শ্যামাদাসের টোপ, রাহার কৈফিয়ৎ আর জাদুঘরের নিশি

শ্যামাদাসের টোপ, রাহার কৈফিয়ৎ আর জাদুঘরের নিশি

সাতসকালেই কানাইয়ের গলা। দরজা ধাক্কা দিচ্ছে সে। হাঁপাতে হাঁপাতে ডাকছে—‘স্যার, স্যার। দরজা খোলো, দরজা খোলো শিগগির।’

শীতের সূর্য সবে উঠছে। চারিদিকে গাছপালার মাথায় মাথায় কুয়াশা ধোঁয়ার মতো বয়ে যাচ্ছে। একটু দূরের গাছ, গ্রামের ঘরবাড়ি, সব অদৃশ্য কুয়াশার জাদু-চাদরে। একটু বেলায় রোদ উঠলেই ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাবে সেই চাদর। আবার দেখা যাবে গাছপালা, ঘরবাড়ি, নদী, সবকিছু।

একটা চাদর গায়ে চাপিয়ে দরজা খোলে রজনী। বলে— ‘কী হয়েছে রে?’

—‘স্যার, সুরেশ কাকা কাল রাতে তোমার এখান থেকে বেরিয়েছিল তো। কিন্তু সারারাত সে বাড়ি ফেরেনি।

একটা ঝটকা লাগে রজনীর। বলে— ‘তুই কী করে জানলি?’

—‘আমি মাঠে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে সুরেশ কাকার ছেলেদের গলা শুনতে পাই। বেশ জোরে জোরেই কথা বলছিল তারা। তখন আমি তাড়াতাড়ি পুকুরঘাট হয়ে ওদের বাড়ি যাই। সেখানেই শুনলাম রাতে সুরেশ কাকা নাকি বাড়ি ফেরেনি। তাই আমি সোজা তোমার কাছে এলাম। তুমি একবার তাড়াতাড়ি চল স্যার।’

সত্যি তো, সুরেশ কাকাকে সে ছোটোবেলা থেকে দেখছে। কোনোদিন এইরকম করেনি। তবে বয়স হয়েছে। অজ্ঞান হয়ে কোথাও পড়েটড়ে যায়নি তো? তাই কানাইকে সে বলে— ‘একটু দাঁড়া। মুখে চোখে জল দিয়ে আসি।’

সুরেশ কাকার বাড়ি রজনীর বাড়ি থেকে মূল রাস্তা ধরে গেলে মাইলখানেক মতো হবে। কিন্তু রজনীর বাড়িতে সে যাওয়া আসা করে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে একটা শর্টকাট পথ ধরে, জ্বালানি কুড়োতে কুড়োতে। তাই রজনী ঠিক করলে মূল রাস্তা নয়, তার বাড়ির পাশের জঙ্গলের রাস্তাই সে ধরবে। সুরেশ কাকার কিছু যদি হয়ে থাকে, তাহলে সেটা এইপথেই হয়ে থাকবে। যদিও এতদিন কিছু ঘটেনি, তবু কেন জানি না আজ রজনীর মন কু-ডাক ডাকছে। তাই জঙ্গলের পথটাই ধরে সে। পেছন পেছন আসতে থাকে কানাই।

প্রায় পৌনে এক মাইল যেতেই সরু জংলা পথের ওপরেই তাদের নজরে পড়ে একটা সাদা কিছু। দৌড়ে যায় সে। পেছনে ছুটে আসে কানাই। কিন্তু এ কী দেখছে তারা? উপুড় হয়ে পড়ে থাকা সাদা ধুতি আর চাদরে মোড়া শরীরটাকে চিনতে ভুল হয় না তাদের। তাই রজনী কানাইকে বলে— ‘যা, তাড়াতাড়ি গিয়ে কাকার ছেলেদের খবর দে।’ শুনেই কানাই দৌড় লাগায়।

