২৬ অগাস্ট, ১৯৪৬ – কলকাতায় মহামিছিল, গোপালের গোঁ আর গান্ধীজির টেনশন
গান্ধীজি কলকাতায় এসেছেন। উঠেছেন বেলেঘাটার বাড়িতে— হায়দারি মঞ্জিলে। তিনি দুই সম্প্রদায়ের মানুষকেই অস্ত্র সমর্পণ করতে বলেছেন আর তারই ফলে আজ মহামিছিল বেরিয়েছিল কলকাতায়। সেই মৈত্রী-মিছিলে সামিল হয়েছিল দুই সম্প্রদায়ের মানুষই। মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং সুরাওর্দী। মিছিলে আরও ছিলেন মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সঙ্গীসাথীদের নিয়ে। সেইসঙ্গে ছিল হিন্দুস্তান ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরাও। যুগলচন্দ্র ঘোষও ছিলেন। সেই মিছিল যখন বেলেঘাটার মহাত্মাজির বাড়ির সামনে দিয়ে ‘মহাত্মাজি জিন্দাবাদ’, ‘ভারত মাতা কী জয়’, ‘হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই’ স্লোগান দিতে দিতে যাচ্ছিল তখন গান্ধীজি স্বয়ং বাড়ির সামনে বেরিয়ে এসে জোড়হাতে জনতার অভিনন্দন গ্রহণ করেন।
রাত সাড়ে ন-টা নাগাদ গোপালবাবুর অফিসে বসেছিল রজনী। গতকালই জাদুঘরের নম্বরে ফোন করে বসন্ত তাকে আসতে বলেছিল আজ যুগলবাবুর সঙ্গে কথা বলিয়ে দেবে বলে; যদিও গোপালবাবু তাঁকে আগেই জানিয়ে রেখেছিল সব।
এখন যুগলবাবুর মুখ থেকে গোপালবাবুকে বলা আজকের মহামিছিলের বর্ণনা শুনছিলো সে আর ভাবছিল নেতাজি আর বাপুজির কথা। এই দুটি মানুষকে আসমুদ্র হিমাচল মান্য করে। তাঁদের কথা নির্দ্বিধায় গ্রহণ করে। কিন্তু দুই মহামানবের পথ ভিন্ন, যদিও লক্ষ্য এক। সুভাষচন্দ্র যে কোথায় তা দেশবাসী জানে না, তবে গান্ধীজি আছেন পথ দেখাতে।
আর এখন রজনী বসে আছে তাঁদেরই দুই অনুগামীর সামনে।
—‘শোনো গোপাল, বাপুজি যে অস্ত্র সমপর্ণের কথা বলেছেন তা নিয়ে তুমি কী ভাবছ?’
শান্ত অথচ কঠোর গলায় গোপাল বললেন— ‘আগে তুমি বল তো যুগলদা, দাঙ্গার সময় গান্ধীজি কোথায় ছিলেন? দাঙ্গা প্রায় থেমে যাওয়ার পরে উনি এসেছেন কলকাতায়; আবার এসে কার সঙ্গে মহামিছিল করেছেন?… কেন?… এরপরেও তুমি আমাকে বলবে অস্ত্র সমপর্ণ করতে?’
—‘দেখ গোপাল, আমি আমার ছেলেদের বলেছি অস্ত্র সমপর্ণ করতে। তারা করবে। তা তুমি নিজে না যাও, তোমার ছেলেদের বল। তারা যাক।’
—‘শোনো যুগলদা, তুমি গান্ধীজির ফলোয়ার। তুমি তাঁর আবেদনে সাড়া দিতেই পার। কিন্তু আমি…।’ একটু থেমে গোপাল আবার একটু উত্তেজিত হয়ে বলতে শুরু করেন— ‘তুমি তো জানো যে এই ক-দিনে কলকাতায় চার হাজারের মতো লোক মরেছে; প্রায় একলাখ লোকের মাথার ওপরে ছাদ নেই। শয়ে শয়ে লোক কলকাতা ছেড়ে পালাচ্ছে। আমার ছেলেরা তোমার ছেলেদের সঙ্গে মিলে দাঙ্গার সময় লড়েছে। এমনকী তুমি ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও করেছ। এরপরেও তুমি আমায় বলছ অস্ত্র সমপর্ণ করতে? না, না, যুগলদা, এ আমি পারব না।’
—‘শোনো, গান্ধীজি কিন্তু আমাকে বারবার তোমার কথা বলেছেন। তোমার সম্বন্ধে উনি বিশেষভাবে ওয়াকিবহাল। তাই বলছিলাম কী ওনার মান রাখতে…।’
—‘যুগলদা, দেখ, কলকাতায় দাঙ্গা থেমেছে। কিন্তু বিহার, উত্তরপ্রদেশ এসবেও দাঙ্গা ছড়াচ্ছে। সেই দাঙ্গার ফিরতি আঁচ আবার যদি কলকাতায় লাগে? তখন? ঢাল-তরোয়াল ছাড়া নিধিরাম সর্দার হয়ে তখন কী করব আমি? বল?’
খানিকক্ষণ দু-জনেই চুপচাপ। তারপরে যুগল ঘোষই বললেন— ‘ঠিক আছে গোপাল। আমি কল্যাণমকে তোমার বক্তব্য জানাব। দেখি কী হয়?’
তারপরে হঠাৎই গোপালবাবুর চোখ পড়ে যায় রজনীর দিকে।
—‘ও, আপনি এসে গেছেন। দুঃখিত, খেয়াল করিনি। আসলে যুগলদার সঙ্গে কথা বলতে বলতে…। এই যে যুগলদা, এইই হচ্ছে রজনীকান্ত রায়। সেই যে, যে ভদ্রলোকের কথা তোমায় বলেছিলাম। খালি হাতে একটা বাচ্চাকে সঙ্গে নিয়ে…।’
—‘ও হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। সেই ওনার গ্রামের স্কুলের রিনোভেশনের ব্যাপার…তাই তো গোপাল?’
—‘হ্যাঁ যুগলদা।’
—‘নমস্কার রজনীবাবু।’
—‘নমস্কার দাদা।’ রজনী ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে।
—‘আরে বসুন, বসুন। তা হ্যাঁ, আপনার ব্যাপারটা আমি গোপালের কাছে শুনেছি। তা বসন্ত একদিন আপনার সাথে গিয়ে ঘুরে দেখে স্কুলের রিনোভেশনের সম্ভাব্য খরচের একটা লিস্ট বানিয়ে আমাকে দেবে। আমি সেটা বিধানবাবুর কাছে পাঠিয়ে দেব। আশা করি উনি নিরাশ করবেন না।’
—‘ধন্যবাদ দাদা।’
—‘ঠিক আছে। তাহলে দিন কুড়ি বাদে গোপালের অফিসেই দেখা করবেন। আর তারই মধ্যে বসন্তের সঙ্গে একটা দিন ঠিক করে নেবেন।’
—‘হয়ে যাবে তো দাদা?’ রজনীর গলায় আকুল প্রশ্ন।
—‘বললাম তো আমার সাধ্যমতো আমি চেষ্টা করব। আশা করি হয়ে যাবে। বিধানবাবু কখনো ভালো কাজের প্রস্তাব ফেরান না। তাই আপনি মোটামুটি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।’ বলতে বলতেই যুগলবাবু উঠে দাঁড়ান। তারপর গোপালের উদ্দেশ্যে বলেন— ‘আমার দেওয়া প্রস্তাবটা তুমি একটু ভেবে দেখো গোপাল।’
গোপালও ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছেন। বলেন— ‘যুগলদা, আমি তোমাকে শ্রদ্ধা করি। তাই বলছি, তুমি এর মধ্যে থেকো না। আমায় এই অনুরোধ করে আর বিড়ম্বনায় ফেল না।’ বলতে বলতে টেবিলের পাশ কাটিয়ে যুগল ঘোষের কাছে পৌঁছে যান।
যুগল ঘোষ বলেন— ‘শোনো, তুমি এক কাজ কর। তোমার ঝড়তি-পড়তি মালগুলোকে তুমি জমা করতে পাঠিয়ে দাও গোপাল।’
গোপালও বলেন— ‘তুমি আবার আমার সঙ্গে তামাশা করছ যুগলদা। তুমি তো জানো যে আমি মাথা উঁচু করে বাঁচতে ভালোবাসি। তা ছাড়া আমি তো কোনো সাধারণ মানুষকে মারিনি। তাই বলছিলাম কী, তুমি দায় ঝেড়ে ফেলে চাপটা বরং কল্যাণমের ঘাড়েই দাও না। দেখি সে কী বলে। …এই বসন্ত, দাদাকে পৌঁছে দিয়ে এসো।’
গোপালের কথামতো বসন্ত গিয়ে বসে জিপের স্টিয়ারিংয়ে। পাশে যুগলচন্দ্র ঘোষ। স্টার্ট নিয়ে জিপ এগিয়ে যায় গন্তব্যে।
