১৯৬৫ – ঘরছাড়া রজনী আর কানাইয়ের হা-হুতাশ

১৯৬৫ – ঘরছাড়া রজনী আর কানাইয়ের হা-হুতাশ

কানাইয়ের বেঙ্গল কেমিক্যালসের অবস্থা খুব একটা ভালো না। ভেতরে ভেতরে ক্ষয় শুরু হয়ে গিয়েছে। আজ সে বুঝতে পারছে যে এইভাবে চললে বেশিদিন কোম্পানির পক্ষে টিকে থাকা মুশকিল। সময় থাকতেই তাই অন্য একটা কিছু আয়ের রাস্তা দেখতে হবে।

অফিসের গেট থেকে বেরোতে বেরোতে এইসবই ভাবছিল কানাই। নাঃ, এসব নিয়ে ভাবলে বড়ো টেনশন হয়। তাই এখন একটু রিল্যাক্সের দরকার। আজ শনিবার। দেখা হবে বৈভব আর অরুণোদয়ের সঙ্গে। প্রতি শনিবারই অাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের চত্বরে দেখা হয় এই তিন বন্ধুর। বৈভব এখন একটা মাঝারি সাইজের প্রাইভেট গ্লু কোম্পানিতে সুপারভাইজারের চাকরি করে আর ঋতিকার অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে যাবার ফলে অরুণোদয় না করল পি এইচ ডি আর না খুঁজল একটা চাকরি। একগাল দাড়ি আর একমাথা উস্কোখুস্কো চুল নিয়ে সে এখন একটা বামপন্থী পার্টির হোলটাইমার। এদিকে সৌগতর কোনো খবরই কেউ জানে না। সে কোনো যোগাযোগও আর রাখেনি। আইএএস হল কি না কে জানে? আর অ্যান্টনি? সেও তো এখন ধরাছোঁওয়ার বাইরে। হপ্তাখানেক আগে রাতের দিকে কানাই ফোন করেছিল ওর বাড়িতে। ওর মা ফোনটা ধরেছিলেন। উনিই জানালেন যে, অ্যান্টনি নাকি পুরুলিয়া জেলার ওপরে একটা ডকুমেন্টারি ছবি তৈরি করছে আর তাই সে দিন দশেক হল দলবল নিয়ে সেখানে গেছে। কবে ফিরবে জানা নেই। অ্যান্টনির কথাটা শোনার পরে খুব খারাপ লেগেছিল কানাইয়ের। যে ছেলেটা একদিন স্বপ্ন দেখেছিল যে সে ‘নিউ ওয়েভ’ সিনেমা বানাবে, সে এখন একটা ডকুমেন্টারি ছবি বানাচ্ছে। অবশ্য ডকুমেন্টারি ছবি বানানো যে খারাপ তা নয়। ভালো ডকুমেন্টারি বানালে আন্তর্জাতিক পুরস্কারও জোটে; কিন্তু তাতে অ্যান্টনির স্বপ্নভঙ্গ হচ্ছে না তো? কানাই খুবই আশা করে যে ডকুমেন্টারি ছবি বানাতে বানাতেই অ্যান্টনি হয়তো একদিন সত্যি সত্যিই ‘নিউ ওয়েভ ফিল্্ম’ বানাবে। এখন তার সিনেমায় হাতেখড়ি হচ্ছে।

যাইহোক, আড্ডা মেরে সাড়ে ন-টা নাগাদ বাড়ি ফিরে কানাই শুনল যে বাক্স আর ব্যাগ নিয়ে রজনী নাকি বিকেল তিনটে নাগাদ বেরিয়ে গেছে। ঘরের চাবিটা কেষ্টদার হাতে দিয়ে বলে গেছে সেটা কানাইকে দেবার জন্যে। কথাটা শুনে কানাই ভাবলো— এই তো গতবছর স্যার হপ্তা তিনেক কোথায় যেন ঘুরে এল, আর এইবছরে কাউকে কিছু না জানিয়ে আবার বেরিয়ে পড়ল?

—‘তা কোথায় গেছে, কিছু বলে যায়নি কেষ্টদা?’

—‘না গো, শুধু বললে যে চাবিটা তোমাকে দিলে তুমি সব বুঝতে পারবে।’

—‘ও আচ্ছা। দাও, চাবিটা দাও।’

কেষ্টদা ফতুয়ার পকেট থেকে চাবিটা বের করে কানাইকে দেয়।

চান সেরে কানাই চাবি নিয়ে স্যারের ঘরে গিয়ে দরজা খুলে আলোটা জ্বালায়। প্রথমেই চোখ পড়ে আলনায়। একটাও জামাকাপড় নেই সেখানে। খাটের তলায় উঁকি মারে। সেখানেও শুনশান। ঢাউস আয়না লাগানো আবলুশ কাঠের আলমারিটা খোলে। সেখানে ন্যাপথ্যালিনের গন্ধ ছাড়া আর কিছুই নেই। তারপরে তার নজর পড়ে টেবিলে। সেখানে স্যারের মানিব্যাগ, কলম, লেখার প্যাড কিচ্ছু নেই; শুধু আধভরতি একটা জলের গ্লাসের নীচে চাপা দেওয়া রয়েছে একটা সাদা ভাঁজ করা কাগজ। কৌতূহলে কানাই টেনে নেয় সেটা। তারপরে ভাঁজ খুলে পড়তে শুরু কর—

স্নেহের কানাই,

তোকে কিছু না জানিয়ে বেরিয়ে পড়ার জন্যে খুবই খারাপ লাগছে। কিন্তু যেতে আমাকে হতই। তাই চললাম। কোথায় যাচ্ছি তা জানতে চাস না। শুধু জেনে রাখ— আমি বেরোলাম খোঁজের পথে। জানিস কানাই, মাসখানেক আগেই আমি চাকরিতে ইস্তফা দিয়েছি। তোরা যাতে জানতে না পারিস, তাই অফিস টাইমে বেরিয়ে কোনোদিন অফিসে গিয়ে রেজিগনেশন সংক্রান্ত কাগজপত্রের কাজকর্ম সেরেছি; আবার কোনোদিন বা ঘুরে বেড়িয়েছি কলকাতার আনাচে-কানাচে। মাঝে একবার গ্রামেও গিয়েছিলাম শেষবারের মতো আখড়া, নদী, হাটতলার বটগাছ, স্কুল দেখতে। সেনেদের ভাঙা ভিটেটাও দেখেছি, যেখানে (তোর ধারণায়) বোমা পড়েছিল। আসলে আমি আর কলকাতা কিংবা চাঁপাডাঙায় ফিরব না কোনোদিন। তাই সবকিছু একবার দেখে নিলাম। স্মৃতিকে আর নিজের শেকড়কে ভুলে থাকা যে বড়ো কঠিন কাজ রে কানাই। তাই পারলে চাঁপাডাঙার বাড়িটার দেখাশোনা করিস তুই।

আর হ্যাঁ, সুবিমল আমার ইস্তফার কথা জানত। কিন্তু আমারই অনুরোধে সে তোদের কিছু জানায়নি। প্রকৃত বন্ধুর মতোই কাজ করেছে সে। কোনো পরামর্শের দরকার হলে তার সাথে দেখা করিস কিংবা ফোনে কথা বলিস।

সৌভাগ্যবশত সুবিমলের উদ্যোগেই আমার প্রাপ্য টাকার চেকও হাতে পেয়ে গিয়েছি খুবই তাড়াতাড়ি। এর জন্যে সুবিমলকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়। আর টাকা যা পেয়েছি তাতে বাকি জীবনটা আশাকরি স্বচ্ছন্দে কেটে যাবে। তার সঙ্গে তো মাসিক পেনশনের টাকাটা আছেই। তাই আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করিস না।

কানাই, আমার জানা বিদ্যের প্রায় সবটুকুই দিয়েছি তোকে। আর যেটুকু দিতে পারলাম না, তার জন্যে তুই দায়ী নোস; দায়ী নিয়তি। তোকে তো আর আমার দেবার কিছুই নেই। তাই বেরিয়েই পড়লাম।

এখন আমি তো ভাটির পথের যাত্রী। সেই পথে চলতে চলতে যদি কোনো যোগ্য আধার পাই, তাহলে সেখানেই রেখে যাব আমার সবটুকু।

তোরা সবাই ভালো থাকিস আর তুই রইলি আমার বুকের গভীরে পরম স্নেহের উষ্ণতায়।

আমার ভালোবাসা নিস আর বড়োদের আমার প্রণাম জানাস। ইতি।

.

তোর স্যার।

পুনশ্চ:- কোন ব্যাঙ্কে আমার পেনশন জমা হবে তা সুবিমলকে জিজ্ঞেস করেও জানতে পারবি না। তাই বৃথা সে চেষ্টা করিস না। ও কথা দিয়েছে যে ও এই ব্যাপারে কাউকে কিছুই বলবে না।

চিঠিটা হাতে নিয়ে খানিকক্ষণ চুপ দাঁড়িয়ে থাকে কানাই। এক অব্যক্ত ব্যথায় তার ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। সেই যন্ত্রণা তার চোখ থেকে দু-ফোঁটা জল হয়ে গড়িয়ে পড়ে চিঠিটার ওপরে। ধেবড়ে যায় কিছুটা অংশের কালি। সে বিড়বিড় করতে থাকে— ‘স্যার, তুমি আমার ওপরে এতটা নির্দয় হতে পারলে? সেই ছোটো থেকে তুমি আমায় আগলে রেখেছ, আমাকে বড়ো করেছ। তুমি কি জানতে না স্যার, যে আমি তোমাকে বাবার মতোই শ্রদ্ধা করি, ভালোবাসি। তুমি না থাকলে কোথায় হারিয়ে যেতাম আমি। আজ যখন আমি ভাবছিলাম যে তুমি রিটায়ার করার পরে প্রাণভরে তোমার সেবা করব, তোমাকে কোনো কাজ করতে দেব না, ঠিক তখনই তুমি আমায় ছেড়ে চলে গেলে স্যার। কোথায় গেলে তুমি বল? আমি তোমার কাছে যাব। তোমায় ফিরিয়ে আনব। তুমিই বল, তুমি না থাকলে রোজ সকালে আমায় প্র্যাকটিস দেবে কে? বল? কে দেবে বল?’

ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে কানাই। কান্নার দমকে তার শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠতে থাকে। বেশ খানিকটা কাঁদার পরে তার কষ্ট ধীরে ধীরে পালটে যায় রাগে। সেই রাগের বসে সে বলতে থাকে— ‘তুমি বল স্যার, কি ছিল না আমার যে তুমি তোমার সব বিদ্যা আমাকে দিয়ে যেতে পারলে না? আমি কি এতই অযোগ্য? তুমি তো ভালোই জানো যে লড়াইয়ের সময়ে আমি কত সাংঘাতিক হতে পারি। তাহলে? তাহলে কেন তুমি আমাকে সব দিলে না? বল। বল স্যার। চুপ করে থেক না। আজ আমার নিজেকে বড়ো দীন মনে হচ্ছে। অথচ তুমি আমার কথার উত্তর দিচ্ছ না। তুমি আমাকে ভাব কী? আমি দুর্বল? তাহলে এই দেখ তোমার কানাই কত শক্তি ধরে…।’ তারপরেই বাড়ি কাঁপিয়ে একটা চিৎকার— ‘কী ইহ্যাপ’।

কানাইয়ের একটা পাঞ্চ আছড়ে পড়েছে আবলুশ কাঠের আলমারিতে লাগানো ঢাউস আয়নাটাতে। ঝনঝন করে ঘরময় ছড়িয়ে পড়েছে কাঁচ। সেই পাঞ্চের জোর এতটাই যে আয়নার পেছনে লাগানো কাঠটায় পর্যন্ত গর্ত হয়ে যায়।

এদিকে নীচ থেকে শোনা গেছে কানাইয়ের হুংকার। মাসিমা রোজ সকালে ছাদ থেকে এই আওয়াজ শুনতে অভ্যস্ত। এটা তো ওদের লড়াইয়ের সময়ে আক্রমণের হুংকার। কিন্তু এই রাত্তিরে কানাই কীসের জন্যে ওই চিৎকার করল? মাসিমা বেরিয়ে আসেন বারান্দায়। কেষ্টদাকে ডেকে বলেন— ‘কেষ্ট, দ্যাখ তো ওপরে কানাই কী করছে।’

কেষ্টকে বললেন বটে, কিন্তু মন যে মানে না। তাই কেষ্টদার পেছনে পেছনে মাসিমাও উঠে আসেন। রজনীর ঘরের মুখে ঢুকেই অবাক হয়ে যান। একী করেছে কানাই? সারা মেঝেতে ছড়ানো ভাঙা কাঁচের মাঝে হাঁটু গেড়ে বসে সে। সারা শরীরে ঘাম। মাথা ঝুঁকে পড়েছে হাঁটুর ওপরে। কেঁপে কেঁপে উঠছে তার শরীরটা আর সেই সঙ্গে শোনা যাচ্ছে ফোঁপানির আওয়াজ। কাঁদছে কানাই। কিন্তু কোন কষ্টে? তাই মাসিমা বলেন— ‘কী হল দাদুভাই? তুমি অমন করে বসে আছ কেন?’

মাসিমার কথা শুনে ধীরে ধীরে সোজা হয় কানাই। তারপরে তার ঠাম্মির দিকে না তাকিয়েই বাঁ-হাতটা এগিয়ে দেয়। সেই হাতের মুঠোয় ধরা একটা কাগজ। তাতে জায়গায় জায়গায় লাল লাল ছোপ। মাসিমা হাত বাড়িয়ে দোমড়ানো কাগজটা নিয়ে ভাঁজ খুলে পড়তে থাকেন। আর যতই পড়েন ততই তাঁর ভুরু দুটো কুঁচকে যেতে থাকে। পড়া শেষ হলে উনি বুঝতে পারেন যে কেন কানাইয়ের এমন দশা হয়েছে। কেন কানাই ভেঙেছে আলমারির আয়নার কাঁচ। তাই পরম স্নেহে বলেন— ‘ডান হাতটা দেখাও তো দাদুভাই।’ কানাই কোনো জবাব দেয় না, এমনকী তার হাতটাও দেখায় না তার ঠাম্মিকে। তাই একটু অপেক্ষা করে মাসিমা বলেন— ‘অক্ষয় ডাক্তারকে একবার ডেকে নিয়ে আয় কেষ্ট। বলবি জরুরি দরকার।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *