১৯৪৪, নভেম্বরের শেষদিক – ওহ বাই জিঙ্গো, ফিয়াট ৫০০ আর বিষ্টুচরণের লাশ

১৯৪৪, নভেম্বরের শেষদিক – ওহ বাই জিঙ্গো, ফিয়াট ৫০০ আর বিষ্টুচরণের লাশ

কলকাতা এক আশ্চর্য সর্বংসহ শহর। যুদ্ধের হুমকি, মন্বন্তরের খিদে, স্বাধীনতার জন্যে রাজনীতির দোলাচল, সব নিয়েও সে বেঁচে থাকে অম্লানবদনে।

১৯৪৩ কেটে গেছে। তবুও রয়ে গেছে তার ধাক্কা। শহর জুড়ে এখনও কঙ্কালসার ভুখা মানুষের মিছিল। কলকাতার আশেপাশের জেলাগুলো আর পূর্ববাংলা থেকে না খেতে পাওয়া মানুষগুলো এসে জুটেছে এখানে— যদি একটু খাবার মেলে। পেটের জ্বালা যে সবচেয়ে বড়ো জ্বালা। এই হেমন্ত-রাতের ঠান্ডাতেও তাদের গায়ে শুধুমাত্র সামান্য কাপড়। সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত এরা কলকাতার পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায়। বাসি ভাত, বাসি রুটি, ছাতাপড়া পাঁউরুটি এমনকী খানিকটা ভাতের ফ্যান পেলেও বর্তে যায় তারা। রাতে খোলা আকাশের নীচে ফুটপাথে শুয়ে থাকে গায়ে গা লাগিয়ে একটু ওমের আশায়।

বাঁচার আশায় কলকাতায় আসা, কিন্তু তবু এরা মরে। ‘ভারত সেবাশ্রম সংঘ’ বা ‘রামকৃষ্ণ মিশন’-এর মতো সংস্থাগুলো এদের জন্যে যে খাবার, জামাকাপড়, কম্বল আর চিকিৎসার ব্যবস্থা করে তা যেন ‘সিন্ধুতে বিন্দু’। রোজ শয়ে শয়ে মানুষ ঢুকছে কলকাতায়। কোনো প্রতিষ্ঠানের, তা সে যত বড়োই হোক না কেন, সাধ্য নেই এই লাখো মানুষের ভুখা পেটে খাবার দেবার, তাদের চিকিৎসা করার। তাই দেখা যায় কুকুরের পাশাপাশি মানুষও আঁস্তাকুড় থেকে খাবার খুঁটে খাচ্ছে। কঙ্কালসার মায়ের ন্যাতানো বুকেও নেই একফোঁটা দুধ যা সে তার কোলের বাচ্চাটাকে দেবে।

সকালে, দুপুরে বা সন্ধেয় গেরস্তের বন্ধ বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ে ভুখা মানুষেরা। তারা অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে মরে আর হেমন্তের রাতের শিশিরভেজা ফুটপাথে বা রাস্তায় পড়ে থাকে তাদের লাশ। দিনের বেলা খবরের কাগজের লোক এসে সেই ছবি তুলে নিয়ে যায়। নিদারুণ খিদে আর করুণ মৃত্যুও পণ্য হয়ে যায় কলকাতা শহরে। কাগজের লোক ছবি তুলে নিয়ে চলে গেলে অনেক বেলায় আসে মুদ্দফরাস। ততক্ষণে কুকুরগুলোও লাশ শুঁকে শুঁকে লোকের তাড়া খেয়ে ফিরে গেছে। মুদ্দফরাসেরা চাটাইয়ে মৃতদেহ জড়িয়ে দড়ি বেঁধে বাঁশে ঝুলিয়ে নিয়ে যায়। কখনো কখনো কোনো শবের মুণ্ডু বা হাত বেরিয়ে ঝুলতে থাকে। পথচলতি মানুষ সরে যায় একপাশে। দোতলা বাড়ির বারান্দা থেকে মুখের সারি তাকিয়ে দেখে সেই লটপটানো হাত। কেউ কেউ হয়তো সেই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে সরে যায়। কিন্তু বেশিরভাগেরই কোনো বিকার নেই। থাকবেই বা কী করে? এখনও তো মন্বন্তরের রেশ চলছে দেশে। এমন তো প্রায়ই চোখে পড়ে। গায়ে সয়ে গেছে সব।

অফিস থেকে রজনী আর সুবিমল একসাথে বেরিয়েছে আজ। আগে হওয়া কথামতো ট্রিট দেওয়া হয়নি সুবিমলকে। আসলে পুলিনের মৃত্যুর শোকে সে এতটাই বিহ্বল হয়ে পড়েছিল যে ট্রিটের কথাটা সে প্রায় ভুলতেই বসেছিল। তাই আজ সুবিমল পাকড়াও করেছে তাকে।

কলেজ জীবন আর আগের চাকরির মাহাত্ম্যে কলকাতার হালচালে আগেই কিছুটা সড়গড় ছিল রজনী। তবে এখন জাদুঘরে চাকরি পাবার পরে আর সুবিমলের সান্নিধ্যে থেকে কলকাতায় আরও অনেক বেশি অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে সে। দুজনে বারে ঢোকে। আজ কোনো জড়তা ছাড়াই সে দুজনের জন্যে খাবার, সুবিমলের জন্যে ভালো হুইস্কি আর নিজের জন্যে সোডা অর্ডার করে। অর্ডার নিয়ে বেয়ারা চলে গেল।

বারে গানবাজনা হচ্ছে। সন্ধের দিকে প্রায়ই হয়। তবে আজ জমিয়ে গান হচ্ছে। এটা আসন্ন ডিসেম্বরের প্রস্তুতি। এক মহিলা গাইছেন— ‘ওহ বাই জিঙ্গো’।* সঙ্গে বাজছে গিটার, পিয়ানো, ড্রাম, ট্রাম্পেট, অ্যাকোর্ডিয়ান। গানের সুরটা এমনই যে লোকে শরীর দোলাতে বাধ্য।

সুবিমল দু-হাতের আঙুলে তুড়ি বাজাতে বাজাতে বলল— ‘আসল গানটা কার গাওয়া জানিস?’

ওয়েস্টাৰ্ন মিউজিকের ব্যাপারে রজনী নিতান্তই অজ্ঞ। তাই সে বললে— ‘না।’ এদিকে সুবিমল অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে। তাই ওর কালচারও রজনীর সঙ্গে অনেকাংশেই মেলে না। যদিও তার প্রভাব তাদের বন্ধুত্বে কখনো পড়েনি।

বেশ খুশি খুশি মনেই সুবিমল বলল— ‘এটা বিলি মারের গাওয়া গান। ১৯৪২ সালের টপ টেনের একটা। বুঝলি?’

—‘ও আচ্ছা। তা এই গানটা আমাদের কোনো সিনেমায় ঢোকালে কেমন হয়?’