রজনী ভালোভাবে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে। সুরেশ কাকার মাথাটা একপাশে ফেরানো। শুধু চাদরে একটা ফুটো। ভালো করে লক্ষ্য করলে ফুটোর চারপাশে খুব হালকা সুতো পোড়ার দাগ দেখা যায়। চাদরের তলা দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ে শুকনো মাটির খানিকটা জায়গা কালো হয়ে গেছে। খানিকটা দূরে ছিটকে পড়ে আছে হাতের টর্চটা; ম্লান হয়ে প্রায় নিভু নিভু। পাছে আঙুলের ছাপ পড়ে, তাই নিজের এক পরত চাদরের ওপর দিয়ে সুরেশ কাকার হাতের রাডিয়াল পালস আর ঘাড়ের ক্যারোটিড পালস পরীক্ষা করে দেখে। নাঃ, নাড়ি কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না রজনী। সে তো জানেই যা হবার তা হয়েই গেছে। কেউ গুলি করেছে এই নিরীহ, সৎ, বৃদ্ধ মানুষটাকে। কিন্তু কই, কাল রাতে তো কোনো গুলির শব্দ শুনতে পায়নি সে। অবশ্য সুরেশ কাকা বেরোনোর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সে খেতে বসে গিয়েছিল। রাতের অন্ধকারে সুরেশ কাকার এতটা পথ আসতে সময় লাগার কথা মিনিট কুড়ি। তারমানে রজনী যখন টিউবওয়েলে বাসন ধুচ্ছিল তখনই কেউ গুলিটা চালিয়ে থাকবে। তাই সে আওয়াজটা শুনতে পায়নি। আর আততায়ী গুলি চালিয়েছে অন্ততঃপক্ষে হাত দশ পনেরো দূর থেকে।

প্রাথমিক অনুসন্ধান করার পরে রজনী থম মেরে যায়। মনে হয় পায়ে যেন তার জোর নেই। আস্তে আস্তে মাটিতে বসে পড়ে সে। থরথর করে কাঁপছে তার শরীর এক অব্যক্ত ব্যথায়। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না যে তার সুরেশ কাকা আর নেই। ছোটো থেকেই দাদু নিশিকান্ত ছাড়া এই সুরেশ কাকার সাথেই তার সখ্যতা ছিল বেশি। এদের সাথেই ধীরে ধীরে বড়ো হয়েছে সে, আর এরা ক্রমে হয়েছে বৃদ্ধ। কত প্রশ্রয়, কত স্নেহ দিয়েছে তাকে। গ্রীষ্মকালে এনে দিয়েছে কচি তালের শাঁস, বর্ষায় এনেছে ঝড়ে খসে পড়া বাবুই পাখির বাসা, আবার এমনই শীতের সাতসকালে এনে দিয়েছে ঠান্ডা খেজুর রসের কলসি। আবার তার মা মারা যাবার পরে এই সুরেশ কাকাই দিনের পর দিন প্রখর রোদ, ঝড়বৃষ্টি আর শীতের ছোবলকে উপেক্ষা করে বাজার করে এনেছে, রান্না করে দিয়েছে তাদের। এমনকী তার জন্মদিনেও তার মুখে তুলে দিয়েছে পায়েসের বাটি।

কয়েক বিঘা জমির ফসলের ভাগের বদলে সে যা করেছে তা কি শুধুই কৃতজ্ঞতা? তাতে কি ছিল না স্নেহ আর ভালোবাসার আকুল আবেগ?… না, আর পারছে না রজনী নিজেকে ধরে রাখতে। তার এতক্ষণের বুকে জমে থাকা তীব্র ব্যথাটা এবার গলতে শুরু করেছে আর তা চোখের কোল বেয়ে ঝরে পড়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে তার বুকের চাদর।

কতক্ষণ যে সে সেখানে বসেছিল তা সে জানে না। এদিকে বনের সরু পথ ধরে আসতে শুরু করেছে সুরেশ কাকার পরিবারের লোকজন আর গাঁয়ের কিছু মানুষ। তারা এসে জড়ো হয় সুরেশ কাকার পাশে। এতক্ষণে হুঁশ ফেরে রজনীর। উঠে দাঁড়িয়ে চাদর দিয়ে চোখ মুছে একপাশে সরে দাঁড়ায় সে। কানাই এসে আঁকড়ে ধরে তাকে। এত কাছ থেকে প্রিয়জনের মৃত্যু কখনো দেখেনি ওই বাচ্চাটা। তাই সে আশ্রয় খুঁজতে আঁকড়ে ধরেছে তার স্যারকে। রজনীও তাকে আঁকড়ে ধরে। এখন কানাই ছাড়া আপন বলতে আর তো কেউ রইল না তার এই দুনিয়ায়। সে একটু দূরেই সরিয়ে নিয়ে আসে কানাইকে। নিজের শরীর দিয়ে তার চোখ থেকে আড়াল করার চেষ্টা করে সুরেশ কাকার দেহটাকে। কিন্তু এভাবে কি আর মন থেকে আতঙ্ক আর ভালোবাসার কষ্টকে দূরে রাখা যায়? তবু দু-হাতে সে চেপে জড়িয়ে ধরে কানাইকে। তার বুকের কাছে কানাইয়ের মাথাটা নিয়ে পরম স্নেহে হাত বোলাতে থাকে। প্রিয়জনের সান্ত্বনা অনেক সময় দূরে সরিয়ে দেয় ভয় আর কষ্টকে। আর তাই বুঝি কানাই একটু পরে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে ওঠে— ‘স্যার, সুরেশ কাকাকে নিশিতে ডাকেনি। তাই ন্যা স্যার?’

