১৬ অগাস্ট, ১৯৪৬ – গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং, রাস্তায় শকুন, কেশোরামে আগুন আর আনন্দমঠ
১৬ অগাস্ট সকালে ছাদে প্র্যাকটিস সেরে নীচে নেমে রজনী আর কানাই কেষ্টদার দেওয়া চা-বিস্কুট খাচ্ছিল। এমন সময় দরজার কড়া নাড়ার সঙ্গে আওয়াজ শোনা গেল— ‘কেষ্ট, দরজা খোল তাড়াতাড়ি।’ মেসোমশাইয়ের গলা। সকাল সকালই বাজার করতে বেরিয়ে যান উনি। এখন ফিরলেন বোধ হয়।
কেষ্টদা দরজা খুলতেই হন্তদন্ত হয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে দুটো ব্যাগভরতি বাজার নিয়ে ঢুকলেন।
—‘এই বাজারেই চালিও একসপ্তা। কেষ্ট, খবরটা চালা দেখি।’ মেসোমশাইকে খুবই উদ্বিগ্ন মনে হচ্ছে।
রজনী বলল— ‘কী ব্যাপার মেসোমশাই, এত হাঁপাচ্ছেন কেন?’
—‘আর বল না। কলেজ স্ট্রিটে দোকানপাট ভাঙচুর হচ্ছে। শুনলাম হ্যারিসন রোড আর কলুটোলাতেও নাকি ইঁট-পাথর ছোঁড়াছুঁড়ি আর ভাঙচুর হচ্ছে। এমনকী দু-জনকে নাকি স্ট্যাবও করা হয়েছে। তাই আমি যতটা পারি বাজার করে আনলাম। পরে বেরতে পারব কি না কে জানে। মনে হচ্ছে রায়ট শুরু হলেও হতে পারে। শোনো, আজ আর কেউ বাড়ির বাইরে বেরিয়ো না। সাবধানের মার নেই। আর হ্যাঁ রে কেষ্ট, চিঁড়ে, গুড়, মুড়ি এসব ঘরে আছে তো?’
—‘হ্যাঁ কত্তাবাবু, আচে।’ জবাব দিল কেষ্টদা।
ততক্ষণে রেডিয়ো থেকে ভেসে আসছে খবর। বিক্ষিপ্ত ভাঙচুর আর খুন শুরু হয়ে গেছে রাজাবাজার, কলাবাগান, বড়োবাজার এমনকী কলেজ স্ট্রিটেও। সম্ভাব্য বিপদের কথা আন্দাজ করে আজ আগে থেকেই স্কুল, অফিস, দোকানপাট বন্ধ রাখা হয়েছে। লালবাজারের মতে এই দাঙ্গাগুলো নাকি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা।
রজনী বলে— ‘কিন্তু মেসোমশাই, আজ দুপুরে তো মনুমেন্টে মিটিং আছে সুরাওর্দীর।’
একগ্লাস জল খেয়ে কেষ্টদার দেওয়া চায়ে চুমুক দিয়ে মেসোমশাই বললেন— ‘কি জানি বাবা, ভোরের সূর্যই যদি এত গনগনে হয় তবে মিটিং এর পরের অবস্থা যে কী হবে কে জানে। কলকাতার দাঙ্গায় যে কী অবস্থা হয় তা তো তুমি দেখোনি রজনী। আমরা দেখেছি। আর সেইজন্যেই বলছি, রেডিয়োর খবরটা শোনো। পরিস্থিতির একটা আন্দাজ পাবে। আর হ্যাঁ, অচেনা কেউ ডাকলেও সদর দরজা খুল না যেন।’
চা খেতে খেতে মেসোমশাই খবর শুনতে লাগলেন। দাওয়ায় বসে কুটনো কুটতে কুটতে মাসিমারও কান ওইদিকে। এমনকী কেষ্টদাও কাজ করতে করতে কান খাড়া রেখে খবর শুনছে। সারা বাড়িটা হঠাৎই যেন থমথমে হয়ে গেছে। দাঙ্গা কি এতই আতঙ্কময়?
তাই একফাঁকে স্যারকে একান্তে পেয়ে কানাই জিজ্ঞেস করে— ‘স্যার, রায়ট কী গো?’