—‘জমে যাবে রে। হল কেঁপে যাবে, বলে দিলাম। তা এবার থেকে একটু বিদেশি গান-বাজনা শোনো বস।’

গ্লাসের জলে একটা চুমুক মেরে রজনী বলে— ‘আচ্ছা, সে না-হয় বুঝলাম ব্রাদার যে ওয়েস্টাৰ্ন গানও আমার শোনা উচিত। কিন্তু তুই আগে বল, সেগুলো শুনলেই কি সায়েব সুবোদের সঙ্গে এক টেবিলে বসে সসম্মানে খাওয়া যাবে? ইংরেজি গান জানলেই কি ইংরেজরা তোকে আদর করে কোলে টেনে নেবে? আরও একটা কথা বল, আমাদের ভাষায় আজকাল যেসব গান হচ্ছে, ইয়ে, মানে যেমন ধর এই রবিঠাকুরের গান, তুই কি তা শুনিস?’

বেয়ারা খাবার আর ড্রিঙ্কস দিয়ে যায় টেবিলে। দু-জনে খাওয়া শুরু করতে যাবে এমন সময় রজনীর নজর যায় ডায়াসের দিকে যেখানে গান হচ্ছে। চোখ চালাতেই নজর পড়ে যায় গিটারবাদকের দিকে। চমকে ওঠে সে। সুবিমলকে ডেকে দেখায়। সুবিমল বলে— ‘দেখেছিস, তোকে বলেছিলাম না যে পিটার ভালো গিটার বাজায়। আজ প্রমাণ পেলি তো?’

পিটার সুর তুলেছে গিটারে। বাজাচ্ছে ‘জিঙ্গল জিঙ্গল জিঙ্গল’। গাইছে গানও। সত্যিই অপূর্ব হাত পিটারের আর গলাও বেশ ভালো। সঙ্গে বাজছে ড্রাম। সে তন্ময় হয়ে গাইছে আর বাজাচ্ছে। গানের তালে তালে দুলছে তার শরীর। দুলছে দর্শকদের শরীরও।

এদিকে দুই বন্ধুর খাওয়া চলছে। চলছে গান শোনা আর চলছে কথাও। দু-জনেরই বেশ ভালো লাগছে। এও কলকাতার আরেক জীবন। রোমান্সে ভরপুর। এই জীবনে যুদ্ধের শঙ্কা নেই, মন্বন্তরের খিদে নেই। নেই স্বাধীনতার জন্যে একদিকে প্রাণের আহুতি আর অন্যদিকে স্বার্থান্বেষী রাজনীতির কূটকাচালি।

একসময়ে পিটারের গানটাও শেষ হল। সুবিমলও তার দ্বিতীয় পেগটা নিয়েছে।

এবারে পিটার গিয়ে বসল পিয়ানোয়। হাতে একটা পেগ নিয়ে দুটো চুমুক মেরে সেটা রাখল পিয়ানোর ওপরে। বাকি শিল্পীরা নেমে গেল স্টেজ থেকে। এখন ডায়াসে দর্শকদের দিকে মুখ করে বসে পিটার। পিয়ানোর রিডে দু-হাত রাখতেই গমগম করে বেজে উঠল সেটা। তার মানে এখন শুধু পিয়ানোয় বাজবে সুর। পিটার একবার চোখ বুজে ওপরের দিকে মুখ তুলে শুরু করলে বাজাতে।

গানটার মুখড়া শুরু হতেই সুবিমল একটুকরো কাবাব মুখে তুলে তার পেগে একটা চুমুক দিয়ে বলল— ‘আচ্ছা বেশ, এবার বল তো এটা কার গান বাজানো হচ্ছে?’

গানটার সুর রজনীর চেনা। একান্তই চেনা। তাই মিটিমিটি হেসে সে বলল— ‘রবীন্দ্রনাথের গানের সুর।’

হাঃ হাঃ করে হেসে সুবিমল বলল— ‘কী যে বলিস। ওরে বাবা এটা হল বেন জনসনের লেখা একটা কবিতা যেটাতে পরে সুর বসানো হয়। অবশ্য সুরে নাকি মোজার্টের প্রভাব আছে বলেও অনেকের কাছে শুনেছি।’

—‘তা সেই কবিতার লাইনগুলো কী শুনি? মনে আছে? নাকি ভুলে মেরে দিয়েছিস?’

একটু হেসে সুবিমল সামনে ঝুঁকে আসে। তারপর পিয়ানোর সুরে সুর মিলিয়ে নীচুস্বরে গাইতে শুরু করে—

Drink to me only with thine eyes, and I will pledge with mine.
Or leave a kiss within the cup and I’ll not ask for wine.

বলেই আবার একটা চুমুক দিয়ে বলল— ‘কী রে? কেমন? হল তো?’

রজনীও উত্তরে হেসে পিয়ানোর সাথে সুর মিলিয়ে নীচু গলায় ধরে—

ভেবেছিনু মনে মনে দূরে দূরে থাকি
চিরজন্ম সঙ্গোপনে পূজিব একাকী—
কেহ জানিবে না মোর গভীর প্রণয়,
কেহ দেখিবে না মোর অশ্রুবারিচয়।
আপনি আজিকে যবে শুধাইছ আসি,
কেমনে প্রকাশি কব কত ভালোবাসি।
কতবার ভেবেছিনু আপন ভুলিয়া …

সুবিমল হাঁ হয়ে শুনছে। ন্যাপকিনে হাতটা মুছে রজনী হেসে বলল— ‘কী রে এবারে হল তো?’

—‘এটা রবিঠাকুরের লেখা?’

—‘ইয়েস মেরে দোস্ত। বেন জনসনের ওই গানটা অনেকেই গেয়েছে। তা এই সুরটা রবীন্দ্রনাথের বড়ো ভালো লাগে। তাই উনি ওই গানের সুরটাতে নিজের মতো করে কথা বসান, বুঝলি?’

টেবিলে কনুই রেখে দু-হাতের চেটোতে মাথা রেখে বেশ খানিকক্ষণ সুরটা শোনে সুবিমল। তারপরে বলে— ‘হ্যাঁরে, এইরকম ওয়েস্টাৰ্ন সুরে আরও কি গান আছে ওনার লেখা?’