রজনী কানাইকে আরও আঁকড়ে ধরে বলে— ‘না, আমাদের সুরেশ কাকাকে কখনো নিশিতে ডাকতে পারে না।’

.

—‘কী ব্যাপার বলুন তো রাহাবাবু, আপনার এলাকায় তো কোনো অশান্তি ছিল না এতদিন। কিন্তু হঠাৎ দু-দুটো মার্ডার আর আরেকজন শাসপিশাসলি মিসিং। জানি আমার কাছে সরাসরি আপনার কারণ দেখানোর দরকার পড়ে না; কিন্তু একটা শান্ত থানার এলাকায় এত ঘন ঘন ক্রাইম ঘটাটা বেশ অস্বাভাবিক বলেই আমার মনে হয়েছে। তাই আপনাকে ডেকেছি।’ টেবিলে রাখা কাগজগুলো খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে ও.সি. জয়ন্ত রাহাকে বলেন ডি সি ডি ডি নির্মল সেন।

—‘প্রথম মার্ডারটায় স্যার ভিক্টিমের ক্রিকয়েড কার্টিলেজ আর হাইওয়েড বোন দুটোই ভেঙে দিয়েছে মার্ডারার।’

—‘সে তো রিপোর্টে দেখতেই পাচ্ছি।’

—‘সেটাই তো মিস্ট্রি স্যার। কোনো স্ট্রাংগুলেশনের চিহ্ন নেই। কোনো ভারী উইপনসও পাওয়া যায়নি। অথচ ঘাড় ভাঙা।’

—‘আচ্ছা, তাহলে বলুন, ওই মিসিং ছেলেটা… কি যেন নাম… হ্যাঁ, দিনেশ। তা দিনেশের কি কোনো খোঁজ পেলেন?’

—‘না স্যার, আমি ওকে গ্রাম ছাড়তে বারণ করেছিলাম। তবু সে বেপাত্তা। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও আমরা তার খোঁজ পাইনি। হতে পারে সে পালিয়ে অন্য কোথাও আছে। আবার এমনও হতে পারে স্যার, যে ওই দিনেশই…।’ তাকে থামিয়ে দেন নির্মল সেন।

—‘আপনি তো দিনেশকে দেখেছেন, তাকে ইন্টারোগেটও করেছেন। তা তার শরীর স্বাস্থ্য কেমন? ওর পক্ষে কি কারোর ঘাড় ভাঙা সম্ভব বলে আপনার মনে হয়?’

—‘না স্যার। পাতলা চেহারা। ওর পক্ষে কারোর ঘাড় ভাঙা সম্ভব নয়। তা ছাড়া ওর চশমা থেকে যে ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেছে সেটা ওর নিজেরই।’

—‘সেটাই স্বাভাবিক। প্রথম কেসটায় বডি সারারাত জলে ডুবে থাকলে আর তার জিনিসপত্রে কেউ টাচ না করলে তো ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া যাবে না। তবে সেকেন্ড কেসটায় আমার একটা ডাউট আছে। আচ্ছা, দিনেশের পক্ষে কি রাত্তিরে গ্রামে ঢুকে ওই বুড়োকে শুট করা একান্তই অসম্ভব?’

—‘কিন্তু স্যার, যদি ধরেই নিই যে দুটো মার্ডারই দিনেশের করা, তাহলেও তো দেখছি কেসদুটোর মোডাস অপারেন্ডিতে কোনো মিল নেই। আর তা ছাড়া দিনেশের ওই বুড়োকে শুট করার মোটিভ কী?’

