জুলাই, ১৯৪৬ – গোপাল পাঁঠা, যুগল ঘোষ আর রায়টের বীজ
ভোট হয়ে গেছে। কংগ্রেস যা ফল প্রত্যাশা করেছিল তা হয়নি। বেঙ্গল প্রভিন্সের ভোটে মুসলিম লীগ পেয়েছে ১১৩ টা আসন আর কংগ্রেসের ৮৬ টা। হুসেন শাহিদ সুরাওর্দী হয়েছেন বেঙ্গল প্রভিন্সের মুখ্যমন্ত্রী। আর মুসলিম লীগ জিতবে নাই বা কেন? অবিভক্ত বাংলায় মুসলিমরা যে এখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ। আর এই ভোটের জোরেই আরও হাত শক্ত হয়েছে মহম্মদ আলি জিন্নার। ১৬ জুন উনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেন্ট অ্যাটলির পাঠানো তিন সদস্যের ক্যাবিনেট মিশনকে বলে দিয়েছেন যে অবিভক্ত ভারতের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ নিয়ে তৈরি হোক ইন্ডিয়া আর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে নিয়ে তৈরি হোক পাকিস্তান।
তার উত্তরে ১০ জুলাই জওহরলাল প্রেস কনফারেন্স ডেকে বলেন যে জাতীয় কংগ্রেস Constituent Cabinet এ যোগ দিতে পারে, যদি তাঁদের ক্যাবিনেট মিশনের দেওয়া প্রস্তাব পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত করতে দেওয়া হয়।
এইরকম এক পরিস্থিতিতে রাত নটা নাগাদ গোপাল পাঁঠার অফিসে এসেছে দু-জন আমেরিকান কালা আদমি। তারা মিলিটারিতে ছিল, কিন্তু গতবছরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেমে যাওয়াতে তাদের হাতে তেমন পয়সা নেই। অথচ ফূর্তি করতে হলে চাই মদ আর সেইসঙ্গে পয়সার প্রয়োজন নিষিদ্ধ পল্লিতে যেতেও। দীর্ঘদিন যে তারা ঘর ছাড়া। তবে তাদের কাছে আছে হিসেব বহির্ভূত কিছু অস্ত্র আর গোলাগুলি। এখন ওইগুলো বেচেই কামাতে হবে ফূর্তির পয়সা। অতএব লোকমুখে শুনে তারা হাজির হয়েছে গোপাল মুখোপাধ্যায়ের অফিসঘরে। তারা শুনেছে যে এই লোকটা নাকি ক্যালক্যাটার এক মস্ত হুলিগ্যান। তাই অপেক্ষা করছে তারা কখন গোপালবাবু আসেন আর সেইফাঁকে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে অফিসঘরের চারপাশে।
ঘরের দেওয়ালে হিন্দু গডস আর গডেসদের বাঁধানো ফোটোগ্রাফ। তাতে মালা দেওয়া। সামনে প্রদীপ জ্বালা। ইন্ডিয়াতে বেশ কিছুদিন থাকার সুবাদে সেই গডস আর গডেসদের মধ্যে তিনজনকে তারা চেনে। একজন ‘বজরংবলী’, অন্যজন ‘লর্ড মহাদেভা’ আর আরেকজন হলেন ‘গডেস কালী’। তবে তারা ভারি আশ্চর্য হয় ঘরের একপাশে দাঁড় করিয়ে রাখা INA এর পোশাক পরা নেতাজি বোসের একটা লাইফ সাইজ স্ট্যাচু দেখে। ভাবে যে— গোপাল একজন হুলিগ্যান হয়ে তার অফিসে বোসের মতো একজন পেট্রিয়টের স্ট্যাচু রাখে কেন?
একটু পরেই তাদের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল একটা জিপ। সেটার থেকে নেমে ঘরে ঢুকলেন দুই ভদ্রলোক। একজনের পরনে সাদা পায়জামা আর খদ্দরের পাঞ্জাবি, অন্যজনের পরনে সাদা হাফহাতা শার্ট আর সাদা ধুতি। এই দ্বিতীয় জনের গালে শিখদের মতো কালো দাড়ি আর মাথার চুল শিখদের মতোই মাথার ওপরে গোল্লা পাকিয়ে বাঁধা।
টেবিলের ওপারে দুটো চামড়ায় মোড়া বিরাট চেয়ার। কিন্তু ওই শিখেদের মতো দেখতে ব্যক্তি তাতে না বসে একে একে প্রণাম করলেন দেওয়ালে টাঙানো দেব-দেবীর ছবিগুলোতে। তারপরে একজন লম্বা-চওড়া চেহারার যুবক তাঁর হাতে তুলে দিল একটা বড়ো মালা। ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে ওই ব্যক্তি নেতাজি বোসের স্ট্যাচুতে পরিয়ে দিলেন মালাটা। হাতজোড় করে প্রণাম করলেন মূর্তিটাকে। তারপরে এসে বসলেন টেবিলের ওপ্রান্তের একটা চেয়ারে। সঙ্গে আসা ভদ্রলোকও বসলেন তাঁর পাশের চেয়ারটায়। আমেরিকান দুই সেনা বুঝেই গেল যে ওই ঝুঁটি বাঁধা ভদ্রলোকই বিখ্যাত গোপাল মুখোপাধ্যায়।
দুই মিলিটারিকে দেখিয়ে দৃঢ় অথচ শান্ত স্বরে গোপাল প্রশ্ন করলেন— ‘বসন্ত, এনারা কেন এসেছেন? কি দরকার তা জেনেছ?’
দীর্ঘদেহী যুবক জবাব দিল— ‘দাদা, ওরা চারটে রিভলভার আর শ-দুয়েক বুলেট এনেছে।’
—‘ও, তা কী দর চাইছে?’
—‘আজ্ঞে দাদা, দু-হাজার।’
—‘মাল দেখেছ?’
—‘হ্যাঁ দাদা। সব একদম ঠিকঠাক আছে।’
কথা বলার দৃঢ় অথচ শান্ত ভঙ্গি দেখেই দুই আমেরিকান বুঝে গেছে যে এই ভদ্রলোক নিউ ইয়র্কের মাথামোটা স্ট্রিট হুলিগ্যানদের মতো নন, বরং বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে আটঘাট বেঁধে তবেই কাজ করেন।
—‘দামটা একটু বেশিই পড়ে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে বসন্ত। যাইহোক, তুমি ওদের হাজার দেড়েক টাকা আর একটা বড়ো রামের বোতল দিয়ে দাও।’
আমেরিকান দু-জন বাংলা বোঝে না। তবু বসন্ত যখন তাদের কাছ থেকে মাল নিয়ে পেছনের একটা ঘরে ঢুকে গেল, তখন তারা ভাবল তাদের চাওয়া দামই বুঝি পাওয়া যাবে।
একটু পরেই বসন্ত ফিরে এসে তাদের সামনে রাখলে একটা বড়ো রামের বোতল আর ওই শিখের মতো দেখতে বাঙালিবাবু চাবি দিয়ে ড্রয়ার খুলে গুণে গুণে দেড় হাজার টাকা এগিয়ে দিলেন তাদের দিকে। টাকাটা যদিও তাদের প্রত্যাশার চেয়ে কম, তবু তারা বিনা বাক্যব্যয়ে সেটাই নিয়ে নিল। আসলে তারা দামটা একটু বেশিই বলেছিল। তাই হাতে যা পাওয়া গেল তাতেই তারা খুশি। উঠে দাঁড়িয়ে তারা হাত বাড়িয়ে দিল গোপালের দিকে। গোপাল কিন্তু হ্যান্ডশেক না করে বুকের কাছে হাতজোড় করে বললেন— ‘নমস্তে’। দুই আমেরিকান সৈনিক খুশি হয়েই বেরিয়ে গেল। দিন দশেকের মতো ফূর্তি করার মত টাকা এসে গেছে তাদের হাতে।
তারা চলে যেতে না যেতেই বসন্ত চা এনে হাজির।
চায়ে চুমুক দিতে না দিতেই গোপাল তাঁর পাশে বসা সঙ্গীকে বললেন— ‘তা জিন্নার কথা কী যেন বলছিলে যুগলদা। তখন ঠিকমতো শোনা হল না। এবারে বল।’
এই যুগলবাবু ওরফে যুগল চন্দ্র ঘোষই হলেন কংগ্রেস পার্টির ট্রেড ইউনিয়নের ডাকসাইটে নেতা। কংগ্রেসের নেতাদের, বিশেষ করে ডক্টর বিধান চন্দ্র রায়ের সঙ্গে তাঁর রীতিমতো ভালোই যোগাযোগ আছে। গোপালের মতো কলকাতা শাসন করার ক্ষমতা না থাকলেও তাঁরও কিছু ডাকাবুকো ছেলের দল আছে।
তা গোপালের কথার জবাবে যুগলবাবু বলতে থাকেন— ‘নেহরুর কথা শুনে জিন্নার মনে হয়েছে যে Constituent Assembly তে হিন্দুরা প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে ক্ষমতা দেওয়ার ব্রিটিশ প্ল্যানকে সে বাতিল করেছে। এমনকী এও বলেছে যে সে পাকিস্তান তৈরির পক্ষপাতী আর যদি পাকিস্তান তৈরি করতে না দেওয়া হয় তবে সে সরাসরি সংঘাতের পথে হাঁটবে।’
—‘কীভাবে?’
—‘জিন্না বলেছে যে ষোলোই অগাস্ট সারা দেশ জুড়ে সভা-সমাবেশ করে মুসলিমদের বুঝিয়ে বলা হবে যে মুসলীম লীগ তাদের জন্যে ঠিক কী করতে চায়।’
—‘তা আমাদের কলকাতায় কোথায় কোথায় ওদের মিটিং হবে?’ জানতে চান গোপাল।
—‘ওইদিন তো মনুমেন্টের তলায় বিশাল সমাবেশের ডাক দিয়েছে সুরাওর্দী। জোহরের নমাজের পরেই মুসলিমরা সেখানে আসবে কলকাতা আর আশেপাশের এলাকা থেকে। সমাবেশ তো বিরাট হবে বলেই মনে হয়।’
—‘তা সুরাওর্দীর সঙ্গে আর কে কে বক্তব্য রাখবে?’
—‘খাজা নিজামুদ্দিন থাকবে, ছাত্র সংগঠনের নেতা আজমিরি থাকবে আর থাকবে ওদের ন্যাশনাল গার্ডের নেতা শেখ মুজিবর রহমান।’
গোপাল এতক্ষণ দু-হাতের আঙুলে আঙুল জড়িয়ে চোখ বুজে শুনছিলেন যুগলদার কথা আর মনে মনে ভাবতে চেষ্টা করছিলেন যে ওই সভায় সুরাওর্দী আর খাজা নিজামুদ্দিন কী বলবে।
এই সুরাওর্দীকে গোপাল চেনেন সেই তেতাল্লিশ সাল থেকে যখন সে সিভিল সাপ্লাইয়ের মন্ত্রী ছিল। সেই সময়ে সরকার ব্যর্থ হয়েছিল মানবিক সাহায্য পাঠাতে। খাদ্যশস্যের ব্ল্যাক-মার্কেট আটকাতে পারেনি, এমনকী সেই আকালের মধ্যে রিলিফও পাঠাতে পারেনি সুরাওর্দী। অবস্থা এমনই ভয়ানক হয়েছিল যে শেষ পর্যন্ত মিলিটারিকে ব্যাপারটা দেখতে মাঠে নামতে হয়েছিল। তাই মনুমেন্টের এই সভা শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হবে তো?
তবে নিতান্তই যদি অশান্তি শুরু হয়ে যায়, তার জন্যে আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা উচিত। এমনিতে মুসলিম বিদ্বেষ নেই গোপালের। ব্যবসার খাতিরে অনেক মুসলিমের সঙ্গে তার ওঠাবসা। তা ছাড়া কলকাতা শহরে কত বিচিত্র পেশায় কত মুসলমান জড়িয়ে— মুটে, রিক্সাওয়ালা, ভিস্তিওয়ালা, কোচোয়ান, ওস্তাগর আর আরও কত কী। কই তাদের সঙ্গে তো তার শত্রুতা নেই। সে শান্তিতে বিশ্বাসী। তবে কেউ বা কারা যদি অশান্তির আগুন জ্বালাতে চায়, সম্প্রীতি নষ্ট করতে চায়, তবে তাদের সে ছেড়ে কথা বলবে না। সে ভালো করেই জানে যে দাঙ্গা বাঁধায় স্বার্থান্বেষীরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করার জন্যে।