—‘থাকবে না কেন? পাশ্চাত্য গানের সুরে, আমাদের দেশের লোকসংগীতের সুরে, এমনকী শুনলে আশ্চর্য হবি যে মহীশূরের রাজদরবারের অ্যান্থেমের সুরেও উনি কথা বসিয়েছেন। তুই বরং এক কাজ কর। ওনার পাশ্চাত্য সংগীতের সুরে লেখা গানগুলো দিয়েই প্রথমে শুরু কর। তুই যেখান থেকে রেকর্ড কিনিস, সেখানে গিয়ে খোঁজ করলেই পাবি। সেই গানগুলো আগে তুই শোন। আর তেমন হলে পরে আমিই না হয় তোকে একটা লিস্ট বানিয়ে দেব।’

—‘ঠিক আছে। দেখতে হবে খুঁজে।’ টেবিলে টোকা মারতে থাকে সুবিমল গানের তালে তালে।

—‘ওরে, মোহিত হয়ে যাবি রে শুনে। সিমপ্লি স্পেলবাউন্ড হয়ে যাবি।’

ক্রমে পিয়ানোর সুর শেষ হল। সুরের মূর্চ্ছনায় মোহিত হয়ে টেবিলে বসা মানুষেরা হাততালি দিচ্ছে। সুবিমলও তালি দিয়ে উঠল। সত্যি, কী ভালো বাজায় লোকটা।

পিটার পিয়ানো ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে তার পেগ একটা লম্বা চুমুকে শেষ করে এক একটা টেবিলের উদ্দেশ্যে ‘বাও’ করতে লাগল। কিন্তু সুবিমলদের টেবিলের দিকে নজর পড়তেই থমকে যায় সে। রজনীর দিকে তাকিয়ে থাকে কয়েক মুহূর্ত। তারপর ডায়াস থেকে নেমে একটা সিগারেট ধরিয়ে তাদের টেবিলের কাছে এগিয়ে আসে। টেবিলে এক হাতের ভর রেখে একমুখ ধোঁয়া ছাড়ে রজনীর মুখ লক্ষ্য করে। বাঁ-হাতের ঝাপটায় রজনী সরিয়ে দেয় সেই ধোঁয়া। পিটারের চোখে ক্রুর চাউনি। সামনে ঝুঁকে পড়ে সে রজনীকে বলতে থাকে— ‘I suppose you are that pal who snatched my prey that day.’

সত্যি, পিটারের স্মৃতিশক্তি সাংঘাতিক। ধর্মতলায় লাঠি চালোনার ঘটনার সময়ে কয়েক লহমায় দেখা রজনীর মুখটা সে মনে রেখেছে।

রজনী কোনো উত্তর দেয় না। সুবিমল তো জানে ধর্মতলার কথা। রজনীই তাকে বলেছিল। সে চায় না একটা বিচ্ছিরি কিছু হোক। তাই সে পিটারকে বলে— ‘Behave yourself Peter. Don’t create a scene here.’

পিটার হিসহিসিয়ে ওঠে— ‘What scene? This fellow had snatched my prey that day and I won’t say anything? What do you expect? Am I to behave like a gentleman with this black nigger?’

সুবিমল ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। বন্ধুর এই অপমান তার গায়ে লেগেছে। সে ঠিক করে, পিটার কিছু করলেই সে তার উপযুক্ত জবাব দেবে। যা হবে তারপর দেখা যাবে। এদিকে পিটারও টানটান হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটা কিছু ঘটে যেতে পারে সেই আশঙ্কায় রজনীও উঠে দাঁড়ায়। বারসুদ্ধু লোক তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। একটা বিপদের গন্ধ পাচ্ছে সে।

সুবিমল কিন্তু ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। সে কঠিন গলায় বলে— ‘I again remind you Pit. Behave yourself.’ রজনী দেখে সুবিমলের হাত মুষ্টিবদ্ধ। পিটার আরও কিছু বললে হয়তো সে মেরেই দেবে। বারের মধ্যে একটা সিন ক্রিয়েট হলে সেটা যাচ্ছেতাই হবে। তা ছাড়া পিটার পুলিশের লোক। তাই সে সুবিমলের কাঁধে হাত দিয়ে চাপ দেয়। কিন্তু পিটার বেশ উত্তেজিত। তার লালমুখ আরও লাল হয়ে গেছে।

—‘You bastard, gonna teach me a lesson?’ বলে ঘুঁষি মারতে যায় সুবিমলকে। সুবিমলও ঘুঁষি তোলে ‘বেজম্মা’ শব্দটা শুনে।

চকিতে রজনী দু-জনের দুটো উদ্যত হাত তার দুহাত দিয়ে খপ করে ধরে ফেলে। সুবিমল আর পিটার দুজনেই রাগে থরথর করে কাঁপছে। কিন্তু রজনীর হাত থামিয়ে রাখে দু-জনকেই। এদিকে টেবিলে গণ্ডগোল হচ্ছে দেখে ছুটে আসে বারের লোকজন। তারা পিটারকে সরিয়ে নিতে চায়। তাকে অনুরোধ করতে থাকে।

সরে যেতে যেতেও পিটার রজনীকে থ্রেট করে— ‘This time I spared you, but remember whenever I’ll get the chance I will just kill you… kill you bloody nigger.’

বারের লোকজন পিটার ব্রাগানজাকে ভেতরে নিয়ে যায়। সে রজনীর চেপে ধরা ডানহাতটা চেপে ধরে চলেছে।

সেলিব্রেশনের আনন্দটাই মাঠে মারা গেল। তাই বিল মিটিয়ে রজনী বন্ধুকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। সুবিমল বললে— ‘ওঃ আমার হাতটা মাইরি আরেকটু হলেই গিয়েছিল। বাপরে, কী গায়ের জোর তোর। দেখলে তো বোঝা যায় না। মুঠিটা আপনা থেকেই আলগা হয়ে গেল।’

রজনী হেসে বললে— ‘তুই কি ভুলে গেলি যে আমি তাইকোন্ডো জানি? তাই কোথায় কোন ভেন বা নার্ভে চাপ দিলে কী হতে পারে সেটা আমার জানা আছে। যাকগে, নে চল তোকে আমি পান সিগারেট খাওয়াচ্ছি; দেখবি ব্যথাটা মরে যাবে একটু পরেই।’

পানটা মুখে পুরে সিগারেট ধরায় সুবিমল। আজ রজনীও একটা মিঠা পান খাচ্ছে।

দুই বন্ধু গল্প করতে করতে এগিয়ে চলে পার্ক স্ট্রিট আর ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ক্রসিংয়ের দিকে।

রজনী হঠাৎই সুবিমলকে বলে— ‘হ্যাঁরে, তোর কাছে ন্যাশনাল লাইব্রেরির কার্ড আছে?’

সুবিমল আচমকা এই প্রশ্নে থতমত খেয়ে যায়। তারপর বলে— ‘না রে, আমার নিজের তো ওখানে কার্ড নেই। কিন্তু হঠাৎ তোর বই পড়ার দরকার পড়ল কেন? তা বই পড়ার ইচ্ছে হলে পাড়ার লাইব্রেরিতে খোঁজ কর।’

—‘আসলে দ্যাখ, ফসিল নিয়ে কাজকর্ম করতে হয়তো, কিন্তু ফসিলের ব্যাপারে তো আমি যাকে বলে এক্কেবারে আনাড়ি। আর পাড়ার লাইব্রেরিতে কি আর এইসব বই রাখে? তাই ভাবছিলাম, তুই কোনোভাবে যদি একটা কার্ড ম্যানেজ করে দিতে পারিস দু-একদিনের জন্যে…মানে অফিস থেকে বেরিয়ে আমি ওখানের রিডিং রুমে বসেই পড়ে নেব। দ্যাখ না, তোর তো অনেক জানাশোনা লোক আছে। তাদের কারোর কাছ থেকে যদি…।’

—‘ও আচ্ছা, দাঁড়া দাঁড়া।… মনে পড়েছে। একটা কার্ড মনে হয় ম্যানেজ হয়ে যেতে পারে। আমাদের বাড়িতেই তো একজন আছে। তবে তাকে পটাতে হবে।’

—‘কে সে?’

—‘আরে আমার মেজ কাকা। তোরই মতো বিয়ে-থা করেনি। অফিসে যায় আর বাড়ি ফিরে লাইব্রেরি থেকে আনা বইয়ে মুখ গুঁজে বসে থাকে। বলে কী জানিস—‘বউয়ের থেকে বই ভালো’। তা মেজকাকে এককৌটো ভালো সিগারেট দিয়ে ফিট করে দিন তিনেকের জন্যে কার্ডটা বাগাতে হবে, বুঝলি।’

—‘উনি কি দিতে রাজি হবেন?’

—‘নয়কে হয় করাতে হবে। বলব— ‘আমার দরকার। কার্ডটা দু-তিনদিনের জন্যে দাও।’ আমি শিয়োর, ভালো সিগারেট ঘুষ পেলে মেজকা আমার কথা ফেলতে পারবে না। তা, তুই না-হয় পরশু অফিসে কার্ডটা নিয়ে নিস আমার কাছ থেকে। ঠিক আছে?’

—‘ওক্কে দোস্ত। নো প্রবলেম।’

রাস্তার ওপারে একটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে প্যাসেঞ্জারের অপেক্ষায়। মোড়ে দাঁড়িয়ে সিগারেটটা শেষ করে ওটাই ধরবে সুবিমল।

কিন্তু রাস্তায় নামতেই একটা গাড়ির হেডলাইটে চোখ ধাঁধিয়ে যায় তাদের। গাড়িটা যেভাবে স্পিডে ফুটপাথের ধার ঘেঁষে বাঁক নিচ্ছে তাতে তারা দু-জনেই গাড়িচাপা পড়তে পারে। চকিতে রজনীর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে ওঠে। এক ঝটকায় সুবিমলের কোমর ধরে পাক খেয়ে চকিতে উঠে পড়ে ফুটপাথে। সাঁ করে পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায় গাড়িটা। আর সামান্য দেরি হলেই মারা পড়ত তারা। উফ, খুব বাঁচা বেঁচে গেছে এ যাত্রায়। সুবিমল এই আচমকা ঝটকায় পড়ে গিয়েছিল মাটিতে। সে অতটা খেয়াল করেনি। কিন্তু রজনীর চোখ এড়ায় না গাড়িটা। ওটা পিটারের ফিয়াট ৫০০।

.

কয়েকদিন পরে ফসিল দুটো পর্যবেক্ষণ করে তার একটা রিপোর্ট তৈরি করেছেন ড্যানীবাবু। রজনী একমনে সেটাই টাইপ করে যাচ্ছিল।

—‘বুঝলে রজনী, বড়োকত্তা কাল থেকে ক্রিসমাসের ছুটিতে যাচ্ছেন। ফিরবেন জানুয়ারির দশ-বারো তারিখ নাগাদ। তাই এই রিপোর্টটা আজই ওনাকে দিয়ে সই করিয়ে রেকর্ডে রাখতে হবে। যদিও ফসিল দুটোয় সিগনিফিক্যান্ট কিছু পাওয়া যায়নি, তবু রেকর্ড তো রাখতেই হবে। পারলে একটু তাড়াতাড়ি করে দিও।’

আর দু-পাতা করলেই হয়ে যাবে স্যার। বেশিক্ষণ লাগবে না।’ রজনী আরেকটু দ্রুত হাতে টাইপ করতে থাকে।

—‘গুড। তা এবার তোমার ওই বাচ্চাটাকে তো কলকাতায় আনতে হবে। আমি প্রিন্সিপালকে ফোন করেছিলাম। উনি বলেছেন যে সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ফ্রি-শিপ পাবে আর হস্টেলও হয়ে যাবে। তবে একজন নামকরা লোকের রেফার লেটার লাগবে। তা ওর বাবা কি রাজি হয়েছেন?’

টাইপ করা একটু থামিয়ে রজনী বলল— ‘প্রথমটায় হচ্ছিল না। কিন্তু গ্রামেও তো দুর্ভিক্ষের ব্যাপক প্রভাব। তাই বলতে পারেন যে একরকম বাধ্য হয়েই ভদ্রলোক রাজি হয়েছে। তা ছাড়া প্রতি সপ্তায় তো বাড়ি আসতে পারবে ছেলে।’ আবার টাইপ শুরু করে রজনী।

একটু পরেই আবার ড্যানীবাবু বলে ওঠেন— ‘আচ্ছা রজনী, তুমি সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল দেখেছ?’

কাজ করতে করতেই রজনী বলে— ‘বাইরে থেকে স্যার।’

—‘তাহলে তুমি এক কাজ কর। সামনের ডিসেম্বরের চব্বিশ তারিখ রাতটা তুমি ক্যাথিড্রালের ভেতরেই কাটাও। মিড নাইট মাসে। যদিও ওটা শুধুমাত্র খ্রিস্টানদের জন্যেই, তবু তুমি একবার ভেতরে যেও। পেছনের দিকে বসবে। কে আর দেখতে যাচ্ছে। চারিদিকে ক্যান্ডেলের আলো, ক্রিসমাস ক্যারল— সে এক দারুণ সিকোয়েন্স। চলবে সেই ভোর পর্যন্ত। আমিও একবার গিয়েছিলাম। বিউটিফুল এক্সপিরিয়েন্স। মন ভরে যায়। তাই বলি ওটা মিস কর না। তারপর না-হয় দিন-দশেকের জন্যে চলে যেও গ্রামে। একেবারে ছেলেটাকে নিয়েই ফির।’

—‘কিন্তু স্যার অ্যাটেনড্যান্স?’

—‘বড়োকত্তা যখন থাকছে না তখন আমি ছাড়া আর কাউকে তো তোমায় জবাবদিহি করতে হবে না। তাই অ্যাটেনড্যান্সের ভাবনাটা না হয় আমার ওপরেই ছেড়ে দিলে।’

অভিভূত রজনী ড্যানীবাবুর দিকে ফিরে বলল— ‘থ্যাংক ইউ স্যার।’

—‘নো মেনশন মিস্টার রজনীকান্ত রায়।’ বলে ঘর কাঁপিয়ে নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে ফেলেন অমায়িক ড্যানীবাবু।

.

আজ হাটতলাতেই বাস থেকে নেমে পড়ল রজনী। এখানে রঘুর চায়ের দোকানে আড্ডা মারে শ্যামাদাস, দিনেশ আর বিষ্টুচরণ। আগে এখানে একটু ঢুঁ মেরে দেখতে হবে। গ্রামের সাম্প্রতিক হালচালের হদিশ পাওয়াও যেতে পারে। তারপরে কাল-পরশু করে না-হয় কানাইদের বাড়িতে যাওয়া যাবে।

‘Time is the best healer’— কথাটায় আজ বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় না রজনীর। রোজই কখনো না কখনো তার পুলিনের কথা মনে পড়ে; বিশেষ করে সন্ধে ঘনিয়ে এলে। তখন একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে আর তা মিলিয়ে যায় সন্ধের ঠান্ডা বাতাসে।

আজও যেমন রঘুর চায়ের দোকানে ঢুকতে ঢুকতেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার। তবে সেটাকে একটু হালকাভাবে নিয়ে সে একটা চায়ের অর্ডার করলে। ভেতরে বসে আছে দিনেশ আর বিষ্টু। সিগারেট ফুঁকছে।

তাকে দেখেই রঘু বলে ওঠে— ‘আরে রজনীদা যে, এসো এসো। বোসো। তা বল দিকি, কলকাতার খপর কী?’

—‘আর কলকাতা! সেখানের যা অবস্থা। মানুষ ফ্যান চেয়েও পাচ্ছে না। ম্যালেরিয়া আর কলেরায় রোজই মানুষ মরছে। অবশ্য সেসব তোমরা খবরের কাগজেই দেখতে পাও।’

—‘হ্যাঁ শ্যামাদার কাচ থেকে খপর পাই বটে। তবে আমরাও গেরামে ভালো নেই গো। জিনিস পত্তরের দাম এমনই আক্রা যে…’

—‘হাত দিলে ছ্যাঁকা লাগে গো।’ সিগারেটে টান দিয়ে ফোড়ন কাটে বিষ্টু।

চায়ের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে রজনী ভাবে— জিনিসপত্রের দাম আক্রা। তবু এরা দামি সিগারেট ফোঁকে কী করে? পয়সা পায় কোথায়?

একটুপরেই রঘু চা দিয়ে যায়। তাতে একটা চুমুক দিয়ে টেবিলে গ্লাসটা নামিয়ে রেখে সে বলে— ‘তা শ্যামাদাকে দেখছি না যে।’

দিনেশ বলে— ‘শ্যামাদা সকালে কলকাতায় গেছে। কী একটা কাজ আছে। ফিরতে দিন তিনেক হবে।’

বিষ্টুচরণ বলে ওঠে— ‘অন্যসময়ে তো দু-একদিনের জন্যে যায়। এবারেই দেকচি তিনদিন।’

দিনেশ তার দিকে তাকাতেই চুপ করে যায় সে। কিন্তু রজনীর চোখ এড়ায় না ব্যাপারটা।

—‘তা শ্যামাদার সঙ্গে তোমার কোনো বিশেষ দরকার আছে নাকি? তেমন ব্যক্তিগত কথা না হলে আমায় তুমি বলতে পার। শ্যামাদা এলে আমি তাকে বলে দেব। অবশ্য অন্য কোনো কথা থাকলে…।’

দিনেশের কথা কেটে দিয়ে নিশ্চিন্তে চায়ে চুমুক দিয়ে রজনী বলে— ‘আরে না না। তেমন কোনো বিশেষ কথা নেই। এমনই জিজ্ঞেস করছিলাম আর কী।’

খানিকপরে সবার চায়ের দাম মিটিয়ে পেছন ফিরে তাদের দিকে হাত নেড়ে রজনী এগিয়ে গেল বাড়ির পথে। সুরেশ কাকা সেখানে অপেক্ষা করে আছে।

.

বিষ্টুচরণের গাঁজা খাওয়ার অভ্যেস অনেকদিনের। অবশ্য খায় সে লুকিয়ে চুরিয়ে। হাটতলার চালকলের পেছনের আবডালে জমা হয় তারই মতো আরও তিন-চারজন গ্যাঁজাখোর। একটা ছোটো ছাতিমগাছের নীচে বসে তারা। টাউন থেকে ভালো মণিপুরী গাঁজা জোগাড় করে আনে বিষ্টু। টাউনের পুলিশ তাকে চেনে। তা ছাড়া ঠেকের মালিকও পুলিশের হাতে গুঁজে দেয় কিছু। তাই বিষ্টুকে তারা কিছু বলে না।

গাঁজার এমনই টান যে গ্রীষ্মকালের ঠা ঠা দুপুরেও পান্তা খেয়ে এই চালকলের পেছনের ঠেকে চলে আসে তারা। হাতে হাতে ফেরে লাল ভেজা কাপড়ের টুকরোয় মোড়া কল্কে। তবে শেষ টানটা বিষ্টুচরণের জন্যে বরাদ্দ। শিবনেত্র হয়ে টান মেরে কল্কে ঝেড়ে সাফ করে তার ভেতরে ছোটো ইঁটের টুকরোটা রেখে ওই কাপড়টা দিয়ে ভালো করে মোড়ে সেটা। তারপর নিজের কোমরে বাঁধা গামছায় এমনভাবে যত্ন করে গুঁজে রাখে, যে দেখলে মনে হয় সে যেন যখের ধন আগলাচ্ছে। এত গেল দুপুরের কারবার। তবে আরেকবার স্যাঙাতরা জমা হয় ঠেকে। রাত্তিরে বাড়ি ফেরার আগে। আর এমনই গাঁজার মাহাত্ম্য যে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষাতেও কল্কে ঠিক জ্বলবেই।

এদিকে আবার যখন মাঠের কাজ থাকে না, তখন বহুরূপীর ভেক ধরে বিষ্টু। যেদিন সকালের দিকে বেরোয়, সেদিন দুপুরে হাটতলা ঘুরে বাড়ি ফেরে সে। আবার যেদিন বিকেলের দিকে বেরোয়, সেদিন ফেরার পথে রাতে হাটতলা ঘুরে যেতেই হয় একবার।

বিষ্টু খেয়াল করে দেখেছে যে রাম, হনুমান বা কৃষ্ণ সাজলে দক্ষিনা মেলে কম। কিন্তু শীতলা বা কালী সাজলে গাঁয়ের মানুষ ভালোই হাত উপুড় করে। এখন বহুরূপী সাজতে গেলে রং মাখতে হয় গায়ে। কিন্তু সেই রং তো টাউনে পাওয়া যায় না। কলকাতার চিৎপুরের যাত্রাপাড়ায় একটা দোকানে মেলে তা। তার বাড়ির তিনটে বাড়ি পরে থাকে ভুবন মন্ডল। সে যাত্রাপাড়ার কাছাকাছি একটা ছাপাখানায় কাজ করে। তাকে পয়সা দিলে সেইই এনে দেয় গায়ে মাখার নীল, সাদা, হলুদ বা কালো রং। এই রংগুলোর সুবিধে এই যে, এগুলো রোদে গলে যায়না আর সাবান মেখে চান করলে বা রগড়ে জলে ধুলেই উঠে যায়।

যাইহোক, বাচ্চাকাচ্চা হয়নি বলে একটাই ঘরে তারা স্বামী-স্ত্রী থাকে। জমি-জিরেতও তেমন নেই। তাই বিষ্টুকে গরিবই বলা চলে। অন্যের জমিতে মুিনষ খেটে বা বহুরূপী সেজে দুটো পয়সা কামাতে হয় তাকে। আগে রাতে জল-মুড়ি খেয়ে শুতে হত, তবে ইদানীং শ্যামাদাসের দলে ভিড়ে, তার দেওয়া কাজকর্ম করে দুটো পয়সা আসছে হাতে। তাই এখন রাতেও দুটো ভাত জুটছে তাদের কপালে। সামনের উঠোনের একপাশে পালং, মূলো আর বেগুন চারা বসিয়েছে তার বউ। সকালবেলা উঠে পাশেরই কুয়োতলা থেকে ওই একটুকরো সবজিবাগানে জল দিয়ে খিড়কি পুকুরে নাইতে যায় সে। কুয়োর জলে চান করা তার পোষায় না। তারপর চান সেরে জল-মুড়ি খেয়ে সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। ফেরে আবার সেই দুপুরে ভাত খেতে।

তবে আজকাল রাতে বাড়ি ফিরতে একটু বেশিই দেরি হয়ে যাচ্ছে তার। বাড়ি ঢোকার আগে হাটতলায় চার-ইয়ারে মিলে গাঁজায় দম মেরে তবেই বাড়ি ফেরে। তাই তার বউ বিষ্টুর খাবারটা ঢাকা দিয়ে রেখেই শুয়ে পড়ে।

বিষ্টু বাড়ি ঢুকে সাইকেল রেখে, গাঁজার সরঞ্জাম চালের বাতায় গুঁজে রেখে খিড়কি পুকুরে নাইতে যাবার জন্যে তৈরি হয়। গ্রীষ্ম, বর্ষা, এমনকী কনকনে শীতেও রাতে তার চান করা চাইই। সম্ভবত গাঁজার মহিমায় ঠান্ডা লাগে না তার; কিংবা হয়তো তার বছরভরের অভ্যেস এটা। তাইই…।

আজও বিষ্টুচরণ লুঙ্গি আর গামছা নিয়ে লন্ঠন হাতে দাওয়া থেকে নামতে যাবে, এমন সময় খিড়কি পুকুরের ধার থেকে দিনেশ তাকে ডাকল— ‘এই বিষ্টুদা, এদিকে এসো।’

বিষ্টুচরণ ভাবে, দিনেশ তো সাইকেল চেপে তার বাড়িতে ঢোকার সরু পথটা দিয়ে আসে। কিন্তু আজ কেন খিড়কি পুকুরের দিকে? পুলিশ কি তবে সেনবাড়িতে তল্লাশি চালাল, নাকি প্যাকেট নিয়ে এসেছে সে? এদিকে শ্যামাদাসের তো কলকাতা থেকে ফেরার কথা তিনদিন পরে। তাহলে দিনেশ তাকে কীজন্যে ডাকে? নিশ্চয়ই কিছু একটা ঘটেছে।

পুকুরধার থেকে আবার ডাক শোনা যায়— ‘কী গো বিষ্টুদা, দাঁড়িয়ে রইলে কেন? পুকুরধারে এসো।’

বিষ্টুচরণের বউও ঘুমের ঘোরে ডাকটা শুনেছিল। শেষ হেমন্তের এই নিঃঝুম রাতে দূর থেকে শিয়াল কুকুরের ডাকেও অনেকসময় ঘুমটা পাতলা হয়ে যায়, আর এ তো ঘরের কাছেই দিনেশের গলা। সে জানে যে অনেক সময়েই দিনেশ রাত বিরেতে বিষ্টুর সঙ্গে দেখা করতে আসে। তাই আর সে কোনো গুরুত্ব দেয় না। নাছোড়বান্দা ঘুমের টানে সে পাশ ফিরে শোয় মোটা কাঁথার তলায়। কাঁথাটা টেনে কান পর্যন্ত ঢাকা দিয়ে দেয়। নদীপাড়ের গ্রামের দিকে এখনই ঠান্ডাটা যে বেশ।

বিষ্টুচরণ নাবাল পথে এগিয়ে যায় খিড়কি পুকুরের দিকে। কিন্তু ঘাটের কাছে পৌঁছোনোর আগেই ঘাড়ে একটা শক্ত কিছুর জোর আঘাত লাগে তার। লন্ঠনটা পড়ে যায় মাটিতে। কাঁচের একটা পাল্লা খুলে যায়। খানিকটা কেরোসিন গড়িয়ে পড়ে মাটিতে। ‘ওঃ’ বলে বিষ্টু বসে পড়ে মাটিতে। দেখে মাটিতে গড়িয়ে পড়া লন্ঠনটাকে পা দিয়ে সোজা করে দিল এক কালো মূর্তি। হাওয়া লেগে কাঁপতে থাকা লন্ঠনের আলো ঠিকরে পড়ছে তার চোখে পরা কালো ঠুলি চশমার কাঁচ থেকে। যেন অন্ধকারে একজোড়া কালো বাঘের চোখ জ্বলছে। খুবই ভয় পেয়ে যায় সে। গাঁজার নেশার ঘোর ছুটে যায় তার।

চকিতে সেই কালো মূর্তি একলাফে তার পেছনে এসে বসে তার মুখ চেপে ধরে। তারপর একটা সাবান তুলে ধরে তার চোখের সামনে। হিসহিসিয়ে তাকে বলে— ‘এটা কী বল?’

বিষ্টু চেনে জিনিসটা। কালো মূর্তি এবার সামান্য একটু মুখ ঢিলে দিয়ে আবার বলে— ‘কী রে, বল এটা কী?’ বিষ্টু বুঝতে পারে, এই গলাটা তো দিনেশের নয়, তবে তার খুব যেন চেনা। তাহলে এ কে?

—‘সাবান।’

—‘সাবান? তাই না? তা কী সাবান? বল।’

বিষ্টু কোনোরকমে বলে—‘আমাদের স্বদেশি সাবান।’

দড়াম করে তার ডান পাঁজরে আছড়ে পড়ে একটা ঘুঁষি। সেই আঘাতে বেঁকে ওঠে বিষ্টুচরণের শরীর।

—‘এটাই তোরা পুলিনকে দিয়ে আনাতিস। তাই তো?’ এবারে গলাটা চিনতে পেরেছে বিষ্টু।

—‘হুঁ।’

—‘কে আনাত? শ্যামাদাস নিশ্চয়ই? আর এইকটা সাবান বেচেই কি তোদের এত্তো খরচ-খরচা চলে?’

বিষ্টু বুঝতে পারে যে সে যা কিছু জানে তা এখন বলতেই হবে। আর এই কথা শ্যামা জানলে তার আর…। সে এখন সাঁড়াশি চাপে পড়েছে। তাই চুপ করে থাকে। কিন্তু আবার একটা ঘুঁষি আছড়ে পড়ে তার পেটে। আবার ককিয়ে ওঠে সে।

—‘না। অন্য জিনিসও আনাতে হয়।’ দম নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছে তার।

—‘কী আনাতে হয়? বল।’

—‘পি…পি…পিস্তল।’

—‘তা শ্যামা কলকাতায় গেছে কেন? পিস্তল আনতে?’

—‘হ্যাঁ।’

—‘আর সেই পিস্তলই সে তুলে দিয়েছিল পুলিনের হাতে? তাই তো?’

—‘হ্যাঁ।’

—‘শ্যামা কোথায় পাচার করে সেগুলো?’

—‘জানি না। স…সত্যি বলচি জানি না। দিনেশ জানলেও জানতে পারে।’

সত্যি বলতে কি শ্যামাদাস কোথায়, পিস্তল পাচার করে তা জানে না বিষ্টু। কালো মূর্তিও বুঝতে পারে সে কথা। আর যাইহোক, অস্ত্রপাচারের গুপ্তকথা শ্যামাদাস কাউকে জানতেও দেবে না। তবে সে যে পুলিনকে দিয়ে সাবান আর রিভলভার দুটোই আনাত, এটা নিশ্চিত। কিন্তু সাবান কোথায় পাঠাত সেটা বিষ্টু নিশ্চয়ই জানবে। আর দিনেশই বা করত কী? সেও কি জানে কোথায় রিভলভার পাচার হয়?

—‘এবার বল, দিনেশ কী করে?’

—‘উঃ…উঃ…দিনেশও সাবান পাঠায়…।’

—‘কোথায় পাঠায়?’

—‘আ…আ…আশেপাশের জেলায়।’

—‘আর পিস্তল কে পাচার করে?’

—‘শ্যামা নিজে।’

—‘আচ্ছা। তাহলে তোরা সাবান, পিস্তল পাচার করিস আর মরে একটা নিরীহ বাচ্চা ছেলে।’ এবার ঘুঁষিটা আছড়ে পরে বিষ্টুর ডান চোয়ালে।

প্রচণ্ড ব্যথায় সে কাতরে ওঠে— ‘উঃ মা গো।’

—‘তোদের জন্যেই পুলিনও গুলি খেয়ে এইভাবেই ককিয়ে উঠেছিল রে ‘উঃ মা গো’ বলে। আর এখন যদি আমি তোকে মেরে ফেলি তাহলে তুইও কি কাতরে উঠবি ‘উঃ মাগো’ বলে? বল হতভাগা কুত্তা।’ একটা কষ্টমাখা ক্রুরতা ফুটে উঠেছে এবার কালো মূর্তির গলায়। বিষ্টুও বুঝেছে সেটা। তাই আসন্ন মৃত্যুভয়ে সে বলে ওঠে— ‘আ, আ, আমাকে মেরোনি…ছেড়ে…।’

কিন্তু বিষ্টুকে ছেড়ে দেওয়ার আর কোনো উপায় নেই। ছেড়ে দিলে শ্যামাদাস সব জেনে যাবে। তাই তার কথা শেষ হবার আগেই কালো মূর্তি তার চুল ধরে মাথাটা পেছনে হেলিয়ে দেয়। তারপরেই একটা চপ এসে পড়ে বিষ্টুর কণ্ঠনালীতে। ভেঙে যায় ক্রিকয়েড কার্টিলেজ আর হাইওয়েড বোন। থরথর করে খানিকক্ষণ কাঁপে তার শরীরটা আর তারপর টানটান হয়ে নেতিয়ে পড়ে।

চোখের সামনে বিষ্টুর নিথর দেহটা দেখে দ্বিতীয়বার নরহত্যা করার ভয়ে থরথর করে কেঁপে ওঠে কালো মূর্তির শরীর। প্রথমবারেরটায় ছিল হিট অফ দ্য মোমেন্টে নিজেকে বাঁচানোর তাগিদ। কিন্তু এবারে একী করল সে? সে তো এমনটা করতেই চায়নি; কিন্তু পরিস্থিতির চাপ আর প্রচণ্ড রাগে সাময়িকভাবে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছিল। অনেকদিনের জমা কষ্টটা আজ রাগ হয়ে তার মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে কেড়ে নিল একটা মানুষের প্রাণ? খুব কষ্ট হচ্ছে তার। খুব কষ্ট… আর সেইসঙ্গে গ্রাস করছে ভয়ও। এখন পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে হবে। তাই শরীরী কালো মূর্তি বিষ্টুর লাশটা তুলে নিয়ে গিয়ে ফেলে পুকুরের জলে। ধীরে ধীরে জলের গভীরে তলিয়ে যায় সেটা।

ঘাটের কাছে পড়ে থাকে শুধু বিষ্টুচরণের লুঙ্গি আর গামছা। আর তখনই একটা দমকা হিমেল হাওয়া এসে দপ করে নিভিয়ে দেয় কাঁচখোলা লন্ঠনের আলো।

.

সেই রাত্তিরে বিষ্টুর বউয়ের একবার মনে হয়েছিল যে বিষ্টু তার পাশে নেই। ভেবেছিল হয়তো সে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গেছে। তাই সে আর আমল দেয়নি। কিন্তু সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে সে দেখে বিষ্টু পাশে নেই। দরজাটাও খোলা। দরজা খুলে রেখেই সে কি গেল মুখ হাত ধুতে? এমনিতেই সকাল সকাল ওঠা বিষ্টুর অভ্যেস। তবে বাইরে গেলেও ঘরে কুকুর ঢোকার ভয়ে দরজাটা তো সে খুলে রাখে না। এদিকে তার গতরাতের খাবারের থালা ঢাকা দেওয়াই পড়ে আছে। লন্ঠনটাও নেই। এরকম তো হয় না। কী মানুষ রে বাবা।

ঘটি হাতে নিয়ে সে দাওয়া থেকেই হাঁক মারে— ‘কী গো, গ্যালে কোতায়?’

কোনো আওয়াজ মেলে না। তাহলে সে কি প্রাতঃকৃত্য সারতে গেল? পুকুরপাড়ের ঘন ঝোপেই কাজটা সারে সে। তারপর পুকুরে শৌচ সেরে ঘরে ফেরে। বিষ্টুর বউ তাই আবার হাঁক দিলে— ‘হ্যাঁ গা, বলি তুমি কি ঘাটে আচো?’ তবু জবাব আসে না কিছু। বিষ্টুর বউ আর আমল না দিয়ে পুকুরের দিকে যেতে যেতে গজগজ করতে থাকে— ‘গ্যাঁজাই মানুষটাকে খেলে। কবে যে গ্যাঁজার ভূত ঘাড় থেকে নামবে…।’ মুখের কথা শেষ হবার আগেই দেখে ঘাটের কাছেই তার পায়ের কাছে পড়ে আছে বিষ্টুর লুঙ্গি, গামছা আর লন্ঠনটা। কাল রাতে তো নাইতে এসেছিল লোকটা। তাহলে গেল কোথায়?

ও মা গো, ওটা কী ভাসছে পুকুরে? চিৎকার করে ওঠে বিষ্টুর বউ— ‘ও ভুবন দাদা গো, কোতায় তুমি? ওগো দেকবে এসো গো কী কাণ্ডিটাই না ঘটেচে। ওগো, আমার যে সব্বোনাশ হয়ি গ্যালো গো।’

ভুবন মন্ডল সবে দাওয়ায় বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল। এমন সময় ভেসে এল বিষ্টুর বউয়ের আর্ত চিৎকার। কী এমন হল যে তার সব্বোনাশ হয়ে গেল? চায়ে চটপট আরও দুটো চুমুক মেরে চা টা শেষ করে সে দৌড়োল বিষ্টুদের খিড়কি পুকুরের ধারে।

পুকুরপাড়ে গিয়ে দৃশ্যটা দেখেই সে থতমত খেয়ে যায়। সেইসঙ্গে ভয়ও লাগে। পুকুরের ঘাটের থেকে একটু দূরে উপুড় হয়ে ভাসছে একটা লাশ। দেখেই চিনতে পারে ভুবন। সেটা বিষ্টুচরণের। সে চিৎকার করে লোকজন ডেকে পাড়ে তোলায় লাশটাকে। তারপর গাঁয়েরই একজন সাইকেল নিয়ে ছোটে টাউনের পুলিশ থানার দিকে।

খানিক পরে পুলিশের দারোগা জয়ন্ত রাহা ভিড় হটিয়ে কনস্টেবলদের দিয়ে লাশটা তোলায় পুলিশ ভ্যানের পেছনে। তারপর জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। তার অভিজ্ঞতায় সে জানে যে গত রাতে জলে না ডুবলে সকালে লাশ ভেসে উঠত না।

বিষ্টুর বউ বলে যে গতকাল বেশি রাতে দিনেশ বিষ্টুকে ডাকতে এসেছিল। ‘হুম’ বলে মাথা নেড়ে জয়ন্ত দারোগা দিনেশের খোঁজ করে। দিনেশ কাছেই ছিল। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দারোগা জানতে পারে যে দিনেশ সে রাতে বাড়িতেই ছিল। তবলা বাজাচ্ছিল। তার দুটো বাড়ির পাশের একজন সমর্থনও করেছে দিনেশের কথা। তবুও কী কারণে বিষ্টুর মৃত্যু হয়েছে তা তো পোস্ট মর্টেম না করলে জানা যাবে না। তাই দিনেশকে গাঁ ছেড়ে যেতে মানা করে দারোগা নিজের জিপে ওঠে। দিনেশ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে শুধু। এ কী মহা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ল সে। এই সময়ে শ্যামাদাও গ্রামে নেই। লোক পাঠিয়ে যে তাকে খবর দেবে, সে উপায়ও নেই। সে জানে যে পুলিশ হয়তো এতক্ষণে ফেউ লাগিয়ে দিয়েছে তার পেছনে। এখন ভগবানই তার ভরসা।

সেদিন বিকেলে গাঁয়ের বেশ কিছু লোক জড়ো হয়েছে টাউনের থানায়। মাতব্বর গোছের দু-একজন ছিল সেখানে। বিষ্টুর বউকে দিয়ে এফ আই আর করানো হয়েছে। এদিকে পোস্ট মর্টেমও হয়ে গেছে। তবে প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জেনেছে যে গলার নলী আর ঘাড়ের হাড় ভেঙে বিষ্টুকে খুন করা হয়েছে। কিন্তু কী দিয়ে বা কীভাবে খুন করা হয়েছে? পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট এলে সেটা জানা যাবে। এদিকে বিষ্টুর লুঙ্গি, গামছা আর লন্ঠন পুলিশ বাজেয়াপ্ত করেছে যদি তাতে খুনির হাতের ছাপ পাওয়া যায়।

সন্ধেবেলা গাঁয়ের লোক বিষ্টুর মৃতদেহ গাড়িতে চাপিয়ে ফিরতে ফিরতে আলোচনা করতে থাকে বিষ্টুচরণের সম্ভাব্য খুনিকে নিয়ে। দিনেশকে থানায় আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে যদি কিছু জানা যায়। কিন্তু কিছুই জানা যায়নি। একটু পরেই হয়তো তাকে ছেড়ে দেবে। তাই এই ফাঁকে উঠে আসে দিনেশের নামও।

একজন বললে— ‘আমার তো মনে হয় দিনেশই খুনি। বিষ্টুর জিনিসপত্তরে ওর হাতের ছাপ পাওয়া যাবে দেকো।’

অন্যজন বলে— ‘তাইলে সে তো গাঁ ছেড়ে পালাত। আমার মনে হয় ওরা যে স্বদেশি দল করে, তাদেরই কেউ খুন করেছে বিষ্টুকে।’

তৃতীয় একজন বলে— ‘আরে, নিজের দলের লোকেরাই খুন করবে নিজেদের লোকেদের? সেটা কি যুক্তিযুক্ত? আমার মনে হয় তা নয়। ব্যাপারটায় অন্য কিচু আচে।’

শেষমেশ সুখরঞ্জন নামের একজন বলে— ‘ওগো, তোমরা খেয়াল করচোনি একটা কতা। মনে করে দেকো তো, কাল রেতে দিনেশ কিন্তু তবলা বাজাচ্চিল। সে তাইলে কী করে বিষ্টুকে খুন করবে? তাইলে দিনেশ তো দোষি নয়।’

প্রথমজন বলে— ‘ঠিকই তো। এ কতাটা তো ভেবে দেকিনি।’

সুখরঞ্জন বলে— ‘আমার কী মনে হয় জানো?’

সমস্বরে প্রশ্ন ওঠে— ‘কী? কী?’

—‘আমার মনে হয় বিষ্টুকে নিশিতে ডেকেচিল। শুনলে না ওর ঘাড় মটকে দিয়েচে।’

এই কথাটা কিন্তু সবার মনে ধরে। তারপর গ্রামে ফিরে দাহ করার সময় লোকমুখে ছড়িয়ে যায়— ‘বিষ্টুকে নিশিতে ডেকেছিল’।

* পরবর্তীকালে কিশোরকুমার এই গানের সুরেই গান—‘শিং নেই তবু নাম তার সিংহ…’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *