১০ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৬
সন্ধেবেলা কানাইকে নিয়ে রজনী হাজির গোপালবাবুর অফিসে। কানাই যথারীতি সঙ্গে নিয়েছে তার নতুন পাওয়া অটোগ্রাফের খাতা।
আজ গোপালবাবু একলা বসে। একটু দূরে অন্য একটা চেয়ারে বসে বসন্ত খবরের কাগজ পড়ছে। তবে আজ গোপালবাবুর মুখটা কেমন যেন থমথমে।
—‘নমস্কার দাদা।’
—‘আরে রজনীবাবু যে, নমস্কার। বসুন বসুন। আরে বাবা, সঙ্গে তো খোকাবাবুও রয়েছে দেখছি।’ দু-জনে গোপালবাবুর সামনের চেয়ারে বসতে গোপাল বললেন— ‘ও বসন্ত।’
কাগজ রেখে বসন্ত বলল— ‘হ্যাঁ দাদা বলুন।’
—বলি, যুগলদার কাছ থেকে ওনার স্কুলের চেকটা এনেছ?’
—‘হ্যাঁ দাদা, দিচ্ছি।’ বলে বসন্ত আলমারি খুলতে এগিয়ে যায়।
হাঁ হাঁ করে ওঠেন গোপালবাবু। বলেন— ‘আরে চেকটা যখন এসেই গেছে তখন তাড়াহুড়োর কিছু নেই। তার আগে তুমি বরং সবার জন্যে এক রাউন্ড চায়ের ব্যবস্থা কর আর খোকাবাবু কী খাবে দেখ।’
কানাই বলে উঠল— ‘আমি শিঙাড়া খাব জেঠু।’
বসন্ত এসে কানাইয়ের পিঠে সস্নেহে হাত রেখে বলল— ‘ঠিক আছে। তোমায় ভালো শিঙাড়া খাওয়াব। তা ক-টা খাবে তুমি?’
—‘দুটো।’
—‘আচ্ছা, ঠিক আছে। একটু বসো। আনছি।’ বলে বসন্ত চলে গেল বাইরে।
—‘তারপর কী খবর বলুন রজনীবাবু। সবাই ভালো আছেন তো?’
—‘হ্যাঁ, তা একরকম। আপনারা?’
—‘একটু দুশ্চিন্তায় আছি।’
—‘কি রকম? জানতে পারি কী?’
—‘অবশ্যই। দুশ্চিন্তার কারণটা আর কিছুই নয়। একটা আশঙ্কা আর নিজের অক্ষমতা নিয়ে।’
—‘কেন? কী হল আবার?’
—‘খবরের কাগজে তো নোয়াখালির খবর পড়েছেন নিশ্চয়ই। গত মাসের একত্রিশ তারিখে বেলেঘাটায় গান্ধীজির থাকার জায়গায় হামলাও হল। এখন তো সবাই দেখছে চারপাশ শান্ত। কিন্তু দাঙ্গার আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে নোয়াখালিতে। আমার ভয় যে সেখানেও না আবার দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। আর যদি তা হয়, তবে সেটা হয়তো কলকাতার চেয়েও ভয়াবহ হবে। আর আমি? আমাকে কলকাতায় হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হবে। অপরিচিত জায়গা। তাই সেখানে দাঙ্গা বাঁধলে আমি কিচ্ছু করতে পারব না রজনীবাবু, কিচ্ছু না।’
গোপালবাবু থামতে রজনী বলে— ‘এখন থেকে এত উতলা হচ্ছেন কেন? আগে দেখুন না সেখানে দাঙ্গা হয় কি না।’
—‘হবার সম্ভাবনা প্রবল। ভুলে যাবেন না রজনীবাবু, মুসলিম লীগ চাইছে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগ করতে। আর নোয়াখালিতে তো হিন্দুরা মাইনরিটি।’
চুপ করে থাকে রজনী। কী বলবে সে ভাবে পায় না।
এমন সময় বসন্ত ঢোকে। তার পেছন পেছন ট্রে-তে করে ভাঁড়ে চা আর ছোটো একটা চেঙারি ভরা শিঙাড়া নিয়ে একজন বিহারি।
শালপাতায় করে শিঙাড়া আর ভাঁড়ে চা আসে সবার কাছে। শুধু কানাইয়ের ক্ষেত্রে চা টা বাদ।
খেতে খেতেই গোপালবাবু বলতে থাকেন— ‘রজনীবাবু, ভারত টুকরো টুকরো হবেই। কেউ ঠেকাতে পারবে না। এটাই আমাদের নিয়তি। খণ্ডাবে কে?’ একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে গোপালবাবুর বুক চিরে।
খাওয়া শেষ হতেই বসন্ত আলমারি থেকে একটা খাম বের করে আনে। দাদার হাতে দেয় সেটা। তোয়ালেতে হাত মুছে রজনীর হাতে খামটা দিয়ে গোপালবাবু বলেন— ‘এইটা পারলাম জোগাড় করতে। আর যদি কিছু প্রয়োজন হয়, সেটা আপনারা চাঁদা তুলে করে নেবেন ভাই।’
খাম থেকে চেকটা বের করে রজনী হাতে নিয়ে দেখে। পনেরো হাজার টাকা। সে তো অনেক। ঠিকমতো বুঝেশুনে খরচ করলে স্কুলটা আবার নতুন হয়ে যাবে। সে আপ্লুত হয়ে গোপালবাবুর দিকে দু-হাত বাড়িয়ে দেয়। গোপালও তার হাতদুটো ধরে মৃদু ঝাঁকুনি দেন।
কানাই এতক্ষণ ধরে সব দেখছিল, শুনছিল। এবার সে খাতাটা বাড়িয়ে দেয় গোপালবাবুর দিকে।
—‘এটা কী গো খোকাবাবু’ ?
—‘অটোগ্রাফ খাতা। এতে তোমার অটোগ্রাফ দাও জেঠু।’
—‘অটোগ্রাফ দেব আমি? কী যে বল খোকাবাবু? আমি কি অটোগ্রাফ দেবার মতো লোক?’ হো হো করে হেসে ওঠেন গোপালবাবু।
—‘ওসব জানি না জেঠু। তুমি অটোগ্রাফ দেবে, ব্যস।’
—‘আচ্ছা বাবা, দিচ্ছি দিচ্ছি। দাঁড়াও, একটু ভাবতে দাও কী লিখব। আগে তো কখনো অটোগ্রাফ দিইনি।’
মিনিটখানেক ভেবে নিয়ে গোপালবাবু খাতায় কিছু একটা লিখে সেটা দেন কানাইয়ের হাতে। কানাই খাতাটা নিয়ে পড়ে দেখে। তাতে লেখা— ‘বড়ো হওয়া ভালো, কিন্তু আরও বড়ো হল ভালো হওয়া। শুভেচ্ছা, ভালোবাসা আর অনেক আশীর্বাদ রইলো কানাইবাবুর জন্যে।’ নিচে বাংলায় সই করা— গোপাল মুখোপাধ্যায়। আর সইয়ের নিচে তারিখ দেওয়া— ১০ই সেপ্টেম্বর, ১৯৪৬।
