মে, ১৯৪৫ – কিডন্যাপ, অদ্ভুত ছদ্মবেশ, পুলিশের অভিযান আর আঙ থিহার লম্বা হাত
কানাই এখন স্কুল আর হস্টেলে সুন্দরভাবে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। এতে খুব খুশি রজনী। আর ক-দিন পরেই তো গরমের ছুটি পড়বে। ইচ্ছে আছে তখন হপ্তাখানেক সে কানাইকে নিয়ে গ্রামে গিয়ে কাটাবে। মেসোমশাইকে বলেওছে সে এইকথা। এইসব কথা ভাবতে ভাবতেই সিঁড়ি দিয়ে নেমে সদর দরজার দিকে এগোতে যাচ্ছিল সে অফিস যাবে বলে।
এমন সময় মাসিমার গলা— ‘বলি ও রজনী, অফিস বেরোচ্ছ নাকি?’
—‘হ্যাঁ মাসিমা।’
—‘এই দেখ, পিছু ডেকে ফেললাম। একটু দাঁড়িয়ে যাও বাবা।’
রজনী বলল— ‘কিছু বলবেন মাসিমা?’
—‘হ্যাঁ, বলব বলেই তো ডাকলাম। বলি আমার গোঠের কানু কেমন আছে? স্কুলে আর হস্টেলে মানিয়ে নিতে পেরেছে তো? কয়েকমাস তো হয়ে গেল।’
—‘সে আর বলতে। সে তো এখন রোজ বিকেলে হস্টেলের ছেলেদের তাইকোন্ডো শেখাচ্ছে। স্কুলের গেমস টিচারও এখন মাঝে মাঝে ওকে দিয়ে স্কুলের ছেলেদের তাইকোন্ডো শেখায়। তাই তার তো এখন স্কুলে বেশ নামডাক।’
—‘তা নামডাক তো হবেই বাবা। ও যে আমার গোঠের কানু। তা রজনী, আর ক-দিন পরেই তো ওর গরমের ছুটি পড়বে। তাই অসময় হলেও ওর জন্যে একটু পিঠে-পুলি করব বলে ভাবছিলাম। সেইসঙ্গে একটু আম, জাম, জামরুল। তাই বলছিলাম কী, যেদিন ছুটি পড়বে সেদিন তুমি যদি অফিসফেরতা ওকে একটু নিয়ে আসতে পার…। তারপরে তাকে না হয় দেশের বাড়িতে নিয়ে যেও। তার মাও তো চায় ছেলেকে টানা ক-দিনের জন্যে কাছে পেতে, তাকে ভালোমন্দ খাওয়াতে তাই না?’
রজনী তো জানে কানাইদের বাড়ির অবস্থা কেমন। সেখানে ডাল-ভাতের সঙ্গে গুগলির ঝাল আর গরমের সময়ে বড়োজোর খালছেঁচা খলসে, পুঁটি বা মৌরলা জুটতে পারে। তাও সবদিন জুটবে কিনা সন্দেহ; আর হস্টেলের মতো মাছ, মাংস বা ডিম তো সেখানে স্বপ্ন।
তাই সে বলে— ‘আচ্ছা মাসিমা, ছুটি পড়লে দেশের বাড়ি যাবার আগে নিশ্চয়ই ও এখানে ক-দিন থাকবে।’
—‘তাইই এনো বাবা। মাত্র এই ক-দিনেই ছেলেটার ওপরে কেমন যেন মায়া পড়ে গেছে। তা হ্যাঁ গো রজনী, তুমি কি দাড়ি রাখছ নাকি?’
দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে রজনী অল্প হেসে বলে— ‘এইই মানে…।’
—‘না না দাড়ি টাড়ি কেটে ফেল। কেমন যেন বৈরিগি বৈরিগি লাগে।’
অস্বস্তিকর পরিস্থিতি এড়াতে হাতের ঘড়ি দেখে সে বলে— ‘তাহলে আমি আসি মাসিমা, দেরি হয়ে যাচ্ছে। কেষ্টদা, ও কেষ্টদা, দরজাটা বন্ধ করে দিও।’
—‘হ্যাঁ, এসো বাবা। সাবধানে যেও। দুগগা দুগগা।’ কপালে হাত ঠেকান মাসিমা।
আসলে পুলিনের মৃত্যুতে রজনী একটা জোর ধাক্কা পেয়েছিল। সেটা কাটিয়ে উঠে একটু স্বাভাবিক হতে না হতেই ঘটে গেল পিটারের ঘটনাটা। তারপর থেকেই তার আর নিজের যত্ন নিতে তেমন ভালো লাগে না। সেজন্যেই তার গালের দাড়িও বড়ো হয়ে গেছে। এখন সে শুধু কানাইটাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। তাকে গড়ে তুলতে হবে যে ভালো করে।
.
মিউজিয়মে স্টাফেদের ঢোকার রাস্তা পাশের গলি দিয়ে। রজনী সেই পথেই যায় আসে। আজও সেখান দিয়েই ঢুকছে সে। কিন্তু খেয়াল করল না যে লোকের ভিড়ে মিশে দূরে দাঁড়িয়ে শ্যামাদাস আর তার সঙ্গে তিনজন লোক তাকে নজরে রাখছে।
রজনী ঢুকে যাবার পরেই শ্যামাদাসের তিন সঙ্গীর একজন জাদুঘরের গলিমুখের দরজায় আর একজন মেন গেটের সামনে পাহারায় রইল। বাকি আরেকজন কাউন্টার থেকে টিকিট কিনে ঢুকে গেল জাদুঘরের ভেতরে। কাজ হয়ে গেছে বুঝে শ্যামাদাস ফিরে গেল অন্যদিকে। হাতের ঘড়িটা দেখল একবার। হ্যাঁ, যথেষ্টই সময় আছে হাতে।
.
হস্টেল থেকে তাইকোন্ডোর গাউন পরে কানাই তার দলবল নিয়ে চলেছে রাস্তাপারের প্রেসিডেন্সি কলেজের মাঠের দিকে। কানাই একটু এগিয়ে রাস্তাটা পার হতেই একটা ট্রাম ঢুকে পড়ল তার আর বন্ধুদের মাঝখানে। ফলে ট্রামের একপারে কানাই আর অন্যপারে রইল তার বন্ধুদের দল। এমনসময় হঠাৎই কে যেন তার মুখে কিছু একটা চেপে ধরল। তারপরে আর কিছু মনে নেই তার। এদিকে ট্রামটা চলে যেতেই তার বন্ধুরা দেখতে পেল দু-জন লোক ধরাধরি করে কানাইকে একটা গাড়ির পেছনের সিটে তুলছে। তারা হই হই করে দৌড়ে যায়; কিন্তু ততক্ষণে গাড়িটা এগিয়ে গেছে। তাদের চিৎকারে সচকিত হয়ে পথচলতি দু-চারজন মানুষও দৌড়ে যায় তাদের সঙ্গে। হঠাৎ কী ঘটে গেল তা বুঝে ওঠার পরেই সকলে খেয়াল করল যে তারা গাড়িটার নম্বরটাই দেখতেই ভুলে গেছে। শুধু তাদের মনে আছে যে, গাড়িটা ছিল গাঢ় বটল গ্রিন রঙের একটা মরিস গাড়ি।
খানিকক্ষণ আলোচনার পরে সবাই বুঝতে পারল যে— যেকোনো কারণেই হোক কানাই দত্তকে অপহরণ করা হয়েছে। কিন্তু কেন? কিইই বা উদ্দেশ্য? কারাই বা এটা করল? কিন্তু জল্পনা করে কী হবে? হস্টেলের সুপারিনটেন্ডেন্টকে খবর করাই আশু কর্তব্য। উনিই তো হস্টেলের দায়িত্বে। ছেলের দলের সঙ্গেই পাড়ারই তিন-চারজন ছুটল হস্টেলের দিকে।
এদিকে বটল গ্রিন রঙের মরিস গাড়িটা ততক্ষণে পৌছে গেছে প্রিন্সেপ ঘাটের কাছে একটা ফাঁকা জায়গায়। সেখানে দাঁড়িয়ে একটা অ্যাম্বুল্যান্স। গাড়ি থেকে নামিয়ে তাতেই তোলা হল কানাইকে। রাস্তা হুটারের আওয়াজে কাঁপিয়ে সেটা ছুটল সোজা আর মরিস গাড়িটা উলটোদিকে মুখ ফিরিয়ে চলল কাছেই খিদিরপুরের দিকে। ওখানে অনেক গ্যারেজ আছে। সেখানে একবার গাড়িটা ঢুকিয়ে দিতে পারলেই হল। পনেরো মিনিটেই তাতে লেগে যাবে ওরিজিনাল নম্বর প্লেট।
স্ট্রান্ড রোড ধরে বেশ খানিকটা এগিয়ে ডানদিকে মোড় নিয়ে অ্যাম্বুল্যান্স চিতপুর রোড ধরে এগিয়ে যেতে যেতে বন্ধ করে দিল তার হুটার। তারপর মিনিট দশেকের মধ্যেই পৌঁছে গেল বাগবাজার ঘাটের থেকে প্রায় তিনশো ফুট দূরে গঙ্গার গা-ঘেঁষা একটা ছোটো বাংলো বাড়ির সামনে। এ-বাড়ির পেছনদিকের দেওয়ালে গঙ্গার জল জোয়ারের সময় এলে ছলাৎ ছলাৎ করে আছড়ে পড়ে। সেখানে ধরাধরি করে অচেতন কানাইকে নামিয়ে ঢোকানো হল বাড়ির ভেতরে। অ্যাম্বুল্যান্স থেকে শ্যামাদাস ছাড়াও আরও চারজন নেমে যেতেই উলটোমুখে ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল সেটা। আর তার মিনিট পাঁচেক পরেই বাড়িটা থেকে প্রায় গজ বিশেক দূরে এসে দাঁড়াল একটা ট্রাক। কাজ সারার পরে এটাই তাদের পালিয়ে যাবার ব্যবস্থা।
নীচের তলার একটা ঘরের বিছানায় শোয়ানো হল কানাইকে। ওই ঘরে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল একজন। শ্যামাদাস তাকে জিজ্ঞেস করল— ‘যাদব, এর জ্ঞান ফিরতে কতক্ষণ লাগবে?’
যাদবই এখানে শ্যামাদাসের রক্ষাকর্তা। সে ঘরে উপস্থিত তার তিন সাঙ্গকে বলল— ‘অ্যাই শুন, তু তিনো বাহর যা কর তিনো সাইড মে আপনা আপনা পজিশন লে লে।’
তারা বাইরে বেরিয়ে যেতে সে শ্যামাদাসকে বলল— ‘এক ঘন্টে কী অন্দর বচ্চা সেন্স মে আ জায়েগা।’
—‘তাহলে তো রজনী আসার আগেই এর জ্ঞান ফিরে যাবে। ওরা দু-জনেই কিন্তু তাইকোন্ডো জানে।’
একটা সোফায় বসতে বসতে যাদব নিজের কোমরে হাত চাপড়ে বলল— ‘আরে বাবু, ছোড়ো ও ফোরেন কুস্তি কী বাত। ইয়ে তো হ্যায়। ইতনা ঘাবড়াচ্ছেন কেনো? অগর বচ্চা কা হোশ ভি আয়ে তো উসে থোড়া আফিম খিলা দেঙ্গে।’
—‘কিন্তু ডন বলেছেন বাচ্চাটার যেন কোনো ক্ষতি না হয়।’
—‘আরে হামি জানে সোব। বাচ্চা হোশ মে আনেকা বাদ সহি ডোজ হি দেঙ্গে জিসসে বাচ্চা কো কোই নুকসান না হোয় অউর ও বেহোশ ভি রহে। আপ আপনা কাম তো করে। আচ্ছা সে শুনল বাবু, বস নে মুঝ পর ভরোসা করতে হ্যায়, ইসিলিয়ে ইয়ে কাম মুঝ পর সোঁপা গয়া। সমঝে?’ লোকটার স্বরটা এবার রূঢ় শোনায়।
এখন শ্যামাদাস বুঝতে পারে যে— এখন থেকে এদেরই হুকুম পালন করে যেতে হবে তাকে। ইতিমধ্যে খিদিরপুরের গোপন ডেরা থেকে সে যে একটা রিভলভার কিনেছে, যাদব বোধ হয় সেটা জানে না। আবার পরক্ষণেই মনে হয় যে ডনের লোকেরা রজনী আর তার ওপরে তো সর্বক্ষণই নজর রাখছে। তাই তার কাছে রিভলভার আছে জেনেও হয়তো তারা তাকে ছেড়ে রেখে দিয়েছে অপারেশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত। যাকগে, যা হবার তা হবেই। সময় যখন আসবে তখন দেখা যাবে। হয় এসপার নয় ওসপার। মরতে হলে সে মেরেই মরবে। তবে একটা অস্ত্র সঙ্গে থাকলে মনে সাহস থাকে।
এমন সময় যাদব বলল— ‘ক্যা শ্যামাবাবু, রজনীকো ফোন নেহি করেঙ্গে ক্যা?’
এবার রজনীকে ফোন করে জানাতে হবে কানাইয়ের খবর। সে এগিয়ে যায় ঘরের কোণে রাখা ফোনটার কাছে। রিসিভার তুলেই বুঝতে পারে যে পিটার মারা গেলেও ফোনটার লাইন এখনও কাটা হয়নি। চালু আছে সেটা। সে ডায়াল ঘোরাতে থাকে একটাই আশা নিয়ে যে, রজনীকে নিকেশ করতে পারলেই সে ডনের কাছে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করতে পারবে।
একটু পরেই শুনতে পায়— রিং হচ্ছে ওদিকে।
.
পৌনে পাঁচটা বাজতে চলল। এবার মোটামুটি কাজ শেষ করে টেবিলের কাগজপত্র গুছিয়ে রাখছে রজনী। এমন সময় ড্যানীবাবুর টেবিলের ফোনটা বেজে উঠল। ততক্ষণে নিজের ব্যাগটা টেবিলের ওপরে রেখে হাতমুখ ধুতে যাবে বলে রেডি হচ্ছে রজনী।
তখুনি ড্যানীবাবু বলে উঠলেন— ‘রজনী, তোমার ফোন।’
ফোনটা কানে তুলে ‘হ্যালো, রজনী বলছি’ বলেই চুপ করে যায়। ফোনের ওপার থেকে যে কথাগুলো ভেসে আসছে তা শুনে স্তম্ভিত হয়ে যায় সে। —‘শোনো রজনী। তোমার কানাইকে কিডন্যাপ করা হয়েছে। যদি তার দেখা পেতে চাও, তাহলে মেন গেটের সামনে যে হলদে পাগড়ি পরা লোকটা দাঁড়িয়ে আছে তার সঙ্গে দেখা কর। আর পুলিশে খবর দেওয়ার মতো ভুল কর না। নইলে…।’
—‘ঠিক আছে। ঠিক আছে। কিন্তু…মানে…ওর যেন কোনো ক্ষতি না হয়…।’ উত্তরের প্রত্যাশায় থাকে রজনী। কিন্তু ওপার থেকে কোনো কথা ভেসে আসছে না। তবে লাইন কাটেনি এখনও। হঠাৎই তার কানে ভেসে আসে একটা স্টিমারের ভোঁ। আর তার একটু পরেই ‘‘কট্’’ করে কেটে যায় ফোনটা। কয়েকবার ‘‘হ্যালো’’ ‘‘হ্যালো’’ বলে জবাবের আশা করেও কোনো উত্তর পায় না। তাই ফোনটা রেখে নিজের টেবিলে এসে বসে।
টেবিলে কনুই রেখে দু-হাতের তালুতে মাথার রগ চেপে ধরে সে। ভয়ংকর এক উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছে তার ভেতরটা। এ কী সর্বনাশ হয়ে গেল তার। সে না পৌঁছতে পারলে কানাইকে হয়তো মেরেই ফেলবে ওরা। দু-দু-জন প্রিয় মানুষকে ইতিমধ্যেই বলি হতে হয়েছে তার জন্যে। পুলিন আর সুরেশ কাকার মুখ ভেসে আসে তার মনে। আর এখন কানাই। তার শিষ্য, নাকি তার সন্তানসম নির্দোষ বাচ্চাটা বলি হতে যাচ্ছে? ভয়ে শিউরে ওঠে তার মন।
কিন্তু না, এইসময়ে সর্বনাশের আতঙ্ককে প্রশ্রয় দিলে হবে না। বরং ঠান্ডা মাথায় মোকাবিলা করতে হবে পরিস্থিতির। টেবিলে রাখা গ্লাসের জলটা ঢকঢক করে খেয়ে চেয়ারের পেছনে মাথাটা হেলিয়ে দেয়। সারা শরীরটা ঢিলে দিয়ে বেশ কয়েকবার বুকভরা শ্বাস নেয় সে। মিনিট তিনেকের মধ্যেই শরীর আর মন খানিকটা স্বাভাবিক হয় তার। এবারে ভাবতে হবে কীভাবে কানাইকে উদ্ধার করা যায়।
তবে রজনীর মনে হয় টেলিফোনে যার গলা সে শুনল, সেটা কেমন যেন চেনা চেনা। এই কণ্ঠস্বর সে আগেও শুনেছে। কিন্তু কে সে?… একটু ভাবতেই মনে পড়ে যায় তার নাম। ওই গলা শ্যামাদাসের। তার মানে, আহত শ্যামাদাসই কিডন্যাপ করেছে তার কানাইকে। কিন্তু তার একার পক্ষে কানাইকে কিডন্যাপ করা সম্ভব নয়। নিশ্চয়ই আরও লোক আছে এর পেছনে। তারা কানাইয়ের গতিবিধির ওপরে নজর রেখেছিল, আর তাই আজ মওকা বুঝে…। তাহলে সেও নিশ্চয়ই তাদের নজরে আছে। এদিকে পুলিশে খবর দিলেও কানাইয়ের বিপদ হবে বলে হুমকি দিয়েছে শ্যামাদাস। এখন এখান থেকে বেরোতে গেলেও সে শ্যামাদাসের লোকের নজরে থাকবে। কিন্তু বেরোতে যে তাকে হবেই। হলদে পাগড়ির সঙ্গে দেখা সে করবেই না। তাহলেই সে ওদের মুঠোয় পড়ে যাবে। তাই অন্য কোনো উপায় তাকে নিতেই হবে। ভাবতে হবে কী উপায়ে ওদের নজর এড়িয়ে বেরোনো যায় এখান থেকে।… একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবতেই প্ল্যানটা হঠাৎই ধরা দেয় তাকে।
—‘কী হল রজনী, বসে রইলে যে? বাড়ি যাবে না?’ জিজ্ঞেস করলেন ড্যানীবাবু।
—‘হ্যাঁ স্যার, এই বেরোচ্ছি।’
—‘তা টেলিফোন পেয়ে অমন চুপচাপ বসেছিলে কেন? কোনো খারাপ খবর নাকি?’
—‘হ্যাঁ… মানে না স্যার। কানাইয়ের জন্যে হস্টেলে মিষ্টি নিয়ে যেতে হবে। মাসিমার অর্ডার।’
—‘ও, তাই বলো। তা কলেজ স্ট্রিটেই ভালো মিষ্টির দোকান পেয়ে যাবে। আচ্ছা তবে এসো। সন্ধেবেলাটা গুরু-শিষ্য মিলে আনন্দে কাটিও।’
—‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।’
—‘ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম।’
টেবিল থেকে সবার অলক্ষ্যে একটা সাদা কাগজ ব্যাগে ঢুকিয়ে ব্যাগটা নিয়ে টয়লেটের দিকে যেতে যেতে চারপাশে নজর রাখে রজনী। এমনও তো হতে পারে যে দর্শকদের সঙ্গে ওরা ওদের লোক ঢুকিয়ে দিয়েছে জাদুঘরে। কিন্তু না। এই ফ্লোরে কেউ তো নেই। এমনিতেই নীচে হাতেগোনা দু-চারজন দর্শক ঘোরাফেরা করছে। একটু পরেই তারাও বেরিয়ে যাবে।
টয়লেটের দিকে যেতে যেতে হঠাৎই তার নজর পড়ে পাশের ঘরে। জাদুঘরে তারই সহকর্মী সুদেব গুহর কালো ফ্রেমের চশমা আর চশমার বাক্সটা পড়ে আছে তার টেবিলে। মনে হয় চশমাটা খুলে রেখেই টয়লেটে গেছে সুদেব। অযাচিত সুযোগ একটা। তাই রজনী টুক করে ঢুকে পড়ে সেই ঘরে। কেউ নেই। সবাই বেরিয়ে গেছে। চটপট সুদেবের চশমাটা তুলে নিয়ে ব্যাগে রাখে সে। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে টয়লেটের দিকে এগিয়ে যায়। পথে দেখা পায় সুদেবের। রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে সে ফিরছে নিজের ঘরে। সুদেব খেয়াল করেনি তাকে। রজনী তার পাশ কাটিয়ে টয়লেটে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দেয় ভেতর থেকে। পরনের জামা, প্যান্ট খুলে চালান করে দেয় ব্যাগে আর বের করে আনে ক্ষুরটা। পরনে থাকে শুধু টাইট হাফপ্যান্ট। বেসিনের কাছে গিয়ে জল দিয়ে ভালো করে চুল আর দাড়ি ভিজিয়ে বেসিনের পাশে রাখা হাত ধোওয়ার সাবান নিয়ে মাখায় চুলে আর দাড়িতে। তারপর চালাতে থাকে ক্ষুর। মিনিট সাতেকেই সব চুল আর দাড়ি উধাও। বেসিন থেকে সেগুলো তুলে নিয়ে ফেলে দেয় ময়লা ফেলার বাস্কেটে। ভয় তার একটাই। কাজ শেষ হবার আগেই কেউ না এসে দরজা খটখটায়। তাই দ্রুত হাতে ক্ষুরটা ব্যাগে রেখে বের করে আনে সুদেবের চশমা, সীসে বাঁধানো ল্যাসো আর তার কেনা সেই সস্তার চাদর। ল্যাসোটা কোমরে জড়িয়ে চোখে পরে নেয় চশমা। তারপরে লুকিয়ে আনা কাগজ ছিঁড়ে সরু করে পাকিয়ে লম্বা করে গুঁজে দেয় নীচের দু-চোয়ালের পাশে। ব্যাগের কাপড়ের হাতলে গিঁট বেঁধে সেটাকে ছোটো করে ঝুলিয়ে নেয় কাঁধে আর তারপরে গায়ে জড়িয়ে নেয় চাদরটা। ব্যাগটা ঢাকা পড়ে যায় চাদরের তলায়। তাড়াতাড়ি হাত চালিয়ে ব্যাগের জিনিসপত্র আরেকবার দেখে নেয় সে। ক্ষুর, পিটারের রিভলভার, গগলস, কাঁচের ছোটো শিশি আর রঙের কৌটো সব ঠিকঠাকই আছে। এবারে আয়না দেখে নিশ্চিন্ত হয় সে। না, আর তাকে রজনী বলে মনেই হচ্ছে না। হঠাৎই নজর পড়ে টয়লেটের কোণে রাখা মেথরের ময়লা ফেলার টিনের পাত্র আর খ্যাংরা ঝাঁটা। চটপট সেগুলো তুলে নিয়ে দরজা খুলে টয়লেটেরই লাগোয়া অন্য একটা সিঁড়ি দিয়ে নেমে যায় রজনী। তখন কেউ তাকে দেখলে এক প্রৌঢ় মেথর ছাড়া আর কিছুই ভাববে না।
বাইরে বেরিয়ে একটা বাঁকের পরেই ময়লা ফেলার ভ্যাট। সেখানেই ময়লা ফেলার পাত্র আর ঝাঁটাটা ফেলে দিয়ে দ্রুতপায়ে হাঁটতে থাকে। একটু পরেই চৌরঙ্গিতে উঠে একটা ট্যাক্সি থামায় সে। ট্যাক্সিওয়ালাকে বলে— ‘বাগবাজার ঘাট।’ সে একটা আন্দাজ লাগিয়েই বাগবাজার ঘাটে যেতে চাইছে। তাই একটু আগেই নেমে পরিস্থিতিটা যাচাই করে নিতে চায় সে।
.
সন্ধে ক্রমশ নেমে আসছে। নীচের ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে সিগারেট ধরায় শ্যামাদাস। এখান থেকে দূরের আধ-ভেজানো দরজার ফাঁক দিয়ে সে দেখতে পাচ্ছে যে ঘরের মধ্যে কানাই এখনও অচৈতন্য। কিন্তু বসেও তার শান্তি নেই। রজনী কখন, কীভাবে আসতে পারে সেটা নিয়েই সে চিন্তিত। আরও একটা ব্যাপার তার মাথায় ঘুরছে। বস, মানে, মনে হয় হরিশরণ, যাদবের ওপরে ভার দিয়েছে এখানকার সবকিছুর। কিন্তু তার অভিজ্ঞ চোখ বলছে— যাদবের হাবভাব তেমন সুবিধের নয়। সে বুঝতে পারে যে লোভে পড়ে বর্মায় ডনের ডেরায় যাওয়াটাই তার বড়ো ভুল হয়েছিল। ডন নিশ্চয়ই চাইবেন না যে তার মতো একজন ‘দ্য ভিন্টেজ’ এর কথা জেনে চোরাচালানে যুক্ত থাকুক। তা ছাড়া ডনের ছেলেকে তো সে নিজে বলেইছিল যে রজনী মিউজিয়মে কাজ করে। এমনকী তার লোকেদেরও সে রজনীকে চিনিয়ে দিয়েছিল। যারা এতবড়ো রাকেট চালায় তারা তো অনায়াসেই রজনীকে ট্র্যাক করে কলকাতারই কোথাও শেষ করে দিতে পারত। কিন্তু তারা সেটা না করে তাকে দিয়ে কানাইকে কিডন্যাপ করিয়ে রজনীকে এখানে আনাতে চাইছে। কিন্তু কেন? সিগারেটে টান দিতে দিতে শ্যামাদাসের মনে প্রশ্ন জাগে— ডন কি তাহলে তাকে আর রজনীকে একই জায়গায় এনে একসাথে শেষ করে দিতে চাইছে? সে কি তাহলে ডনের টোপ হয়ে গেছে?
তাই যদি হয়, তবে এখন এখান থেকে মুক্তি পেতে গেলে শুধুমাত্র একটাই রাস্তা খোলা আছে। সেই পথে হাঁটলে সে প্রাণে বেঁচে গেলেও তাকে হারাতে হবে অনেককিছু। এখন শুধু যদি তার ভাগ্য তাকে সাহায্য করে।
সিগারেটে শেষ টানটা মেরে অ্যাশট্রেতে চেপে নিভিয়ে দেয় শ্যামাদাস।
—‘জল…স্যার একটু জল দাও না…।’
খৈনি ডলতে ডলতে চমকে পেছনে তাকায় যাদব। শ্যামাদাসও উঠে পড়ে। হুঁশ আসছে কানাইয়ের। তাই তারা দু-জনেই উঠে গিয়ে দাঁড়ায় তার পাশে।
শ্যামাদাস বলে— ‘যাদব, ওর হুঁশ আসছে। আফিং চড়াও।’
—‘হাঁ, হাঁ, হামি আনছি। আপ দোশ মিনট সামলে রাখেন বাচ্চাকে।’
বলে যাদব বেরিয়ে যায় ট্রাক থেকে আফিংয়ের কৌটো আনতে। ওটা অ্যাম্বুল্যান্সে ছিল না। পরের গাড়িতে আনার কথা ছিল। তাড়াহুড়োয় সেটা আনার কথা ভুলে গেছে সে। তাই যাদব সেটা আনতে যায়। শ্যামাদাস ভাবতেও পারেনি যে এইরকম একটা অপ্রত্যাশিত সুযোগ জুটে যাবে তার কপালে। এখন এই সুযোগটাকেই কাজে লাগাতে হবে। কাজটা সারতে হবে যাদব ফেরার আগেই। তাই ফোনের দিকে এগিয়ে যায় সে।
.
সন্ধে নেমে গেছে। বাগবাজারের ঘাটের গঙ্গার জলে এখন টুকরো টুকরো টালমাটাল শুক্লা চতুর্দশীর চাঁদের ছবি। জোয়ার আসতে শুরু করেছে আর সেই হালকা হালকা ঢেউয়ের মাথায় চড়ে সেই ছবি আছড়ে পড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে রজনীর পায়ের ঠিক নীচের ধাপটায়। সন্ধে হয়ে গেছে বলে সে ছাড়া ঘাটে আর লোকজনও নেই। এখন একটা নৌকো পেলে হত। কারণ রজনী ভেবে দেখেছে যে— ওরা নিশ্চয়ই ভেবে রেখেছে রজনী স্থলপথে আসবে কানাইকে বাঁচাতে। সেকারণেই জলপথটা অরক্ষিত থাকার সম্ভাবনাই প্রবল। তাই সেই জলপথেই হানা দিতে চায় রজনী। এখন একটা খালি জেলে নৌকো বা ফেরি নৌকো পেলে বর্তে যায় সে। তারই খোঁজে আশেপাশে তাকায়। এদিক ওদিক দেখতে দেখতে ব্যাগের মধ্যে হাত ঢোকায়। বের করে আনে একটা ছোট্টো শিশি। তারপরে শিশির তরলটা ঢেলে নেয় হাতে। ছুঁড়ে ফেলে দেয় শিশিটা গঙ্গার জলে। ন্যাচারাল কালারের নেল পালিশটা ভালো করে দু-হাতের চেটোতে মেখে নেয়। নেল পালিশে থাকা স্পিরিটের গুণে গঙ্গার হাওয়ায় সেটা শুকিয়ে বসে যায় হাতের তালুতে। পালিশের পরতে ঢেকে যায় হাতের চেটোর আর আঙুলের খানাখন্দ।
আরে, ওই তো। ওই তো ঘাটের ডানপাশে তার আকাঙ্খিত জিনিসটা। সম্পূর্ণ অরক্ষিত একটা ছোটো নৌকো। কাদায় পোঁতা একটা নোঙরের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা। কথায় বলে— উদ্যোগী মানুষ ভাগ্যের সাহায্য পায়। এক্ষেত্রেও বুঝি তাইই ঘটল।
সিঁড়ির ধাপ বেয়ে ওপরে উঠে আসে সে। পাড় বরাবর গিয়ে কাদামাটি ভেঙে নেমে নৌকোটায় চড়ে বসে। তারপর একটা টানে উপড়ে নেয় নোঙরটা। সদ্য আসতে থাকা জোয়ারের ধাক্কায় পাড় থেকে দূরে সরে যায় সেটা। গা থেকে চাদর আর সুদেবের চশমাটা খুলে ঢুকিয়ে দেয় কাঁধের ব্যাগে। মুখ থেকে ফেলে দেয় নীচের চোয়ালে গোঁজা কাগজ আর নৌকোয় বসেই রঙের কৌটো থেকে মুখে, হাতে, পায়ে যতটা সম্ভব মেখে নেয় কালো রং; চোখে পরে নেয় গগলস। হাতের চেটোর কালি আর পায়ের কাদা ধুয়ে ফেলে গঙ্গার জলে আর তারপরে ছোটো দাঁড়টা দিয়ে বাইতে থাকে নৌকো।
মিনিট চারেক পরে একদল গাদাবোটের পাশ কাটিয়ে এগোতেই তার নজরে পড়ে একদম তার সামনে জলের ধার ঘেঁষা একটা বাংলো ধাঁচের বাড়ি। বাগবাজার ঘাট থেকে দূরত্বের হিসেব করলে মনে হয় ঠিক জায়গাতেই পৌঁছে গেছে সে। আশেপাশে তো আর কোনো পাকা বাড়ি নেই। তার মানে এটাই পিটারের বাংলো বাড়ি। গঙ্গার দিকে বাড়ির দুটো জানলা। তার একটাতে আলো জ্বলছে। তার মানে ভেতরে মানুষ আছে। তাই বাড়ির আড়ালে নৌকোটা নোঙর করে সে। এরপরে কাদা ভেঙে ওঠার পালা। সন্তর্পণে পাড়ের দিকে চোখ রেখে উঠতে থাকে রজনী। অর্ধেকের বেশি পথ কাদা ঠেলে শুকনো মাটিতে উঠতেই তার নজরে পড়ে একজন লোক দাঁড়িয়ে। রাস্তার দিকে মুখ করে সিগারেট ফুঁকছে সে। নদীর দিকে তার নজরই নেই।
দারুণ সুযোগ। তাই কোমরের ল্যাসো খুলতে খুলতেই লোকটার হাত পাঁচেকের মধ্যে পৌঁছে যায় রজনী। চকিতে ল্যাসোর প্রান্ত জড়িয়ে যায় লোকটার গলায়। ভারী সীসের বলটা সজোরে আঘাত করে লোকটার মাথার পেছনে আর তারপরেই এক হ্যাঁচকা টানে লোকটা এসে পড়ে প্রায় তার পায়ের কাছে। এই সীসের বল আর ল্যাসো ফাঁসুড়ের দড়ির মতোই নির্মম। তবু লোকটার পড়ে থাকা শরীরটা যাতে কারোর চোখে না পড়ে, তাই তাকে তুলে নিয়ে গঙ্গার ঢালু পাড়ে ছুঁড়ে ফেলে সে। ‘থপ্’ করে একটা হালকা আওয়াজ ওঠে আর অচেতন শরীরটা ঢালু পাড় বেয়ে গড়িয়ে গিয়ে পড়ে গঙ্গার জলে।
ফিরে এসে আবার সে ল্যাসোটা জড়িয়ে নেয় পৈতের মতো করে।
এখন বাড়ির এই দিকটা একেবারে পাহারাশূণ্য আর যে ঘরটায় আলো জ্বলছিল সেটা এদিকেই পড়ে। এমনকী একটা গরাদ লাগানো জানলাও আছে এদিকে। খুব সাবধানে জানলার পাশ থেকে উঁকি মেরে দেখে রজনী আর সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়ে শিউরে ওঠে সে। ওই তো, ঘরের একটা খাটে তাইকোন্ডোর গাউন পরেই চিৎ হয়ে শুয়ে আছে কানাই। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তাহলে আন্দাজে হলেও ঠিক জায়গাতেই এসেছে সে। এখন তার আর কানাইয়ের মাঝের ব্যবধান শুধু কয়েকটা জানলার গরাদ।
দূর থেকে একটা স্টিমারের ভোঁ শোনা যাচ্ছে। বোধ হয় এদিকেরই কোনো ফেরিঘাটে ভিড়বে। এদিকে জোয়ারও ক্রমশ বাড়ছে। ছলাৎ ছলাৎ করে গঙ্গার ঢেউ আছড়ে পড়ছে পাড়ে।
জানলার কাঠের ফ্রেমে আর শিকগুলোর গোড়ায় হাত বুলিয়ে সে বোঝে— গঙ্গার জোলো হাওয়া আর বেশ কিছুদিন রং না করানোর জন্যে জানলার নীচের কাঠ বেশ ক্ষয়িষ্ণু আর সেইসঙ্গে মরচেও পড়েছে শিকগুলোর গোড়ায়। একটা শিক তো বেশ নড়বড়েই। একটা হ্যাঁচকা টান মারতেই সেটা খুলে বেরিয়ে আসে তার হাতে। কিন্তু কানাইকে নিয়ে বেরোতে গেলে আরও অন্তত দুটো শিক ভাঙার দরকার। সেগুলো কিন্তু অতোটা নড়বড়ে নয়। তাই প্রাণপণে কিক লাগায় সে। একবার…দু-বার…তিনবার…
স্টিমারের ভোঁ এর শব্দটা এখন অনেক কাছে। তার প্রপেলারের তোলা ঢেউ জোয়ারের ঢেউয়ের সাথে মিশে আরও জোরে আছড়ে পড়ছে পাড়ে আর সেই শব্দে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে রজনীর কিকের শব্দ, যদিও সে আওয়াজ তেমন জোরালো নয়। হঠাৎই হালকা ‘মচ’ শব্দ। হ্যাঁ, এবারে মনে হয় একটু আলগা হয়েছে শিকদুটো। তাই একটা শিক ধরে টান মারে সে। নাঃ, আরও একটু ঢিলে হওয়া দরকার। পাশের শিকটার অবস্থাও তাই। তাই আবার পরপর পাঁচ-ছটা কিক। তারপরে দ্বিতীয় শিকটা ধরে হ্যাঁচকা টান মারতেই সেটা খুলে এল তার হাতে। কিন্তু তার পাশের শিকটা যেন নাছোড়বান্দা। বেশ খানিকটা ঢিলে হয়েছে তার গোড়াটা, কিন্তু টান মারলেও খুলে আসছে না। তাই বাধ্য হয়েই আবার কিক লাগাতে শুরু করে রজনী। তিন-চারটে কিকের পরেই ‘ঠং’ করে আওয়াজ তুলে শিকটা ছিটকে পড়ে ঘরের মেঝেতে।
এখন দিব্যি ফাঁকা হয়ে গেছে জায়গাটা। এখান দিয়ে সে ঘরে ঢুকে অচেতন কানাইকে তুলে অনায়াসেই বেরিয়ে আসতে পারবে। তাই জানলা গলে ঘরে ঢোকে সে। কিন্তু কানাইকে তুলতে যেতেই পেছনে ঘরের দরজা থেকে আওয়াজ ভেসে আসে— ‘রুখ যা, নেহিতো গোলি মার দুঙ্গা। কৌন হ্যায় বে তু?’
রজনী বুঝতেই পেরেছে যে ঠিকরে পড়া জানলার শিকের শব্দ শুনেই ছুটে এসেছে ওরা। সে দু-হাত মাথার ওপরে তুলে আস্তে আস্তে পেছনে ফেরে। দেখে ঘরের দরজার মুখে দাঁড়িয়ে আছে দু-জন। একজন তার অচেনা আর অন্যজন তার অতিপরিচিত শ্যামাদাস রায়।
যাদবের হাতে রিভলভার। কিন্তু আগন্তুককে অচেনা লাগছে তার। সে আর তার লোকেরা জাদুঘরে যে লোকটাকে ঢুকতে দেখেছিল, তার সঙ্গে এই আগন্তুকের কোনো মিলই নেই। কোথায় সেই চুল, দাড়িগোঁফ আর শার্ট-ট্রাউজার? এই লোকটার তো মুখে কালিমাখা, চোখে গগলসের কাঁচে আলো ঠিকরে পড়ছে। পৈতের মতো করে শরীরে পেঁচানো দড়ি আর পরনে হাফপ্যান্ট। একে তো রজনীকান্তর সঙ্গে মেলানো যাচ্ছে না। এর শরীরে কোথায় যেন একটা ভয়ংকরের আভাষ। তাহলে এই লোকটা কে? তাই সে আবার বলে— ‘আবে, কৌন হ্যায়রে তু? বোল।’ কিন্তু শ্যামাদাস চিনতে পেরেছে। তাই সে বলে ওঠে— ‘যাদব, এহি হ্যায় রজনী। গোলি সে উড়া দো উসকো।’ কিন্তু হাতের ইশারায় শ্যামাদাসকে থামিয়ে যাদব রিভলভারের ইঙ্গিতে রজনীকে ডাকে। বলে— ‘আ, ডরয়িংরুমমে আ।’
উঁচিয়ে থাকা রিভলভারের নির্দেশ পালন করে রজনী। সে জানে, এখন শুধু সময় নিয়ে ধৈর্য ধরতে হবে আর অপেক্ষা করতে হবে যাদবের সামান্যতম ভুলের জন্যে। তাই দু-হাত তুলে ধীরপায়ে সে এগিয়ে যায় খোলা দরজা দিয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে। বাড়ির বাইরে একটাকে সে নিকেশ করেছে বটে, কিন্তু বাইরে আর কতজন মোতায়েন আছে তা তো সে জানে না। সে এও জানে না যে বাড়ির ভেতরে যাদব আর শ্যামাদাস ছাড়া আরও কতজন আছে। যদি ভেতরে ওই দু-জন ছাড়া আরও কেউ থেকে থাকে তবে ব্যাপারটা বেশ মুশকিল হয়ে যাবে। এমনও হতে পারে যে, আজই তার শেষদিন। হোক গে। তবে আজ সে মরীয়া।
.
ফোনটা পাবার পর থেকেই নিজের টেবিলে বসে আনচান করছেন নির্মল সেন। অনেকসময় ভুয়ো ফোনও আসে। তাই বাগবাজার অঞ্চলের শ্যামপুকুর থানার ওসি কে নির্দেশ দিয়েছেন যে সে যেন কোনো সাদা পোশাকের পুলিশ বা কোনো সোর্সকে পাঠিয়ে জানায় যে পিটারের ওই বাড়িতে কোনো লোকজন আছে কিনা। যদি লোকজন থাকে তবেই পুলিশ অ্যাকশনে যাবে। কিন্তু এখনও শ্যামপুকুর কিছু জানাল না। যদি শ্যামপুকুর থানা কনফার্মডও করে তবুও সেখানে পৌঁছতে পৌঁছতে রাত হয়ে যাবে। জায়গাটা এমনিতে একটু সান্নাটা। তবে অন্ধকারে অপারেশন চালানোর সুবিধে যেমন আছে, তেমনই অসুবিধেও আছে। তাই একটু টেনশনে রয়েছেন সেন।
এইরকম সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই বেজে উঠল টেলিফোন।
—‘হ্যালো, ডি সি ডি ডি বলছি।’
—‘গুড ইভিনিং স্যার। আমি শ্যামপুকুর থানা থেকে ওসি রাঘব আচার্য বলছি।’
—‘হ্যাঁ বলুন। লোক পাঠিয়েছিলেন?’
—‘হ্যাঁ স্যার। সোর্স বলল যে ওই বাড়ির ভেতরে আলো জ্বলতে দেখেছে সে। তা ছাড়া বাড়ির বাইরেও তিন-চারজন লোককেও ঘোরাঘুরি করতে দেখেছে।’
—‘ঠিক আছে মিস্টার আচার্য, আপনি বাড়িটার ওপরে নজর রাখার ব্যবস্থা করুন। আমি ফোর্স নিয়ে অ্যাস সুন অ্যাস পসিবল পৌঁছচ্ছি। আর আপনিও ফোর্স রেডি রাখার ব্যবস্থা করুন। প্রয়োজনে ওয়্যারলেসে ডেকে নেব। ওক্কে।’
—‘ওক্কে স্যার। তাই হবে। থ্যাঙ্ক ইউ।’
ফোনটা রেখে দিয়ে ইন্টারকমের রিসিভার তোলেন নির্মল সেন। ওপারের কাউকে নির্দেশ দেন— ‘হ্যাঁ, জনা দশেক আর্মড ফোর্স রেডি করুন কুইকলি। আর সঙ্গে একটা অ্যাম্বুল্যান্সও রেডি রাখবেন। জানি না ওখানের বাচ্চাটার অবস্থাটা কেমন আছে। তেমন হলে তো তাকে হসপিট্যালাইজ করতে হতে পারে। ঠিক আছে? আর সবকিছু রেডি হলেই আমাকে জানাবেন। আমি থাকব অপারেশনে।’
ইন্টারকমের রিসিভার নামিয়ে রাখেন নির্মল সেন।
.
ড্রয়িংরুমে এসে পড়তেই যাদব তার রিভলভারের ইশারায় শ্যামাদাসকেও বলে রজনীর পাশে দাঁড়াতে। শ্যামাদাস ঠিক এই ভয়টাই পাচ্ছিল। সে একটু দোনামোনা করে। তার দেরি দেখে যাদব তাকে বলে— ‘ক্যা বে শালা, ইশারা নেহি সমঝে হ্যায় ক্যা? যা, যা, তু যাকে উসকা বগলমে খাড়া হো যা। চল, জলদি।’ অনুগতের মতো শ্যামাদাস দু-হাত মাথার ওপরে তুলে এসে দাঁড়ায় রজনীর পাশে। সে বুঝতেই পারছে যে এবার যাদবের দুটো নির্মম গুলি ফুঁড়ে ফেলবে তার আর রজনীর শরীর। আঙ থিহার পথের কাঁটা নির্মূল হবে।
এত কাণ্ডের মধ্যে রজনী কিন্তু বুঝে গেছে যে বাড়ির ভেতরে কানাই, সে, শ্যামা আর যাদব ছাড়া আর কেউ নেই। থাকলে সে নিশ্চয়ই বুঝতে পারত। তাই তার কাজটা সহজ হলেও হতে পারে।
কিন্তু যাদব যে রিভলভার উঁচিয়ে শ্যামার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। তার সামনে গিয়ে একটু থামল সে আর তারপরেই যাদবের বাঁ-হাতের উলটোপিঠের একটা চড় ঠাটিয়ে পড়ল শ্যামাদসের বাঁ-গালে। দীর্ঘদেহী যাদবের গায়ে প্রচণ্ড জোর। চড়ের ধাক্কায় মাথা টলে গেল তার। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে দু-হাত তুলে দাঁড়াতেই যাদব এক হ্যাঁচকায় শ্যামাদাসের কোমরের পেছনে গোঁজা ছোটো রিভলভারটা টেনে বের করে নিয়ে গালাগালি দিয়ে উঠল— ‘শালা কুত্তা কা বাচ্চা, খুদ কো তু বহোত চালাক সমঝা থা না? তেরে রিভলভারকে বারে মে হামলোগ কুছ জানতে নেহি থে ক্যা?’ তারপরে ছোটো রিভলভারটা নিজের প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে আবার একটা কষে চড় হাঁকাল শ্যামাদাসকে। আবারও শ্যামাদাস টাল খেয়ে পড়ে যেতে যেতেও সামলে নিয়ে দাঁড়াল। নির্লিপ্ত মুখে একদলা খৈনির রস আর থুতু মাটিতে ফেলে যাদব বললে—‘ব্যাস বাচ্চোঁ, অভি তুরন্ত খেল খতম হো…
যাদবের বাকি কথা মুখেই রয়ে গেল। কারণ পুলিশভ্যানের শব্দ শোনা যাচ্ছে। খুব কাছেই। আর তারপরে বাইরে দুটো গুলির শব্দ। ঘটনাটা বুঝতে গিয়ে একটু আনমনা হয়ে পেছনে দরজার দিকে তাকাল সে; আর সেই মুহূর্তেই একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবে ঘটে গেল ঘটনাটা।
যাদবের ক্ষণিকের অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে রজনী চকিতে শ্যামাদসের ঘাড়টা দু-হাতে আঁকড়ে ধরে শূণ্যে ভাসিয়ে দিল শরীরটা আর তার ডানপায়ের কিক গিয়ে আছড়ে পড়ল যাদবের বাঁ-ঘাড়ে। ‘কট’ করে একটা হালকা আওয়াজ। তারপরেই প্রবল সেই আঘাতে দীর্ঘদেহী যাদব লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। দুপাশে দু-হাত ছড়িয়ে সে যেভাবে পড়ল, তাতে মনে হল হয়তো তার ঘাড়ের হাড় ভেঙে গেছে। হাতের রিভলভারটা ছিটকে গেল একটু দূরে।
দৌড়ে গিয়ে রজনী সেই রিভলভারটা তুলে নিল। শ্যামাদাসও মওকা বুঝে ঝাঁপিয়েছিল যাদবের প্যান্টের পকেট থেকে তার নিজের রিভলভারটা বাগিয়ে নিতে; কিন্তু চোয়ালে এক লাথি খেয়ে ছিটকে পড়ল সেও। উঠতে গেল, কিন্তু ততক্ষণে রজনী যাদবের পকেট থেকে রিভলভারটা বের করে নিয়েছে।
দু-হাতে দুটো রিভলভার নিয়ে সে শ্যামাদাসের দিকে তাকায়। তার চশমার কাঁচে ঠিকরে পড়া আলো দেখে হঠাৎই শ্যামাদাসকে এক প্রবল মৃত্যুভয় গ্রাস করে। তার মনে হয়— এবারে আর তার মুক্তি নেই। স্বয়ং যমরাজ আজ রজনীর রূপ ধরে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। সে সম্মোহিতের মতো রজনীর সামনে হাঁটু গেড়েই বসে থাকে।
—‘কী রে যমের বাচ্চা, আমার একটা বাচ্চাকে খেয়েও শান্তি হয়নি তোর? আরেকটাকেও খেতে যাচ্ছিলিস? এইবারে দেখ, কেমন করে তোর বিষ্টুকে শেষ করেছিলাম…।’ বলেই সে যাদবের চুলের মুঠি ধরে খানিকটা তুলে মাথাটা হেলিয়ে দিল পেছনে। আর তারপরেই কন্ঠনালীতে একটা চপে ভেঙে দিল তার ক্রিকয়েড কার্টিলেজ। নরহত্যা করবে না বলেই প্রতিজ্ঞা করেছিল রজনী। কিন্তু পাছে যাদব তার ঘাড় ঠিক হয়ে গেলে পুলিশের কাছে তার নাম বলে দেয়, তাই সে এখন বাধ্য হয়েই তার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করল। তার গায়ে তো একজন সিরিয়াল কিলারের তকমা লেগেই গেছে।
শ্যামাদাসকে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল সে। কিন্তু বাইরে থেকে ভেসে আসছে গুলির শব্দ আর মাঝে মাঝে মানুষের আর্তনাদ। কাদের সঙ্গে কাদের গুলির লড়াই হচ্ছে? এদেরই কোনো রাইভ্যাল গ্যাং, নাকি পুলিশ? সে নিজে তো পুলিশে খবর দেয়নি। যাইহোক না কেন, আর বেশি দেরি করা যাবে না। সে ঠিকই করে নিয়েছে যে খুন না করলেও আজ শ্যাদাসকে এমন শিক্ষা দেবে যাতে ভবিষ্যতে সে পঙ্গু থাকে সারাজীবনের মতো।
শ্যামাদাস কিছু বলতে যাচ্ছিল। হয়তো বা ক্ষমাভিক্ষা। কিন্তু তাকে থামিয়ে দিয়ে রজনী বলে উঠল— ‘থাম শালা পা-চাটা কুত্তা কোথাকার। এতদিন তো অনেকের পা চেটেছিস। নে এবার আমার পা চাট।’
শ্যামাদাস ইতস্তত করছিল। তাই দেখে রজনী চাপা ক্রুর স্বরে বলে উঠল— ‘শালা, চাট বলছি।’
বাধ্য হয়েই শ্যামাদাস রজনীর সামনে ক্রীতদাসের মতো হাঁটু গেড়ে বসে। জিভ বের করে সে নীচু হতে যাবে, এমনসময় রজনীর জোরালো হাঁটুর গুঁতো এসে লাগলো তার থুতনীর নীচে। ‘উঁ’ বলে শুধু ককিয়ে উঠতে পারল শ্যামাদাস। দু-পাটির দাঁতের চাপে তার আধখানা জিভ টুকরো হয়ে পড়ে গেছে মাটিতে। খসে পড়া টিকটিকির ল্যাজের মতো দু-সেকেন্ড তিরতির করে কেঁপে স্থির হয়ে গেল সেটা। প্রচণ্ড যন্ত্রনায় দু-হাতে মুখ চেপে শ্যামাদাস এলিয়ে পড়ে মাটিতে। গলগল করে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে তার দু-হাতের আঙুলের ফাঁক দিয়ে। ভিজে যাচ্ছে তার জামা। কিন্তু তাতেও আক্রোশ কমে না রজনীর। সে টেবিল থেকে একটা হাত দেড়েক লম্বা ভারী মার্বেল পাথরের মূর্তি তুলে নিয়ে আসে। তারপরে শ্যামাদাসের একটা হাত পা দিয়ে মাটিতে চেপে ধরে সেই মূর্তি দিয়ে একের পর এক আঘাত করতে থাকে তার আঙুলে। কাতরে কাতরে উঠতে থাকে শ্যামাদাস। কিন্তু মুখ দিয়ে শুধু ‘ওঁ ওঁ’ শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ বেরোয় না। সেই হাতের সবকটা আঙুল থেঁতলে দিয়ে রজনী এবারে চেপে ধরে শ্যামাদাসের অন্য হাতটা। একইরকম নির্দয়ভাবে থেঁতলে দিতে থাকে সেই হাতেরও সব আঙুলগুলো। তার চোখের সামনে রক্তে ভেসে যাচ্ছে মাটিতে পড়ে থাকা দেহটা আর প্রতিটা আঘাতের অভিঘাতে বেঁকে বেঁকে উঠছে। তবুও থামছে না সে।
একসময় আক্রোশ কমলে উঠে দাঁড়ায় রজনী। সে এবারে নিশ্চিত হয়েছে যে, শ্যামাদাস আর কোনোদিন মুখ দিয়ে কিছু বলতে আর হাত দিয়ে কিছু লিখতে পারবে না। না পুলিশের কাছে, না কোনো গ্যাংস্টারের কাছে।
এমন সময় বাইরে থেকে চোঙা ফোঁকার আওয়াজ শোনা যায়— ‘বাড়ির মধ্যে যারা আছ, তারা বেরিয়ে এসে ধরা দাও। নইলে দু-মিনিটেই আমরা দরজা ভেঙে ফেলব।’ এটা নির্ঘাত পুলিশের হুমকি। তার মানে, বাইরে পুলিশের সঙ্গে লড়ার মতো আর কোনো লোকজন নেই। আর মাত্র দু-মিনিট সময়। ওইটুকু সময়ের মধ্যে রজনী কি পারবে কানাইকে নিয়ে বাড়ি ছাড়তে? তাই একটা রিভলভার কোমরে গুঁজে আর একটা হাতে নিয়ে সে ছুটে যায় কানাইয়ের ঘরে। তার ঘুমন্ত শরীরটা তুলে নিতে যায় কাঁধে। কিন্তু কি একটা ভেবে কানাইকে ছোঁয় না সে।
জানলা দিয়ে সবে পা বের করেছে, এমন সময় ‘খটাং’ করে একটা বুলেট এসে লাগে জানলার পাল্লায়। সে বুঝতে পারে যে পুলিশ মোটামুটি ঘিরে ফেলেছে বাড়িটাকে। তাই যেদিক থেকে গুলিটা এসেছিল, সেদিকেই আন্দাজ করে পরপর তিনটে গুলি ছোঁড়ে সে। ওদিকে কেউ একজন ককিয়ে উঠতেই বুঝতে পারে যে আবারও অন্ধকারে শব্দ শুনে লক্ষ্যভেদ করতে পেরেছে সে। এখন আরও পুলিশ আসার আগেই বেরোতে হবে তাকে। তা ছাড়া পুলিশ তো একটু পরে বাড়িতে ঢুকবেই। তারাই উদ্ধার করবে কানাইকে। বরং সেটাই ভালো হবে। কানাইয়ের সঙ্গে তার গোপন সত্ত্বার যোগাযোগও পুলিশ ধরতে পারবে না। তার নিজের গোপন পরিচয়ও অজানাই থাকবে তাদের। তারপরেই জানলা গলে বেরিয়ে সে দ্রুতগতিতে ছুটতে থাকে নৌকোর দিকে।
চতুর্দশীর চাঁদের টানে ঢেউয়ের তালে তালে দুলছে সেটা। আরও জোরে ঢেউ উঠছে গঙ্গার বুকে। ফলে নৌকোটাও এসে গেছে পাড়ের অনেক কাছে। জলে ঢেকে গেছে পাড়ের কাদা। তাই নৌকোর কাছে এসে সে লাফ মারে। আরও দুলে ওঠে নৌকোটা। আর একটু হলেই ডুবে যেত আর কী। সেটা সামলে নিয়ে একটা টানে তুলে নেয় নোঙরটা। হাতে তুলে নেয় দাঁড়। নৌকো বাইতে থাকে গঙ্গার খানিকটা ভেতরে ঢুকে গিয়ে, জোয়ারের উলটোপথে, গঙ্গার বুকে সারি দিয়ে বাঁধা গাদাবোটগুলোর আড়ালে আড়ালে। যাতে পুলিশ গুলি ছুঁড়লেও তা গায়ে না লাগে।
সেখান থেকে বেশ খানিকটা দূরে এসে এবার সে মন দেয় নিজের দিকে। অস্ত্র দুটো, গগলস আর ল্যাসোটা ব্যাগে রেখে ভালো করে গঙ্গাজলে মুখ হাত ধুয়ে নেয়। ব্যাগ থেকে বের করে পরে নেয় তার শার্ট-প্যান্ট। আর তারপরে আবার দাঁড় তুলে নেয় হাতে।
.
ফায়ারিংয়ের শব্দ একেবারে থেমে যাওয়ার পরে নির্মল সেন কনস্টেবলদের বলেন দরজা ভাঙতে। বন্দুক উঁচিয়ে পাঁচ ছ-জন আর্মড পুলিশ ঢুকে পড়ে বাড়ির মধ্যে। তাদের একটু পেছনেই নির্মল সেন আর রাঘব আচার্য ঢোকেন রিভলভার উঁচিয়ে। হঠাৎ একটা ‘গোঁ গোঁ’ আওয়াজ শুনে দু-জন কনস্টেবল ছুটে যায় সেদিকে। একী দেখছে তারা! একজন মাটিতে পড়ে গোঙাচ্ছে। তার মুখ আর দুটো হাত থেকে রক্ত বেরিয়ে ভিজে যাচ্ছে মেঝে। তারই পাশে পড়ে আছে লম্বা-চওড়া একজন লোক।
নির্মল সেন বাকিদের বাড়িটা তল্লাশি করতে বলেন। ওসি আচার্য তিনজন কনস্টেবলকে নিয়ে বাড়িটাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখতে থাকেন আর সেন এগিয়ে যান পড়ে থাকা মানুষ দুটোর কাছে। প্রথমে যাদবকে নেড়েচেড়ে দেখেন। নাঃ, কোনো সাড়াশব্দ নেই। হাতের নাড়ি টিপে দেখেন। নাঃ, কোনো আশা নেই। তারপরে এগিয়ে যান শ্যামাদাসের কাছে। থ্যাঁতলানো আঙুলের নুলো হাতদুটো তুলে সে কিছু বলতে চায় তাঁকে। তার সারা শরীর কাঁপছে। কিন্তু পাশে পড়ে ওটা কী? হাঁটু একটু মুড়ে বসে তুলে ধরেন জিনিসটাকে। তাঁর বুঝতে বাকি থাকে না সেটা কি। তাই লোকটা কথা বলতে পারছে না আর অসম্ভব ব্লিডিং হচ্ছে মুখ আর হাত থেকে। সঙ্গে সঙ্গে কনস্টেবলদের আদেশ করেন— ‘এদের অ্যাম্বুল্যান্সে তোলো, কুইক।’ তারপরে একজন সাব-ইনস্পেকটরকে জিজ্ঞেস করেন— ‘আমাদের লোকেদের অবস্থা কী?’ সে বলে— ‘একজনের কাঁধে গুলি লেগেছে স্যার আর দু-জনের বডি ছুঁয়ে বেরিয়ে গেছে গুলি। ওরা আমাদের ভ্যানেই আছে স্যার।’
ইতিমধ্যে স্ট্রেচার এসে তুলে নিয়ে যায় প্রথমে শ্যামাদাসকে আর তারপরে যাদবকে।
—‘অ্যাম্বুল্যান্স ছেড়ে দাও’ বলে নির্মল সেন বাইরে আসেন। এখন অনেক কাজ বাকি। মাথার ওপরে বাতি জ্বালিয়ে আর সাইরেন বাজিয়ে অ্যাম্বুল্যান্স এগিয়ে যায় দ্রুতগতিতে। কিন্তু খানিক এগোতেই একটা বিকট শব্দ। চমকে উঠে সবাই দেখে দূরে আধো অন্ধকারে একটা ট্রাক পুরো দলা পাকিয়ে দিয়েছে অ্যাম্বুল্যান্সটাকে।
—‘কাম অন, কুইক’ বলে নির্মল সেন দৌড়ে গিয়ে ওঠেন নিজের জিপে। সঙ্গে সেই সাব-ইনস্পেকটর আর জনা তিনেক রাইফেলধারী পুলিশ। জিপ চলতে শুরু করে। দুর্ঘটনাস্থলের খানিকটা দূর থেকেই সেন বুঝতে পারেন যে দু-জন লোক ট্রাক থেকে নেমে পালাচ্ছে। তাই ড্রাইভারকে বলেন— ‘জোরে চালান।’ জিপের ড্রাইভার চাপ দেয় অ্যাকসিলেটরে। লোকদুটোর খানিকটা কাছাকাছি যেতেই সেন উঠে দাঁড়িয়ে পড়েন জিপে। রিভলভার তুলে অন্যদের বলেন— ‘পায়ে গুলি করুন।’ খান সাতেক বুলেট ছুটে যায় পুলিশ জিপ থেকে। পড়ে যায় লোকদুটো। কাছে গিয়ে বুঝতে পারেন, একজনের পেট ভেদ করে গেছে বুলেট আর অন্যজনের কাঁধের নীচে দিয়ে ঢুকে ডানদিকের গলা দিয়ে বেরিয়ে গেছে। এখন এদের বাঁচানো খুব জরুরি। অনেক খবর মিলতে পারে এদের কাছ থেকে। তাই বলেন— ‘এদেরকে জিপে তুলুন।’ কনস্টেবলরা তাদের পুলিশ জিপেই তুলতে থাকে। সেই ফাঁকে সেন এগিয়ে যান অ্যাম্বুল্যান্সটার দিকে। সব দেখেশুনে তাঁর মুখ থেকে হতাশা আর বিস্ময়ে বেরিয়ে আসে— ‘ওঃ মাই গড। সব শেষ।’ এখানে আর কিচ্ছু করার নেই। তাই জিপে উঠে জিপ ঘোরাতে বলেন পিটারের বাড়ির দিকে। সেখানে পৌঁছে ভ্যানে লোকদুটোকে তুলে দিয়ে ভ্যানটাকে সোজা হাসপাতালে যেতে বলেন। ভ্যান বেরিয়ে যায়।
ততক্ষণে বাড়িতে পুলিশের তল্লাশি শেষ।
নির্মল সেন আচার্যকে জিজ্ঞেস করেন— ‘পেলেন বাচ্চাটাকে?’
—‘হ্যাঁ স্যার। বাচ্চাটা একটা ঘরে শুয়ে আছে।’
—‘চলুন তো, আর একবার দেখি গিয়ে ভেতরে। খবর তো ছিল যে বাচ্চাটাকে এখানেই রাখা হয়েছে। আর বাচ্চাটা থাকলেও বাড়িতে এত পাহারার ব্যবস্থাই বা রাখা হয়েছিল কেন?’
ভেতরে গিয়ে নির্মল সেনের চোখ ঘোরে ফেরে। মেঝেতে যেখানে যাদব পড়েছিল, সেখানটাই ভালো করে খুঁটিয়ে দেখতে থাকেন। নজর চালাতে চালাতে চোখে পড়ে একটা ছোটো দস্তার কৌটো। এটা কী? পকেট থেকে রুমাল বের করে সাবধানে খোলেন সেটা। ভেতরে কালো রঙের চিটচিটে পদার্থ একটুখানি। নাকের কাছে তুলে শোঁকেন। তারপর রাঘব আচার্যকে বলেন— ‘ওপিয়াম। কিন্তু এখানে ওপিয়াম এল কেন? আর এত ছোটো কৌটতেই বা কেন? এদের দু-জনের মধ্যে কি কেউ আফিংখোর ছিল?’
—‘ব্যাপারটা দেখতে হবে স্যার। কার ফিঙ্গারপ্রিন্ট আছে এতে।’ নির্মল সেনের কাছ থেকে কৌটোটা নিজের রুমালে নিয়ে পকেটে ঢোকান আচার্য।
ডি সি ডি ডি তারপরে এগিয়ে যান সেখানে, যেখানে জিভকাটা লোকটা পড়েছিল। কোমরে দু-হাত রেখে ভালো করে জরিপ করতে থাকেন জায়গাটা। তার এপাশে ওপাশে ইতস্তত ছড়িয়ে কাদামাখা পায়ের ছাপ। সেই ছাপ যে একই লোকের, তা বেশ স্পষ্ট। ড্রয়িংরুম থেকে এদিক-ওদিক ঘুরে সেই ছাপ চলে গেছে একটা ঘর পর্যন্ত। ওই ঘর থেকে সেই লোকটা এখানে এসেছিল আর এখান থেকে আবার ঘরে ফিরে গিয়েছিল তা কাদামাখা পায়ের ছাপে স্পষ্ট। তাই ঘরটা একবার দেখতে হবে। ঘরের মুখেই পড়ে আছে একটা শিক।
নির্মল সেন এগিয়ে যান বিছানার কাছে। বাচ্চাটা শুয়ে ঘুমচ্ছে অঘোরে। ওকে এখুনি হাসপাতালে পাঠানো দরকার। তাই উনি রাঘব আচার্যকে বলেন— ‘মিস্টার আচার্য, বাচ্চাটাকে ইমিডিয়েটলি হসপিটালে পাঠাবার ব্যবস্থা করুন।’
—‘হ্যাঁ স্যার।’ আচার্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন কানাইকে হাসপাতালে পাঠানোর জন্যে।
তারপরে সেন এগিয়ে যান জানলার দিকে। জানলাতে কিন্তু তিনটে শিক নেই। একটা তো মেঝেতে পড়ে আছে, তবে বাকি দুটো গেল কোথায়? জানলার কাছে এগিয়ে যান। ঘরের আলোয় ভালো করে দেখেন যে জানলার ফ্রেমের নীচের কাঠের যে জায়গাগুলোয় শিক গাঁথা থাকে সেখানে নতুন ভাঙা কাঠের চিহ্ন আর বাইরে পড়ে আছে বাকি শিক দুটো। তার মানে এখান দিয়েই কেউ ঢুকেছিল। আর সে বেরিয়েও গেছে এই পথেই, কারণ জানলার কাঠে রয়েছে কাদার দাগ।
এবারে নির্মল সেন পায়চারি করতে করতে তলিয়ে ভাবতে থাকেন— তাহলে ব্যাপারটা এরকম দাঁড়ায় যে কেউ একজন জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকেছিল। কিন্তু কে সে? এইসব কথা ভাবতে ভাবতেই আবার এগিয়ে যান জানলার কাছে। আরে, ওটা কী? জানলার কাঠের ফ্রেমে কালো ছোপটা কীসের? এতক্ষণ তাঁর নজর এড়িয়ে গিয়েছিল সেটা। হয়তো ছোটো দাগ বলেই। তাই আঙুল দিয়ে কালো ছোপটা ঘষে দেখেন। হাতে লেগে যায় সেটা। এটা কী? কিন্তু তারপরে বুড়ো আঙুল দিয়ে ঘষতেই একটা শিহরণ ছড়িয়ে যায় তাঁর শরীরে। তাঁর মনে পড়ে যাচ্ছে কয়েকমাস আগের খবরের কাগজের একটা হেডলাইন— ‘কলকাতায় নিশির ডাক’।
তার মানে এখানেও নিশি এসেছিল। কিন্তু এবার দুয়েকটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তাঁর মাথায়। আচ্ছা, ‘নিশি’ কি এদের দলের লোক, নাকি এদের রাইভ্যাল দলের? এদের দলের লোকই যদি হয়, তাহলে এরা নিজেদের মধ্যেই মারপিট করল কেন? কিডন্যাপ করা নিয়ে কি তবে কোনো গন্ডগোল হয়েছিল? কিন্তু ইন্ট্রুডার রাইভ্যাল দলের লোক হলে অঙ্কটা যেন অনেকটাই মিলে যায়। সে কি এদেরকে ডেস্ট্রয় করতেই এখানে এসেছিল? আর তাই যখনই সে দেখেছে যে পুলিশ বাড়িতে ঢুকতে পারে, তখনই সে পালিয়েছে জানলা দিয়ে। কিন্তু এদের ওপরে তার এত আক্রোশ কেন? এই লোকটাই কি তাঁদের কাছে পিটারের জবানবন্দির ফোটোকপি পাঠিয়েছিল? এইই কি ফোন করে তাঁদের জানিয়েছিল কিডন্যাপের ব্যাপারটা? এখন তাঁকে সেই ব্যাপারটাই খুঁজে দেখতে হবে। জানতেই হবে ‘নিশি’ লোকটা আসলে কে?
.
সেদিন রাতে দশটা নাগাদ রজনী এসে কড়া নাড়ল বউবাজারের বাড়ির দরজায়। শুনতে পেল ভেতর থেকে মেসোমশাইয়ের হাঁক— ‘কেষ্ট দেখতো, এত রাত্তিরে কে এল।’
দরজা খুলে রাস্তার ম্লান আলোতে দাড়ি গোঁফহীন, ন্যাড়ামাথা রজনীকে দেখে প্রথমটা কেমন যেন ঘাবড়ে গেল সে। সামনের মানুষটা তার পরিচিত কি না তা ঠাহর করতে একটু সময় নিল। তারপরে রজনী যখন বলল— ‘কী গো কেষ্টদা সরো। ভেতরে ঢুকতে দাও;’ তখন চিনতে পেরে— ‘আরে দাদাবাবু, তুমি? এসো, এসো। ভেতরে এসো।’ বলে দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়াল সে। রজনী ভেতরে ঢুকতে দরজায় খিল দিতে দিতে বলতে লাগল— ‘আর বলো না, সারাদিন যা কাণ্ড…।’
তার মুখের কথা শেষ হবার আগেই মেসোমশাইয়ের গলা— ‘কে রে কেষ্ট?’
—‘আজ্ঞে আমাদের দাদাবাবু।’
—‘কে রজনী?’ বলতে বলতে বেরিয়ে আসেন মেসোমশাই। তারপরে নতুন রূপের রজনীকে দেখে একটু উষ্মা মিশিয়ে বলেন— ‘তা অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে কোথায় যাওয়া হয়েছিল?’
—‘আজ্ঞে মেসোমশাই, সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউতে। ডার্মাটোলজিস্টের কাছে।’ আগে থাকতে এই প্ল্যানটাই ছকে রেখেছিল সে।
—‘তা চামড়ার ডাক্তারের কাছে কেন? কী হয়েছে তোমার?’ প্রশ্নটা এল মাসিমার কাছে থেকে।
—‘আর বলবেন না মাসিমা। মিউজিয়মে তো ল্যাবরেটরিতে হাড়গোড় নিয়ে কাজ করতে হয়। সেখানে নাকি মাথা ঢেকে কাজ করার নিয়ম। তা ড্যানীবাবুও আগে আমাকে সতর্ক করে দেননি। আত্মভোলা লোক তো। কাজেই না জেনেই আমি খালি মাথাতেই কাজ করতাম। এদিকে কিছুদিন হল মাথা আর দাড়ি চুলকোত। তা উনিই একদিন সেটা খেয়াল করে আমাকে ডাক্তার দেখাতে বলেন। তাই আজ ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম।’
—‘তা ডাক্তার কী বললেন শুনি?’ প্রশ্নটা এবার করেছেন মেসোমশাই।
—‘আজ্ঞে, ডাক্তার বললেন যে, চুলে আর দাড়িতে নাকি চাম-উকুন হয়েছে। তাই সব চুল-দাড়ি কামিয়ে ফেলতে বললেন। আর একটা লোশন লিখে দিয়েছেন লাগানোর জন্যে।’
এবারে কেষ্টদা বলে উঠল— ‘উরিবাবা, চাম-উকুন। সে বড়ো বাজে জিনিস গো দাদাবাবু। চামড়ায় ঘা করে দেয়।’
সব শুনে মাসিমা বললেন— ‘তা বাবা রজনী, এবার থেকে আর ওসব দাড়ি-গোঁফ রেখো না। আগে যেমন ছিলে তেমনই থেকো। আর অফিসে কাজ করার সময় মাথায় একটা স্কার্ফ বেঁধে রেখো। বুঝলে?’
—‘হ্যাঁ, তাই করতে হবে দেখছি।’
—‘ঠিক আছে, সব বুঝলাম। তা আজ এদিকে সারাদিনে কি ঘটেছে সেটা জানো কি?’ মেসোমশাইয়ের স্বর গম্ভীর।
—‘আজ্ঞে, মানে…কী হয়েছে মেসোমশাই?’ কিছুটা যেন অপ্রতিভ রজনী।
—‘তোমার কানাইকে কারা যেন স্কুলের সামনে থেকে কিডন্যাপ করেছিল। ফোন এসেছিল থানা থেকে।’
—‘কিডন্যাপ? বলেন কী মেসোমশাই? কিন্তু কেন? কী বলল থানা থেকে?’ বেশ উদগ্রীব দেখায় রজনীকে।
—‘ব্যস্ত হবার কিছু নেই। থানা থেকে ঘণ্টাদেড়েক আগেই ফোন এসেছিল। পুলিশ নাকি তাকে বাগবাজার ঘাটের কাছে একটা বাড়ি থেকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করেছে। ওকে হাসপাতালে দেখিয়ে তবেই হস্টেলে নিয়ে যাবে। আমার কী মনে হয়, জানো রজনী, কিডন্যাপাররা অন্য কোনো বাচ্চাকে তুলতে গিয়ে ভুল করে কানাইকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল।’
—‘তা হতে পারে। কিন্তু ওকে হস্টেলে নিয়ে যাবে? আমার মনে হয়, এখানে আনলেই বোধ হয় ভালো হত। হস্টেলে কি আর সেই কেয়ার ও পাবে?’ রজনীর গলায় স্বাভাবিক উদ্বেগ।
—‘দেখ রজনী। পুলিশ তো তার নিয়ম মানবেই। তবে আমি একবার হস্টেলে ফোন করে দেখি, ওরা ফিরল কি না। বলে কয়ে দেখি যদি ছেলেটাকে বাড়িতে আনা যায়।’
—‘তাইই করুন মেসোমশাই। ছেলেটা যদি ফিরে থাকে, তাহলে কেমন আছে সেটা তো অন্তত জানা যাবে।’
মেসোমশাই ফোনের রিসিভারটা তোলেন। ডায়াল করতে যাবেন, এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। রিসিভারটা রেখে মেসোমশাই আবার হাঁক দেন— ‘অ্যাই কেষ্ট, দেখত আবার কে এল?’
সদর দরজার ওপার থেকে শোনা গেল— ‘দরজা খুলুন। আমরা পুলিশ। থানা থেকে আসছি।’
কেষ্টদা তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজা খুলে দেয়। মেসোমশাই আর রজনী নেমে আসে দাওয়া থেকে। মাসিমাও এসে দাঁড়ান দাওয়ায়। এদিকে পুলিশ ততক্ষণে ঢুকে পড়েছে বাড়িতে। একজন ইনস্পেকটর সামনে, তাঁর পেছনে দু-জন কনস্টেবল ধরে নিয়ে আসছে কানাইকে আর তাদের সবার পেছনে হস্টেল সুপার। কানাই হাঁটছে ঠিকই, তবে তাকে খুব ক্লান্ত লাগছে।
ইনস্পেকটর জিজ্ঞেস করলেন— ‘আচ্ছা, রজনীকান্ত রায় কে?’
রজনী এগিয়ে গিয়ে বললে— ‘আজ্ঞে আমি।’
—‘আমরা লোকাল থানা থেকে আসছি। তা এই বাচ্চাটার লোকাল গার্জেন তো আপনিই। এই নিন আপনার বাচ্চা।’
মাসিমা ততক্ষণে নেমে এসেছেন দাওয়া থেকে। কনস্টেবল দু-জন কানাইকে তুলে দেয় তাঁর হাতে। মাসিমা জড়িয়ে ধরেন তাকে।
ইনস্পেকটর বলতে থাকেন— ‘আমরা ওকে হসপিটালে দেখিয়েছি। এখন সুস্থ। আমরা গরম দুধও দিয়েছি। তবে ওর এখন ক-দিন রেস্টের খুব দরকার।’
সেইসময় পেছন থেকে হস্টেল সুপার বলে ওঠেন— ‘দেখুন রজনীবাবু, এই অবস্থায় তো হস্টেলে ওকে সর্বদা কেয়ারে রাখা সম্ভব নয়। তাই ওনাদের বলে ছেলেটাকে আমি আপনার বাড়িতেই নিয়ে এলাম।’
মেসোমশাই বলেন— ‘তা ভালোই করেছেন। এইসময়টা এখানে থাকলে ও যত্নেই থাকবে।’
—‘তা এই বাচ্চাটাকে কেন কিডন্যাপ করা হল, সে ব্যাপারে কি কিছু বলতে পারেন?’ প্রশ্নটা ইনস্পেকটরের।
—‘আজ্ঞে, তেমন কোনো কারণ আছে বলে তো আমার মনে হয় না।’ জবাব দেয় রজনী।
—‘ঠিক আছে। তবে তেমন কোনো কারণ খুঁজে পেলে বা কোনো হুমকি চিঠি পেলে সেটা অবশ্যই আমাদের জানাবেন। তবে এইটুকু শুধু জেনে রাখুন যে আপনাদের বাচ্চাকে একটা খুব নোটোরিয়াস গ্যাং তুলে নিয়ে গিয়েছিল। তাদের দু-জন ড্রাইভার ধরা পড়েছে। সিভিয়ারলি ইনজিওর্ড। তবে তারা হসপিটালে ট্রিটমেন্টে আছে। আর এই কিডন্যাপের ব্যাপারে আমরা তদন্তও করছি। সে যাইহোক, এখন থেকে ওকে খুব সাবধানে রাখবেন।’
—‘ঠিক আছে। অনিচ্ছাকৃতভাবে আপনাদের ডিস্টার্ব করার জন্যে আমাদের মাফ করবেন।’ কথাটা বলেন মেসোমশাই।
ইনস্পেকটর বলে ওঠেন— ‘না না, এটা তো আমাদের কর্তব্য। আমরা তো আছিই এই জন্যে। আর হ্যাঁ, মিস্টার রায়, কাল একবার ওসি-র সঙ্গে দেখা করবেন থানায়। আমাদের কিছু কথা জানার আছে। আচ্ছা আসি তাহলে।’
পুলিশ দরজার দিকে একটু এগিয়ে যেতেই হস্টেল সুপার রজনীর কাছে এসে বলেন— ‘কিছু মনে করবেন না মশাই। আজ সারাদিন যা গেছে। আমি তো জেরবার একেবারে। এইরকম কেস আমার হস্টেলে আগে কখনো ঘটেনি। বড্ড ভয় করছে মশাই। তাই বলছিলাম কী, আপনি বরং ওকে হস্টেল থেকে ছাড়িয়ে এনে নিজেদের কাছেই রাখুন। আমার পক্ষে এসব উটকো ঝামেলা সামলানো সম্ভব নয়, বুঝলেন।’ হস্টেল সুপারের গলায় যেন বেশ বিরক্তির সুর।
তাই বোধ হয় মাসিমা বলে উঠলেন— ‘বাবা রজনী, উনি যেটা বলছেন তুমি বরং তাইই কর। দু-একদিনের মধ্যে গিয়ে কানুর জিনিসপত্র নিয়ে এসো। ও এখন থেকে এখানেই থাকবে। কে জানে বাবা, চোখের আড়ালে থাকলে আবার কখন কী বিপদ ঘটবে।’
কেষ্টদা ততক্ষণে মাসিমার কাছ থেকে কানাইকে নিয়ে ওপরের ঘরে উঠে গেছে।
রজনীও ভেবে দেখল যে কানাইয়ের নিরাপত্তার জন্যে এটাই সেরা উপায়। তবে এরপরেও যে তারা কানাইয়ের ওপরে ঝাঁপাবে না, তারই বা নিশ্চয়তা কি?
সদর দরজা বন্ধ করে মেসোমশাই আর মাসিমার সাথে কথাবার্তা শেষ করে একটুপরে ওপরে এসে রজনী দেখে কানাই গভীর ঘুমে ডুবে। কেষ্টদাও নেমে গেছে নীচে। এটাই মস্ত সুযোগ। সে চটপট তার কাপড়ের ব্যাগ থেকে সবকিছু বের করে খাটের তলায় তার দাদুর প্যাঁটরায় ঢুকিয়ে তালা লাগিয়ে দেয়। তার কেন জানি না মনে হচ্ছে যে পুলিশ তাকে যেকোনো কারণে হোক সন্দেহ করতে শুরু করেছে। কানাইয়ের কিডন্যাপের পরে সে যে অফিসে ছিল না সেটাই কি কারণ? তা যাইহোক এবার গ্রামে গেলে এই প্যাঁটরাটাকে ব্যাগের মধ্যে করে নিয়ে গিয়ে রেখে আসতে হবে সেখানে, যেখান থেকে সে এটাকে বের করে এনেছিল একসময়ে।
তাই পরের দিনই স্কুলে গিয়ে কানাইয়ের জন্যে দু-দিনের ছুটির দরখাস্ত করে সেখান থেকে সোজা হস্টেলে গিয়ে সইসাবুদ সেরে কানাইয়ের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতেই সন্ধে হয়ে গেল। এদিকে থানায় ডেকে পাঠিয়েছে। ঠিক আছে, কালই না হয় যাবে। কিন্তু ফিরে এসে দেখে কানাইয়ের মুখ ভার।
—‘কী রে কানাই, কী হয়েছে তোর? এত চুপচাপ কেন?’
উত্তরটা দিলেন মাসিমা— ‘আর বলো না, বন্ধুবান্ধবদের ছেড়ে আসতে হয়েছে বলে মুষড়ে পড়েছেন কানুবাবু। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দুষ্টুমি করা তো আর হবে না, তাই।’
—‘কি রে কানাই, তাইই?’
কানাই শুধু মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়।
রজনী বলে— ‘তা স্কুলে গেলে তো বন্ধুদের সাথে দেখা হবেই। তখন তুই ওদের সঙ্গে গল্প করার, টিফিন পিরিয়ডে খেলা করার সুযোগ তো পাবিই। তা ছাড়া অফিস থেকে ফিরে আমি তোকে পড়া দেখিয়ে দিতে পারব। তারপরে সকালবেলায় ফাঁকা রাস্তায় দু-জনে মিলে জগিং করে এসে ছাদে তোকে তাইকোন্ডোও শেখাতে পারব। কতকিছু তোর শিখতে বাকি আছে জানিস? এখন তো তুই একজনকে কাত করতে পারিস; কিন্তু যদি চারজনকে সামলাতে হয় তখন? পারবি?’
সব শুনে মেসোমশাই বললেন— ‘বুঝলে রজনী, ছেলেটার এখন একটু মেন্টাল রিলিফ দরকার। তুমি বরং এই সামনের গরমের ছুটিতে ওকে নিয়ে একটু দেশের বাড়িতে ঘুরে এসো। বাবা-মা আর পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলে দেখবে ওর এই মনমরা ভাবটা কেটে যাবে। তা কি গো কানুবাবু, গরমের ছুটিতে গ্রামে যাবে তো?’ শেষের কথাটা কানাইকে বলা।
কানাই এবারেও শুধু মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়।
এদিকে সন্ধে হয়ে গেছে। এমন সময় আবার দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
—‘কে?’ বলে হাঁক পাড়েন মেসোমশাই।
—‘আমি। গোপালদার লোক। দরজাটা একটু খুলুন।’
—‘কেষ্ট, দরজাটা খুলে দে তো।’
কেষ্টদা গিয়ে দরজাটা খুলে দিতে ট্রাউজার আর হাফহাতা শার্ট পরা বলিষ্ঠ চেহারার একজন যুবক ভেতরে আসে।
—‘বসুন ভাই, একটু বসুন। আমি ভেতর থেকে আসছি।’
—‘ঠিক আছে। তবে মেসোমশাই একটু তাড়াতাড়ি করবেন। এখনও অনেক বাড়ি যেতে বাকি। আর পারলে এবারে একটু বাড়িয়ে দেবেন।’
একটু পরেই মেসোমশাই বেরিয়ে এসে বলেন— ‘এবারে এগারো টাকা নাও ভাই।’
—‘সামনের বছরে মার্চে তো ইলেকশন। তাই এখন থেকেই ফান্ড তুলতে হচ্ছে। জানেনই তো ইলেকশনে কী পরিমাণে খরচ-খরচা হয়।’
মেসোমশাই টাকাটা যুবকের হাতে তুলে দিতে দিতে বলেন— ‘তা ইলেকশনে কে জিতবে বলে মনে হয়? কংগ্রেস না মুসলিম লীগ? হাওয়া কোন দিকে?’
যুবক ঈষৎ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে— ‘এত তাড়াতাড়ি কি আর তা বলা যায়। তবে যুগলদা তো বলছেন যে কংগ্রেস জিতবে। কিন্তু ওদের তো জনসংখ্যা ঢের বেশি। তাই গোপালদা তো বলছিলেন যে মুসলিম লীগের জেতার চান্স বেশি। আচ্ছা, আসি মেসোমশাই। তবে পরের বারে আরেকটু বাড়িয়ে দেবেন।’ একটু গলা তুলেই বলে যুবক। মেসোমশাইয়ের হাতে ধরিয়ে দেয় চাঁদার রসিদ।
—‘আচ্ছা এসো। আর হ্যাঁ, গোপালবাবু আর যুগলবাবু ভালো আছেন তো?’
যেতে যেতে যুবক বলে— ‘হ্যাঁ, মেসোমশাই।’
যুবক রাস্তায় গিয়ে পড়তেই কেষ্টদা সদর দরজাটা বন্ধ করে দেয়।
রজনী এতক্ষণ চুপচাপ বসে সব দেখছিল আর শুনছিল। এবার সে মেসোমোশাইকে জিজ্ঞেস করে— ‘আচ্ছা মেসোমোশাই, এই যুগলবাবুই কি কংগ্রেসের ট্রেড ইউনিয়নের নেতা? রাস্তাঘাটে পোস্টারে নামটা দেখেছি বলে মনে হচ্ছে।’
—‘হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছ। যুগল ঘোষ কংগ্রেসেরই কর্মী। গান্ধীবাদী। কলকাতায় কিন্তু ওনার যথেষ্ট প্রভাব আছে।’
—‘আর ওই গোপালবাবুটি কে? কোথায় যেন নামটা শুনেছি বলে মনে হচ্ছে।’
—‘আরে, গোপাল পাঁঠার নাম শোনেনি এমন লোক এই অঞ্চলে কেউ আছে নাকি? ব্রাহ্মণের ছেলে। মুখোপাধ্যায়। তবে কলেজ স্ট্রিটে পারিবারিক ব্যবসা পাঁঠার মাংসের দোকান চালায়। কলকাতার সেরা গুন্ডা, কিন্তু কখনোই নিরীহ সাধারণ মানুষের ওপরে জুলুমবাজি করে না; তা সে হিন্দুই হোক বা মুসলমান। তবে হ্যাঁ, দাঙ্গাবাজ মুসলমানদের গুন্ডামি ও সহ্য করে না। গত দাঙ্গাতেও অনেক দাঙ্গাবাজ মুসলমান খুন হয়েছে ওর আর ওর দলবলের হাতে। বুঝতেই পারছ, কত ক্ষমতা রাখে ওই লোকটা। এই ওয়েলিংটন স্কোয়ারে ওর অফিস। ভোটের সময়ে কংগ্রেসের যে ওকে দরকার। তাই একটু বেশি চাঁদা দেবার কথা বলছিল ওই ছেলেটা।’
—‘তা পুলিশ ওকে কিছু বলে না?’
—‘পুলিশ কী বলবে ওকে? মাথার ওপরে যে নেতাদের হাত আছে। বুঝলে রজনী, মাথায় রাজনীতির লোকেদের আশীর্বাদ থাকলে পুলিশ…। যাকগে ছাড়ো ওসব কথা।’
—‘আমি তাহলে ওপরে যাই মেসোমোশাই?’
—‘হ্যাঁ, এসো।’
.
তারপরের দিন অফিস ফেরত রজনী যায় লোকাল থানায়। একজন কনস্টেবলকে জিজ্ঞেস করতে সে ওসি-র ঘর দেখিয়ে দেয়। রজনী দেখে ঘরের দরজায় একটা কাঠের টুকরোয় নাম লেখা— ‘কমল চন্দ্র সান্যাল(অফিসার-ইন-চার্জ)’। সে বলে— ‘মে আই কাম ইন।’
ওসি মুখ তুলে দেখে বলেন— ‘কে?’
—‘আমার নাম রজনীকান্ত রায়। আপনি আমাকে আপনার সাথে দেখা করতে বলেছিলেন।’
—‘ও, আপনিই রজনীবাবু? আসুন। বসুন।’
রজনী উলটোদিকের চেয়ারে বসে বলে— ‘অফিসটা করেই এলাম। অবশ্য আমার কালকেই আসা উচিত ছিল, কিন্তু ছেলেটাকে হস্টেল থেকে রিলিজ করতে করতে সন্ধে হয়ে গিয়েছিল। তারপর আর আপনাকে ডিস্টার্ব করতে ইচ্ছে হল না। তাই আজ এলাম।’
—‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। আসলে আপনার কাছ থেকে কয়েকটা ব্যাপার জানার ছিল। তাই ডেকেছিলাম।’
সে বলে— ‘বলুন কী জানতে চান?’
—‘আচ্ছা, ওই কানাই দত্ত ছেলেটা আপনার কে হয়?’
—‘ও আমাদের গ্রামের ছেলে। রক্তের সম্পর্কে আমার কেউ হয় না। তবে ওরা খুবই গরিব আর ছেলেটা খুবই ইনটেলিজেন্ট। তাই ওকে পড়াশোনার জন্যে এখানে আনা।’
—‘তা আপনাদের গ্রামে এরকম গরিব আর ইনটেলিজেন্ট অনেক ছেলেই তো আছে। কিন্তু তাদের কাউকে আপনি কলকাতায় আনলেন না কেন?’
