুলতেই কর্পূরের ঝাঁঝ লাগে নাকে। পাছে পোকা বা পিঁপড়ে ঢুকে কেটে না দেয় ভেতরের জিনিস, তাই দাদুর কথামতো মাস ছয়েক বাদে বাদেই তোরঙ্গে কর্পূর দিয়ে যেত রজনী। তোরঙ্গ তোলা হয়ে গেছে, এবার সেটা নিয়ে জঙ্গল থেকে বেরোনোর পালা। এতদিন পরে দাদুর ব্যবহার করা একটা জিনিস নিজের কাছে রাখবে সে। দাদুর স্মৃতি হিসেবে। কিন্তু বেরোনোর পথেই বিপত্তি।
হঠাৎ হিসহিসানির আওয়াজ সামনে। চক্রের মাথায় সাদা ছিটে ছিটে দাগ দেখেই রজনী বুঝতে পেরেছে যে সেটা একটা গোখরো। খানিকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে সে, যদি সাপটা নিজে থেকেই চলে যায়। কিন্তু না, মিনিট তিনেক পরেও সাপটা নড়ে না। খালি হিস্-হিস্ শব্দ করতেই থাকে। এই হিসহিসানির অর্থ হল এই যে— রজনী সাপটার নিজস্ব এলাকায় ঢুকে পড়েছে। এখন সাপটাকে না সরালে সে এগোতে পারবে না। তাই সে পাশের গাছ থেকে ছ-ফুটের মতো একটা ডাল ভেঙে নেয়, আর তারপর সেই ডালটা দিয়ে সাপটাকে তুলে ছুঁড়ে দেয় একটু দূরের ঝোপে। তবে গাছের ডালটা হাতছাড়া করে না সে।
জঙ্গল থেকে বেরিয়ে চরের চোরাবালি পেরিয়ে নদীর মাঝামাঝি একটা শক্ত জায়গায় আসে। তোরঙ্গ আর বুমেরাং নামিয়ে রেখে হাতের ডালটা বেশ শক্ত করে পুঁতে দেয় প্রায় পঁচিশ ফুট দূরের বালিতে। তারপর পিছিয়ে এসে হাতে তুলে নেয় বুমেরাং। ঠিকঠাক তাক করে ছুঁড়ে দেয় হাতের অস্ত্র। হাওয়া কেটে পাক খেতে খেতে উড়ে যায় সেটা। বোধ হয় দু-সেকেন্ড। তারপরই খটাস শব্দ। মেহগনি কাঠের বুমেরাং ঠিক গিয়ে লেগেছে গাছের ডালটায়। দৌড়ে গিয়ে সেটাকে কুড়িয়ে এনে আবার ছোঁড়ে অস্ত্রটা। একবার, দু-বার, বারবার। আর প্রতিবারেই টার্গেটে গিয়ে লাগে বুমেরাং।… হ্যাঁ, পেরেছে সে। অনেকদিন পরে হলেও অন্ধকারে লক্ষ্যভেদ করতে পেরেছে সে। তাই তৃপ্তিতে বুকভরে শ্বাস নেয় রজনী। তারপর জিনিসপত্র গুছিয়ে, তোরঙ্গ বগলে বাড়ির পথ ধরে। রাত অনেক হয়েছে। কাল আবার রবিবার। সে ঠিক করেছে কাল ছেলেদের বুমেরাং ছোঁড়া শেখাবে। আর এখন আগের খচখচানিটা কেটে গিয়ে মনটাও শান্ত হয়েছে সাফল্যের খুশিতে। আরও ভালো লাগছে দাদুর লুকোনো তোরঙ্গটা কাছে রাখতে পেরে। এবারে দরকার শুধু ঘুমের।
