১৯৪৪, ডিসেম্বর – কানাইয়ের প্রস্তুতি, হুগলিতে শ্যামাদাস আর রজনীগন্ধার গলি
—‘মা, মা, দ্যাখো, স্যার এসেছে।’ রজনী তাদের বাড়িতে ঢোকার আগেই দৌড়ে আসে কানাই। কাছে যেতেই কানাইয়ের মা ঘোমটা ঠিক করতে করতে একটা আসন পেতে দেয় দাওয়ায়। রজনী বসে বলে— ‘কলকাতায় কানাইয়ের স্কুলে ভরতির ব্যবস্থা পাকা হয়ে গেছে। পাঁচ ক্লাসে ভরতি হবে। হিন্দু স্কুলে। কলকাতার খুব নামকরা স্কুল।’
—‘তা ও থাকবে কোতায়?’
—‘বউবাজারে আমার কাছেই। সকালে দু-জনে দুটো ভাত খেয়ে বেরিয়ে পড়ব। আমার বাড়ি থেকে হাঁটাপথেই ওর স্কুল। তারপর বিকেল চারটের সময় ছুটি হলে ও বাড়িতে এসে জলখাবার খেতে খেতেই আমি পৌঁছে যাব।’ ইচ্ছে করেই হস্টেলের কথাটা চেপে যায় রজনী। নইলে কানাইয়ের মা ওকে কলকাতায় যেতে দেবে না।
—‘তবে কি জানো, কলকাতার যা খপর শুনচি-বোমা পড়চে, লোকে খাবার পাচ্চে না। তাই বড়ো চিন্তে হয়।’
—‘ওই ব্যাপারে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। ওকে আমি….আঃ ছাড় বলছি। গলায় লাগছে।’ এই শেষের কথাটা কানাইকে বলা। ও পেছন থেকে রজনীর গলা জড়িয়ে ধরেছে আনন্দে। অনেকদিন পরে স্যার এসেছে যে তাদের বাড়িতে।
—‘তা, শুনেচো তো গেরামের অবস্তা। ইস, কী সাংঘাতিক বল তো। দু-দু-জনকে নিশিতে ডেকে নে গ্যালো। একজনকে তো ঘাড় মটকে মারলে আর আরেকজনের কোনো চিন্নত নেই। আমি বাপু কানাই আর ওর বাপকে পইপই করে বলে দিয়েচি রেতে কেউ ডাকলে ওরা দরজা যেন না খোলে।’
—‘তা ঠিকই বলেছেন।’
—‘তাহলে স্যার, আমরা কবে যাব?’ প্রশ্নটা কানাইয়ের।
রজনী হেসে বলে— ‘দাঁড়া, দাঁড়া, ক-দিনের ছুটিতে এসেছি। এই ক-দিন একটু গ্রামটায় থাকতে দে। তারপর এই মাসের শেষের দিকে আমরা না হয় কলকাতায় যাব। সেখানে একদিন তোকে নিয়ে গিয়ে স্কুলে ভরতি করে দিতে হবে। নতুন বই, নতুন স্কুলের জামা, জুতো এসব কিনতে হবে তো।’
—‘তুমি আমায় পড়া দেখিয়ে দেবে তো? আর বইগুলো কি সব ইংরিজিতে লেখা?’
—‘ওরে পাগলা, না না। তবে হ্যাঁ, ইংরাজির জন্যে বই তো থাকবেই। সেগুলো তো ইংরাজিতেই হবে। তবে বাকি বই সব বাংলায় লেখা। আর আমি অফিস থেকে এসে তোকে পড়তে বসাবো, বুঝলি?’
কানাইয়ের মা চা-মুড়ি দিয়ে যায়। রজনী মুড়ির বাটিটা কানাইয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে— ‘নে, এখান থেকে খা।’
কানাইয়ের মা হাঁ হাঁ করে ওঠে— ‘না না, তুমি খাও। ও একটু আগেই খেয়েচে।’ কানাই কিন্তু ততক্ষণে এক খাবলা মুড়ি তুলে নিয়েছে তার স্যারের বাটি থেকে।
একমুঠো মুড়ি তুলে নিয়ে রজনী বললে— ‘বাড়ন্ত বয়েসের খিদে। আর যা লাফঝাঁপ করে সারাদিন..।’
—‘তা যা বলেচো।’
—‘স্যার তুমি আমায় জাদুঘর দেখাবে তো? তুমি তো ওখানে চাকরি কর।’
—‘দেখাব, দেখাব। সব দেখাব। জাদুঘর দেখবি, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখবি, মনুমেন্ট দেখবি, চিড়িয়াখানা দেখবি।’
—‘দোতলা বাসে চড়াবে?’
—‘চড়াব। ট্রামেও চড়াব।’
কানাইয়ের খুশি আর ধরে না। রজনীরও মনে আনন্দ। নিজের প্রিয় শিষ্যকে সে নিজের মতো করে গড়ে তুলতে পারবে। তবে তার থেকেও বড়ো স্বস্তি যে কলকাতায় থাকলে পুলিনের মতো শ্যামাদাস আর কানাইকে কব্জা করতে পারবে না।
চা-মুড়ি শেষ করে রজনী বলে— ‘তাহলে আমি আসি। একটা ব্যাগে ওর জামাকাপড় গুছিয়ে রাখবেন। সোয়েটার আর চটিও দিয়ে দেবেন। তবে কম্বল-টম্বল দিতে যাবেন না। ওখানে সব আছে।’
—‘আচ্ছা তাইলে এসো। সাবধানে ফিরো। আমি সব গুচিয়ে রাকবোকন। এই কানাই স্যারকে একটু এগিয়ে দে আয়।’
কানাই রজনীর পাশে পাশে তার হাত ধরে চলে। কিন্তু হঠাৎই একটা প্রশ্ন মনে পড়ে যায় তার।
সে বলে— ‘আচ্ছা স্যার, একটা কথা বলবে? নিশি কি হরবোলা?’
