১৯৩০, এপ্রিল – স্বয়ং মুকুন্দদাস, নিশিকান্ত আর বহুরূপী
হাটতলার ঠিক মাঝখানে এক বিশাল বটগাছ। তার গোড়ার চারপাশে খানিকটা জায়গা জুড়ে লাল সিমেন্টের বাঁধানো বেদি। চারপাশে শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে আর ঝুরি নামিয়ে সে যেন আগলে রেখেছে এই হাটটাকে। সেই বেদিতে গ্রীষ্মের খর দুপুরে অনেকে এসে বসে বিশ্রাম করে আর সন্ধের দখিণা হাওয়ায় সেখানে জমে ওঠে আড্ডা। আদ্যিকালের এই গাছটা অনেক কিছু দেখেছে, অনেক কিছু শুনেছে। রজনীকান্তর মনে হয় শুধু যদি গাছটা কথা বলতে পারত তাহলে হয়তো পুরোনো দিনের অনেক কথাই জানা যেত ওর কাছ থেকে। কিন্তু তবুও ও যে কেন কথা বলে না কে জানে? ভরদুপুরের নির্জনতায় যখন কখনো সখনও রজনী এই গাছটার তলায় এসে বসে, তখন ফিসফিসিয়ে বললেও সে ঠিক শুনতে পেত গাছটার বলা কথা। অন্য কেউ না বুঝলেও সে ঠিকই বুঝতে পারত। সে যে অনুভব করতে পারে প্রকৃতির অব্যক্ত কথা।
সেবার, ১৯৩০ সালের এপ্রিল মাসের এক সন্ধ্যায় এই গাছতলাতেই এসেছিলেন স্বয়ং চারণকবি মুকুন্দদাস। ভগৎ সিংয়ের মারা যাবার ঠিক একবছর পরেই। শ্যামাদাসের বাবাই ব্যবস্থা করেছিলেন সব। প্রচুর লোকসমাগম হয়েছিল সেবার। আশেপাশের গাঁ থেকেও অনেক পুরুষ আর মহিলারা এসেছিল। এই বটতলারই বেদিতে দাঁড়িয়ে একের পর এক দেশাত্মবোধক গান গেয়ে যাচ্ছিলেন চারণকবি। উদাত্ত গলায় তাঁর গানের সুরে আর হাতের মুদ্রায় ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন দেশাত্মবোধ। রজনী তখন বাইশ বছরের যুবক। সদ্য কলেজ পাশ করে বেরিয়েছে সে। দাদু নিশিকান্তর পাশে দাঁড়িয়ে শুনছিল। আর যতই শুনছিল, ততোই তার গায়ের রোম খাড়া হয়ে যাচ্ছিল। চোখের কোল ভারী হয়ে উঠছিল জলে। দাদু নিশ্চয়ই তার এই মগ্নতা লক্ষ্য করেছিলেন। কিন্তু কিচ্ছু বলেননি তাকে। সদ্য যুবক রজনীর স্বদেশি আবেগকে লাগাম দিতে চাননি উনি। আপ্লুত রজনীকান্তের আবেগ তুঙ্গে উঠেছিল যখন চারণকবি গাইতে শুরু করেছিলেন— ‘ভয় কী মরণে, রাখিতে সন্তানে, মাতঙ্গী মেতেছে আজ সমর রঙ্গে…’। তাই গানের মাঝেই সে দাদুকে বলেছিল— ‘তুমি পুরো গানটা জানো?’
—‘হ্যাঁ, মুকুন্দদাসের গান তো অনেক লোকেরই মুকে মুকে ফেরে। সেখান থেকেই শুনে শুনে দু-একটা শেকা।’
—‘আমাকে শিখিয়ে দেবে?’
—‘হ্যাঁ দেবো। অ্যাকোন মন দে গানটা শোনো দিকি।’
চারণকবি গেয়ে চলেছেন। তাঁর অন্তরের দামাল স্বদেশপ্রেম গান হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। তাঁর গানের সঙ্গে তাঁরই পাশে বেদির ওপরে ঘোর কৃষ্ণবর্ণ কালী সেজে নাচছে এই গ্রামেরই বাসিন্দা বহরূপী বিষ্টুচরণ। রজনীরই প্রায় সমবয়সি সে। অপরের জমিতে চাষবাষের কাজ করে আর মাঝেমধ্যেই বহুরূপী সেজে এ গ্রাম সে গ্রামে দুটো বাড়তি পয়সা উপার্জনের আশায় ঘোরে ফেরে। কখনো সাজে শিব, কখনো শীতলা, কখনো কৃষ্ণ আবার কখনো বা কালী। আজ যেমন সে কালী সেজেছে।
চারণকবি গেয়ে চলেছেন। কখনো মাথা ঝাঁকিয়ে আবার কখনো বা দু-হাত তুলে। যখনই তাঁর গানের ওই লাইনটা ফিরে ফিরে আসছে— ‘তাথই তাথই থই, দ্রিমি দ্রিমি দ্রম দ্রম…’ তখনই বিষ্টুর নাচের তাণ্ডবও বাড়ছে। তার হাতে ধরা নকল নরমুন্ড নাচের তালে তালে দোল খাচ্ছে। তার কালো রংমাখা মুখের নকল লাল জিভে আর বিস্ফারিত চোখে দানবদলনের মূর্ত ছবি। নকল হাতের টিনের খাঁড়ায় ঠিকরে ঠিকরে পড়ছে হ্যাজাকবাতির আলো। মনে হচ্ছে যেন গানের প্রভাবে কালী আমূল পালটে হয়ে গেছেন প্রলয় নৃত্যকারী রুদ্র। নৃত্যরত বিষ্টুর ভাঙা ভাঙা ছায়া ঘুরে ঘুরে ফিরছে বটগাছের ডালে ডালে, পাতায় পাতায়। সেই ছায়া দেখে মনে হচ্ছে যেন ঊর্ধে নাচছে পিশাচের দল— যেমনটা আছে চারণকবির গানের কথায়। শ্রোতাদের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছে কবির গানের সেই উদ্দাম আবেশ। তাই ওই ‘তাথই তাথই থই, দ্রিমি দ্রিমি দ্রম দ্রম…’ জায়গাটা এলেই তারাও গলা ছেড়ে গানের সুরে সুর মেলাচ্ছে।
ঠিক এমনই সময়ে ঘটে গিয়েছিল অঘটন। এই তালুকের থানার দারোগা নরসিংহ জনা বিশেক লাঠিধারী পুলিশ নিয়ে পেছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সমবেত জনতার ওপরে। গানে মজে থাকায় কেউ কিচ্ছুটি বুঝতে পারেনি আগে। পুলিশের দল নিরস্ত্র জনতার ওপরে নির্মমভাবে এলোপাথাড়ি চালিয়েছিল লাঠি। আচমকা আক্রমণে ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছিল সবাই। কারোর মাথা ফেটেছিল, কারোর কাঁধে লেগেছিল ভীষণ চোট আবার কেউবা মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছিল। এমনসময়ে একজন পুলিশ তার আর তার দাদুর ওপরে লাঠি তুলতেই দাদু খপ করে ধরে ফেলেছিল সেই লাঠি আর পরক্ষণেই চকিতে ঘুরে পুলিশটার পেছনে গিয়ে দু-হাতে ওই লাঠিটা দিয়েই চেপে ধরেছিল পুলিশটার গলা। প্রায় আধমিনিট পরে দাদু যখন লাঠির প্যাঁচ ছেড়েছিল, তখন পুলিশটা নিজের গলা ধরে লুটিয়ে পড়েছিল মাটিতে। তারপর ওই বৃদ্ধ বয়েসেও পুলিশের লাঠিটা তুলে নিয়ে দাদু গিয়ে দাঁড়িয়েছিল চারণকবির পাশে। হেঁকে বলেছিল— ‘কবির গায়ে হাত পড়লে তোদের কাউকে আমি ছেড়ে কতা বলবোনি কিন্তু। খবরদার।’ দারোগা নরসিংহ তখন পিস্তল বের করে শূন্যে গুলি ছুঁড়ে বলেছিল— ‘এ্যাই বুড়ো, সরে যা। সরকারি পরোয়ানা আছে মুকুন্দদাসকে গ্রেফতার করার।’
দাদু চিৎকার করে বলেছিল— ‘কেন? সরবো কেন? সে কী অপরাদ করেচে? গান শোনানো কি অপরাদ?’
জবাব এসেছিল— ‘অতশত জানি না। গ্রেফতারি পরোয়ানা আছে ওর নামে। ওকে গ্রেফতার করতে দে।’
ততোক্ষণে বটতলা ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। শুধু শ্যামাদাসের বাবা, রজনীকান্ত আর গাঁয়ের দু-চার জন মাতব্বর দাঁড়িয়েছিল তখনও।
সেই মাতব্বরদেরই একজন বললে— ‘সরে এসো নিশিকান্ত। পুলিশের কাজে বাধা দিতে গেলে তুমিও গ্রেফতার হতে পার। সরে এসো। দারোগাবাবুকে নিজের কাজ করতে দাও।’
দাদু বলেছিল— ‘দারোগাবাবু, আমাকে আগে কতা দাও যে তোমরা চারণকবির কোনো অনিষ্ট করবেনি। নইলে আমি নড়চিনি। দেকি তোমার পিস্তলের কত্তো জোর। আমাকে না মেরে তোমরা কবিকে নে যেতে পারবেনি, কয়ে দিলাম।’
রজনী অবাক হয়ে দেখছিল ওই সাতাত্তর বছর বয়সের বৃদ্ধের ওপরে তখন যেন স্বয়ং মহারুদ্র ভর করেছেন।
—‘নিশিকান্ত, তুমি আমাকে দারোগাবাবুর কাছে যেতে দাও। এরকম অ্যারেস্ট ব্রিটিশ পুলিশ আমায় অনেকবার করেছে। তবু আমার গলা থামেনি আর থামবেও না।’ বলে উঠেছিলেন স্বয়ং মুকুন্দদাস।
—‘না, আমি পেরান থাকতেও পারবোনি তা।…আঃ।’
এই কথা চালাচালির মধ্যেই কোনো এক পুলিশ আলো-অন্ধকারের আড়াল আবডাল দিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল দাদুর পেছনে। কেউই খেয়াল করেনি। সেইই সপাটে লাঠি কষায় বৃদ্ধের মাথার পেছনে। সেই আঘাতেই বটলার বেদিতে লুটিয়ে পড়েছিল বৃদ্ধ। হাঁ-হাঁ করে ছুটে গিয়েছিল সবাই। রক্তমাখা দাদুর মাথাটা কোলে তুলে নিয়েছিল রজনী আর স্তম্ভিত হয়ে দেখছিল— হাতে হাতকড়া পরা, কোমরে দড়ি বাঁধা চারণকবি মুকুন্দদাস ধীরপায়ে এগিয়ে চলেছেন পুলিশের সঙ্গে হ্যাজাকবাতির আলোর বৃত্ত ছেড়ে ঘোর অন্ধকারে ঢাকা পথের দিকে।
সেদিনই সবাই ধরাধরি করে গোরুরগাড়িতে চাপিয়ে দাদুকে নিয়ে গিয়েছিল সদর হাসপাতালে। সেখানে সাতদিন থাকার পরে ছুটি পেয়ে বাড়ি ফিরেছিল দাদু নিশিকান্ত। তবে শরীরে আর জোর ছিল না। বেশি কথা বলতে পারত না। বেশিরভাগ সময়ে শুয়ে বসেই কাটাত। তবে সেই সময়েই গানের কথাগুলো বলে দিয়েছিল রজনীকে। রজনী তা লিখে নিয়েছিল খাতায় আর সুরটা সে রপ্ত করেছিল চারণকবির গান আর দাদুর কাঁপা কাঁপা গলার সুর শুনে। তারপরে বোধ হয় আর এক পক্ষকাল বেঁচে ছিল দাদু।
.
তবে আজ, এই ১৯৪৩-এর এপ্রিলে শ্যামাদাসদা ব্যবস্থা করেছে ভালোই। বটগাছের চারিদিকে ছ-টা খুঁটি পুঁতে জ্বালিয়ে দিয়েছে হ্যাজাকবাতি। এই গ্রামে বিদ্যুৎ এসেছে বটে, তবে তা দু-একজন বিত্তশালী মানুষের বাড়িতে। অন্যদের বাড়িতে হয় টেমি, নয়তো হ্যারিকেন বা লন্ঠন। তাই হাটতলায় আজ সেদিনের চেয়ে অনেক বেশি হ্যাজাকবাতির আলো। অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে তা। ছেয়ে আছে হাটতলা জুড়ে— লোকের মনে যেমন অনেক বেশি স্বদেশিয়ানা ছেয়ে আছে আজ।
কলকাতা থেকে গাইয়ে আসবে। খরচখরচা সবই করছে শ্যামাদাসদা। সঙ্গে রয়েছে তার সাঙ্গোপাঙ্গরা। আজও বিষ্টুচরণ সেদিনের মতো কালী সেজে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। এখন তার লালরঙা নকল জিভটা মুখে লাগানো নেই। হঠাৎই শ্যামাদাসের এক চ্যালা কোথা থেকে দৌড়ে এসে হাতের দামি সিগারেটের কৌটো থেকে একটা সিগারেট বের করে বিষ্টুর মুখে গুঁজে দেয়। তারপরে দেশলাই জ্বেলে সেটাকে ধরিয়ে দিয়ে বলে— ‘আজ এক্কেবারে জমিয়ে দিতে হবে বিষ্টুদা। দামি সিগারেট খাওয়ালাম। জমিয়ে দিলে আরও পাঁচটা দেবো আর শ্যামাদা তোমাকে পাঁচটা টাকাও দেবে বলেছে।’ সামান্য দূর থেকেই কথাটা কানে যায় রজনীর। কথাটা বলেই চলে যায় ছেলেটা। নকল নরমুণ্ডটাকে অন্যহাতের বাটির ওপরে বসিয়ে একটা হাত খালি করে নেয় বিষ্টুচরণ। দু-আঙুলের ফাঁকে সিগারেট ধরে সুখটান মেরে একমুখ ধোঁয়া উড়িয়ে দেয় বাতাসে। এদিকে কালীকে সিগারেট খেতে দেখে বিষ্টুর আশেপাশে ভিড় করেছে কয়েকটা কৌতূহলী বাচ্চা।
—‘এই, ভাগ এখান থেকে’ বলে বাচ্চাদের খেদিয়ে তার কাছে এগিয়ে যায় রজনী। তাকে দেখে একগাল হেসে বিষ্টু বলে— ‘আঃ, কী খোসবাই। বিড়ি খেতে খেতে মুকে চড়া পড়ে গেসলো, বুইলে। অবিশ্যি তুমি আর এসবের কি বুইবে? কোনোদিন তো নেশা ভাং কিচ্চু কল্লেনি।’
তার দিকে হাতটা বাড়িয়ে রজনী বললে— ‘দেখি কোন অমৃত তোমায় দিয়ে গ্যালো শ্যামাদাসদার চ্যালা।’ বিষ্টু ভাবলে রজনীও বুঝি দু-টান দেবে। তাই সিগারেটটা বাড়িয়ে দিলে সে। হাতে নিয়ে সিগারেটের ব্র্যান্ডটা দেখে সেটা বিষ্টুর হাতেই আবার ফেরত দিয়ে দেয় রজনী। ফেরার সময় মুচকি হেসে বললে— ‘নাও, আজ তো বেশ ভালোই কামাই হবে বলে মনে হচ্ছে। চালিয়ে যাও, চালিয়ে যাও।’ কলকাতায় কাজ করার সুবাদে রজনী দেখেছে এই ব্র্যান্ডের সিগারেট খায় সেখানকার অবস্থাপন্ন লোকেরা। ফ্রেডরিক সায়েবও এটাই খায়। চায়ের দোকানে গিয়ে চায়ে চুমুক দিতে দিতে একটা সন্ধেহ উঁকি মারে তার মনে। শ্যামাদাসদা আর তার দলবল স্বদেশি দলের সঙ্গে যুক্ত। এরা খদ্দর পরে। এরাই তো গ্রাম গঞ্জের মানুষের মনে স্বদেশিয়ানার ভাবধারা ছড়িয়ে দিতে চায়। এরাই তাই আজ আয়োজন করেছে স্বদেশি গানের। তাহলে এদের হাতে বিদেশি সিগারেটের কৌটো কেন?
হঠাৎই একটা শোরগোল শোনা যায়। মুকুন্দদাসের মতো গোরুরগাড়িতে নয়, মোটরে চেপে হাজির হয়েছে কলকাতার শিল্পী। এখন এই গ্রামে ইঁটভাঙা দিয়ে তাতে রোলার চালিয়ে বাসের সড়ক তৈরি হয়েছে। দুটো বাস চলাচল করে। একঘন্টার তফাতে একটা বাস যায় আর আরেকটা আসে। সেই পথেই এসেছে মোটর। ধীরেসুস্থে চা শেষ করে ভাঁড়টা ফেলে পয়সা মেটাতে যাবে রজনী, এমনসময় একটা টর্চের আলো তার শরীর ছুঁয়ে যায়। সুরেশ কাকা হাজির হয়ে গেছে। রজনীকে দেখেই সে বললে—‘চলোগে এবার। গাইয়ে তো এসে গ্যাচে। একটা ভালো জায়গা খুঁজেপেতে বসিগে চল।’
—‘হ্যাঁ, চল’ বলে দাম মিটিয়ে হাটতলার বটগাছের দিকে এগোয় তারা। যেতে যেতে সুরেশ কাকা বলে— ‘তবে আমার কী মনে হয় জানো ছোরদাবাবু, মুকুন্দদাসের মতো গান আর এবার বোদয় হবেনি। ছেলে ছোকরাদের মোদ্দে সেই দেশভক্তি কোতায়? এরা সব মোটরে চড়ে হেতায় হোতায় গান গেয়ে দু-পয়সা কামাতেই ব্যাস্ত।’
—‘তবে ছেলে ছোকরাদের মধ্যে যে দেশভক্তি থাকবে না এমনটাই বা ভাবছ কেন? কত বিপ্লবী তো কাঁচা বয়েসেই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে প্রাণ দিয়েছে। সেকথা কি ভুলে গেলে?’
—‘তা অবিশ্যি ঠিক।’ বলে সুরেশ কাকা।
ওরা একটা বন্ধ দোকানের সামনে বাঁশের তৈরি বসার জায়গায় গিয়ে বসে। একটু পরেই শুরু হয় গান। সঙ্গে বহুরূপী বিষ্টুচরণের দানবদলনী নাচ। কিন্তু সেবারের মতো রজনীর গায়ের রোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে কই? চোখের কোলে জল জমছে কই? তাহলে কি সুরেশ কাকার কথাই সত্যি? নাকি তার বয়সটা তেরো বছর বেড়ে গেছে বলে ভেতরের আবেগটাই গেছে কমে?
যাইহোক, একসময় গানবাজনা শেষ হল।
তারপরে শ্যামাদাসদা সমবেত জনগণের উদ্দেশ্যে বললে— ‘এবারে সবাই মিলে বলুন, ‘‘বন্দে মাতরম’’, ‘‘ভারত মাতা কী জয়’’।’
সবাই শ্যামাদাসের সুরে সুর মিলিয়ে ডাক ছাড়ল— ‘বন্দে মাতরম’, ‘ভারত মাতা কী জয়’। সুরেশ কাকাও ডাক ছাড়ল সবার সাথে গলা মিলিয়ে।
কিন্তু রজনীর মনে হল— কই এবারে তো পুলিশ এল না?… কেন এল না কে জানে…।
তারপরে সুরেশ কাকা বললে— ‘তাহলে এবার উটি? গিন্নি না খেয়ে বসে আচে। আমি সকালবেলা ঠিক পৌঁচে যাবোকন।’
—‘হ্যাঁ এসো। সাবধানে যেও’ বলে উঠে পড়ে রজনী। বাড়ির পথ ধরে। অন্ধকার পথ। আকাশে ছড়িয়ে আছে হাজারো তারা। আকাশ দেখতে তার বড়ো ভালো লাগে। মানুষের মনের মতো আকাশকেও পুরোপুরি চেনা সহজ নয়। কিছু কিছু চেনা যায় হয়তো, কিন্তু সবটা নয়। হ্যাঁ, ওই তো ‘কালপুরুষ’, ওইটা ‘সপ্তর্ষি’ আর ওই যে হালকা আলোয় মিটমিট করছে যে তারাটা, ওটা হল ‘ধ্রুবতারা’। সর্বদাই উত্তরদিক চিনিয়ে দেয় সে। কখনো ভুলচুক হয় না। রজনীর মনে হয়— ‘প্রকৃত সত্যি’ ব্যাপারটাও বুঝি এমনতরো। হাজারো প্রকট ‘আপাত সত্যি’র মধ্যেও তা হারিয়ে যায় না।
এইসব ভাবতে ভাবতেই বাড়ির কাছে এসে পড়ে রজনীকান্ত।
হঠাৎই তার বাড়ির দাওয়া থেকে ছিটকে আসে টর্চের আলো। সরাসরি পড়ে তার মুখে। চোখ ধঁধিয়ে যায়। এক অজানা আশঙ্কায় তার শরীরের সব স্নায়ু টানটান হয়ে যায়। সে মোকাবিলার জন্যে তৈরি হয়ে যায় মুহূর্তে। হাঁক পাড়ে— ‘টর্চটা সরাও।’ আলোটা এবার ঘুরে গেল টর্চধারীর দিকে। চমকে উঠল রজনী। কালো মতো ওটা কে? একটু পরেই চোখ সয়ে যেতেই সে বুঝতে পারল দাওয়ায় পা ঝুলিয়ে বসে আছে কালীর কালো বেশে সাজা বহুরূপী বিষ্টুচরণ। অন্ধকারের সাথে মিশে রজনীর দাওয়ায় বসেছিল সে। এতক্ষণে শরীরটা স্বাভাবিক হয় রজনীর।
কাছে এগিয়ে গিয়ে সে জিজ্ঞেস করে— ‘কী ব্যাপার বিষ্টু? এত রাতে এইভাবে এখানে কেন? কী দরকার?’
দাওয়া থেকে টুক করে নেমে সাদা দাঁতগুলো বের করে হেসে বিষ্টুচরণ বলে—‘শোনো। পরের শনিবার জলার ধারে সেনেদের পোড়ো ভিটেতে রাত দশটায় তোমায় হাজির হতে বলেচে শ্যামাদা।’
—‘কিন্তু আমাকে কেন?’
—‘তার আমি কি জানি। বলেচে নাকি বিশেষ দরকার আচে তোমার সাতে।’
—‘বিশেষ দরকার? তা আর কিছু বলেনি শ্যামাদাসদা?’
—‘নাঃ, ব্যাস এইটুকুই। বাকি কতা সাক্কাতে বলবে বলেচে। আর বলেচে যে এই কতাটা আর কেউ যেন না জানে। বুইলে? তাহলে একন আসি?’ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামে বিষ্টু।
—‘হ্যাঁ, এসো।’
টর্চের আলো ফেলে ফেলে দূরের অন্ধকারে ক্রমশ মিলিয়ে যায় বিষ্টুচরণ বহুরূপীর কালীরূপ। আর রজনীর মনে প্রশ্ন জাগে— কী এমন প্রয়োজনে শ্যামাদাসদা তাকে ডেকে পাঠাল সেনেদের পোড়ো বাড়িতে? এই কথাটা তো সে সুরেশ কাকাকে দিয়ে বা সে নিজেও হাটতলায় তাকে বলতে পারত। কিন্তু তা না করে…।
শুধু তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে বলল সজাগ থাকতে।