—‘রায়ট হল দু-দল মানুষের মধ্যে মারামারি, কাটাকাটি।’
—‘তাহলে রায়ট কি যুদ্ধ?’ কানাইয়ের এই সরল প্রশ্নের সঠিক জবাব কি দেবে তা জানা নেই রজনীর।
তবু সে বলে— ‘না যুদ্ধ নয়। কোনো দেশের মানুষের ভেতরটা খুব খারাপ হয়ে গেলে তখন রায়ট হয়। বিনা কারণে তখন মানুষ মানুষকে মারে।’
কানাই কী বুঝল তা সেইই জানে। রজনীও তার মনের ভেতরের নাগাল পেল না।
.
দুপুরবেলা ছাদে উঠে এল সবাই। দূরে দূরে কালো ধোঁওয়া উঠছে আকাশে। হয়তো কোথাও আগুন লাগানো হয়েছে। একটুপরেই ঢং-ঢং করে ঘণ্টা বাজিয়ে সামনের রাস্তা দিয়ে ছুটে গেল একটা দমকল। তার পিছু পিছু আরেকটা।
আবার একটু পরেই শুনশান রাস্তা দিয়ে ছুটে এল একটা ট্রাক। তাতে একদল লোক। হাতে তাদের লোহার রড, লাঠি। খোলা তরোয়াল উঁচিয়ে তারা চিৎকার করে বলছে— ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান।’ আর তার সঙ্গে সঙ্গেই একটা ইঁট এসে লাগল তাদের বাড়ির বন্ধ দরজায়।
তারা যেতে না যেতেই পেছন পেছন ছুটে এল একটা জিপ আর তারও পেছনে এক ট্রাক ভরতি লোক। জিপের চালকের পাশের আসনে বসা সাদা শার্ট আর ধুতি পরা একজন পাগড়ি ছাড়া শিখ। তার হাতে একটা রিভলভার।
মেসোমশাই ফিসফিস করে রজনীকে বললেন— ‘ওই দেখ গোপাল পাঁঠা। ওই যে শিখের মতো গালে দাড়ি আর মাথায় ঝুঁটি বাঁধা।’
পেছনের ট্রাকের ছেলেরাও সশস্ত্র। তাদের হাতে ছোরা, বড়ো চপার, লোহার রড এমনকী পিস্তলও। ছাদের সবাই বুঝতে পারে যে সামনে চলে যাওয়া ট্রাকটাকে ধাওয়া করে চলেছে গোপালের দলবল।
তারা চলে যেতেই মেসোমশাই কেষ্টদাকে বললেন— ‘কেষ্ট, একটা তোলা উনুন ছাদে এনে তাতে গরম জল হাঁড়িতে করে ফুটিয়ে রাখবি। কেউ দরজা ভাঙতে এলে ওপর থেকে গরম জল ঢালবি।’
তারপরে মাসিমার উদ্দেশ্যে বললেন— ‘শোনো, গোপাল যখন মাঠে নেমেছে, তখন বুঝতে হবে অবস্থা বেশ গুরুতর। তাই আমি ঠিক করেছি যে, আজ আমি, রজনী আর কেষ্ট ছাদে পাহারায় থাকব সারারাত। আর কানাই নীচে তোমার কাছে শোবে।’
থতমত খাওয়া মাসিমা কানাইকে আঁকড়ে ধরে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেন শুধু।
রজনী বলে— ‘মেসোমশাই, একটা কথা বলব?’
—‘বল।’
—‘রাতে বরং আমি আর কেষ্টদাই ছাদে থাকব। আপনি রেস্ট নিন। এই বয়সে রাতজাগার ধকল নেওয়া উচিত হবে না। আমরা দু-জন তো আছিই। আপনি চিন্তা করবেন না।’
অনেক বোঝানোর পরে মেসোমশাই রাজি হলেন।
.
সন্ধের মুখেই ছাদে তোলা উনুন জ্বালিয়ে কেষ্টদা জল চাপিয়ে রাখল হাঁড়িতে। এদিকে নীচের ঘরে মেসোমশাই রেডিয়োর খবর শুনতে শুনতে বললেন— ‘বুঝলে, অবস্থা ক্রমে ক্রমে আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। কলকাতার আশপাশের অঞ্চলেও রায়ট শুরু হয়েছে। এখন অবস্থা আয়ত্তে থাকলে হয়।’
রজনী বলল— ‘পুলিশ কোনো অ্যাকশন নিচ্ছে না কেন?’
—‘আরে, পুলিশ তো সরকারের হাতের পুতুল। তাদের যেমন চালানো হবে, তেমন চলবে। তা ছাড়া এতবড়ো শহরে কত গলিঘুঁজি। সেখানে পুলিশ হয়তো ঢুকতেই পারবে না। এখন দরকার… আরে আরে। দাঁড়াও, দাঁড়াও, শোনো রেডিয়োতে কী বলছে।’
রেডিয়ো থেকে যা ভেসে আসে তার সারমর্ম হল এই যে— অবস্থা আয়ত্তের বাইরে চলে গেছে বুঝতে পেরে সন্ধে ছ-টা থেকে সারা শহরে কার্ফু জারি করা হচ্ছে। প্রধান প্রধান রাস্তাগুলোয় রাত আটটা থেকে নামানো হচ্ছে মিলিটারি।
—‘এবার তাহলে অবস্থা আয়ত্তে আসবে, কি বলেন মেসোমশাই?’
—‘আরে বাবা, পুলিশের কাছ থেকে খবর পেলে তবেই না মিলিটারি অ্যাকশন নেবে। মিলিটারি তো শুধু মেন রোডে টহল দেবে। কিন্তু অলিগলিতে? আর পুলিশ তো এখন পলিটিক্যাল পাপেট।’
ঘণ্টাখানেক পরেই রাস্তায় শোনা যায় মাইক নিয়ে পুলিশের গাড়ি ‘কার্ফু’র হাঁক দিচ্ছে। এদিকে সন্ধে ঘনিয়ে আসছে। কার্ফুর ঘোষণা শুনে সবাই পড়িমড়ি করে ছাদে ওঠে। পুলিশের গাড়ি চলে যেতেই সবার নজর পড়ে দূরের দিকে। দেখা যায় সেখানে আকাশ লাল। কোথাও কোনো বস্তি, দোকান বা কারখানায় আগুন লাগানো হয়েছে বোধ হয়। দূর থেকে ভেসে আসছে কখনো ‘আল্লা হু আকবর’ আবার কখনো বা ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি। মাঝেমধ্যে শোনা যাচ্ছে বোমা আর গুলির আওয়াজও।
রাত দশটা নাগাদ খাওয়া-দাওয়া শেষ হতেই সবাই আবার ছাদের ওপরে। কিন্তু অবস্থা পালটায়নি। কার্ফু বা মিলিটারি টহলের তোয়াক্কা না করেই দাঙ্গা চলছে শহরে।
খানিকক্ষণ এসব দেখে মেসোমশাই আর মাসিমা কানাইকে নিয়ে চলে গেলেন নীচে। রজনী আর কেষ্টদা রইল ছাদে। শুধু রজনীর সঙ্গী এখন তার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ।
কানাই সারাটা দিন খুব একটা কথা বলেনি। কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছে ছেলেটা। তবে রজনীর দেওয়া ‘রায়ট’এর উত্তর সে ঠিকমতো বুঝতে পারেনি। তাই এখন বিছানায় শুয়ে সে মাসিমাকে প্রশ্ন করে— ‘হ্যাঁ গো ঠাম্মি, রায়ট কী গো?’
—‘রায়ট মানে হল দাঙ্গা। এখন হিন্দু-মুসলমানে দাঙ্গা লেগে গেছে।’
—‘কই, আমাদের গ্রামে তো এমন হয় না। সেখানেও তো কত মুসলমান আর হিন্দু থাকে।’
মাসিমা এর কী উত্তর দেবেন ভেবে পান না। তাই চুপ করে থেকে কানাইয়ের মাথার চুলে আঙুল চালাতে থাকেন যাতে ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়ে।
কানাই আবারও প্রশ্ন করে— ‘এই দাঙ্গা কি স্বাধীনতা পাবার জন্যে হচ্ছে?’
—‘হয়তো হবে; আবার হয়তো বা না। আবার দেশটা ভাঙার জন্যেও হতে পারে।’
কানাই ঠিক বুঝতে পারে না তার ঠাম্মির কথা। বড্ডো জটিল এসব। তাই সে চুপচাপ পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে।
.
রজনীর কথামতো ছাদের চিলেকোঠার ঘরে কেষ্টদা শুতে চলে যায়। তেমন হলে রজনী তাকে ডেকে দেবে বলেছে। আর রজনী? সে একটা লোহার তারের তৈরি চেয়ারে বসে থাকে ছাদের কোমর সমান উঁচু পাঁচিলে হাতের উলটোপিঠে থুতনিতে ভর রেখে।… এদিকে সময় বয়ে চলে নিজের গতিতে।
প্রায় ঘণ্টাদেড়েক পরে একটা মিলিটারি গাড়ি চলে গেল বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে। তাদের হাতে বেয়নেট লাগানো রাইফেল। তারা চলে যেতে বালতিতে রাখা খানিকটা জল নিয়ে হাঁড়িতে ঢেলে দেয় সে। কমজোরী আঁচে ফুটতে ফুটতে হাঁড়ির জল বেশ খানিকটা কমে গিয়েছিল। একবার চিলেকোঠার ঘরে উঁকি দেয়। সারাদিন খাটাখাটুনির পরে অঘোরে ঘুমোচ্ছে কেষ্টদা। তাই সে আবার চেয়ারে এসে বসে। ব্যাগের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে তিনটে লোডেড রিভলভারের অস্তিত্ব ঠাহর করে নেয়। খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে হাতের ঘড়িতে দেখে রাত পৌনে একটা।
দূর থেকে এখনও মাঝেমধ্যে ভেসে আসছে দলবাঁধা মানুষের চিৎকার। উন্মত্ততার চিৎকার, হিংস্রতার চিৎকার, দেশ ভাঙার চিৎকার। কিন্তু কী করবে সে এই মারণ সময়ে? দেশভাঙার কুটিল খেলায় মত্ত মানুষের কাছে, স্বার্থপর রাজনীতির কাছে সে যে বড়োই নগণ্য।
কোথায় মানুষ চাইবে এদেশ থেকে ব্রিটিশ শাসকদের তাড়াতে, তা নয়, এখন তারা মেতেছে আত্মধ্বংসের সর্বনাশা খেলায়। হ্যাঁ, তার হয়তো কিছু বিশেষ ক্ষমতা আছে; কিন্তু সে তো অতিমানব নয়। আর যদিও বা সে অতিমানবও হত, তাহলেও এই রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষীদের কাছে সে অসহায়ই হয়ে থাকত। পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো ক্ষমতা হল রাজনৈতিক ক্ষমতা, যার কাছে অতিমানবিক ক্ষমতাও তুচ্ছ হয়ে যায়।
এইসব ভাবতে ভাবতেই তার চোখদুটো লেগে এসেছিল। হঠাৎই একটা শোরগোলে তার তন্দ্রা গেল ভেঙে। অনেক মানুষের চিৎকার ভেসে আসছে তাদের বাড়িরই কাছাকাছি রাস্তা থেকে। পাঁচিলের আড়াল থেকে দেখল তাদের বাড়ি আর মণ্টুর চায়ের দোকানের মাঝামাঝি জায়গায় দুটো লোককে মাটিতে ফেলে জনা পাঁচ-ছয়েক লোক নির্দয়ভাবে পেটাচ্ছে। মুষলের মতো আছড়ে পড়ছে লোহার রড; রাস্তার ম্লান আলোতেও ঝলসে উঠছে চপারের চওড়া ব্লেড। আর্ত মরণ-চিৎকার আর পাশবিক উন্মত্ততার গর্জন ফুঁড়ে ফেলছে কলকাতার রাতের ঘুমের শান্তিকে। নাঃ, এই গণ-পাশবিকতা সহ্য করা যায় না। নিজের অজান্তেই তার হাত ঢুকে যায় ব্যাগের মধ্যে। টার্গেট নাগালেই। কিন্তু…।
কেষ্টদা ঘুম ভেঙে উঠে মগে করে ফুটন্ত জল ছুঁড়তে শুরু করেছে। কিন্তু সেই জল কি আর অতদূর যায়! এদিকে রাস্তার চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেছে নীচের সবারও। তারা তিনজনেই উঠে এসেছে ছাদে। মাসিমা কানাইকে চেপে ধরে আছেন আর সন্ত্রস্ত কানাই তার ঠাম্মিকে আঁকড়ে ধরে আঁচলের তলা থেকে দেখতে চেষ্টা করছে এই নরমেধের খেলা। কিন্তু ছাদের পাঁচিলটা যে বাধা।
এমন সময় বোমার আওয়াজ। বিকট শব্দ। কেঁপে উঠল পাড়া। আর কী যেন একটা ছিটকে এসে লাগল চিলেকোঠার জানলার কাঠে। বোধ হয় বোমার স্প্লিন্টার। যে লোকগুলো এতক্ষণ মারছিল, তাদের দু-জন ছিটকে পড়ল মাটিতে। কাতরাতে লাগল। বাকিরা পালাতে গেলে পেছন থেকে ধাওয়া করে এল একটা ট্যাক্সি। তাদের বাড়ি পার হয়ে একটু দূরেই ট্যাক্সির লোকেরা ধরে ফেলল পলায়মান লোকগুলোকে। তারপরে মিনিট পাঁচেক ধরে চলল হত্যালীলা। হত্যাকারীদের নৃশংস গর্জন আর মৃত্যুর শেষ আর্তনাদ ফালা ফালা করে দিচ্ছে মানবিকতা। কী ভয়ানক! কী সাংঘাতিক! রজনীর মতো শীতল স্নায়ুর মানুষকেও স্তব্ধ করে দিল সেই নারকীয় দৃশ্য। তারপরে আর ঠিক দু-তিন মিনিট। ট্যাক্সিটা মিলিয়ে গেল দূরে। শুধু তাদের বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে পড়ে রইল ছিন্নভিন্ন কতকগুলো মানুষের শরীর, যারা এখন শব হয়ে গেছে।
নিজে একটু ধাতস্থ হতেই রজনী দেখল মেসোমশাই থরথর করে কাঁপছেন। সে তাড়াতাড়ি তাঁকে ধরে বসিয়ে দিল চেয়ারটায়। অন্যদিকে মাসিমা আর কানাই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছে। ভয়ার্ত চাপা কান্নায় কেঁপে কেঁপে উঠছে তাদের শরীর। তাই দেখে রজনী কেষ্টদাকে বলল— ‘কেষ্টদা তুমি ওদের নীচে নিয়ে যাও আর পারলে একটু কফি বানাও সবার জন্যে। এখন ওটার খুবই দরকার।’
কেষ্টদা মাসিমা আর কানাইকে নিয়ে এগিয়ে গেল নীচে নামার সিঁড়ির দিকে। সিঁড়ির মুখ পর্যন্ত গিয়ে হঠাৎই পাগলের মতো ছুটে এসে হাঁড়ির ফুটন্ত জলে মগ ডুবিয়ে একমগ জল নিয়ে ছুটে গেল পাঁচিলের কাছে। তারপর ব্যর্থ আক্রোশে ‘মর শালা’ বলে চিৎকার করে সেই জলটা ছুঁড়ে দিল রাস্তার ওপরে। পাছে আরও কিছু করে বসে, এই ভয়ে রজনী তাড়াতাড়ি গিয়ে জড়িয়ে ধরল তাকে। টেনে নিয়ে গেল সিঁড়ির কাছে। তখনও কেষ্টদা হাঁফাচ্ছে এক অব্যক্ত আক্রোশে।
কেষ্টদাকে শান্ত করে তাদের তিনজনকে রজনী পাঠিয়ে দিল নীচে আর তারপরে এগিয়ে গেল মেসোমশাইয়ের দিকে। এই অতি প্রৌঢ় মানুষটার মাথা ঝুলে পড়েছে সামনে। হয়তো এই মানুষটা এত কাছ থেকে এমন হত্যালীলা কখনো দেখেননি। তাই প্রচণ্ড শকে তাঁর এই অবস্থা। রজনী তাঁর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল— ‘মেসোমশাই, একটু জল খাবেন?’
—‘হ্যাঁ, দাও।’
চিলেকুঠুরিতে রাখা কলসী থেকে একগ্লাস জল নিয়ে মেসোমশাইকে দিতে উনি এক চুমুকে জলটা শেষ করে ফেললেন। তারপরে রজনীর দিকে বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুধু বললেন— ‘ওরা কেন এমন করে বল তো?’