—‘ঠিক। দুটো মার্ডারের কোনোটাতেই মোটিভ স্পষ্ট নয়।’

—‘স্যার একটা কথা বলব? আমার মনে হয় স্যার, দিনেশের ডুপ্লিকেট চশমা আছে।’

—‘গুড গেস। তাহলে দিনেশ অন্য কোথাও লুকিয়ে থাকলেও থাকতে পারে, বলছেন? …ওয়েল, তাহলে একটা কাজ করুন। আপনি কি তার কোনো রিসেন্ট ছবি পেয়েছেন?’

—‘না স্যার।’

—‘কিন্তু আপনি তো দিনেশকে নিজের চোখে দেখেছেন। তার হাইটও মোটামুটি জানেন।… কি সেটা খেয়াল করেছিলে তো? নাকি…।’

—‘হ্যাঁ স্যার। মনে হয় আপনি ওর পোর্ট্রেট পার্লে করানোর কথা বলছেন।’

—‘ইয়ে, অ্যাবসোলিউটলি দ্যাট। তাই আপনি যাবার আগে ওটা নীচে আর্টিস্টের কাছ থেকে করিয়ে নিয়ে যাবেন। আর ফিরে গিয়ে সেটা ছাপিয়ে আশেপাশের টাউনের সমস্ত পাবলিক প্লেসে ছড়িয়ে দেবেন। বুঝলেন?’

—‘হ্যাঁ স্যার, তবে লাস্ট কেসটায় একটা ক্লু পেয়েছি। রিপোর্টটা জাস্ট কালই পেয়েছি। তাই সেটা সঙ্গে নিয়েই এসেছি স্যার।’ একটা খাম থেকে বের করে জয়ন্ত রাহা বাড়িয়ে ধরেন রিপোর্টটা।

—‘কী দেখি?’ রিপোর্টটার দিকে হাত বাড়ান ডি সি।

—‘লাস্ট ভিক্টিমের বুকে যে বুলেটটা আটকে ছিল সেটা পয়েন্ট থ্রি টু বোরের কোল্টের। আর শুট করা হয়েছে পাঁচ-ছ গজ দূর থেকে।’

—‘পয়েন্ট থার্টি টু কোল্ট? মানে আমরা পুলিশরা যেটা ইউজ করি?’ ভুরু দুটো কুঁচকে যায় নির্মল সেনের। রিপোর্টটা পড়েন। তারপর একটু ভেবে স্বগতোক্তির মতো বলতে থাকেন— ‘লাস্ট ভিক্টিমের মার্ডারারের হাতে ওই রিভলভার এল কোথা থেকে? এক হতে পারে, স্বদেশিরা কোথাও পুলিশের রিভলভার ছিনতাই করে থাকবে, আর বেশ কয়েক জায়গায়, এমনকী থানাতেও লুঠপাঠ করেওছে তারা। আর তারই একটা পেয়েছে ওই মার্ডারার। আর দ্বিতীয় সম্ভাবনাটা হল এই যে— সে সেটা ব্যক্তিগতভাবে সংগ্রহ করেছে। আর তিন নম্বর হল…।’

আগ্রহের সঙ্গে জানতে চান রাহা— ‘আর তিন নম্বরটা কী স্যার?’

—‘আপনার থানার আর্মস আর অ্যামুনিশনসের স্টক লাস্ট কবে মিলিয়েছেন?’

—‘ছ-মাস আগে স্যার।’

—‘তা এই ছ-মাসে তো অনেক কিছুই ঘটে থাকতে পারে। যাইহোক, আপনি স্টক মিলিয়ে ডিসট্রিক্ট হেডকোয়ার্টারে সেই রিপোর্ট যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জমা করবেন। ইটস ভেরি আর্জেন্ট।’

—‘আচ্ছা স্যার।’

—‘ঠিক আছে। আপনি এখন আসুন তাহলে। আমি দেখছি আর্মসের সাপ্লাই হল কীভাবে।’

—‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার’ বলে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে স্যালুট ঠুকে ডি সি-র ঘর ছাড়েন জয়ন্ত রাহা। উনি বেশ ভালোই বুঝতে পারেন যে প্রোমোশনের লোভে বেড়া ডিঙিয়ে ঘাস খেতে চাইছেন ডি সি। তবে হ্যাঁ, থানার আর্মস আর অ্যামুনিশনসের স্টক মেলানোটা খুবই জরুরি, বিশেষত এই সময়ে।

.

সেদিন সন্ধে সাড়ে ন-টা নাগাদ নিখিলেশ মিত্র আর নির্মল সেনকে দেখা গেল নিজামের পর্দা ঢাকা কেবিনে। প্লেটে রাখা পরোটা দিয়ে কাবাবের একটুকরো মুখে পুরে নির্মল সেন বলে— ‘হ্যাঁরে চাঁপাডাঙার খুনের খবরগুলো কভার করছিস তো ভালো করে? ভালো জিলিপি আছে কিন্তু।’

—আর বলিস না। আমাদের হুগলি ডিস্ট্রিক্টের যে করস্পন্ডেন্ট আছে সে তেমন এফিসিয়েন্ট নয় বুঝলি। খবর পাঠায়, তাও ভাসা ভাসা, ডিটেলও নেই তেমন। জমিয়ে যে কপি লিখব।…দূর দূর, এভাবে কাজ হয়?’

—‘শোন নিখিল, আজকে ওখানকার ওসি জয়ন্ত রাহাকে ডেকে পাঠিয়েছিলাম।’

খাবারে কামড় দিতে গিয়েও খবরের আঁচ পায় নিখিলেশ মিত্র। তাই সেটা প্লেটে রেখে রুমালে হাত মুছে ব্যাগ থেকে রাইটিং প্যাড আর পেন্সিল বের করে সে। তারপর বলে— ‘হ্যাঁ, এবারে বল।’

হেসে ফেলে নির্মল। বলে— ‘একেই বলে ছুঁকছুঁকে রিপোর্টার। যাইহোক, এবার শোন আর যা নোট করার কর। আমি বলে যাচ্ছি এক এক করে।’

—‘একটু আস্তে বলিস।’

—‘কেন? তুই তো শর্টহ্যান্ডে নোট করবি। আচ্ছা নে, আস্তে আস্তেই বলছি। তবে খাবার খেতে খেতে লেখ, নইলে ওটা ঠান্ডা হয়ে যাবে।’

তাই কাবাব-পরোটায় কামড় দিয়ে এক বন্ধু বলতে থাকে আর নোট নিতে থাকে অন্যজন। রিপোর্ট থেকে যতটা জেনেছে ততটাই আনুপূর্বিক বর্ণনা করে নির্মল আর খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে লিখে চলে নিখিলেশ।

সবটা লেখা শেষ হলে নিখিলেশ বলে— ‘আরে বাপরে! বিহাইন্ড দ্য কার্টেন এত্তো ঘটনা?’

—‘হুঁ, তাহলে তো দেখছি তোদের কালকের টেলিগ্রাম একেবারে বাম্পার হিট হয়ে যাবে রে। এডিটর তো মনে হয় ডাবল প্রিন্ট ছাপাবে।’

—‘তা হয়তো ঠিকই বলেছিস। বাড়িতে বসে জমিয়ে কপি লিখব আজ, তা সে যত রাত্তিরই হোক।’

—‘হেডলাইন কি করবি? ভেবেছিস কিছু? নাকি পরে ঠিক করবি?’

—‘ভাবা হয়ে গেছে রে। হেডলাইন দেব— ‘‘চাঁপাডাঙায় নিশির ডাক’’। পাবলিক একেবারে চেটেপুটে খাবে, বলে দিলাম।’

—‘ওঃ, তোরা রিপোর্টাররা পারিসও বটে।’

—‘ওরে, ওটাই তো আমাদের…ইয়ে…মানে ট্রেড সিক্রেট। তবে একটা জিনিস আমার কাছে পরিষ্কার।’

—‘কী?’

—‘রাইভ্যাল পেপার এসব খবর পেলে না…।’

—‘সে তো নিশ্চয়ই। তবে তখন হয়তো দেখবি যে তারা হতাশায় এখানকার কোনো পেটি খুনের কেস নিয়ে না হেডলাইন করে বসে— ‘কলকাতায় নিশির হানা’। তবে এইরকম মারকাটারি হেডলাইন হলে পাবলিক টোপ না গিলে যাবে কোথায়?’

—‘তা যা বলেছিস। অসম্ভব কিছুই নয়। নয়কে হয় করাই তো এই লাইনের রেওয়াজ। আরে বাবা, এটাও তো একটা ব্যবসা। আমরা যা খাওয়াব, পাবলিক তাই খাবে। ওইসব ‘সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা’ হচ্ছে স্রেফ কথার কথা। আসল কথা হল খবর বেচা। ‘‘নিউজ’’ আসলে একটা কোমোডিটি, তুই তো সেটা ভালো করেই জানিস।’

—‘জানি, জানি, তোদের ‘‘ইয়েলো জার্নালিজম’’ এর কথা আমি ভালোই জানি। অনেক সময় স্রেফ টেবিলে বসেই খবর লিখিস তোরা। উড়োকথা শুনেই খবর বানিয়ে ফেলতে জুড়ি নেই তোদের। মানতেই হবে, যেকোনো গল্পকারও হার মানবে তোদের কাছে।’

হা হা করে হেসে ওঠে দুই বন্ধু।

.

শীতের কলকাতা। যুদ্ধের কলকাতা। রাত দশটার পরেই যেন অঘোষিত কার্ফু জারি হয়ে যায়। জেগে থাকে শুধু পুলিশ আর মিলিটারির গাড়ি আর জেগে থাকে নেড়িকুকুরের দল।

পার্ক স্ট্রিটের মুখটায় তবু দু-একটা মোটর গাড়ির দেখা মেলে। ওগুলোর বেশিরভাগই বড়লোকের জিভ জড়িয়ে যাওয়া ছেলেদের কিংবা কখনো বা কোনো মধ্যবয়স্ক লোককে বার থেকে ঘরে পৌঁছে দিতে ব্যস্ত। শুনশান চৌরঙ্গির ওপর দিয়ে দৌড়ে যায় তারা। তবে তাদের চলার আওয়াজে ঘুম ভাঙে না ফুটপাথে ইতিউতি গুটিয়ে শুয়ে থাকা মানুষদের।

তবে সেদিন ভোরের আলো সবে ফুটতে শুরু করেছে। চৌরঙ্গি ধরে ধর্মতলার দিকে যাওয়া পুলিশের টহলদারি ভ্যানটা হঠাৎই দাঁড়িয়ে যায় মিউজিয়মের গেটের সামনে। গেটের একটা পাল্লা হাট করে খোলা কেন? চোর ঢুকেছিল নাকি? দু-জন কনস্টেবল আর একজন সাব-ইনস্পেকটর গাড়ি থেকে নেমে এগোয় সেদিকে। কিন্তু একী? একী দেখছে? আরে, এই পাগলটা তো রোজ মিউজিয়মের গেটের পাশেই বসে থাকে রাতে। কিন্তু আজ? চাবি সমেত তালাটা পড়ে আছে মাটিতে আর পাগলটা পড়ে আছে ফুটপাথে। কালচে রক্তের ধারা তার মাথা থেকে বেরিয়ে গড়িয়ে পড়েছে পাশের নর্দমায়। আর তার পাশে পড়ে আছে একটা উনুন ধরানোর শক্তপোক্ত চ্যালাকাঠ। সাব-ইনস্পেকটর দ্রুত খবর পাঠায় ওয়্যারলেসে।

কপি লিখে রাত দু-টোয় শুতে গিয়েছিল নিখিলেশ মিত্র। সকাল ছ-টা নাগাদ মাথার পাশে রাখা টেলিফোনটা ঘুম ভাঙিয়ে দেয় তার। ঘুম জড়ানো গলায় ‘হ্যালো’ বলতেই শুনতে পেল নির্মল সেনের গলা।

ফোনে ভেসে আসে— ‘মিউজিয়মের সামনে চলে যা। ওখানে তোর নিশির ডাকের একটা স্যাম্পেল পাবি। সে ওখানে একটা পাগলকে মমি বানিয়ে দিয়ে গেছে কালকে রাতে।’ ফোনটা কেটে দেয় নির্মল সেন।

তবে সেদিন সন্ধেবেলা কলকাতার মোড়ে মোড়ে টেলিগ্রাম হকাররা জাঁকিয়ে হাঁকছিল— ‘খুন, খুন… চাঁপাডাঙা আর কলকাতায় নিশির ডাকে খুন।’ আর অফিস ফেরত লোকেরা হামলে পড়ে কিনছিল সত্যসংবাদের সেই টেলিগ্রাম।

আসলে তারা তো কেউ জানে না রজনীর শোনা মুক্তোরামের ‘সমন্যামবুলিজম’-এর কাহিনি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *