১৯৪৪, মে – পিটার ব্রাগানজা, সাবান রহস্য আর নিশির ছোবল
বউবাজারে সুবিমলের মেসোর বাড়িতে প্রায় একমাস হল এসেছে রজনী। রাতের খাওয়া সেরে বিছানায় শুয়েছিল সে।
কিন্তু গ্রামের মায়া এখনও তার বুকজোড়া। সেই ঘর, সেই নদীচর, সেই তাইকোন্ডোর আখড়া, সেই ছেলেদের ‘কী ইহ্যাপ’ চিৎকার এখনও তার কাছে জীবন্ত।
আসার আগে সুরেশ কাকাকে সব বুঝিয়ে দেবার সময়ে তার চোখে জল দেখেছিল সে। অনেক কষ্টে নিজের চোখের জল চোখেই আটকে রেখে বলেছিল— ‘শনিবার করে তো আমি আসব। রবিবারেও থাকব, ছেলেদের শেখাব, একসঙ্গে খাব। শুধু সপ্তার মাঝের ক-টা দিন তুমি ছেলেদের একটু দেখাশোনা কর।’
সঙ্গে নিয়েছিল কিছু জামাকাপড়, কম্বল, চাদর, বুমেরাং আর দাদুর প্যাঁটরার ধনসম্পদ। এই প্যাঁটরাটা শুধুমাত্র দাদুর স্মৃতি নয়, এটা কাছে থাকলে তার মনে হয় যে দাদু সর্বদাই তার কাছে আছে। একটা অন্যরকম সাহস পায় সে। এখন খাটে চোখ বুজে শুয়ে সে কল্পনায় দেখতে পাচ্ছে— কানাইয়ের ছুঁড়ে দেওয়া বুমেরাংটা বাতাস কেটে ঘুরতে ঘুরতে নদী পেরিয়ে চলে গেল অন্ধকারে ডুবে থাকা জঙ্গলের দিকে। তারপরেই শোনা গেল একটা শিয়ালের চিৎকার। অনেকক্ষণ ধরেই ডাকছিল সেটা। কানাইয়ের বুমেরাং শব্দভেদী হয়ে আঘাত করেছে শিয়ালটাকে। নাঃ, কানাইকে তার দরকার। কানাইই পারবে তার যোগ্য উত্তরসূরী হয়ে উঠতে। তবে আগে তাকে ভালো করে লেখাপড়া শেখাতে হবে।
মনে আসছে পুলিনের কথাও। এই পুলিনকে সে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে তুলেছে। তার গরিব বাবা-মাকে যতটা সম্ভব সুরেশ কাকার মাধ্যমে সাহায্য করেছে সে শুধু একটা আশা নিয়ে যে পুলিন একদিন তার মান রাখবে।
পুলিন আজ তার হাতের বাইরে চলে গেছে। না, পুলিনের ওপরে তার রাগ হয়নি। সদ্য সাবালক হওয়া একটা ছেলে অন্যের শেখানো বুলি আউড়েছে মাত্র। তার এখন রাগ হচ্ছে তার নিজেরই ওপরে। কেন সে পিটার ব্রাগানজার হাত থেকে ওই প্রতিবাদী ছেলেটাকে বাঁচাতে গেল? সেটা কি তার ভুল ছিল? আবার শ্যামাদাসদার কথামতো এমনও তো হতে পারে যে সে হয়তো আগেই মার্কড হয়ে গিয়েছিল পিটারের চরের চোখে? তাই বাধ্য হয়েই তাকে সরে আসতে হল আর পুলিনকে সঁপে দিতে হল শ্যামাদাসের কাছে। সে তো বুঝতেই পেরেছিল যে একটা গরিব ঘরের ছেলে সহজেই টাকার টোপে ধরা পড়ে যাবে শ্যামাদাসের হাতে। সে নিজেও তো সপ্তায় দুটো করে টাকা দিয়ে পুলিনকে নিজের কাছে ধরে রাখতে পারত? হ্যাঁ, তার পক্ষে হয়তো কঠিন হত কাজটা, কারণ তার তখন মাইনে বেশি ছিল না। তবু…তবু আজ তার মনে হচ্ছে বড়ো ভুল করেছে সে, যার জন্যে সে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না। কিন্তু তার সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার উপায়ই বা কী?
হঠাৎই তার ভাবনায় ছেদ পড়ে। আরে, পরশুই তো পুলিন আসবে মার্কুইস স্ট্রিটে। তবে সে ঠিকই করে রেখেছে যে পুলিন না চাইলেও তাকে নজরে রাখবে এমনভাবে যাতে পুলিনের নজরে ধরা না পড়ে। কিন্তু কীভাবে? উপায় খুঁজে ফেরে সে। কিন্তু তার মস্তিষ্ক বড়ো ক্লান্ত এখন।
ঘরের দেওয়ালে সুবিমলের মেসোমশাইয়ের টাঙিয়ে রাখা এক কালীমূর্তির পটের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে। তার মনে ভেসে আসছে বিষ্টুচরণের কালী সেজে সেই তাণ্ডব নাচের কথা। সে আবার ভাবতে চেষ্টা করে পুলিনকে আগলে রাখার উপায়। কিন্তু ভেবে ভেবে ক্লান্ত হয়ে যায় তার মন। চোখ বুজে আসে তার। ঘুম নেমে আসছে ধীরে ধীরে।… গভীর ঘুমে তলিয়ে যাবার আগে দেখে যে বিষ্টুচরণ আর কালীমূর্তি একাকার হয়ে যাচ্ছে। তন্দ্রায় মিশে যাচ্ছে শরীরী আর অশরীরী…।
ক্রমে রজনী তলিয়ে যায় আরও গভীর ঘুমে। শুধু ঘরের বাল্বটা জেগে থাকে সারারাত— এক নির্বাক, বিনিদ্র প্রহরীর মতো।
.
আজ বৃহস্পতিবার। কিন্তু বিকেলবেলায় সাড়ে চারটে নাগাদ কালবোশেখী ঘনিয়ে আসার জন্যে সন্ধে নেমে গেছে তাড়াতাড়ি। রাস্তার বাতিও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন প্রায় ছ-টা বাজতে যায়। আবছা আলোয় আজ বৃষ্টিভেজা মার্কুইস স্ট্রিট যেন আরও রহস্যময়। লোকচলাচল প্রায় নেই বললেই চলে। তবে খোলা আছে চীনে জুতোর দোকানটা।
এমনসময় টাইট কালো হাফপ্যান্ট আর ফতুয়া পরা একজন লোক পথে যেতে যেতে হঠাৎই ঢুকে পড়ল ওই রাস্তার পাশের একটা গলিতে। এখানে বাড়িগুলো সব গায়ে গায়ে লাগানো। লোকটা একটু দাঁড়াল একটা বাড়ির পেছনের অন্ধকার জায়গায়। তার কোমরে ঝোলানো কালো চামড়ার তৈরি একটু বড়ো পাউচ ব্যাগে ঢুকিয়ে নিল তার গায়ের ফতুয়া। তারপর জাগুয়ারের মতো ক্ষিপ্রতায় ড্রেন পাইপ বেয়ে উঠে গেল বাড়ির অন্ধকার ছাদে। পাউচ ব্যাগ থেকে বের করে আনল একটা টিনের ডিবে আর একটা বাইক আরোহীদের চশমা। তারপর ডিবে থেকে কালো কালি নিয়ে মেখে নিল মুখে, গায়ে, সর্বাঙ্গে। আর চোখে পরে নিল চশমা। এই চশমাটার দু-পাশ ঢাকা, কারণ যাতে ঘামে বা বৃষ্টিতে গায়ে মাখা রং গলে গিয়ে তার চোখে না ঢুকে যায়। এবার ডিবেটা ব্যাগে রেখে ব্যাগ থেকে ব্যান্ডেজের মতো কাপড় বের করে চটপট জড়িয়ে নিল তার হাতের চেটো থেকে কনুই আর পায়ের পাতা থেকে হাঁটুর নীচ পর্যন্ত— যাতে ভালো গ্রিপ পাওয়া যায়। বেরিয়ে রইল শুধু হাতের আর পায়ের আঙুলগুলো। সব রেডি হয়ে গেলে ছাদের পর ছাদ টপকে পৌঁছে গেল সেই বাড়ির ছাদে যেখান থেকে রাস্তার দু-দিক আর জুতোর দোকানের ভেতরটাও স্পষ্ট দেখা যায়। এখন বৃষ্টি থেমে গেছে। তবু বাজের আলো ঝলকাচ্ছে মাঝেমাঝে। সেই আলোতে চকচক করে উঠছে লোকটার চশমার কাঁচ।
ওই তো, ওই তো ছেলেটা আসছে। আসতে আসতে সামনে পেছনে চোখ চালিয়ে সে দেখে নিচ্ছে কেউ আসছে কি না। চীনে জুতোর দোকানটা ছাড়িয়ে সে এগিয়ে গেল ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের মোড় পর্যন্ত। দেখে নিতে চাইল কেউ তাকে নজরে রাখছে কি না। কিন্তু না। খানিক সেখানে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে ভালো করে দেখেও সন্দেহজনক কাউকে দেখতে পেল না। সে ছেলেটা আর কেউ নয়— সে হল পুলিন।
নিশ্চিন্ত হয়ে ফিরে এসে পুলিন ঢুকে পড়ল চীনে জুতোর দোকানটায়। নিজের ব্যাগ থেকে একটা খাম বের করে দিল লোকটাকে। বিনিময়ে লোকটাও তাকে দিল দুটো প্যাকেট।
এদিকে নিঃশব্দে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের মোড়ে জিপ দাঁড় করিয়ে তার থেকে নেমে এলেন লোকাল থানার ওসি দূর্গাদাস সাহারায়। তার পেছনে একজন পুলিশ। গাড়ি থেকে নেমে দূর্গাদাস দেখেন চীনে জুতোর দোকান থেকে বেরিয়ে পুলিন মার্কুইস স্ট্রিট ধরে এগিয়ে যাচ্ছে চৌরঙ্গির দিকে। খানিকটা এগিয়েই গেছে সে। দূর্গাদাস তাই রিভলভার বের করে হাঁক পাড়লেন— ‘এইই হল্ট, থামো, নইলে গুলি করে দেব।’
সেই আওয়াজ শুনেই দৌড়তে শুরু করেছে পুলিন। তার পেছনে খানিকটা তফাতে দৌড়চ্ছেন দারোগা দূর্গাদাস আর তার পেছনে দৌড়চ্ছে পুলিশটা। এদিকে এক ছাদ থেকে আরেক ছাদে তাদের নিঃশব্দে ফলো করে যাচ্ছে অন্ধকারে মিশে থাকা এক কালো মূর্তি।
সামনেই রাস্তার একটা বাঁক। সে বাঁকে অদৃশ্য হয়ে যায় পুলিন। দারোগা তখন বাঁকটা পেরিয়েছেন সবে। তাঁর থেকে হাতকয়েক দূরে পুলিশটা তখনও বাঁকের মুখে। আর ঠিক তখনই ছাদ থেকে লাফিয়ে পুলিশটার পেছনে নামে ছাদ দিয়ে ছুটে চলা মানুষটা। কিছু বোঝার আগেই তার একটা রদ্দায় অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়ে পুলিশটা। হঠাৎই শোনা যায় একটা ফায়ারিং এর শব্দ আর ‘উঃ মাগো…’ বলে একটা আর্ত চিৎকার।
কালো মূর্তি বাঁক পেরোতেই দেখে রাস্তার পাশের ময়লা ফেলার জায়গার পাশে বুক চেপে বসে পড়েছে পুলিন আর সেই অবস্থাতেই তার ব্যাগ থেকে একটা রিভলভার বের করে ফায়ার করল সে। বুলেটের ধাক্কায় দূর্গাদাস কাতরে উঠে মাটিতে ছিটকে পড়েন চিত হয়ে।
কালো মূর্তি এবার এগিয়ে আসে। দুজনেরই নিশানা একেবারে অব্যর্থ। পুলিন আর দূর্গাদাস এখন শুধু শবদেহ মাত্র।
হঠাৎ সে লক্ষ্য করে দূর্গাদাসের লাশের হাতচারেক দূরে পড়ে থাকা পুলিশটা উঠে বসেছে। চকিতে কাজ সারে কালো মূর্তি। রিভলভার ধরে থাকা মৃত দারোগার হাতটা তুলে দারোগারই আঙুলের চাপে একটা বুলেট ছুঁড়ে দেয় পুলিশটাকে তাক করে। গলা ভেদ করে বেরিয়ে যায় বুলেটটা। পুলিশটা লুটিয়ে পড়তেই পুলিনের ব্যাগ হাতড়ায় কালি মাখা লোকটা। কিন্তু তার ব্যাগের প্যাকেটদুটো গেল কোথায়? নিশ্চয়ই ওই ময়লা ফেলার ভ্যাটে। ঠিক এমন সময়েই চৌরঙ্গির দিক থেকে একটা গাড়ির আওয়াজ শোনা যায়। হাতে আর একদমই সময় নেই। তাই সে চটপট উঠে যায় সামনের একটা বাড়ির ছাদে। সেখান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কারা যেন হেঁটে আসছে আধো অন্ধকার রাস্তা ধরে জলে ভেজা রাস্তায় পড়ে থাকা তিনটে লাশের দিকে।
ওই লোকদুটো হল পিটার ব্রাগানজা আর তার বডিগার্ড করিম শেখ। এই করিম শেখই নজর রাখত পান্ডের চায়ের দোকানের ওপরে। তারা চারপাশে আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে থাকলো কিছু। পিটার খুঁজে দেখল পুলিনের ব্যাগটা। তার মানে তারা এসেছে পুলিনের প্যাকেটেরই সন্ধানে। কী আছে ওই প্যাকেট গুলোতে? শেষমেশ করিম শেখ ওই ময়লার ভ্যাটেই খুঁজে পেল প্যাকেট দুটো। করিম সেটা পিটারের হাতে দিতেই তারা হনহনিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল বাঁকের মুখে আর ছাদ থেকে ছাদে কালো মূর্তিও তাদের অনুসরণ করে চলল। খানিক দূর গিয়ে পিটার উঠে পড়ল তার ছোটো ফিয়াট ৫০০ গাড়িতে আর করিম তাকে সেলাম করে এগিয়ে গেল ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের দিকে।
সরু রাস্তা; তাই বেশি জোরে ছুটছে না গাড়ি। ওমা, এ কী? পাশেই বাঁ-দিকে কলিন স্ট্রিট আর সেদিকেই বাঁক নিয়েছে গাড়ি। কালো মূর্তিও ছাদ থেকে ছাদে ফলো করতে থাকে গাড়িকে। কলকাতার এই এক সুবিধে যে বাড়িগুলোর অধিকাংশই গায়ে গায়ে লাগানো। তবে সর্বত্রই তো তা নয়। তাই কখনো রাস্তায় নামতে হচ্ছে তাকে আবার মওকা বুঝে উঠে পড়তে হচ্ছে কোনো বাড়ির ছাদে। কিন্তু এভাবে কতদূর যাওয়া যায়? বড়ো রাস্তায় পড়লে কী করবে সে? হঠাৎই তাকে বিস্মিত করে কাছেই একটা দোতলা বাড়ির কাছে থামল গাড়িটা। পিটার গাড়ি থেকে নেমে লোহার গেটটা খুলে আবার গাড়িতে উঠে সেটাকে ঢুকিয়ে দিল বাড়ির সামনে দু-পাশের সবুজ লন চিরে যাওয়া মোরাম বেছানো পথে। তারপর গেট বন্ধ করে গাড়ি থেকে প্যাকট দুটো নিয়ে সিটি বাজাতে বাজাতে গিয়ে পকেট থেকে চাবি বের করে খুলল বাড়ির দরজা। এর মানে একটাই হয়— পিটার একাই আছে বাড়িতে। অন্য কেউ নেই।
কালো মূর্তি ততক্ষণে সন্তর্পণে পৌঁছে গেছে লনে। পিটার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। সামনেই কাঁচের জানলা দেওয়া ড্রয়িংরুম। সেই জানলা দিয়েই দেখা যাচ্ছে ভেতরটা। কোমরে গোঁজা রিভলভার আর মানিব্যাগ কাবার্ডের ড্রয়ারে রেখে চাবি দিয়ে সেই চাবির গোছা বড়ো ডাইনিং টেবিলে রেখে ছোটো সেলার থেকে একটা গ্লাসে বেশ খানিকটা মদ ঢেলে নিয়ে এসে বসল চেয়ারে। মদে খানিকটা জল মিশিয়ে তাতে দুটো লম্বা চুমুক মেরে একটা সিগারেট ধরাল সে। তারপরে প্যাকেট দুটোর ব্রাউন কাগজটা খুলল। প্রতিটার ভেতরে আরও বেশ কয়েকটা করে প্যাকেট। পিটার সেগুলো থেকে একটা করে প্যাকেট নিয়ে শুঁকে দেখল একবার। আরে এ তো সব স্বদেশি সাবানের প্যাকেট। সব প্যাকেটের ভেতরেই তাহলে সাবান আছে। তৃপ্তিতে সাবানটা নামিয়ে রেখে আবার গ্লাসে একটা চুমুক দিল। বাইরে থেকে তার হালচাল দেখে কালো মূর্তির কেমন যেন সন্দেহ হয়। প্যাকেটের ভেতরে সাবান নাকি অন্যকিছু আছে; নইলে নারকোটিক্সের অফিসার পিটারের কেন এত তৃপ্তি? কিন্তু কী আছে? জানতে হবে সেটা। আর জানতে গেলে বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই হবে।
পিটার নিশ্চিন্তে গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে আর হাওয়ায় ধোঁয়ার রিং ছাড়ছে। এমন সময় দরজায় টোকা। ‘হু ইজ দেয়ার?’ হেঁকে উঠল পিটার। বাইরে অন্ধকার। তাই ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। আবার দরজায় টোকা। মনে হচ্ছে করিম শেখ তাকে কোনো গোপন কথা বলতে এসেছে। তাই সাড়া দিচ্ছে না। নাঃ, এবারে উঠতেই হয়। টেবিল ছেড়ে উঠে পিটার এগিয়ে এল দরজার দিকে।
আর দরজা খুলতেই দড়াম করে একটা ঘুঁষি আছড়ে পড়ল ঠিক তার নাকের ওপরে। ‘ওঃ মাই গড’ বলে পিটার দু-হাতে নাক ধরে বসে পড়ে মাটিতে। কালো মূর্তি ততক্ষণে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। ওই সাবান তার চাই। সাবানের মোড়কের ভেতরে কি কোনো নিষিদ্ধ বস্তু আছে? নাকি স্বদেশিদের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণের জন্যে এনেছে? আসল সত্যিটা জানতে হবে তাকে। তবে পিটারের জ্ঞান থাকা অবস্থায় ওটা নিতে পারা যাবে না। হয়তো সে গুলিই চালিয়ে দেবে।
পিটার তখনও মাটিতে বসে। নাক ফেটে গিয়ে তার আঙুলের ফাঁক দিয়ে টপটপ করে রক্ত ঝরে পড়ছে মাটিতে। তখন কালো মূর্তি পিটারের জামার কলার ধরে টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে তেড়ে একটা ঘুঁষি মারে তার পেটে। ‘ওঁক’ করে একটা আওয়াজ বেরোয়। ঘুঁষির ধাক্কায় পিটার ধপ করে গিয়ে পড়ে সোফাতে। কিন্তু পিটারকে চেঁচাতে দেওয়া চলবে না। তাই সঙ্গে সঙ্গে কালো মূর্তি পিটারের পকেট থেকে রুমাল বের করে দলা পাকিয়ে ঠেসে দেয় তার মুখে। পিটার উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করে। ‘গোঁ গোঁ’ করে আওয়াজ বেরোয় তার মুখ দিয়ে, কিন্তু পরমুহূর্তেই কালো মূর্তির বাঁ-হাতের আরেকটা পাঞ্চ গিয়ে পড়ে তার চোয়ালে। সোফায় কাত হয়ে যায় সে। আবার তাকে টেনে তুলে ঝড়ের গতিতে পাঁচ-ছটা পাঞ্চ ছুঁড়ে দেয় পিটারের পেটে আর চোয়ালে। ভক করে খানিকটা মদ বেরিয়ে আসে পিটারের মুখে গোঁজা রুমালের পাশ দিয়ে। নাক থেকে বেরোনো রক্তের সাথে মদ মিশে দরদর করে গড়িয়ে পড়ছে। ভিজে লাল হয়ে যাচ্ছে পিটারের জামা আর ট্রাউজারস। তবু মারমুখি সেই কালো মূর্তি। তার গোল গোল চশমার কাঁচে ঠিকরে পড়ছে ঘরের বাতির আলো। দেখা যাচ্ছে তার তীব্র আক্রোশ মাখা মুখের সাদা দাঁতের সারি। বড়ো ভয়ংকর সেই রূপ। তাকিয়ে থাকা যায় না। ভয় পাচ্ছে পিটার। রিভলভারটাও যে রাখা তার ড্রয়ারে। তাই এখন তার আর কিচ্ছু করার নেই। হঠাৎই সেই কালো মূর্তি পিটারের একটা হাত ধরে সাঁ করে ঘুরে গিয়ে তাকে দড়াম করে আছড়ে ফেলে মেঝেতে। তার শরীরের কালি লেগে যায় পিটারের জামায়। তবু এখনও পিটার গোঁঙাচ্ছে। কী সাংঘাতিক প্রাণশক্তি রে বাবা লোকটার। তাই শেষবারের মতো তাকে তুলে আবার আগের মতোই নির্মমভাবে আছাড় মারে মেঝেতে।
নাঃ, এইবার অজ্ঞান হয়েছে লোকটা। এখন তাড়াতাড়ি কাজ সারতে হবে। প্রথমেই একটা টোকায় টেবিলের গ্লাসটাকে ছিটকে ফেলে মাটিতে। গ্লাস ভেঙে বাকি মদটুকু ছড়িয়ে যায় মাটিতে। পিটারের মুখে গোঁজা রুমালটা বের করে নিয়ে সেটা হাতে জড়িয়ে টেবিলে রাখা পিটারের চাবির গোছা নিয়ে খুলতে থাকে একের পর এক ড্রয়ার। একটায় মেলে পিটারের রিভলভার। লোডেড। সেটা নিয়ে পাউচ ব্যাগে রাখে। আরেকটায় রাখা মানিব্যাগ। সেটাও নেয়। তারপরে পিটারের একতলার একটা ঘরে গিয়ে খুলতে থাকে আলমারি। জামাকাপড় ঠাসা। টেনে কিছু জামাকাপড় মেঝেতে ফেলে দেয় সে। এবারে দৌড়োয় দোতলায়। দেখে মনে হয় এটাই পিটারের শোবার ঘর। সেখানের আলমারিটা খুলে হাঁতড়াতে গিয়ে একটা কাগজ ছিটকে পড়ে মাটিতে। দিসপুর থেকে পাঠানো একটা টেলিগ্রাম। সেন্ডার লিন আঙ। টেলিগ্রামটা একবার ভালো করে দেখে, সেটাকে ফেলে রেখেই আগন্তুক আলুথালু করে দেয় ভেতরের জিনিসপত্র। হ্যাঁ, মোটামুটি বাড়িতে চুরি হওয়ার মতোই দেখাচ্ছে এবার।
আবার সে নীচে নেমে আসে। তারপরে পিটারের চোয়ালে একটা লাথি মেরে দেখে তার জ্ঞান ফিরেছে কি না। নাঃ, সাড়াশব্দ নেই। নাকের সামনে হাত দিয়ে দেখে নিঃশ্বাস পড়ছে কি না। হ্যাঁ, পড়ছে। তার মানে পিটার মরেনি। তারপরে দুটো সাবান রুমালে মুড়ে নিয়ে ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে অন্ধকারে মিশে যায়। জ্ঞান ফিরলে পিটার বুঝতেই পারবে যে এত সাবানের মধ্যে থেকে দুটো সাবান চুরি হয়ে গেছে। তবে বুঝলেও কালো মূর্তির তাতে কিছু যায় আসে না। কোথাও তো সে তার আঙুলের ছাপ ছেড়ে আসেনি। তার মন জুড়ে এখন শুধুই স্নেহাস্পদকে হারানোর তীব্র যন্ত্রণাজাত ক্রোধ আর জীবনে প্রথমবার নরহত্যা করার জন্যে শঙ্কা আর অনুশোচনার মিশ্র অনুভূতি।