থমকে দাঁড়িয়ে যায় রজনী। স্থির দৃষ্টিতে কানাইয়ের দিকে একটুখানি তাকিয়ে থেকে কিছুটা গম্ভীর স্বরে বলে— ‘ও নিয়ে তোমায় ভাবতে হবেনা। তুমি শুধু রাত্তিরে দরজা খুলবে না ব্যাস; এমনকী আমি ডাকলেও নয়। বুঝেছ?’
কানাই মাথা হেলিয়ে সায় দেয়।
.
সেদিন বাড়ির টিউবওয়েলের জলে চান করছিল রজনী। পাতলা একচিলতে সাবান গায়ে মাখতে বেশ অসুবিধেই হচ্ছিল। মাথায় মাখার পরেই সেটা হড়কে বেরিয়ে গেল তার হাত থেকে। এদিকে মাথা থেকে সাবানজল গড়াচ্ছে। তাই সে হেঁকে বলল— ‘ও সুরেশ কাকা, আমার তাকে যেখানে কলম রাখা আছে, সেখান থেকে একটা সাবান দাও তো।’
—‘হ্যাঁ দিচ্চি’ বলে সুরেশকাকা একটা সাবান এনে দেয়। মাথার সাবানজল পাছে চোখে ঢুকে যায় তাই রজনী হাঁতড়ে হাঁতড়েই প্যাকেট থেকে সাবান বের করে সেটা জলে ভিজিয়ে গায়ে মাখতে শুরু করে। কিন্তু রোজ যে সাবানটা সে মাখে,এটার গন্ধ তো তেমন নয়। কেমন যেন জুঁইফুলের মতো গন্ধ। সুরেশকাকা কি তাহলে অন্য কোনো সাবান কিনে এনেছে? যাইহোক, সে চোখ বন্ধ করেই গায়ে পিঠে সাবান ঘষতে থাকে। শীতের দিনে এই খোলা কলতলায় গায়ে রোদ্দুর মেখে চান করায় ভারি আরাম। তাই গায়ে ভালো করে সাবান ঘষতে থাকে রজনী। কিন্তু হঠাৎই সাবানটা আবার হাত ফস্কে বেরিয়ে গেল। কিন্তু কোথায় পড়ল? শব্দ শুনে মনে হল যে পেছনে পড়েছে; কিন্তু সাবান তো হড়কে অন্য জায়গায় সরে যায়। এখন চোখ-মুখের ফেনা না ধুলে তো সেটা তোলা যাবে না। তাই বালতি থেকে জল নিয়ে মুখটা ভালো করে ধুয়ে কলতলার মেঝের দিকে তাকায় রজনী। কিন্তু এ কী? সাবানটা মেঝেতে দুটো টুকরো হয়ে পড়ে আছে আর তার ভেতরটা নারকেলের মতো ফাঁকা। সেই ফাঁকেতে একটা সেলোফেনের কাগজে মোড়া সাদা মতো কী একটা রাখা। প্যাকেটের মুখটা সুতো দিয়ে বাঁধা। কৌতূহলে রজনী সেলোফেনের প্যাকেটটা তোলে। ভেতরে সাদা গুঁড়োর মতো কী যেন আছে। এটা কী? সাবানের মধ্যে এটা এলই বা কী করে? কেমন সাবান এটা? তাই নজর একটু ঘোরাতেই তার চোখে পড়ে সাবানের প্যাকেটটার ওপরে। আর তাতেই আশ্চর্য হয়ে যায় সে। আরে, এটা তো পিটারের ঘর থেকে আনা সাবানের একটা। ওপরে লেখা ‘স্বদেশি সাবান’। তাহলে সাবানের মধ্যে এই সাদা গুঁড়োটাই পাচার করে শ্যামাদাস আর তার দলবল। নারকোটিক্সের পিটার কি সেটা সন্দেহ করেই তাহলে পুলিনের প্যাকেট নিয়ে গিয়েছিল তার ঘরে?
আজ শনিবার। অতি ভোরে বেরিয়ে যায় শ্যামাদাস। কলকাতা গিয়ে নানান কাজ সেরে যখন সে হুগলির তেমাথায় মহামায়া মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে ঢুকল তখন প্রায় সাড়ে পাঁচটা বাজে। শীতের দিন। সন্ধে নেমে গেছে। একটা কোণের টেবিলে বসে কাঁধের ব্যাগটা টেবিলে রাখল। ব্যাগটা বেশ ভরতি। তারপর একগ্লাস জল খেয়ে হাঁক দিল— ‘ভবেশ, কচুরি দে।’
দোকানে মোটামুটি বিক্রিবাটা হয়। দু-একজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে। তবে শ্যামাদাসের টেবিলের কাছাকাছি কেউ বসে নেই। এটাই চায় শ্যামাদাস। ভবেশের সঙ্গে তার কথাবার্তা আর কেউ যেন শুনতে না পায়। একটু পরেই ভবেশ কচুরি নিয়ে এল। শালপাতার থালাটা কাছে টেনে নিয়ে ইশারায় সে ভবেশকে বলল তার মুখোমুখি বসতে।
তারপরে বললে— ‘আজ রাত্তিরে আসিস। তা হ্যাঁ রে, বিশে, নগাই, মদনাদের ঠিক রেখেছিস তো? দেখিস বাবা, ওরা যেন বিগড়ে না যায়।’
—‘হ্যাঁ কাকু, ওরা সব ঠিক আছে। তবে কাল একজন এসে তোমার বাড়ির খোঁজ করছিল। সে নাকি তোমার বাড়িটা কিনতে চায়। কার কাছ থেকে যেন খোঁজ পেয়ে এসেছে।’ ভুরু দুটো কুঁচকে যায় শ্যামাদাসের। সে তো বাড়ি বিক্রি করবে বলে কাউকে বলেনি। বিক্রি করার প্রশ্নও ওঠে না। তাহলে এই লোকটা খবর পেল কোথা থেকে? কে এই লোকটা? পুলিশের লোক নয়তো? নাকি অন্য গ্যাংয়ের কেউ? এই লাইনে তো টক্কর লেগেই আছে। নেহাত কলকাতায় তার ভালো যোগাযোগ আছে বলেই কেউ তাকে ঘাঁটাতে চায় না। তাহলে কে এসেছিল? তবে যেইই এসে থাকুক না কেন, সে জানে যে এখানে তার বাড়ি আছে।
তাই একটুকরো কচুরি মুখে পুরে চশমার কাঁচের ওপর দিয়ে তাকিয়ে ভবেশকে সে বলল— ‘লোকটাকে দেখতে কেমন? লক্ষ্য করেছিলিস ভালো করে?’