—‘দেশে তো কত শিক্ষিত বেকার আছে। তা সরকারের পক্ষে তাদের সবাইকে কি চাকরি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে, বলুন? ঠিক একই কারণে আমার একার পক্ষেও গ্রামের সব ছেলের দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব নয়। তবে প্রয়োজনে আমি তাদের পড়াশোনায় সাহায্য করে থাকি।’
সান্যালবাবু বুঝে যান যে রজনী সহজে ঘাবড়ে যাবার লোক নয়। এর কাছ থেকে কিছু জানতে হলে ঘুরপথে যেতে হবে। তাই বলেন— ‘আপনার ওই বাচ্চাটার গায়ে জুজুৎসুর পোশাক দেখলাম। তা এখানে ও কোথায় জুজুৎসু শেখে?’ রজনী বুঝতে পারে এটা হয় সান্যালবাবুর অজ্ঞতা, নয়তো উনি সব জেনেও একটা চাল দিচ্ছেন। তাই সে ঠিক করে— জবাব দিতে গিয়ে তাকেও কিছুটা আক্রমণাত্মক হতে হবে। তাহলে এই যুবক ওসি তাকে খুব একটা বেশি ঘাঁটাতে যাবে না। তাই সে খোলাখুলি বলে— ‘ও যেটা শেখে সেটা জুজুৎসু নয়। সেই খেলাটার নাম হল তাইকোন্ডো। একটা কোরিয়ান মার্শাল আর্ট। আর ওকে শুধু নয়, আমাদের গ্রামের আরও অনেক ছেলেকেই আমি ওটা শেখাই।’
সান্যালবাবু কখনো তাইকোন্ডোর নামটা শোনেনি। শুধু বুঝে গেলেন যে রজনী ওই মার্শাল আর্টটা ভালোমতোই জানে। তাহলে সে এটা শিখল কোথায়? তাই জিজ্ঞেস করেন— ‘তা আপনি এটা শিখলেন কোথায়?’
—‘আমার স্যার সুকুমার ভদ্র। উনি কোরিয়ায় গিয়ে এটা শিখেছিলেন। এখনও ওনার জোড়াসাঁকোর বাড়িতে উনি শেখান।’
—‘তা আপনি গ্রামের ছেলেদের এইসব শেখান কেন? কাউকে আক্রমণ করার জন্যে?’
—‘যেকোনো মার্শাল আর্টের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে আত্মরক্ষা করতে শেখা, বিনা কারণে কেউ আক্রান্ত হলে তাকে রক্ষা করা আর সুস্থ শরীর-মন গড়ে তোলা। কাউকে অযথা আক্রমণ করা নয়। তাই আমি ছেলেদের সেইগুলোই শেখানোর চেষ্টা করি মাত্র, যাতে তারা একদিন দেশের ভালো নাগরিক হয়ে উঠতে পারে। আর এই ব্যাপারে আমার স্যারের পূৰ্ণ সমর্থন আছে। ইচ্ছে হলে আপনারা তাঁকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন।’
রজনীর এই আক্রমণাত্মক জবাবে কিঞ্চিৎ বিব্রত হন ওসি। তাই অন্য প্রশ্ন করে রজনীকেও বিব্রত করতে চান। একটা কাগজের লেখা দেখতে দেখতে বলেন— ‘আচ্ছা, আপনি তো চাঁপাডাঙায় থাকেন। তা আপনি পুলিন বিশ্বাস, বিষ্টুচরণ, দিনেশ, শ্যামাদাস রায় আর সুরেশ বাগদিকে চেনেন নিশ্চয়ই।’
—‘চাঁপাডাঙা তো আর কলকাতা শহর নয়, যে কেউ কাউকে চিনবে না। তা একই গ্রামে যখন থাকি তখন ওদের আমি বিলক্ষণ চিনি বই কী। তবে আপনার প্রশ্ন শুনে মনে হচ্ছে যে আপনি আমার কাছ থেকে ওদের সম্বন্ধে আমি কী কী জানি, সেটাই জানতে চাইছেন।’
রজনীর এই উত্তরে মনে মনে একটু রাগ হয় যুবক ওসি কমল সান্যালের। কিন্তু তাঁকে জানতে হবে ওদের ব্যাপারে রজনী কতদূর কী জানে। তাই রাগ চেপে রেখে একটু গম্ভীর ভাবেই বলেন— ‘হ্যাঁ, ঠিক তাই।’
—‘প্রথমেই বলি পুলিনের কথা। আমি যাদের তাইকোন্ডো শেখাই পুলিন আর কানাই ছিল তাদের মধ্যে সেরা। তাই পুলিন যখন মারা যায়, তখন আমার খুবই কষ্ট হয়েছিল।’
—‘সেটাই স্বাভাবিক, বিশেষত যেখানে গুরুশিষ্যের সম্পর্ক থাকে। তা আপনার কি মনে হয় যে সত্যিই পুলিন পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত ছিল?’
—‘আমি তো খবরের কাগজ থেকে তাইই জেনেছি। ডিটেল তো আপনাদেরই জানার কথা।’
—‘আর বাকিরা?’
—‘গ্রামেই শুনতাম যে বিষ্টুচরণ, দিনেশ আর শ্যামাদাস রায় নাকি স্বদেশি করত। দেখতাম ওরা স্বদেশিদের তৈরি সাবান বিক্রি করত। এমনকী শ্যামাদাস রায় গ্রামের হাটতলায় একবার কোনো একজন শহুরে গায়ককে দিয়ে চারণকবি মুকুন্দদাসের গানের একটা প্রোগ্রামও করিয়েছিল। তবে কেন জানি না, বেশ কিছুদিন হল দিনেশ আর শ্যামাদাসকে গ্রামে দেখছি না। আর গ্রামের সবাই বলছিল যে বিষ্টুচরণকে নাকি নিশিতে ডেকে নিয়ে গিয়ে ঘাড় ভেঙে মেরে ফেলেছিল।’
—‘আপনিও কি নিশিতে বিশ্বাস করেন?’
—‘যা রটে তার কিছু তো বটে।’ ঘুরিয়ে উত্তর দেয় রজনী।
—‘কিছু তো বটে।…বাঃ, বেশ ভালো বলেছেন। আচ্ছা, মিস্টার রায়, বলুন তো, তাইকোন্ডো দিয়ে কি কারোর ঘাড় ভাঙা যায়?’
—‘তা যায় বই কী। তাইকোন্ডো শিখতে হলে মানুষের অ্যানাটমি জানতে হয়।’
—‘আপনি জানেন?’
—‘কেন জানব না? তা বিষ্টুচরণের ব্যাপারে কি আপনি আমাকে সন্দেহ করছেন?’
—‘না, মানে, সন্দেহ ঠিক নয়…তবে…।’ সদ্য যুবক ওসি যে এখনও পোক্ত হয়নি তা বেশ বুঝতে পারে রজনী।
তাই সে বলে— ‘আপনার কথার অর্থ আমি বুঝতে পেরেছি মিস্টার সান্যাল। প্রথমত বলি যে বিষ্টুচরণের সঙ্গে আমার কোনোরকম বিরোধ বা শত্রুতা ছিল না। দ্বিতীয়ত, আমি আগেই বলেছি যে তাইকোন্ডো মানুষকে আত্মরক্ষা করতে শেখায়, অকারণে মারতে নয়। আর যদি ধরেই নেন যে আমি তাকে মেরেছি, তাহলে বলি যে তার বডি কেন পুকুরের জলে পাওয়া যাবে? আর একটু মনে করে দেখুন তো, আপনাদের রিপোর্টে মনে হয় লেখা আছে যে তাকে দিনেশ ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। আর দিনেশ এবং বিষ্টু দু-জনেই কিন্তু স্বদেশি করত। তা ছাড়া দিনেশ কিন্তু বেশ কিছুদিন হল গ্রামছাড়া। কাজেই…।’
—‘তার মানে আপনি বলতে চাইছেন যে বিষ্টুচরণ আর দিনেশের মধ্যে তিক্ততা ছিল, আর সেই কারণেই দিনেশ বিষ্টুচরণকে…।’
কথাটা কেটে দিয়ে রজনী বলে ওঠে— ‘আমি কিছুই বলতে চাইছি না। ও ব্যাপারটা আপনাদের। আমি শুধুমাত্র যা জানি, সেটুকুই বললাম।’
—‘আচ্ছা বেশ, তা আপনিও কি স্বদেশি করেন?’ কথা ঘুরিয়ে দিতে ওসি বলেন।
—‘মুকুন্দদাসের গান শুনলেই যদি স্বদেশি করা হয়, তাহলে বলব যে চাঁপাডাঙা গ্রামের সব বাসিন্দাই স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত, কেন না তারা সেদিন সবাই মুকুন্দদাসের গান শুনতে হাটতলায় এসেছিল।’
এমন ত্যাড়াবাঁকা জবাব আশা করেননি কমল সান্যাল। তবু রজনীকে খোঁচা দেন— ‘আপনি তাহলে কি সশস্ত্র বিপ্লবীদের সমর্থন করেন?’
—‘তা আমি নেতাজি সুভাষচন্দ্রের মতো সশস্ত্র সংগ্রামী মানুষকে শ্রদ্ধা করি বটে। আর সেইসঙ্গে একটা কথা আমি বলতে চাই যে, আমি আপনারই মতো একটা সরকারি অফিসে কাজ করি আর সেখানে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেবার আগে ক্যান্ডিডেটের পাস্ট হিস্ট্রির পুলিশ ভেরিফিকেশন করা হয়। আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।’ আবার পালটা খোঁচা দেওয়া জবাব।
—‘আর সুরেশ বাগদি? সে তো আপনার খাস লোক ছিল। তা তাকে কেন মরতে হল?’ এই প্রশ্নটা রজনীর কাছে বড়ো নির্মম। তাই সে একটু চুপ করে থাকে। তার এই ক্ষণেকের মৌনতা কমল সান্যালকে উৎসাহিত করে। মনে মনে উনি ভাবেন— বড়ো মোক্ষম জায়গায় আঘাত করেছেন উনি। তাই ফের বলেন— ‘কী হল মিস্টার রায়? কিছু বলছেন না কেন?’
—‘ছোটোবেলা থেকে যে আমাকে মানুষ করেছে, তার সম্বন্ধে আমি আর কি বলব? তবে এইটুকু বলতে পারি যে সুরেশ কাকা শুধু আমাদের ভাগচাষীই ছিল না, সে ছিল আমার বাবার মতো। আমি যেমন তাকে মান্য করতাম, তেমনই খুব ভালোওবাসতাম। শুধু আমি কেন, আমার কাছে যে সমস্ত ছেলেরা তাইকোন্ডো শিখতে আসে তারাও তাকে আমারই মতো মান্য করত আর ভালোওবাসতো। তাই সুরেশ কাকা মারা যেতে আমরা সবাই, এমনকী গ্রামের লোকেরাও খুব কষ্ট পেয়েছিল।’
—‘আপনার সুরেশ কাকা তো মার্ডার হয়েছিলেন। ওঁকে শুট করা হয়েছিল। তা আপনার কী মনে হয়, ওনাকে কেন শুট করা হয়েছিল? ওনার কি কোনো শত্রু ছিল?’ রজনী বুঝতে পারে যে ওস. কমল সান্যাল তার কাছ থেকে কোনো ক্লু আশা করছে। তাই সে বলে— ‘ওই মানুষটার কোনো শত্রু থাকতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি না। শুধু আমি কেন, গ্রামের কেউই তা বিশ্বাস করে না।’
—‘তাহলে ওঁকে মারল কে? আর কেনই বা মারল? আপনি কি জানেন যে ওঁকে পয়েণ্ট থ্রি টু কোল্ট রিভলভার থেকে শুট করা হয়েছিল?’
—‘ওঁকে কে মারল আর কেনই বা মারল সেটা তো আপনারা খুঁজে বের করবেন বলেই আমি আশা রাখি। ওটা আপনাদের ভাবনার বিষয়। আমি শুধু সুরেশ কাকার সম্বন্ধে যা জানি সেটাই আপনাকে বললাম। শান্ত গলায় বলে রজনী।
এইসব শুনে ওসি-র মনে হয় লোকটাকে বরং সরাসরি একটা প্রশ্ন করা যাক। তাই তিনি বলেন— ‘আচ্ছা মিস্টার রায়, পিটার ব্রাগানজাকে কি আপনি চেনেন?’
—‘তা খবরের কাগজের মাধ্যমে চিনি বটে। উনিই সেই অফিসার যিনি ধর্মতলার প্রতিবাদীদের মিছিলে টিয়ার গ্যাসের শেল ব্যবহার করেছিলেন আর সেইসঙ্গে লাঠিচার্জও করেছিলেন। আর কাগজে এটাও পড়েছি যে উনি আত্মহত্যা করেছেন।’
—‘আপনি তো জানেন যে বাগবাজারের গঙ্গার ধারের যে বাড়ি থেকে আপনাদের বাচ্চাটাকে উদ্ধার করা হয়েছিল সেটা পিটারের বাড়ি?’ একটা টোপ ফেলে রজনীকে বাজিয়ে দেখতে চান ওসি।
রজনীও বুঝতে পারে যে টোপ দেওয়া হয়েছে।
তাই সে অবাক হয়ে বলল— ‘তাই নাকি! ওটা পিটার ব্রাগানজার বাড়ি? কিন্তু থানা থেকে কাল আপনারা যে ফোন করেছিলেন তাতে তো সেকথা বলেননি। এখন আপনার মুখেই শুনছি যে ওটা পিটারের বাড়ি। আর আপনারাই তো কাল বলেছিলেন যে কানাইকে একটা খুব নোটোরিয়াস গ্যাং তুলে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পিটার তো মারা গেছে। তাহলে কি ওই নোটোরিয়াস গ্যাং-এর সঙ্গে পিটারেরও একসময় যোগাযোগ ছিল; নইলে ওরা কানাইকে নিয়ে ওখানে তুলবে কেন?’
এবারে উলটোচালে বিপাকে পড়ে যান ওসি কমল সান্যাল। কিন্তু উনি ভাঙবেন, তবু মচকাবেন না। তাই নিজের টোপ নিজেই গিলে নিয়ে বলেন— ‘দেখুন মিস্টার রায়, পিটারের সঙ্গে কোনো নোটোরিয়াস গ্যাং-এর যোগাযোগ ছিল কি না তা আমরা তদন্ত করে দেখছি। তবে আমাদের মনে হয়েছে যে, আপনার স্টুডেন্ট কানাইকে হয়তো বা ভুল করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে এখন আপনি আসতে পারেন। আপনার সময় নষ্ট করার জন্যে খুবই দুঃখিত। তবে পরে কখনো কোনো প্রয়োজন হলে আপনাকে ডাকতে পারি। আশাকরি আপনার সাহায্য পাব।’
—‘নিশ্চয়ই। আপনাদের কাজে লাগলে আমি খুশিই হব। তা আমার বাড়ির ফোন নম্বর তো আপনাদের কাছেই আছে, এখন আমার অফিসের নম্বরটাও একটু লিখে নিন। আসলে মেসোমশাই তো রিটায়ার্ড মানুষ, বয়সও হয়েছে; টেনশনে ভোগেন। তাই ওনাকে ডিস্টার্ব না করাই ভালো।’
ওসি কমল সান্যাল রজনীর অফিসের নম্বরটা নোট করে রাখেন আর রজনীও তাঁকে নমস্কার জানিয়ে থানা থেকে বেরিয়ে আসে।
বাড়ির পথে হাঁটতে হাঁটতে রজনী মুচকি মুচকি হাসে আর মনে মনে বলে— ওসি, তুমি আমার পেছনে ফেউ লাগাবে তো জানিই। তা লাগাও লাগাও, ফেউ লাগাও আমার পেছনে। দেখি তোমাদের ফেউয়ের কত ক্ষমতা।
.
ঢাউস টেবিলটার বিপরীত দিকে বসে আছেন আর্নল্ড থিহা। মূল চেয়ারটা খালি। ওখানে বাবা এসে বসবেন। তাঁর পরামর্শ নেবার জন্যেই তাঁকে খবর পাঠিয়েছেন আর্নল্ড। কতকগুলো নিতান্তই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে আজ। ক্যালকাটার ব্যবসার ব্যাপারে। তাই বাবার মতামত খুবই দরকার। যদিও বিশেষ কারণ না থাকলে ব্যবসার ব্যাপারে বাবা আজকাল মোটেই মাথা ঘামাতে চান না, নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটাতে আর বই পড়তেই ভালোবাসেন উনি; তবুও আজকে তাঁকে খুবই দরকার। বাধ্য হয়েই তাই আর্নল্ড আজ ডেকে পাঠিয়েছেন তাঁকে। রজনী আর দু-জন ট্রাক ড্রাইভারের ব্যাপারে নিজে কিছু ডিসিশন নিয়েছেন। বাবাকে সেগুলো জানানো দরকার।
আর্নল্ড চাইলে সুপারি-কিলার দিয়ে রজনীকে শুট করিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু বাচ্চাটা কিডন্যাপ হওয়ার পর থেকে রজনীর পেছনে এখন পুলিশের ফেউ ঘোরে। আবার যে দু-জন ড্রাইভার পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে, তারা যদিও এখন পুলিশের ইন্টারোগেশনের সামনে পড়ার মতো শারীরিক অবস্থায় নেই, তবুও দু-একদিনের মধ্যেই হয়তো পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করবে। সেটা আটকাতে হবে। হরিশরণ ফোনে তাঁকে জানিয়েছে সব। এমনকী তাঁর লোক ভিজিটিং আওয়ারে হাসপাতালে ঘুরেও এসেছে। তাই ওই ড্রাইভারদের জন্যে একটা প্ল্যানও ছকে রেখেছে উনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্যালকাটার পলিটিক্যাল ঝুটঝামেলা। তাই এইসব কিছুর জন্যেই বাবাকে আজ বড়ো দরকার আর্নল্ডের।
এমনসময় পেছনের দরজা খুলে যায়। জ্বলন্ত চুরুট হাতে হাসি হাসি মুখে ঘরে ঢুকে আঙ থিহা তাঁর চেয়ারে বসতে বসতে বলেন— ‘গুড মৰ্নিং। মনে হচ্ছে তুমি খুব সমস্যায় আছ, নইলে…। তা তোমার সমস্যাগুলো কী শুনি?’ তারপরে চুরুটটা অ্যাশট্রেতে রেখে দেন আলতো করে। ঘরটা ভরে যায় চুরুটের গন্ধে।
আর্নল্ড তাঁকে সব ব্যাপারগুলো বলেন, এমনকী তাঁর নিজের বর্তমানের প্ল্যানগুলোও। চোখ বুজে চেয়ারে মৃদু মৃদু দোল খেতে খেতে শুনতে থাকেন আং থিহা। আর্নল্ডের বলা শেষ হলে তবেই চোখ খোলেন বৃদ্ধ।
—‘দেখ, তোমাদের আগের প্ল্যান সম্বন্ধে আমি কিছুই জানতাম না। তবে বুঝতে পারছি যে তোমাদের প্ল্যান ফুলপ্রুফ ছিল না। তবে সেদিন ওই ট্রাক ড্রাইভারদের পেছনে দুজন শার্প-শুটার বাইক রাইডার লাগিয়ে দিলেই ঝামেলা মিটে যেত। তারা ড্রাইভার দু-জনকে শুট করে বাইক নিয়ে গলি দিয়ে পালাত। ক্যালকাটায় তো আর ন্যারো গলির অভাব নেই। যাইহোক, সমস্যা যখন আসে, জানবে তার পেছনে সেটার সলিউশনও লুকিয়ে থাকে। শুধু খুঁজে নিতে হয়।’ একটু থামেন ডন আঙ থিহা। তারপরে বলেন— ‘তাহলে এখন তোমার সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হল ওই ধরা পড়া ড্রাইভার দু-জন। কী তাই তো?’
—‘হ্যাঁ বাবা। ওরা মুখ খুললেই বিপদ। তাই আমি ওদের জন্যে সায়ানাইডের কথা ভেবেছি।’
ভুরুদুটো একটু কুঁচকে যায় ডনের। তারপরে বলেন— ‘তা সায়ানাইড কী করে দেবে শুনি? তা ছাড়া দ্যাখো, এইসব সাইলেন্ট-কিলার আমার যদিও পছন্দ নয়, কিন্তু এইক্ষেত্রে আমার মনে হয় সায়ানাইডের চেয়ে স্ট্রিকনিন অনেক বেশি উপযুক্ত।’
—‘কেন বাবা? সায়ানাইডের চেয়ে স্ট্রিকনিন কেন ভালো? সায়ানাইডে তো মৃত্যুর গ্যারান্টি লেখা থাকে।’
—‘সেটাই তো এইক্ষেত্রে প্রবলেম।’
আঙ থিহা শুধু মিটিমিটি হাসতে থাকেন। ছেলেও বুঝে যায় যে ডন তার এই প্রশ্নের জবাব দেবেন না। হয়তো সময়ই বলে দেবে যে এইক্ষেত্রে সায়ানাইডের চেয়ে স্ট্রিকনিন কেন ভালো। হয়তো এইভাবেই বাবা তাকে জটিল সমস্যার উপযুক্ত সমাধান শেখাতে চান। আর তা ছাড়া সায়ানাইড দেবেই বা কী করে হরিশরণের লোক? যাইহোক, সেটা হরিশরণের ব্যাপার। শুধু তাকে স্ট্রিকনিনের ব্যাপারটা জানিয়ে দিতে হবে। তাই সে তার দ্বিতীয় প্রশ্ন করে বাবাকে।
—‘বেশ, তাহলে বলুন, এখন রজনীকান্তকে নিয়ে কী করা যায়?’
—‘আমি বলি কী, এইমুহূর্তে তাকে নিয়ে চিন্তার তেমন কারণ নেই। সে তো নিজে আমাদের নেটওয়ার্কে নাক গলায়নি। পিটার আর শ্যামাদাসের এক্সট্রিম গ্রিড আর তার ডিয়ারেস্ট পার্সনদের মৃত্যু তাকে বাধ্য করেছিল আমাদের ব্যবসায় নাক গলাতে। তুমি আর হরিশরণ তো চেষ্টা করেছিলে তাকে শেষ করে দিতে, কিন্তু পারলে কি? সে তার বুদ্ধি আর ক্ষমতা দিয়ে ঠিক নিজের কাজ সেরে বেরিয়ে গেল। তাই বলছিলাম কি, তার নিজের যেটা করার দরকার ছিল, সে সেটা করে নিয়েছে। তা ছাড়া দেখাই যাক না, পুলিশ তার কী করে? তবে আমার মনে হয়, সে আমাদের আর ঘাঁটাতে আসবে না। আর যদি আবার কখনো আসে, তখন না হয় দেখা যাবে।’
রজনীর সম্বন্ধে বাবার কী ধারণা তা পরিষ্কার হয়ে যায় আর্নল্ডের কাছে। তাঁর মনে হয়, বাবা হয়তো ঠিকই বলেছেন। দেখাই যাক না রজনী কী করে এর পর। তাই পরের পরামর্শের জন্যে বলেন— ‘বাবা, বলছিলাম কী, হরিশরণ বলছিল যে ক্যালকাটার এখনকার পলিটিকাল সিচুয়েশন আমাদের ব্যবসার পক্ষে ভালো নয়। তা ছাড়া এখন সেখানে পিটারের মতো একজন প্রভাবশালী লোক আমাদের হাতে নেই। তাই, ক্যালকাটায় আবার একটা স্ট্রং নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে আমাদের সময় লাগবে। তা এই ব্যাপারে আপনার কী মত সেটা যদি বলতেন…’
এবারে স্মিত হাসলেন আঙ থিহা। অ্যাশট্রে থেকে তুলে নিলেন তাঁর চুরুটটা। সেটা ঠোঁটে ঝুলিয়ে টান মারতে গিয়েই বুঝলেন যে আগুনটা নিভে গেছে। তখন তাঁর কোটের বাঁ-পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনলেন দেশলাইয়ের বাক্স। একটা কাঠি জ্বালাতে গেলেন। সেটা জ্বলল না। তাই কাঠিটা অ্যাশট্রেতে ফেলে আবার একটা কাঠি বের করলেন। সেটারও একই হাল। এইভাবে তিন-চারটে কাঠি নষ্ট হতে উনি দেশলাইয়ের বাক্সটাই অ্যাশট্রেতে রেখে তাঁর কোটের ডান পকেট থেকে একটা লাইটার বের করে আনলেন। একবার ক্লিক করতেই সেটা জ্বলে উঠল। তাই দিয়ে চুরুটটা ধরিয়ে আরাম করে চেয়ারে হেলান দিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে বললেন— ‘I always like to keep a better substitute, my son.’
আর্নল্ড বুঝে গেলেন ডন কী বোঝাতে চাইছেন। তাই উনি বললেন— ‘তাহলে বলুন, ক্যালক্যাটা থেকে কোথায় ব্যবসা সরিয়ে নেওয়া যায়?’
বৃদ্ধ আঙ থিহা স্মিত মুখে মাথার চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন— ‘আজ রাত আটটার পরে হরিশরণের সঙ্গে কথা বল। তার আগে নয়। আশা করি তুমি তোমার সব উত্তর পেয়ে যাবে। যাইহোক, এবার তাহলে আমি উঠি। আর হ্যাঁ, শোনো, টেনশন আমাদের ব্যবসার একটা পার্ট। তাই টেনশনকে ডমিনেট করে একটু চিলড থাকার চেষ্টা কর। আ কুল ব্রেন অলওয়েস অ্যাক্টস বেটার।’
তারপরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ধীরপায়ে দরজার পেছনে অদৃশ্য হয়ে গেলেন বৃদ্ধ ডন আং থিহা। পেছনে ফেলে গেলেন শুধু তাঁর চুরুটের গন্ধ।
.
হাসপাতালের পাশাপাশি বেডে শোওয়া দু-জন ট্রাক ড্রাইভার। এখনও বেহুঁশ তারা। অপারেশন হয়েছে বটে, তবুও কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। তাদের একহাতে স্যালাইনের ছুঁচ গোঁজা আর অন্যহাতে লাগানো হ্যান্ডকাফ বেডের গায়ের রেলিংয়ের সঙ্গে আটকানো। দুটো বেডের মাঝখানে একটা টুলে বসে একজন কনস্টেবল। দুই রোগীরই দু-জন করে বাড়ির লোক এসেছে তাদের দেখতে। কিন্তু তারা শুধুই বেডের পাশে দাঁড়িয়ে। বেডে শোওয়া মানুষ দু-জন যে জ্ঞানহীন। এমন সময় বেজে উঠল ঘন্টি। ভিজিটিং আওয়ার শেষ। তবুও বাড়ির লোকজন যেন বেড ছেড়ে যেতে চায় না। এই সময়টায় ডাক্তার বা নার্স কেউই থাকে না বেডের পাশে। ভিজিটিং আওয়ার শেষ হলে, ওয়ার্ড ফাঁকা হলে তবেই ডাক্তার আর নার্সেরা আসবেন। রোগীদের দেখবেন আর তারপরে একজন জুনিয়ার ডাক্তার বিল্ডিং এর নীচে অপেক্ষারত পেশেন্ট পার্টিকে পেশেন্টের নাম ধরে ধরে ডেকে তার পরিজনদের জানাবেন রোগীর অবস্থা।
—‘কী হল? বেল পড়ে গেছে আর তবুও আপনারা দাঁড়িয়ে? যান, নীচে যান।’ একজন সাদা অ্যাপ্রন পরা নার্স হালকা ধমক দেন বেডের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকেদের। ধমক খেয়ে তারা বেড ছেড়ে নীচে যাবার পথ ধরে।
নার্সের হাতে একটা ছোটো এনামেলের ট্রেতে দুটো সিরিঞ্জ ভরতি জলরঙা ওষুধ। পেশেন্টের মাথার পাশে রাখা টুলে ট্রেটা রেখে একটা সিরিঞ্জ তুলে নেন উনি। তারপরে একজন ট্রাক ড্রাইভারের হাতে লাগানো স্যালাইনের বোতলের মুখের রবারের ছিপিতে নিডলটা ঢুকিয়ে সিরিঞ্জের পুরো ওষুধটা পুশ করে দেন বোতলের ফ্লুয়িডে। বোতলের ফ্লুয়িড আর জলরঙা ওষুধ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। একইভাবে দ্বিতীয় জনের বোতলেও পুশ করে দেন ওষুধ। তারপরে সিরিঞ্জ আর ট্রে তুলে নিয়ে ওয়ার্ডের বাইরে বেরিয়ে যান। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই ছোটো ট্রে আর সিরিঞ্জদুটো অদৃশ্য হয়ে যায় অ্যাপ্রনের পকেটে।
নীচে, একটু দূরে অপেক্ষা করে আছে একটা অ্যাম্বুল্যান্স। নার্স গিয়ে সোজা উঠে বসেন সেই গাড়িতে। স্টার্ট নিয়ে হাসপাতালের মেনগেট দিয়ে বেরিয়ে অ্যাম্বুল্যান্সটা মিশে যায় কলকাতার রাজপথের গাড়ির মিছিলে।
.
সেদিন রাত সাড়ে আটটা নাগাদ ফোন বেজে ওঠে হরিশরণের দোকানের গদিতে। হরিশরণ ফোনটা রিসিভ করতেই ভেসে আসে আর্নল্ডের গলা। হরিশরণের কাছ থেকে বিস্তারিত জেনে বিস্মিত হয়ে যান আর্নল্ড। নার্স যাতে পালাবার জন্যে হাতে পনেরো-বিশ মিনিট সময় পায় তাই তাঁর বাবা সায়ানাইডের বদলে স্ট্রিকনিনের ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন হরিশরণকে। আর কলকাতা থেকে কোথায় ব্যবসা সরানো হবে তা জানতে চাইলে হরিশরণ বলে যে— বোম্বাইয়ের ক্রফোর্ড মার্কেটে একটা সাইকেলের দোকান আছে। সেখানে কাজ করত হায়দার মির্জা নামের উনিশ বছরের একটা ছেলে। এখন দোকানটা অবশ্য তার বাবা চালায় আর ছেলে এখন দু-বছর হল বোম্বাইয়ের পোর্টে কুলির কাজ করে। অল্পবয়েস হলে কী হবে, করিম লালার সঙ্গে হাত মিলিয়ে সেইসঙ্গে সে চালায় জুয়ার ঠেক, বেআইনি মদের আড্ডা, হ্যাসিস আর নানান জিনিসের স্মাগলিং। লোকে তাকে মস্তান হায়দার মির্জা বলে ডাকে। নিজে সরাসরি কোনো ঝামেলায় থাকে না, যা করার থাকে সেটা তার আর করিম লালার দলের লোকেরাই করে। এখন যোগাযোগ করতে হবে তার সঙ্গে। তাই আরও দিন পনেরো সময় চাই। ডন বলেছেন, হরিশরণ নিজেই যেন সেই উদ্যোগটা নেয়।
সব শুনে আর্নল্ড বোঝেন— ডন হলেন ডনই। তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। বাবার প্রতি সম্ভ্রমে আপনা থেকেই মাথা নীচু হয়ে যায় তাঁর।