—‘হ্যাঁ, লম্বা, তবে খুব একটা বেশি লম্বা নয়। চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা আর কপালের বাঁ-দিকে একটা খয়েরি রঙের জড়ুল। মাথার মাঝখানে সিঁথি, পাতা পেড়ে চুল আঁচড়ানো আর গোঁফ নেই।’ একটু থামে ভবেশ। আরও কিছু মনে করতে চেষ্টা করে।
আবার কচুরির টুকরো মুখে পুরে শ্যামাদাস বলে— ‘আর?… আর কিছু?’
—‘লোকটা এই তোমার কান পর্যন্ত লম্বা হবে বলে মনে হয়। আর…হ্যাঁ, সাদা ধুতি আর নীল শার্টের ওপরে কালো কোট পরেছিল। কোটের পকেটে ছিল চেন লাগানো ঘড়ি। একবার বের করে টাইমও দেখেছিল। আর হ্যাঁ, লোকটার গা থেকে সেন্টের গন্ধ বেরোচ্ছিল। দেখে তো মনে হল পয়সা আছে।’
—‘বয়েস কত?’
—‘তা এই তোমারই মতো হবে।’
—‘তুই কি তাকে আমার বাড়ির খোঁজ দিয়েছিলিস?’
—‘কি যে বল কাকু, তাই কখনো কেউ দেয়? আমি বলেছি যে আমি ওই নামের কাউকে চিনি না। তারপর লোকটা মালিককেও জিজ্ঞেস করেছিল। মালিকও ওই একই কথা বলেছে।’
—‘আচ্ছা। তা লোকটা গেল কোন দিকে সেটা খেয়াল করেছিলিস?’
—‘ওই কুমোর গলির দিকে।’
—‘ঠিক আছে। তুই এখন কাজে যা। আর শোন, তুই তাহলে আজ আর রাত্তিরে আসিস না। আর তোর কাকা এলে তাকেও বারণ করে দিস। আর আবার ওইরকম কেউ এলে তার ওপরে বিশেষ করে নজর রাখবি, বুঝলি?’
—‘আচ্ছা কাকু’ বলে ভবেশ চলে গেল নিজের কাজে। আর কচুরি খেতে খেতে শ্যামাদাস ভাবতে থাকে— তার নিজের হাইট পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চি; আর লোকটা যদি তার কান পর্যন্ত লম্বা হয়, তাহলে তার হাইট হবে প্রায় পাঁচ ফুট সাত বা সাড়ে সাত ইঞ্চি। আর লোকটা কুমোর গলির দিকে গিয়েছিল। সে যদি তার বাড়িটা দেখে থাকে? বাড়ির দরজায় তো তার আর তার বাবার নামও লেখা আছে। ওই লোকটা সেটা দেখেও থাকতে পারে। তবে ভবেশ লোকটার যে রকম বর্ণনা দিল, তার সঙ্গে তো নিজের চেনাজানা কাউকে সে মেলাতে পারছে না।
যাইহোক, খাওয়া সেরে, দাম মিটিয়ে দোকানের বাইরে এসে সিগারেটের কৌটো থেকে একটা সিগারেট বের করে সে। কৌটোর ঢাকনা বন্ধ করে তাতে সিগারেটটা দু-বার ঠুকে ঠোঁটে ঝোলায়। হ্যাঁ, সে খানিকটা সময় নিচ্ছে আর সেইসঙ্গে ঈগল-চোখে মেপে নিচ্ছে সন্ধের অন্ধকারে ওইরকম কাউকে দেখা যাচ্ছে কি না। তবে এটা সে বুঝে গেছে যে কেউ তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। এ তো নির্ঘাত অন্য কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সিগারেটটা ধরিয়ে শ্যামাদাস এগিয়ে চলে তার গন্তব্যের দিকে। তেমাথা পেরিয়ে ইচ্ছে করেই কখনো জোরে আবার কখনো আস্তে চলতে থাকে শ্যামাদাস। চলার সময় নানান ছুতোয় পেছন ফিরে দেখে। কখনো জুতো থেকে কাঁকর বের করার অছিলায় আবার কখনো বা ঘড়ির বেল্ট বাঁধার বাহানায় দেখে নেয় সে পেছনে কেউ তাকে ফলো করছে কি না। বার দুয়েক চাদরের ওপর দিয়ে হাত বুলিয়ে দেখে নেয় তার কোমরে গোঁজা রিভলভারের অস্তিত্ব। আর এইভাবেই ভয় আর ভাবনার দোলাচলের মধ্যেই একসময় সে পৌঁছেও যায় তার বাড়ির দরজায়। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে তালা খুলে ভেতরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দেয়। আধঘণ্টা পরে তবে আবার তাকে দেখা যায় বেরোতে। তবে খালি হাতে।
.
পরের দিন নরেশ বাগদি সন্ধে সাতটা নাগাদ শ্যামাদাসের বাড়ি থেকে বেরোয়। তবে তার কাছ থেকে মিষ্টির দোকানে আসা লোকটার যে বর্ণনা সে শুনল সেইমতো নজর রাখতে রাখতে চলল বাসস্ট্যান্ডের দিকে। কিন্তু কই? নজরে এল না তো লোকটা? তবে খুব শিগগিরিই যে এই ঠেকটা পালটাতে হবে তা সে বেশ বুঝতে পারল। শ্যামাকে তাড়া দিতে হবে।
রাত ন-টা নাগাদ ভবেশ দোকানের কাজ শেষ করে সাইকেলে চেপে কুমোর গলির পথ ধরলে। একটু পরেই সে পৌঁছেও গেল শ্যামাদাসের বাড়িতে। দরজায় বিশেষ সাংকেতিক টোকা দিতেই দরজা খুলে দিল শ্যামাদাস। সাইকেলটা লক করে বাইরে রেখে ভবেশ ভেতরে ঢুকে যেতেই আবার বন্ধ হয়ে গেল দরজা।
হঠাৎই কালো ট্রাউজার, খয়েরি সোয়েটার আর গাঢ় নীল মাঙ্কি টুপি পরা একজন এসে বসল ভবেশের সাইকেলের পাশে। তারপর অতি সাবধানে আওয়াজ না করে সাইকেলের পেছনের চাকার হাওয়া খুলে দিয়েই হারিয়ে গেল রাস্তার আলো-আঁধারীতে।
মিনিট পনেরো পরেই শ্যামাদাসের বাড়ি থেকে হাতে একটা চটের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে এল ভবেশ। সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধ হয়ে গেল দরজা। ব্যাগটা হ্যান্ডেলে ঝুলিয়ে লক খুলে সাইকেলটা রাস্তায় নামাতেই সে বুঝতে পারল কোথাও একটা গড়বড় হয়েছে। ভালো করে পরীক্ষা করে দেখে বুঝতে পারল যে সাইকেলের পেছনের চাকাতে হাওয়া নেই। এই অবস্থায় তো আর সাইকেল চালানো যাবে না। এটাকে শ্যামাকাকুর বাড়িতেই রেখে যেতে হবে। নইলে রাস্তায় পড়ে থাকলে চুরি হয়ে যাবে। তাই আবার দরজায় সাংকেতিক টোকা দেয় সে। সামান্য একটু সময় লাগে দরজা খুলতে। দরজা খুলে শ্যামাদাস জিজ্ঞেস করলে— ‘আবার কী হল? সেই লোকটাকে দেখতে পেলি নাকি?’
—‘আরে না গো। সাইকেলটার পেছনের চাকাটা পামচার হয়ে গেছে। এটা এখানেই রেখে যেতে হবে, নইলে চুরি হয়ে যাবে। আর তুমি যে খামটা দেবে, সেটাও নিতে ভুলে গেছি।’
—‘ও আচ্ছা। আয়, ভেতরে আয়। এত ভুলো মন তোদের…।’
ভেতরে ঢুকে উঠোনে সাইকেলটা রাখে ভবেশ। শ্যামাদাস যায় ঘরের ভেতরে। এখান থেকে ভেতরটা স্পষ্ট দেখা যায়। বিছানায় পড়ে থাকা খামটা শ্যামাদাস তুলতে যেতেই ভবেশের নজর পড়ে শ্যামাদার বিছানায় দুটো প্যাকেট রাখা। ওই প্যাকেট দুটো ব্যাগে ঢোকাতেই যাচ্ছিল শ্যামাদাস, কিন্তু ভবেশ হঠাৎ ডাকতেই তাড়াহুড়োয় সেদুটো ব্যাগে ঢোকাতে ভুলে গেছে সে। বিছানা থেকে খামটা নিয়ে ভবেশের হাতে দিয়ে বলে—‘সাবধানে যাস কিন্তু। আর খেয়াল রাখিস কেউ তোকে ফলো করছে কি না।’
—‘ঠিক আছে। তুমি চিন্তা কর না।’ বলে রাস্তায় বেরিয়ে আসে ভবেশ। তবে তার মনে একটা খটকা লাগে— তার কাকাকে আর তার তাকে দেওয়া প্যাকেটের সংখ্যা মেলালে তো কোনো প্যাকেটই পড়ে থাকার কথা নয়। তবে শ্যামাকাকুর কাছে আরও যে দুটো প্যাকেট সে দেখল, সেগুলো কী?
সাইকেল নেই, তাই একটু তাড়াতাড়িই পা চালাতে হবে স্টেশনের দিকে। মোড়টা পেরোলেই স্টেশনে যাবার রাস্তাটা এই শীতের রাতে একটু বেশিই সান্নাটা। তার ওপরে বাতিও নেই। তবু ভবেশের মনে হচ্ছে পেছনে কেউ যেন আসছে। হ্যাঁ, একজন আসছে ঠিকই। আসছে অন্ধকারে মিশে, কালো পোশাকে। আরও তাড়াতাড়ি পা চালায় ভবেশ। স্টেশনে পৌঁছলে তবেই নিশ্চিন্ত। সেখানে আলো আছে অনেক। কিন্তু তার দেখাদেখি লোকটাও গতি বাড়ায়। এ নির্ঘাত পুলিশের লোক, কিংবা এর অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে। তাই ভবেশ দৌড়তে শুরু করে। কিন্তু লোকটার বেগ তার চেয়েও অনেক বেশি। সে পেছন থেকে এসে তার কলার চেপে ধরে ঠাস ঠাস করে দুটো চড় মারে তার গালে।
—‘পালাচ্ছিলিস কেন?’ মাঙ্কিটুপির আড়াল থেকে লোকটার চোখ দুটো শুধু দেখা যাচ্ছে।
—‘কই না তো। আমি তো পালাচ্ছি না।’ ভয় পেয়ে গেছে ভবেশ। তার কথাতেই সেটা বোঝা যায়।
—‘তোর ব্যাগে কীসের প্যাকেট আছে?’
—‘কই, কিছু না তো।’ আবার গালে একটা ঠাস করে চড় মারতেই ভবেশ বলে ফেলে ‘সা সা…মানে সাবান।’
—‘তা কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস? কলকাতায়?’
—‘হ্যাঁ।’
—‘এতরাতে এখান থেকে কলকাতায় যাচ্ছিস সাবান বেচতে? তা কত প্যাকেট সাবান বিক্রি করবি শুনি?’ ব্যঙ্গ ঝরে পড়ে লোকটার গলায়।
—‘দু…দু-প্যাকেট। মানে কুড়িটা।’
—‘মাত্র দু-প্যাকেট? তা এগুলো এমনকী স্পেশাল সাবান যে রাত্তিরে নিয়ে যেতে হয়? কলকাতায় তো এখন কেনার লোক পাবি না।’
চুপ করে থাকে ভবেশ। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে লোকটা আবার তার গালে আরেকটা চড় মেরে বলে— ‘যদি বাঁচতে চাস তো সত্যি কথা বল।’
ভয়ে ভবেশ সত্যি কথাটাই বলে— ‘এগুলো স্বদেশিদের তৈরি সাবান তাই…।’
লোকটা তার ট্রাউজারের পকেট থেকে একটা কাগজে মোড়া জিনিস বের করে। তার থেকে বের করে একটা সাবান। ভবেশের নাকের কাছে ধরে বলে— ‘শুঁকে দেখ। তোদের ওই সাবানের মতো গন্ধ আছে?’
—‘হ্যাঁ।’
—‘তাহলে একবার ধরে দেখ।… নে। নে। দেখ ভালো করে।’
আঙুল দিয়ে ধরতেই ভবেশ বুঝতে পারে এটা হুবহু তাদের স্বদেশি সাবানের মতো।
তাই সে চুপ করে থাকে।
লোকটা আবার কাগজে মুড়ে সাবানটা পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে বলে— ‘তোদের ওগুলোয় সাবানের ছদ্মবেশে অন্য জিনিস আছে।’
—‘কী আছে?’
—‘সত্যিই তুই জানিস না ওগুলোয় কী আছে?’
নার্ভাস ভবেশ বলে— ‘সত্যি বলছি জানি না।’
লোকটা এবার তার কাঁধে হাত রাখে। ভবেশ তাতে একটু ভরসা পায়। তারও কৌতূহল হয় জানতে যে তার প্যাকেটে কী আছে?
লোকটা বলে— ‘ওগুলোর মধ্যে আছে কোকেন। সাবানের মতো করে বাইরেটা তৈরি করা হয়েছে আর ভেতরটা ফাঁপা। আর সেই ফাঁপা অংশের ভেতরে আছে সেলোফেন কাগজে মোড়া কোকেন। দামি নেশার জিনিস। তোদের ওই শ্যামাদাস স্বদেশি সাবানের নামে তোদের দিয়ে কোকেন পাচার করায়।’ এই কথা বলে লোকটা আবার পকেট থেকে সাবানটা বের করে খুলে দেখায় ভবেশকে।
ভবেশের মুখে কথা সরে না। না জেনেই সে শ্যামাদাসের হয়ে কোকেন পাচার করছে।
—‘কী রে, বুঝলি তো এবার কী সর্বনাশের পথে পা বাড়িয়েছিস তুই? আচ্ছা, বল দেখি, আজ শ্যামা এইরকম ক-টা প্যাকেট এনেছে?’
একটু ঢোঁক গিলে ভবেশ বলে— ‘চারটে। …না না ছ-টা। আমার সাইকেল পামচার হয়ে গিয়েছিল বলে আমি আবার শ্যামাকাকুর বাড়িতে ঢুকেছিলাম। তখন শ্যামাকাকুর বিছানায় আরও দুটো প্যাকেট দেখেছি। মনে হয়, শ্যামাকাকু ওগুলো তার ব্যাগে ঢোকাতে যাচ্ছিল।’
—‘হুম, আচ্ছা, নরেশ তো তোর কাকা। তা সে কি জানে শ্যামা যখন নিজে কলকাতায় যায়, তখন সে ক-টা প্যাকেট আনে?’
—‘আমি গেলে চারটে প্যাকেট আনি আর শ্যামাকাকু গেলে ওই চারটে প্যাকেটই আনে বলে তো আমরা জানি। কিন্তু আজ সে দুটো প্যাকেট বেশি এনেছে।’
—‘বেশ, তোকে যে টাকার খামটা দিয়েছে শ্যামাদাস গুনে দেখ তো তাতে কত টাকা আছে। আগে কখনো গুনে দেখেছিলিস?’
—‘হ্যাঁ, একবার দেখেছিলাম। তবে আর কখনো গুনে দেখিনি। কিন্তু খামটার মুখটা আটা দিয়ে আটকানো আছে যে।’
—‘ঠিক আছে, খুলেই দেখ না। আবার না হয় আটকে দেওয়া যাবে।’ বলে লোকটা সাবানটা আবার কাগজে মুড়ে নিজের পকেটে ঢোকায়।
জিভের লালা দিয়ে ভিজিয়ে খামের মুখটা সাবধানে খুলে ভেতরের টাকাটা গুনে ভবেশ অবাক হয়ে যায়। বলে— ‘আরে, এখানে তো অনেক অনেক বেশি টাকা আছে দেখছি।’
—‘তাহলেই বুঝলি তো শ্যামা তোকে দিয়ে বেশি টাকা পাঠাচ্ছে যাতে সে নিজে পরের বারে আরও বেশি প্যাকেট আনাতে পারে। চারটে প্যাকেটের লাভের টাকা দিয়ে খরচ-খরচা চালাবে, আর বাকি দুটোর টাকা দিয়ে…বুঝতেই পারছিস। আচ্ছা আর একটা কথা বল তো, শ্যামা কতদিন পরে পরে নিজে কলকাতায় যায়, যেমন কাল গিয়েছিল আর কী?’
—‘মাসে একবার কী কখনো দু-বার তো যায়ই। মনে হয় মালের বন্দোবস্ত করতেই যায়।’ খামের মুখটা আবার আটকাতে আটকাতে বলে ভবেশ।
—‘তাহলে একটা কথা ভেবে দেখ, তোকে যখন মাসে দু-তিনবার কলকাতায় যেতে হয়, তখন নিশ্চয়ই ওর কলকাতায় একটা পাকা বন্দোবস্ত করা আছে।’ ভবেশের ব্রেনটা আরও ওয়াশ করতে থাকে নাম না জানা লোকটা। তাই বলতে থাকে— ‘তাহলে মাঝেমধ্যেই ও নিজে কলকাতায় যায় কেন? তোকে দিয়ে কাজটা করালেই তো পারত। আসলে এই সাবানের ব্যবসার আড়ালে ও আরও একটা ধান্দা চালায়। সেটা তোদের জানতে দিতে চায় না। কিন্তু আমি জানি সেকথা। সেটা পরে কখনো তোকে বা তোর কাকাকে বলব। এখন বাড়তি লাভের টাকা দিয়ে শ্যামা কী করে তা যদি জানতে চাস, তাহলে আমার সঙ্গে আয়রে কলুর বলদ। আর যা দেখবি সেটা তোর কাকাকেও বলবি। নে, এখন দেখবি তো চল। কাল আমি সব ঘুরে, দেখে ব্যবস্থা করে রেখে গিয়েছি। আয় তাড়াতাড়ি পৌঁছতে হবে সেখানে।’
দু-জনে হনহনিয়ে ফিরতি পথ ধরে।
.
কুমোর গলি ধরে দু-জনে এগোতে এগোতে লোকটার ইঙ্গিতে তারা দাঁড়িয়ে যায় একটা গলির সামনে। ভবেশের দ্বিধা দেখে লোকটা বলে— ‘কী রে আয়, ভেতরে যেতে হবে। ভয় লাগছে নাকি?’ ইচ্ছে করেই ভবেশকে এই খোঁচাটা দেওয়া যাতে তার দ্বিধা আর ভয় দুটোই কেটে যায়।
গলির মুখে একজন এই শীতের রাতেও গাঁদা আর রজনীগন্ধার মালা বিক্রি করছে। এই গলিতে যে বাবুরা আসে তাদের কাছ থেকে ভালোই দাম পায় সে। বাবুরা হাতে সেই মালা জড়িয়ে এগিয়ে যায় গলিপথ ধরে। শুধু পেছনে ছেড়ে যায় এক এক রকমের আতরের গন্ধ। গলিটা বেশ অন্ধকার। তবু কোনো কোনো খোলা দরজা থেকে হ্যারিকেনের এক এক ফালি ম্লান আলো ঠিকরে পড়ে গলিপথের ওপরে। এ যেন অন্ধকার পথে যাবার জন্যে আলোর প্রলোভন। আবার কোনো দরজা বন্ধ হলে সেই আলোটুকুও হারিয়ে যায়। পথের সেই অংশটুকু তখন আবার প্রলোভনের আলোর প্রত্যাশায় অপেক্ষা করে থাকে। আলো-আঁধারীতে এক আদিম রোমাঞ্চকর নেশার মাখামাখি চলে এই গলিতে।
ঘরটা এই লাইনের একেবারে শেষপ্রান্তে। ভবেশ তো ভাবতেই পারছে না তার শ্যামাকাকু এত রাতে এইরকম একটা জায়গায় এসে থাকতে পারে। ঘরটার একপাশে আর পেছনদিকে খানিকটা খোলা জায়গা রয়েছে। তারা দু-জনে ঘরটার পেছনে যায়। সেখানে কুয়োতলা। কুয়োতলার দিকে ঘরের জানলাটাও বন্ধ। শীতের জন্যে? নাকি এটাই এখানকার দস্তুর? লোকটা এদিক ওদিক তাকিয়ে ঘরের দেওয়ালের গা ঘেঁষে শুইয়ে রাখা একটা মই তুলে দাঁড় করিয়ে সাবধানে সেটা হেলিয়ে দেয় ঘরের টালির চালে।
লোকটা কি মইটা কাল এখানে রেখে গিয়েছিল? নাকি এটা এখানেই পড়ে থাকে? —মনে মনে ভাবে ভবেশ।
লোকটা উঠতে থাকে মই বেয়ে। টালির ওপর দিয়ে বুকে হেঁটে নিঃশব্দে সরিয়ে দেয় একটা টালি। সেই ফাঁক দিয়ে ঘরের ভেতরের একফালি আলো এসে পড়ে তার মুখে। তারপর সাবধানে নীচে নেমে এসে সে ভবেশকে ফিসফিসিয়ে বলে— ‘চুপিসাড়ে উঠে যা। দেখ ভেতরে তোর শ্যামাকাকু কী করছে। দেখিস, একদম আওয়াজ যেন না হয়। সাবধান।’
ভবেশও লোকটার মতো করেই নিঃশব্দে উঠে পড়ে মইটার ওপরে। তার হাতের ব্যাগটা নিয়ে একটু অসুবিধে হচ্ছে। প্রথমে সে ভেবেছিল যে ব্যাগটা লোকটাকে ধরতে দিয়ে সে ওপরে উঠবে। কিন্তু সে ওপরে ওঠার পরে লোকটা যদি মইটা সরিয়ে দিয়ে তার ব্যাগটা নিয়ে পালায়? তাই সে ব্যাগটা হাতেই রেখেছে। কিন্তু সাবধানে ওপরে উঠে টালির ফাঁকে চোখ রাখতেই সে বুঝে যায় লোকটার কথা একশোভাগ সত্যি। ভেতরের সবকিছু পরিস্কার দেখা যাচ্ছে আর সান্নাটা শীতের রাতের জন্যে ভেতরের কথাও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
শ্যামাকাকুর ব্যাগটা খাটের ওপরে রাখা। তার ভেতরে রাখা দুটো প্যাকেটের আভাষ বেশ বোঝা যাচ্ছে। খাটের ওপরে বসে একটা বাচ্ছাকে কোলে নিয়ে আদর করতে করতে শ্যামাকাকু গ্লাসের পানীয়তে চুমুক দিল। তার পাশে বসা বছর ত্রিশের এক মহিলা। সেও তার পানীয়র গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে।
শ্যামাকাকু বলছে— ‘জানো রসু, কাল কেউ একজন মিষ্টির দোকানে আমার পৈতৃক বাড়ির খোঁজ করছিল। সে নাকি আমাদের ভিটেটা কিনতে চায়।’
—‘তা ভবা কি তাকে বাড়ি দেকিয়ে দেচে?’ নিজের নাম শুনে কেমন যেন একটা শিরশিরানি লাগে ভবেশের।
—‘না, তা দেখায়নি বটে। ও চালাক চতুর ছেলে। বলবে না। তবে…।’ বাচ্চাটা শ্যামাকাকুর গাল টিপছে।
—‘তবে কী গা?’
—‘আমি ভাবছি, যে খোঁজ করছিল সে কে? অন্য দলের লোক? নাকি পুলিশ?’
—‘পুলিশ তো তোমায় ঘাঁটাবেনি। বলি, তারা তো মাসোয়ারা পায়; নাকি?’
—‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ রসময়ী। আমারও মনে হচ্ছে অন্য কোনো দলের লোক। আমার ব্যবসাটার বারোটা বাজাতে চায়। মনে হয় আমার বাড়িটা ওদের নজরে পড়ে গেছে।’ গ্লাসে আবার চুমুক দেয় দু-জনে।
—‘তাইলে তো তোমায় অন্য কোতাও ব্যবস্তা কত্তে হয়। তা নতুন জায়গা খুঁজে পেইচো?’
—‘না গো রসু, সেটারই সন্ধানে আছি। দু-চার দিনের মধ্যেই একটা ঠেক তৈরি করতে হবে। সেখানে তোমাদেরও নিয়ে গিয়ে রাখতে হবে তো।’
এই বলে শ্যামাকাকু বাচ্চাটাকে কোল থেকে নামিয়ে দেয় খাটে। বাচ্চাটা বলে ওঠে— ‘বাবা, তোমার বন্দুকটা দাও না। আমি পুলিশ পুলিশ খেলব।’
মহিলা বলে— ‘না বাবা ওসব ধত্তে নেই। এই নাও তোমার বন্দুক।’ বলে একটা টিনের খেলনা পিস্তল দেয় তার হাতে। বাচ্চাটা সেটা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে থাকে।
—‘তা রসু, বলি আজ কী রেঁধেছ?’
—‘শীতের দিন। তাই আর ভাত করিনি। নুচি, ফুলকপির তরকারি আর কষা মাংস করিচি।’
শ্যামাকাকু তার গালে আদরের চাপড় মেরে বলে— ‘এই না হলে আমার রসময়ী। রসে একেবারে টইটুম্বুর।’
রসময়ীও আদুরে হেসে তার হাত ধরে সেটা নিজের গালে চেপে ধরে বলে—‘আমার বুড়োই বা কম কীসে? সে তো এক্কেরে গরম জিলিপি। প্যাঁচে প্যাঁচে রস।’
দু-জনেই হেসে ওঠে। এমনসময় বাচ্চাটা পিস্তলটা বাগিয়ে ধরে বলে— ‘বাবা, বাবা, আমি তোমায় গুলি করছি। তুমি বেশ মরে যাবে, অ্যাঁ।’
—‘আচ্ছা কর।’ বলে বাচ্চাটার গালে আদরের চাপড় মারে।
—‘গুরুম।…গুরুম।…গুরুম। এবারে পড়ে যাও।’
ভবেশের শ্যামাকাকু লাশের মতো চিৎপাত হয়ে শুয়ে পড়ে খাটের ওপরে। আর তখনই তার নজরে পড়ে— টালির ছাদে ঘরের আলোয় দেখা যাচ্ছে একটা মুখ আর ওই মুখটা তার বড্ডো বেশি চেনা।
ধরা পড়ে গেছে বুঝতে পেরে ভবেশ লাফ মারে চালের ওপর থেকে। কালো প্যান্ট-শার্ট পরা লোকটা আর সে দৌড় লাগায় গলিপথ ধরে।
এদিকে শ্যামাদাস উঠে বসে ঠান্ডা গলায় রসময়ীকে বলে— ‘রসু, নগাই এখন কোথায়?’
—‘ও তো এখন ফুলমতীর ঘরে।’
—‘ওকে একবার ডাকো তো শিগগিরই। জরুরি দরকার। আর ব্যাগটা তোরঙ্গে ঢোকাও।’
.
সবে সূর্য উঠছে। হাওড়া থেকে আসা দ্বিতীয় ট্রেনটা কুয়াশার জন্যে বেশ ধীরে ধীরে আসছিল। এইসময়ে লাইনে চিড় ধরে। আবার অনেকসময় মানুষজনও লাইনের ধারে প্রাতঃকৃত্য সারতে বসে। তাই ড্রাইভার বারে বারেই হর্ন বাজাচ্ছিল। ট্রেনের হর্ন শুনতে পেলেই গাড়ু হাতে নিয়ে লাইন ছেড়ে উঠে যায় তারা। ওইতো, ওই যে একজন এখনও লাইনে বসে। কালা নাকি রে বাবা! হর্ন শুনেও উঠে যাচ্ছে না। স্টেশন এখনও আধমাইল দূরে। দূর হতচ্ছাড়া সর না— মনে মনেই বলে ড্রাইভার। সে আবারও হর্ন দেয়। কিন্তু লোকটা সরছে না।… আর মাত্র পঞ্চাশ গজ দূরে লোকটা। তাই বাধ্য হয়েই ব্রেক কষে সে। গাড়ি খানিক এগিয়ে ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে ব্রেকের আওয়াজ তুলে দাঁড়িয়ে যায়।
নিজের কেবিন থেকে নেমে লোকটার দিকে এগিয়ে যায় ড্রাইভার। দশ-বারো গজ দূর থেকেই ব্যাপারটা বুঝে যায় সে। কাছে এগিয়ে যেতে থাকে। অন্ধকার আর কুয়াশার জন্যে দেখতে না পেয়ে প্রথম ট্রেনটা মনে হয় রানওভার করেছে।
কাছে গিয়ে দেখে লাশের বয়স বেশি নয়। যদিও শরীরের ওপরের অংশ ট্রেনের ঘসায় থেঁতলে গেছে, তবুও শরীর আর পোশাক দেখলে বোঝা যায় বড়োজোর উনিশ-কুড়ি হবে। এবারে সামনের স্টেশনে খবর পাঠাতে হবে। তাই কোটের পকেটে রাখা হুইশিলটা বের করে জোরে জোরে তাতে বারবার ফুঁ দেয় সে, সহকারী চালক আর গার্ডের উদ্দেশ্যে। সামনের স্টেশনমাস্টারও হয়তো শুনতে পাবে এই শব্দ।
বিপদের সংকেতধ্বনি যে বহুদূর থেকেও শোনা যায় এই শীতের সকালে।
.
হুগলির পৈতৃক বাড়িতে সকালবেলা ঢোকে শ্যামাদাস। রসময়ীর কাছে লোক এসে প্যাকেটদুটো নিয়ে যাবে। কাজেই সেসব নিয়ে ভাবার কিছু নেই। এখন শুধু দেখতে হবে কে বা কারা তার পেছনে পড়েছে, আর সেইমতো ব্যবস্থা নিতে হবে। আপাতত আগে চান করতে হবে। তারপরে ফিরতে হবে গ্রামে। তাই সে কাচা পাঞ্জাবি-পাজামা আর গা মোছার জন্যে গামছাটা ভবেশের সাইকেলের ওপরে রেখে উঠোনের একধারের টিউবওয়েলের দিকে এগোতে যায়। আর তখনই ক্যারিয়ারে গামছার টান লেগে উলটে পড়ে সাইকেলটা। সেটাকে আবার সোজা করে রাখতে গিয়ে একটা শক্ত কিছু পড়ে পায়ের তলায়। ‘উঃ’ বলে পা-টা তুলতেই একটা সোনালি রঙের ধাতব জিনিস নজরে পড়ে তার। ঝুঁকে সেটা হাতে তুলেই বুঝতে পারে যে সেটা সাইকেলের টায়ারের ভালভ টাইট রাখার প্যাঁচ কাটা পিতলের অংশটা। সেটাকে জায়গায় লাগাতে গিয়েই সে বুঝতে পারে যে ভবেশের সাইকেলের টায়ার পাংচার হয়নি। এইটা খুলে গিয়ে হাওয়া বেরিয়ে গেছে। কিন্তু কেউ না খুলে দিলে এমনি এমনি তো আর ভালভ খুলে যায় না? ভবেশ তো খোলেনি। সে তো ভেতরেই ছিল। তাহলে কে হাওয়া খুলল? আর আরও একটা প্রশ্ন— ভবেশকে কে রসময়ীর ঘর চেনাল? আচ্ছা, তাহলে কি মিষ্টির দোকানে আসা লোকটাই এসব করেছে? সেজন্যেই কি কাল রসময়ীর ঘরে যাবার সময়ে তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে বারবার সতর্ক করে দিচ্ছিল?
তার চান মাথায় ওঠে। দাওয়ায় ওঠার সিঁড়িতে বসে ভাবতে শুরু করে— বিষ্টু ঘাড় ভেঙে মরেছে। পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট বলছে কোনো ভারী বস্তুর আঘাতে তার মৃত্যু হয়নি। অথচ ঘাড় ভাঙতে গেলে জোরালো আঘাত করতেই হবে। আবার দিনেশও নাকি গ্রামছাড়া। কিন্তু সকলে যা ভাবছে তা ঠিক নয়, কারণ তার চশমা পড়েছিল তার দাওয়ায়। পুলিশ নিজেদের পিঠ বাঁচাতে যাইই বলুক না কেন, দিনেশকে লোপাট করে দেওয়া হয়েছে— কারণ বিষ্টু আর দিনেশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিশির ডাক। দু-ক্ষেত্রেই নিশির ডাকের গলা কিন্তু দিনেশের। আবার সেই নিশি কিন্তু তাকেও চেনে। নইলে সে দিনেশের মায়ের ডাকে তার নাম বলত না। তাহলে ওই মিষ্টির দোকানে আসা লোকটাও কি সেই নিশিই? কিন্তু তার কপালে তো জড়ুল ছিল? আর কপালে জড়ুল আছে এমন কাউকে তো সে চেনে না। তাহলে… তাহলে…? অবশ্য সে একটা আন্দাজ করেছে। কিন্তু সে যা আন্দাজ করছে তা কি ঠিক? তাহলে তো একবার টোপ ফেলে দেখতেই হয়।
